হোম গদ্য প্রবন্ধ প্রশ্নহীন লেখক হুমায়ূন আহমেদ!

প্রশ্নহীন লেখক হুমায়ূন আহমেদ!

প্রশ্নহীন লেখক হুমায়ূন আহমেদ!
2.76K
0

বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ ইহকাল গত করেছেন ৪ বছর। এটা খুব সুখের সংবাদ নয়। জাতির জন্য খানিকটা দুখের। কারণ বেঁচে থাকলে আনন্দদায়ক আরও কিছু সাহিত্য তাঁর কাছে পেত বাংলা ভাষার পাঠক-পাঠিকা। বেঁচে থাকাকালে তিনি সাহিত্য দিয়ে পাঠককে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলেন। এটা বাংলাদেশের সাহিত্যে বিরল ঘটনা। কেউ কেউ বলেন, তাঁর পাঠক ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণি’র। আমরা শ্রেণি বলব না, বলব ‘বিকাশমান মধ্যবিত্ত সমাজ’। শ্রেণির দিক থেকে মধ্যবিত্ত সমাজ স্থির নয়। কিন্তু হুমায়ূনের পাঠক খানিকটা স্থির। প্রয়াণের ৪ বছর পর বলা যাবে না তাঁর পাঠক অন্য কোনো লেখকের কুঠুরিতে ঢুকেছেন। সমকালীন সাহিত্যের বাস্তব অবস্থার ভেতর এত এত পাঠক কি হারিয়ে গেছেন? না!

আদতে লেখক হিশেবে তিনি ছিলেন ‘বাস্তবতার দশা’। যে বাস্তব পাঠককে শুধু আনন্দ দেয়। রাজনৈতিক কাঙ্ক্ষা তার মোক্ষ নয়। এমনকি প্রশ্নও সেখানে থেকেছে আড়ালে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের বৃত্ত ভাঙার চেয়ে তিনি আনন্দ ডুবিয়ে রেখেছেন। ‘ডুবিয়ে রাখা’ আর ‘ডুবে যাওয়া’ এক পদার্থ নহে। ডুবিয়ে রাখার ভেতরের পদার্থ ‘নির্মল মকারি’। আর ‘ডুবে যাওয়া’র ভেতরের পদার্থ ‘ভাসমান সমাজ’। ভাসমান এই অর্থে, বাস্তবতার বাইরে ভাববার অবসর নাই। ফলে হুমায়ূনের স্রোত হুমায়ূনের দিকে থেকে গেছে। দর্শনের দিক থেকে বাস্তব কোনো স্থির ধারণা নয়। এক অবস্থা থেকে এক অবস্থার রূপান্তর। কিন্তু সমাজে অবস্থা অবস্থাই থাকছে। মৌল পরিবর্তনের কোনো প্রশ্ন সেখানে নেই।


তিনি পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে পশ্চিমবাংলার ম্যাড়ম্যাড়ে-সংস্কৃত বাংলা ভাষা হতে আলাদা করে দিয়েছেন।


ব্যক্তি হুমায়ূন আহমদকে নিয়ে আমরা খানিকটা আবেগাপ্লুত। আবেগাপ্লুত হওয়ার কারণ অন্য। কারণ তার বিপুল রচনা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পাঠকসমাজকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছে। সেটা কেন? সোজা কথায়, বাংলা সাহিত্যে তাঁর তিন অবদানের কথা বলতে হয়। পহেলা, তিনি পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে পশ্চিমবাংলার ম্যাড়ম্যাড়ে-সংস্কৃত বাংলা ভাষা হতে আলাদা করে দিয়েছেন। কেন দিয়েছেন? এতে সামাজিক, ভৌগোলিক আর রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। সামাজিক দিক থেকে বাঙালি মুসলমান সমাজের বিকাশ, ভৌগোলিক দিক থেকে ’৪৭-এর দেশ ভাগ, রাজনৈতিকভাবে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন আর ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—এর ভেতরে প্রোথিত আছে।

