হোম গদ্য প্রবন্ধ প্রভাবিত এলিয়ট

প্রভাবিত এলিয়ট

প্রভাবিত এলিয়ট
1.03K
0

প্রভাব কখনও কখনও সুন্দর ও সদর্থক হয়, হয় গুরুত্বপূর্ণও। চাঁদের ওপর সূর্যের প্রভাব নান্দনিক কেননা তা সৃষ্টি করে জোছনা। কখনও বা প্রভাবিতই সেরা হয়ে ওঠেন, ছাড়িয়ে যান প্রভাবককে: দুজনের নাম এক্ষেত্রে বলা যায়: বোদল্যের ও এলিয়ট। এ দুজন তাদের প্রভাবক-পূর্বসূরি এডগার অ্যালেন পো ও জুল লাফর্গ থেকে হয়ে ওঠেছিলেন ব্যাপকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা অকপটে বলেওছেন এই প্রভাবের কথা।

টি. এস. এলিয়ট এমন একজন কবি যিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন বেশ কয়েকজনের দ্বারা, বেশ কিছু দর্শন, চিন্তা ও রচনার দ্বারাও, এবং তিনি নিজেও পরে প্রভাবিত করেছেন পৃথিবীর প্রতিটি ভাষার (সম্ভবত ফরাসি বাদে) অসংখ্য কবিকে। শুধু কবিতা নয়, তিনি জন্ম দিয়েছিলেন নতুন শৈলী ও সমালোচনাধারার যা এখনও প্রভাব বিস্তার করে আছে নানাভাবে, নানা প্রান্তের কবি ও কবিতাকে, যাকে আমরা বলে থাকি নিউ ক্রিটিসিজম বা নব্যসমালোচনাবাদ। সাধারণত যারা নেন তারা তা স্বীকার করেন না, বা করতে চান না। অনুসৃতিকে লুকিয়ে রাখতে চান তারা, কারণ তারা মনে করেন, তা তাদের মৌলিকত্ব ও নিজ প্রতিষ্ঠাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, মৌলিকত্ব আসলে একধরনের সৃষ্টিশীল নবায়ন বই অন্য কিছু নয়। এলিয়ট তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ঐতিহ্য ও ব্যক্তিপ্রতিভা’-য় এ বিষয়ে অন্যভাবে বলেছেন, ‘কোনো কবি বা যে-কোনো শিল্প মাধ্যমের কোনো শিল্পী একা কোনো স্বয়ম্ভূ অর্থ বহন করেন না। তার তারিফ হলো মৃত কবি ও  শিল্পীর সাথে তার সম্পর্কায়নের তারিফ। একা তা কোনো মূল্য বহন করে না। তুলনা ও সাদৃশ্যের জন্য নিজেকে মৃত কবি-শিল্পীদের মাঝে বসাতেই হয় তাকে।’ অনুসৃতিকে স্বীকার করার ক্ষেত্রে, এলিয়ট, সামান্য খামতি ছাড়া, ব্যতিক্রম। খামতির কথা বলছি, কারণ, ‘অবজেক্টিভ কোরেলিটিভ’—এই বিখ্যাত ধারণাটির প্রথম উদ্ভাবক ছিলেন আমেরিকান চিত্রশিল্পী ওয়াশিংটন অলস্টোন, তিনি এক বক্তৃতায় এর সূত্রপাত করেন যা তার মৃত্যুর পর ১৮৫০ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯১৯ সালে এলিয়ট একে পুনর্জাগরিত করেন কোনো রকম স্বীকার ছাড়াই। এ ছাড়া দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর ‘দ্য ফায়ার সারমন’-এ তাইরেসিয়াসের স্বগতোক্তির পর অনেক বিচ্ছিন্ন ঘটনার উল্লেখ করেছেন এলিয়ট যা ১৯১৩ সালে প্রকাশিত, অধুনা বিস্মৃত, কাউন্টেস মারি লারিশ-এর মাই পাস্ট নামক স্মৃতিচারণ গ্রন্থ থেকে নেওয়া, যার কোনো ঋণস্বীকার তিনি টীকায় করেন নি। এই সামান্য ব্যতিক্রম বাদ দিলে শুরু থেকেই তিনি যে প্রভাবিত এবং কিভাবে প্রভাবিত, সে বিষয়ে পুনরাবৃত্তিকভাবে বলে গেছেন, এবং  মোটাদাগে বলাই যায়, একক ও যৌথ প্রভাবক-পূর্বসূরি কবি-লেখকদের ওপর  লিখেও গেছেন।


