হোম গদ্য পশ্চিমের রবীন্দ্রমুগ্ধতা

পশ্চিমের রবীন্দ্রমুগ্ধতা

পশ্চিমের রবীন্দ্রমুগ্ধতা
804
0

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বসাহিত্যে এখন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। বাংলা সাহিত্যের কথা উঠলেই বিদেশিদের কাছে ভেসে ওঠে শ্মশ্রুমণ্ডিত এই মানুষটির প্রতিকৃতি। জীবদ্দশায় ভারতীয় দর্শন ও সাহিত্যের আইকন হয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন পুরো বিশ্ব। উপনিষদ থেকে সমসাময়িক নবীনতম দেশি-বিদেশি রচনা হতে রসদ সংগ্রহ, শিল্পসাহিত্যের সর্বশাখায় দাপুটে পদচারণা; ইয়েটস-পাউন্ড থেকে শুরু করে তা-বড় তা-বড় কবি-সাহিত্যিকদের প্রশংসাবাণীতে সিক্ত হয়েছেন তিনি। লেখনীর জোর তো আছেই, কিন্তু তার বাইরে এই যে পশ্চিমের রবীন্দ্র-বন্দনা ও মুগ্ধতা এর পেছনে কী কী কারণ কাজ করেছিল? একজন কবি-সাহিত্যিক কিভাবে পরিণত হয় কিংবদন্তিতে? কিভাবে পেরিয়ে যায় দেশকালের গণ্ডি? খুব নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও, কিছু কার্যকরণ তো চিহ্নিত করাই যায়। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে একাধিক ফ্যাক্টর কাজ করেছে। তার কয়েকটি অনুসিদ্ধান্ত আকারে তুলে ধরার চেষ্টা করছি—

প্রথমত, সমসাময়িক বড় কবিদের স্বীকৃতি, ভূয়সী প্রশংসাপ্রাপ্তি।

দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তি।

তৃতীয়ত, ভারতীয় দর্শন ও কাব্যধারার মুখপাত্রে পরিণত হওয়া—যিনি কবিতা লেখেন, গান লেখেন, গান করেন, নাটক-উপন্যাস লেখেন, প্রবন্ধ লেখেন, ছবি আঁকেন, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংগঠক, একজন পরিপূর্ণ শিল্পী ও ‘ঋষি’র প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

চতুর্থত, বিপুল পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের অবিরাম চর্চা ও প্রচার; অনুবাদ।

এসবের বাইরে পশ্চিমা রবীন্দ্রমুগ্ধতার আরেকটি কারণ মিথিক্যাল ভারতীয় দর্শনে বিস্ময় ও প্রাচ্যতত্ত্বগত দৃষ্টিভঙ্গি। পশ্চিম বরাবরই সেলফ ও আদার এই বিভাজনে বিশ্বাসী। সেলফকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে রাখতে হলে আদার-এর অস্তিত্ব রাখতেই হবে—একথা সবার জানা। সেসময় পশ্চিমা সাহিত্যের নাগরিক বিচ্ছিন্নতার বাইরে ভারতীয় তথাকথিত ঐতিহ্যসংলগ্নতা, ধর্ম ও দর্শনাশ্রয়ী মিস্টিক কবিতা (গান), যা তাদের বৈচিত্র্যের স্বাদ দিতে পারে—এমন কবি রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কে ছিল? একজন নেটিভ যিনি প্রথাগত শিক্ষাগ্রহণ করেন নি, জমিদার পরিবারের সন্তান, স্বশিক্ষিত, উদারমনা, সমন্বয়বাদী, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনের কথা বলেন, সর্বোপরি এনলাইটেনমেন্টের আদর্শ অনুস্মরণ করেন বলে প্রতিভাত হয়, আবার মানবাত্মা-পরমাত্মার সম্পর্ক খোঁজেন এমন প্রাচ্যমনা ঋষিত্বের ইমেজ—সবই সন্নিবেশিত ছিল রবীন্দ্রনাথে। ফলে পশ্চিমের কাছে সহজেই আলাদা বৈশিষ্ট্য ও চমক হয়ে দেখা দিয়েছিলেন তিনি।