পূর্ববাংলার পাঠককূলের দিকে তাকালে বোঝা যাবে এই অঞ্চলে রোমেনা আফাজ কেমন জনপ্রিয় ছিলেন। একদা রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর চরিত্র পূর্ববাংলার বাঙালি মধ্যবিত্ত পাঠককে মোহাবিষ্ট করেছিল। রোমেনা আফাজ থেকে এটার উত্তরণ ঘটে কাজী আনোয়ার হোসেনে। দস্যু বনহুরের আসনটি দখল করে নেয় কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা। ভাষার এই চরিত্র বদলটা কি খুব সহজে ঘটেছে? বলা যায়, হুমায়ূন আহমেদ এই ভাষাটাকে আরও সহজ ও আধুনিক করেছেন। কেননা তিনি পশ্চিমবাংলার সংস্কৃত ভাষানির্ভর বাংলাভাষা থেকে সহজ বাংলা ভাষার দিকে ধাবিত ছিলেন। ফলে হুমায়ূনের বইয়ের পাঠকপ্রিয়তা বেড়েছে। তাকে যত ‘স্থূল’ ‘চটুল’ নানা বিসর্গমূলক তকমা আঁটা হোক না কেন, তিনি যে সেই খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে গেছেন।


যা বাস্তব সমাজে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়, সেটাই তিনি হিমু কিংবা মিসির আলি নামক চরিত্রের আচরণের ভেতর দিয়ে তুলে এনেছেন।


দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে না গিয়ে তিনি সাহিত্যকে প্রশ্নহীন বিনোদনের ছক হিশেবে এঁকেছেন। কেন প্রশ্নহীন? হুমায়ূন সাহিত্যে কোনো প্রশ্ন তোলেন নাই, বা প্রশ্ন আকারে হাজির হন নাই। এই না হওয়াটাকে নিছক বিনোদন আকারে চিহ্নিত করা যায়। যে বিনোদন সমাজে প্রশ্ন আকারে হাজির হয়, সেটা এক রাজনৈতিক দ্বান্দ্বিক কাঙ্ক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। প্রশ্ন কিংবা দর্শন সেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে। হুমায়ূন সেই দ্বান্দ্বিক কাঙ্ক্ষার ভিতর দিয়ে যান নি। ফলে তার লেখা কাহিনি সমাজে প্রশ্নের উদ্রেক করে না। এটা অনেকটাই বর্ণনামূলক। সাহিত্যে তিনি যে বড় কাজটি করেছেন, সেটা রস সৃষ্টি করা। অন্তত বাংলাদেশের সাহিত্যে তার জুড়ি মেলা ভার।

তৃতীয়ত, গুটিকয় গল্প বা উপন্যাস বাদে তিনি অনৈতিহাসিক লেখক। কেননা গল্প বা উপন্যাসে কাহিনির চরিত্র বিকাশে ব্যক্তির দৈহিক বা ভাষিক আচরণকে প্রাধান্য দিয়েছেন। মধ্যবিত্ত মনে মনে যা করতে চায়, যা পারে না বা যা বাস্তব সমাজে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়, সেটাই তিনি হিমু কিংবা মিসির আলি নামক চরিত্রের আচরণের ভেতর দিয়ে তুলে এনেছেন। এই আচরণ বা দেহবাদিতাই তাঁর সাহিত্যের প্রাণ। সাহিত্যে তিনি কাহিনির ভিতর দিয়ে চরিত্রের স্বাধীনতা দেখিয়েছেন। মানুষের অভাব মূলত বাস্তব অবস্থার অভাব। ফলে সে বাস্তবতানির্ভর নিঠুর অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু শ্রেণি বা রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে সেই অবস্থায় বেঁধে রাখে। এই বেঁধে রাখার প্রক্রিয়া তাকে অসুখের পরিণতি দেয়। সে বেরোবার পথ খোঁজে। পথ পায় না, ফলে চরিত্রাবলি হয়ে ওঠে বাস্তবদশার কল্পনাবিলাসী। কাহিনির এসব কল্পনা নিছক কল্পনাবিলাস, কোনো শ্রেণিসংঘাতে যায় না। ফলে নিছক ব্যঙ্গ-, বিদ্রূপ-রসে চরিত্রগুলো আচ্ছন্ন থাকে বা থেকে কাহিনির বিস্তার করে।


