হোম গদ্য পূজারী, জীবন্যাস ও আলোচ্য পেটকাটা ঘুড়ি

পূজারী, জীবন্যাস ও আলোচ্য পেটকাটা ঘুড়ি

পূজারী, জীবন্যাস ও আলোচ্য পেটকাটা ঘুড়ি
1.05K
0

পূজারী


তখন তোমাদের বারান্দা ঘেঁষে একটি মাত্র আতাফলের গাছ ছিল। গাছটিকে প্রতিদ্বন্দ্বী করে তোমাদের বাড়ির বারো হাত উঠোনে একদা আমি আমার চারা-স্বপ্ন রুয়ে আসার সাথে সাথে হাড়-মাংস-ছায়া-জিহবা-কলিজা রুয়ে আসি। ভেবেছি—পৃথিবী পরিভ্রমণ শেষে ফড়িংগুলো এসে আমার বাগানে উত্তাপ ছড়াবে। ভেবেছি—জগতের সব পীর-আউলিয়া-পয়গম্বর-চেয়ারম্যান-মুচি-চামার-মন্ত্রী তোমার এবং আমার মুরিদানি নেবে। আমি পীর হবো, আর তুমি পিরানি হয়ে সংসারের সব কৃপণ মানুষের হাতে জ্যোৎস্নার তবররক তুলে দেবে; তোমাদের দক্ষিণ-পুতার সর্বকনিষ্ঠ সুপারি গাছটি এক শীতার্ত রাতে তোমায় জননী বলে ডাক দেবে, আর আমি ক্রমেই পিতা হয়ে উঠব প্রকৃতির। সেদিন তোমাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। আমার চারা-স্বপ্নগুলো দুরন্ত মহিষেরা গিলে খাওয়ার পর শূন্য উঠোনে বাড়ির বুজুর্গরা যে ফ্ল্যাট বাড়িটি বানিয়ে রেখেছেন, আমি সেখানে বে-শরম রাত্রি যাপন করি। বড়-ঘরের বারান্দার পাশে বুড়ো আতাফল গাছটি এখনও বেঁচে আছে। স্বপ্নহীন লোহার আতাফল ধরে বলে ফলের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া সারিবদ্ধ পিঁপড়ার পাল ভুল করেও ফলের মিঠা চেখে দেখল না। তুমি গ্রামে থাকো না তাই সারা গ্রাম ভরে গেছে মশা ও মৌলবাদে। এখন তোমাদের গ্রামে টিউমারের মতো লোহার ঘরবাড়ি ক্রমবর্ধিত হচ্ছে। তোমার চরণ হতে শাদা শাদা ঘাসফুলের জন্ম হয় না বলে ভীষণ কান্না পেয়েছে আমার। আর তো তুমি জানোই, কান্না পেলে আমিও ঘন ঘন তেল মাখি। ২ দীর্ঘদিন পর স্নান সেরে লস্কর আজিজ নাভীতে তেল মাখে। একদা আম্মাজি আদর করে খাঁটি গৌড়গোবিন্দ সরিষার তেল মাখিয়ে দিতেন। সারা শরীর মর্দন শেষে এক কলকি তেল নাভিতে মালিশ করায় লস্করের জিজ্ঞাসার জবাবে আম্মাজি বলেছিলেন—নাভি হলো মানুষের জড়; গাছের জড়ে যেমন জল দিতে হয়, তেমনি মানুষের জড়ে তেল দিতে হয়। লস্কর আজিজ নাভিতে তেল মাখলেও হাড়ের মেঠো পথে নীলবর্ণ ঘোড়াদের বল্গাহীন দৌড় কোনো রকমেই থামাতে পারে না। সে ধুলাক্রান্ত হয়। তীক্ষ্ম ক্ষুরের আঘাতে