হোম গদ্য প্রবন্ধ অর্ফিয়ুসের মহাপ্রয়াণ

অর্ফিয়ুসের মহাপ্রয়াণ

অর্ফিয়ুসের মহাপ্রয়াণ
1.20K
0

ছোটকাল থেকেই একটা প্রবাদ শুনতে শুনতে বড় হয়েছি—‘লোকজন আড়ালে রাজাকেও শালা বলে।’

এই বাক্যটি যে শুধু শুনেছি তাই নয়, নানাস্থানে ফলতেও দেখেছি। সর্বশেষ ফলতে দেখলাম সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের তিরোধানের পর।

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের অবারিত জমিনে কালো কালো অক্ষর বসিয়ে অনেকেই রসিয়ে রসিয়ে নানান কথাই বলল। সৈয়দ হকের লেখাপত্র নিয়ে রীতিমত কাজিসভা বসিয়ে দিলো কেউ কেউ! যেন-বা তারাই সাহিত্যের রক্ষাকর্তা। আর তাদের বিচারসভার আসামী সৈয়দ হক। এবং তারা সকলেই দ্রুত বিচারে বসেছে। কারণ তাদের সাহিত্য বিচারে সৈয়দ হকের দ্বিতীয় মৃত্যুকে ত্বরান্বিত না-করলে পেটের ভাত হজম হচ্ছে না!


আমাদের বাংলাদেশের আধুনিকতা মানেই ছিল সৈয়দ শামসুল হক।


খুব বিস্ময় ও আহত মন নিয়ে এইসব কীর্তিকলাপ লক্ষ করলাম। আমাদের মহীরুহদের এই হাল! তিরোহিত হবার পর আমাদের মতো চুনোপুটিদের কী হাল হবে ভেবে আমূল কেঁপে উঠল।

আমরা মানে বাঙালিরা আর কিছু না-পারি গরম তেলে ফোড়ন দিতে খুব পারি। অথবা তৈয়ার ডালে বাগাড় দেয়া। অর্থাৎ ডাল যখন প্রস্তুত তখন তা তেলে ফেলে পেঁয়াজ-পাঁচফোড়নে সম্ভাষণ দেয়া সব চাইতে সহজতর কর্ম বটে!

একটা কথা আজ বলতে চাই, বাংলাদেশে সম্প্রতি ভুঁইফোড় কবি-সাহিত্যিকের সংখ্যা যে হারে বেড়ে চলেছে, তাতে আনন্দিত হওয়ার বদলে ভয় জাগে। এজন্য যে ‘আতা গাছে তোতাপাখি টাইপ’ লিখিয়েরা ক্রমাগতই দলে ভারি হচ্ছে। এতে করে সাহিত্যের ভাগাড় বিস্তৃত হচ্ছে। আর মূলধারার লেখকরা ভাগাড়ের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। এই অধিক প্রজনন মোটেও খারাপ চোখে দেখছি না। কিন্তু এত ট্র্যাশ সাহিত্যিকদের আধিক্যে কখনো কখনো নিজেকেই বিকলাঙ্গ মনে হয়। জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় ভ্যাসেকটমি, লাইগেশন বা ভ্যাক্সিনেশনের ওপর জোর না দিলে আমাদের বঙ্গসাহিত্যে অকালেই আগাছায় সয়লাব হয়ে যাবে। প্রায় সকলেই লেখক হওয়ার চেষ্টা করছে এটা আশাব্যঞ্জক বৈ কি! এবং কালে কালে কেউ কেউ লেখক হয়ও বটে, সকলেই নয় কিন্তু!

