হোম গদ্য প্রচণ্ড নীরবে খসে পড়ে রাত্রির সমস্ত কাঠামো

প্রচণ্ড নীরবে খসে পড়ে রাত্রির সমস্ত কাঠামো

প্রচণ্ড নীরবে খসে পড়ে রাত্রির সমস্ত কাঠামো
697
0

বৃক্ষেরও আছে ঘুমপাড়ানি গান। ঘুমের আগে তা শিশুবৃক্ষরা শোনে। শুনতে শুনতে খায়, ঘুমায়। ওরাই রচনা করেছে আদিম সংগীত; পাখিদের প্রতিবেশী। হয়ত পকেট হাতরে পাওয়া যাবে বাঁশি বাজানোর স্মৃতি। মায়ের কবরে দাঁড়িয়ে ওরাই গাইতে পারে বেদনাসংগীত।

অক্ষয় বটের স্নেহে যারা ঘুমিয়ে গেছে শেকড়ের ভেতর মাটির ঘণ্টা বাজলে
তারা শুনে শোকের মাতম।
প্রতপ্ত নুড়ি পাথরে মুখ গুঁজে শ্বাস নাও পাতার বসতি জুড়ে ছড়িয়ে দাও
অসংখ্য কংক্রিটের হাত
তুমিও শুনতে পাবে প্রথম ঘুঙুর নাচের আওয়াজ

(ডলক/ সাইইদ উজ্জ্বল)

২.
দাঁড়িয়ে থাকলেই বুঝি ঘোড়ারোগ তাকে! ঘোড়ারোগ নেই, ঘোরা রোগ আছে। পেছনে তাকানো নতুন অভ্যেস; প্রাণীজ ব্যাকরণ বলে, পেছনে তাকানো পাপ—যে কোনো ভাবে শুধু পেছনে ‘ফেলতে’ হয়। মাটির পাশে দাঁড়িয়ে আছি যদি বলি তবে বিশ্বাস হবে কি? একাকী জোনাকি আলো দিয়ে চলে গেল আমার জামার ভেতরে, সজোরে।

ফয়েল প্যাকে বাতাস এসে শব্দ তোলে কর্কশ, কানে লাগে
পরিবেশবাদীদের নিদ্রামগ্ন শরীর তখন আড়মোড় ভাঙে
প্লেজার ট্রিপের রোদ ফুরিয়ে বৃষ্টি নেমে এলে চারদিকে
আমাদের তখন সাঁতার শেখার তীব্র বাসনা জেগে ওঠে।

ছিপ দিয়ে মাছ শিকারের ধৈর্য আমরা হারিয়েছি আগেই
খাদ্যজ্বর আমাদের পুড়িয়েছে বিকলাঙ্গ জিহ্বার ক্রন্দনে
নেহায়েত মুগ্ধতা শোনায় গল্প, বলে কত ম্যানিফেস্টো
আসলে এইসব ঢেকে রাখা মুখোশের কলকব্জা বিশেষ!

(প্লেজার ট্রিপ/ সৈয়দ সাখাওয়াৎ)

৩.
টাংকি ফুল হলে কেমন ঝিমুনি লাগে!.. নদীতে লাফ দিতে ইচ্ছে করে… ঝপঝপ জল পতনের শব্দ আর ঘর ঘর ঘর ঘর বুঝি নাক ডাকছে ঘুমন্ত শরীর। মনে হয় যেন গলাপথ বেয়ে অগ্নিফুলকি বয়ে যাচ্ছে; তরল আগুন। তার সাথে মাথার গভীরে একটা রেলগাড়ি চলছে, ঝমঝম ঝমঝম… কু ঝিকঝিক কু ঝিক ঝিক…

কত উল্টোপাল্টা ভাবি, কত উল্টোপাল্টা দেখি! আসলে পুরোটা সময় একটা প্রজাপতিদেবী আমাকে পথ দেখায়, সঠিক পথ ধরে নিয়ে যায়। ওহে প্রজাপতিদেবী, আমি তোমাকেই ভগবান মানি।

ভরদুপুরে জেগে উঠেন ভগবান টিলা
গায়ে পাখির পোশাক পরে জটাচুল নাচে
মেঘডুমুরের বনে; তামাটে রোদে বেঘোর
মাতাল—দু’হাঁটুর মাঝে বয়ে দিলেন এক
ফটিক জলাধার। দূরে ঝাপসা পুরুষের
স্থির ছায়া দেবী তোমার অজুহাতে কাঁপে।

কোথায় যায় মন গোত্তা খেয়ে খেয়ে মন
লাটিমের সুতো ছিঁড়েছে যদিও ভগবান
তোমার টালত আমার মাটির ঘর; নাহি
পড়বেশী হাঁড়ি ভরে দিও প্রভু মদে-গানে
যতদিন বাঁচি।

(ভগবান টিলা/ উপল বড়ুয়া)

৪.
ক’দিন আগে একটা স্বপ্ন দেখেছি ফের; স্বপ্ন না আসলে দুঃস্বপ্ন। দেখলাম: খুন হয়ে যাচ্ছি, দৌড়াচ্ছি…

ঘুমাতে সাহস পাচ্ছি না সেই স্বপ্নের কথা ভেবে। তুমি আমাকে ঘিরে থাকো ঝিমলি; স্বপ্নটা আমাকে খুন করে ফেলবে…

কী কষ্ট হবে বলো তো, যদি ফের না জন্মাই! অথবা ভাবো তো যদি আমার ভূত মাঝরাতে তোমার বিছানায় উঠে বলে, দ্রুত উঠো, নইলে ট্রেন ফেইল করবে তো। সত্যি করে বলো তো, তুমি তখন কী করবে?

