হোম গদ্য প্রবন্ধ প্যাস্টোরাল কবিতার ইতিবাচক অনুষঙ্গ

প্যাস্টোরাল কবিতার ইতিবাচক অনুষঙ্গ

প্যাস্টোরাল কবিতার ইতিবাচক অনুষঙ্গ
828
0

১. পত্রপাঠ
১৮৫২ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার নবাগত অধিবাসীদের স্থান সংকুলানের জন্য রেড ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকে জমি ক্রয় করতে চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। জবাবে রেড ইন্ডিয়ানগোষ্ঠী প্রধান সিয়াটল যে পত্রটি লিখেছিলেন প্যাস্টোরাল কবিতা বুঝতে হলে সে চিঠির খানিকটা পড়া জরুরি :

ওয়াশিংটন থেকে প্রেসিডেন্ট সাহেব জানিয়েছেন যে তিনি আমাদের জমিজিরাত কিনতে চান। কিন্তু আকাশ কি কেনাবেচা করা যায়? যায় জমি কেনাবেচা করা? আমাদের কাছে এই ধারণা খুব অদ্ভুত মনে হচ্ছে। বাতাসের সজীবতা, জলের স্বচ্ছতা তো আমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। তাহলে? কী করে কিনবেন তাদের?

এই ধরিত্রীর প্রতিটি ধূলিকণা আমার লোকেদের কাছে পবিত্র; প্রতিটি পাইন পাতার কাঁটা, প্রতিটি বালুবেলা, ঘনান্ধকার অরণ্যের প্রতিটি শিশিরকণা, প্রতিটি মাঠ, প্রতিটি গুঞ্জরিত পতঙ্গ। আমার লোকেদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতায় এরা সবাই খুব পবিত্র।

গাছ রস টেনে নেয় গোপন পথে—আমরা তা জানি, যেমন জানি রক্ত আমাদের ধমনি বেয়ে চলে। আমরা এই ভূলোকের অংশ, যেমন এই ভূলোক আমাদের অংশ। সুরভিত ফুলেরা আমাদের বোন। ভালুক, হরিণ, রাজকীয় ঈগল—এরা সবাই আমাদের ভাই। পাহাড়ের চূড়া, সবুজ প্রান্তরের রস, ঘোড়ার শরীরের ওম, আর মানুষ, সবাই আমরা একই পরিবারের সদস্য।

ঝর্নায় নদীতে স্ফটিক-স্বচ্ছ যে জল গড়িয়ে যায় সে তো নেহায়েৎ জল নয়, আমাদের প্রপিতাদের শরীরের স্বেদ, রক্ত। আমরা যদি আপনাকে জমি বিক্রি করি তো অবশ্যই স্মরণ রাখবেন যে জমিটা পবিত্র। ঝিলের স্বচ্ছ জলে অলৌকিক ছায়া পড়ে। তার প্রতিটিতে আমার লোকেদের জীবনের স্মৃতি আর ঘটনা বিম্বিত হয়। বনের মর্মর ধ্বনিতে আমি আমার পিতামহের ডাক শুনতে পাই।

নদীরা আমাদের ভাই। তাদের জলে আমাদের তৃষ্ণা মেটে। ওরা আমাদের নৌকা বয়ে নেয়, আমাদের সন্তানদের মুখের গ্রাস জোগায়। অতএব আপনি অবশ্যই নদীকে সেই রকম দয়াদাক্ষিণ্য করবেন যেমনটি করবেন আপনার ভাইকে।

আমরা যদি জমি বিক্রি করি তো মনে রাখবেন যে সেই জমির ওপর প্রবাহিত বাতাস আমাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। হাওয়া তার উদ্যোমের অংশ দান করে তার সমস্ত পোষ্যকে। হাওয়া যেমন প্রথম ফুৎকারে আমাদের প্রপিতামহের ফুসফুসে দিয়েছে দম, তেমনি গ্রহণ করেছে তার অন্তিম শ্বাসবায়ুও। আমাদের শিশুদের বাতাস দেয় জীবনের উদ্যম। অতএব আপনাকে জমি বিক্রি করলে অবশ্যই সেই জমি বিশেষ যত্ন করে রাখবেন যেন সেখানে লোকে মাঠের ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ পাওয়ার লোভে সমবেত হয়।

আমাদের সন্ততিদের আমরা যা শিখিয়েছি, আপনারাও কি আপনাদের সন্ততিদের তা-ই শেখাবেন? আমরা শিখিয়েছি যে ধরণী আমাদের মা। এই ধরণীর কিছু হলে এর সন্তানদের সবারই তা হবে।

আমরা এটুকু জানি: মাটি মানুষের নয়, বরং মানুষই মাটির। রক্ত যেমন আমাদের একত্রে বেঁধেছে, তেমনি সমস্ত জিনিসও পরস্পরে বাঁধা। জীবনের জাল মানুষ বয়ন করে নি। সে তো এই জালে কেবল বাঁধা। এই জালের ক্ষতি করা মানে নিজেরই ক্ষতি করা।

আপনাদের ভবিষ্যৎ আমাদের কাছে রহস্যজনক মনে হয়। গরু-মোষ সব জবাই করলে কী হবে অবস্থাটা? বুনো ঘোড়া পোষ মানিয়ে চালাবেন? অরণ্যের গোপন অঞ্চলগুলি যখন মানুষের ঘামের গন্ধে উঠবে ভরে, এবং উঁচু পাহাড়ের চূড়া আলাপী তারের আড়ালে পড়বে ঢাকা, তখন কী হবে? ঝোপঝাড়, বনবাদাড় যাবে কোথায়? সব উধাও। ঈগল পাখি যাবে কোথায়? উধাও, উধাও। আর ক্ষিপ্রগতি টাট্টুঘোড়া আর শিকারকে অকালে বিদায় জানাতে হলে কেমন হয় ব্যাপারটা? তখন ফুটে উঠবে জীবনের অন্তিম দশা এবং শুরু হবে ধুঁকে ধুঁকে জীবনের পথে চলা।

যখন একবারে শেষ লাল মানুষটিও তার নিধুয়া দিগন্ত পাড়ে হাওয়া হয়ে গেছে, এবং তার স্মৃতি কেবল ভাসমান মেঘের মতো প্রেইরীর পাথারে থেকে থেকে ছায়াসম্পাত করে বেড়াচ্ছে, তখনও কি এই সমুদ্রতট, এই অরণ্যরাজী থাকবে যেমন আজো আছে? তখনো কি আমার লোকেদের আত্মা মিশে থাকবে এদের আনাচে কানাচে?

নবজাতক যেমন তার মায়ের হৃৎস্পন্দন ভালোবাসে, তেমনি আমরা ভালোবাসি এই পৃথিবীকে। অতএব আমরা জমি বিক্রি করলে আপনিও একে আমাদের মতোই ভালোবাসবেন। আমরা এর যেমন যত্ন নিয়েছি, আপনাকেও সে রকম যত্ন নিতে বলি। জমি সম্প্রদানের অবিকল স্মৃতি মনে ধরে রাখুন। সমস্ত সন্তানের জন্য জমি রক্ষা করুন, জমিকে ভালোবাসুন যেমন ঈশ্বর আমাদের ভালোবাসেন। [জোসেফ ক্যাম্পবেল: অনু. খালিকুজ্জামান ইলিয়াস]


লম্পট রাখাল যুবক কানাই। যাকে নিয়ে রাধা সম্ভোগের কাহিনি রচিত হয়েছে।


প্যাস্টোরাল কবিতার জন্য এমনই এক চারণভূমি দরকার, যেখানে জমি কেনাবেচা চলে না; আকাশকে ভাগ করে নেওয়া যায় না; প্রতিটি মাঠ, ধূলিকণা, শিশিরকণা কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। অথবা বিস্তীর্ণ চারণভূমির অবারিত সবুজে রয়েছে মেষ পালক আর গণনাহীন মেষপালের অবাধ অধিকার; মাঠ-মাটি-মানুষ-ঘাস আর গো-সম্পদে মিশে যায় আমাদের যাবতীয় পূর্বপুরুষ আর নবজাতকের হৃৎস্পন্দন; আর এই স্পন্দন তো রাখাল বালকের বাঁশির দীর্ঘতর এক সুর; যে সুর ব্যঞ্জনাতে চুঁইয়ে নামে প্রাকৃত জীবনের জীবনগাথা; মেষপালক সমুদ্র উপকূলে গা ছেড়ে দিয়ে উদাস মগ্ন বিভোরতায় ব্যাকুল; তাকে আত্মহারা করেছে তারই বাঁশির সুর; হয়তো এই সুরের মতোই সে চিরদিন এমনি তরুণ থেকে যাবে; কোনো বার্ধক্য তাকে জীর্ণ করবে না; প্রতি প্রত্যুষে প্রতি সন্ধ্যায় এমনই জ্যোৎস্নালোকে সে তার প্রিয়তমার সাথে মিলন-সঙ্গীতে বিভোর। অথবা বিরহগীতি ছড়িয়ে দেবে স্বাধীন আকাশের সীমাহীন দিগন্তে। বিরহবিচ্ছেদে অংশ নেবে আকাশ আর আকাশের মর্মস্পর্শী বাতাসেরা। সহমর্মিতা জানাবে চির সবুজ প্রান্তর।

২. জসীম উদ্‌দীন, পোস্টমর্ডানিজম ও উত্তরাধুনিকবাদ
এই চিরসবুজ প্রান্তরের মর্মস্পর্শী রাখালিয়া চিত্রকল্প খুঁজে পাওয়া সম্ভব বাংলা ভাষায় জসীম উদ্‌দীনের কবিতায়। যদিও অনুসন্ধান অনুসারে প্যাস্টোরাল কবিতার উদ্ভব বাংলা ভাষায় নয়। যদিও বাঙালির বুকের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে নদী, ঘাস, লতা, মাটি আর অবারিত গোচারণ ভূমি। এক সময় অবারিত ভূমি ছিল বৈকি। সে-সাথে রাখাল বালকেরাও ছিল। ছিল লম্পট রাখাল যুবক কানাই। যাকে নিয়ে রাধা সম্ভোগের কাহিনি রচিত হয়েছে। কাহিনি পেয়েছে ধর্মগীতিকার মর্যাদা। অথচ এই গীতিকার বৈশিষ্ট্য প্যাস্টোরাল কবিতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রসঙ্গতই প্রশ্ন উঠবে আমাদের ফোকগীতিকাগুলোর কিছু অংশ অথবা ব্যালাডগুলোকে কেন প্যাস্টোরাল কবিতার অন্তর্ভুক্ত করা হবে, প্রয়োজনটা কী? আর এর সূত্র ধরে সমসাময়িক কবিতার মধ্যে প্যাস্টোরাল কবিতার গন্ধ আবিষ্কার করার যৌক্তিকতা কোথায়? অথবা এর মধ্যে কোনো দূরভিসন্ধি লুকিয়ে আছে কিনা? অথবা কবিতা-মধ্যে প্যাস্টোরাল কবিতার ছিটেফোটা থাকলেও তাদেরকে পৃথকভাবে প্যাস্টোরাল কবিতা হিশেবে চিহ্নিত কেন করব?