হালে আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়—বটবৃক্ষদের দিকে ঢিল ছুঁড়তে পারলেই যেন সে মহান সাহিত্যিকের তকমাটা পেতে যাচ্ছে। বিষয়টা এমন, যেন আকাশের দিকে ঢিল ছুঁড়ে মারলেই আকাশ হয়ে উঠা যায়। আদতে আকাশ হওয়া দূরে থাক, কোনোদিন হয়তো সে মেঘের জলকণার নাগালও পাবে না। অতটা নাগাল চিরকালই তার সীমার বাইরে। কিন্তু সেদিকে তাদের ভ্রূক্ষেপ নেই। বটবৃক্ষদের দিকে ঢিল নিক্ষেপ করে নিজের তাগদ দেখানোর আনন্দ থেকে সে বঞ্চিত হবে কেন? ঢিল লক্ষ্যভ্রষ্ট হোক, নিজের তাগদ দেখানোর বেহুদা খায়েশ থেকে সে বিরত হবে কেন? এসব কিছুকেই আমার ‘বেয়াদবি’ বলে মনে হয়। যদিও ট্র্যাডিশনকে অস্বীকার করার মাঝে এক ধরনের স্মার্টনেস জাহির করা যায়। এবং তা যুগে যুগে জাহিরও হয়েছে। হয়তো এসবই আধুনিকতা বা উত্তরাধুনিকতার নামান্তর। পুরাতনকে খারিজ করার মাঝেই যেন নিজের আত্মপ্রতিষ্ঠা। আমার প্রশ্ন হলো, এই খারিজে আমি নিজেই অংশ নেব কেন?

এইরূপ স্বমেহন আমার কাছে দৃষ্টিকটু। অযৌক্তিক। বটবৃক্ষদের তুলনায় আমাদের শাখাপত্র কিচ্ছুটি নাই, ফল-ফুল তো বহুদূর—তবুও আমাদের আস্ফালন। তবুও নিজেকে উচ্চতায় তুলতে নিজেকেই খেলো করে ফেলা। আর সিংহকে যদি একবার খাঁচাবন্দি করা যায় বা হাতি যদি একবার কাদায় পড়ে বা অর্ফিয়ুসের সেই জাদুকরী বাঁশিটি আর না বাজে, কবিতা লেখার অলৌকিক ক্ষমতা যদি ক্ষয়ে যেতে শুরু করে, মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়তে শুরু করে রাজন, তাহলে তো কথাই নেই! চামচিকাও উড়ে আসে লাথি মারার জন্য। অথচ রাজা যখন সিংহাসনে আসীন, তখন তাবেদারি করতে করতে জুতোর শুকতলিটি পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলতে অনেকেরই দ্বিধা বা হায়া-লজ্জাও হয় না। তাই বলি কি, এইদিন দিন নয়রে, আরও দিন সম্মুখে আছে! আমার বা আপনাদেরও।

এসবই আমার অবজার্ভেশন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে এমন কিছুই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আমাদের সব্যসাচী লেখকের তিরোধানের পরপরই কিছু চামচিকাদের ওড়াউড়ি নজরে এল। আর তাদের বাকোয়াজি। তাদের জ্ঞান জাহিরের অবস্থা দেখে স্থাণু হয়ে বসে রইলাম। অথচ একদা আমাদের বাংলাদেশের আধুনিকতা মানেই ছিল সৈয়দ শামসুল হক। বাংলাদেশের নতুন নাটক মানেই ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ‘নুরুলদীনের সারাজীবন’। বাংলাদেশের সাহিত্য মানে ‘পরানের গহীন ভিতর’, ‘নীল দংশন’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’,‘খেলারাম খেলে যা’, ‘দূরত্ব’, ‘নিজস্ব বিষয়’, ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’। এইভাবে আরও অনেক গ্রন্থের নাম যুক্ত করা যায়। বা শুধুমাত্র একটা গল্পের উল্লেখ করি—‘ফেরিঘাটের অপেক্ষায়’।

ওই গল্পের প্যারালাল কোনো গল্প বাংলাদেশের ছোটগল্পে বিরল।


বেদনার মতো বেজেছে হক ভাইয়ের অন্তর্ধানের পর সাহিত্যের হাতুড়ে ডাক্তারদের পোস্টমর্টেম প্রক্রিয়া দেখে।