আহত ধুলা ও মাংসের রেণু পরিষ্কার শেষে বারবার তেল মাখতে যুদ্ধ করে লস্কর আজিজ—ষোল বছর আগে হইরো পেরে তেল উত্তোলনে যে রকম যুদ্ধ করেছিল চরকাসিমপুর মাড়াই কলের লোমশূন্য এক অসুস্থ ঘোড়া। ৩ যখন ছোট ছিলাম, তেল চিকচিক আমরা দলবদ্ধ হয়ে টাউনে যেতাম। কালিগঞ্জ মটরস্ট্যান্ড হতে বাসটি যখন শহরমুখো হবে, জানালার পাশে বসে ইলেকট্রিক খোটায় বসে-থাকা পেচকুন্দা পাখির দিকে তাকিয়ে কী যে মায়া হতো আমার! এ-তো আমারই পাখি, আমার মাতৃকূলে জন্ম নেয়া আমাদের গ্রামের। মটরের পেটে বসে আমি আর পেচকুন্দা পাখি মাইলের পর মাইল ধান ক্ষেত, বাঁশবরণ্ডি পেরিয়ে শহরমুখো হলেও ইলেকট্রিক তারের সাথে পেঁচিয়ে থাকা মৃত কাকগুলোর দিকে তাকিয়ে আমাদের কেচমা হৃদয় হু হু করে উঠত; মটর যাত্রা এক সময় শবযাত্রার মতো মনে হলে আমার নগরভ্রমণ আর কী করে আনন্দের হয়, বলো! যখন কিছু বড় হই (মানুষ আর কতটুকুই-বা বড় হতে পারে!), নির্জন নদীতীরে আমারে তুমি হলুদ গেন্দাফুল দিলে, সংসারের সকলের কাছ থেকে এ-আমার নরম হৃৎপিণ্ডটি ইতিহাস বইয়ের মলাটের নিচে লুকিয়ে রাখি। তুমি তো জানোই, ইতিহাস বইয়ে অজস্র মৃত কাক ও মানুষ শুয়ে আছে। শুধু তোমার পরশ-ধন্য গেন্দাফুলের জন্য গ্রন্থখানি গভীর মমতায় বহুদিন আগলে রেখেছি। জানি না কতটা ভালোবেসেছি তোমায়, গেন্দাফুল-ভরা ইতিহাস বই ভালোবেসে থাকলে আমায় কি তুমি প্রেমিক না বলে বলবে—জাতিস্বর। ৪ জ্বালানি তেলের দাম লিটার প্রতি আরও দশ টাকা বেড়েছে। লস্কর আজিজ করু-তেল মাখে; তিন লিটার জিপটি ক্রোড-অয়েলের বদলে করু-তেল দিয়ে চালানো সম্ভব হলে তার বিশেষ উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ছিল না। লক্ষ লক্ষ বছর আগেকার পচা মাছ, হরিণ, পাতা ফসিল না-হলে জ্বালানি তেলের জন্ম হয় না বলেই কি পৃথিবীতে এত তেল-যুদ্ধ? মানুষ বোমা বানাতে পারে, খনিজ-তেল তৈরি করতে পারে না। মৃত্যুবরণের পর লক্ষ লক্ষ বছরে মানুষ কি তৈল পদার্থ হয়ে পুনর্জন্ম লাভ করবে? লস্কর আজিজ পচে পচে লস্কর আজিজ মাখে, সে করু-তেল মাখে। ৫ তোমার মনে আছে, তোমাদের বিদ্যাপীঠ যাওয়ার সরকারি সড়কে নির্নিমেষ ধুলা হয়ে কতদিন তোমার চরণের অপেক্ষায় থেকেছি; মঈল হয়ে দিনমান তোমার নখের গুঁড়িতে লুকিয়ে রয়েছি বিদগ্ধ প্রেমিক। যখন তুমি বাড়ি ফিরতে, তোমার কাছে প্রার্থনা করেছি, পুরলের ছোলায় আর কোনো দিনও তুমি চরণ ধুয়ো না… তোমাদের গ্রামের কেউ কেউ তাজমহল দেখে আশ্চর্য হয়েছে। কিন্তু তুমি আমার দিকে একপলক তাকিয়েছ, এমন অত্যাশ্চর্য ঘটনা তোমাদের গ্রামের কেউই দেখে নি। আজও ভেবে পাই না, কেন যে তারা এত মাখাল ছিল! ৬ গুইট-ভাঙা গরুর পাল বিভিন্ন মাঠে ছড়িয়ে পড়লে ভগ্ন-বটগাছের ছায়ায় নতজানু হয়ে বসে থাকে পঙ্গু রাখাল। সন্ধ্যা মিলিয়ে যায়—সে আর বাড়ি ফিরে না। আকাল আসে চারিদিকে। বুরো জমিনের পেট চৌচির হলে আজিজ লস্করের মোলায়েম চামড়া সন্তর্পনে ফেটে যায়। আজিজ লস্কর ক্লান্তিহীন করু-তেল মাখে। ৭ সূর্যের দিকে মুখ করে একদল লোক কবে যে শূন্য মাঠে বাড়িগুলো বানিয়েছিল! মানুষের পর মানুষ বাড়িতে বসবাস করে অথচ চোখের সামনে লেপাপুচা দেয়ালগুলোতে শ্যাওলা লেগে যায়, গেউর লাগে পুরনো পুকুরের ঝাওয়া পাথরে। পা পিছলে যায়। তোমার সাথে সর্বশেষ কবে দেখা হয়েছিল! বারো না কি তেরো বছর আগে! সমশেরনগর রেলওয়ে স্টেশনের প্লাটফর্ম আলোকিত করে তুমি দাঁড়িয়েছিলে—তুমি কি কারো জন্য অপেক্ষা করছিলে? ট্রেন ছেড়ে যাবার হুইসেল না বাজলে তোমাকে বলা যেত—এই দেখো, এই আমি আজও বেঁচে আছি একই জলবায়ুতে, তোমার সাথে একই পৃথিবীতে আছি! তুমি কি আমায় লোভী, অহংকারী ভেবে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে! নাকি অবাক হয়ে দীর্ঘ তাকিয়ে থাকতে, অতঃপর হলুদ গেন্দাফুলের মতো হেসে উঠতে! তোমার গালে কি বিদ্যুতের দ্যুতি নিয়ে ঠোল পড়ত তখন! কেমন তোমার মুখাবয়ব! নাকের অগ্রভাগটা কি সামান্য বোচা রয়েছে আগের মতন? ঠিক কতদিন আগে তোমার সাথে দেখা হয়েছিল—দশ, বারো, আট বছর আগে? সমশের নগরে নাকি মনতলা রেলওয়ে স্টেশনে? অগত্যা পুনর্বার দেখা হলে বলা যেত-নাতো একটুও চিনতে পারছি না তোমায় মগজে গেউর লেগেছে স্মৃতিরা পা ফসকে পড়ে যায়। তুমি কি খুব বিষণ্ন হতে তখন? তুমিও কী বলতে—গালের এইখানে ঠোল পড়ত একসময়, এখন পড়ে না… পিছলে গেছে বয়স, লাবণ্য। …আর তো তুমি জানোই, লাবণ্য ধরে রাখতে জগতের সকলেই ময়েশ্চার ব্যবহার করে। আমার চামড়া-ফাটা-মাঠে চূড়ান্ত আকাল এখন, আর আমি দিনে দুবারের পরিবর্তে দুশোবার করে করু-তেল মাখি।


