হোম গদ্য পুরোহিতের পাঠ : ব্যক্তিত্ব ও কবিত্বের কাঠগড়া

পুরোহিতের পাঠ : ব্যক্তিত্ব ও কবিত্বের কাঠগড়া

পুরোহিতের পাঠ : ব্যক্তিত্ব ও কবিত্বের কাঠগড়া
402
0

জীবনকে সঞ্জীব পুরোহিত উপভোগ করেন কোনোরকম মতলবি শুচিবায়িতার ধার না ঘেঁষে। তাঁকে দেখলে মনে পড়ে শত সংকীর্ণতার মধ্যে এখনো আকাশ আছে, উপরে তাকানোর ইচ্ছে যদি কারো মরে গিয়ে থাকে, তার কাছে গেলে উপশম পাওয়া যায় এক-রকম। তাঁকে প্রথম দেখে অপচয় বা বিশৃঙ্খলার মতো একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরতে পারে, কিন্তু অপচয় বা বিশৃঙ্খলা তাঁকে টলাতে পারে না, সবই তাঁর আপাত-অপচয়, আপাত-বিশৃঙ্খল

ধ্বনিগুচ্ছের অর্থসঞ্চারী বিন্যাস যদিও ভাষা-অভিধায় স্বীকৃত, বিধিবদ্ধ সংগঠন আকারে তার প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব যখন তা বিজ্ঞানসূত্রের সমর্থনে সুশৃঙ্খল সাঙ্কেতিক বুননে রূপায়িত। ভাষা আকারে ধ্বনিপ্রবর্তনের যে নকশা স্বীকৃত তা সাঙ্কেতিক রক্ষা-ব্যবস্থায় উত্তরিত হোক বা না হোক তাকে দ্বিমাত্রিক শ্রেণিকরণে প্রকাশ করা যায়—প্রথম মাত্রাকে শাদামাটা ঘরকুনো ভাষা বললে দ্বিতীয় মাত্রাকে বলতে হয় পোশাকপরা সাহিত্যভাষা, বিশেষ করে বললে কবিতাভাষা। ভাষার এ-দুটি রূপমাত্রায় বলিষ্ঠ বিসঙ্গতি বিদ্যমান বলেই তা যে অকাট্য মৌলিকতায় বিভিন্ন, ব্যাপারটি এমন নয়; দুটি রূপকাঠামোর একটি অভিন্ন আদিকেন্দ্র আবিষ্কার সম্ভব–যোগাযোগ বা ভাব-বাটোয়ারায় অপৃথক সিদ্ধি উভয়ের ক্ষেত্রেই অর্জিত, যদিও তাতে পরিমাণভেদ ও গুণবৈষম্য স্বীকার্য। সঞ্জীব পুরোহিতের কবিতায় দুটি ভাষামাত্রার কোনো একটাকে বিশেষ গ্রাহ্যতায় বরণ করা হয়েছে, সোজাসাপ্টা এমন কথা বোধ করি বলা যায় না, বিষয়টি বিশ্লেষিত হওয়ার আগে এটুকু বলা যৌক্তিক, কায়দামাফিক নকশা কাটার আশায় তিনি দুটি ভাষাকৌশলকে বুনিয়েছেন নিজের চাহিদার অনুপাতে।

shamsআলোচনার ভেতর-মহলে প্রবেশের আগে বার-দরোজায় দাঁড়িয়ে একটু কেশে নিলে গলাটাও পরিষ্কার হবে, আবার অন্দরের সাড়া কেমন করে আসে তার নিকেশও একটু কষে নেয়া যাবে। ‘আমার বই প্রথম ভাগ’ কবিতাসঞ্চয়ের ‘ব্রেকফাস্ট’ শিরোনামে, যখন তিনি বলেন ‘ক্যাডবেরি রঙের ঘুমের ওপর বসেছিলো চকলেট রঙা শালিক’, উপলব্ধি সহজ হয় না সে ভাষা আটপৌরে না আলঙ্কারিক—স্বাভাবিক ভাষাবোধ থেকে ধরা পড়ে, এতে নিত্যদিনের পেয়ালায় উপচেপড়া জীবনের বিবরণে নাতিকাব্যিক নাতিবৈষয়িক ভাষা ব্যবহৃত। এটা অতিসাধারণ আটপৌরে ভাষার ছাঁটযুক্ত এজন্য যে, এতে বলা আছে বিশেষ-কেসেমের একটা কিছুর উপরে বিশেষ-ধরনের একটা কিছু বসেছিল; যদি বিশেষ একটা কিছু হয় উঁচু নিমের ডাল অথবা বিশেষ একটা কিছু হয় ছোট নিশিন্দাশাখা এবং বিশেষ আরেকটা কিছু হয় মধ্যবয়সী দাঁড়কাক অথবা বিশেষ আরেকটা কিছু হয় বুড়ো শালিখ, তখন বাক্যগুলো হবে, উঁচু নিমের ডালের উপরে দাঁড়কাক বসেছিল, ছোট নিশিন্দাশাখায় বুড়ো শালিখ বসেছিল। যেকোনো ভাষাকুশলী মনের কাছে এগুলো নিতান্ত সাধারণ বাক্যরূপেই গণ্য হবে, কিন্তু ক্যাডবেরি রঙের ঘুমের উপর চকলেট রঙা শালিখকে যখন বসিয়ে দেন সঞ্জীব, অসাধারণত্ব ঝিলিক না দিয়ে পারে না, এবং এটুকু লিখলাম সঞ্জীবের অনতিকাব্যিক অনতিবৈষয়িক ভাষাবুনুনির দৃষ্টান্ত হাজির করতে এবং তার সম্পর্কে বলা কথাকে ব্যবহারিকতার রেশ পাইয়ে দিতে। (অপ্রাসঙ্গিকভাবে এবং অনেকটা নিন্দুকের মতো আরেকটা কথার কূটাভাস রেখে যাই, ক্যাডবেরিঘুমের চূড়ায় বসা শালিখ যেহেতু ‘ধবধবে সাদা টি-শার্ট আর নীল ডেনিম’-পরা মেয়ের ঝিল পরিক্রমার দৃশ্য দেখছিল ‘ঝরিতেছে কাঁঠাল পাতা’র মতো মন্থরতায়, তবে সেই শালিখের ক্রিয়াত্মক ভঙ্গিমার বিবরণে ‘বসে ছিল’ না বলে ‘বসেছিল’ কেন বলা হলো তা কবিকে নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করা যায়।)