লন্ডনে রোদেনস্টাইনের বাড়িতে যেদিন তার বন্ধু-বান্ধবদের কবি গীতাঞ্জলি থেকে পাঠ করে শুনিয়েছিলেন সেদিন ঐ আসরে ইয়েটস ছাড়াও ছিলেন কবি মে সিনক্লেয়ার। রবীন্দ্রনাথে অভিভূত হয়ে তিনি লিখেছিলেন:

রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মানুষের সাধারণ আবেগমথিত নিবেদনের মিলন হয়েছে এমন এক সংগীত ও ছন্দে, যা সুইনবার্নের চেয়েও পরিশীলিত। এমন এক সংগীত ও ছন্দ যা পশ্চিমি শ্রোতার কাছে অচিন্তনীয়, যাতে আছে শেলির অপার্থিব চেতনা, অদ্ভুত সূক্ষ্মতা ও তীব্রতা…. এবং তা এমন সহজিয়া রীতিতে যাতে এই জাদুকরী-আবেশকেও মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক রূপবন্ধ। মিল্টনও না, সে মানুষের হৃদয়ের তুলনায় বড় বেশি জাঁকাল; ওয়ার্সওয়ার্থও নয়, সে বড় সূক্ষ্ম আর অন্তর্লীন… এমনকি দান্তেও নয়, যদিও তিনি বাংলার এই মরমিয়া কবির খুব কাছাকাছি।

এই বক্তব্যটি বিশ্লেষণ করলে আমরা কিছু বিশেষণ পাই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে—

১. আবেগমথিত নিবেদন (পূজা)
২. পরিশীলিত সংগীত ও ছন্দ
৩. পশ্চিমি শ্রোতার কাছে অচিন্তনীয়
৪. অপার্থিব চেতনা
৫. বাংলার মরমিয়া কবি


পশ্চিমের চোখে এসবই ‘আদার’-এর বৈশিষ্ট্য। এই আলাদাকরণই রবীন্দ্রমুগ্ধতার কারণ 


পশ্চিমা রবীন্দ্রমুগ্ধতার আরেকটি কারণ—মিথিক্যাল ভারতীয় দর্শনে বিস্ময় ও প্রাচ্যতত্ত্বগত দৃষ্টিভঙ্গি। এই যে মুগ্ধতা এর পেছনে সেদিনের বৈঠকির আবহটিও তাৎপর্যপূর্ণ। উপস্থিত ভারতীয়রা পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন—ইনি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান পোয়েট অ্যান্ড ফিলোসফার বলে। অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ গান গেয়ে শোনাচ্ছেন। পশ্চিমকে তার চেনা তত্ত্বের মধ্যে অবাক করার সমস্ত মাল-মসলা তাতে বিদ্যমান ছিল। বলা হচ্ছে, ‘ভারতীয় বন্ধুদের কাছে ইয়েটস রবীন্দ্রনাথের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শোনেন এবং তার অনূদিত কবিতা পড়েও প্রথম মহাযুদ্ধের প্রাক্কালে ইউরোপ জুড়ে বিস্তৃত হতাশার মধ্যে একটু আশার আলো দেখতে পান। সেসময় সমগ্র ইউরোপই যে আশাহত বস্তুবাদী পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছিল তার প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি, প্রেম ও আধ্যাত্মিক জীবন সম্পর্কে লেখা কবিতাগুলি ইয়েটসকে অন্তত : কিছুদিনের জন্য খুব মুগ্ধ করে রেখেছিল।’

এখানেই শেষ নয় ইয়েটসের কাছ থেকে মুগ্ধতা ছড়ায় পাউন্ডের কাছে। ১৯১২-র সেপ্টেম্বরেই তিনি শিকাগোর Poetry পত্রিকার সম্পাদকের কাছে লিখছেন :

মহান বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতা সংগ্রহের চেষ্টা করছি… শীত সংখ্যার জন্য দারুণ হবে।

আরেক রবীন্দ্রভক্ত ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো। যিনি রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন ফ্রান্সের পিগ্যাল গ্যালারিতে। এর চিত্রসূচিতে ভূমিকা লিখেছিলেন ওকাম্পোর বান্ধবী ও লেখিকা কঁতেস দ্য নোয়াই। তিনি বলছেন :

