হোম গদ্য প্রবন্ধ জীবনানন্দ অনূদিত বনলতা সেন

জীবনানন্দ অনূদিত বনলতা সেন

জীবনানন্দ অনূদিত বনলতা সেন
1.06K
0

কবিতার অনুবাদ নিয়ে অনুসরণযোগ্য কোনো নির্দেশিকা আজও তৈরি হয়ে ওঠে নি। অনুবাদ বিষয়টিকে ঘিরে আজ অব্দি তর্ক ও তত্ত্বেরও শেষ নেই। অনুবাদ ব্যাপারটাই বিশ্বাসঘাতকতা, এরকম ধারণাও পোষণ করে এসেছেন সমালোচকদের কেউ কেউ। আবার অনেকেই মনে করেন, অনুবাদের মাধ্যমে মূল সৃষ্টির অনেকটাই আস্বাদিত হতে পারে। মূল কবিতার প্রতি অনুগত ও নিরপেক্ষ থেকেও অনেক অনুবাদকই যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি অনুবাদকর্মে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আরোপের অপরাধে অভিযুক্তও হয়েছেন কেউ কেউ। ইংরেজি ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্য থাকার পরও রেহাই পান নি বিষ্ণু দে—এমনকি সুধীন্দ্রনাথও। ব্লেক ও ইয়েটসের কবিতার বাংলা অনুবাদ করতে গিয়ে এই দুই কবিই মূল থেকে বিচ্যুতির বেশ কিছু প্রমাণ রেখে গেছেন, এরকমই অভিযোগ অনেক বিদগ্ধ পাঠক ও সমালোচকদের। রিলকের কবিতার অনুবাদ নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর দিকেও যে অভিযোগ ওঠে নি তা নয়। অন্য ভাষায় দক্ষতা, কখনও কোনো কবিকে অনুবাদকর্মে প্রাণিত করতেই পারে। কিন্তু কোনো কবি যখন নিজেই তাঁর কবিতার অনুবাদক সেক্ষেত্রে লিখনে কী ঘটে? এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই, অপর ভাষায় দক্ষ কোনো কবির পক্ষে তাঁর নিজের কবিতার স্বকৃত ভাষান্তর নিতান্তই সহজসাধ্য, মূলানুগ, নিরপেক্ষ ও বিচ্যুতিরহিত। বরং ভাষান্তরের মুহূর্তে অনুবাদকের ভূমিকায় সেই কবি নিজের কবিতাটিকে অন্য ভাষায় ধর্মান্তরিত করার সময় হয়তো এক অসহায় ঘোরের ভেতর লিখে ফেলেন মূল রচনার অসম্পূর্ণ ও অনুক্ত সম্ভাবনাগুলিকে। কখনোবা মূল কবিতার কোনো কোনো অংশ বা পঙ্‌ক্তি বা কোনো স্তবক স্বকৃত অনুবাদে বাহুল্য হয়ে ওঠে কবির কাছে। সেই বাহুল্য বর্জন করে নিজের কবিতার অনুবাদক সেই কবি গড়ে তোলেন ভাষান্তরিত এক ভিন্ন মাত্রার অবয়ব। ফলে, অনূদিত কবিতাটিতে উপস্থাপিত হয় এক দ্বিতীয় সৃষ্টি। প্রশ্ন ওঠে, তবে কোথায় কবির মনোবীজ, মৌলে নাকি তর্জমায়? এই প্রশ্ন পাঠককে তাড়িয়ে বেড়ায় বৈকি। এডগার এলান পো-র To Helen কবিতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব থেকে গেলেও এটা অনস্বীকার্য, ‘বনলতা সেন’ বিশ্বকবিতার ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি। এই কবিতার দিব্য বিষ বাঙালি পাঠককে আজও নীলাভ করে রেখেছে। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ অনূদিত ‘বনলতা সেন’ পাঠের পর যুগপৎ বিস্ময় ও বিভ্রান্তি যদি কাউকে গ্রাস করে, অবাক হওয়ার কিছু নেই। পাশাপাশি মূল ও তর্জমার তুলনামূলক পাঠের পর ‘বনলতা সেন’-এর কবি ও অনুবাদক জীবনানন্দ সপ্রশ্ন সংশয় হয়ে উঠেন আমাদের কাছে। এবার আমরা দেখে নিতে পারি, মূল ‘বনলতা সেন’ ও কবিকৃত তর্জমার তুলনামূলক পাঠটিকে—

বনলতা সেন

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসে দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ফিরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।
.