‘না জিগাইলে জানি আর জিগাইলে জানি না’র মতো এলিয়টীয় অভীক্ষাকে পাশকাটানোর সূত্র বলে পাশে সরিয়ে রেখে, আমরা হয়তো মনে করতে চাইব নানা-অরূপতার মধ্যেও কবিতার এক-ধরণের সংজ্ঞারূপ আমাদের অবচেতনার বরফতুষার-রৌদ্রছায়ার জগৎ জুড়ে ক্রিয়াশীল। কিন্তু তার পরও তো কলমের টানে বা বাটনের টেপাটেপিতে প্রসারিত অজস্রতার মধ্যে, বিচিত্র রূপোৎসারের মধ্যে কবিতার বহুত্ববাদী ছেনালিপনার প্রকাশ ঘটে। সঞ্জীব পুরোহিতের মানসক্রিয়ার প্রত্যক্ষ অভিঘাত ব্যক্তিগতভাবে যেটুকু পর্যবেক্ষণ করি তাতে নতুননিবিষ্টতা ও বৈচিত্র্যচারিতা তাঁকে বহুক্ষেত্রে লিঙ্গনিরপেক্ষ কাব্য-ছেনাালিপনার কাছাকাছি নিয়ে যেতে চেয়েছে বার বার। কবিতা কেমন পদার্থ—জলপানসে না জ্বালানিদাহ্য, নাকি অন্য কোনো তৃতীয় মাত্রায় সক্রিয়—ধোপা-মুচি, ক্লিপার-সুইপারকে বোঝানো শক্ত হলেও দৈনন্দিন তারা যা করে, তার ভেতর দিয়েও কবিতার অদেখা-অভিষেক ঘটতে পারে এবং ঘটে, এ তো অস্বীকার্য নয়। মাথামুটকো, গলাকাটা  সমালোচক সে কথায় কান পাতলে রোজনামচার পাতায় ধরা প্রতিদিনের ঘরজীবনে অজস্র কবিতা বা স্বাদুপংক্তির দেখা মিলতো, শুধু শুঁচিবাইয়ের সীমিত ফুলঝাড়ে কাব্য তালাশ করে বেড়াতে হতো না। সঞ্জীব পুরোহিত নিশ্চয়ই একটা উপলব্ধি অর্জন করেই তাঁর কবিতার আদলচেহারা নির্ণয় করতে চেয়েছেন, যেখানে ধোপার অ-ধোপদুরস্তি, মুচির মৌনতা আর নাপিতের কিচিরমিচির ভাষার চিকনফেঁসো জালে আটকা পড়ে। প্রযুক্তির আল্লাদ মাত্রা ডেঙালে মানুষ কৌশলে ত্বক বাচিয়ে চলতে শেখে, ডাঙার মাখলুক হাতে আর পানির কাঁটা বেঁধাতে চায় না, জেলে-ধীবর কলা ক’রে নিজেকে ‘ফিশারম্যান’ হিশেবে দেখেই খুশি থাকে। প্রযুক্তিঅলা মোটা মাপের ধীবর-মাঝির চোখ লটকে থাকে বড় মাছের চোখে চোখে। স্রোতের উজানে বসে যদি কোনো রসিক মাঝি ছোট মাছকেও ধরতে চায়, তার জালের ফাঁস একটু ছোটই হয়; তবে তা কারেন্টের ফাঁস নয়, হাতে গড়া ফাঁস—সঞ্জীবের জালের চিকন ফাঁস কাটা চিকন অনুভূতিকে ধরার জন্য যদি হয়ে থাকে, বলা বৈধ তিনি ভাবকে ধরে ধরাশায়ী রাখার কায়দা-কিরদানি জেনেছেন যত্ন করে, তিনি তাই কুশলী ধারক। জীবনকে সঞ্জীব পুরোহিত উপভোগ করেন কোনোরকম মতলবি শুঁচিবায়িতার ধার না ঘেঁষে। তাঁকে দেখলে মনে পড়ে শত সংকীর্ণতার মধ্যে এখনো আকাশ আছে, উপরে তাকানোর ইচ্ছে যদি কারো মরে গিয়ে থাকে, তার কাছে গেলে উপশম পাওয়া যায় এক-রকম। তাঁকে প্রথম দেখে অপচয় বা বিশৃঙ্খলার মতো একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরতে পারে, কিন্তু অপচয় বা বিশৃঙ্খলা তাঁকে টলাতে পারে না, সবই তাঁর আপাত-অপচয়, আপাত-বিশৃঙ্খলা, কেননা তিনি কবিতা বানান জীবনের নানা ফেলে-দেওয়া উপাদান থেকে, পরিত্যক্ত বর্জ্য থেকে, রিসাইক্লিংয়ের কারিশমাকে কাজে খাটিয়ে—যে অশ্রুচোখের অধিকার ছেড়ে ঝরে গেছে, যে স্পার্ম কনডোমের খোসায় চড়ে ডাস্টবিনে আশ্রয় পেয়েছে তা থেকেও কবিতা নিষ্কাশন করে আনার ক্ষমতা আছে তাঁর। ‘খুব ভোরে/ যৌনতাচর্চিত বাগানে থোকা থোকা কনডম ফুল ঝরে আছে/ রাতভর যে উদাম হাওয়া আগলে রেখেছে শিশির খচিত ঘাস, তার গালে একগোছা চুল আর বিক্ষত ওড়না লেগে আছে/ থমকানো স্বাধীনতা উদ্যানের  হাঁটাপথ—বেদনার পিচ্ছিল খোসা পরেছে।’