টেগোরের মতো একজন মেধাবী স্বপ্নদ্রষ্টা কিভাবে যে তার আশ্চর্য সব সৃষ্টির কাছে গিয়ে পৌঁছান! এইসব সৃষ্টি আমাদের দৃষ্টিকে নন্দিত করে, সেই সব দেশে আমাদের চক্ষুকে নিয়ে চলে যায়, যেখানে যা সম্ভাব্য তা বাস্তবের চেয়েও অধিক সত্য! শ্বেতকপোতের মতো রঙের অসামান্য সুন্দর হাত দিয়ে তিনি কবিতা রচনা করেন, আর এক অনির্বচনীয় সুরার নেশায় আবিষ্ট হয়ে তিনি তার পাণ্ডুলিপির কিনারায় নিজেকে ছেড়ে দেন—সূক্ষ্ম, জটিল ও বুদ্ধিনির্ভর শিল্পসৃষ্টির আওতা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তুলে নেন কল্পনার অনিয়ন্ত্রিত শক্তির কাছে। প্রথমে তিনি স্কেচ করতেন মাত্র; তার থেকে ক্রমশ তার হাতে অজ্ঞাত সব দেশের অদ্ভুত সব সম্পদ এসে পৌঁছতে শুরু করল। তিনি যেন মহাজাগতিক শিক্ষকের দ্বারা নির্দেশপ্রাপ্ত বাধ্য ছাত্রের মতো সেসব নির্দেশ লিপিবদ্ধ করতে আরম্ভ করলেন। তিনি পেয়েছিলেন অশ্রুর উপহার—কান্নার উপহার, যে ক্রন্দনের কারণ তিনি জানতেন না; ক্রমশ তার মুখের উপর শিশির জমতে শুরু করল, তৈরি হতে আরম্ভ করল সূক্ষ্ম তরল নকশার কাজ—দেবদূতেরা যেন অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। পরিরা যেভাবে আমাদের তন্দ্রায় প্রবেশ করে—অস্পষ্ট স্বপ্নের ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে, নিজেকে দেখাতে দেখাতেই নিজের সংজ্ঞা নির্মাণ করে তোলে, টেগরের আঁকা ছবিও আমাদের অন্তরে প্রবেশ করে সেইভাবে; এই মহান সৃষ্টিকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়—কারণ এই মহত্ত্ব—তুচ্ছ ও বিশাল—উভয়ের মধ্য দিয়ে সমভাবে প্রকাশিত হয়েছে …

এই মুগ্ধতার পরম্পরা চলেছে আরও বহুদূর। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার বিশেষ অনুরাগী ছিলেন অক্টাভিও পাজ। ‘আর্তে দে মেহিকো’ নামের শিল্পকলা বিষয়ক এক পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন :

মনে হয় কোনো কোনো শিল্পীর মূল কাজের পাশে তাদের অন্য কিছু কাজ সাধারণত খুবই, বা তার চেয়েও বেশি কৌতূহলোদ্দীপক। আমরা এর আগে অন্যত্র ভিক্টর উগোর ড্রয়িংগুলো নিয়ে কথা বলেছিলাম, যিনি মহৎ কবি হওয়া সত্ত্বেও ছিলেন এক মহান শিল্পী। তবে আরেকটি লক্ষণীয় ঘটনা আছে যা ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে ঘটেছে। আমার স্ত্রী ও আমি যখন কলকাতায় ছিলাম, তখন রবীন্দ্রনাথের এক শিষ্যা আমাদেরকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যিনি কবির সমস্ত কাগজপত্র সংরক্ষণ করে রাখতেন। তার ঘরটা ছিল এক রকম স্মৃতিশালার মতো, সেখানেই দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের কাজ, যা ভিক্টর উগোর মতোই কৌতূহলোদ্দীপক। তার ক্ষেত্রে একটা বিশেষত্ব হলো এই যে, রবীন্দ্রনাথ যে-ভাষায় লিখতেন তাকে বলা হয় দেবনাগরী, এর লেখ্যরূপ খুবই সুন্দর। তবে হ্যাঁ, দাগ কাটতেন, সংশোধন করতেন, মুছে ফেলতেন এবং দাগগুলোকে রূপান্তরিতও করতেন। কংক্রিট কবিতা যে-কাজটা করে অনেকটা সেরকম, তবে তিনি এটা করতেন অনেক বেশি প্রকাশবাদী (Expressionist) ভঙ্গিতে, যা আমাদের চেনা বহু কংক্রিট কবিদের চেয়ে অনেক বেশি জীবন্ত। এবং হঠাৎ করেই অক্ষরগুলো দিয়ে তিনি সৃষ্টি করতেন অসামান্য ভূ-দৃশ্য, আর কাল্পনিক ও ভয়ংকর সব জীবজন্তু। ওকাম্পোও এই পাণ্ডুলিপিগুলো দেখেছিলেন, যখন রবীন্দ্রনাথ তার সান ইসিদ্রোর বাসায় ছিলেন। অন্যান্যদের মধ্যে অন্যতম, আঁদ্রে জিদের পৃষ্ঠপোষকতায় রবীন্দ্রনাথ প্যারিসে একটা প্রদর্শনী করেছিলেন। শিল্পকর্ম, চিত্রকলা এবং লেখা যেখানে একে অপরের সাথে জড়িয়ে গেছে সে-ধরনের কাজগুলোর প্রতি আমার আগ্রহ চিরকালের।


