হোম গদ্য প্রবন্ধ কবিতা : শাশ্বতীর গালে নশ্বরতার চুম্বন

কবিতা : শাশ্বতীর গালে নশ্বরতার চুম্বন

কবিতা : শাশ্বতীর গালে নশ্বরতার চুম্বন
1.69K
0

পূর্ব

কিছু কিছু তর্কের বোধ করি কোনো ফয়সালা নেই। একটি মহৎ শিল্পকর্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শিল্পীর নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা, তার ক্ষুদ্রত্ব, নীচতা, পাপাচার—শেষ পর্যন্ত কি বিচার্য হবে! সংগ্রামী, শ্লোগানমুখর কবিতার পেছন থেকে কবির ভীরুতা, কাপুরুষতা, আপসকামিতা কখনো কি চলে আসবে সামনে, একেবারে আত্মপরিচয়ের প্ল্যাকার্ড হাতে?

তখন ধর্মের ধুয়া তুলে, মতবাদ ও দর্শনের দাঁত-খিঁচুনি দেখিয়ে ওই কবিকে ছুড়ে ফেলবে না সবাই? কারাগারে নিক্ষেপ করবে না শিল্পীকে? নিশ্চয়ই। এবং সেটিই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু তারপর? তারপর নষ্ট করে ফেলব তার শিল্পকর্ম এবং ভুলে যাব কবিতাকে। কেননা অরিস্টিস তার মাকে হত্যা করেছিল, যাতে দেশের কোনো নারীর মধ্যে ক্লাইটেমনেস্ট্রার পাপাচারের দৃষ্টান্ত অনুসরণের অন্তিম, সুপ্ত ইচ্ছাটিও মরে যায়। অপৌত্তলিক তাই চায় পৃথিবীর সমস্ত মূর্তি ধ্বংস হোক।

কিন্তু হায়! জীবন তো এমন কঠিন-কঠোর ঔচিত্যবোধের অনুশাসনে চলে না। ‘তোমরা কি দ্যাখো না, তারা (কবিরা) উপত্যকায় উপত্যকায় উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে বেড়ায়।’ ছুটে তো বেড়াবেই। কারণ তাকে নিরন্তর পিষে ফেলতে চাইছে অনন্তের ভর, অসীমের বেদনা। ‘অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেয়, তার বক্ষে বেদনা অপার, তার নিত্য জাগরণ; অগ্নিসম দেবতার দান ঊর্ধ্বশিখা জ্বালি চিত্তে অহোরাত্র দগ্ধ করে প্রাণ।’ আর সত্যের বহুবর্ণ রূপদর্শনে তাকে গ্রাস করে বিপন্ন বিস্ময়। তাই তাকে বলতে হয়, ‘পাপপুণ্যের কথা আমি কারে-বা শুধাই! এক দেশে যা পাপ গণ্য, অন্য দেশে পুণ্য তাই।’


শাসক ও শাসিতের বৈরিতায়, সুন্দর ও শয়তানের অক্ষক্রীড়ায়, কাম ও নিষ্কামের দোলাচলে আর প্রথা ও গ্রগতির টানাপড়েনে ক্ষতবিক্ষত আত্মার উষ্ণতা পেতে চাই আমরা।


মহাগ্রন্থের কাল আমরা পেরিয়ে এসেছি। পেরিয়ে এসেছি মঙ্গলকাব্যের যুগ। একালে, দেবীর দ্বারা স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে কবি আর ন্যস্ত হন না কাব্যবিরচনে। বড় জোর, নারীর কটাক্ষ-ইঙ্গিতে জাগে তার বাকস্ফূর্তি। কবির রূপমুগ্ধতার এই ঘোর কলিকালেও কেবল অলি এসে তো জোটে না। কীট ও কণ্টকের আছে দন্তবিকাশ। তাই স্বর্ণমুকুটের চূড়ায় যখন দেবতার বরাভয় দেখতে পায় রাজঅমাত্ম্য, কবি তখন দেখে তার তলায় ঘুণপোকার সিংহাসন।

শাসক ও শাসিতের বৈরিতায়, সুন্দর ও শয়তানের অক্ষক্রীড়ায়, কাম ও নিষ্কামের দোলাচলে আর প্রথা ও গ্রগতির টানাপড়েনে ক্ষতবিক্ষত আত্মার উষ্ণতা পেতে চাই আমরা। হতে চাই নীড়ভ্রষ্ট নিখিলের অকপট কোনো ভগ্নহৃদয়ের সঙ্গী। যেহেতু আমরাও, অধিকাংশ তাই। কিন্তু এ কি সম্ভব, কবিকে খুঁজে পাব কবিতারূপে! কেন নয়, যদি কবিতায় মেলে কবির দর্শন!
.