11922079_10203515113197889_432504010_nশিথিলায়নের আরাম নিয়ে অবকাশে সঞ্জীব পুরোহিতের কবিতা পড়লে বোঝা যায় জীবন ও কবিতায় পৌরহিত্যের কোনো উটকো প্রবণতাকে তিনি প্রশ্রয় দেন না; ও-বস্তুর আভাস মাত্র তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে থেকে ক্লান্তশ্রান্ত হয় এবং লাস্টে খসে পড়তে বাধ্য হয়। যে-যে কেসেমের, যে-যে টাইপের জীবন তিনি সরাসরি যাপন করেন তাকে সঙ্গী করেই অটল আস্থায় তিনি কবিতার কাছে যান, অন্যের জীবন থেকে লোনকর্জকরা মালমশল্লা তাঁর বড় একটা দরকার পড়ে না—অভিন্ন কারণে তাঁর কবিতায় নিজের জীবনের অ-বিকল, অ-ব্যহত স্বতঃস্ফূর্ততা আছে, অর্ধশোধিত বন্য সৌন্দর্য আছে, যেখানে বন্যতার মানে অসভ্যতা বা আদিমতা নয়। প্রথাপ্রচল জীবন-চৌহদ্দির বাইরে থেকে সাহিত্য রচনা করলে তা প্রথাবাধা পাঠকের জীবনের সামনে কেমন করে হাজির থাকে, সামন্তরুচির প্রলেপপরা তথাবর্ণিত ধার্মিক পাঠকের সামনে তথাকথিত অধার্মিক কবির জীবন ও কার্যক্রম কোন মাত্রায় কেমন করে মূল্য পায় তা উপলব্ধির আকর বটে। মোল্লা-পুরুতের আদর্শমতলবি বিশাল অহমিকার সরব মূর্তির সমানে স্বধার্মিক-স্বশিক্ষিত কবি বা সাধারণ মানুষ বা কাব্যকবিতা বা উদারমানবতা উপেক্ষাভরা করুণার খোরাক ছাড়া কিছু হতেই পারে না। পৌরহিত্যের এই অসারতাপ্রধান কূটকুণ্ডলি খুলে দেওয়ার জন্যই হয়তো সঞ্জীব পুরোহিত তাঁর কবিনামে একটি ঐতিহ্যবাদী ধর্মসামন্তমূলক প্রত্যয় জুড়ে দিয়েছেন; আন্ত:সাম্প্রদায়িক মেলবাধুনি জোরদার করার অনুঘোটক হিসেবেও তিনি তা করে থাকতে পারেন। পৌরহিত্যের লাউ-কলা, ডাব-গামছা আঁস্তাকুড়ে ছুঁড়ে ফেলে কবিতার মৃণাল ধরে ছোটেন কবিতা ও জীবনের জুটি-বাঁধা এক অনার্য সরণিতে। তবে ‘আমার বই প্রথম ভাগ’ কবিতাবইয়ে উৎসর্গপত্রের ভাষণমতে সঞ্জীব পুরোহিত ঈশ্বরবিশ্বাসী কবি, ঈশ্বর যদি হোন কোনো ব্যক্তিমানুষ—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর—যদিও মদের গেলাসের নিচে, শাস্ত্রভাঙা অভ্যাসের তলানিতে বিশ্বাসের সংস্কৃতি থেকে উঠে আসা স্মৃতি-ঐতিহ্যের দ্যুতি আমি মাঝেমধ্যে দেখে ফেলি, অথবা আমার চিন্তায় তা কি এমন করে ক্রিয়া করে যে ‘তোমার মনের রঙে পান্না হলো লাল’। জানি না, জানা জরুরিও নয়। নিজের বস্তুসাপেক্ষ সংবেদ-অনুভূতি, শ্বাস-প্রশ্বাস কবিতার শিরা-উপশিরায় মিশিয়ে দিয়ে রক্তের গ্লুকোজে জারিত করে তবেই তিনি সামনের পথে পা বাড়ান, একনিষ্ঠ শ্রমেঘামে সে রাস্তা তিনিই গড়েগেঁথে নেন; তিনিই তার পথজন হয়ে হেঁটে চলেন। কখনো সে পথে অন্যেরা পা বাড়ায় আবার কখনো বাড়ায় না, সৃষ্টির ঘরানায় প্রত্যেকে বানিয়ে নিতে চায় আলাদা তরিকা যা তার এবং অন্য কারো নয়। তবে এ নিয়ে তাঁর হা-পিত্যেস থাকা-না-থাকা বড়ো কথা নয়, একটা শক্তি আছে বলেই সে পথে তাঁর পা বাড়ছে, না হলে বাড়ত না হয়তো, অনুশীলনের বাহ্য কথা স্বীকার করেও। বস্তুচিন্তা ও বৈষয়িকতার চোরাবালি তাঁর পা আটকে ফেলবে কিনা সেই চিন্তায় তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীর ঘুমহারা হবার উপক্রম, কিন্তু দেখা যায় যাপিত জীবনের সাতপাঁক-ঝুট-ঝামেলার কেল্লা ফতে করে তিনি তার উপর দিয়ে কবিতার ঝাণ্ডা উড়িয়ে পার পেতে চান, এমনকি, টি-শার্টের টিসু সৃজনশীলতার লাঙলে ফালা ফালা করে কবিতায় ভরে তোলেন। এমন মানুষের ব্যবসাই কি আর কবিতাই কি, সবই তো এক পাত্রে মেশামেশি করে থাকে, সবকিছুর মধ্যেই তো সবকিছু, খুলে বললে, সবকিছুর মধ্যে আসলে কবিতা।