হ্যাঁ চিহ্নিত করার সময় এসেছে। সময় এসেছে এই কারণে যে, বাংলা কবিতা দিক পরিবর্তনের উল্মম্ফনে দুর্বোধ্যতার বেড়াজালে ক্রমান্বয়ে জটিল শিল্পকলার দিকে এগিয়ে চলেছে। এর মধ্যে অবশ্যই কেউ কেউ সুস্থ কাব্যক্ষেত্র অনুসন্ধানে যত্নশীল হবেন এটাই স্বাভাবিক। অনুসন্ধান শুরু হতে পারে জসীম উদ্‌দীনকে দিয়ে। আমরা সময়ের হিশেবে আরো পিছিয়ে গেলে লোকগাথার মধ্যে প্যাস্টোরাল কবিতার গন্ধ খুঁজে পাব। যা কিনা আমাদের বাংলা কবিতার জন্য একটা ইতিবাচক দিক।

ক.
খড়ি কুড়াও সোনার মেয়ে! শুক্নো গাছের ডাল,
শুক্নো আমার প্রাণ নিয়ে যাও, দিও আখার জ্বাল।
শুক্নো খড়ি কুড়াও মেয়ে! কোমল হাতে লাগে,
তোমায় যারা পাঠায় বনে বোঝে নি কেন আগে?

খ.
মাঠের রাখাল, বেদনা তাহার আমরা কি অত বুঝি?
মিছেই মোদের সুখ-দুখ দিয়ে তার সুখ-দুখ খুঁজি।

গ.
বাজায় রূপাই বাঁশিটি বাজায় মনের মতন করে,
যে ব্যথা বুকে ধরিতে পারে নি সে ব্যথা বাঁশিতে ঝরে।
                            [নক্সী-কাঁথার মাঠ]

জসীম উদ্‌দীন তার কবিতাতে রাখালিয়া ইমেজকে স্পষ্ট করার জন্য মোট চৌদ্দটি অধ্যায়ের প্রতিটির প্রথমেই অথবা কবিতার মাঝে রাখালী গান, মুর্শিদা গান, মেঘরাজার গান আবার কখনো বা মৈমনসিংহ গীতিকার আশ্রয় নিয়েছেন। বিষয়টি প্যাস্টোরাল কবিতার জন্য বিবেচনার দাবি রাখে। যেমন প্রথম অধ্যায়ের প্রথমেই রয়েছে,

ক.
বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে ক্ষীর নদী,
উইড়া যাওয়ার সাধ ছিল, পাঙ্খা দেয় নাই বিধি।
                            [রাখালী গান]

দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরুতে মুর্শিদা গান,—

খ.
এক কালা দাতের কালি যা দ্যা কলম লেখি,
আর এক কালা চক্ষের মণি, যা দ্যা দৈনা দেখি,
—ও কালা, ঘরে রইতে দিলি না আমারে।

ষষ্ঠ অধ্যায়ের মাঝে ব্যবহৃত মুর্শিদা গান,

গ.
আগে যদি জানতাম আমি প্রেমের এত জ্বালা,
ঘর করতাম কদম্বতলা, রহিতাম একেলারে;
আমি কেনেবা পিরীতিরে করলাম।


আমাদের নিজেদের কথা, সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকার বাহিত ঐতিহ্যের কথা কবিতায় ধারণ করতে পারি নি।


রাখাল বালক সাজুর মানস জগৎকে এই গানগুলোর সাহায্যে যেভাবে উন্মোচন করার চেষ্টা করা হয়েছে তা অবশ্যই আমাদেরকে প্যাস্টোরাল কবিতার চারণভূমির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের গ্রিক কবি থিওক্রিটাস প্রথম প্যাস্টোরাল কবিতার সূচনা করেন। বিষয়বস্তু সিসিলির মেষ পালকদের প্রাকৃত জীবনলীলা। ল্যাটিন শব্দ ‘প্যাস্টর’ যার অর্থ হচ্ছে মেষপালক। বিষয়টি ওরাল লিটারেচারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত; যা ফোকলোরের অন্তর্ভুক্ত তো বটেই সে-সাথে কৃৎকৌশলগত বিবর্তনের সূত্র ধরে অগ্রসর হলে দেখা যাবে প্যাস্টোরাল কবিতা আধুনিক জীবন জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে সক্ষম। সুতরাং বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্যাস্টোরাল কবিতার পঠন-পাঠন অযৌক্তিক নয়। প্রসঙ্গক্রমে কবি রিজোয়ান মাহমুদের আলোচনা স্মরণযোগ্য। তাঁর মতে:

মধ্য আশির দশকে উত্তর আধুনিকতার দায়বদ্ধতা মেনে বাংলা কবিতার দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পরিবর্তন হতে শুরু করে। এ কাজ শুরু করে তরুণ, অনতি তরুণ, যাদের হাতে কবিতার আঙ্গিক পরিবর্তন হয়ে, স্বল্পায়তনের মধ্যে ধারণ করেছে অনেক বড় বিষয়। কবিরা ফিরে গেছে সুবর্ণ গ্রামে। গ্রামীণ জীবনের বিবিধ অনুষঙ্গ ধর্ম-লোকাচার-ঐতিহ্য এবং মিথের আকরে কবিরা প্রতিষ্ঠা করেছে স্বকীয় ভাবনা। ইউরোপ-আমেরিকায় যেখানে ধ্রুপদী মিথের অস্তিত্ব বিলুপ্ত প্রায়, সেখানে পাক-ভারত উপমহাদেশে নতুনভাবে উজ্জীবিত হচ্ছে মিথ। একদিকে কবিতা বিমূর্ততা ও শূন্যতা থেকে রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে মূর্ত ও শৈল্পিক প্রক্রিয়ায় কবিতা লেখার চেষ্টা চলেছে। তিরিশ-এর বাংলা কবিতা সম্পর্কে পূর্বাহ্নে বলেছি, ব্রিটিশবাহিত সংস্কৃতির ভিতরে জীবন যাপনের ফলে কবিতা ও সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে ব্রিটিশ আদলে। শুধু আমরা বাংলা বর্ণ ধারণ করে পশ্চিমা পরিবেশ ও বিষয়কে বর্ণনা করেছি। আমাদের নিজেদের কথা, সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকার বাহিত ঐতিহ্যের কথা কবিতায় ধারণ করতে পারি নি। ’৪৭ পরবর্তী পাকিস্তান উপনিবেশ আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতিকে আরো দুর্বিষহ করে তোলে। একদিকে পাকিস্তান জাতীয়তাবাদের জয়গান করে কবিতা লেখার হিড়িক, অন্যদিকে কিছু কবিতায় অন্ধ ধর্মীয় জিকির এবং ইসলামী সংস্কৃতি প্রাধান্য বিস্তার করে। উপরোক্ত কারণেই কবিতা খণ্ডিত হয়েছে এবং পাকিস্তান জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ইসলামী কবি বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বাঙালিকে ডমিনেন্ট করেছে পাঞ্জাবি-সিন্ধু-বেলুচ-লাহোর ও ইসলামাবাদের সংস্কৃতি। কায়েদে আজম কর্তৃক ঢাকায় সদর্পে একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষিত হওয়ার পর, সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে যেমন প্রতিবাদ হয়েছে, তেমনি বন্ধ্যাত্বও সৃষ্টি হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধ ও স্বাধীনতার পর আমরা ফিরে পেয়েছি স্বাধীন দেশ।

একটি স্বাধীন দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি স্বাধীন হবে, কিংবা বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের মধ্যে নিজের আত্মপরিচয়কে খুঁজে নেবে এটিই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে দশ বছর যাবৎ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কবিতা, গল্প, উপন্যাস রচিত হওয়ার পর আশির দশকে এসে কবিতা দু’ভাগে বিভক্ত হতে শুরু হলো। গ্লোবালাইজেশন কিংবা মুক্তবাজার অর্থনীতির স্রোতে একপক্ষ পশ্চিমা পোস্ট-মর্ডানিজমের অন্ধ অনুকরণে কবিতায় অনর্থক উল্লম্ফন আমদানি করলেন। এতে কবিতা দুর্বোধ্য থেকে দুর্বোধ্যতর হয়েছে। অর্থহীন উপমা, বিষয় অলংকরণ এবং সর্বোপরি এক ধরনের স্যাডিজম কবিতায় নিয়ে এসেছে। এতে নিজস্ব জাতীয় চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন থাকে নি। অপর দিকে পশ্চিমা অনুকরণের কোনো ইতিবাচক প্রভাবও পড়ে নি জনমানসে। কবিতা পিছিয়ে থাকল, Art For Art Sake–এর নামে যোজন যোজন দূরে। প্রায়শই লক্ষ করা যায় যে কবিরা কবিদের কবিতা বুঝতে পারছে না। আবার এমনও হয়েছে কবিরা নিজেদের রচিত কবিতার কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারছে না। কবিদের মুখে শোনা যায়, বহুমাত্রিক কবিতার নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই, যে যেভাবে নেবে।

আলোচনাটি গুরুত্ববহ। গুরুত্ববহ বাংলা কবিতার বাঁক পরিবর্তনকে শনাক্ত করণের ক্ষেত্রে। আর এই বাঁক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই উঠে এসেছে প্যাস্টোরাল কবিতার অনুষঙ্গটি। এবং অবশ্যই ঐতিহ্য অনুসন্ধানের আলোকে বেরিয়ে এসেছে প্যাস্টোরাল কবিতার প্রশ্নটি। এই প্রশ্নটির উত্তর অনুসন্ধান করতে আমাদেরকে আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি। তা হলো উত্তরাধুনিকতার বিষয়টি। এ কথা ঠিক যে পোস্টমর্ডানিজম আর উত্তরাধুনিকতা এক বিষয় নয়। পশ্চিমাদের আর ভারতীয়দের সভ্যতার বিবর্তনের ধাপগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলে তো নয়ই এমনকি সময়ের বিবেচনায়ও বটে। পশ্চিমা পোস্টমর্ডানিজমের সারাংশটি অনেকটা এরকম:

এক.
বাচনের ক্ষেত্রে তারা মনে করে বাচন দু’শ্রেণির। প্রথমটি দলিত বাচন দ্বিতীয়টি কর্তৃত্বকারী বাচন। উদাহরণ হিশেবে ধরা যাক, স্ত্রী এবং পুরুষ। এক্ষেত্রে স্ত্রী দলিত বাচন আর পুরুষ কর্তৃত্বকারী বাচন। এখানে দলিত বাচন অগ্রসরমান ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়; ফলে কর্তৃত্বকারী বাচন ছাড় দিতে বাধ্য হয় আর এই উভয় অবস্থার মধ্যে বিনির্মাণ সংঘটিত হয়; ফলাফলে গণতন্ত্রের জমি তৈরি হতে থাকে। আরেকটি উদাহরণ আবশ্যক। ধরা যাক শ্রমিক এবং মালিকের সম্পর্ক। এক্ষেত্রে শ্রমিক দলিত বাচন আর মালিক কর্তৃত্বকারী বাচন। এখানেও শ্রমিক অগ্রসরমান আর মালিক ছাড় দিতে বাধ্য হয় ফলে বিনির্মাণের সাহায্যে পাওয়া যায় গণতন্ত্রের জমি।

এখন বিষয়টি হচ্ছে, উভয় উদাহরণের ক্ষেত্রেই প্রতিটি সম্পর্ক কিন্তু পৃথক পৃথক। একটি উদাহরণের সাথে আরেকটি উদাহরণের বিনির্মাণ সম্ভব নয়। তাই যদি হয় তাহলে বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নে সার্বিক ক্ষেত্রে কোনো বিপ্লব হবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কিংবা উভয় উদাহরণে ভাববিনিময় সম্ভব নয়। কেননা পোস্টমর্ডানিজম কোনো নির্ধারণবাদে অর্থাৎ ডিটারমিনজমে বিশ্বাস করে না। সুতরাং সভ্যতার বর্তমান পর্যায়ে বিপ্লব অথবা রাষ্ট্র ক্ষমতায় তাদের কোনো বিশ্বাস নেই। যদিও প্রথম উদাহরণের পুরুষ বাচনটি স্ত্রী বাচনের বিপরীতে কর্তৃত্বকারী বাচন হওয়া সত্ত্বেও ঐ পুরুষ বাচনটি যদি দ্বিতীয় উদাহরণের শ্রমিক বাচন হয়ে থাকে তবে সে হয়ে যাবে দলিত বাচন। এভাবে সমাজে প্রতিটি বাচনই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন বাচনে রূপ নিতে পারে, তারপরও সার্বিক ক্ষেত্রে সমাজে কোনো বিপ্লব অথবা বৃহৎ কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।

দুই.
সাহিত্যের ক্ষেত্রে, সাহিত্যের মূল লক্ষণ হিশেবে পোস্টমর্ডানিজম ‘প্রতীক’কে অস্বীকার করে থাকে। তাদের মূল বক্তব্য, শব্দ স্বয়ম্ভু। একটি শব্দের ঠিক যা অর্থ তাই হওয়া যৌক্তিক; ঐ শব্দের ভিন্ন কোনো অর্থ থাকা উচিত নয়। শব্দ থেকে তার মৌলিক অর্থকে পৃথক করা যাবে না। দেরিদা তার আলোচনায় দেখিয়েছেন এতে প্রকৃত সত্য প্রকাশের জন্য কী ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়।

তিন.
পোস্টমর্ডানিজম কোনো প্রশ্নের উত্তর প্রদান যৌক্তিক বিবেচনা করে না। বরং প্রকৃত সত্য উন্মোচনে তারা একটি প্রশ্নের উত্তরে আরো অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দেওয়াই বিধেয় মনে করে। কেননা জ্ঞানের রাজ্যে কোনো উত্তরই নিজ অবস্থানে স্থির নয়।

চার.
কালপর্ব এবং যুগদর্শনের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় রেনেসাঁস থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত সময়কে ‘মডার্ন এজ’ বিবেচনায় রেখে তারা পরবর্তী সময়কে ‘পোস্টমডার্ন এজ’-এর আওতাভুক্ত করতে চান। কেননা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই দর্শনে, সমাজে, রাষ্ট্রে, সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে সর্বপোরি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে; যা-কিনা বৃহত্তর অর্থে পশ্চিমাদের সার্বিক জীবন প্রণালিকে পাল্টে দিতে শুরু করেছে।


আমাদের ভারতবর্ষের আধুনিক যুগটি ছিল মূলত উপনিবেশিক আধুনিকতা।


অপরপক্ষে ভারতীয় উত্তরাধুনিকতা কোনোক্রমেই উল্লেখিত পোস্টমডার্নিজমের সাথে সঙ্গতি রক্ষা করে না। অথবা সঙ্গতি রক্ষা করা সভ্যতা বিবর্তনের যৌক্তিকতায় যৌক্তিকও নয়। উত্তরাধুনিক মতবাদ মনে করে, আমাদের ভারতবর্ষের আধুনিক যুগটি ছিল মূলত উপনিবেশিক আধুনিকতা। উপনিবেশিক আধুনিকতার দীর্ঘসূত্রিতার সূত্র ধরে ইউরোপীয়রা ভারতীয়দের সমাজ-ঐতিহ্য-কালচার-ভাষা অথবা জ্ঞান চিন্তনে অথবা শাসন ব্যবস্থায় যেভাবে আগ্রাসন চালিয়েছে তা থেকে আজও কি আমরা মুক্ত? যদিও মানুষের চিন্তাচেতনায় পশ্চিমের প্রভাব উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার আগ থেকেই সক্রিয় ছিল।

তখন থেকে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, চিত্রকলা, ভাষাবিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা—সর্বত্র পশ্চিমের জ্ঞানগুরুরা দাপটের সঙ্গে তত্ত্ব দিয়েছেন, তত্ত্ব ভেঙেছেন, আবার আধভাঙা তত্ত্বের ওপর খাড়া করেছেন নতুন তত্ত্বের বহুতল দালান। এই রকম আধিপত্যের মধ্যে গত কয়েক দশকে গুরুতর একটা পরিবর্তন এসেছে। উত্তর-উপনিবেশী মন এখন নানা দিক থেকে উপনিবেশের ছাপগুলো পরীক্ষা করে দেখতে আগ্রহী। সে যাচাই করতে চায় তার অন্তরে-বাহিরে উপনিবেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও ধরন। প্রাক্তন উপনিবেশের পণ্ডিতেরা এখন পশ্চিমে বসে ওদের জ্ঞানজগতের আধিপত্যে হস্তক্ষেপ করছেন, ওখানে খাড়া করতে চাইছেন এককালের উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর নিজস্ব স্বর ও ভঙ্গিমা। এই হস্তক্ষেপ-চেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব ‘উত্তর-উপনিবেশবাদ’ (Post-colonialism), ‘উত্তর-উপনিবেশী অধ্যয়ন’ (Post-colonial Study) প্রভৃতি পরিচয়ে এ-মুহূর্তে খুবই আলোচিত ও বলশালী। উত্তর-উপনিবেশবাদ সম্পর্কে প্রথম কথা, এটি গজিয়েছে পশ্চিমা জ্ঞান-শৃঙ্খলের আধিপত্য অস্বীকার করে; এর প্রধান তাত্ত্বিকেরাও প্রাক্তন উপনিবেশের মানুষ। [উত্তর-উপনিবেশী মন, ফয়েজ আলম]

সুতরাং এই আধুনিকতার মধ্য দিয়ে আমাদের জাতিগত সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয় নি; বরং লঙ্ঘিত হয়েছে। সুতরাং আমাদের লুপ্ত ধারাবাহিকতাকে পেতে হলে আমাদেরকে তথাকথিত উপনিবেশিক আধুনিকতার কালপর্বের আগ থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে। অথচ এই যাত্রা শুরুর পরেই আমাদের ওপর চেপে বসে আছে দু’শ বৎসরের এক উপনিবেশিক আধুনিকতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। এই সময়টিকে পৃথক করে রেখে এরপর থেকে যাত্রা শুরু হতে পারে এবং সেই সময়টিকে বিবেচনার সময় এসে গেছে, যাকে উত্তরাধুনিক যুগ হিশেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। তারপরেও উত্তরাধুনিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় এবং এক্ষেত্রে পোস্টমডার্নিজম, উত্তরাধুনিকতা এবং উত্তর-উপনিবেশবাদ বিষয় তিনটিকে গুলিয়ে ফেললে পক্ষান্তরে আমরা নিজেদেরকেই প্রতারিত করব।

ইউরোপের কেন্দ্রমুখী সংস্কৃতি বিনির্মাণের যে-প্রবণতা আমরা লক্ষ করি উত্তরাধুনিকতায়, কেউ কেউ তার সঙ্গে সাদৃশ্য খুঁজে নিতে পারেন উপনিবেশী জ্ঞানভাষ্যের কেন্দ্র-প্রান্ত বিন্যাস ভাঙার উত্তর-উপনিবেশী প্রচেষ্টার সঙ্গে। আবার অনেক ইউরোপীয় তাত্ত্বিকের লেখা—লাঁকার পর্যবেক্ষণ, দেরিদার বিনির্মাণবাদ, ফুকোর কিছু বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত উত্তরাধুনিক তাত্ত্বিকদের কাছে যেমন, তেমনি কোনো কোনো উত্তর-উপনিবেশী পণ্ডিতের নিকটও কাজের জিনিস বলে মনে হয়। কিন্তু উপনিবেশী প্রভাব মোচন বা নয়া-উপনিবেশী আগ্রাসন প্রতিরোধের কোনো তাগিদ বা লক্ষণ উত্তরাধুনিকতায় চিহ্নিত করা যায় নি। অনেকে তো বলেছেনও যে, উত্তরাধুনিকতা মূলত পশ্চিমা জ্ঞানভাষ্যেরই (Discourse) একটি রূপান্তরিত পর্ব, যা প্রাক্তন-উপনিবেশগুলোর ওপর কিছু-না-কিছু আধিপত্যশীল প্রভাব ফেলেছে। সেক্ষেত্রে স্বীকার করে নিতে হবে যে, ইউরোকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব হিশেবেই উত্তরাধুনিকতাকে বিচার করতে হবে। তাহলে উত্তরাধুনিকতাও উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্বের বি-উপনিবেশায়নের (De-colonization) লক্ষ্যে পরিণত হবে। [উত্তর-উপনিবেশী মন, ফয়েজ আলম]

অথচ কিছু বিজ্ঞ পণ্ডিত আজও উইলিয়াম কেরী কৃত পাঠশালার পণ্ডিতদের মতো উপনিবেশিক ধ্যান-ধারণা লালন করে পোস্টমডার্নিজমের প্যারালাল হিশেবে অথবা পোস্টমডার্নিজমের বাংলা প্রতিশব্দ উত্তরাধুনিকতাকে বিবেচনায় এনে আবারও সেই উপনিবেশিক আধুনিকতাকেই পুষ্টি দিয়ে চলেছেন। এই পুষ্টি শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে অপসাংস্কৃতিক আবহ নির্মাণের পথকে উত্তরোত্তর সুগম করে চলেছে। সুতরাং সময় হয়েছে বিষয়টিকে স্পষ্ট করার। পাঠ্যপুস্তক নির্ভর উপনিবেশিক আধুনিকতার শিক্ষা এবং উক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত অধ্যাপকদের অন্ধ পাঠ্যপুস্তক অনুকরণ প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করা; সেইসাথে জাতিগত নৃতাত্ত্বিক পরিচয়কে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের অপকৌশলকে অস্বীকার করার সময় সমাগত। ভারতবর্ষে আধুনিকতা বলতে প্রকৃত প্রস্তাবে আমরা কী জাতীয় যুগদর্শনকে বুঝে থাকব, বিষয়টিকে পুনর্বিবেচনার সময় সমাগত।

প্রকৃত প্রস্তাবে বিষয়টি এভাবে দেখতে লজ্জার কিছু নেই, বাঙালি জাতির সভ্যতায় আধুনিক যুগের সূচনা হয় নি; বরং আমরা ১৮০১ সালের পর থেকে এ যাবৎ আধুনিক যুগের প্রস্তুতিকাল অতিক্রম করেছি মাত্র। আর ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে পাশ কাটিয়ে নতুন করে আধুনিকতার চিন্তা যদি করতেই হয় তবে Neo-colonization অর্থাৎ নয়া-উপনিবেশায়নের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে উত্তর-উপনিবেশিক মন ও চিন্তনকে সাথে রেখে অগ্রসর হওয়া জরুরি। অর্থাৎ বি-উপনিবেশায়নের পথে অগ্রসর হওয়া। বি-উপনিবেশায়ন আসলে কী?

