হোম নির্বাচিত কবিতার দানবীয় প্রত্যাবর্তন

কবিতার দানবীয় প্রত্যাবর্তন

কবিতার দানবীয় প্রত্যাবর্তন
952
0

এই নরহত্যা

হ্যায়িম নাহমান ব্যাইলিক
.

স্বর্গ আমার কাছ থেকে মাফ চাইয়া পালাইছে
তোমার কাছে প্রভুর ঠিকানা এবং
তোমার কি কোনো পথ আছে তার দিকে যাওয়ার
কিন্তু আমি তা খুঁজে পাই নাই।
আমার জন্য একটু দোয়া কইরো।
আমার হৃদয় মইরা গ্যাছে
আমার ঠোঁট আর কোনো প্রার্থনা জপে না।
আমার আশা এবং ভরসা বিনাশ হয়ে গ্যাছে
কই গেছে, কতদূরে গেছে..?

হে নির্দেশকর্তা, এই যে আমার গ্রীবা
ঘাতক, আমাকে বলি দাও! তোমার তো
রয়েছে পরাক্রমশালী বাহু ও কুড়াল
কুকুরের মতো আমার মুণ্ডু দ্বিখণ্ডিত করো।
দুনিয়াটা আমার জন্য কসাইখানা
আমরা সংখ্যাতেও অল্প।
এখন তো আামদের রক্তেই বইবে উদ্দাম বসন্ত।
করোটি ফাটিয়ে রক্ত নিংড়ে নাও।
নাবালক এবং বয়সী রক্তের ধারা তোমার বুকে এসে ঝাপটা দিচ্ছে
এই রক্ত তোমার বুকে চিরকালের জন্য লেগে থাকবে, কখনও মুছে যাবে না।

এখানে যদি কোনো ন্যায় থাকে তবে তাকে এখনই আসতে হবে
আমার রক্তের সব চিহ্ন আকাশের রেখার মধ্যে মিলিয়ে যাবার পর এই ন্যায়
হাজির হলে আমি ভাগাড়ে ছুড়ে ফেলে দিব।
সেখানেই তুমি বেঁচে থাকবে
তোমারই নামে ঝাড়ানো রক্তের সৌরভ নিয়ে।

তাকেও হত্যা করে প্রতিশোধ নাও, যে এই চূড়ান্ত অবস্থা থেকে বেরুতে চায়।
অভাবনীয় প্রতিশোধ নাও, যেন শিশুটির রক্তের আদব রক্ষা হয়।
ওরা এখনও শয়তানের সংকল্পেই রয়েছে
রক্ত দিয়ে পূর্ণ করো ধর্মাশ্রম।
তীব্রভাবে ভেদ কর গভীর আঁধারের পুরুত্ব
জনমের খিদা মিটাও অন্ধকার গ্রাস করে
সব আঁধার খেয়ে খেয়ে দুনিয়ার শিখরে পৌঁছে যাও।

[মূল কবিতা হিব্রুতে লেখা, On the Slaughter নামের এই কবিতাটি বাংলায় তর্জমা করার সময় একাধিক অনুবাদ দেখেছি। – রনি]

গণহত্যার সাথে কবিতার সমন্ধ নিয়া ভাবাভাবি তখনও শুরু করি নাই। হঠাৎ আমার টুইটার ওয়ালে ‘এই করি’ কবিতার দুইটা লাইন চোখে পড়ে। সময়টা ২০১৪ সালের জুলাই মাসে ইসরায়েল কর্তৃক গাজা আক্রমণ ও অভাবনীয় গণহত্যা চালানোর সময়েই আমার ভাবনা একটা শক্ত ভিতের উপর দাড় করানোর আগেই বিষয়টা সামনে চলে এসেছে। এবং আটঘাট করে ভাবাভাবি বাদ দিয়ে চট জলদি বিষয়টি নিয়ে খসড়া লেখা লিখতে শুরু। কোন চূড়ান্ত দার্শনিক মীমাংসার জন্য নয় বরং প্রশ্নটা নানান দিক থেকে হাজির করতে চেষ্টা করেছি।


ইসরায়েলের প্রতিশোধ-বাসনাকে পুরোপুরি তর্জমা করতে এর চেয়ে জুতসই বাক্য যেন আর নাই! এতদিন আড়ালে পড়ে থাকা কবি হ্যায়িম নাহমান ব্যাইলিক পরাক্রমশালী দানবীয় রূপ নিয়ে ফিরে আসেন দুনিয়ার কাব্য-পরিমণ্ডল ছাপিয়ে ক্ষমতার অস্ত্র হয়ে।


কবিতার আয়ু যে গজ ফিতা দিয়ে মাপা যায় না তা আবারও হাতেনাতে প্রমাণ হলো। কবিতাকে আমরা যতখানি শক্তিশালী মনে করি, কবিতা মনে হয় তাঁর চেয়ে একটু বেশিই শক্তিধারণ করে। এই শক্তি মানে শুধু তৎপরতার শক্তি না। অবশ্য ‘এইজ অব রিজনে’ বা যুক্তিবাদী জুলুমের দুনিয়ায় তৎপরতাকেই শক্তির নগদ নজির হিশেবে দেখা হয়। শক্তি তো শুধু সৃষ্টি না, ধ্বংসও করে। কিন্তু রাবীন্দ্রিক-পজিটিভিস্টরা বা ভালোত্ববাদীরা সব কিছুকে মঙ্গলালোকময় মনে করেন। মানবতাবাদিতা যে শক্তির মঙ্গলময় ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে না, তা আবার প্রমাণ হলো। এখন গাজা ‘ইভেন্টে’ একটি কবিতার দানবীয় প্রত্যার্বতনকে কেন্দ্র করে আমরা বিস্তারিত আলোচনায় প্রবেশ করব।

১২ জুলাই, ২০১৪ তিনজন ইহুদি তরুণকে অপহরণ ও হত্যার খবর ব্যাপকভাবে মিডিয়াতে চাউর করা হয়েছিল। তখনই অনেকে বলছিল ‘যুদ্ধ ডাকতেছে’। আক্রমণের আগের দিন ইসরায়েরের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারি ক্যাবিনেটের ভাষণে দুটি কবিতার লাইন উচ্চারণ করেন। এবং প্রতিশোধের আগুন ছড়িয়ে দিয়ে গাজায় গণহত্যা শুরু করেন। ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর সম্পাদকীয়তে এই কবিতার লাইনগুলো উদ্ধৃত করা হয়। ইসরায়েলের প্রতিশোধ-বাসনাকে পুরোপুরি তর্জমা করতে এর চেয়ে জুতসই বাক্য যেন আর নাই! এতদিন আড়ালে পড়ে থাকা কবি হ্যায়িম নাহমান ব্যাইলিক পরাক্রমশালী দানবীয় রূপ নিয়ে ফিরে আসেন দুনিয়ার কাব্য-পরিমণ্ডল ছাপিয়ে ক্ষমতার অস্ত্র হয়ে। শুরু হয় তাঁর কবিতা ও তাঁর ইহুদিবাদী সাহিত্যপ্রকল্প নিয়ে নানানমুখী বিশ্লেষণ। আমি নিশ্চিত বাংলাদেশে এই কবিকে নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা আগে পরে হয় নি। আমার চোখে পড়ে নি।

আমেরিকার খ্যাতিমান কবি পিটার কোল ২০১৪ সালের ৩১ জুলাই ‘প্যারিস রিভিউ’তে এক নিবন্ধ লিখেন। কবিতার ইংরেজি অনুবাদ তুলে দিয়ে পিটার লিখেন, ‘আমেরিকানদের ধারণা কবিতা ও রাজনীতি কখনও মিশ খায় না। কিন্তু এই দুইটা শুধু মিশেই না, অনেক সংঘাতময় (ভায়োলেন্ট)-ভাবে মিশে যেতে পারে’।

আমাদের এখানেও কবিতা ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে বেশ কৌতুককর কিছু অনুমান আছে। সেই দিক থেকে ব্যাইলিক এর দানবীয় প্রত্যার্বতনকে আমাদের দেশের কব্য-পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে পাঠ করাটা বেশ কাজের হতে পারে মনে করেই এই লেখার অবতারণা। পাঠকের ধৈর্য কমনা করে শুরু করছি।

মৃতদের পরিবারের প্রতি প্রধানমন্ত্রী সমবেদনা জানান। গোটা ইসরায়েলে শোকের ছায়া নেমে আসে। ক্যাবিনেট মিটিংয়ে বসেন রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা। নেতানিয়াহু ব্যাইলিকের কবিতা থেকে উচ্চারণ করেন, “Vengeance… for the blood of a small child, /has yet been devised by Satan.”