‘দোয়েল দোয়েল ভোরে সুনিপুণ শিশিরের স্তন ভিজে এলে/ তোমার বুকের লাল তিল বাদ দিয়ে/ সমস্ত শরীর সবুজ হয়ে ওঠে।’

কবি ও ব্যক্তিমানুষ হিসেবে সঞ্জীব পুরোহিত কেমন সে কথা একটু বলি। তিনি একেবারে আলাদা ধাঁচের, জীবন আলাদা বলে কবিতা আলাদা, কবিতা আলাদা বলে, জীবন?। তা হয়তো নয়। কারণ কি, এ কালের কবি তাঁর সব জীবন কখনোই যাপন করেন না, করা সম্ভবও নয়, কবিতায় ধরা থাকে বাকিটা, অন্তর্জীবন। প্রথম প্রথম ইর্ষাতুর অসহায়তায় তাঁর মতো হতে না-পারার চিন্তা মগজে কিছুটা বিলি কাটত, পরে বুঝে যাই আমি কোনোদিনই তাঁর মতো হতে পারবো না। সমালোচক ঝাল কষে বলবেন, কারো মতো হওয়ার ঠেকাটা বা কী—তা জানি, কিন্তু কোনোকিছুর ধার না ধেরে আমার যে কেন তাঁর মতো মানুষকেই খাঁটি কবি মনে হয়, হোক তা একুশ শতকে দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে ভাবি, সুচের ফোঁড়ে তলপেট ঝাঁঝরা করে সঞ্জীব ইনসুলিন নেন, মনে হয় কী করে তিনি এতো আত্মবিশ্বাস জমা রাখেন। তিনি এটা পারেন। তাঁর চেহারায় সাঁওতালী ধরনের একটা ভাব আছে, পুরোটাই শক্তিভরা আকরিক। বিদ্যুৎ স্টেশনে বিপজ্জনক লেখা দেখে হা করে তাকিয়ে থাকতাম ছোটোবেলায়—এতো হাজার কেপিআই, সাবধান। সঞ্জীবকে দেখলেও তা মনে আসে, মনে হয় তিনি একটা বায়োলজিক্যাল পাওয়ার হাউজ। ভয়ে একটু দূরে সরে যেতে ইচ্ছে করে, কেন, এর কোনো ব্যাখ্যা হয় না। আগে মনে হতো তিনি দেখতে সুন্দর নন মোটেও, এখন মনে মনে হয় তিনিই সুন্দর, অন্যেরা অতোটা নয়—এটা যখন বলছি, মনে রাখা চাই কোনো বালিকার ভাষ্য নয় তা। সমাজের খাপের মধ্যে পোরা যায় না যাকে, সেই অগ্রজ কবি লোকটাকে এতো ক’রে ভালোবাসি, কিন্তু কেন যেন মনে হয় তিনি তা বুঝতে পারেন না—কার কাছে কী শুনে এসে আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপে থাকেন, আন্তরিকতা দেখান হিসেব কষে, কম কম। দূরত্ব ও অসম্পর্কের কাঁটায় খোঁচা খাই কিন্তু কিছু বলা হয় না, মনকে প্রবোধ দিই তিনি এতো মানুষ নিয়ে থাকেন, আমার মতো অর্বাচীন, যার জীবন পদ্ধতির মধ্যে মিলের মাত্র কিঞ্চিৎমাত্র, তাঁর কাছে না গেলে কী হয়। কবিকে ঢেড় কচলানো হলো, এবার তাঁর ভাষাচিত্রণের স্বাভাবগতি বিষয়ে তুলে রাখা কিছু কথা তুলে ধরার চেষ্টা করা যায়, উদ্ধৃতিবাক্য চাপিয়ে পরে যেগুলো আবার বিশ্লেষিত হবার সুযোগ পাবে। কবিতায় পরোক্ষতা বৃদ্ধি ও ধ্বনিপিচ্ছিলতা যোগাতে নন্দনের প্রচলচিন্তার লাপাত্তাকরণ—ক্যাকোফোনি বা ধ্বনিকর্কশতা, আপাত-আরোপন, বহুস্তর ভাষাবিন্যাস, ডালপালাধর চিন্তাসূত্র, প্রসঙ্গান্তর বা প্রক্ষেপণ, টানাগদ্যের আশ্রয়-প্রশ্রয়—এগুলো তাঁর কবিতায় যোগ হয়ে প্রকাশের শক্তিকে সহায়তা করে, তার কবিত্ববার্তা বাস্তবতার শ্বাসকেন্দ্র থেকে উচ্চারিত, তাঁর কথার জানালায় নিত্যদিনের আলোবাতাস, উপকূলের আমদানিকরা বিলাসবায়ু নয়।‘আমাকে এক চিমটি নাও/ তোমার আঙুলে/ এক থোকা লবণ—এই আমাকে/ নাও—নিয়ে মাখো—ভালোবাসার পাতে/ উপহাসে নয়—অপমানে নয়—বিলাসিতায় নয়/ চাহিদায়।’