এক্ষণে আসল কথা পাড়ি, বেয়াদবি করার পূর্বে কিন্তু আদবটা জানতে হয়, বা জানা জরুরি। আদবকায়দা ভালো জানা থাকলেই বেয়াদবি হাসিল করতে সুবিধা পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করি। তবে আমিই বা এইসব কথা বলবার কে? বা বলার এখতিয়ার রাখি নাকি? কিন্তু বড়ো বেদনার মতো বেজেছে হক ভাইয়ের অন্তর্ধানের পর সাহিত্যের হাতুড়ে ডাক্তারদের পোস্টমর্টেম প্রক্রিয়া দেখে।

বাংলাদেশের সাহিত্যে যখন ‘পরানের গহীন ভিতর’, তখন অমন কাব্যগ্রন্থ কয়টা ছিল আমাদের গ্রিপের ভিতর? তখনও তো আকছার রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের চেনা মুখ। চেনা স্বর আর চেনা কবিতা। সামান্য জ্ঞান তৃষিত যারা, তাদের হাতে সুকান্ত এবং জীবনানন্দ দাশ। আরও পরে নীরেন্দ্রনাথ। অনেক পরে সুনীল, উৎপল আর শঙ্খ। যারা দেহ-মনে প্রেমিক হয়ে উঠছি তাদের কাছে তখন নীরাই আরাধ্য। ফলে হাতে ‘হঠাৎ নীরার জন্য’। আর বাংলাদেশ বলতে ‘সোনালি কাবিন’ ‘আশায় বসতি’, ‘তবক দেয়া পান’, ‘নিরালোকে দিব্যরথ’, ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’, ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ ইত্যাদি। এসবই আমার কৈশোরকালীন স্মৃতি। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ বাদ পড়ে থাকলে, পাঠক মার্জনা করবেন।

তখন তো কোনো কিছুই নাগালের ভিতর ছিল না। ছিল না সহজলভ্য। অন্য সবকিছুর মতো বইও ছিল দুষ্প্রাপ্য। আমাদের বড় কষ্ট করে বই সংগ্রহ করতে হতো। আর আমরা যারা বাবার হোটেলের অন্ন ধ্বংস করছি তাদের জন্য বই ছিল আরও দুষ্প্রাপ্য। এখনকার মতো এত সহজে আমরা কিছুই পাই নি। পাই নি বলেই সবকিছুর কদর করেছি। কদর বুঝেছি। আর শিখেছি আদব, নমনীয়তা। শিখেছি বড়োর প্রতি ঝুঁকে থাকা। সবকিছুকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার আগে নিজের দিকে তাকাতে শিখেছি। নিজের আয়নায় নিজেকে দেখে সন্দিহান হয়েছি। নার্সিসিজমে স্থির হয়ে থাকা জলের শরীরে আঙুলের ডগা দিয়ে মৃদু টোকা দিয়েছি। যাতে ছোট ছোট ঢেউ ওঠে। আর তাতে আত্মপ্রেমের অন্ধ আয়নাখানি ভেঙে চৌচির হয়ে যায়।

এতে করে আমরা নিজের মুখচ্ছবিতে বিভোর না থেকে অন্যদের দিকেও দৃকপাত করতে শিখেছি। মনে করে এখনও শিউরে উঠি—প্রেমকে আমরা দিবালোকে প্রথম দেখতে পেলাম ‘পরানের গহীন ভিতর’ দিয়ে! এই কাব্যগ্রন্থে প্রেম আমাদের দেহমন বাসন্তী রঙে রাঙিয়ে দিল। আর আমরা মেতে উঠলাম ঝুলন-উৎসবে। যেন দমকা-হাওয়া এসে প্রেমের লাজুক ঘোমটাখানি খুলে দিল। আমরা নবীন প্রেমিকেরা খোলা-প্রান্তরের এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আর মুহুর্মুহু লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলাম—যেন-বা চুনির প্রকৃত রূপে।