ছফা যা ভেবেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ তা হয়ে উঠতে পারেন নি বা উঠতে চান নি। এমনও হতে পারে, হুমায়ূন যা হতে চেয়েছিলেন ছফা তা বুঝতে পারেন নি।


যে কথা না বললে নয়—লেখক হুমায়ূন আহমেদের জন্ম বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ আহমদ ছফারই ছত্রছায়ায়—হুমায়ূনের প্রথম লেখকজীবনের প্রথম যৌবনেই। বিষয় এমন না, আহমদ ছফা হাতে ধরে লেখা শিখিয়েছেন তাঁকে। কিন্তু ছফা প্রথম যৌবনে তাঁকে বাংলা সাহিত্যে আন্তন শেখভের মতো লেখকের আবির্ভাব হিশেবে ঠাউরেছিলেন। ছফা যা ভেবেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ তা হয়ে উঠতে পারেন নি বা উঠতে চান নি। এমনও হতে পারে, হুমায়ূন যা হতে চেয়েছিলেন ছফা তা বুঝতে পারেন নি। সেই তর্ক অন্য। তবে সাহিত্যে তিনি হয়ে উঠলেন মধ্যবিত্তের প্রাণপুরুষ। তার মৃত্যুতে সাহিত্যের যত না ক্ষতি হয়েছে, বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে খোদ হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যভোক্তা মধ্যবিত্ত সমাজকে। এমন নির্মল বিনোদন আর কই পাওয়া যাবে!

বাংলা সাহিত্যে তাঁর মতো প্রশ্নহীন লেখক আর আছে কিনা সন্দেহ। প্রশ্নহীন থাকতে পারার শক্তি তিনি মৃত্যুর কিছুদিন আগ মুহূর্ত পর্যন্ত দেখাতে পেরেছিলেন। অন্তত তাঁর অসমাপ্ত লেখা ইতিহাসনির্ভর ‘দেয়াল’ উপন্যাসের আগ পর্যন্ত। বিশেষত তাঁর ইতিহাসনির্ভর উপন্যাসগুলো পাঠ করলে সেই দুর্বলতা টের পাওয়া যায়। উপন্যাসের চেয়ে হুমায়ূনের গল্পের রন্ধনপ্রক্রিয়া বেহতর। কারণ আঁটোসাঁটো কাহিনি তাঁর শক্তিময় দিক। সেই তুলনায় উপন্যাসের গঠন অনেক এলানো। কখনো কখনো দ্বিরুক্তি-কাহিনিও চোখে পড়ে। তবে ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’র মতো বই পাঠকমনে অনেকদিন স্মরণীয় রাখবে তাঁকে। হয়তো!

সাখাওয়াত টিপু

সাখাওয়াত টিপু

জন্ম ১৯৭১, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম। লেখক ও চিন্তাবিদ।


প্রকাশিত বই :
কাব্যগ্রন্থ—
১. এলা হি বরষা
২. যাহ বে এই বাক্য পরকালে হবে
৩. শ্রী চরণে সু
৪. বুদ্ধিজীবী দেখ সবে
৫. কার্ল মার্কসের ধর্ম


সম্পাদনা ও গবেষণা—
১. জাতীয় সাহিত্য (ভাষা ও দর্শনের কাগজ)
১. চাড়ালনামা (নাসির আলী মামুনসহ যৌথ)


ই-মেইল : shakhawat.tipu@gmail.com
সাখাওয়াত টিপু