রবীন্দ্রমুগ্ধতা কমার পেছনে পশ্চিমা সাহিত্য-শিল্পের তাত্ত্বিক ও চর্চাগত ধারণার পরিবর্তন 


পশ্চিমে রবীন্দ্রমুগ্ধতার এই যে অপার বিস্ময়ের রেশ, তা এখন কমে গেছে বহুলাংশে (?)। অন্তত এটুকু বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ শুরুর দিকে যে বহুল পঠন, মনোযোগ আকর্ষণ ও চর্চিত হয়েছেন বহির্বিশ্বে, সেই পরিমাণ বহুলাংশে কমেছে। কিন্তু কেন? এর পেছনে নানাবিধ কারণ উল্লেখ করা যায়—

১. মানহীন অনুবাদ, বিশেষত রবীন্দ্রপ্রতিভার বিশেষত্ব নির্ধারক লেখাগুলোর অনুবাদ না হওয়া।

২. পশ্চিমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্য-শিল্পের তাত্ত্বিক ও চর্চাগত ধারণার আমূল পরিবর্তন।

৩. পশ্চিমের চোখে ‘আদার’-এর তীর্থ বদলে যাওয়া।

প্রথমেই আসি, অনুবাদ প্রসঙ্গে। গীতাঞ্জলি—যে বইয়ের জন্য রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে পাশ্চত্যের বৈঠকখানায় ঢুকে পড়েন, নর্ডিক জাহাজে করে আটলান্টিক পেরিয়ে মুগ্ধতা ছড়ান নোবেল কমিটির কফির টেবিলে, সেই গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ রবীন্দ্রনাথের করা। ইংরেজিতে যার নাম Song Offerings। অনেকে জানেন, তারপরেও বলি, এই বইটি বাংলা গীতাঞ্জলির হুবহু অনুবাদ নয়। সেটি ভাষান্তর ও সংকলিত কবিতা দুই দিক থেকেই। মূল গীতাঞ্জলি‘র ১৫৭টি কবিতা বা গান থেকে ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে জায়গা পেয়েছে মাত্র ৫১টি। বাকি ৫২টি বেছে নেয়া হয়েছিল গীতিমাল্য, নৈবেদ্য, খেয়া, শিশু, কল্পনা, চৈতালি, উৎসর্গ, স্মরণঅচলায়তন থেকে। মোট কথা ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে মূল বাংলা গীতাঞ্জলিসহ মোট ৯টি গ্রন্থের কবিতা বা গান স্থান পায়। এই কাব্যগ্রন্থ রচনার পেছনের কাহিনিটি মোটামুটি এরকম : ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে রবীন্দ্রনাথের জাহাজযোগে লন্ডন যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যাত্রাপথে তিনি অর্শ রোগের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শিলাইদহে আসেন বিশ্রাম নিতে। এ সময় তিনি তার গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ থেকে সহজ ইংরেজিতে অনুবাদ শুরু করেন। পরবর্তীতে গীতাঞ্জলির ৫২টি এবং গীতিমাল্য, নৈবেদ্য, খেয়া প্রভৃতি আরও নয়টি কাব্যগন্থ থেকে ৫১টি—সর্বমোট ১০৩টি কবিতার অনুবাদ নিয়ে একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন। এই পাণ্ডুলিপি সঙ্গে করে রবীন্দ্রনাথ ২৭ মে ১৯১২ তৎকালীন বোম্বাই বন্দর থেকে বিলেত যাত্রা করেন। যাত্রপথেও যুক্ত হয় আরো কিছু অনুবাদ। তিনি লন্ডনে পৌঁছান ১৬ জুন। এ সময় উইলিয়াম রোদেনস্টাইনের সঙ্গে তার দেখা হয় এবং পাণ্ডুলিপিটি তিনি তাকে পড়তে দেন। রোদেনস্টাইন টাইপ করিয়ে পাণ্ডুলিপিটি ব্রিটিশ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটসসহ আরো কয়েকজন কাব্যবোদ্ধাকে পড়তে দেন। এরপরের ইতিহাস আগেই বলেছি। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে লন্ডনে ইন্ডিয়া সোসাইটি থেকে Song Offerings গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং কবি ইয়েটস। ইয়েটস বলছেন :