বি-উপনিবেশায়ন বলতে আমরা বুঝব উপনিবেশের সেইসব প্রভাব নিষ্ক্রিয় করা, যেগুলো আমাদের প্রাক-ঔপনিবেশিক সামাজিক সাংস্কৃতিক উপাদান ও অভিজ্ঞতাসমূহ বিকৃত করেছে, গোটা জাতির মধ্যে হীনমন্যতার বোধ পুঁতে দিয়েছে। আবার যেসব সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপাদান উপনিবেশ-প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে কিংবা নব্য উপনিবেশের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে, সেগুলোর বিরুদ্ধেও লড়তে হবে। [উত্তর-উপনিবেশী মন, ফয়েজ আলম]

এই বি-উপনিবেশায়নের সূত্র ধরে বাংলাসাহিত্যে প্যাস্টোরাল কবিতা অনুসন্ধান করা যেতে পারে। এই অনুসন্ধানে পাওয়া সম্ভব, উল্লেখিত সমাজ বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে একদল কবি সাহিত্যিক সত্যিকার অর্থেই নিজেদের পরিচয়কে পুনর্বিবেচনায় আনতে বাধ্য হয়েছেন। ইতঃপূর্বে পশ্চিমা আধুনিকতার শ্লোগানে কবিতাকে রহস্যের পবিত্রভূমিতে বিভ্রান্তকর মায়াজালে আটকে রাখা হয়েছে। উদাহরণ দেয়া হয়েছে, মালার্মের। অথবা বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো প্রমুখ প্রতীকবাদী কবিগণ আধুনিক কবিতার উদ্‌গাতা হওয়ার ফলে তাদেরকে অন্ধ অনুকরণে বাংলাসাহিত্যে সূচিত হয়েছে আধুনিক কবিতা। এতে বাংলাসাহিত্যে প্রাচীন ও মধ্য যুগের সূত্রটি হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলাফলে বাংলা কবিতা তার যুগলক্ষণ হারিয়ে অন্ধ ভিখেরির মতো অবাঞ্ছিত দাম্ভিকতায় পথ চলতে শুরু করে।


কথিত আছে দাফনিসের এই শোকগীতি থেকেই প্যাস্টোরাল কবিতার উদ্ভব।


হ্যাঁ, অবশ্যই বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো, মালার্মে প্রমুখ প্রতীকবাদী আধুনিক কবিগণ তাদের প্রেক্ষাপটে গ্রহণযোগ্য খুব বড় রকমের কাজ করে গিয়েছেন; কবিতার ক্ষেত্রে তারা মানব ভাষার মানস জগতের একটা বৃহত্তর মুক্তি সূচিত করে গেছেন। এবং এ কারণেই দারিদা অথবা ফুকোর ভাবনা জগৎ ভাষাগত যৌক্তিক জগতের অনুসন্ধানে অগ্রসর হতে পেরেছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাঙালি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বিষয়টিকে কিভাবে বিবেচনায় রাখব? এক্ষেত্রে অবশ্যই উল্লিখিত প্রতীকবাদী কাব্য আন্দোলনের সুফল অনিবার্যত আমাদের পরিচর্যার আওতায় থাকবে; তবে অবশ্যই তা আমাদের ভারতীয় সভ্যতার বিবর্তনের ধাপগুলোকে অস্বীকার করে নয় বরং ধাবাহিকতাকে অক্ষু্ণ্ন রেখে কিভাবে অগ্রসর হওয়া সম্ভব সে বিষয়টিকে বিবেচনায় রাখা আবশ্যক। তারপরও পশ্চিমা কালচারের মিথষ্ক্রিয়ায় এই ধারাবাহিকতা বিষয়ে শ্রী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়তো সন্দিহান ছিলেন। ফলে তিনি ২১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে জোড়াসাঁকোতে বসে জসীম উদ্‌দীনের নক্সী-কাঁথার মাঠ-এর ভূমিকাতে লিখেছিলেন:

শহরবাসীদের কাছে এই বইখানি সুন্দর কাঁথার মতো করে বোনা লেখার কতটা আদর হবে জানি না। আমি এইটিকে আদরের চোখে দেখেছি, কেননা এই লেখার মধ্য দিয়ে বাংলার পল্লী-জীবন আমার কাছে চমৎকার একটি মাধুর্য্যময় ছবির মতো দেখা দিয়েছে।

এই কারণে আমি এই নক্সী-কাঁথার কবিকে এই বইখানি সাধারণের দরবারে হাজির করে দিতে উৎসাহ দিতেছি। জানি না, কিভাবে সাধারণ পাঠক এটিকে গ্রহণ করবে; হয়তো গেঁয়ো যোগীর মতো এই লেখার সঙ্গে এর রচয়িতা এবং এই গল্পের ভূমিকা-লেখক আমিও কতকটা প্রত্যাখ্যান পেয়েই বিদায় হব।

পশ্চিমা মডার্নিজমের দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণ, এরপর নেমে এল পোস্টমডার্নিজমের আঘাত; ফলে এই প্রত্যাখ্যান আরো মর্মান্তিক হয়ে দেখা দিল। তারপরও আমাদেরকে প্যাস্টোরাল কবিতার অনুসন্ধানে ফিরে আসতে হলো জসীম উদ্‌দীনের রাখালী, সকিনা, রঙিলা নায়ের মাঝি অথবা সোজন বাদিয়ার ঘাটে। আমাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হলো মৈমনসিংহ গীতিকাতে।

৩. প্যাস্টোরাল কবিতার উৎস অনুসন্ধান
আমরা আলোচনার শুরুতেই রেড ইন্ডিয়ানগোষ্ঠী প্রধানের যে পত্রটি উপস্থাপন করেছি, তা স্মরণ করতে পারি। পত্রটিতে প্যাস্টোরাল কবিতা সৃষ্টির যে পরিবেশ দেখানো হয়েছে, প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের বাঙালি জীবনে কি তেমন কোনো আবহ ছিল? বলা হবে হয়তো এক সময় ছিল নিশ্চয়ই, এখন নেই। কখন ছিল? আমরা আজও বলছি অথবা শুনে আসছি, এক সময় গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ অর্থাৎ দেশটা ছিল সুজলা সুফলা।

অথচ বৈদিক সাহিত্য অনুসারে আমরা পাই, বৈদিক যুগে মানুষ অর্ধাহারে অনাহারে থেকেছে; বিজ্ঞান বলতে কোনো ধারণা ছিল না; প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাতে আমরা ছিলাম দাস। আর্যরা ভারতবর্ষে প্রবেশ করার চার পাঁচ শতাব্দীর মধ্যে উৎপাদন ব্যবস্থায় কৌশলগত পরিবর্তন আসে; ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। যদিও আর্যরা কৃষি সভ্যতার সাথে পরিচিত ছিল না; তারা ছিল শিকারি যাযাবর শ্রেণির জাতি। এই সময়ে সমাজে শ্রেণিভেদ দেখা দেয়। কেননা উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে তা সমাজের মুষ্টিমেয়ের হাতে চলে আসতে থাকে। আর উপনিষদের যুগে জন্মান্তরবাদের তত্ত্ব এবং কর্মবাদের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সাধারণ বঞ্চিত মানুষ সবকিছুর জন্য পূর্বজন্মে তাদের কর্মকাণ্ডকে দায়ী করতে শিখল। সুতরাং অন্ত্যজশ্রেণি দারিদ্র এবং ক্ষুধাকে মেনে নিতে শিখল। সুতরাং এই সময়ের শাস্ত্রে আমরা দেখতে পাই যজ্ঞ দিয়ে অথবা দেবতার স্তুতি দিয়ে এবং তীব্র প্রার্থনার সাহায্যে ক্ষুধা থেকে অথবা মৃত্যু থেকে উদ্ধার পাওয়ার আকুলতা।

অর্থাৎ কোনো কালেই বাঙালি জাতির জন্য প্রকৃতির ‘প্রাকৃত-রাজ্য’ ছিল না। তবে হ্যাঁ ছিল। কোন ক্ষেত্রে? ছিল ফোক কালচারের ভেতর। এই বিরূপ সমাজ প্রতিবেশেও মানুষ নিজেদেরকে স্বপ্ন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। বাস্তব সমাজ সংসারে যা অপুরণীয় তাকে মানুষ পূরণ করে নেয় কল্পনায়; শিল্পে, সাহিত্যে। সুতরাং শিল্প সাহিত্যের ভেতর প্রত্যাখ্যাত জীবনবীক্ষণ চিত্রিত হতে থাকল। লোকমুখে প্রচলিত হয়ে গেল ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’। জসীম উদ্‌দীনের গাথাগুলোতে এমনই এক বসুন্ধরার ছবি পাওয়া যায়; যেখানে ক্ষুধার্ত মানুষের মানবেতর জীবন অনুপস্থিত।

তাহলে বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে, বিরূপ প্রতিবেশেও স্বর্গীয় জীবনের চিত্র অঙ্কিত হওয়া সম্ভব। সুতরাং প্রাকৃত জীবনে কতটুকু ঐশ্বর্য ছিল সেটি বিবেচ্য নয়; বিবেচ্য বিষয় হলো বাংলাদেশের নদী বিধৌত সবুজ মাঠ প্রান্তরে প্যাস্টোরাল কবিতার সৃষ্টি সম্ভব। বৈদিক যুগেও এই সম্ভাবনাটি ছিল। এরপর প্রাচীন-মধ্য অথবা বর্তমান সময়পটেও সম্ভব। ফোকসাহিত্য অনুসন্ধান সে-কথাই বলে।

প্যাস্টোরাল কবিতার উৎস অনুসন্ধানে জানা যায়, সিসিলির কিংবদন্তি অনুসারে দাফনিস একজন মেষপালক। যার বাবা একজন দেবতা; নাম হার্মিস। কোনো এক পরী তার মা। বাবা হার্মিসের জীবন চারিত্রে রয়ে গেছে গো-পালনের বীজ। এই হার্মিস আবার জিউস এবং মাইয়ার পুত্র। সংবাদ বহনকারী দেবতা হিশেবে হার্মিস অধিক পরিচিত। অতি প্রত্যুষে আর্কেডিয়া পর্বতে মাইয়া তাকে প্রসব করে। সদ্যজাত হার্মিস ঐদিন দুপুরেই দোলনা থেকে উঠে একটি কাছিম হত্যা করে তার খোল দিয়ে চমৎকার একটি বীণা বানিয়ে ফেলে। এবং ঐদিনই সে অ্যাপোলোর গরুর পাল চুরি করে। হোমারের বর্ণনা মতে অ্যাপেলো এই চুরির জন্য হার্মিসের ওপর ক্ষিপ্ত হলেও গো-চুরির কৌশল এবং বীণা তৈরিতে তিনি মুগ্ধ হয়ে তিরস্কারের পরিবর্তে সমস্ত গো-সম্পদকে পুরস্কার হিশেবে দিয়ে দেন। আর সেই সাথে দেন আশ্চর্য ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা। হয়তো এই গো-সম্পদ আর ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা সে-সাথে হার্মিসের বীণার সুরের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল রাখালিয়া গীতের ভ্রূণ।