আমারে যেদিন তুমি ডাক দিলা তোমার ভাষায়
মনে হইল এ কোন পাখির দ্যাশে গিয়া পড়লাম,
এ কোন নদীর বুকে এতগুলা নায়ের বাদাম,
এত যে অচিন বৃক্ষ এতদিন আছিল কোথায়?
আমার সর্বাঙ্গে দেখি পাখিদের রতির পালক,
নায়ের ভিতর থিকা ডাক দ্যায় আমারে ভুবন,
আমার শরীলে য্যান শুরু হয় বৃক্ষের রোপন,
আসলে ভাষাই হইল একমাত্র ভাবের পালক।
তাই আমি অন্যখানে বহুদিন ছিলাম যদিও,
যেদিন আমারে তুমি ডাক দিলা নিরালা দুফর,
চক্ষের পলকে গেল পালটায়া পুরানা সে ঘর,
তার সাথে এতকাল আছিল যে ভাবের সাথীও।
এখন আমার ঠোঁটে শুনি আমি অন্য এক স্বর,
ভাষাই আপন করে আর সেই ভাষা করে পর।।
(২৩)

এমন নির্ভীক উচ্চারণ—ভাষাই আপন করে, আর সেই ভাষাই করে পর!


তখন বা এখন আমার এটাই মনে হয়েছে ‘খেলারাম খেলে যা’ এক মানবিক উপাখ্যান।


আজকে যারা কবিতাভূমে নবীন-তুর্কি-তরুণ, তারা হয়তো তাচ্ছিল্যের হাসিতে গড়িয়ে পড়ছে। আর উঁচু গলায় বলছে—প্রাগৈতিহাসিকতার ওইসব ছিরিছাঁদ আমরা ঢের আগেই জানি। ‘পরানের গহীন ভিতর’ এমন সিলি বই নিয়ে কেউ এখন কথা পাড়ে নাকি?

আমি তো অস্বীকার যাচ্ছিনে আমার পাঠের দীনতা, আমি ব্যাকডেটেড। ট্র্যাডিশনাল। তাছাড়া আমার বয়সের গাছপাথরটিও তো বহু প্রাচীন। প্রাচীনই। একেবারে শ্যাওলা পড়া। কিন্তু এ কথাও তো সত্য যে, ‘পরানের গহীন ভিতর’ ছিল আমাদের শিথানে। ছিল পৈথানে। কিশোরকালের প্রেমের ফাঁদে পড়া বকপাতিদের একমাত্র আশ্রয় ছিল ওই বই। যেন-বা অন্তিম নিদান।

তার কিছুকাল পরে ‘খেলারাম খেলে যা’। অথচ সৈয়দ হকের অমন আধুনিক উপন্যাস ধারণ করার মতো জমিনই প্রস্তুত ছিল না বাংলাদেশের সাহিত্যে।

তারপরেও ছিল কলেজ পড়ুয়াদের ফিসফিসানি, যেন ‘লোলিটা’কে হার মানিয়েছে বাবর আলি। বা ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভারের’ লাভা স্তিমিত হয়ে গেছে এক খেলারামের কাছে! আর যারা পড়ে ফেলেছে ‘খেলারাম খেলে যা’ তারা যেন গন্দম ভক্ষণ করা আসামি। তাদের নত আঁখিদ্বয়। অল্প-কম্পিত-ওষ্ঠ! যেন খানিক বাদেই তাদের নিয়ে যাওয়া হবে ফাঁসির মঞ্চে। তরুণদের এই হাল, আর যারা সদ্য-তরুণী? তাদের জন্য ওপেন-স্কোয়াডে ব্রাশ-ফায়ার অবধারিত। আজ ভেবে অহংকার জাগে মনে—ওই ব্রাশ-ফায়ারের সামনে আমিও নির্ভীক দাঁড়িয়ে ছিলাম।