তিনি আবিষ্কার করে বসলেন নিজেকে লাফর্গের ভেতর দিয়ে, তাকে আত্তীকৃত করে


কিন্তু কারা ছিল তার প্রভাবক-কবি বা ভাবুক? পরিষ্কার করে বলা খুব সহজ কেননা তিনিই এ পথ দেখিয়ে গেছেন, কিন্তু তার আগে দেখি কিভাবে তিনি এর কথা বলেছেন। ‘নিজের প্রস্বরকে ব্যবহারের জন্য যে-ধরনের কবিতাকে জানার প্রয়োজন ছিল আমার, তা মোটের ওপর ইংরেজি ভাষায় ছিলই না, তা কেবল খুঁজে পেয়েছিলাম ফরাসিতে।’ ১৯৪০ সালে ইয়েটসের ওপর লেখা প্রবন্ধে একথা বলছেন তিনি। প্রতিভাত হচ্ছে, তিনি মোটা দাগে স্বীকার করছেন ফরাসি সাহিত্যের ওপর তার দুর্বলতার কথা। ১৯৪৮ সালে, যে বছর তিনি নোবেল পুরস্কার এবং দ্য অর্ডার অব মেরিট পেয়েছেন, ‘দ্য ইউনিটি অব ইউরোপিয়ান কালচার’-এ তিনি দিচ্ছেন এক তাৎপর্যপূর্ণ স্বীকারোক্তি: ‘বোদল্যের থেকে শুরু করে ভালেরি পর্যন্ত বহমান ঐতিহ্যকে বাদ দিলে সাহিত্যিক কাজ বলতে গেলে আমার পক্ষে ছিল অসম্ভব।’ ১৯৩৩ সালে জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ৩য় টার্নবুল ভাষণেও তিনি বললেন, ফরাসি কবিদের ছাড়া তার পক্ষে কবিতা লেখা অসম্ভবই ছিল। আরও বললেন, ‘আমি মনে করি, যে-ই সমসাময়িক সাহিত্যকে বুঝতে চাইবে, তাকেই ইংল্যান্ডের নয়, ফরাসি প্রজন্মকেই চর্চা করতে হবে।’ এর আগে  তার সমসাময়িক টি. ই. হিউম, এজরা পাউন্ড, এফ. এস. ফ্লিন্ট এবং রিচার্ড অ্যালডিংটন ছাড়া ইংরেজিভাষী কারও মুখেই এ কথা শোনা যায় নি। তাদের এই ঐতিহাসিক উপলব্ধিও হয়তো সাহিত্যিক রাজনীতির কারণে আলোচিত হয় নি। কিন্তু কেন এলিয়ট এ কথা বললেন? আমরা জানি, ১৯১০-১১ সময়টা এলিয়ট প্যারিসে বাস করেছেন এবং ফরাসি ভাষা শিখেছেন খুব ভালোভাবে। ফরাসি ভাষায় কবিতাও লিখেছেন। যে ভিন্নতার প্রয়াসী ছিলেন তিনি, তার একটি উৎস ও ভিত্তিভূমি তিনি পেয়ে গিয়েছিলেন ফরাসি ভাষায়। ফরাসিদেশে গমন ছিল তার জন্য তীর্থযাত্রার মতো যার মাধ্যমে তিনি নিজেকে বদলে ফেলতে চেয়েছিলেন ভেতরে-বাহিরে। তিন দশক পর এ ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন যে, ‘আমি বিশ্বাস করি, ১৯১০ সালে প্যারিস আবিষ্কার একজন যুবকের জন্য ছিল এক ব্যতিক্রমী সৌভাগ্যের ঘটনা।’ সময়টা যে ভালো ছিল তা নয়: ৩০ ডিসেম্বর ১৯১০-এ লা ফিগারোর একটি কার্টুন অনুযায়ী তা ছিল স্যেন নদীর বন্যা আর রেল ধর্মঘট নিয়ে খুবই খারাপ বছর। কিন্তু সে-বছর এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে আরেক বিখ্যাত কবি রাইনের মারিয়া রিলকেও এলেন প্যারিসে। এসবে আগ্রহ ছিল না এলিয়টের, প্রতি সপ্তাহে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করে কলেজ দ্য ফ্রঁসে-তে বের্গসনের বক্তৃতা শুনতেন, স্যেন নদীর পার ধরে হাঁটতেন, আনাতোলে ফ্রাঁসকে দেখতেন, আর আঁদ্রে জিদ বা ক্লদেলের সর্বশেষ প্রকাশিত লেখাগুলো দোকান থেকে কিনে এনে পড়তেন। প্যারিস কখনও তার কাছে মনে হতো এক অতীত, কখনোবা এক ভবিষ্যৎ, আর এ-দুয়ে মিলে এক পরিপূর্ণ বর্তমান। তিনি বলেছেন, ‘প্যারিস যদি বিশেষভাবে কিছু আমার কাছে তুলে ধরে থাকে তবে তা হলো এক সুন্দর সুযোগের আকস্মিকতা। কোনো দৈব আমাকে প্যারিসে হাজির করে নি। বেশ কয়েক বছর ধরেই ফ্রান্স আমাকে মেলে দিয়েছিল কবিতার ডালা।’ তার ফরাসি ভাষাজ্ঞান যদিও ছিল কেতাবি, তবু তা ছিল মোটের ওপর উৎকৃষ্ট। একঘেয়ে উচ্চারণে তাড়াতাড়িই তিনি ফরাসি বলতে পারতেন। যদিও তিনি যুদ্ধের সময়টা অতিবাহিত করেছিলেন লন্ডনে, তবু লন্ডনকে তিনি ঘৃণাই করতেন। অক্সফোর্ডকে বলেছিলেন ভালো কিন্তু বন্ধু আইকেনকে বলেছিলেন, ‘আমি সেখানে মরতে চাই না।’ অন্যদিকে প্যারিস ছিল তার কাছে মরূদ্যান যা তাকে অনেক বছর ধরে জুগিয়েছিল মানসিক সুস্থতা। ১৯২০ সালের ২২ আগস্ট সিডনি শিফকে তিনি লিখেছিলেন যে, লন্ডনে বসবাসের পর প্যারিস তাকে দিয়েছিল বড় ধরনের স্বস্তি। এমনকি ১৯১৯ সালের আগস্টে ফ্রান্সে আবার এক সফরের পর তিনি তার মাকে ভ্রমণের উত্তেজনা জানিয়ে চিঠিও লিখেছিলেন। প্যারিস ছিল তার কাছে এবং তার জন্য এক শক্তিশালী উদ্দীপনা। ম্যাক্সওয়েল বডেনহাইমকে ১৯২১ সালের ২ জানুয়ারি লেখা চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, ‘যখনই ছুটি পাই, ছুটে পালিয়ে যাই প্যারিসে।’ নোবেল পুরস্কার ও অর্ডার অব মেরিট পাওয়ার পর ‘এডগার অ্যালেন পো ও ফ্রান্স’-বিষয়ক ফরাসিতে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি আবারও জানান যে, একজন আমেরিকান বংশোদ্ভূত ইংরেজ কবি হিশেবে তিনি বোদল্যের ও বোদল্যের ঘরানার কবিদের কাছ থেকে তার নিজের শিল্পকে শিখে নিয়েছিলেন। সে-সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন যে তিনি তখন ইংরেজি ছেড়ে প্যারিসে থিতু গেড়ে ফরাসিতে লেখার চিন্তা করেছিলেন। দুই আমেরিকান লেখক স্টুয়ার্ট মেরিল ও ফিয়েলে-গ্রিফিন-এর মতো সত্যিকারভাবে ফরাসিতে লেখার চিন্তা তাকে আবিষ্ট করে রেখেছিল। ১৯৪৮ সালের শেষের দিকে তার মধ্যে কমই দ্বিধা কাজ করেছিল এই ভেবে যে ঊনবিংশ শতাব্দীর চূড়ান্ত বছরগুলোতে ইউরোপীয় কবিতার সেরা কাজ হয়েছিল ফ্রান্সেই। ১৯৩০ সালে দ্য ক্রাইটেরিয়ন-এর জানুয়ারি সংখ্যায় তিনি আরও একবার এ বিষয়ে করেন স্মরণীয় উক্তি: ‘মি. সাইমনস-এর কাছে আমি অত্যন্ত ঋণী তার দ্য সিম্বলিস্ট মুভমেন্ট ইন লিটারেচার বইটির জন্য। ১৯০৮ সালে আমি লাফর্গ বা র‌্যাঁবোর নাম শুনি নি। সম্ভবত ভেরলেনও পড়া শুরু করি নি বা কিছুটা পড়লেও করবিয়ে-র নাম শুনি নি। সুতরাং সাইমনসের লেখা বইটি এমন একটি বই যা আমার জীবনের গতিপথকে পরিবর্তিত করে দিল।’ আমরা বুঝতে পারছি এলিয়ট আর্থার সাইমনসের দ্য সিম্বলিস্ট মুভমেন্ট ইন লিটারেচার বইটির কথা বলছেন যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৯৭ সালে, এবং যা প্রথমবারের মতো ফরাসি প্রতীকবাদী কবিদের বিষয়ে ইংরেজিভাষী বিশ্বে সার্থকভাবে আলো ফেলেছিল। এলিয়ট সম্ভবত বইটির ১৯০৮ সালের দ্বিতীয় সংশোধিত সংস্করণটি পড়েছিলেন। সাইমনসের এ বইটি  ছিল বিস্ময়কর, এমনকি এখনও। তিনি এমনভাবে ফরাসি প্রতীকবাদী কবিদের কবিতা ও জীবনকে মেলে ধরেছেন যা পাঠকদের আগাগোড়া করে তোলে সম্মোহিত। এলিয়টকেও করেছিল, এবং তা এমনভাবে যে তিনি আবিষ্কার করে বসলেন নিজেকে লাফর্গের ভেতর দিয়ে, তাকে আত্তীকৃত করে, যেন বুঝতে পারলেন স্নায়ুর শিল্পকে। বুঝলেন, নতুন, অপ্রত্যাশিত এবং বিচলনকর এক সাহিত্যকে, যা ছিল অভূতপূর্ব। পরে, নিউইয়র্কে, ডোনাল্ড হল-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও ফরাসি কবিদের সাথে তার জানাজানি-প্রশ্নে তিনি আর্থার সাইমনস-এর বইগুলোর কথা বলেছেন। আমরা দেখছি ফরাসি সাহিত্য বিষয়ে তার অভিনিবেশ সৃষ্টির উন্মেষমাহাত্ম্যটির। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানিয়েছেন যে, হারভার্ডে থাকার সময় বোস্টনে একটি বইয়ের দোকানে যেতেন তিনি, এবং সেখানেই  তার প্রথমে নজরে পড়ে লাফর্গের বইটি, এবং ফরাসি আরও অনেকের কবিতার বই। এটা আরও বোঝা যাবে একই পত্রিকার আরও দুটো উদ্ধৃতিতে যেখানে তিনি বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের ইংল্যান্ডের ও আমেরিকার বৌদ্ধিক ঊষরতার কথা বলতে গিয়ে ফরাসি কবিতার উৎকর্ষের কথা বলেছেন। আমরা জানি তিনি তার প্রভাবক কবিদের কথা বলতে গিয়ে দান্তের কথা বলেছেন। ১৯৫০ সালে দান্তের বিষয়ে আবারও বললেন, ‘এখনও, চল্লিশ বছর পর, আমি শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করি আমার নিজের কবিতার ওপর  তার কবিতার গভীর ও দৃঢ় প্রভাবকে।’ এর প্রায় এগার বছর পর আবারও দান্তের বিষয়ে বলছেন, ‘তিনি এমনই এক কবি যিনি আমার একুশ বছর বয়সে আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিলেন, তিনি এমন এক কবি যিনি আমার সময়ের প্রশান্তি আর এক বিস্ময়-বিহ্বল করা কবি।’ দেখতে পারছি, প্রভাবক কবির ওপর তার পুনরাবৃত্তিক শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি। এর নজির আরও মেলে। তার সাথে পরিচয় ঘটে তার আমেরিকান বন্ধু ও শিক্ষক আলেঁ-ফোরিঁয়ার-এর যিনি রিভিয়ের-এর সাথে এলিয়টকে পরিচয় করিয়ে দেন। ফোরিঁয়ার আর রিভিয়ের-এর অনিঃশেষ আগ্রহ ছিল লাফর্গ আর ক্লদেলের বিষয়ে, এবং তাদের অস্বাভাবিক আগ্রহের কারণেই সারাজীবনের জন্য এলিয়টের ভেতরে জন্ম নেয় এ দুজন কবির স্থায়ী প্রভাব। ফোরিঁয়ের ও রিভিয়ের দান্তে এবং রেমি দ্য গোরমঁতের অনুরাগী ছিলেন, যা এলিয়টের ওপরও প্রভাব বিস্তার করেছিল বলে মনে করা হয়। এছাড়াও আঁদ্রে জিদের সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকা লা নোভো রেভু ফ্রাঁসোয়া (এন আর এফ)-ও এলিঅটকে প্রভাবিত করেছিল যার আদলে তিনি তার ক্রাইটারিয়নকে প্রকাশ করেছিলেন। আলেঁ-ফোরিঁয়েরের ছিল লাফর্গের বিষয়ে অসাধারণ তৃষ্ণা যা সঞ্চারিত হয়েছিল এলিয়টে। ১৯০৬ সালের ২১ মার্চ লেখা এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন: প্রতিটি শ্রদ্ধেয় মানুষেরই উচিত লাফর্গের জন্য অতি উৎসাহিত বোধ করা।’ ১৯৫০ সালে লাফর্গের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তিনিই প্রথম যে আমাকে আমার বাচনিক মাধ্যমের কাব্যিক সম্ভাবনাকে কিভাবে উচ্চারণ করতে হয়, তা শিখিয়েছেন।’ ১৯৬১ সালে, মৃত্যুর চার বছর আগে, আবারও দেখি লাফর্গ সম্পর্কে তার আত্মনিষ্ঠ ও আত্মনিবেদিত উক্তি: ‘জুল লাফর্গ, যার কাছে যে-কোনো ভাষার যে-কোনো কবির চেয়ে আমার সবচেয়ে বেশি ঋণ।’