জীবন্যাস


গত দুইদিন অথবা দুইশত বছর যদিও তুমি পিরামিডের মতো স্থির থাকতে চেয়েছ, ভেতরে অনুভূত হয়েছে ফেরাউনের মমির কম্পন। মরুতাপে উচ্চকিত ধ্বনি বার বার মিশে গেছে বালির প্রপাতে—খুফু রে, রে ফেরাউন… ঈষৎ ফেটে-যাওয়া মমির ভেতর ঢুকে পড়েছে কয়েকটি উঁইপোকা; তোমার মনে পড়েছে শৈশবের ইতিহাস বইয়ের সবুজ মলাটটির কথা। গত দুইদিন তুমি স্থির থাকতে চেয়েছ অথচ দেখলে—তাড়া-খাওয়া পূর্ণিমা হঠাৎ ঢুকে পড়েছে তোমাদের কলাপসিবল গেটের ভেতর। আহারে জ্যৌৎস্নী! এমন সুন্দরী রাতে কেবল মরে যেতে ইচ্ছে করে। তুমি ভাবো—সুন্দরী চৌথাই নদীটি যেভাবে মারা গেল… আর ঐ যে নারী কোনো এক ডুবন্ত বিকেলে বউ হয়ে চলে গেল দূরের গ্রামে। দূর পর্বতে দৃশ্যমান হলো ঝর্ণাগুলি—শুধু আত্মহত্যা করছে গড়িয়ে গড়িয়ে। রক্তাক্ত তুমি ছায়া সন্ধান করো। দৃশ্যমান হয়—ফাল্গুনের চাঁদের আলোয় তোমাদের গ্রামের উঠোনে আড়াআড়ি পড়ে আছে ডালিম ডালটির চিরল ছায়া। বাতাস বইছে ছেঁড়া ছেঁড়া। ছায়াগুলি ছায়ার শিরচ্ছেদ করছে ধীরে। দেখতে পাও—তোমাদের বাগিচা বাজারে লন্ঠনের নিম-আলোয় ইলিশের পেটির মতো চিকচিক করছে ঘাতকের ছোরা। এ দৃশ্যে তুমি নিদ্রা যেতে পারো না। বরং শুনতে পাও—তোমার শিথানের পাশে লাল-পাকুড়ে বৃক্ষের বয়স্ক পায়ের আওয়াজ। তারা হাঁটচলা করছে; গুড়ি-কন্দের শব্দ থেঁতলে দিচ্ছে নৈঃশব্দ্য। দৃশ্য উচিয়ে চলে যাও দৃশ্যান্তরে। লোহার গালিচায় বিষণ্ন বালিকারা বসে আছে। তাহাদের হাতে নীল নয়নের নুড়ি। বুঝে উঠতে সামান্য সময় লাগে— বালিকারা কোটর হতে চক্ষুদ্বয় খুলে ফেলেছে, বালিকাদের হাতে এখন মার্বেলের মাছি; তারা চক্ষু খেলায় মনোযোগী হয়—দপ্পা এক, দপ্পা দুই… নির্ঘুম সারারাত ভাবিত হও—ঐ বনমর্মর আর হরপ্পা নদীর নির্মাণশৈলী নিয়ে। তোমার হাতের কাছে প্যারামাকন, পাখিদের ঠোঁট; তোমার হাতের পাশে ম্রিয়মাণ খাগড়ার কলম ছিল। যুদ্ধ করেছ সারারাত অথচ কিছুই লিখতে পারো নি। তাকিয়েছ হাতের কৈশিক শিরা উপশিরা আর রক্তপ্রবাহের দিকে। হস্তদ্বয় গুটিয়ে গেছে কেঁচোর মতো। তোমার হাতে রঙিন কোনো কমলা নেই, শিশিরের স্তন নেই। আপাতত তোমার কোনো হাত নেই; পৃথিবীতে আর কোনো হাতের অস্তিত্ব নেই। তোমার চোখ নেই, কান নেই, তোমার চারপাশে