অনুসিদ্ধান্ত :
১-কবিতা জীবন-সত্যের উপলব্ধিজাত। ভণ্ডামির কোনো জায়গা নেই।
২-কবিতা মানুষের একটি আচরণ।
৩-কবিতায় থাকবে সত্য, সুন্দর, শিব।
৪-কবিতা দর্শনেরই বয়ানমাত্র। এতে তাই থাকবে যুক্তি ও গণিত। বক্তব্যে যুক্তির প্রকাশ, ছন্দে গণিতের স্ফূর্তি।
৫-কবিকে হতে হবে নবির সমতুল।

 

পশ্চিম

দুখের ঘোর নিদানে, আরোগ্যবিধানে আমরা ডাক্তারের প্রেসকিপশন মেনে চলি বিনাবাক্যব্যায়ে। সে কেবল তার চিকিৎসাবিদ্যায় দখল আছে জেনে। কিন্তু তার চরিত্র নিয়ে ভাবি না কখনো। রাতের অন্ধকারে যে আলোতে বসে পড়া-লেখা করি, সে মুহূর্তে ওই আলোর আবিষ্কর্তা নিয়ে থাকে না আমাদের মাথাব্যথা। গণিতের সূত্র যে প্রণয়ন করে, তার ব্যাপারেও একই কাণ্ড।

তবে কেন পটে আঁকা ছবিটির থেকে উঁকি দেবে শিল্পীর মুখ? কবিতার অক্ষরের আঁকাবাঁকা পথে কেন খুঁজে নিতে চাইব কবিকে? কারণ, এ যে তার জ্ঞানবুদ্ধি যুক্তিমাত্র নয়, এতে আছে তার হৃদয়-উদ্ভাস, অভিব্যক্তি। অভিব্যক্তি থেকে কিভাবে আলাদা করে রাখব ব্যক্তিকে!

এখানেও তবে দুটো কথা বলবার আছে। খুনির চোখের অশ্রু, ধর্ষকামীর মর্ষপ্রিয়তা, প্রেত ও পিশাচের ক্ষণমধুর হাসিটিকে আমরা কি পারি না কল্পনায় আনতে! আপাদমস্তক লম্পটের চিত্তে কোনোদিন জাগে না কি সন্ন্যাস, বেশ্যার পূজারিণী-প্রাণ! কী করে অস্বীকার করি! কে বলতে পারে, আগুনের মধ্যে ভস্মীভূতের জন্য অন্তর্দহন নেই! নিখাদ ভালো মানুষের দেখা পেলাম না বলে হয়তো নিখুঁত শয়তানের সাক্ষাতও মিলল না।

কবির ভেতর যে কবি, সে তো রাগী, আত্মম্ভরি অধ্যাপকটি নয়। ছ্যাচ্চোর বজ্জাত হাড়কিপ্টে লোকটা যখন কবিতার শিশমহলে ঢুকে পড়ে, তখন তার প্রতিবিম্ব, যা হয়তো নিজেই চেয়ে দ্যাখে, দ্যাখে, সেটি ঠিক উল্টো। সব কলহকথা, নীচতা, ভীরুতা, লজ্জা কী ভয়ংকরভাবে ঘুরে দাঁড়ায়! কোথা থেকে আসে এই দুঃসাহস, নিখিল-নৃশংস প্রেরণা!
.

অনুসিদ্ধান্ত :
১-কবিতা বিশেষ মুহূর্তজাত উপলব্ধির বয়ানমাত্র।
২-কবিতা এক ধরনের আত্মস্বীকৃতি। তা দুর্বৃত্তেরও হতে পারে। মহতের নয় শুধু।
৩-কবিতা শেষ পর্যন্ত আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও কল্পনার জায়গা। বাস্তবতার চিত্রায়ণ কোনোমতেই নয়।

 

উত্তর

যেহেতু কবি বুঝে ফ্যালে, যে কল্পনার জগৎ গড়ে উঠল তাকে ঘিরে, তা তারও অনধিগম্য, সুদূর, স্বপ্ন-পরাভূত। অতএব হাহাকার ও শূন্যতাই তার প্রাপ্তি। এর ফলেই হয়তো তৈরি হয় জীবনের এক বিয়োগান্তক বিজয়োল্লাস, নশ্বরতার বোধিলাভ। এ যেন শৃঙ্গারোহীর ভূলুণ্ঠনের চৈতন্য। প্রত্যাখ্যানের জন্যেই প্রেমিকের সমর্পিত হওয়া। তাই সকল মাধুর্য, সৌন্দর্য বিষাদরসে ভাসমান পদ্মপর্ণ যেন। এই রসের সরোবরে কবি ও পাঠকের অনন্ত সাঁতার ও নিমজ্জনই শেষ সত্য। কেননা, ‘হাতের ধরা ধরতে গেলে, ঢেউ লেগে তায় দিই যে ঠেলে’।
.