Banalata Sen

Long I have been a wanderer of this world,
Many a night,
My route lay across the sea of Ceylon somewhere winding to
The sea of Malaya.
I was in the dim world of Bimbisar and Asok and further off
In the mistiness of vidarbha.
At moments when life was too much a sea of sounds,
I had Banalata Sen of Natore and her wisdom.

I remember her hair dark as night as Vidisha,
Her face and image of Sravesti as the pilot,
Undone in the blue milieu of the sea,
Never twice saw the earth of grass before him,
I have seen her, Banalata Sen of Natore.

When day is done, no fall somewhere but of dews
Dips into dusk; the smell of the sun is gone
Off the Kestrel’s wings. Light is your wit now,
Fanning fireflies that pitch the wide things around
For Banalata Sen of Natore.

এই তুলনামূলক পাঠের পর এ প্রশ্ন উঠতেই পারে, ইংরেজি ভাষান্তরে জীবনানন্দ কি বনলতা সেনের প্রতি বিশ্বস্ত? অনূদিত প্রথম স্তবকের দিকে একবার তাকানো যাক। কোথায় সেই ক্লান্তির ভাষান্তর? Life was too much a sea of sounds, এই বাক্যবন্ধ কি আদৌ ক্লান্ত প্রাণের বার্তা বয়ে আনে? বরং sea of sounds-এর মতো আলঙ্কারিক আর্ষ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে কবিসত্তার এক অস্থিরতাই সূচিত হয়। I had Banalata Sen of Natore and her wisdom—থমকে যেতে হয় অনূদিত স্তবকটির শেষ পঙ্‌ক্তিতে এসে। নারীর কাছে ক্লান্ত বিধ্বস্ত পৌরুষের সমর্পণের যে আর্তি অনুভূত হয়, মূল বনলতা সেন-এ দুদণ্ড সেই শান্তির কারণ কিন্তু কোথাও চিহ্নিত নয়। তর্জমায় এসে পাঠকেরা বরং এই wisdom শব্দটিতে খুঁজে পেতে পারেন এক সঙ্কেতসূত্র, যা মূল কবিতায় অনুক্ত। নারীর এই wisdom তথা জ্ঞান ক্লান্ত কবিসত্তার এক পরম আশ্রয় হয়ে ওঠে। এ কি সেই জ্ঞান, যে জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই? এই wisdom-ই যদি নারীর ভেতর ডুবুরি পৌরুষের অন্বেষণ ও সমর্পণের একমাত্র কারণ হয়, তবে কেন জীবনানন্দ এই নির্ণয় অনুক্ত রেখে দিলেন মূল কবিতায়? অনুগত না হয়েও তর্জমার এই ঘোর-ই বনলতা সেনের কল্পবিগ্রহে যুক্ত করে এক অন্য মাত্রা। ভাষান্তরিত দ্বিতীয় স্তবকটি পাঠকের কাছে যুগপৎ বিস্ময় ও বিভ্রান্তির; এতে সন্দেহ নেই। দারুচিনি দ্বীপের ভেতর দিশাহীন নাবিকের সহসা সবুজ ঘাসের দেশ আবিষ্কারের উপমিত উত্তেজনাকে কি জীবনানন্দ বইয়ে দিতে পেরেছেন Never twice saw the earth of grass before him চরণটিতে? কোথায় দারুচিনি দ্বীপ? অন্ধকারে বনলতা সেনকে দেখার উল্লেখই বা কোথায়? কোথায় পাখির নীড়ের মতো চোখের তুমুল উপমা-সমৃদ্ধ প্রশ্নমুখর বনলতা সেন? যেন নিস্তরঙ্গ একটি স্তবকে সমস্ত বাহুল্য স্বেচ্ছায় বর্জন করেছেন জীবনানন্দ। ইংরেজি তর্জমায় পাখির নীড়ের মতো চোখের ব্যঞ্জনা বাঙালি ব্যতিরেকে বৃহত্তর পাঠকের কাছে ব্যর্থ হতে পারে, হয়তো সঠিক এই উপলব্ধি থেকে মৌন রইলেন অনুবাদক। তৃতীয় স্তবকেও ‘পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন’ অংশটির ভাষান্তর এড়িয়ে গেলেন জীবনানন্দ। বরং মূল রচনাবিচ্ছিন্ন Light is your wit now পঙ্‌ক্তিটির সংযোজন অপ্রাসঙ্গিক এক স্বরক্ষেপ বলেই মনে হয়। কার উদ্দেশ্যেই-বা এই স্বরক্ষেপ? সব পাখি ও নদীদের ফিরে আসা, জীবনের সব লেনদেন ফুরানোর পর সেই অন্ধকার ও বনলতা সেনের মুখোমুখি আত্মসমর্পিত মুহূর্তকে ভাষান্তরিত না করে এক অদ্ভুত নির্লিপ্তিতে নিষ্ক্রিয় রইলেন জীবনানন্দ। এই অনুবাদ নিয়েই বরিশালের সর্বানন্দ ভবন থেকে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়কে লেখা জীবনানন্দের দুটি চিঠির কিয়দংশ উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রথম চিঠিটি উনিশশো বিয়াল্লিশের দশ অক্টোবর, দ্বিতীয়টি কুড়ি মার্চ, উনিশশো চুয়াল্লিশ—