এলিয়ট বলেন, তার কাছে লাফর্গ মানেই কবিতা, বা আধুনিক এক কৃষ্টি।


প্রচলিত ইংরেজি কবিতাকে অস্বীকার বা অপ্রতুল ভেবেই এলিয়ট নতুনের খোঁজে ফরাসি কবিতাকে তালাশ করতে গিয়ে পেয়ে যান জুল লাফর্গকে। লাফর্গ জন্মগ্রহণ করেন উরুগুয়ের মন্তিভিদিয়োতে, ১৮৬০ সালের ২০ আগস্ট। ছ-বছর বয়সে তিনি তার পূর্বপুরুষের দেশ ফ্রান্সে চলে আসেন। ১৮৮৬ সালে তিনি লিয়া লি নাম্নী এক ইংরেজ নারীকে বিয়ে করেন লন্ডনের সেন্ট বারনাবাস চার্চে যেখানে ঠিক সত্তুর বছর পর তারই গুণমুগ্ধ এলিয়ট ভালেরি ফ্লেচারের সাথে গাঁটছড়া বাঁধবেন। বিয়ের পর লাফর্গ প্যারিসে চলে আসেন এবং ১৮৮৭ সালে তার সাতাশতম জন্মদিনের দু-দিন আগে, যক্ষ্মায় মারা যান। সাইমন্স তার বইয়ে লাফর্গের ওপর লেখাটি শেষ করেন তার সম্পর্কে ভিলিয়ের-এর একটি উক্তি দিয়ে: ‘তিনি ছিলেন সেই সমস্ত মানুষদের একজন যারা করোটিতে জোছনার আলো নিয়ে পৃথিবীতে আসেন।’ মেরি হাচিনটনকে লেখা চিঠিতে এলিয়ট বলেন, তার কাছে লাফর্গ মানেই কবিতা, বা আধুনিক এক কৃষ্টি। কিন্তু কেন লাফর্গের কবিতাকে মনে হয়েছিল তার নিজের প্রাতিস্বিকতার জন্য বা ইংরেজি কবিতার ঋদ্ধির জন্য দরকারি? কারণ, লাফর্গের কবিতার ভাষার যে দু-দিকে ধারবিশিষ্ট বহুগুণিত সম্ভাবনার শৈলী, তা-ই তাকে আকর্ষণ করেছিল এবং একেই আরও আলুলায়িত ও বাতুল সংরাগে তার নিজের কবিতায় ব্যবহার করেন তিনি যা প্রতিষ্ঠিত করেছিল আধুনিকবাদের অভূতপূর্ব প্রতিরোমান্টিকতাকে, আর এলিয়টকে করে তুলেছিল অসাধারণ। যদিও এই প্রভাব কিছুটা আপতিক তবু এলিয়ট এই স্বীকরণকে পুনঃপুন বলে গেছেন প্রায় সারাজীবনব্যাপী। ডোনাল্ড হলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এলিয়ট বলেন, লাফর্গ যে-আঙ্গিকে কবিতা লিখতেন, সেই একই আঙ্গিকে লেখার একটি প্রবণতা তার প্রথমদিকের গীতিকবিতাগুলোর মধ্যে পাওয়া যাবে। শুধু কবিতাই নয়, স্পেন্ডার বলে গেছেন কিভাবে তিনি চুপিচুপি শুনে ফেলেছিলেন, গাব্রিয়েলা মিস্ত্রালকে এলিয়ট বলছিলেন যে পোড়ো জমি লেখার সময় তিনি বৌদ্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করতে শুরু করেছিলেন। এটাও এসেছিল লাফর্গের প্রভাবে, কারণ, লাফর্গের ওপরও ছিল ছদ্ম-বৌদ্ধবাদের প্রভাব।