এই হার্মিসের পুত্র দাফনিসের প্রতি আসক্ত হয়ে এক পর্বত পরী প্রেম নিবেদন করে ব্যর্থ হয়। কেননা হার্মিস ভালোবাসতো ক্লোয়ি নামের এক মেষ পালিকাকে। এতে ক্ষিপ্ত পর্বত পরী আফ্রোদিতির কাছে অভিযোগ করে। আফ্রোদিতি শাস্তি হিশেবে দাফনিসকে অন্ধ করে দেন। এরপর শুরু হয় দাফনিসের অন্ধ জীবন পরিভ্রমণ। বাবা হার্মিসের কাছ থেকে দাফনিস পেয়েছিল বীণার সুরের এক ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা; সে-সাথে গো-পালনের এক বিস্ময়কর হৃদয়। মন উদাস করা সৌন্দর্যের অভিব্যক্তি বহনকারী দাফনিস বহিমান জীবনের আস্বাদ ভালোবেসে সুপ্তরক্ত স্রোতের অন্তরালে বয়ে নিয়ে বেড়াতে থাকল এক অপার বেদনার জগৎ। যে বেদনা শেষ পর্যন্ত তার বীণার সুরে শোকগীতিতে রূপ নেয়। গো-চারণ ভূমিতে নিঃসঙ্গ জীবন পরিভ্রমণের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হতে থাকে রাখালিয়া গীত। কথিত আছে দাফনিসের এই শোকগীতি থেকেই প্যাস্টোরাল কবিতার উদ্ভব।

প্যাস্টোরাল কবিতার কিংবদন্তি অনুসন্ধান করতে হলে মেষপালনের দেবতা প্যান-এর প্রসঙ্গটিও স্মরণযোগ্য। আর্কেডিয়ার মেষ পালকেরা এই দেবতার পূজা করে থাকে। কিংবদন্তি অনুসারে মেষপালকদের দেবতা প্যান সপ্তস্বরা বাঁশি উপহার দিয়েছিলেন। যা কিনা প্যাস্টোরাল কবিতার আদি ও অকৃত্রিম সুর সৃষ্টির জন্য স্মরণীয়।

কিংবদন্তির কথা বাদ দিলে প্যাস্টোরাল কবিতার উৎস চিহ্নিতকরণে বলতে হয় ভার্জিনের বুকোলিকা এবং জিওর্জিকা কাব্যগ্রন্থ দুটোর কথা, যা রচিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের দিকে। এই কাব্যগ্রন্থ দুটোর বিষয়বস্তু ছিল গ্রামীণ জীবনের প্রেক্ষাপট; ভূমি কর্ষণ, কৃষি, উদ্যান রচনা, মৌমাছিপালন আর পশুপালন জীবনের অকৃত্রিম আলেখ্য। যা প্যাস্টোরাল কবিতার ইমেজকেই ধারণ করে থাকে।


বিজ্ঞান-রাষ্ট্র-রাজনীতি আর শিল্পতত্ত্ব এসে কবিতার ঘাড়ে বসে পড়েছে।


বিগত শতকের প্রথম দিককার কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা জন্মেছিলেন স্পেনের চারণ ভূমিতে। যে ভূমির পূর্ব পুরুষরা ছিল প্যাস্টোরাল গীতিকার ধারক ও বাহক। তাদের রক্ত রাখালিয়া কবিতায় জারিত। লোরকার কবিতায় পাওয়া যায় রাখালিয়া কবিতার সঙ্গীত মাধুর্য। যে সঙ্গীত মাধুর্য তিনি পেয়েছিলেন যতটা-না নিজের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তার চেয়ে বেশি পেয়েছিলেন লোককথা ও লোকসঙ্গীতের ভেতর। তার বিখ্যাত তিন অঙ্ক আর ছয় দৃশ্যের একটি বিয়োগান্ত কবিতা ‘ইয়ারমা’-র মধ্যে ব্যবহৃত প্যাস্টোরাল কাব্য-সঙ্গীতটি অনেকটা নিম্নরূপ; অবশ্য গোটা ইয়ারমাই আমার বিবেচনায় একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণযোগ্য প্যাস্টোরাল কবিতা। কবিতাটির খানিক অংশ মূল স্পেনিশ থেকে অনুবাদ করা হলো:

একলা কেন ঘুমাও তুমি
একলা কেন ঘুমাও আমার মেষপাল?
ঘুমাও তোমার পশমি পোশাকে
আহা একলা আমার মেষপাল
একলা কেন ঘুমাও?

পাথর ঢাকা শীতল ছায়ায় ঘুমাও
তুষার ঝড়ে পোশাক তোমার বোনা
আহা শীতের ঝালর নদী যেন তোমার বিছানা।
একলা কেন ঘুমাও আমার মেষপাল?
রাতের স্রোতে ঘুমাও আমার মেষপাল…

ছিড়ে যাওয়া ক্লান্ত নদীর ক্লান্ত সঙ্গীত
দুখি পাহাড়ের চারণভূমি হায়
আমার শিশুকে কে মেরেছে
কে মেরেছে দুখি মেষপাল আমার
একলা কেন ঘুম যাও তুমি?
একলা কেন ঘুম যাও তুমি?

হঠাৎ করে এই গানের মর্মার্থ আমাদের বোধে আলোড়ন সৃষ্টি হয়তো করবে না। কেননা বিষয়টির সাথে জড়িয়ে আছে এক হতভাগা কুমারীর জীবনগাথা। যে জীবনগাথার সাথে মিলেমিশে আছে মেষপালকদের শোকার্ত অশ্রু। কুমারীর নাম ইয়ারমা। যে কিনা সন্তান লাভের জন্য বলতে থাকে:

প্রসবের পর পশুরা তাদের বাচ্চাগুলোকে চেটে চেটে পরিষ্কার করে ফেলে।
হায়, আমার যদি কোনোদিন বাচ্চা হয়
আমি কি সুস্থ থাকব?
ইস্ কি ঝলমলে অহঙ্কারী আর রূপবতী ঐ সন্তানসহ মেয়েরা
ঘণ্টার পর ঘণ্টা বচ্চাগুলো ওদের কোল জুড়ে থাকে
ওরা ক্লান্ত হয় না
আর বচ্চাগুলো শুনতে পায় মায়ের বুকের গরম দুধের শিরশিরে আওয়াজ
কস্‌কস্ শব্দে মায়েদের স্তন পরিপূর্ণ হয় শিশুদের দুধে।
যখন বচ্চাগুলো দুধ টানতে শেখে মায়েরা ওদেরকে নিয়ে জাদুতে মাতে
সারাটি দিন যেন ক্লান্তিহীন খেলা, সাধ মেটে না
খোকা আমার আরেকবার খা, আহা আরেকটু টানো

বাচ্চাদের মুখ আর বুকে লেপটে থাকে
মায়ের দুধের সাদা সাদা ছোপ ছোপ দাগ।

দুখী ইয়ারমা যেন ওর মেষপালের ভেতরেই নিজের সন্তানদের খুঁজে পায়। শুরু হয় আন্দালুসিয়ার পাহাড়ের ধার ঘেঁষে সন্তানহীন দুখী ইয়ারমার জীবন-চারণ। বয়ে চলে নদীর জল। সেই জলে গাঁয়ের মেয়েরা, কুমারীরা, সন্তানময় টইটুম্বর রমণীরা কাপড় কাচে আর গান গায়। দ্রুত এগিয়ে চলে ইয়ারমার জীবন এক অমোঘ বিয়োগান্তক স্রোতের দিকে।

৪.    অসমাপ্ত বয়ান
এখন আমরা কবিতার এই প্যাস্টোরাল ইমেজকে যদি বাংলা ভাষায় দেখতে চাই, তাহলে আমরা হোঁচট খাব এবং ভুল করে বসব। কেননা আমরা প্যাস্টোরাল ইমেজ নিয়ে পৃথকভাবে ভাবতে অভ্যস্ত নই।

ক.
ওগো আমার শ্রাবণ-মেঘের খেয়াতরীর মাঝি,
অশ্রুভরা পুরব হাওয়ায় পাল তুলে দাও আজি।
উদাস হৃদয় তাকায়ে রয়—বোঝা তাহার নয় ভারী নয়,
পুলক-লাগা এই কদম্বের একটি কেবল সাজি।।
                            [রবীন্দ্রনাথের গান]

খ.
আমরা কেউ তার শেষ ডাকে সারা দিই নি যেদিন
সত্যি এসেছিল বাঘ। মৃত্যুর নখে ছিন্নভিন্ন হলো সেই ডাক।
সেই কাতর অনুনয় এখনও আমার কানে লেগে আছে।
আজ ভাবি, ছেলেটার কি তবে আগাম মৃত্যুর গন্ধ টের
পাওয়ার কোনো অস্বাভাবিক ইন্দ্রিয় ছিল? যার দুর্গন্ধে
শত তিরস্কার উপেক্ষা করে সে চিৎকার করে ওঠতো
বাঘ বাঘ বলে, ঠিক কবির মতো?
আহ, আবার যদি ফিরে আসত সেই মিথ্যেবাদী ছেলেটা
জনমত ও তিরস্কারের পাশে দাঁড়িয়ে প্রান্তরের চারণের মতো
বলে ওঠতো, ‘মৃত্যু এসেছে, গ্রামবাসী—
হুশিয়ার।’
                        [মিথ্যাবাদী রাখাল, আল মাহমুদ]

গ.
নীল গ্রাম। বহুদূর দিগন্তে কালো রেখার মতো।
শস্যক্ষেত, বাড়ি ঘর নদী সবি আছে সেই গ্রামে
সে-গ্রামে সোনালি রৌদ্র, পরিষ্কার দিন। বৃষ্টি নামে
কখনো-কখনো। আছে উচ্চারিত পাখি শত শত:
        [এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি, নীল গ্রাম, ওমর আলী]

ঘ.
এই যে মমির মতো জেগে আছে এক সভ্যতা।
হাজার ভাঙচুর তছনছ বনরাজি শস্যহীন নিরাক মাঠ আর
সুজলা শ্যামাঙ্গী রূপখানি খুয়ে
দ্যাখো সে কে-নারী কাটায় প্রহর তার
পথ প্রান্তর শীর্ণা নদী জল আর
হাহাকার ভরা বনানীর দগ্ধ নীরবতায় একা কেঁদে কেঁদে।
        [ভাঙনের সুখে সম্মোহে, রাহুমুখ এই বিপন্ন জনপথ, সৈয়দ নাজমুল করিম]