11911536_10203515097437495_1278750539_nবোধবুদ্ধি আর অভিজ্ঞতার শাসন—দুয়ে মিলে প্রেম-অনুভব নতুন মাত্রা পায়, যেখানে অর্থশাস্ত্রের চাহিদাতত্ত্বের আলোয় যৌনানুভূতির নোনতা স্বাদকে তিনি আস্বাদন করতে চান, ফ্রয়েডের হক-কথাকে হাতে রেখে। তখন অক্রিয়তা বা Passivity তার নিবেদনের মধ্যে প্রেমিকসত্তার অসহায়তার খোদ ছবিকে ফুটিয়ে তোলে, তাঁর মিনতিমন্থর উচ্চারণ: ‘আমাকে এক চিমটি নাও/ তোমার আঙুলে’। পরে পাই ‘চাবুকের নোনা স্বাদ’ শব্দবন্ধ যাতে ছিচকাঁদুনে বয়োসন্ধির রোমান্টিক প্রেমগন্ধ মুছে যৌনসংবেদনা ও লিবিডোত্তর ইশারা খোলাসা হয়ে ওঠে। চাবুকের অনুষঙ্গ এলে অবশ্য দারিদ্র্যের প্রহারের কথাও এড়িয়ে যাওয়া সহজ হয় না, যুগযাপনার জ্ঞান যতক্ষণ আছে আমাদের। ‘নাও তোমার ক্ষুধায় এবং চাহিদায়/ ঘাম ও অশ্রুতে সঞ্চিত/ শাদা শাদা রেখা ছুঁয়ে, চিবুক ও পিঠে/ আর চাবুকের নোনা স্বাদে/ তার থেকে সবটুকু নয়, আমাকেও নয়—/আমার এতটুক।’ ‘আমার এতটুক’ কথার প্রয়োগ বহুঅর্থসূচক—যার শুরু যৌন অনুষঙ্গে আর শেষ অনির্দেশ্যতায়, এমনকি মরমিবাদে, যদিও সঞ্জীবের তাতে আস্থা নেই। তবু বললাম এজন্য, ‘মানুষ কথা বলে না, কথা বলে তার ভাষা’, বিনির্মাণবাদীরা যেমন বলে থাকেন। যুগের প্রতি দায়শীলতা আর প্রথাবিপরীত চিন্তাছকের আলোকে প্রেমের শাশ্বত প্রতিষ্ঠানে আঘাতের প্রশ্নে তিনি অপ্রতিহত কঠোরতা দেখান, ‘বনলতা সেনে’র অজর-মূর্তিকে নতুনতর প্যারাডাইমের আঘাতে ভেঙে ফেলেন, মিথকেও তিনি পেষণ করেন একইভাবে, পুনঃনির্মাণের আশায়, মিথিক্যাল রিকন্সট্রাকশনের অভিপ্রায়ে। ‘বনলতার চোখে পাখির বিষ্ঠার মতো পিঁচুটি’ দেখে তিনি অনুভূতির তির্যকতায় ‘ডিঅ্যাস্থেটিসিজম’ বা ‘বিনান্দনীকরণে’র প্রকাশ ঘটান সহজ করে, প্রয়োজনের কামড় থেকে এবং কালের অনিবার্যতা থেকে। এডগার এলেন পো’র ‘প্রিয় হেলেন’-এর কাছ থেকে তিনি নিয়ে এলেন ‘মার্কারি-গ্লাস’, যে কারণে মনে জাগা স্বাভাবিক ‘আজ তার চোখে/ চোখ-ওঠা রোগ, বিদেশি বীজাণু সংক্রমণ।’ ‘চোখ-ওঠা রোগ’ শব্দযৌগে সমকালের দৃষ্টিপ্রদাহ এবং ‘বিদেশি জীবাণু সংক্রমণ’ কথার আশ্রয়ে অবমুক্ত অর্থনীতিবাদ, ভুবনীকরণ, বণিকীকরণ ইত্যকার অনেক কিছুর ইশারা পেতে পারেন কূটাভাসপ্রিয় পাঠক। শিল্পপ্রতারণার কূটকৌশলের প্রতি কাককক্ষশীল থেকে তিনি একটি কবিতায় শিল্প কীভাবে জীবনের চেয়ে বেশি করুণা জাগাতে পারে তার মর্ম-আকর্ষী চিত্র এঁকেছেন। ‘আহত পথশিশুটিকে পাশ কাটিয়ে যে লোকটি এইমাত্র চিত্রশালায় ঢুকলো/ ঝোলানো ফ্রেমে বিবিসি মুদ্রিত একটি শিশুর লাশের দিকে অপলক তাকিয়ে/ তার চোখে জল জমতে দেখেছি।’‘এইসব শিল্পশিল্প খেলা’ শিরোনামে যে ত্রি-ভাষী কবিতা সংকলন তিনি ছেপেছেন তাতে শিল্পকলার বিলাসিতাকে কটাক্ষ করা হয় দক্ষতার সঙ্গে, মুখে মানবতাবাদের দরদ চুয়ে পড়লেও শিল্পের নির্বেদ বিলাসিতায় কোনো মানুষ যে মনুষ্যত্বকে অপমান করে চলে তা তাঁর চোখ ফসকে সরে যেতে পারে নি। ‘বাছুরের গলায় চুমু খেয়ে যে ছুরি চালানোর মর্মকে হৃদয়ের মর্মর উঠোনে/ আছড়ে দিয়েছে, গরুর গলায় ঘুঙুরের শব্দ যিনি জুড়ে দিয়েছেন/ গোঙানির সুরের সাথে/ ব্রেকফাস্টের তন্দুরি আর কচি গরুর ঝোলে তাকে দেখেছি আপ্লুত হতে। ‘জীবনানন্দীয় প্রকৃতিনিষ্ঠার ছাঁট একটু-আধটু আছে সঞ্জীবের কবিতায়, তবে তাতে বাংলা-মানচিত্রের সবুজ শরীর আর বুকের লাল তিলচিহ্নে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক অভ্যুদয়কে ফুটিয়ে তোলা হয়; সেখানে বিশেষ কোনো নতুনত্ব আছে বলে মনে হয় না, তবু পড়ে ভালোলাগার বিষয়কে এড়ানো যায় না। ‘দোয়েল দোয়েল ভোরে সুনিপুণ শিশিরের স্তন ভিজে এলে/ তোমার বুকের লাল তিল বাদ দিয়ে/ সমস্ত শরীর সবুজ হয়ে ওঠে।’