তখন বা এখন আমার এটাই মনে হয়েছে ‘খেলারাম খেলে যা’ এক মানবিক উপাখ্যান। এ উপন্যাসের শ্লীলতা বা অশ্লীলতা নিয়ে যারা মরমে মরতে থাকে, তাদের এই মানবিকবোধটি হয়তো একেবারেই ভোঁতা।

এ নিয়ে বিস্তৃত কথা অন্যদিন বলা যাবে। ফিরে যাই ‘পরানের গহীন ভিতরে’

কি কামে মানুষ দ্যাখে মানুষের বুকের ভিতরে
নীল এক আসমান—তার তলে যমুনার ঢল,
যখন সে দ্যাখে তার পরানের গহীন শিকড়ে
এমন কঠিন টান পড়ে সে চঞ্চল?
কিসের সন্ধান করে মানুষের ভিতরে মানুষ?
এমন কি কথা আছে কারো কাছে না-কইলে-নাই?
সুখের সকল দানা কি কামে যে হয়া যায় তুষ?
জানি নাই, বুঝি নাই, যমুনারও বুঝি তল নাই।
তয় কি বৃক্ষের কাছে যামু আমি? তাই যাই তয়?
বনের পশুর কাছে, জোড়া জোড়া আছে যে গহীনে?
যে পারে জবাব দিতে, গিয়া দেখি শূন্য তার পাড়া,
একবার নিয়া আসে আকালের কঠিন সময়,
আবার ভাসায় ঢলে খ্যাতমাঠ শুকনার দিনে,
আমার আন্ধার নিয়া দেয় না সে একটাও তারা।
(১৪)

এ কিসের তালাশে রত কবি? এই সেই তালাশ, যা জীবাত্মা করে চলে পরমাত্মার তরে। এই তালাশ আদতে সাধনা, যে সাধনায় পার্থিব ও লৌকিক জীবনকে অগ্রাহ্য করে অসীমলোকে উন্নীত করা যায়। কিন্তু বড় দুর্গম সেই পথ। যার সন্ধানে সুখের সকল দানা তুষ হয়ে গেলেও বিফল হতে হয়।

Flowers every night
Blossom in the sky;
Peace in the Infinite;
At peace am I.
Sighs a hundredfold
From my heart arise;
My heart, dark and cold,
Flames with my sighs.

(জালালউদ্দিন রুমি)


সৈয়দ হক চলে গেলেন, কিন্তু তার কবিতার বাঁশিটি রয়ে গেল।


আন্ধার তোরঙ্গে তুমি সারাদিন করো কি তালাশ?
মেঘের ভিতরে তুমি দ্যাখো কোন পাখির চক্কর?
এমন সরল পথ তবু ক্যান পাথরে টক্কর?
সোনার সংসার থুয়া পাথারের পরে করো বাস?
কি কামে  তোমার মন লাগে না এ বাণিজ্যের হাটে?
তোমার সাক্ষাৎ পাই যেইখানে দারুণ বিরান,
ছায়া দিয়া ঘেরা আছে পরিষ্কার তোমার উঠান
অথচ বেবাক দেখি শোয়া আছে মরণের খাটে।
নিঝুম জঙ্গলে তুমি শুনছিলা ধনেশের ডাক?
হঠাৎ আছাড় দিয়া পড়ছিল রূপার বাসন?
জলপির গাছে এক কুড়ালের কোপের মতন
তাই কি তোমার দেহে ল্যাখা তিন বাইন তালাক?
এমন বৃক্ষ কি নাই, যার ডালে নাই কোনো পরী?
এমন নদী কি নাই, যার বুকে নাই কোনো তরী?
(২)

The heavenly rider passed;
The dust rose in the air;
He sped; but the dust he cast
Yet hangeth there.
Straight forward thy vision be,
And gaze not left or night;
His dust is here, and he
In the Infinite
.