১. তাড়াহুড়ো করে তিন-চারটে কবিতার তর্জমা পাঠাচ্ছি, কিন্তু অত তাড়াতাড়ি কি ঠিক জিনিস হয়? উপযুক্ত সময় ছাড়া আমি অন্তত মনের মতন জিনিস গড়তে নিতান্তই অক্ষম, বনলতা সেন, বিড়াল ও মনোবীজ অনুবাদ করে পাঠালাম। ইংরেজি লেখার অভ্যাস নেই। হয়তো নানারকম ত্রুটি রয়ে গেছে।

২. বুদ্ধদেববাবুর কাছে বনলতা সেন, বিড়াল ও মনোবীজ-এর যে ইংরেজি তর্জমা রয়েছে তাও খুব তাড়া খেয়ে লেখা, ও তর্জমায় আমি খুশি নই… বেশি সময় পেয়ে স্থির হয়ে নিতে না পারলে এসব জিনিস মনের মতন হয় না।

ইংরেজি লেখার অভ্যাস নেই, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপকের এ হয়তো এক বিনীত ভঙ্গি। প্রাক ও পরবর্তী জীবনে বেশ কিছু কবিতা ও প্রবন্ধ, জীবনানন্দ ইংরেজিতেই লিখেছিলেন। দ্বৈত সত্তাকবলিত অসহায় ঘোরের দুর্বল ও অসম্পূর্ণ ভাষান্তরকে মূল কবিতার পাশাপাশি রেখেই বনলতা সেন-এর বহুরৈখিক পাঠ হয়তো ভবিষ্যতে বাঙালি পাঠকদের চিন্তাসূত্রকে আরও উস্কে দিতে পারে।

প্রবুদ্ধসুন্দর কর

প্রবুদ্ধসুন্দর কর

জন্ম ৭ জানুয়ারি, ১৯৬৯; ভারতের আগরতলা। ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। ত্রিপুরা সরকারের উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
ডার্করুম মঘানক্ষত্র [ক্রান্তিকাল, ১৯৯০]
ইন্দ্রজাল কমিকস [বাংলাকবিতা, ১৯৯৬]
মায়াতাঁত [মনোবীজ, ২০০১]
নৈশ শিস [ অক্ষর পাবলিকেশনস, ২০০৫]
আত্মবিষ [অক্ষর পাবলিকেশনস, ২০১০]
যক্ষের প্রতিভূমিকা [অক্ষর পাবলিকেশনস, ২০১৩]

সম্পাদিত—
উত্তরপূর্বের তরুণ কবিদের শ্রেষ্ঠ বাংলা কবিতা [আবহমান, ২০০২]
উত্তরপূর্বের কবিতা [নাইনথ কলাম, ২০১৫]
ত্রিপুরার বাংলা কবিতা [অক্ষর পাবলিকেশনস, ২০১৭]

ই-মেইল : prabuddhasundar@rediffmail.com
প্রবুদ্ধসুন্দর কর

Latest posts by প্রবুদ্ধসুন্দর কর (see all)