পুঁজির কলকব্জা বুদ্ধিবিক্রয়ী একটা শ্রেণির হাতে তুলে দিয়ে তাদের মাধ্যমে বাজারে নানা সময়ে নানা সাহিত্য-মতবাদ খাড়া হয়, যার মধ্য দিয়ে নন্দনতত্ত্বের সাম্রাজ্যবাদী একটা ছাঁচ পাওয়া যায়। অন্যদিকে আমাদের জ্ঞানতত্ত্ব স্বার্থের চাকু দিয়ে ছাঁটা, যে স্বার্থ স্থূল এবং সংকীর্ণ, যে চাকু কখনো রাজনীতির হাতে, কখনো আন্তঃরাষ্ট্রীয় কূটনীতির হাতে, কখনো মাটির তলে লুকিয়ে থাকা মাফিয়া শক্তির হাতে ধরা থাকে। কর্পোরেটিজমের কষা কীভাবে দুস্থদলিত শ্রেণিকে পিষে মারে তার এক জ্যান্তচিত্র পাওয়া যাবে সঞ্জীব পুরোহিতের কবিতায়। ‘ফুটপাতে ইটে মাথা রেখে/ উঁচু জ্বলজ্বলে বিলবোর্ডে সেঁটে থাকা হুরের দিকে তাকিয়ে/ স্ব-মৈথুন বীর্যে যাচ্ছে ডুবে এক বদ্ধ উন্মাদ/ হাতের মুঠোয় মস্ত শিশ্ন কাঁপে তিরতির।’ শুধু এক নগরদৃশ্য-বিবরণের মধ্যে এই উচ্চারণের সারবত্তা সন্ধান করলে তার কবিতার সঠিক ব্যঞ্জনা অব্যক্ত থেকে যায়। যে ইন্দ্রিয়ের যে ভূমিকা তা পাল্টে দিয়ে অন্য ভূমিকায় বসিয়ে দিলে অনুভূতির জগতে একপ্রকার বিপর্যয় দেখা দেয়, যা পাঠকমনে শৈল্পিক আনন্দ সঞ্চার করে, দুটি পরস্পরসংঘর্ষী ইমেজের সহায়তায়। জানা আছে সবারই ভালো করে যে, জীবনানন্দ দাশ এ-কাজে কুশলতার পরিচয় দিয়ে স্বর্গবর্তী হয়েছেন, মর্তের মাটিতে অজস্র আক্রমণসহ তবু তাঁর পাঠ আছে। সঞ্জীবের হাতে এ-প্রকরণ ঘন হয়ে উঠতে দেখি, যখন আমাদের চুমুক তাঁর ‘রক্ত ডাব’ কবিতায়। স্বাদগ্রন্থিকে বিভ্রান্ত করে ‘রক্ত ডাব’ শব্দযুগল—নির্মিত হয় মিশ্র ইমেজ—পরিণতি সংঘর্ষজনিত আনন্দ: ‘সকালে হাঁটি লেকের হাওয়ায়/ ডাবের জল টেনে নিচ্ছি স্ট্র ডুবিয়ে/ স্ট্র, শিশুর আঙুল চুষে/ শুষে নিচ্ছি … / লেকের গোড়ালিতে ভর করে ডাব বিক্রেতা ন’বছরের নাবালক/ ধারালো দা-এ দিচ্ছে কেটে শিশু নারকেলের শরীর/ হঠাৎ আঙুলের ডগা/ শিশুটি মাআআআ করে চিৎকার করছে।’ উপস্থাপিত দৃশ্যের অন্তর্গত করুণতা ও নিষ্ঠুরতার পরিমাপ বোঝা যায় যখন তিনি পরে আবার বলেন: ‘একটি ডাবের খোলসে দু’টি স্ট্র পুরে এগিয়ে/ ব্যান্ডেজ মোড়ানো আঙুল/ চোখে চোখ রেখে স্কুল পালানো এক জুটি/ মুচকি মুচকি হেসে পিপাসা বাড়াচ্ছে ডাবের জলে।’

11931696_10203515122598124_563974014_n

প্রজাতিগত শেষ্ঠত্বের অহমিকায় যে মানুষ পৃথিবীকে সভ্যতার অলঙ্কারে সুন্দরতর করার চেষ্টা চালায়, মায়ের জরায়ু থেকে পড়ে তার কোনো অলঙ্কার থাকে না, মৌলিকতার কোনো অলঙ্কার নেই। আদিসুরতের উপর উত্তরকালে স্নো-পাউডার মাখার, অলঙ্কার আরোপের নানা-অজস্র কায়দাকোশেশ শুরু হয়