“অভাবনীয় প্রতিশোধ নাও, যেন শিশুটির রক্তের আদব রক্ষা হয়।”

Hayyim_Nahman_Bialik_1923
হ্যায়িম নাহমান ব্যাইলিক (৯ জানুয়ারি ১৯৭৩—৪ জুলাই ১৯৭৪)

সাথে সাথেই উচ্চারণ করেন, হামাস এর জন্য দায়ী। হামাসকে মূল্য দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর অফিসিয়াল টুইটেও এই কবিতার লাইন প্রচার করা হয়। ‘ইসরায়েলের জনগণ প্রতিশোধ চায়’ নামে একটা ফেইসবুক পাতা খোলা হয়—পঁয়ত্রিশ হাজার লাইক নিয়ে পাতাটি যাত্রা শুরু করে। সব আয়োজন শেষ করেই শুরু হয় গাজার নিরীহ বাসিন্দাদের উপর একতরফা গণহত্যা। মিডিয়ার খবরে জানা যায়, মৃতের সংখ্যা  দুই হাজারের উপর ছাড়িয়ে যায়। আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। যার বেশির ভাগই শিশু। সারা দুনিয়া ইসরায়েলি গণহত্যার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠে। মানুষ যে কোনো মূল্যে এই হত্যাদৃশ্য দেখার হাত থেকে মুক্তি পেতে প্রতিবাদ জানাতে পথে নেমে আসে। সারা দুনিয়ায় ইসরায়েলের কসাইগিরি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও এই নরঘাতকদল ক্ষান্ত হচ্ছে না। ঘাতকের স্পিরিট নিয়ে অনেক আলাপ হতে পারে। অনেক আলাপ হয়েছে। হচ্ছে। সুপরিচিত চিন্তক এডওয়ার্ড সাঈদ ফিলিস্তিন প্রশ্নে সারাজীবন সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেছেন। জায়োনিজম ফরম দ্যা স্টেন্ড পয়েন্ট অব ইটস ভিকটিম নামের বিখ্যাত লেখায়, ফিলিস্তিনের উপর ইসরায়েলি এই বর্বরতাকে তিনি ‘দ্য ভিকটিমস অব ভিকটিমস’ বলে সাবস্ত করেছেন। ইউরোপের এন্টি-সেমিটিক বা ইহুদি-বিরোধিতা ও চরম দমনের ইতিহাস তাদেরকে তাড়া করে ফিরে বলে তারা পৃথিবীতে হিংস্রতার চূড়ান্ত করে চলেছে। ইহুদি গণহত্যার ‘মিথটা’ (মিথ অব হলোকাস্ট) এখন অন্য জাতিকে নিধনের স্পিরিট আকারে হাজির হয়েছে। আমরা এখানে কবিতার সূত্র ধরে কথা বলব।

নেতানিয়াহু যে কবির কবিতা কোট করে যুদ্ধের হাওয়ায় গতি এনেছেন সেই কবি ইসরায়েল জন্মের অনেক আগেই এই কবিতাটি লিখেছেন। ১৯০৩ সালে, যখন কবির তিরিশ বছর বয়স। রাশিয়ার উপশহরে ইহুদিদের উপর যে আক্রমণ হয়েছিল তার প্রেক্ষিতে ব্যাইলিক কবিতাটি লিখেছেন। কিন্তু এই কবির চেতনা ও স্বপ্নবিশ্বে এমন কিছু ছিল যা পরবর্তী সময়ে তাকে ইসরায়েরের কণ্ঠস্বর করে তুলেছে। তাকে জাতীয় কবির চেয়ে বেশি মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে সাম্প্রতিক কালে। যদিও বিশ্বসাহিত্যের মাঠে এই কবির কোনো বিরাট অবস্থানের কথা এতদিন কেউ কল্পনাও করে নি।

ব্যাইলিকের কবিতা কিভাবে এখনকার ‘ইভেন্টে’র সাথে যুক্ত হয়ে গণহত্যার জন্য গোটা জাতিকে অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হলো তার পাঠ নেওয়ার আগে কবি সম্পর্ক সংক্ষিপ্ত একটা ধারণা নেওয়া প্রয়োজন।

ব্যাইলিক ১৮৭৩ সালের ৯ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথম দিকের আধুনিক হিব্রু ভাষার ইহুদি কবি হিসেবে পরিচিত। তাকে আধুনিক হিব্রু কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবিদের অন্যতম মনে করা হয়। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে জাতীয় কবির মর্যাদা পান তিনি।


একটি জনগোষ্ঠীর চৈতন্য কেমন তা বুঝতে কবিতার চেয়ে তীক্ষ্ণ কোনো মাধ্যম আর নাই।


ব্যাইলিক ইউক্রেনের রাদি নামের গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ইউক্রেন তখন রাশিয়ার অংশ ছিল। সাত বছর বয়স থেকে তিনি কবিতা লিখেন। বাল্যেই ইহুদি ধর্মশিক্ষায়তনে তিনি পাঠ নেন। ইহুদি রাব্বিদের কাছে তিনি সাহিত্যের ও ইউরোপীয় শিল্পের ধারণা লাভ করেন। প্রথম যৌবনেই তিনি যোগ দেন ‘ইহুদি এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্টে’ ইহুদি জাগরণের সংকল্পে নিজেকে নিয়োজিত করেন। দুনিয়ার নানা প্রান্তে সফর করেন। হিব্রু ভাষার প্রচার-প্রসারে প্রণয়ন করেন পাঠ্যপুস্তক। জায়োনিজমকে জনপ্রিয় করতে তিনি নিরলস কাজ করেছেন। ৩ জুলাই ১৯৩৪ সালে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পরে বা জীবিতকালে এবং এখনও তাঁর কবিতার পাঠক ইহুদিদের বাইরে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় নি। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে তাকে জাতীয় কবির আসনে বসানো হয়। তার কবিতাকে কেন্দ্র করে একটি উগ্র-জায়নবাদী জেনারেশন গড়ে উঠছে। ইসরায়েলের এখকার কবিদের আদর্শ হলো ব্যাইলিক। তাঁর কবিতা বাচ্চাদের চকলেটের প্যাকেট থেকে শুরু করে জ্যামিতি বক্স ও লেখাতেও মুদ্রিত করা হয়। তিনি একাধারে, কবি, পণ্ডিত, শিশুসাহিত্যিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক, সংকলক ও কমেন্টেটর। তাঁর সাহিত্যকে অনুসরণ করে ইসরায়েলের নতুন প্রজন্ম বিকশিত হয়ে চলেছে। তাঁকে ইসরায়েলের শেক্সপিয়র মনে করা হয়। ২০১৩ সালে তার জন্মের ১৪০তম বছর পূর্তি উপলক্ষে দৈনিক ‘হারেজ’ একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে। সেখানে তাকে জাতীয় কবির চেয়ে বেশি কিছু বলে অখ্যায়িত করা হয়। ‘মোর দেন ন্যাশনাল পয়েট’ প্রবন্ধে স্যামুয়েল এভনারি তর্ক তুলেন যে, শুধুমাত্র ইসরায়েলি নয়, যে কোন ন্যাশনের আইডেনটিটি তৈরির ক্ষেত্রে ব্যাইলিক গাইডার বা নির্দশক হিশেবে ভুমিকা পালন করতে পারে। ‘ডায়াসপোরা’ বা উদ্বাস্তু যে কোনো জাতির কবির আদর্শ হতে পারেন তিনি। ফলে এই কবির পরিচয়কে ইসরায়েলের ‘জাতীয় কবি’ পরিচয়ের মধ্যে আটকে ফেলার পক্ষে নন স্যামুয়েল। তিনি ব্যাইলিকের ইহুদি-রেনেসাঁর গ্লোবাল আবেদনের দিকে নজর ফেরাতে নসিহত পেশ করেছেন। এই প্রবন্ধ পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে, একটি জনগোষ্ঠীর চৈতন্য কেমন তা বুঝতে কবিতার চেয়ে তীক্ষ্ণ কোনো মাধ্যম আর নাই।

ইসরায়েল ব্যাইলিকের সাহিত্যকর্ম ব্যাপকভাবে প্রচার করছে। অনলাইন ও অফলাইনে তার লেখা এখন সহজলভ্য। তাঁর রচনা একক বই ও সমগ্র আকারে নানা ভাবে নানা খণ্ডে প্রতিনিয়ত বাজারে আসছে। আশা করি এই অতি সংক্ষিপ্ত পরিচয় থেকে জাতীয় সাহিত্য প্রকল্পের সমস্যা এবং সম্ভাবনা ও রূপ কী হতে পারে তার একটা ধারণা আমরা করতে পারছি। এখন প্রশ্ন হলো, কবিতার দিক থেকে বিষয়টি কিভাবে বুঝব? আমাদের দেশের সাথে এর প্রাসঙ্গিকতাই-বা কী?

.

কবিতাপ্রকল্পহীন সংকল্প
.