ঙ.
জানালা খুলে দিলেই
‘‘কালিনী নদীর কূলে কাহার বাঁশির সুর সুমধুর আহা
কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া যায়’’
তারপর
সুখ স্বপ্ন কাটে, স্মৃতি কাটে সাঁই সাঁই বাতাসের নীল তলোয়ার
        [প্রাগৈতিহাসিক দুঃখ, জানালা খুলে দিলেই হু হু হাওয়া, ওমর কায়সার]

চ.
হয়তো বৃক্ষেরাও জানে
পাখিদের পালকের ভাষা
হয়তো ওরাই বোঝে
পাখিদের গীত
ওরা তাই
বৃক্ষজীবন অবলীলায়
পাখিদের গীত শুনে
পাখিদের সাথেই কাটায়।
            [মিশ্রমানব, পাখি ও বৃক্ষের সম্পর্ক, ওয়ালী কিরণ]

ছ.
মাঠের কিনারে বসে বাঁশি হই, দু’হাতে আলগা করি যাবতীয় সাধ।
তারও হাতে
একদিন বেঁজেছিল বাদামি পাতার বাঁশি—হাড়ের খোড়লে তার সুর;
মধ্যমাঠে রাখালের সুরতৃষ্ণা—শব্দ জন্ম লয়, ধ্বনিপাড় আঁচলে বাঁধে কৃষাণি-দুপুর
            [উড়ে যাচ্ছ মেঘ, আলফ্রেড খোকন, পিতামহের বাঁশি]

জ.
প্রকৃতির সরল বিশ্বাসের কাছে গাছ যেভাবে নত
তুমিও দুই দিকে বেড়ে চলো, উপরে ডালপালা
                    অধঃপাতে শেকড়…

খোলা মাঠে একদিন উড়ন্ত শালিকের বিষ্ঠা লেগেছিল
                সেই রেখা
আকাশে ভাসমান রেখে কপালে তুলে চাঁদ
তুমি রেখা ও চাঁদ একসাথে থাকো…

শীতের দিঘি থেকে উঠে আসে ধোঁয়া
…পৃথিবীর হাই নাকি?
যে-কোনো জলের তলে পুড়ে চলে শেকড়ে…!

দুপুরের ঘনরোদ দু’চোখের সীমায় এনে
উদ্ভিদজন্ম অনুসরণ করে আবার সংসার

একদিন তোমার পায়ের আদর পেয়ে উঠানের ধান
বের করে দিত হৃদয়-তাঁতানো চাল
…রাতে তালপাখাটা হা থেকে পড়ে
তোমার সাথে যেত গভীর গভীর ঘুমে
        [গুলি ছোটার বোবা রেখা, দুই দিকে বেড়ে চলা, শওকত হোসেন]

ঝ.
যখন রাত্তির নাইমা আসে জলপদ্মের পাতার উপরে
আমাদের আদিম পৃথিবীতে হাইপার রিয়ালিটি নামে।
গুনাগার বান্দার খোঁজে ফেরেস্তা আইসা তোমার
নাভিমূলে হেঁয়ালি কপোতীর ঘ্রাণে মুখ গুঁজে, কামরাঙার
কামাতুর ঠোঁটে তুমি ভাবনার অণু বিছায়া উইড়া আসো
আমার ভিতরে।…..
মহাকালের সন্তান বুকে কইরা সৃজনের ঘরে দিয়াছো
উড়াল। চারিদিকে অনন্ত কনভয়, কুরু-বর্ষ আসে কুরু-
বর্ষ যায়, তারপরও তোমার মাটির টানে রাত্রি আর দিনে
মৃতদের ঘুম ভাইঙা নতুন নতুন নদীর জন্ম হয়।
            [যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে, শামীম রেজা]

ইংরেজদের ঔপনিবেশিক শাসন আর সে-সাথে পাকিস্তানিদের শাসন ব্যবস্থা, এই দু’দুটো শাসন ব্যবস্থা ঘাড়ে নিয়ে আমাদের প্রজন্ম আমাদের সাহিত্যের নন্দনগত সমস্যায় জর্জরিত। আমরা লম্বা চওড়া ইস্তেহার দাঁড় করাচ্ছি ঠিকই। কখনো ইউরোপের দিকে কখনো আবার স্যাটালাইট কালচারের সাথে মিকচার তৈরি করে বাজার দখলের রাজনীতিতে বগল বাজাচ্ছি। এই সব হচ্ছেটা কি, যিনি বলবেন তিনিও বুঝে উঠতে পারছেন না আসলে হচ্ছেটা কি?

এর মধ্য দিয়েই বাংলা কবিতা নিজের প্রকৃত ক্ষেত্র নির্মাণে জাগ্রত। আশির দশকে এসে উল্লম্ফনের মাত্রাটা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও এই প্রজন্মই কিন্তু দাবি করছেন, তাদের সময়েই বাংলা কবিতা একটা বড় রকমের বাঁক নিয়েছে। হ্যাঁ নিয়েছে বটে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কোন দিকে বাঁক নিয়েছে? অবক্ষয়ের আধুনিকতাকে অর্থাৎ ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে পাশ কাটাতে চেষ্টা করেছে এই সময়ের কিছু কিছু সাহিত্য মুভমেন্ট। ফলে কবিতাকে নানান মুদ্রায় বাজিয়েছেন। বাজাতে গিয়ে প্রকৃত প্রস্তাবে গোলক ধাঁধার চক্রে জড়িয়ে গিয়ে যা আবিষ্কার করেছেন, সেখানে পাওয়া গিয়েছে এক ধরনের উগ্র আধুনিকতার জয়কেতন। বিজ্ঞান-রাষ্ট্র-রাজনীতি আর শিল্পতত্ত্ব এসে কবিতার ঘাড়ে বসে পড়েছে। বেশ ভালো, তবে তা কতটা নান্দনিক, সে বোধটুকু আমরা হারাতে বসেছি। অথচ আমরা যারা নিজেদেরকে প্রজ্ঞাবান বলে দাবি করি, তারা বাহবা দিয়েছি।


বাংলা ভাষার কবিতাতে প্যাস্টোরাল কবিতা খুঁজতে গিয়ে অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছি।


প্রকারন্তরে এ সময়েরই আরো একটি কাবিতা-মুভমেন্ট এই তত্ত্বনির্ভর কবিতার জগতে টিকতে না পেরে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিলেন। এবং তারা তাদের অনিবার্য পথ নির্মাণে যন্ত্রণাকাতর হলেন। শেষ আশিতে এসে, নব্বইয়ের প্রারম্ভে গুটি কয়েক কবি নিজেদের ভূমি খুঁজে পেতে শুরু করল। যাদের নাম আশির দশকে কেউ শোনে নি অথচ তাদের সৃষ্টিকর্ম আশির অভিজ্ঞতাতেই পুষ্টি লাভ করেছে; যারা কিনা কিছু কিছু উল্লেখযোগ্য নির্মাণকর্ম আশিতেই সমাপন করেছিলেন; তারা জেগে উঠলেন। যার অপ্রতিরোধ্য প্রভাব নব্বইয়ের অসংখ্য কবিদের উজ্জীবিত করে তুলল। করে তুলল এই কারণে যে, তারা ইতোমধ্যে আশির দশকের যুগ যন্ত্রণার আলোকে প্রকৃত কাব্য ক্ষেত্রটি আবিষ্কারের ইঙ্গিত পেতে শুরু করেছেন। ফলে নতুন করে ক্ষেত্র নির্মাণের জন্য পুরো একটি দশক অপেক্ষা করতে হলো না নব্বইয়ের কবিদেরকে। কবিতা দুর্বোধ্য জগৎ থেকে খানিকটা যেন মুক্তি পেল। প্রেক্ষাপটটি প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে, প্যাস্টোরাল কবিতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যে ভারতীয় সভ্যতার বিবর্তন অনিবার্যতায় এগিয়ে নেবার যৌক্তিকতা দেখা দিয়েছে।

বাংলা ভাষার কবিতাতে প্যাস্টোরাল কবিতা খুঁজতে গিয়ে অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছি। ওপরের উদাহরণে উল্লিখিত একটি কবিতাও প্যাস্টোরাল কবিতা নয়; বরং বলা চলে প্যাস্টোরাল লক্ষণযুক্ত কবিতা; যা অবশ্যই বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক। এই সময়ের এ জাতীয় আরও অসংখ্য কবিতার উদাহরণ আমরা পেতে পারি; যে কবিতাগুলোকে ঠিক প্যাস্টোরাল কবিতা বলা যাবে না; তবে তা অবশ্যই অনাবিল শান্তির পরিবেশ নির্মাণে সক্ষম। অর্থাৎ প্যাস্টোরাল কবিতা নয় বরং প্যাস্টোরাল কবিতার অনুষঙ্গকে আশ্রয় করে আমরা ফিরতে শুরু করেছি এমন এক কবিতার কাছে যা প্রকারন্তরে আমাদেরকে আমাদের মাটি ও মানুষের কাছেই ফিরিয়ে আনে। এই ফিরিয়ে আনার যুগ-বৈশিষ্ট্যকেই আমরা বাংলা কবিতার বাঁক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিশেবে চিহ্নিত করতে চাচ্ছি। উদাহরণ নেওয়া যাক,

ক.
গভীর সমুদ্রে গিয়ে এতখানি খোলামেলা পাওয়া গেল তোমাকে আকাশ
আশাবরি সমস্ত পালের আড়াল ছেড়ে নৃত্যপর তুমি বিবসনা
ঘূর্ণিময় উচ্ছ্বাসের প্রান্তে গিয়ে ঘাগরা উড়িয়েছ
গভীর নীলের কাছে মানুষের মর্মপাঠোদ্ধার
প্রপিতামহ মাছদের আশ্চর্য পাঠশালা
প্রণয়ী সকল মাছ ছেড়ে গেছে সুপ্ত লীলাখেলা।

সুউচ্চ আকাশে গিয়ে এতখানি খোলামেলা পাওয়া গেল তোমাকে সাগর
দূরবর্তী সমস্ত মেঘ মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে নিত্য করে চলাফেরা
প্রাণবান দিগন্তের প্রান্তে গিয়ে লুপ্তহাহাকার
প্রমাতামহ পরীদের অপূর্ব স্নানাগার
প্রণম্য সকল পাখি ছেড়ে গেছে লুপ্ত লজ্জাব্রীড়া।
            [রূপচৈত্রের অরণ্যটিলায়, জলেস্থলে ঈশ্বর, কামরুল হাসান]

খ.
ট্রেন থেকে নামলেই সন্ধ্যাদের বাড়ি
উত্তরে, হিমালয়-ঘেঁষা মেঘের মতো
শুয়ে আছে সন্ধ্যার শরীর, হাত বুলালে
জেগে ওঠে ধ্বনি, শব্দ, বাক্য ও ভোর;