কী ছিল লাফর্গের কবিতায় যা সম্মোহিত ও অনুসন্ধিৎসু করেছিল এলিয়টকে? প্রতীকবাদী কবিতার নতুন ফর্মের কলোম্বাস লাফর্গকে স্তেফান মালারমে বলেছিলেন অন্যতম প্রধান কবি। ফরাসি কবিতায় ভালেরি, জিদ, ক্লদেল, লারবোও, ব্রেতঁ, এলুয়ার ও সাঁ-জন পের্স-এর সমতুল্য হিশেবে তাকে মনে করা হয়। এলিয়টের প্রিয় সাহিত্য-সমালোচক রেমি দ্য গোরমতঁ লাফর্গকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘যৌবনের অবিসংবাদিত শিক্ষক… আমাদের একজন পূজ্য জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা’ বলে। পিয়েরে সেগেরস বলেছেন, লাফর্গ আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রবর্তক। চারটি কাব্য ছাড়াও তার রয়েছে একটি উপন্যাসিকা ও একটি ছোটগল্পের সংকলন। তিনি ছিলেন নতুনের অভিলাষী। তার বোনকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘যে-কোনো মূল্যেই একজন লেখককে হতে হবে মৌলিক।’ লিখেছেন, ‘একজনকে হতেই হবে নতুন…শিল্পে, হতেই হবে আকর্ষণীয়।’ আমরা এ কথারই প্রতিধ্বনি দেখি ইংরেজি আধুনিকবাদের স্থপতি এজরা পাউন্ডের কথায়: ‘মেক ইট নিউ।’ লাফর্গ আরেকটি চিঠিতে লিখেছিলেন: ‘ভাঁড় হওয়াই উচিত ছিল আমার। আমি নিয়তি-নিরুদ্দিষ্ট। অনিবার্যভাবেই তা হারিয়ে গেছে।’ অন্যস্বরে কথা বলার মাধ্যমে এ কবি তার নিজের ভয় ও কষ্টকে লুকাতেন, এই অন্যস্বর এক মুখোশ। তার আত্ম-ব্যাজোক্তি, তার নৈর্ব্যক্তিক অগ্রগামিতা প্রতিপন্ন করেছিল আগত কালের আধুনিকতার স্বরকে। তিনি চাইতেন তার নিউরোসিসকে লুকাতে, চাইতেন অন্তর্গত জীবনের অবিরাম আঘাতকে শ্লেষের দ্বারা প্রকাশ করতে। ভালেরি বলেছেন, একজন মানুষের স্নায়ুতন্ত্রই সেরা কবি। এজন্যই লাফর্গ বলেন, ‘জীবন নিয়ে আমি ছিলাম ভীত’ আর এলিয়ট বলেন, ‘এককথায় আমি ছিলাম ভীত’। জীবনের নির্বাসনের সংবেদন থেকে কবিতা লিখেছেন দুজনেই। দুজনই ফেলে এসেছিলেন তাদের জন্মস্থান: লাফর্গ মন্তিভিদিয়ো আর এলিয়ট মিসিসিপি। বলা যায়, দুজনের কবিতাই আসলে নির্বাসনের কবিতা। আর চিন্তাকে সংবেদনে পরিণত করার এলিয়টীয় প্রাতিস্বিকতা তো এসেছে লাফর্গ থেকেই।