ঘুম থেকে জেগে দেখি খুন হয়ে গেছি। কারা কারা যেন আমার কব্জি দিয়ে বানানো কাবাবের দিকে তাকিয়ে কাঁটাচামচ খুঁজছে। কব্জির পাশে ওয়াইনে ভিজিয়ে রেখেছে আমার স্বপ্নকাতর চোখ। যেন চোখ দুটো মুখে পুরলেই, আমার স্বপ্ন ইনস্টল হয়ে যাবে ঘাতকদের চোখে। খুলিটা ডিপ ফ্রিজে রেখে দিয়েছে; পরবর্তী ভোজের পরিকল্পনায়। আমার স্নেহাস্পদ ঘাতকেরা আমার হৃদয় ধরে টানাহেঁচড়া করে নি আর। আমি নিহত হয়েছি, আমার কব্জি-চোখ-মগজ ওদের দখলে। ওদের কাছে এতটুকুই হয়তো ব্যাস্। তারপর তুমি আমার হৃদয়টাকে মাশরুমের মতো কেটে টুকরো টুকরো করে জিরো ফ্যাট ম্যায়োনিজ দিয়ে বানিয়েছো সালাদ।

(৯ জুলাই ২০১৫/ আহমেদুর রশীদ)

৫.
রোদের কারণে ঘুম ভেঙে গেল ঝিমলি। এত তীব্র রোদে আগে আমি কিভাবে ঘুমাতাম? যেভাবে যেদিক দিয়ে পাচ্ছে আলোরা ঢুকে পড়ছে। হা হা আ হা। তীব্র গরম ভাবে জ্বলন্ত চুল্লি। এখন কী হবে ঝিমলি; আমার তো ঘুম ভেঙে শরীর পুড়ে গেল!

প্রচণ্ড বাতাস ভেদ করে চলে গেল এক ঝাঁক তীব্র প্রজাপতি। তুমি কি প্রজাপতির রঙিন ডানা ভালোবাসো মেঘ?

যেন ঝরা ফুলের বিষাদে আমি হই উনুনের
আগুন-উত্তাপ; জলচোখ পাপড়িগুলো খুলে, তুমি
দ্যাখো জলজ নীলের জলোচ্ছ্বাস। হলুদ গোলার্ধ
বুকের পরিধি উপছায়া মাঝখানে নুয়ে আসে।
উঁচু ঢিবির মতন হাঁ-ক’রে রোদ মেখে
নেয় বালুর শরীর; প্রবল নুনের দীর্ঘশ্বাস
স্রোতহীন কাদায় উর্বর জলের বুদ্বুদ কেটে
ভেসে যায়। সন্ধ্যাঅগ্নি যেন গোধূলির চোখ মুখে
পুরে দেয় দেহের আলোক। কচুরিপানা পাতার
উপর বিষের নীল উল্লাস, রক্তের ছোপ ছোপ
মৌন বাতাসের স্বপ্নরিক্ত অনুভূতি, যতদূর
চোখ যায়, নীলিমার বুকে গাঢ় রাত্রির আঁধার;
অনন্তের পূর্ণিমায় ফুঁড়ে ওঠে ফুলের পরাগ
তোমার উচ্ছল, দেহের আবেগ বীজ বপনের।

(হাঁ/ চঞ্চল নাঈম)

৬.
রাত্রিকে অস্বীকার করে ফ্রেম থেকে ছুটে যায় কেউ। ও চোখে কেবলই ছুটে চলা; প্রচণ্ড নীরবে খসে পড়ে রাত্রির সমস্ত অন্ধকার। এ আঁধার কবর সমান দীর্ঘ; মরুর তপ্ত বালুর মতো তেজি। তাকেই কি না অস্বীকার করে ছুটে যায় চিরমলিনের হাসি! আশ্চর্য সে তাকায় না পেছনে—কিংবা আশেপাশে; অনুভূতির বড়শি গাঁথে না বুঝি এইসব কথামালায়। সামনে যদি মেঘমল্লার থাকে তবে তো সমস্ত পিছুটান ছুটে যাবে ওর। এত সময়ের বিশিষ্টতা গ্রীষ্মজ্যাকেটের মতো খুলে টুপ করে বসে পড়বে পছন্দমতো আড়ালে; বিদায়ের ক্ষণে ক্রমাগত ডেকে ডেকে অঘ্রানি কম্বলের মতো জড়িয়ে নেবে প্রিয়তম সঙ্গীকে।

দৃশ্যে যে ছিল, সে অন্য কেউ। অনাহুতের মতো ফ্রেমে ঢুকে পড়া শুধু। ওগো রাত্রি, হে তুমুল আঁধার-ঢাকো; আমাকে আড়াল করো। দৃশ্যে, চিরমিলনের হাসি, অমলিন থাক। চলাচল গতিশীল হোক আরো।

দৃশ্যচ্যুত আমি- বিদায়ের ক্ষণ এল বুঝি চলে!

(মা ও বিবিধ প্রলাপ-৫/ বিধান সাহা)