কবির থাকে জীবন
তোমরা হিশেবে ধর কাল
আরও একটি সূর্যদোয়ের সাথে সাথে
আামদের উঠানে নামে আলু পোড়া সকাল

(রেজাউল করিম রনি, দাউ দাউ সুখ, কা বুকস প্রকাশনা)

ব্যাইলিকের কবিতার সূত্র ধরে ইসরায়েল রাষ্ট্রের যে দানবীয় চরিত্র আমরা দেখলাম তার জন্য কি কবিতা দায়ী? আমরা যে কবিতা নিয়ে শুরু করেছি তার মধ্যেই কি এই প্রতিশোধ-পরায়নতা নাই? আছে, পুরোমাত্রাই আছে। এর যুক্তি হতে পারে ১৯০৩ সালে রাশিয়াতে ইহুদি শিশু ও নারীদের উপর স্থানীয় নাগরিকরা যে ভায়াবহ অত্যাচার করেছিল তার প্রেক্ষিতে এমন আক্রোশের কবিতা খুবই স্বাভাবিক। হয়তো কবি প্রকৃত মনঃপীড়া থেকেই লিখেছেন। এবং তাঁর জাতিকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতে আহবান করেছেন। ফলে এই আহ্বানে অপরাধ ঘটার কথা না। কিন্তু অপরাধ তো ঘটে চলেছে। দুনিয়ার মানুষ অসহায়ের মতো দেখছে। ইহুদিরা জায়নবাদী আগ্রাসন করেই চলেছে। ফিলিস্তিন বিশেষ করে গাজাকে ‘ওপেন এয়ার প্রিজন’ বা খোলা কারাগার করে তুলেছে। ইসরায়েল মানবতাবাদ ও উদারনীতিবাদের সব সুযোগকে কাজে লাগিয়ে হয়ে উঠছে টেকনো-টেরর বা প্রযুক্তিময় সন্ত্রাসী। এবং এর সাথে তাদের জাতীয় কবির কবিতাও জনগণকে সন্ত্রাসের পক্ষে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এই কবিতায় তাহলে কী ঘটেছে? ব্যাইলিকের এই কবিতাকে নন্দনতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নানান প্রেক্ষিত ধরে ব্যাখ্যা করা যায়। মার্কসবাদী তরিকা দিয়ে সাহিত্য বিশ্লেষণের ঐতিহ্য এখন হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই কবিতাকে এই রকম ‘ইভেন্টে’ ব্যবহার করার ব্যাখ্যা তাইলে আমরা কিভাবে করব? শাসকের দোষ? এইটা বললে কি সমস্যা সমাধান হয়ে যায়? না। এই কবিতাটির (উপরে তর্জমা দেওয়া হয়েছে) দিকে ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখবেন, এইটা একটা ‘ফ্যানোমেনোলজিক্যাল’ বা প্রত্যক্ষকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। এই প্রত্যক্ষকরণ প্রক্রিয়াই পরবর্তী সময়ে যুক্তি ও কারণের ধারণা তৈয়ার করেছে। এই ধারার মহান দার্শনিক হলেন ইমানুয়েল কান্ট। বর্তমান সভ্যতাকে কানসিয়ানও বলা যায়। এর মধ্যেই নিহিত আছে নিজেকে আলোকিত ও উন্নত ভাবার উগ্রবাসনা। এটা মূলত এর আগেই শুরু হয়েছে দেকার্ত-এর সময় থেকে। রিজনকে কেন্দ্র করে সত্যে পৌঁছার যে তরিকা তাই পরে ‘রেনেসাঁর’ জন্ম দিয়েছে। এর সাথে গণতন্ত্র-মানবতাবাদ-উদারনীতিবাদ ও শিল্পকলার মানবিকীকরণ ইত্যাদি নানা বিষয় মিশেছে। ‘রেনেসাঁ’ ১৭ শতকে ইউরোপে এবং পরে নানা ভাবে নানা সময়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের বাবু সংস্কৃতিও এই রেনেসাঁর মধ্যে থেকে তৈরি হয়েছে। এই রেনেসাঁর প্রথম দিকের সবচেয়ে বড় কবি—মাইকেল ও ঠাকুর।


ব্যাইলিক রেনেসাঁর বাইনারি চালে পড়েছেন। অন্ধকারকে মন্দের প্রতীক আকারে দাঁড় করিয়ে তাঁর জনগোষ্ঠীকে বলছেন, অন্ধকার গ্রাস করে দুনিয়ার শিখরে চলে যাও।


এখন এই ‘রেনেসাঁ’ পরিমণ্ডলের মধ্যে যে কবি সত্যকে ধরতে চাইবেন, যা করবেন তা ব্যাইলিকের কবিতার মতো হয়ে উঠতে পারে। ব্যাইলিক তো তাও নিজে এই যন্ত্রণা ধারণ করেছেন তাঁর কমিউনিটির হয়ে। কিন্তু আধুনিক কবিরা তো বাইরে থেকে শব্দাস্ত্র দিয়ে তাতিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। বিপ্লবীপনার নামে যে কাব্যধারায় খাবি খান তার সাহিত্যিক নাম ‘পারফরমেন্স-পয়েট্রি’ বা দেখানোপনার কবিগিরি। এবং এরা কবিতায় এক ধরনের মর্দানির চর্চা করে থাকেন। সংক্ষেপে ব্যাইলিকের কবিতার ‘আইডিয়াল’ দিকটি ধরতে পারলে এই কবিতার দানবীয় ব্যবহারে অবাক হওয়ার কিছু নাই। কবি বাস্তব অবস্থার রূপায়ণের দায়িত্ব নিয়ে ভালগার মেরিরিয়াল অবস্থার খপ্পরে পড়েছেন। কবির যে ‘সত্য’ সাধনার কথা আমরা জানি তা তো উনি করতে পারলেন না। উনি সত্যকে ধরতে গেলেন বিশেষ একটা পরিস্থিতির মধ্যে। ব্যাইলিক রেনেসাঁর বাইনারি চালে পড়েছেন। অন্ধকারকে মন্দের প্রতীক আকারে দাঁড় করিয়ে তাঁর জনগোষ্ঠীকে বলছেন, অন্ধকার গ্রাস করে দুনিয়ার শিখরে চলে যাও। ইহুদি রেনেসাঁয় তাঁর এই স্বপ্ন অনেকখানি সত্যি হয়েছে। ফলে সবকিছুকে আলোময় মনে করলেই কল্যাণ আনতে পারবেন, এমন না। কার্তেসিয় বিচারের ধরনের মধ্যেই সন্ত্রাসের সম্ভাবনা আছে। এতে সব সময়ই নিজের ও নিজেদের অবস্থানকে চূড়ান্ত বলে ধরে নিয়ে তা যুক্তি দিয়ে ‘ইউনিভারসাল’ বা সর্বজনের করার চেষ্টা করা হয়। এবং মধ্যে পুরে দেওয়া হয় প্রোটেস্টান-মানবতাবাদ।

হোমিভাবা মনে করেন, ‘এই এনলাইটমেন্ট নিজের সার্বভৌমত্বকে বিশ্বময় প্রমাণ করার জন্য অন্যের সাথে পাল্লায় যায়। নিজের নিখুঁতত্ব প্রমাণের জন্য দ্বন্দ্বে জড়ায় এবং এভাবেই নিজের ধ্বংস তরান্বিত করে’। সেই দিক থেকে এই প্রচেষ্টাকে আত্মঘাতী বলা যায়। কাজেই ক্ষুদ্র পরিস্থিতি, জাতি বা বিশেষ সময়কে কবি যদি ‘চূড়ান্ত সত্য’ ধরে এগিয়ে যায় তাহলে কবির ভাগ্যে ব্যাইলিকের মতো মর্যাদা থাকলেও অন্যদের পরিণতি গাজার শিশুদের মতো হতে পারে। নিচে আমরা এই আলোচনায় আবার ফিরব। এই বিশেষ পরিস্থিতি বা ফেনোমেনা ঐ জনগোষ্ঠীর জীবনে ফিরে ফিরে আসলে সেই কবিতার ব্যবহার আর বুলেটের ব্যবহার একাকার হয়ে যেতেই পারে।

আমাদের এখানে একদল লোক সব সময়েই মনে করে এসেছেন শিল্পসাহিত্য হলো পবিত্র আর রাজনীতি হলো নোংরা। এরা সবসময় নিরপেক্ষতার নামে যা করেছেন তা রাজনীতির চেয়ে আরও নোংরা, এটা তারা আমলে নেয় নি। এরা সরাসরি গণবিরোধী ক্ষমতার গিনিপিকে পরিণত হয়েছে।

আমরা প্রায়ই শুনি আমাদের কবিরা (আল মাহমুদ বারবার) বলেন, কবির একটা দেশ লাগে। পোস্ট কলোনিয়াল বা উত্তর-উপনিবেশি অবস্থা যখন বিশুদ্ধ কল্পনা ছাড়া আর কিছু না তখন ‘দেশ’ কথাটার মনে কী? আধুনিক পুঁজিবাদী অবস্থার মধ্যে আমরা কি কোনোভাবেই কলোনিয়াল বা উপনিবেশি অবস্থা পার করে আসতে পেরেছি? উত্তর হলো, না। এখনকার কবিতার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করব না। কারণ, আমি মনে করি, কবিতার আলোচনা কোনোভাবেই শুধুমাত্র নন্দনতাত্ত্বিক বিচার-বিবেচনা মাত্র নয়। অন্যদিকে নন্দনতত্ত্বের যে রাজনীতি এতদিন দেখে এসেছি তা কবিতাকে একটি বিশেষ ‘গোষ্ঠী’ বা শ্রেণির আদলে তৈরি করে নেবার দাবি ছাড়া আর কিছু না। মানে, বাংলা কবিতার যে নন্দনতাত্ত্বিক বিচার তা হয় বৈদিক নতুবা সংস্কৃত। আর এখন যা চলছে, তা উনিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যের যে নন্দনতাত্ত্বিক নীতি, তার আলোকেই। সব কবি এই মিটারের মধ্যে পড়বে না। আমাদের কবিরা রাজনীতি অপছন্দ করলেও কমবেশি নন্দনতত্ত্বের রাজনীতি ফলিয়ে থাকেন। কবিতা বা সাহিত্যের এই সব নন্দনতাত্ত্বিক দারোগাগিরি খুবই কৌতুককর। মাস্টাররা তো বটেই, কবিরাও এটা নিয়ে হাঙ্গামা করেন! তার পরও কবিতার আলোচনা নানা দিক থেকে, নানাভাবে করতে পারবেন। এর মার্কসবাদী পাঠ দিয়ে তাক লাগিয়ে দিতে পারবেন। দর্শন ও সমাজতাত্ত্বিক দিক বা এর চিত্রকল্প বা আরও নানা কিছু নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু কবিতা যেই কারণে ‘কবিতা’ সেটা সবসময়েই আলোচনার বাইরেই হাজির থাকে। কবিতাই ‘কবিতা’কে ধারণ করে। করতে পারে। ফলে আমি কবিতার আলোচনা নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী না। বিশেষ করে হাইডেগারের আলোচনার পরে কবিতা নিয়া আলাপের যে অভিমুখ তৈয়ার হয়েছে সে নিরিখে বাংলাদেশে কবিতা নিয়া এখনও আলাপ শুরু হয় নি বলে ধরা যায়।

আমরা সহজেই বুঝি পোস্টকলোনিয়াল বা উত্তর-উপনিবেশি লড়াই একটা হুজুগ ছাড়া আর কিছু না। আমাদের শিক্ষা ও নিজেদের বেড়ে উঠার মধ্য দিয়ে আমরা এক একজন ‘অপর’ মানুষ হয়ে বড় হই। চরম ব্যক্তিতান্ত্রিক, স্বার্থভোগী বিচ্ছিন্ন মানুষ হবার সাধনাকে আমরা উন্নতি ও আধুনিকতায় উত্তরণ বলে মনে করি। এই অবস্থায় পৌঁছার জন্য ঘরে-বাইরে প্রতিযোগিতা। ভাইয়ে ভাইয়ে খুনাখুনি। সমাজের এই চেহারা নেওয়ার আগেই কবিতায় এটা হাজির হয়েছে। ৩০ তো বটেই বাংলাদেশে ৫০-এর পর থেকেই এখানকার কবিরা দলবাজি আর মাস্তানির চর্চা শুরু করেছে। এখনও চলছে। রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সাথে কবির ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে কথা বলছি না। আপনি যদি খেয়াল করেন, দেখবেন, বাংলাদেশের কবিরা মধ্যবিত্ত গণ্ডিতে খ্যাতি-খাতির ও পরিচিত হওয়ার জন্য ‘পশুর লড়াই’ করে চলেছে। যা তাদের অল্প দিনেই ক্লান্ত করে ফেলে। কে কতটা আধুনিক? কে বিজ্ঞানবাদী? কে ধর্মবাদী? এইসব ফালতু আলাপই কবিতার আলাপ হয়ে আছে! জীবনানন্দ যদিও বলেছেন, ‘কবি হলো কালের বিচিত্র সত্তা’। আধুনিক কবিতার দিন গত হয়েছে অনেক আগেই। এখন দশকের হিশেবে নিজের একটা জায়গা নিয়ে আত্মতৃপ্তি খোঁজার চেষ্টা করেন কবিকুল। এগুলা পুরানা আলোচনা। আমরা কথা বলছি কবিতার প্রকল্প নিয়ে। কবিতার কোনো প্রকল্প নাই। থাকে না। ফাঁকে প্রশ্ন করতে পারেন, যেটা নিয়ে এত কথা হচ্ছে সেই ‘কবিতা’ জিনিসটা কী? এটা নিয়ে সবসময়ই আলোচনা জমে ওঠে। মতের আর শেষ নাই। এই প্রশ্ন যদি বিনয় মজুমদারকে করেন তিনি উত্তর দিবেন:

‘কবিতা কী তা বলা অসম্ভব। কেন? বলুন তো আপনি কী?’

তার পরে উনি বলবেন, ‘দেখা যাবে নিজেকে নিয়ে আপনি অনেক কিছুই জানেন না। তাহলে কবিতা কী তাও আপনার পক্ষে জানা অসম্ভব।’

আপাতত এতটুকুই।

আপনি দেখবেন, যখন কোনো কিছুকে জাতীয়, ঐতিহ্যময়, ঐতিহাসিক বলে পূজা দেওয়ার প্রচলন হয় তখন একটা হায়ারারকি বা ভারসাম্যহীনতার অবস্থা তৈয়ার হয়। এটা ভাষা বা কোনো জাতীয় চরিত্র বা নেতাকে কেন্দ্র করেও তৈরি হতে পারে। দেরিদা যেটা বলেন লগোসেন্ট্রিসিজম বা এক ধরনের পৌত্তলিকতা। এর নেচারটা যে কোনো সময় ফ্যাসিবাদের দিকে মোড় নিতে পারে। আমাদের আশপাশে তাকালে বিষয়টি আরও সহজে পরিষ্কার হবে। প্রচলিত যে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা, এর মধ্যেই যখন কবি নিজেকে মহান বা ক্লাসিক করার জন্য পারফর্ম করতে থাকে তখন এর চেয়ে নিকৃষ্ট জিনিশ আর হতে পারে না। এইসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই না। যে কথাটা বলার জন্য এই ভূমিকা করলাম তার দিকে আসি।

ব্যাইলিক যখন কবিতা লিখেছেন তখন তো তাঁর কোনো দেশ ছিল না। তখন সারা ইউরোপ জুড়ে ইহুদিরা মার খাচ্ছেন। ইহুদি-জাগরণের জোয়ার চলছে। আর এই জোয়ারে আগুনের ঢেউ হিশেবে হাজির হয়েছেন ব্যাইলিক। কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি এমন এক জায়োনিস্ট জাতীয় গৌরব প্রচার করে গেছেন যে সারা দুনিয়ার ইহুদি-জাগরণে এখন বুলেটের আগে আগে ছুটছে। এখন এই কবি কি ‘বাজে’ কবি? এই কবি মিসটেকটা কী করেছেন? যেহেতু আমরা প্যারালাল আলোচনা করছি তাই প্রাসঙ্গিকভাবে মিলিয়ে নিতে বলব কবি শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটা। স্বাধীনতা মানে:

  • শহীদ মিনার উজ্জ্বল সভা
  • পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল
  • ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি
  • মুক্তিসেনার চোখের ঝিলিক
  • তরুণ শিক্ষার্থীর সতেজ ভাষণ…ইত্যাদি ইত্যাদি….
image_571_80751
শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর ১৯২৯—১৭ আগস্ট ২০০৬)

জনগণের ভোটের তোয়াক্কা না করে গণতন্ত্র নামে প্রতারণা করে ক্ষমতায় আসা দলের জাতীয়তাবাদী-ফ্যাসিবাদী যে টিভি-বিজ্ঞাপন, তার সাথে এই কবিতার ইমেজগুলা একবার মিলিয়ে পাঠ করেন। শামসুর রাহমানকে আমাদের প্রধান কবি বানাবান জন্য যে সৈনিকরা লড়াই করেছেন তাঁরা এখনও মাঠে আছেন। শুধু ব্যাইলিকের দোষ হবে কেন?

অবশ্যই যারা বিজ্ঞাপনটা বানাইছে তারা যে এই কবিতাটা আগে পড়ে নিছে এমনটি মনে করার কোনো কারণ নাই। যে কোনো জনগোষ্ঠীর বর্তমান অবস্থা আগের কোনো না কোনো কবিতার মতোই। এই জন্যই বলা হয়, ‘নেতার আগে জন্ম নেয় কবি’।

কবিরা এটা বোঝেন। কবিরা বোঝার পরেও হীনম্মন্যের মতো আচরণ করেন কেন তা আমি বুঝতে পারি না। একটা কারণ হতে পারে ক্লাসিক নিয়ে একটা ‘ইলিউশন’ বা বিভ্রম আছে, বা নিজেরে অমর করার ঘোড়া রোগে ভোগেন। ক্লাসিক বলে কোনো কিছু নাই। যা আছে তার নাম ‘কনটেম্পোরারি’। এটার একটা বাংলা আছে—সমসাময়িকতা। এর মানে কী? কনটেম্পোরারি মানে কী?


কবিতা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ মাত্র না। হৃদয়বৃত্তিক। বিনয় বলছেন, ‘প্রতিভা চিন্তা করার বিশেষ ধরন—তা আবার জন্মগত, জন্মের সময় থেকে এক বিশেষ পদ্ধতিতে চিন্তা করে একজন কবি।


ইতালির বিখ্যাত দার্শনিক জর্জিয়ন আগামবেন বলছেন, কনটেম্পোরারি মানে হলো ‘আনটাইমলি’। এখানে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারলে ভালো হতো। সংক্ষেপে বলি:

কনটেম্পোরারিনেস হলো এমন জিনিশ—যা অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ দ্বারা বিভাজিত নয়। যখন আপনি কোনো কবিতা পড়েন, সেটা যে সময়েরই হোক, আপনি তাঁকে ছুঁয়ে যেতে পারেন কি না? ঐ কবিতা হতে পারে এক হাজার বছর আগের লেখা। কোনো সমস্যা নাই, ঐটা কনটেম্পোরারি। রিডিং বা পাঠের সময়েও মোমেন্ট বা মুহূর্ত তৈয়ার হয়। কবিতাটার মোমেন্ট আর পাঠকের মোমেন্ট এক হয়ে যায়। পাঠ করা মাত্রই হাজির হয়। তা ১০ হাজার বছরের পুরানা হলেও তা উদ্ভাসিত হতে পারে। এটা কনটেম্পোরারি। কনটেম্পোরারি মানে কোনো সরলরৈখিক কাল-বিভাজন নয়। ফলে নিজেকে ক্লাসিক করার এই যে হাস্যকর প্রচেষ্টা, এর কোনো দরকার নাই। ব্যাইলিক যেমন কনটেম্পোরারি তেমনি প্রাচীন দোহাও কনটেম্পোরারি। আলাদা করে কালজয়ী কবিতা লেখার চেষ্টা করা অসুস্থতার লক্ষণ। প্রতিভাবান লোক এই চেষ্টা করে না। আবার বিনয় থেকে শুনি—বিনয় মজুমদার বলছেন, ‘কালোত্তীর্ণ নয় কালোপয়োগী লেখাই অমর’। যাদের প্রতিভা আছে তারা যাই লিখুক, যে ভঙ্গিতেই লিখুক তাই অমর। প্রতিভা জিনিশটা কী? এটা কি বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো ব্যাপার? ‘বুদ্ধিজীবী কবি’দের খুশি হবার কারণ নাই। কবিতা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ মাত্র না। হৃদয়বৃত্তিক। বিনয় বলছেন, ‘প্রতিভা চিন্তা করার বিশেষ ধরন—তা আবার জন্মগত, জন্মের সময় থেকে এক বিশেষ পদ্ধতিতে চিন্তা করে একজন কবি। এই ধরনটাই প্রতিভা।’ এখানে সংক্ষেপে বলে রাখি, ক্লাসিক ধারণাকে কেন আমি কনটেম্পোরারি ধারণা দিয়ে রিপ্লেস করতে বলছি। স্মরণে রাখছি, চার্লস অগাস্টিন সাঁত বভ-এর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ক্লাসিক কী’? ১৮৫০ সালে তিনি ফরাশি দেশে এই প্রবন্ধ লিখেন। তখন ইউরোপীয় রেনেসাঁর টনটনা কাল। এই প্রবন্ধে তিনি বলছেন, ‘”সমাজের উচ্চ শ্রেণির অর্থে” ক্লাসিক কথাটা প্রথম ব্যবহার করেছিলেন রোমানরা। সকল শ্রেণির লোকের অধিকার ছিল না এই নামে।’ ক্লাসিক হওয়া নিয়ে রুমানদের সাথে গ্রিসদের ঝগড়াও ছিল। বভ আরও বলেন, ‘ক্লাসিকের ধারণার মধ্যেই এমন কিছু আছে যাতে বুঝায়, যার ধারাবাহিকতা আছে, যা দ্বারা ঐতিহ্য সৃষ্টি হয় যা অন্যের মধ্যে সংক্রমিত হয়। নজ প্রজন্ম যা থেকে প্রেরণা নেয়।’

ফলে ক্লাসিক ধারণার মধ্যে গোলমাল আছে। এটা একটা কালচারাল এলিটিজম তৈরি করে।

শামসুর রাহমান বা ব্যাইলিক এর মতো কবি জাতীয় চেতনা ও ঐতিহ্যকে পুষ্ট করতে যেয়ে ক্ষমতাকে ফ্যাসিবাদের দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করেন। এটা কি কবিতার কাজ? আমি শান্তিবাদীদের মতো বলব না, কবিতা সবসময় ফুল আর চন্দন নিয়ে থাকবে। কবিতা এ.কে ৪৭ নিয়েও থাকতে পারে।

বলব না ব্যাইলিক বা শামসুর রাহমান পরিকল্পনা করে এমন কবিতা লিখেছেন যেন পরে অবৈধ ক্ষমতাধরদের কাজে লাগে। তাঁরা হয়তো এটা তাঁদের আন্তরিকতা থেকে করেছেন বা কবিমনের উদ্ভাসন থেকে করেছেন। নিষ্পাপভাবে যা তাঁদেরকে আন্দোলিত করেছে তার প্রেরণাতেই করেছেন। কল্পনা প্রতিভা বা জীবনানন্দ যাকে ভাব-প্রতিভা বলেছেন তা দিয়ে কবি এমনটাই ভেবেছেন হয়তো। আমাদের এখনকার কবিরা নিজের সব অনুভূতি, কামনা বাসনা, সুখ-দুঃখ লিখে সাহিত্যপাতা ভরে ফেলছে। এর কিছু কিছুতে পড়ার আনন্দও আছে। কিন্তু কবি তার সময়কে কি এই হাইটেকনো প্রতিভার বাইরে নিয়ে যেতে পেরেছে? আশিস নন্দী যেমন বলেন, ‘টেকনোলজি বা প্রযুক্তি জনগণের সংস্কৃতির দিকে না তাকিয়েও একটা ট্র্যাডিশন তৈরি করে।’ বলাই বাহুল্য এইটা পণ্য-ট্রেডিশন। মিডিয়া এখন আর কোনো সমস্যা না। দুরু দুরু বুকে সাহিত্য সম্পাদকের কাছে নতুন কবির আর যেতে হয় না। ছাপা-ছাপির দিন শেষ। ফেসবুকে কবিতা দিলে বন্ধুরা ১০ মিনিটের মধ্যে আমারে দেশের সেরা কবি বানিয়ে দিবে। উপনিবেশ ইংরেজ থেকে কলকাতা হয়ে বাংলায় এসে এখন চরম ভোগী এক পণ্যব্যবস্থার মধ্যে আমাদের ফেলে দিয়েছে। ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে তৈরি হয়েছে চরম নার্সিসাস বা আত্মরতিমগ্ন এক প্রজন্ম। ফলে কবির ব্যক্তিগত কল্পনা মানেই সেটা মহান হয়ে যাবে এমন না। কবি কালের সাথে সম্পর্ক করতে পেরেছে কিনা সেটা তো কবিতায় ধরা পড়ে। মিডিয়া, বন্ধু-বান্ধবী আর দূর থেকে ভালোলাগা গ্রামের কথা ভেবে বা বইয়ের তত্ত্ব বা ডিকশনারি ঘেঁটে কবিতা লিখে খাতা ভরে ফেলেন, তাইলে আপনার আবেগের অপমান হবে এমনটা বলছি না। এই কবিতা না পড়েও আমরা থাকতে পারব। যে কবি ‘সত্য’ হয়ে ওঠে তাকে উপেক্ষা করে থাকা যায় না। কেউ উপেক্ষা করে না। গোলমাল হয় এই ‘সত্য’ সাধনা নিয়ে। বাংলাদেশের সত্য, বাংলা ভাষার সত্য, আর অন্য জয়গা বা অন্য ভূমির সত্য কি এক? সত্য নিয়ে দার্শনিকরা কম আলোচনা করে নাই। আমরা কবিতা নিয়ে হাইডেগারের আলোচনা দেখব পরে। সক্রেটিস বলেছিল, সত্য এই কারণে ‘সত্য’ না যে আমরা তাকে সত্য বলে মানি বা সত্য খুব ভালো। মহৎ একটা ব্যাপার, তাই সত্য খুব গৌরবের বিষয়, এমনও না। সত্য নিজগুণেই ‘সত্য’। ট্রুথ ইজ ট্রুথ বিকজ অব এসেন্স অব ট্রুথ।

কবিতা কিভাবে গণহত্যার কাঁচামালে পরিণত হলো? কবি তাইলে কি সত্যের সাধনা করলেন? তাইলে কি কবিতার সবকিছু কবির হাতে থাকে না? আমি কবিতার ক্ষেত্রে দেরিদীয় ডিকনট্রাকশনের কথা বলব না। দেরিদাও কবিতার প্রশ্নে এমন প্রস্তাব করবেন না। কবিতা টেকচুয়ালিটি বা কিতাবি স্বভাব ঝেড়ে ফেলে হাজির হতে পারে, ফলে ডিকসট্রাকশনের প্রশ্ন নাই। তাইলে কি সমস্যা তৈরি হলো যে, কবিতা দানবীয় রূপ নিয়ে হাজির হলো?

বাংলাদেশের কবিদের মোটাদাগে প্রায় সবাই নিজেরা রাষ্ট্রীয় বা কোনো না কোনো হেরিটেজের অংশ হতে চায়! ব্যক্তিগত প্রতিভা ও ঐতিহ্য বা ভাষা এবং এর সাথে গণহত্যার সম্পর্ক নিয়ে কথা হতে পারে। আজ আপনি ‘মূলধারা’ বা অবহেলিত কোনো ধারার জন্য যদি নিজের কাব্যপ্রতিভা নিয়োগ করেন তাইলে আপনার জন্য দুইটা জিনিস অপেক্ষা করছে। আপনি মূলধারার স্রোতে নিজেরে নিয়োগ করলে নগদ ফিডব্যাক পাবেন। আর অবহেলিত ধারার সাথে থাকলে বীরের মর্যাদা পাবেন কোনো একদিন—ব্যাইলিকের মতো। দুইটাই কমবেশি জনগণকে দমন করে, হত্যার রাজনীতি করে টিকে থাকে। আপনি কোন দিকে যাবেন? বাংলাদেশে যেটা হয়, এই তথাকথিত ‘মূলধারা’য় নিজেরে যোগ্য প্রমাণ করার জন্য পশুর কামাকামড়ি শুরু হয়। দলবাজি করা, অমুকের ইজ্জত নষ্ট করা আর অমুকের ইজ্জত তৈরি করা—এই খেলায়ই চলে। হাস্যকর। এগুলার সাথে কবির সম্পর্ক কী? এই অবস্থার মধ্যে কবি হিশেবে হাজির হবেন আর বলবেন, লোকে তো এখন কবিতা পড়ে না। কবিতা আসলে কম লোকই পড়ে। উচ্চাঙ্গের সাহিত্য তো সবাই বোঝে না! কবিদের আত্মরতি এমন পর্যায়ে গেছে, ঢাকাতে কিছু পপ কবিরও দেখা পাওয়া যাচ্ছে এখন। বাংলাদেশের কবিতা মোটামুটি ফ্যাসিবাদী ধারারই চর্চা করেছে। এর মধ্যে কয়েকজন বুদ্ধিজীবিতা বা আগাম চিন্তার চকচকি দিয়ে কবি হওয়ার জন্য কবিতায় সব তত্ত্ব নিয়ে কবিতাকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে, এখন কবিতা পড়লে লোকের কষা হয়। যুগে যুগে কি কবিরা ব্যাইলিক হওয়ার সাধনা করে? বাংলাদেশে কবি বা চিন্তক সবাই দেখি ‘রেনেসাঁ-পুরুষ’ হইতে চায়! এই জন্য কিছু অনুসারীও তৈরি করে কেউ কেউ। এটা কি কবিতার কাজ? কবিতা তো তাইলে যুদ্ধই ডেকে আনবে! জাতি বা গোত্র-হত্যার হাতিয়ার হয়ে উঠবে কবিতা! প্রশ্ন রেখেছিলাম কী কারণে এই অবস্থা তৈয়ার হলো? এর উত্তর তালাশ করতে করতে লেখা শেষ করব।

কবির কাজ ‘সত্য’কে ধরা বা সাধনা করা। ধরা মানে ভাষায় ধরা—এমনটা মনে করেন অনেক চিন্তক। ভাষা মানে একই সাথে ‘কমিটমেন্ট’। কিসের কমিটমেন্ট? আপনি যখন ভাষায় কিছু প্রকাশ করেন তখন ভাষার সাথে আপনার একটা কমিটমেন্টের সম্পর্ক তৈরি হয়। এখন এই ভাষা তো জাতিগৌরব ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ তৈরি করতে পারে। তাইলে কবি কি ভাষার ফাঁপরে পড়বে? কবি কখনও ভাষার পূজারী হবে না। শব্দ সাধনা করা কবির কাজ না। কবি ভাষা শাসন করে। ভাষা সত্য-কবিকে আশ্রয় করে। ফলে এদের মধ্যে কমিটমেন্টের লেবেলটা খুব শক্ত হয়ে থাকে। তবে ভাষায় শুধু ধরা হয় না, অনেক কিছু অধরাও থাকে। কবিতা কেন সম্ভব হয়েছে? কবিতা সম্ভব হয়েছে কারণ ভাষাতে আমরা এমন কিছু হাজির করতে পারি যা ভাষায় নেই। ফলে ভাষার মধ্যে শুধু প্রকাশিতই হয় না। ভাষাতে লুকানোর কাজটাও চলে। দেরিদা যেটা বলেন, ‘ম্যাটাফিজিক্স অব প্রেজেন্স’, এইটা ভাষায় সবচেয়ে ভালোভাবে ঘটে। ফলে ভাষাকে বস্তুময় ভেবে আলোচনার কোনো মানে হয় না। যা হোক, আমাদের প্রশ্ন ছিল তাইলে কবির কাজ কী? ব্যাইলিক বা শামসুর রাহমানের (কথাটা খুব রেটরিক্যালি বলছি না) মতো ফাঁপরে পড়া ছাড়া কবির আর কোনো পথ আছে কী? এখানে সবার সুবিধার জন্য বলি, পৃথিবীতে ‘আধুনিক’ ও রেনেসাঁ প্রকল্পের যুগের কবি ছাড়া আর কোনো কবি পাবেন না যার এমন দানবীয় প্রত্যার্বতন সম্ভব হয়েছে। আমাদের কাব্যধারার কথা মনে করতে পারেন। হুমায়ূন কবীরের বাংলার কাব্য খুলে দেখতে পারেন। বাংলা কবিতা বিকশিতই হয়েছে আর্য এলিটিজমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। দোহা কাব্যের নজির টেনে হুমায়ূন কবীরের বরাতে আরও জানা যাবে, বৌদ্ধ ধারা, বৈষ্ণব কাব্য হয়ে মুসলমানদের ও ইসলামের সাথে এই কাব্যধারার যে সংযোগ তা সব রকম ঔপনিবেশিকতাকে অতিক্রম করেই বিকশিত হয়েছে। এখন আধুনিকতার কালে এসেই বাংলা কবিতা আটকা পড়েছে। এর আগের কবিরাও যথেষ্ট ‘বিপ্লবী’ কবিতা লিখেছেন, কিন্তু সেটা ব্যাইলিক বা শামসুর রাহমান এর পরিণতি বরণ করে নি।


সত্যকে আবিষ্কারের সমস্যা দর্শন ও কবিতার কমন সমস্যা। কিন্তু দুইটার পদ্ধতি এক না। মাঝে মাঝে দার্শনিকরা কবিদের উপর মাস্তানি করেছেন। এখনও করতে চান, কিন্তু সেটা অনেক সময় হয়ে যায় হিতে বিপরীত।


এটা বাস্তবিক কারণেই সম্ভব হবে না। কারণ, এর আগের কবিরা জাতীয় বা গোত্রসমস্যার শিকারে পরিণত হন নি। এই সমস্যায় নিপতিত হওয়ার কারণ হলো, কবির সত্য সাধনা সম্পর্কে ধারণা না থাকা। আপনারাও হয়তো একমত হবেন—কবির কাজ সত্য সাধনা করা। কিন্তু এই সত্য কি পরে গণহত্যাকারী হয়ে উঠতে পারে? উত্তর হলো, পারে। তার মানে সত্য মানেই রাবীন্দ্রিক সত্য না। মানে সব সত্যই সুন্দর না। কিন্তু প্রকৃত কবি এখানে থামবেন না। কারণ যেই সত্য জাতি নিধন করে, গোত্রহত্যায় প্রেরণা জোগায় তা যদি সত্য হয় তাহলে সেটা সত্যের পারভার্সন মাত্র। কারণ সত্য কোনো স্থান-কালের ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। কবি এই সত্যের সাধনা না করে চোখের সামনের সহজ সরল বা নিজের মনোবাসনার তাগিদে কবিতা লিখলে, সেই কবিতা পড়ে আমরা আনন্দ বা আন্দোলিত হতে পারি। সেই কবিতা জনগোষ্ঠীরও কাজে লাগতে পারে। সেই কবিতা দিয়ে ফ্যাসিবাদী ক্ষমতাও নিজেকে ঐতিহ্যময় করে গড়ে তুলতে পারে, তবে এটা কবির সাধনা না। ফলে ক্ষুদ্র কালের হিশেবে বা জনগোষ্ঠীর কালচারাল এজেন্ট হিশেবে যে কবি নিজের ভূমিকা পালনে সদা তৎপর তাকে বলতে হবে, সে ডেঞ্জার পয়েন্টে আছে। তাঁর অক্ষর শিশুর লাশ ফেলার জন্য কাজে লেগে যেতে পারে। ‘সত্য’কে কবি কিভাবে ধরবে সেই আলোচনাটা আজ নতুন হচ্ছে না। বাংলা কবিতায় তিরিশি প্রভাবের বেশ ক্রিটিক হয়েছে। এইসব ক্রিটিক কবিতাকে ‘কবিতা’র দিকে নিয়ে যেতে পারে নি। পারবে না। এটা কবিদের কাজ। আমাদের কাব্য-আলোচনায় তো বটেই, পশ্চিমা জগতেও কাব্য-আলোচনায় টিএস এলিয়টকে খুব প্রবাদপুরুষ হিশেবে ধরা হয়। এলিয়টের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ট্র্যাডিশন অ্যান্ড দি ইন্ডিভিজুয়াল ট্যালেন্ট’  দ্বারা শুধু তিরিশিরা না, বাম-ডান সব পন্থি কবিই ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। এবং পরে এই প্রভাব জবরদস্তির রূপ নিয়েছে। বিখ্যাত পণ্ডিত ও কবি, ধর্মগুরু শ্রী অরবিন্দ ১৯৫৩ সালে লিখেন দ্য ফিউচার পয়েট্রি—যেটা ১৯৯৫ সালে ড. রমেশ্বর শ’ বাংলায় অনুবাদ করেছেন ভবিষ্যতের কবিতা নামে। দুইটা বই এক সাথে পড়ে দেখেন, অবাক হয়ে যাবেন। এলিয়ট যা বলছেন অরবিন্দও হুবহু তাই বলছেন কবি ও কবিতা নিয়ে (অন্য প্রসঙ্গে ভিন্নতা আছে)। এলিয়ট যেসব ধারণা দিয়েছেন, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিপ্রতিভাকে কেন্দ্র করে তা পশ্চিমে অনেক আগেই বাতিল হয়ে গেছে। কবি জীবনে ‘ঐতিহ্যের’ এই গুরুত্বের সবাক প্রচার করেছেন এলিয়ট ও অরবিন্দ। এই ঐতিহ্যসাধনা, বলাই বাহুল্য, খুবই প্রবলেমেটিক ধারণা। তারাও বলেছেন কবিকে সত্য-সাধক হতে হবে। তাদের সত্য হলো ‘রেনেসাঁর’ সত্য। যেই সত্য শুধু নিজ জনগোষ্ঠীর গৌরবেই টিকে থাকতে পারে। অন্যকে খতম করতে দ্বিধা করে না। এবং প্রস্তাব করেছেন ঐতিহ্য! খুবই কৌতুককর। অন্য দিকে প্রোটেস্টান বিপ্লবের ফলে যে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদিতার হুজুগ শুরু হলো তাই এখন নার্সিসিজম নামে পরিচিত। এই আত্মবিকারই পরে কবিতার নামে ইন্ডিভিজ্যুয়াল ট্যালেন্ট আকারে জারি হলো। তোমাকে সবার থেকে আলাদা কবিতা লিখে অমর হয়ে থাকতে হবে টাইপের উম্মাদকালই হলো এলিয়টিয় আধুনিকতার অবদান। আরও নানা বিকার—সিম্বলিজম, অ্যাবস্ট্রাক্ট পয়েট্টি—হাজি-জাবি কত কী যে জারি হলো। কিন্তু কবিতার অবস্থা দিনকে-দিন হয়েছে দুর্বল। কবিতা আর ‘কনটেম্পোরারি’ হতে পারছে না। কবিতা হয়ে যাচ্ছে আধুনিক। আর এরাই নন্দনতত্ত্ব বা ব্যাকরণ দিয়ে ঠিক করে দিচ্ছে কোনটা কোন স্তরের সাহিত্য বা শিল্প। কোনটা ‘লোকশিল্প’ ‘লোক-কবিতা’, আর কোনটা তাঁদের কাছে স্ট্যান্ডার্ড বা মানসম্পন্ন। এইসব ক্রিটিক আমরা কমবেশি এতদিনে জানি। তবে অরবিন্দ এটা বুঝতেন যে কবির সত্য আর দার্শনিকের সত্য এক নয়। ভবিষ্যতের কবিতায় তিনি লিখেন, ‘ট্রুথ অব পয়েট্রি ইজ নট ট্রুথ অব ফিলোসফি’।

সত্যকে আবিষ্কারের সমস্যা দর্শন ও কবিতার কমন সমস্যা। কিন্তু দুইটার পদ্ধতি এক না। মাঝে মাঝে দার্শনিকরা কবিদের উপর মাস্তানি করেছেন। এখনও করতে চান, কিন্তু সেটা অনেক সময় হয়ে যায় হিতে বিপরীত। হয়তো দার্শনিক যেটা ধরতে চাচ্ছেন কবি সেখানে গিয়ে বসে আছেন চুপচাপ। নিৎসে যেমন বলেছেন, ‘পয়েটস অ্যাজ এলিভেটরস অব লাইফ’। কবি জীবনের যন্ত্রণা নিরাময় করেন। কবি সময়ের সাথে কনসেপ্টের ব্রিজ নির্মাণ করেন। কবিতা নিয়ে বাক্যালাপের শেষ নাই, আমাদের এখনকার আলোচনাও কবিতাকে সামনে রেখে—যার আলোচনা আমাদের সবচেয়ে কাজে লাগবে তিনি বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক হাইদেগার। বইটার নাম, পয়েট্রি-ল্যাঙ্গুয়েজ-ট্রুথ। এইসব আলোচনায় সব ইংরেজি বা পশ্চিমি ধারণার ব্যবহার দেখে এমনটা মনে করার কারণ নাই। এইসব চিন্তা খালি পশ্চিমা জগতেই হয় না, আমাদের গ্রামে পথেঘাটেও এসব আলোচনা হয়। কিন্তু যে ভাষা ও পদ্ধতিতে হয় তা আমরা রপ্ত করতে পারি না, অথবা গুরুত্ব দেই নাই। চিন্তার কোনো দেশ-কাল-পাত্র নাই। সেই দিক থেকে কোন দেশে কে চিন্তা করল তা দেখার বিষয় না। হাইদেগার মনে করেন, ‘জেনুইন থিংকার বাই নেচার পয়েট্রিক’। বইয়ের প্রথম প্রবন্ধ, ‘থিংকার অ্যাজ এ পয়েট’। হাইদেগার মনে করেন:

Poetry—together with the language and thinking that belong to it and are identical with it as essential poetry, it is the creative source of the humanness of the dwelling life of man. Without the poetic element in our own being, and without our poets and their great poetry, we would be brutes, or what is worse and what we are most like today: vicious automata of self-will.

আমরা প্রায়ই শুনি শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ ঘটে গেছে। মার্কসবাদীরা এই আলাপে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। পণ্য সভ্যতার এই চূড়ান্ত পরিণতির কাছে শিল্পকলার মানবিকতা হারায়ে গেছে। ফলে এই কালের পরিমণ্ডলে যে কবি ট্র্যাডিশন ও নিজেকে আবিষ্কারের জন্য কবিতা চর্চা করবে তার কবিতা মানবিকতার সংঙ্কটমুক্ত হতে পারে না। কারণ খোদ মানবিকতার ধরনটাই গণহত্যার অস্ত্র হয়ে উঠেছে। এই সভ্যতা যেভাবে প্রোটেস্টান নীতির উপর দাঁড়িয়ে মানবিকতার চর্চা করে তা অমানবিকতার চূড়ান্ত রূপ ছাড়া আর কিছু না। এই অবস্থায় আমাদের মনে রাখতে হবে প্রত্যেক ডি-কলোনিয়াল (আমরা পোস্ট কলোনিয়াল অবস্থাকে কল্পনা বলেছি) আরচণ বা লক্ষণ হলো ভায়োলেন্ট ফেনোমেনন (ফ্রানজ ফেনন)। ফলে কবি যদি প্রবহমান ইতিহাসের মধ্যেআইডেনটিটি তৈরি করতে চেষ্টা করে, সেটা হোক নিজ বা কমিউনিটির আত্মপরিচয়, তা হলে ভায়োলেন্সের সাথে তাঁর সম্পর্কটা এড়ানোর কোনো উপায় নাই। আইডেনটিটির সাথে ভায়োলেন্সের সম্পর্ক এখন সবাই মানে। এই ভায়োলেন্স যে সব সময় খারাপ এমন না। এটা অনেক সময় ন্যায়যুদ্ধ আকারেও ঘটতে পারে। তার জন্য চাই কবির সত্যকে স্থান-কালের বা বিশেষ জনগোষ্ঠীর বাইরেও সত্য হয়ে উঠার সাধনা। বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প আর কবিতার প্রকল্প এক না, যদিও এরা ভালো প্রতিবেশী।