ভোর রাতে ট্রেনে করে বাড়ি গেলে
পথে ভূত-প্রেতিনীর আবাস পেরোতে হয়
তখন শিশুবেলা জাগে পুনরায়
অস্থির স্নায়ুতন্ত্রে মন্ত্র পড়া হয়।

সন্ধ্যাদের বাড়ি কত ঢের দূর
হিমালয়-ঘেঁষা উত্তুরে মেঘ, শৈশব-পালালে
নেমে আসে সকাল
সন্ধ্যাদের বাড়ি নিবিড় কাছাকাছি!
            [অতিক্রমণের রেখা, সন্ধ্যাদের বাড়ি, আহমেদ স্বপন মাহমুদ]

গ.
এই হাওয়া তার শিস জাগিয়ে দেবদারু বনে গেছে বহুদূর
চৈত্র কী খরায় বীজের চিৎকারে ঘটে বৃক্ষের উদগমন
আমি তো বীজের সম্ভাবনা নিয়ে ঘুমের ভেতর জেগে দাঁড়াই
কে আমার ছদ্মবেশ খুলে দেবদারু পথে নেবে হাওয়ার বনে।
                        [ধাঁধাশীল ছায়া ১১, মাসুদুল হক]

বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে অপরিহার্যভাবে রাখালের কাহিনি থাকতেই হবে এমন কোনো শর্ত বাংলা ভাষায় প্যাস্টোরাল কবিতায় থাকতে পারে বলে আমি মনে করি না। কেননা রাখাল বালকের পরিচিত প্রতিবেশও এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়। পরিবেশকে চিত্রায়নের মাধ্যমেও রাখালিয়া গীতের আবহ চিত্রিত হতে পারে; যেখানে রাখালের উপস্থিতি অপরিহার্য নয়। এক্ষেত্রে পরিবেশের সাথে অপরিহার্যভাবেই অপরাপর চরিত্রের সমাবেশ ঘটতে পারে। যদিও কবি রিজোয়ান মাহমুদ বলছেন:

বাংলা কবিতার গ্রামীণ পরিপ্রেক্ষিত বর্ণনা করতে গিয়ে রাখাল ও বাঁশি কোনো না কোনোভাবে এসেছে; যা কোনোভাবে প্যাস্টোরাল দাবি করতে পারে না। বাইরের প্রকৃতির অবারিত সুন্দরের সঙ্গে আমাদের অন্তরের ভিতরে গোপন গহিন বেদনা একসঙ্গে মিশে গিয়ে কেঁদে না উঠলে রাখালিয়া কবিতাকে স্পর্শ করা যাবে না; তাই রাখালিয়া কবিতা সত্য কবিতা, খাঁটি কবিতা, যার বুননে উপর চালাকি নেই। ছোট ইঙ্গিতময়তার মধ্যে মনের নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করে দেয়া প্যাস্টোরাল কবিতার ধর্ম।

হ্যাঁ, এই ইঙ্গিতময়তার মধ্যে মনের নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করিয়ে দেয়া শুধু প্যাস্টোরাল কবিতার ক্ষেত্রে কেন, যে কোনো মহৎ কবিতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাহলে আমরা প্যাস্টোরাল কবিতাকে কিভাবে চিহ্নিত করতে পারি? অবশ্যই প্রশ্ন উঠতে পারে, এ জাতীয় কবিতা কি আমরা রচনা করি নি? হ্যাঁ করেছি এবং তা অবশ্যই সফল কবিতা; তারপরও তা প্যাস্টোরাল কবিতা নয়। উপরের উদাহরণগুলো দেখা যেতে পারে। প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ, যিনি প্যাস্টোরাল কবিতার আবহ নির্মাণ করেছেন তাঁর অসংখ্য গানে এবং কিছু ক্ষেত্রে সফলও হয়েছেন। তারপরও তিনি প্যাস্টোরাল কবিতা লিখেন নি; লিখেন নি এ কারণে যে তখন ঠিক প্যাস্টোরাল কবিতা রচনার যুগলক্ষণটি আমাদের ছিল না। কেননা রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে তিরিশোত্তর পঞ্চপাণ্ডব অথবা এর পরে যাদের কথাই বলি না কেন সকলেই প্রকৃত প্রস্তাবে ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় মদদপুষ্ট মধ্যসত্ত্বভোগী শ্রেণি। যাদের কাছে ভারতবর্ষীয় ঐতিহ্যনির্ভর ধারাবাহিকতা আশা করা অনেকটাই অর্থহীন।


জসীম উদ্‌দীনের লেখা ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাহিনিকাব্যের ধারায় লিখিত এক জাতীয় বাংলা ব্যালাড।


উদাহরণ হিশেবে জসীম উদ্‌দীনকে টানলেও, জসীম উদ্‌দীনের লেখা ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাহিনিকাব্যের ধারায় লিখিত এক জাতীয় বাংলা ব্যালাড। যদিও প্যাস্টোরাল কবিতাতে কাহিনি থাকতেই পারে। তথাপি আমাদের বাঙালি ভূখণ্ডে প্যাস্টোরাল কবিতা সৃষ্টির বিষয়টি ইউরোপিয়ানদের কিংবদন্তির সাথে গুলিয়ে ফেলাটা যৌক্তিক নয়। হার্মিস অথবা দাফনিসের করুণ জীবনালেখ্য এক্ষেত্রে কার্যকর নয়। আমরা যাযাবর জাতি নই। আমাদের পরিবেশে এক সময় অজস্র গো-সম্পদ থাকলেও এবং সে-সাথে নদীবিধৌত অপার বিস্ময়কর সৌন্দর্য সম্পদ থাকলেও আমাদের রাখাল বালকদের ঘিরে তৈরি হয় নি কোনো শোকগাথা। যা হয়েছে তা অনেকটা বিচ্ছিন্ন ভাবেই হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পৃথক ভাবে কোনো প্যাস্টোরাল কবিতার ধারা সৃষ্টি হয় নি।

অথচ এতটা সময় পর প্যাস্টোরাল কবিতা রচনার প্রেক্ষাপট দাবি করা হচ্ছে কেন? বাংলা কবিতার গতিবিধি লক্ষ করার ফলে একটি বিষয় পরিষ্কার, তা হচ্ছে কবিতা-মুভমেন্টের একটি অংশ উপলব্ধিতে শিখেছে যে তাদেরকে তাদের ঐতিহ্যনির্ভর সভ্যতার বিবর্তনগত ধারাবাহিকতাকে বহন করেই অগ্রসর হতে হবে। ফলে কবিতাঙ্গিকের ক্ষেত্রে বিগত সময়ের উল্লম্ফনকে তারা অস্বীকার করে আসছে। প্রতীকের ভেতরে আরেকটি প্রতীক সৃষ্টি না করে বরং প্রতীককে নির্বাচন করা হলো অভিষ্ট বিষয় প্রকাশের বাহন হিশেবে। ফলে নতুন করে প্রতীক সৃষ্টি না করে বরং হাজার বছরের ভাষা অভিজ্ঞতায় প্রোথিত ইমেজকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হলো প্রতীকের মাধ্যমে। যা কিনা যে কোনো অবস্থাতেই দ্রুত ভাষা ব্যঞ্জনাকে স্পষ্ট থেকে আরো স্পষ্টতর করে দিতে সক্ষম। যা প্যাস্টোরাল কবিতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে প্রায় সকল প্রতিভাধর কবিই একটি বিষয়টি বুঝতেন তা হচ্ছে, ছন্দের বিষয়টি আসলে কবিতার দৈহিক বিষয় নয়, বিষয়টি আত্মিক। ফলে ছন্দ গণনার বিষয়টি এখানে গৌণ। এবং গৌণ হলেও কবিতাপাঠে তা কোনো বাঁধার সৃষ্টি করে না; বরং প্রতিটি কবিতারই রয়েছে নিজ নিজ চরিত্র অনুসারে নিজস্ব এক ছন্দ; যার সাহায্যে সে পুষ্টি পায়, বেঁচে থাকে। এই পুষ্টি প্যাস্টোরাল কবিতার জন্মগত বৈশিষ্ট্য।

কেননা প্যাস্টোরাল কবিতা সৃষ্টি হয় কোনো ধার করা পুষ্টিতে নয়; অথবা এই কবিতার জন্য আমাদেরকে তিরিশের কবিদের মতো ইউরোপের কাছে ছুটতে হয় না। এক্ষেত্রে আমাদের জন্য রয়েছে আমাদেরই নিজস্ব ভূমি। যেখানে কর্ষণ করলে আমাদের সম্পদকে আবিষ্কার করা সম্ভব। নতুন কিছু সৃষ্টির জন্য আমাদেরকে ভিনদেশী সম্পদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাতে হবে না। আমাদেরই আছে এক দীর্ঘ ইতিহাস; আছে কবিতার এক দীর্ঘ চারণভূমি; যেখানে রাখাল বালকের মতো আমরাও বুক ভরে শ্বাস নিতে পারব।

প্যাস্টোরাল কবিতা ছন্দমিল অথবা অন্ত্যমিল দাবি না করলেও এমন একটি মিল দাবি করে যে মিলটি ছন্দের অথবা শব্দের নয় বরং উক্ত মিলের উপস্থিতিতেই গোটা বাক্যটির ভেতর থেকে যায় এক ধরনের গীতিপ্রবণতা; যাতে প্রয়োজনে সুরারোপও সম্ভব। আর এই সুরটি কবিতা পাঠকালে আমাদের ভেতরে আপনা থেকেই বেজে ওঠে। ফলে কবিতাটি কাঙ্ক্ষিত আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়। এতে কবিতার ভাষা-ব্যঞ্জনা পাঠকের হৃদয়কে সহজেই ছুঁয়ে দিতে পারে; কাঁদাতে পারে।

ক.
কার বাঁশির শব্দে আমার মন উতলা হলো গো
কার ছোঁয়ায় তেলবিনা বাতি জ্বলিল গো
বৃক্ষবিনা গুচ্ছগুচ্ছ ফুল ফুটিল গো

চকোর দেখ মন চন্দ্রিমাতে করেছে সমর্পণ
চাতক দেখ স্বাতী নক্ষত্রে দিয়েছে সকল মন
প্রেমিক কোথায় বল কিভাবে দিয়েছে জীবন ধন?
            [কবীরের শতদোঁহা, ৮২, মজিদ মাহমুদ]

খ.
একটি চুম্বন চেয়ে পৃথিবীর রাত্রি কাঁদে,
                    কাঁপে বৃক্ষ বন্য
                স্পার্টার উদার উপকূলে।
আমি দেখি তাই
            কেবলই গড়ন ভেঙে
            গড়িয়ে গড়িয়ে—মুক্তবেণী
                        মেঘে মেঘে ভেসে চলে মধ্যযুগ—
                                            মহুয়া বেদেনী।
                        [সোহেল হাসান গালিবের দীর্ঘকবিতা ‘কাউন্টার ফ্ল্যাশ’]

গ.
পুরোনো পথেই হাঁটছি, সেই তো ভালো—কেউ নেই কিছু নেই। জীবনের অদ্ভুত আঁধারের মায়া, একাই গুছিয়ে নেব শামুক সংগ্রহ।
                        [শামুক সংগ্রহ, রাহেল রাজিব]

ঘ.
ক্রমশ দৃশ্য বদলে যায় আর
নদী মরে যায়, দিঘি-পুকুর ভরে যায়
সময় ধূসর হয়ে ওঠে বেদনায়।
                        [জন্মতীর্থভূমি, ফজলুররহমান বাবুল]

ঙ.
হয়তো আমরা দুজনেই কোপাই
আমাদের সবুজ জলে নীরবতা ছিল
জন্মের রহস্য ছিল
হয়তো মৃত্যুও ছিল
কোথাও-বা ঝিঁঝিঁর গানও ছিল

একটি শস্যের দানা যেমন আলের ধারে পড়ে থাকে অবহেলায়
রাতের তারার কাছেই কেবল স্পষ্ট অর্থবহ হয়ে ওঠে
আমাদের সম্পর্কের কোপাইও তেমনি নীরব ভাষায় কথা বলে
মানুষের রক্তের ভেতরে
মানুষের ঘামের ভেতরে
পাখিদের ঝলসানো জামার ভেতরে
অসমাপ্ত, ভঙ্গুর।
                        [ময়ূর উজানে ভাসো, জফির সেতু]


পশ্চিমা রাখালিয়া কবিতা প্রকৃত বাস্তবতায় শ্রমসঙ্গীত।


স্পষ্টই বলছি, উল্লিখিত উদাহরণসমূহ পুরোপুরি অর্থে প্যাস্টোরাল কবিতার উদাহরণ নয়। কেননা পশ্চিমাদের মতো বাংলা ভাষায় প্যাস্টোরাল কবিতার ধারা পরিলক্ষিত না হওয়াই স্বাভাবিক। সুতরাং আমাদের কবিতা থেকে সহসা প্যাস্টোরাল কবিতার উদাহরণ উপস্থাপন করা কষ্টসাধ্য। যদিও রাখালী গান অথবা কবিতার সুর ও ছন্দ ফোক সাহিত্যে পাওয়া যায়। আমরা জসিম উদ্‌দীনের কথার পাশাপাশি চারণ কবিদের কথা বলতে পারি; তারপরও এ কথা ঠিক, বাংলা সাহিত্যে প্যাস্টোরাল কবিতার ধারা মোটা দাগে চাপিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। বরং তার আগে আমাদের অনুসন্ধান করা উচিত আসলে প্যাস্টোরাল কবিতায় কী থাকে? এই কী থাকে বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমাদেরকে পশ্চিমা সাহিত্যের উদাহরণ হাজির করতে হয়; যেহেতু আমাদের সাহিত্যে প্যাস্টোরাল সাহিত্যের ধারা নেই।

সবিনয়ে বলা সম্ভব, পশ্চিমা সাহিত্যের উদাহরণ হাজির না করেও বরং আমরা বলতে পারি, যে সব কবিতায় গ্রামীণ জীবন ও আবহ; গ্রামীণ পরিবেশ ও সংকট; গ্রামীণ চেতনা, সুর ও বিশ্বাস; প্রশান্তি ও রাখালি বাঁশির সুর শুধু নয় বরং রাখালি প্রশান্তির একটি নির্ভার স্বাধীন চিত্র ও চিত্রকল্প খুঁজে পাওয়া সম্ভব সেই সব কবিতাকে প্যাস্টোরাল কবিতার লক্ষণযুক্ত কবিতা হিশেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। আমাদের কবিতায় এ ধরনের গ্রামীণ-আবহ ও প্রশান্তিনির্ভর বিষয় খুঁজে পাওয়া সম্ভব; তবে শুধুমাত্র রাখালি বাঁশি আর রাখালি জীবননির্ভর কবিতা অপ্রতুল।

আরও একটি বিষয় ভাবা যেতে পারে, আমরা কি শুধুমাত্র কবিতার বিষয়-বিচারে প্যাস্টোরাল কবিতার লক্ষণ বিচার করব? নাকি এর সাথে আঙ্গিকের প্রশ্নটিও যুক্ত হওয়া উচিত? আমার কাছে মনে হয়েছে আঙ্গিক ও সুরনির্ভরতা প্যাস্টোরাল কবিতার জন্য অবশ্যই বিচার্য বিষয়। পশ্চিমা প্যাস্টোরাল কবিতা আখ্যাননির্ভর, সুর ও ছন্দনির্ভর যা রাখালিয়া জীবনের চিরায়ত শুশ্রূষার ভূমিকা পালন করে থাকে। এ প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে পশ্চিমা রাখালিয়া কবিতা প্রকৃত বাস্তবতায় শ্রমসঙ্গীত। পশুর পাল নিয়ে বছরের পর বছর বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে ঘুরে বেড়ায় যে জনগোষ্ঠী তাদের ফোক-বিলিভ থেকে ক্রমশ সৃজিত হতে থাকে এই ফোক পোয়েম ও ফোকসঙ। খোঁজ করলে আমাদের ভারত উপমহাদেশে এ রকম রাখালিয়া শ্রমনির্ভর কবিতা/ সঙ্গীত পাওয়া সম্ভব। যেমন বিহারের কিছু কিছু অঞ্চলে, হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশের মহিষ-বাথান-নির্ভর জনজীবনে পাওয়া সম্ভব প্যাস্টোরাল কবিতার অনুষঙ্গ; তবে সেগুলোর খুব কমই পুরোপুরি বাংলা ভাষায় রচিত; বরং অধিকাংশই উপভাষানির্ভর।

এ কথা ঠিক যে, বিস্তীর্ণ চারণ ভূমির অপ্রতুলতার কারণে বাংলা ভাষাভাষি জনজীবনে এ ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ ঘটে নি। বরং আমাদের রয়েছে ভাওয়াইয়া ভাটিয়ালি আশ্রিত কবিতা ও গান; যা প্রধানত সুর ও ছন্দনির্ভর; অন্ত্যমিলনির্ভর এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির আশ্রয়ে এর প্রকাশকৌশলে রয়েছে ফোক-অলঙ্কার আশ্রিত ব্যঞ্জনা। অবশ্য এই গুণগুলো প্যাস্টোরাল কবিতাতেও লক্ষ করা যায়। কিন্তু এত কিছুর পরও আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের এই সময়ের কবিতা এখন আর ফোক অনুষঙ্গের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই; সে জায়গা থেকে বহু আগেই অনেক দূর সরে এসেছে বাংলা কবিতা।

৫. জবাবদিহিতা ও সন্দেহ
আলোচনাটি অসম্পূর্ণ। রয়েছে উপযুক্ত উদাহরণের অভাব। এবং সবচেয়ে বড় কথা আমার বেশকিছু মতামতের সাথে সবাই এক মত হবেন না। কারণ এখানে বাংলা প্যাস্টোরাল কবিতার বৈশিষ্ট্যকে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয় নি। সম্ভব না হওয়ার কারণ একটিই; সেটি হলো প্যাস্টোরাল কবিতার ধারা আমাদের সাহিত্যে অনুপস্থিত। হয়তো বা আমরা এই ধারায় আমাদের অভিষ্ট কবিতা আজও সৃষ্টি করতে পারি নি; অথবা সৃষ্টি হয়ে থাকলেও তা আমাদের অগোচরে রয়ে গিয়েছে; আমরা এখনো অনুসন্ধান করতে পারি নি। তবে আমরা আশাবাদি। আশাবাদি এই কারণে যে, উত্তর-উপনিবেশবাদের ক্ষয়িষ্ণু প্রভাব থেকে ক্রমশ মুক্ত হয়ে আমরা শেকড়ের কাছে ফিরে আসতে চাইছি; ফিরতে চাইছি সিংহভাগ জনগোষ্ঠীর কাছে; ব্রাত্য ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির কাছে। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। এ কথা যেমন বাস্তবসম্মত তেমনি প্রকৃত বাস্তবতা হলো, কর্পোরেট সভ্যতায় যেখানে দ্রুত উৎপাদিত দ্রব্যের পাশাপাশি মানুষকে পণ্যে রূপান্তর করা হচ্ছে সেখানে কিভাবে শেকড়ের দিকে যাত্রা করা সম্ভব?

শিমুল মাহমুদ
Shimul Mahmu

শিমুল মাহমুদ

জন্ম ৩ মে ১৯৬৭, সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পাঠ গ্রহণ শেষে ইউজিসি-র স্কলার হিসেবে পৌরাণিক বিষয়াদির ওপর গবেষণা করে অর্জন করেছেন ডক্টরেট ডিগ্রি। বর্তমানে তিনি রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, চেয়ারপারসন ও কলা অনুষের ডিন-এর দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
মস্তিষ্কে দিনরাত্রি [কারুজ, ঢাকা: ১৯৯০]
সাদাঘোড়ার স্রোত [নিত্যপ্রকাশ, ঢাকা: ১৯৯৮]
প্রাকৃত ঈশ্বর [শ্রাবণ প্রকাশন, ঢাকা: ২০০০]
জীবাতবে ন মৃত্যবে [শ্রাবণ প্রকাশন, ঢাকা: ২০০১]
কন্যাকমলসংহিতা [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৭]
অধিবিদ্যাকে না বলুন [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৯]
আবহাওয়াবিদগণ জানেন [চিহ্ন, রাজশাহী: ২০১২]
কবিতাসংগ্রহ : সপ্তহস্ত সমুদ্রসংলাপ [রোদেলা, ঢাকা: ২০১৪]
স্তন্যপায়ী ক্ষেত্রউত্তম [অচেনা যাত্রী, উত্তর ২৪ পরগণা: ২০১৫]
বস্তুজৈবনিক [নাগরী, সিলেট: ২০১৬]

গল্প—
ইলিশখাড়ি ও অন্যান্য গল্প [নিত্যপ্রকাশ, ঢাকা: ১৯৯৯]
মিথ মমি অথবা অনিবার্য মানব [পুন্ড্র প্রকাশন, বগুড়া: ২০০৩]
হয়তো আমরা সকলেই অপরাধী [গতিধারা, ঢাকা: ২০০৮]
ইস্টেশনের গহনজনা [আশালয়, ঢাকা: ২০১৫]
নির্বাচিত গল্প [নাগরী, সিলেট: ২০১৬]
অগ্নিপুরাণ ও অন্যান্য গল্প [চৈতন্য, সিলেট: ২০১৬]

উপন্যাস—
শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৭]
শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী [ধানসিড়ি, কলকাতা: ২০১৪]
শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনি [চৈতন্য সংস্করণ, ২০১৬]

প্রবন্ধ—
কবিতাশিল্পের জটিলতা [গতিধারা, ঢাকা: ২০০৭]
নজরুল সাহিত্যে পুরাণ প্রসঙ্গ [বাংলা একাডেমী, ঢাকা: ২০০৯]
জীবনানন্দ দাশ : মিথ ও সমকাল [গতিধারা, ঢাকা: ২০১০]
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধারার কবিতা [গতিধারা, ঢাকা: ২০১২]
মিথ-পুরাণের পরিচয় [রোদেলা, ঢাকা: ২০১৬]

ই-মেইল : shimul1967@gmail.com
শিমুল মাহমুদ
Shimul Mahmu