(জালালউদ্দিন রুমি)

আমি শুধু অবাক হয়ে ভাবি, আজকে যারা ‘খারিজ-উৎসবে’ মেতেছে, তাদের সন্মুখে এই সুচারু-বিন্যাসটুকু না-থাকলে তারা কোন পথ ধরে এগিয়ে যেত?

দিবারাত্রি অক্লান্ত পরিশ্রম করে যারা গহীন অরণ্যে আমাদের চলার পথ তৈরি করে গেলেন, তাদের অস্বীকারের মধ্য দিয়েই কেন নিজেকে বড় করে তুলতে হবে? কিন্তু যারা কঠিন মাটির স্তর খুঁড়ে আমাদের জন্য সুপেয় জলের বন্দোবস্ত করে গেলেন সেইসব জলাধার বুজিয়ে দেয়া কি এতই সহজ?

কী আছে তোমার দ্যাশে? নদী আছে? আছে নাকি ঘর?
ঘরের ভিতরে আছে পরানের নিকটে যে থাকে?
উত্তর সিথানে গাছ, সেই গাছে পাখির কোটর
আছে নাকি? পাখিরা কি মানুষের গলা নিয়া ডাকে?
যখন তোমার দ্যাখা জানা নাই পাবো কি পাবো না,
যখন গাছের তলে এই দেহ দিবে কালঘুম,
যখন ফুরায়া যাবে জীবনের নীল শাড়ি বোনা,
তখন কি তারা সব কয়া দিবে আগাম-নিগুম?
আমার তো দ্যাশ নাই, নদী নাই, ঘর নাই, লোক,
আমার বিছানে নাই সোহাগের তাঁতের চাদর,
আমার বেড়ায় খালি ইন্দুরের বড় বড় ফোক,
আমার বেবাক ফুল কাফনের ইরানি আতর।
তোমার কি সাধ্য আছে নিয়া যাও এইখান থিকা,
আমার জীবন নিয়া করো তুমি সাতনরী ছিকা?
(১১)

সৈয়দ হক চলে গেলেন, কিন্তু তার কবিতার বাঁশিটি রয়ে গেল। রয়ে গেল সুরের ইন্দ্রজাল। যা আমাদের ভাবাবে। কিংবা আমরা তাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবো। কারণHis dust is here, and hein the Infinite.

papree.rahman@gmail.com'

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।
লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং অনুবাদক।

গল্পের বই:
লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা (২০০০)
হলুদ মেয়ের সীমান্ত (২০০১)
অষ্টরম্ভা (২০০৭)
ধূলিচিত্রিত দৃশ্যাবলি (২০১০)
মৃদু মানুষের মোশন পিকচার (২০১২)
মামুলি জীবনের জলতরঙ্গ (২০১৪)
Lilies, Lanterns, Lullabies (২০১৪) Edited By Niaz Zaman
শহর কিংবা ঊনশহরের গল্প (২০১৬)

উপন্যাস:
পোড়া নদীর স্বপ্নপুরাণ (২০০৪)
মহুয়া পাখির পালক (২০০৪)
বয়ন (২০০৮)
পালাটিয়া (২০১১)

সম্পাদনা:
ধূলিচিত্র (সাহিত্যপত্রিকা)
বাংলাদেশের ছোটগল্প : নব্বইয়ের দশক
গাঁথাগল্প (যৌথ), লেখকের কথা (যৌথ)
অ্যালিস মানরোর নির্বাচিত গল্প (যৌথ)
Women Writing from Bengal (Joint)

গবেষণা : ভাষা শহীদ আবুল বরকত
আত্মজীবনী : মায়াপারাবার (২০১৬)

ই-মেইল : papree.rahman@gmail.com
papree.rahman@gmail.com'