মুণ্ডুহীন জোলেখা সুন্দরী কুহু কুহু রবে… তুমি তাকিয়েছ দূরতম দেশের দিকে—ঐ দেশে কিছুই নাই বন্যাকবলিত পিতার কবর ব্যতিরেকে। তোমার ঘাড়ের ডানদিকে শিলং শহর। কে যেন বলে যায়—ঐ শহরে সরকারি দিঘিতে একটা নীলপদ্ম ফুটেছে; আর যে নারী যুবতী, তার জানালায় সামান্য ঝুলে পড়েছে জুঁই আর শেফালির ঝোঁপ, বাঁ দিকে ঘাড় ঘোরাতেই তুমি বিমর্ষ হও। ল্যাম্পপোস্টের ঘোলা আলোর ভেতর একপাল জন্মান্ধ পতঙ্গ উড়ছে, উড়ছে… যে তোমার বন্ধু ছিল, প্রিয় কিশওয়ার এখন মৃত্যুর রাজা… সুবেহ সাদিক ভরা মাঠ। অশ্বারোহী তুমি যাচ্ছ প্রভাতের দিকে। দূর গাঁয়ে ঝুলে আছে কুয়াশার রেখা। শিশিরসিক্ত মাঠে হৃৎকম্পন থেমে থেমেই শুনতে পাচ্ছ আর দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে অচিন পশুদের মগ্নতার শীৎকার। দুরন্ত তোমার হস্তদ্বয় কে যেন ঝাপটে ধরে হঠাৎ। প্রাণপণ যুদ্ধ করো তুমি; কিছুতেই মুক্ত হতে পারো না। সে এক কালো মানুষের হাত, হাতের কব্জি… শেষবারের মতো তাকিয়ে দেখো—লাল ঘোড়াটি তোমায় ফেলে রেখে কুয়াশার গ্রামে মিলিয়ে যাচ্ছে। কোনো এক শাকিলা পাখির ডাকে তুমি ইচ্ছে করলেই এখন জেগে উঠতে পারো না। এখন তুমি আর কেউ না। অথচ একদিন ছায়ার ঘনত্ব খুঁজতে যেয়ে লুকিয়ে পড়েছিলে ঝুনা নারকেলের পেটের ভেতরে। নারকেলের ভেতরে জল; আসলে জল নয়, মেঘের মগজ। তুমি বসে থাকলে ফলের পূর্ণিমায়। নিজকে মনে হলো অনেক অনেক কুচবর্ণ অথচ অভিজ্ঞ, প্রাচীন শিলাখণ্ডের মতো; মনে হলো তুমি এক কুকাপণ্ডিত, বসে আছো কুকাশাস্ত্র হাতে; দুই কাঁধে দুইখণ্ড অজগর যাদের রয়েছে নয়শত মাথা…। মাঝে মাঝে উলঙ্গ দুপুরে তুমি আসন পেতেছ নীলনদের তীরে। প্রাচীন গুনিন তুমি, উড়ন্ত কবুতর দুইখণ্ড করে প্রেয়সীর পায়ের কাছে ফেলে দিয়েছিলে আর ঘর্মাক্ত তুমি শিশির খুঁজেছিলে নারী সর্বংসহার বুকের গহিনে। সময় চলে গেছে; মহাকালের হা-করা গর্তের ভেতর সময় অনেক তো চলে গেছে। বহুবর্ষ আগে ঐ সুবেহ সাদিকের মাঠে তোমায় চেপে ধরেছিল ঐ যে হস্তদ্বয়, থামিয়ে দিয়েছিল রথযাত্রা তোমার, পাঁজর ফুঁড়ে সর্বভুক যে শিকড়গুলি মুখের দিকে ধাবমান তা হলো বৃক্ষের দাঁত, জিহ্বাবলি। ঠিক দুইদিন নয়, দুইহাজার বছর ধরে তুমি মানুষ নও; তুমি মূলত বৃক্ষের আহার…