অনুসিদ্ধান্ত :
১-কবিতা বাস্তবের অধিক বাস্তব, সেই অর্থে অধিবাস্তব।
২-যা হলো না, যেখানে পৌঁছানো গেল না, যাকে পাবার নয়—সমস্ত না-এর বিরুদ্ধে কবিতা হলো ইন্দ্রিয়ের সান্ত্বনা।

দর্শনের দরকার একদিন ফুরায়। এমনকি বাতিলও হয়। এককালের জ্ঞান হয়তো অন্য কালের আঙিনায় হয়ে পড়ে উপহাস্য।


দক্ষিণ

কবিতা ভাবরসেরই ব্যাপার। বিনোদনের দায়টুকু শেষ হলে তাকে আর সম্ভব নয় কবিতারূপে পাওয়া—দহন শেষ হলে শিখার মতো।

কিন্তু বিনোদন কী? চিত্তের সমস্ত বিকারের পথ অবারিত করে দেওয়া। কেবল আনন্দ-হাসি-উল্লাস নয়; ক্রোধ, বিষাদ, বিনাশও তাই বিনোদনের সামগ্রী। এর ফলে চিত্তসঞ্চালন ঘটে, হৃদয় হয়ে ওঠে সূক্ষ্ম-সংবেদী। অঙ্গ-সঞ্চালনে দেহের স্বাচ্ছন্দ্য যেমন আসে।

তাই বলে কবিতায় কি দর্শন থাকবে না? তার উত্তরে বলতে পারি : দর্শনের দরকার একদিন ফুরায়। এমনকি বাতিলও হয়। এককালের জ্ঞান হয়তো অন্য কালের আঙিনায় হয়ে পড়ে উপহাস্য। চৈতন্যের রাধাভাবের উন্মাদনা আমাদের আরাধ্য নয়। কিন্তু চণ্ডীদাসের, বিদ্যাপতির রাধার অন্তর্দাহ আমাদের হৃদয় মন্থন করে, সে মন্থন না চাইলেও। রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতা সোনার তরী বেয়ে কালসমুদ্র পার হয়ে আজ চলে গেছে অন্য কোথাও। তবু তার নিরুদ্দেশ যাত্রার স্রোতচিহ্ন, অসীম ব্যাকুল বাক্যরাশি হাওয়াবাষ্পে আকুল করে রেখে গেল আমাদের বোধিদ্রুম, তপোবন, তটরেখা। আমরাও জেনে গেছি, ‘মানুষ কাউকে চায়, তার সেই নিহত উজ্জ্বল ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোনো সাধনার ফল’। দেখি, আজ মরে গেছে ‘সাতসাগরের মাঝি’, ঝরে গেছে ‘পদাতিক’।

তাই মনে হয়, দর্শনের দরদি গিলোটিনে মাথা দিয়ে কবি মহৎ হতে পারেন, জীবন বাঁচাতে পারেন না। কবির জীবন মানে তো কবিতা।

যারা কেবল ভাবেন সমাজ-রাজনীতি নিয়ে, অনুযোগের সঙ্গে বলেন দুর্যোগের কথা, তাদের বলব, কবিতাই কেন লিখতে হবে? সকল রোগের একই দাওয়াই কি সম্ভব! উপযোগিতার কথাই যদি ভাবি, তবে শীতার্তকে একখানা ছেঁড়া কম্বল দেয়াটাই বড় কাজ হবে। কবিতা পারবে না তাকে এতটুকু উষ্ণতা দিতে, ফেরাতে শৈত্যপ্রবাহ। অসির চেয়ে মসি বড় হতে পারে, কিন্তু রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ না হলে কে করবে যুদ্ধ! আর অবতীর্ণ হলে, হায়, মসিতে কী আবশ্যক তার!
.

অনুসিদ্ধান্ত :
১-কবিতা অনুপযোগিতারই বিষয়।
২-কবিতার চূড়ান্ত লক্ষ্য চিত্তরঞ্জন।
৩-রসাত্মক বাক্যই কাব্য—এটিই কবিতার শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা।

 

পুনশ্চ

কবিতার শুকিয়ে মরা, ক্লিশে হয়ে পড়া সম্পর্কে কিছুই বলা হলো না। কবিতার টাটকা, সতেজ ভাবটা বিষয়ের যতটা, তারও বেশি আঙ্গিকের, এই শুধু মনে হয়। শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাস আর উপমা-চিত্রকল্পের অভিনবত্ব ফিকে বিষয়কেও টিকিয়ে দিতে পারে। শাশ্বত বলে যা আছে, তা হলো আঙ্গিকের অবিরল ভঙ্গুরতা। যেমন : পুরনো কিছু কথাকেই নতুন ভঙ্গিতে এই প্রবন্ধে সাজাবার চেষ্টা করা হলো।

সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব