হোম গদ্য প্রবন্ধ কবিতার আধুনিকতা, উত্তরাধুনিকতা ও পাঠক

কবিতার আধুনিকতা, উত্তরাধুনিকতা ও পাঠক

কবিতার আধুনিকতা, উত্তরাধুনিকতা ও পাঠক
530
1
11103513_922605221117933_106193906_o
অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম

যখন বাংলাদেশ সৃষ্টি হলো, তখনও কবিতা পড়ার দিকে ঝোঁক ছিলো সাধারণ মানুষের। প্রেমিকাকে চিঠি লিখতে বা প্রেমের প্রস্তাব দিতেও কবিতার বই উল্টেপাল্টে দেখেছে তখনকার তরুণ প্রজন্ম

‘আধুনিক মানুষকে যিনি তাঁর কথা শোনাতে পারেন, তিনিই হলেন আধুনিক কবি। কবে তিনি বেঁচে ছিলেন সেটা বড় কথা নয়। তবে যদি আধুনিককালে বেঁচে থেকেই সে কাজ করে থাকেন, তাহলে তিনি আরো বেশি আধুনিক।’ —রবার্ট ফ্রস্ট

ফ্রস্ট সাহেবের এই কথাকে একটা মানদণ্ড ধরে নিলে মনে একটা প্রশ্ন আসে, আরো বেশি আধুনিক বা উত্তরাধুনিক কবি কি বাংলা কবিতায় নেই? বেশ ক’জনই আছেন। আধুনিককাল মানে ঘটমান-বর্তমানকাল ধরে নিলে, বেঁচে আছেন এবং পাঠকপ্রিয়তা পেয়ে ধন্য হয়েছেন, এমন কবি হিসেবে আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ, শঙ্খ ঘোষ, নির্মলেন্দু গুণ, জয় গোস্বামী প্রমুখের নাম করা যায়। কিন্তু উল্লেখিত কবিদের গত এক দশকে লেখা কোনো কাব্য বা কবিতা পাঠকপ্রিয় হয়েছে, তা মনে পড়ছে না। তাহলে গত দশ বছরে এই বড় কবিগণ যা লিখেছেন সবই ট্র্যাশ, নাকি তাদের কবিতার আধুনিকতা এ প্রজন্ম ধরতে পারছে না? হতে পারে, তাঁদের সেরাটা দিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। সেই লেখাগুলো তাঁরা যে সময়ে লিখেছেন, ওই সময়ের চেয়ে তাঁরা অনেক এগিয়ে ছিলেন। কবিমাত্রই অবশ্য নিজ সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা মানুষ। অতি সাম্প্রতিককালে কিছুটা হলেও সাড়া ফেলতে পেরেছে দুটি কবিতার বই : জেব্রামাস্টার (মজনু শাহ) এবং ভাতের ভূগোল (জুয়েল মোস্তাফিজ)। তাহলে এ দুজন কি আরো বেশি আধুনিক? হতে পারে!

রবার্ট ফ্রস্টের আধুনিক কবির সংজ্ঞা অনুযায়ী কাউকে বিবেচনায় আনতে গেলে প্রথমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছেই ফিরে যেতে হয়। শত বছরের অধিক সময় পরেও তাঁর গীতাঞ্জলি, গীতবিতান  পাঠককে মুগ্ধ করছে; অধুনা অনেক কবির কবিতার চেয়েও রবীন্দ্রনাথের আবেদন এখনও অনেকখানি বেশি। জীবনানন্দ দাশের সমান নন্দিত হতে পারেন নি কোনো কবিই। বনলতা সেন  বা রূপসী বাংলা  ছেড়ে জীবনানন্দ সমগ্র  কেনার দিকেই আজকের পাঠকের ঝোঁক বেশি। অথচ এই জীবনানন্দকেই অকবি বলে গালাগাল করেছেন তাঁর সময়ের অনেকে। অর্থাৎ, জীবনানন্দ তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক ছিলেন। তাঁকে ধারণ করার মতো ক্ষমতা ছিল না ওই সময়ের পাঠক আর কাব্য সমালোচকদের (হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া)।

আবার আধুনিকতা চিন্তা করলে সমসাময়িক পাঠক বা সাধারণ মানুষের চেয়ে কবির মানস এগিয়ে থাকায় কবি এ সময়ে যা লিখছেন তা হয়তো সাধারণ মানুষ নিতে পারছে না। গত শতকের পঞ্চাশ আর ষাটের দশকের কবিরা এ ক্ষেত্রে ভাগ্যবান। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ বপনের সময়টায় বাংলার মানুষ নিজ অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতির দিকে মনোযোগী ছিলেন। তাই তাঁদের কবিতা নিজেদের সময়ের মানুষ গ্রহণ করেছে। যখন বাংলাদেশ সৃষ্টি হলো, তখনও কবিতা পড়ার দিকে ঝোঁক ছিল সাধারণ মানুষের। প্রেমিকাকে চিঠি লিখতে বা প্রেমের প্রস্তাব দিতেও কবিতার বই উল্টেপাল্টে দেখেছে তখনকার তরুণ প্রজন্ম।

ই-বুকের দিকে কিছু পাঠকের আগ্রহ আছে। তারচেও বেশি ঝোঁক ফেইসবুকের দিকে

মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট যুগ শুরুর পরমুহূর্ত থেকে ব্যাপারটা বদলে যেতে থাকে। এর বিরুদ্ধে লড়াই করেই বাংলা কবিতা টিকে আছে। সেই দিক চিন্তা করলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণরা অনেক ভাগ্যবান। তাঁরা জীবিত থাকতেই পাঠকপ্রিয়তার চূড়া দেখেছেন। হেলাল হাফিজ তো এক যে জলে আগুন জ্বলে  দিয়েই আমপাঠকের ঘরে ঘরে। মৃত্যুর পর জনপ্রিয় হয়েছেন জীবনানন্দ দাশ, আবুল হাসান আর রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায় মৃত্যুর আগে-পরে সমান পাঠকপ্রিয়। এখানেই কবি আর কবিত্বের শক্তিমত্তা।

তাহলে কি গুণ, সৈয়দ হকরা যে মাপের কবি, উত্তরসূরিরা সেই মাপের নন? আল মাহমুদের সোনালি কাবিন-এর আবেদন কখনো ফুরোবার নয়। প্রকাশের সময় থেকে এখনও অব্দি এই বইয়ের চাহিদা কখনো কমে নি। ওরকম কবিতার বই বাংলা সাহিত্যে ক’টাই বা হয়েছে! আহসান হাবীব কি কম আধুনিক? তাঁর অনেক কবিতাই তো এখনো কাব্যরসিকদের আলোচনার খোরাক। এই সময়ে এসেও গত শতকের তিরিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাটের দশক এখনও জনপ্রিয়, পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক। তাহলে তারা কি উত্তরাধুনিক নন? আর নব্বই দশক থেকে একুশ শতকের প্রথম আর দ্বিতীয় দশকের কবিরা যা লিখছেন, তা নিশ্চয়ই উত্তর-আধুনিকের চেয়েও এগিয়ে। আবার না-ও হতে পারে। এমনও তো হতে পারে, পূর্বসূরিদের চেয়ে আলাদা কাব্যভাষার চর্চা করতে গিয়ে কবিতার সরলতার জায়গাটাকে পিষে ফেলা হচ্ছে। কবিতা অতিমাত্রায় দুর্বোধ্য। যে কবিতা উত্তরাধুনিকতাকেও ছাপিয়ে আরো সামনের, তাতে তো চিত্রকল্প আর রূপকসর্বস্বতাই থাকবে।

তাহলে পাঠক কি তৈরি নয়? পাঠকরা তো কখনোই তৈরি থাকে না। আমার মনে হয় বাংলাদেশে শুধু কবিতা না, সমগ্র সাহিত্যেরই নতুন পাঠক বাড়ছে না। কারণ পাঠক তৈরি হচ্ছে না। বই পড়ার সংস্কৃতি অনেকটাই ফুরিয়ে গেছে। তার কারণ হতে পারে প্রযুক্তিনির্ভরতা। ই-বুকের দিকে কিছু পাঠকের আগ্রহ আছে। তারচেও বেশি ঝোঁক ফেইসবুকের দিকে। ওখানে পাঠকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি। উত্তরাধুনিক কবিতার চেয়ে তিরিশীয় ঢঙের লেখায় লাইক বেশি। কেননা, পাঠ্যপুস্তকে যে ক’টা কবিতা পড়ার সুযোগ মিলছে, সবই তো পুরোনো ঘরানার। জীবনানন্দের কবিতা পাঠ্যপুস্তকে থাকে বটে, মাস্টাররা সেই কবিতা কিন্তু পড়ান না, পরীক্ষায়ও প্রশ্ন হয় না। তাই ওই কবিতা পড়াও হয় না অনেকের। ফেব্রুয়ারির মেলায় যে এত তরুণ-তরুণীর সমাগম, তাদের হাতে কবিতার বই থাকে কয়টা? কবিতার বই শুনলেই ই-প্রজন্ম নাক সিঁটকায়। যেন কবিতা খুব আনস্মার্ট কিছু!

এরই ফলে সকলেই পাঠক নয়, কেউ কেউ পাঠক

শুধু আধুনিক বা পুনরাধুনিক কবিতাই নয়, কোনো কবিতার দিকেই পাঠকের ঝোঁক নেই। মানুষ কবিতা পড়ে না বললেই চলে। এই সত্য মেনে নিয়েও অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় এই সময়ে তরুণ কবির আবির্ভাব বেশি। সেটা ফেইসবুক বা বিভিন্ন ব্লগে লগইন করলেই চোখে পড়ে। কৃষ্টি কর, সরকার মুহম্মদ জারিফের মতো বিস্ময়কর কাব্যপ্রতিভার সঙ্গেও পরিচিত হয়েছি ফেইসবুকে। হয়তো আমরা এই সময়ের কবিরা কবিতার মৌলিকতা থেকে অনেক দূরে। আর পাঠক পাঠ্যপুস্তকে পড়া মৌলিকতাতেই আটকে আছে এখনো। এখানে দ্বিধার এক অদৃশ্য দেয়াল আছে। এটাও তো ঠিক নতুন কবিকে পুরনো মৌলিকতা ভেঙে নতুন ধরনের কবিতা লিখতে হবে। তৈরি করতে হবে নিজস্বতা, পুনরাধুনিক মৌলিকতা। ‘Basic’ চিরন্তন, এই প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা তো নবীনরা করবেই। বিজ্ঞানের বেসিক আর শিল্পকলা বা কবিতার বেসিক তো এক হতে পারে না। বিজ্ঞান বদলায় না। কিন্তু কবিতার ভাষা বদলায়।

সবকিছুর পরেও কিছু প্রশ্ন হৃদয় তোলপাড় করে। ই-প্রজন্মের পাঠক কি কবিতার ভেতরে গিয়ে এর রূপ-রস আস্বাদন করার ধৈর্যশক্তি কখনো পাবে না, নাকি প্রযুক্তি ওদের কাব্যরস পান করার তেষ্টা মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরিই চুষে নিচ্ছে? হয়তো তা নয়। একুশ শতকের বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ তাহলে কাদের কাছে, শুধু অনাগত তরুণ কবিদের নিকট? পাঠক ছাড়া কবি ও কবিতা কিভাবে বাঁচে? আবার শঙ্খ ঘোষের কথাটাও মনে রাখতে ইচ্ছে করছে, ‘যে কোনো কবিতাই (যদি তা কবিতা হয় অবশ্য) তো আত্মিক? প্রতিদিনের হন্যে-হওয়া মানুষের তো সময় বা আগ্রহ হবার কথা নয় সেই আত্মিকতাকে চাইবার বা বুঝবার। বাইরে না রেখে মনটাকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেবার! এরই ফলে সকলেই পাঠক নয়, কেউ কেউ পাঠক।’ এই কেউ কেউ পাঠকদের পাঠেই জুয়ার আসরে কোনো আঙুলই মিথ্যা নয়, সার্কাস তাঁবুর গান, সাবানের বন, পুরুষের বাড়ি মেসোপটেমিয়া, সূর্যাস্তগামী মাছ, কাঠঠোকরার ঘরদোর, দর্জিঘরে এক রাত, যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণ নগরে, জেব্রামাস্টার, ভাতের ভূগোল  কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী গিটার, বাদামি পুকুর, কানা রাজার সুরঙ্গ, আমাদের পোষা ট্রেন  এবং এরকম সব কবিতার বই পৌঁছে যাচ্ছে…পৌঁছাবে অনন্তকাল ধরে। রণজিৎ দাশের গলায় গলা মিলিয়ে বলি, কবিতার পাঠক—এক শুদ্ধ, নির্জন, অলৌকিক মানুষ। তাঁকে নমস্কার।

০৭.০৪.২০১৫
মিরপুর
রুহুল মাহফুজ জয়

রুহুল মাহফুজ জয়

জন্ম ৩১ মার্চ ১৯৮৪, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা : সাংবাদিকতা।

শিল্প-সাহিত্যের ওয়েবজিন শিরিষের ডালপালা’র সমন্বয়ক।

প্রকাশিত বই :
আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো [কবিতা, ২০১৬, ঐতিহ্য]

ই-মেইল : the.poet.saint@gmail.com
রুহুল মাহফুজ জয়

Latest posts by রুহুল মাহফুজ জয় (see all)