সঞ্জীব পুরোহিতের কবিতায় যৌনতা ও দেহঘন আবিষ্টতার ছড়াছড়িকে অবসেশন মনে হতে পারে এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিরক্তিও উৎপাদিত হতে পারে, যদি-না জানা থাকে যে সঞ্জীবের সব যৌনতায় প্রেম থাকে, তা যত তাৎক্ষণিকই হোক না কেন। ‘তবু শিশ্ন হয়ে ওঠে ছুরি!/ আর কেউ কেউ চাইছে হতে শুধুই/ প্রেমহীন দু’টুকরো!’—‘কেউ কেউ’-এর মধ্যে তিনি আছেন কিনা জানবো কী করে, ‘দু’টুকরো’ শব্দগুচ্ছের পরে বিস্ময়চিহ্ন তাঁর প্রেমবোধের সত্যবার্তা প্রকাশ করে দেয়। সর্বশেষ প্রকাশিত কবিতাবই ‘কাকফুলে মধু’সহ তাঁর কবিতাকাজে কোথাও কোথাও ইন্দ্রিয়সর্বস্বতাকে লজ্জিত করে বেজে উঠেছে শৈল্পিক ধারাভাষ্য: ‘অধরপুরে পৌঁছে গেলে/ শিশ্নখচিত এ মধ্যাহ্ন/ আরো ভালো লাগে/ খুব কাছ থেকে কেউ দূর অভিযানের গল্প শোনায়/ ফুঁসে ওঠা জন্মযন্ত্রের কানে বাজে/ গুহার ভেতর চুইয়ে পড়া জলের গান।’ ‘চুইয়ে পড়া জলের গান’ চালু থাকতেই তিনি জুড়ে দেন ‘সকল সঙ্গীতের পিঠে/ জলতলে খেলা করা মাছের গোল্লাছুট মুদ্রিত থাকে’ কথাটি বলে তিনি যৌনতার দ্বিপাক্ষিক অনিবার্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করেন, কাব্যিকভাবে। বিবর্তনের সূত্র ধরে মাছের পাখিতে রূপান্তর আর শিশ্নকে কাঠঠোকরা পাখিতে রূপায়ণের প্রসঙ্গ টেনে যৌনতাকে যান্ত্রিকতায় দৃশ্যমান করে তুলেছেন; এতে তাঁর জ্ঞানকল্পের বিস্তারসহ তা থেকে আহরিত প্রায়োগিক উপযোগিতা  অনুমান করা যায়। ‘শিশ্ন পাখি হলে/ কাঠঠোকরা হয়ে যায়/ মাছ যেমন হয়েছে পাখি/ বিবর্তনের সিঁড়ি টপকে।’ রতিপ্রলোভনমূলক পর্ণোগ্রাফিক বয়ানও তাঁর কবিতার নানাস্থান জুড়ে আছে, তবে তা যৌনতা প্রচারের লক্ষ্য থেকে উচ্চারিত নয়, বেছে-নেয়া বিষয়ের পটভূমি পরিষ্কার করতেই তার আমদানি। ‘কানের লতিকে ছোট ছোট কামড়ে/ তাই অত আদিম হয়ে ওঠা/ ফিসফিসিয়ে ময়না ডাকলে/ তলপেট শিরশিরিয়ে ওঠে’—এই বাণীর অনুকৃতি দেখাতে, কেউ চাইলে ‘গুপ্ত’কেও ডেকে আনতে পারেন। সঞ্জীবের বাক্যগুলো কবিতার পংক্তি, কেননা তা বড়ো উদ্দেশ্যের সঙ্গে জোড়ানো, ইন্দ্রিয়ে জল এনে দেয়ার জন্য নয়। আল মাহমুদ এক সাক্ষাতকারে একবার বলেছিলেন, আমার লেখায় যৌনতা যৌনতাকে উস্কে দেয় না, তাকে লজ্জিত করে। সঞ্জীবের কাব্যযৌনতা শিল্পের আনন্দকে উদযাপনের জন্য পরিকল্পিত, মনে হয়, পোশাকের নিচে অযথা ক্ষিপ্ত হবার বা ক্ষিপ্ত করার জন্য নয়। পরকীয়া প্রেমের অনুষঙ্গে, নপুংসক স্বামীর প্রক্সি দেয়াকে বৈধতা দেয়ার প্রয়োজনে প্রেমকে তিনি পূর্বশর্তমূলক হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। ‘শিল্পগ্রামে একটি বাছুর বাঁটে চাইছে মদ/ যা করছি, ভাতের জন্য তা বেশ্যারা করে/ আমি ক’ফোটা বীর্য বেচে দিয়েছি এক বেচারিকে’—বোঝা যায় শিল্পগ্রামের যে বাছুরের কথা বলেছেন, তা তিনি বা কবিতার ভাষ্যকার নিজেই, যিনি শিল্পযাপনের আশায় ক’ফোঁটা বীর্য বেচে দিয়ে অর্থাৎ এক নারীকে তৃপ্ত করে বিনিময়ে পেতে চান শিল্পসৃষ্টির প্রতীকরূপ পানীয়, যেটাকে ‘বেশ্যার সম্মানী’র সঙ্গে তুলনা করছেন তিনি: ‘আর নিজের প্রকরণের সাথে বেশ্যার সম্মানি শেয়ার করছি’। অবশ্য এ-ব্যাখ্যার সম্ভাবনাকে নাকচ করে তিনি আবার বলেন, ‘এভাবে ভাবলে সহজ হয়ে যেতো’, তার মানে ওভাবে ভাবা সম্ভব নয়। এটাকে পরে তিনি ভালোবাসা হিসেবে দেখাতে চান, যাতে তাঁর পক্ষে কিছুটা ‘বেঁচে-বর্তে’ যাওয়া সহজ হয়: নপুংসক স্বামীর প্রক্সি দেয়াটা, সেলার খালি করাটা/ তার গায়ের রঙের একটি কালো বাছুর জন্মানো সুগম করাটাকে/ হালাল করে ফেলেছি/ আর নিজের প্রকরণের সাথে বেশ্যার সম্মানি শেয়ার করছি।’ প্রেম অথবা মানবতার শর্ত জুড়ে দিয়ে এভাবে যৌনতার ঐতিহ্যবাহী নিষ্ঠার কনভেনশনকে তিনি ভেঙে ফেলেন, কারণ, তিনি বিশ্বাস করেন যৌনতার সঙ্গে নৈতিকতার ঠুনকো সম্পর্ক মুহূর্তের আঘাতে ভেঙে যেতে পরে।  যুগে যুগে মানুষের যৌনমনস্কাম বাধাগ্রস্ত হয়েছে শাস্ত্রীয় ছলাকলায়, তন্ত্রমন্ত্রের কলকব্জা ও ধর্মসামন্তবাদের ঘোঁটপাকানিতে। ব্রতচারী যৌননিষ্ঠার নামে শাস্ত্রীয় সন্ন্যাসবৃত্তি মাথাচারা দিয়ে উঠেছে; এতে যৌন অবরুদ্ধতার হাত ধরে যৌনবিকৃতকামতার প্রসার ঘটেছে। সঞ্জীবের কটাক্ষশীল ও পরিহাসকরুণ মনোভাব এভাবে প্রকাশিত: ‘নিচে সদ্য বীর্যস্নাত সন্ন্যাসী/ ভীষণ সন্ন্যাসে, ক্রমশ হয়ে যাচ্ছেন/ শিথিল… শিথিল… শিথিল…।’ ‘গর্ভাশয়ে অনুপ্রবেশ করা ভোমরার শুঁড়’ ‘পরাগশিশ্ন’কে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বুকে ধর্ষণের কষ্টে ‘নিষ্ফলা নির্বীজ একথোকা রক্তজবা’ ফোটানোর কথা তিনি যেভাবে বলেছেন তাতে ধ্বজভঙ্গতাকে ধর্ষণের কারণ হিসেবে বোঝা যেতে পারে। এর মধ্য দিয়ে এমন এক মনস্তত্ত্ব কি প্রকাশ পায় যাতে ‘স্যাডিজম’ বা ধর্ষকামিতার পক্ষে ওকালতির আভাস পাওয়া যায়? ‘কাকনামা’য় সঞ্জীব বলেন, ‘নিমগ্ন আত্মহননে ধর্ষক মোরগ হয়ে চড়ে বসি/ ভাসিয়ে আনা কোনো কালো আবাবিলের পিঠে/ এ বীজে তাই জন্মেছে, যা জন্মেছে/ মা মা ডাকছে কা কা করে।’ এই অভিব্যক্তির মধ্যে ভারতভূগোলে মানবজাতির রক্তসংকরায়নের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে। তিনি বলেন, আবাবিলকে কাকপাখিতে রূপান্তরিত করা গেছে, চোখে নৃবিজ্ঞানের চশমা লটকানো থাকলে সে ইঙ্গিতের সম্ভাবনা প্রকট। একই কবিতার অন্য স্থানে তিনি যখন বলেন, ‘এভাবেই মা প্রজ্ঞায় মরিয়মকে করেছি ক্ষমা/ যাতে তাকে সইতে না হয়/ ক্রুশবিদ্ধ শিশুর আর্তনাদ’ তখন বুঝতে সহজ হয় ধর্ষকামিতা বা যৌন প্রচাপনকে তিনি সমর্থন করছেন না, সমর্থন করছেন সপ্রেম যৌনতাকে। যৌনতার সঙ্গে খাদ্যরুচির নানা অনুসঙ্গ আছে তাঁর কবিতায়, এ-ধরনের প্রবণতাগুলো ‘খাদ্যযৌনতা’ অভিধা পেতে পারে। বার্গার শব্দটির আরেক অর্থ যোনি, ভেজিটেবল রোল বা মিটরোল শিশ্নের প্রতিরূপ, ফাস্টফুড চিবোনোর অভিজ্ঞতায় সঞ্জীব বলেন: ‘বুক থেকে খুলে নেবো জিলোটিনে গড়া সিলোফেনে মোড়া/ বিভীষণের বার্গার/ লেটুস পাতা যে মর্ষকামে কচকচ/ গাজরের চোখ যে আলোয় চকচক/ দাঁতের দ্যুতিতে ওকে করবো ধর্ষণ।’ অথবা ‘যাই বোঝাও/ সকল নীতিবাক্য নিপীড়ণ-বিরোধী সভা শেষে/ কিশোর মোরগের কামান্ধ ঝুঁটিতে সোমরস মাখিয়ে/ স্থির করেছি অস্থির হবো এক গঞ্জের মুরগির ওপর।’ সমকালীন বাঙালি সমাজের ধর্ষকামী মানসপ্রবণতার একটি বিশিষ্ট দিক এতে শিল্পসুন্দরভাবে প্রতিফলিত।