এলিয়ট লাফর্গ থেকে নিয়েছিলেন অনেক। এখন সাদৃশ্য খুঁজলে পাওয়া যাবে অনেক। যখন এলিয়ট বলেন, ‘জন্ম, সঙ্গম আর মৃত্যু, এ-ই সব’, মনে হবে লাফর্গের প্রতিধ্বনি: ‘ক্ষুধা, প্রেম, আশা…অসুস্থতা,/ তারপর মৃত্যু, একই ধরনের তামাশা সর্বদা’। মনে হবে, এলিয়ট প্যারাফ্রেজিং বা শুধু যেন একটু অন্বয় করে বলছেন লাফর্গেরই কবিতা-পঙ্‌ক্তি। এলিয়টের পাগলের মৃত জেরানিয়ামকে ঝাঁকি দেওয়াকে মনে হবে লাফর্গের ‘বিমুগ্ধ ভাড়ের মুখ/ যেন এক আশ্চর্য জেরানিয়াম’-এর এলিয়টীয় উপস্থাপনা। ‘দ্য লাভ সং অব জে. অ্যালফ্রেড প্রুফ্রক’-এর শেষদিকে এলিয়ট বলছেন, ‘রাখব কি পেছনের দিকে চুল ভাঁজ করে? পিচফল পারব কি মুখে নিয়ে খেতে?’, বা ‘পোর্ট্রেট অব আ লেডি’-তে বলছেন, ‘এসব চিন্তারা কি ঠিক, নাকি বেঠিক’, অথবা পোড়ো জমি-তে বলছেন, ‘সেই লাশটি উদ্‌গত হতে শুরু করেছে? এ বছরই কি ফুটবে তা?’ বা ‘কিছু কি ভাবছ তুমি? কী ভাবছ? কী?’,—এসবের সাথে সহজ মিল খুঁজে পাওয়া যায় লাফর্গের কবিতা-পঙ্‌ক্তির: ‘খেয়েছ তো ভালো করে,/কেমন ছিল পদগুলো?’, ‘আমরা কি একা? কেন এই সন্তাপ?’ ‘যদি জানতাম আমি, যদি জানতাম আমি’, ‘তুমি কি বুঝেছ? কেন পারছ না বুঝতে তুমি?’ ‘হা ঈশ্বর, এসব কি নয় এক প্রতারক দুঃস্বপ্ন?’ আমরা আরও বুঝে নিই, আত্মজিজ্ঞাসার যে গভীরতা, ঢঙ এবং আধিবিদ্যক জেরার যে ধরন এলিয়ট তার প্রথম ও মধ্য পর্যায়ের লেখায় সূত্রপাত করেন, তার বীজ নিহিত ছিল লাফর্গের কবিতায় ব্যবহৃত অত্যুক্তিতে।


এটা এক বিস্ময়, তবু এলিয়ট নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন প্রভাবকে