হাইদেগার মনে করেন—কবিতা, ভাষা এবং চিন্তাকে এক সাথে ধারণ করে এবং এরা কবিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়াই মানুষের জীবনকে মানুষময় করে রাখে। আমাদের আপন সত্তার কবি ও কবিতা ছাড়া আমরা জানোয়ারের মতো হয়ে উঠতাম। অথবা এর চেয়ে বাজে অবস্থা হতো। যেমনটা আমরা খুব পছন্দ করিস্বেচ্ছাচারিতার কুৎসিত চক্রে আটকে থাকতে হাইদেগার যেটাকে self-will’ বলেন—কবি এ থেকে মুক্ত। কাব্যপনার নামে নানা স্বেচ্ছাচারিতার সেল্ফউইলই আমাদের সমাজে কবিত্ব বলে স্বীকৃত। কবির যা ইচ্ছা তাই লিখতে পারে! একটা পশুও (যদিও পশু লিখে না সাধারণত) যা ইচ্ছা তাই করতে পারে—এর মধ্যে কোনো তফাৎ নাই। ফলে দেখা যাচ্ছে এখানে কবির যে অাত্ম-অহম তাকে সৃষ্টিশীল করে তুলছে, তার মধ্যে একটা ফ্যাসিস্টিক টেন্ডেন্সি বা প্রবণতা আছে। এই অংশে অতি জরুরিভাবে আলোচনা করতে হবে, ‘এথিকস আব ইমাজিনেশনবা কল্পনার নৈতিকতার দিকটি নিয়ে (এটা নিয়ে আলাদা লিখব) আপনি যদি আবেগে গদগদ হয়ে বিশাল কবিতা লিখে ফেলেন তাহলেই কবিতার শর্ত পূরণ হয়ে যাবে না। আপনার কাছে যে মুহূর্তটা সত্য হয়ে ধরা দেয় তাকে ইউনিভার্সাল মনে করাটা সেল্ফউইল—এটা ফ্যাসিবাদী প্রবণতাআর এটা চর্চা করার জন্যই কবিদের সাথে মিশতে অভক্তি লাগে। এত উৎকট অহম এরা ধারণ করে যে তাদের মাঝে মাঝে উন্মাদ মনে হয়। সত্য স্থান-কাল-পাত্রের অধীন কোনো বিষয় না। এই আত্নরতি বা স্বেচ্ছাচারিতা বাদ দিতে পারলেই কেবল কবিতার দানবীয় প্রত্যাবর্তন অকেজো হয়ে যেতে পারে। কবিতাও কবিতার শর্ত পূরণ করতে পারে। কবিতায় নাটকীয়তা ও ভাষার ক্যারদানি নিয়ে উৎরে যেতে চাইলে সৈয়দ হকের মতো অবস্থা হবে। আপনি চূড়ান্তভাবে রাজনীতিবিমুখ হয়েও বিশেষ সংস্কৃতির চেতনা ও ইতিহাসের একরৈখিক বয়ানের খপ্পরে পড়ে যে দলের জন্য কল্পনা ও কাব্যময়তা ব্যয় করবেন সেই দলের ভাগ্যের সাথে আপনার কবিতার ভাগ্য একাকার হয়ে যাবে। এখানে চালাকির কোনো সুযোগ নাই। ওয়ার্ড জাস্ট লাইক অ্যা ওয়েপন বা শব্দ অস্ত্রের মতো। আর কবিতা হলো গুলি লোড করা রাইফেলের মতো—ভাবালুতার বিষয় না। আমরা কবিতাকে কি এত গুরুত্ব দিয়ে নিতে পেরেছি? মনে হয় না। হাইদেগার বলছেন:

Only image formed keeps the vision.
Yet image formed rests in the poem.

ইমেজই লক্ষ্যকে পরিণতি দেয়।
আর কবিতায় এই ইমেজ ধরা থাকে।

ব্যাইলিকের ইমেজ বা রাহমানের ইমেজ ক্ষমতাসীনদের লক্ষ্যকে পরিণতি দিচ্ছে। কবিতার শক্তি বুঝাতে এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর পাই নাই।

হাইদেগার বলেন, ‘We never come to thoughts. They come to us’.

হাইদেগারের গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারভেনশন হলো, তিনি ‘দি অরিজিন অব দি ওয়ার্ক অব আর্ট’কে বুঝবার চেষ্টা করেছেন। এখানে অরিজিন বলতে তিনি কোনো কিছুর নেচার বা এসেন্সকে বুঝিয়েছেন। এবং তিনি এই অরিজিনের উৎস খুঁজেছেন। যে কোনো শিল্প, কাব্য, গান, চিত্র—সবকিছুকে আমরা ‘থিং’ মানে ‘কিছু একটা’ আকারে দেখি। হাইদেগার এই কোনোকিছু কী কারণে হয়ে ওঠে বা হয় তা বুঝতে চেয়েছেন। এই ‘থিংলিনেস’টা তিনি খুঁইজা দেখতে চাইছেন। এই কোনো কিছু হওয়া মানে ব্যক্তিশিল্পী বা কবির বানানো বা বস্তুময় হওয়া বা থিং নয়। এর সাথে সত্যের সম্পর্ক খুঁজতে গিয়ে তিনি দর্শনকে কাব্যের দিকে মনোযোগ ফিরাতে বললেন এবং সত্য বিষয়টা বিং (পরমাবস্থা)-এর সাথে সম্পর্কযুক্ত করলেন। অতি সংক্ষেপে আগ্রহীদের জন্য প্রসঙ্গটা হাজির করে রাখলাম। এটা নিয়ে আলাদা লিখব।


কবির কাজ হলো কবিতায় ‘কবিতা’র শর্ত পূরণ করা। এর কোনো ব্যাকরণ নাই। শিশুকে যেমন মায়ের ওলান চিনিয়ে দিতে হয় না তেমনি কবিকে কবিতার এসেন্স বুঝিয়ে দিতে হয় না।


আমাকে হোলসেল ‘আধুনিকতা’ বিরোধী প্রকল্পের লোক মনে করার কারণ নাই। আধুনিকতা কবিতার আলোচনার কোনো বিষয়ই না আমার কাছে। নানা ‘ইভেন্টে’ যেসব কবিতা লিখে মাঠ গরম করে ফেলা হয়, এগুলা অনেক কাজে আসতে পারে। বাট এগুলাতে আপনার ‘সত্য’ হাজির আছে কিনা তা বুঝতে পারব, যখন এর এসেন্স, মূর্ত রূপ হাজির হবে তখন। বেশির ভাগ সময়ই দেখা যায় ইভেন্টপ্রিয় কবিরা ‘রেটরিক্যাল পয়েট্রি’ বা বাচালকাব্য লিখে থাকেন। কেউ কেউ এর মধ্যে নানা তত্ত্ব ও আদর্শ চালান করে দিয়ে কালজয়ী কবিতা লেখার তৃপ্তিও পেয়ে থাকেন। দার্শনিক যে সময়েই জন্ম নিক না কেন, তার কাজ থিংকিং। চিন্তা করতে পারা বা তাকে চিন্তা করতে হয়ই। তেমনি কবির কাজ হলো কবিতায় ‘কবিতা’র শর্ত পূরণ করা। এর কোনো ব্যাকরণ নাই। শিশুকে যেমন মায়ের ওলান চিনিয়ে দিতে হয় না তেমনি কবিকে কবিতার এসেন্স বুঝিয়ে দিতে হয় না। এটা খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমাদের শুধু সতর্ক থাকতে হবে কবিতার নামে ব্যক্তির বিকার বা কোনো হাওয়াই ট্র্যাডিশনের জোয়াল যেন আমাদের ঘাড়ে উঠে না যায়। বাংলা কবিতার কেন, কোনো কবিতারই খারাপ দিন বলতে কিছু নাই। আপনার আমার মিটারের বাইরে অনেক কবিতা লেখা হচ্ছে। নিজের জীবনই যাপন করতে পারেন না—নিজের কবিতাতে কেমনে পারবেন? ফলে আধুনিকতাবাদী বা চরমবস্তুবাদী বা ভাববাদী এইসব খুচরা আলাপের খপ্পরে পরে কবিতার নামে সেল্ফ-উইল বা নিজের মনগড়া প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করতে চায়।  বই পড়া, তত্ত্বচিন্তার সাথে সাথে নিজের কামনা-বাসনা বা প্রেম-ঘৃণা ইত্যাদি জাহির না করলে নিজেদের দানবীয় প্রত্যার্বতন ঠেকানো সম্ভব হবে। এবং কবিতার যে শক্তি আছে তাকে ন্যায়যুদ্ধেও পাওয়া যাবে।

কবি যদি বিশেষ সময়, রাষ্ট্র, দেশ, ভাষায় আটকা পড়ে যায় তাহলে সেই কবিতার দানবীয় প্রত্যার্বতন ঘটতে পারে। সরকারি দলের বিজ্ঞাপন ও শামসুর রাহমানের কবিতার ইমেজ এবং গাজার শিশুদের লাশ ও ব্যাইলাকের কবিতা সেই কথাই বলে। অবার অন্য দিকে কল্পনার নৈতিক গুণের কারণে নজরুলের কবিতায় দেখবেন—কবিতা গণহত্যা নয়, গণশক্তির আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে।

জীবনান্দের কথা দিয়ে শেষ করি:

“ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশ থেকে বাংলাদেশে ভালো কবি জন্মায় বলে শুনে এসেছি। সত্য কি না আমার পক্ষে নির্ধারণ করা কঠিন।”

রেজাউল করিম রনি

রেজাউল করিম রনি

সাংবাদিক, সহকারী সম্পাদক at নিউ এজ
জন্ম : ২০ জুলাই, ১৯৮৮, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। কবি। তবে বিশেষ ঝোঁক তার সাহিত্য, রাজনীতি ও দর্শন নিয়ে বিশ্লেষণী লেখার প্রতি।

প্রকাশিত কবিতার বই : ‌‘গোলাপসন্ত্রাস’, ‘দাউ দাউ সুখ’। গদ্য: ‘শহীদুল জহিরের শেষ সংলাপ ও অন্যান্য বিবেচনা’।

ই-মেইল : rkrony@live.com
রেজাউল করিম রনি