11942252_10203515085517197_245321675_nপরীক্ষার খাতা লেখা নয়, তবু শেষ কথা বলার সময় এসে কড়া নাড়ে, যদিও কোনোকিছুরই আসলে শেষ নেই। প্রজাতিগত শেষ্ঠত্বের অহমিকায় যে মানুষ পৃথিবীকে সভ্যতার অলঙ্কারে সুন্দরতর করার চেষ্টা চালায়, মায়ের জরায়ু থেকে পড়ে তার কোনো অলঙ্কার থাকে না, মৌলিকতার কোনো অলঙ্কার নেই। আদিসুরতের উপর উত্তরকালে স্নো-পাউডার মাখার, অলঙ্কার আরোপের নানা-অজস্র কায়দাকোশেশ শুরু হয়। শিশু উলঙ্গ বলে সে মৌলিক। কবিতায় উলঙ্গ সত্যের চাকু সঞ্জীব খাড়া করে রাখেন সবসময়, এমনও নয়। তাঁরও অলঙ্কার আছে, তবে চলতে ফিরতে অসুবিধা হওয়ার মতো ভারি নয়, তার সেলাই বা ঝালাই নিজের মতো করে দেয়া। তাঁর কবিতা যে পোশাক পরে, গায়ের উপর যে অলঙ্কার চাপায়, তা সচেতন চেষ্টার দ্বারা আড়ষ্ট নয়। কথার ধার বাড়াতে চাইলে অনেক অলঙ্কার খুলে ফেলতে হয়, ইউরোপে আধুনিকতার যে আন্দোলন বয়ে গেলো তাও মূলত অলঙ্কার খোলার আন্দোলন। সঞ্জীব পুরোহিতের কবিতা আলোচনায় শিল্প প্রকরণের বিভিন্ন উপাদান খুলে খুলে এনে তার বিশ্লেষণ চলতে পারতো, কিন্তু এক লেখায় সব সম্ভব নয় বলে, ইতি টানতে হয়।