প্রভাবিত হয়েছিলেন এলিয়ট। প্রভাবিত হয়েছিলেন বেদান্ত ও বৌদ্ধদর্শন, খ্রিস্টীয় দুঃখবাদ ও সংস্কৃতি, প্রতীকবাদী কবি ও কবিতার দ্বারা। প্রভাবিত হয়েছিলেন ইংরেজ আধিবিদ্যক কবি ও এলিজাবেথীয় নাট্যকার, শেক্সপিয়র, ডান, এজরা পাউন্ড ও দান্তের দ্বারাও। আবেগের স্বতোৎসারণকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রলম্বিত করে কিভাবে আধুনিক কবিতার ঐতিহ্য নির্মাণ করা যায়, সে-বিষয়ে ছিলেন দান্তের সফল অন্বেষক। দান্তের ‘ইনফের্নো’ থেকে নেন ‘দ্য লাভ সং অব আলফ্রেড প্রুফ্রক’-এর এপিগ্রাফ। প্রভাব আর কিছুই না, তা হলো আলোকিত হওয়া। প্রভাবকে ঋণ গ্রহণের সাথেও এক করে দেখা ঠিক নয়। ঋণ হচ্ছে সরাসরি গ্রহণ, প্রভাব তা না-ও হতে পারে। তাই প্রভাবকে শুধু ‘অনুরূপ’ বা  ‘সাদৃশ্য’ বা  ‘অভিসৃতি’ মনে করা অযথার্থ। প্রভাব হচ্ছে উদ্দীপন, পথ খুঁজে পাওয়া। বা তাকে ধরা যেতেও পারে ব্যাখ্যা বা গ্রহণীকরণ। তা সরাসরি বা অপ্রত্যক্ষ দুটোই হতে পারে। হতে পারে ঋণাত্মকও। গ্যোয়েটের ওপর বলতে গিয়ে আঁদ্রে জিদ বলেছিলেন, জাগিয়ে তোলা ছাড়া প্রভাব কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না। এলিয়টের ক্ষেত্রে হয়তো তা-ই হয়েছিল। এটা তো ঠিক যে আত্তীকরণের প্রতিভা ছিল এলিয়টের, সবকিছুকেই তিনি নিজের মতো করে নিতে পারতেন, সব গ্রহণকেই করে তুলতে পারতেন প্রাতিস্বিকতাময়। নিয়েওছেন প্রাচ্য-প্রতীচ্য থেকে। তবু উদারভাবেই তিনি প্রভাবের কথা, ঋণের কথা বলেছেন। লিখেছেনও প্রভাবক-পূর্বসূরিদের ওপর। কিন্তু আশ্চর্য যে, লেখেন নি লাফর্গের ওপর। ১৯৬১ সালে শেষবারের মতো তিনি অনেকটা দুঃখবোধ ও দায়বদ্ধতার অনুতাপ থেকে তাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন এই বলে যে, বোদল্যেরের ওপর তিনি লিখেছেন কিন্তু লাফর্গের ওপর কিছুই লেখেন নি অথচ তার কাছেই তিনি সবচেয়ে বেশি ঋণী। তার ওপর প্রভাবকারী দান্তে, বোদল্যের, এলিজাবেথীয় ও আধিবিদ্যক কবিদের ওপর লিখলেও কেন তিনি সবচেয়ে প্রভাবকারী জুল লাফর্গের ওপর লেখেন নি, এ প্রশ্ন অবলীলায় এসে যায়। এই খামতির বিষয়ে তিনি জানান যে, কেউ তাঁকে লাফর্গের ওপর লিখতে দায়িত্ব দেয় নি, কারণ অন্যদের ওপর  প্রথম দিকের তার এইসব লেখাগুলো ছিল অর্থের বিনিময়ে লেখা। এই আত্মপক্ষ সমর্থন মন মানে না আমাদের। দীর্ঘ জীবনে শ্রেষ্ঠ প্রভাবক এই পূর্বসূরির ওপর লেখা কি অসম্ভব ছিল তার পক্ষে? তিনি কি লেখেন নি এই ভয়ে যে তাতে তার খ্যাতি অর্জনের পথ কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত ও বিতর্কিত হয়ে পড়বে?

এটা এক বিস্ময়, তবু এলিয়ট নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন প্রভাবকে, বলেছেন নিজের ওপর  প্রভাবক কবি-লেখকদের কথা—কারও বিষয়ে প্রবন্ধ লিখে, আর কারও বিষয়ে অভিভাষণ বা চিঠিতে, বা সুচিন্তিত মন্তব্যে।

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতা: লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব ( ২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২), তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪);

প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬), অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯),মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫);

অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪)।

ই-মেইল : kumar.4585@yahoo.com
কুমার চক্রবর্তী