আলোচ্য পেটকাটা ঘুড়ি ও কমলা রঙের হাতি পরম্পরা


একটা পেটকাটা ঘুড়ির ভেতর বাতাসের মুখ আবিষ্কার করতে পেরে আশির দশকের শেষের দিকে চরকাসিমপুর গ্রামের একদল বালক ভাঙা দাঁত ও ছেড়া জিহ্বা বের করে যদিও হেসে উঠেছিল কিন্তু বড় হয়ে আকাশভর্তি শকুনের ঠোঁট ও মানুষের ছিন্নভিন্ন হাত-পা-পাঁজর এবং মৃত কুকুরের ছায়া প্রত্যক্ষণের পর চিরদিনের জন্য ঘুড়ি উড়ানোর কৌশল ভুলে গিয়ে দলবদ্ধ তারা যখন নগরমুখো হয় তখন কেউ কেউ সাঁকো ভেঙে জলের গর্তে অগত্যা হারিয়ে যায় এবং দুতিনজন ছাড়া সকলেই দশ-বারো বছরের ব্যবধানে ভেসে ওঠে পৃথক পৃথক জল ও স্থলখণ্ডে—লেবাননে আফগানিস্তানে জয়দেবপুরে শমসেরনগরে এবং যারা যাত্রা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয় তারা হাত ধরাধরি করে সড়কের পর মহাসড়ক পেরুতে যেয়ে জ্ঞাত হয়—এ পন্থে চলাচলকারি প্রতিটি ট্রাক বাস মহিলা-বাসসহ অটোরিক্সা হামাজীব নট-নটী এবং রাষ্ট্রপতি মহা-রাষ্ট্রপতিসহ সমগ্র বাংলাদেশের ওজন পাঁচটন করে অর্থাৎ চরকাসিমপুর গ্রামের একটা তিনপায়া উনুনের ভেতর আগুনের ওজন অথবা গ্রামসুন্দরী ভাবিটির স্তনের ওজনের সঙ্গে বিস্তর ফারাক অনুভব করে ঈষৎ বিস্মিত তারা মহাসড়কের মধ্যবর্তী আয়ারল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আপাতচঞ্চল ডানদিকে তাকিয়ে বাঁ দিকে ঘাড় ঘুরাতেই কমলা রঙের হাতিগুলোর কথা ভুলে গিয়ে পেটকাটা ইঁদুরের ভেতর দলবদ্ধ মানুষের লুকিয়ে-পড়ার-দৃশ্যে বেশ আশ্বস্ত যদিও তবু মনে পড়ে যায়—প্রতিমাসে আঠারোবেলা ভাত খাওয়ার জন্য কমপক্ষে বিশটি সাপ ধরে কোনো প্রযত্নে যখন জীবনধারণ অসম্ভব হতো তখন প্রতি বর্ষা-মৌসুমে কয়েক মণ ঘাড়—ব্যাঙ ধরে কয়েক মণ ভাঙাধানের বন্দোবস্ত করতে হতো… তারপরও তাদের নির্জন পল্লীতে পূর্ণিমা আসত আর ধবল উঠোনে আগুনে-পোড়া পূর্ব পুরুষের মুখ ভেসে ভেসে পুনরায় মিলিয়ে যেত… বেড়ালের হর্ষধ্বনি হতে অনেকগুলো নতুন বেড়ালের জন্ম হলেও কোনো এক প্রত্যুষে নিদ্রা ভেঙে তারা নিরাধারা কান্না করেছিল… ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হতে হতে বাকরুদ্ধ হয়েছিল… এখন যদিও তা মনে নেই তবে নিগূঢ় দৃশ্যকল্পটি কিছুতেই ভুলতে পারে না এ জন্যে যে—ঐ রাতে বেড়াল জননী তার সদ্যপ্রসূত ছানাটির মাথা ও ঘাড়সহ তলপেটের অংশবিশেষ গিলে খেয়েছিল এবং তা প্রত্যক্ষরণের পর অপ্রতিরোধ্য বিবমিষার সময় তারা বুঝতে পেরেছিলো—মানুষ তার সারাটা পাকস্থলী সরু ছিদ্র দিয়ে উগলে দিতে পারে কিন্তু পাকস্থলী হতে বেড়ালের মাথাটা উগলে দেয়া প্রায়-অসম্ভব…

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু

জন্ম ৩০ নভেম্বর, ১৯৭০। মাতৃমঙ্গল, সিলেট।

মূলত কবি। পাশাপাশি কথাসাহিত্যিক, গদ্যকার, ক্রিটিক।

অনিয়মিত ভাবে সম্পাদনা করেন চিন্তা ও চিন্তকের একটি ছোট কাগজ ‘ধীস্বর’।

গ্রন্থ সংখ্যা ১০ এর অধিক।

আটটি কাব্যগ্রন্থের সংকলন এক মলাটে ‘বিদ্যুতের বাগান সমগ্র’ নামে পাওয়া যায়।

প্রকাশিত দুইটি উপন্যাস ‘কাফের’ এবং ‘জ্যোৎস্নার বেড়াল’।

dmonju@hotmail.com

Latest posts by দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু (see all)