কবিতাগুলোর সজীবতায়, আধ্যাত্মিকতায় তিনি এতই অভিভূত হয়েছিলেন যে, তাকে ঘন ঘন পাণ্ডুলিপি বন্ধ করতে হয়েছে, পাছে তার অভিভূত অবস্থা কেউ দেখে ফেলে।

এই যে একজন নেটিভের লেখায় প্রাচ্যদর্শনের সন্ধান পেলেন ইয়েটস, যার কাছে ধরা পড়ল মানব ও ঈশ্বরপ্রেমের এক অভূত যুগলবন্দি। সুর-ছন্দে রচিত সেই পঙ্‌ক্তি কিন্তু আর ছন্দময় থাকে নি। ইংরেজিতে যেমন লাইন ভেঙে টানাগদ্যে লিখিত হয়েছে এই কবিতাগুলো, তেমনি হারিয়ে গেছে তার ছন্দ ও সুরও। তারপরেও এমন ইংরেজিকরণে কেন সায় দিলেন রবীন্দ্রনাথ? হয়তো তিনি চেয়েছেন, চিন্তাকাঠামোটি ভাষান্তরিত হোক, ভাবনাটুকু পৌঁছাক পশ্চিমের সিংহাসনে।

শুরুর দিকে ব্যাপারটা ভালোই কাজ করেছিল। কিন্তু ঝামেলা বাধে পরে। রবীন্দ্রনাথের খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে ইংরেজিতে বই লিখিয়ে নেয়ার হিড়িক পড়ে, গীতাঞ্জলি’র অসংখ্য সংস্করণ বের হয়, যাতে ভাষাগত দুর্বলতার কারণে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন :

রবীন্দ্রনাথ প্রথম ভুলটি করেছিলেন যে, তিনি নিজের ভালো কবিতাগুলি অনুবাদ না করে অপেক্ষাকৃত সাধারণ কবিতাগুলি অনুবাদ করেছিলেন। অর্থাৎ অনূদিত কবিতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ সুবিবেচনার পরিচয় দেন নি। রবীন্দ্রনাথ ভালো ইংরেজি জানলেও ততটা ভালো জানতেন না, যা ইয়েটসকে প্রাথমিকভাবে আলোড়িত করলেও পশ্চিমের এলিয়ট-পরবর্তী প্রধান কবিদের আলোড়িত করতে পারে।

এ কারণেই হয়তো হালাম টেনিসন বলছেন :

রবীন্দ্রনাথের নিজের করা অনুবাদগুলো ঠেলে একপাশে সরিয়ে কোনো ইংরেজ কবি যদি মূলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত কোনো বাঙালির সাহায্যে অনুবাদ করতেন, তো রবীন্দ্রনাথ হয়তো বিশ্বসাহিত্যে গ্যেয়টের স্তরের এক দূরবর্তী মহিরুহদের একজন হিশেবে বিবেচিত হতেন।


চিত্রকর রবীন্দ্রনাথকে নবরূপে আবিষ্কারের সুযোগ আছে। উচিত সেই সম্ভাবনার নবদিগন্তটি উন্মোচিত করা


পশ্চিমে রবীন্দ্রমুগ্ধতার রেশ কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ হয়তো ইউরোপের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহের পরিবর্তন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা যখন ইংরেজি সাহিত্যে আলোড়ন তুলতে শুরু করে তখন ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটা; অস্থির সময়ে বিপরীত দিক থেকে ইংরেজ মনীষার প্রাণ ছুঁয়েছিল রবীন্দ্রনাথের লিরিকস, তাদের গীতলতা ও মরমি ভাবদর্শন নিয়ে, যা ইয়েটসের ভাষায় ছিল ‘ফুল অব সাটলটি অব রিদম, অব আনট্রান্সলেটেবল ডেলিকেইসিস অব কালার, অব মেট্রিক্যাল ইনভেনশন’, যা তিনি স্বপ্নের জগতে দেখেছেন, কিন্তু বাস্তবে নয়। ইয়েটস রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ধর্ম ও কাব্যের ঐন্দ্রজালিক সংমিশ্রণ দেখে উদ্বেলিত হয়েছিলেন। কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর মতে, ওই আবেগটিই ছিল নেতিবাচক, কারণ পশ্চিমা পাঠক রবীন্দ্রনাথকে কবিরের মতো ধর্মগুরু-কাম-কবি ভাবতে শুরু করে। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজ অর্জন ও তার দেহত্যাগের মধ্যকার সময়টুকুতে ইউরোপ শুধু যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ করল তা নয়, তারা পৌঁছে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জঙ্গম পরিস্থিতির সম্মুখে এবং তার মধ্যে প্রাচ্যের ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথের শান্তির ললিত বাণী শুনবে, সে ধৈর্য তখন পশ্চিমা সমাজে কোথায়!

এর বাইরে রবীন্দ্রনাথের লেখায় শ্রেণিচেতনা নেই এবং তিনি বুর্জোয়া সমাজের প্রতিনিধি—এই যুক্তিতে কট্টর বামপন্থি বুদ্ধিজীবী-শিবির বরাবরই তার ব্যাপারে ছিল উন্নাসিক। এই উন্নাসিকতার চরম বহিঃপ্রকাশ ম্যাক্সিকান চিত্রশিল্পী, মুরাল-শিল্পী দিয়েগো রিবেরা’র আঁকা ‘জ্ঞানীরা’ (Los sabios) শীর্ষক ছবিটি। যেখানে বাসকনসেলোসকে আক্রমণ করতে গিয়ে তিনি লাতিন আমেরিকার সে সময়কার কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথকেও আক্রমণের অংশ করে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মাথায় ঠুলি বসিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি বুর্জোয়া জ্ঞানীদের প্রতিনিধিত্ব করেন। এই শ্রেণি-অবস্থান প্রসঙ্গেই চিলিতে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিবাদে জড়িয়েছিলেন পাবলো নেরুদা এবং বিসেন্তে উইদোব্রো।

একই ইস্যুতে ভারতেও বিভিন্ন সময়ে সমালোচনার কামান তাক হয়েছে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে। তার কাব্যরীতির বাইরে এসে তিরিশের কবিদের নতুন কবিতা আন্দোলনও রবীন্দ্রজোয়ারে ভাঁটা ফেলে পশ্চিমে। এর সাথে সাথে পশ্চিমের কাছে নতুন ‘আদার’ হিশেবে আবির্ভূত হয় আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা। সেখানকার লোকরীতি, সাংস্কৃতিক টানাপড়েন, ঐতিহ্যলগ্নতা সর্বোপরি অঞ্চল দুটির যুদ্ধ-বিগ্রহরের আবহ ইউরোপের পরবর্তী লেখক-বুদ্ধিজীবীদের কাছে আধিক উপাদেয় হয়ে ওঠে। পশ্চিমা কালচারাল থিংক-ট্যাংক ‘আদার’-এর কাছ থেকে যা চায় তার সবই মেলে আফ্রিকা ও লাতিন সাহিত্যে, আর দুটো বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি কাজ করে অদৃশ্য নৈকট্য-নিয়ামক হিশেবে। এর মধ্যে ভারতবর্ষেও ঘটে যায় নানান রাজনৈতিক পালাবদল। বাংলা ভাগ হয়, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ ও পশ্চিমে রূপ নেয় পূজায়। কিন্তু একসময়ে ভারতীয় সাহিত্য বলতে যেখানে বাংলার সমকক্ষ কাউকেই পাওয়া যেত না সেখানে রাজনৈতিক পটপরিক্রমায় বাংলা সাহিত্যের স্থানচ্যুতি ঘটে। এই অবসরে তামিল-মালালায়াম কিংবা ‘হিংলিশ’ লেখকরা হয়ে ওঠেন প্রধানতম ধারা। এখন একটি উপন্যাস লিখে অরুন্ধতি রায় যেখানে ইন্টারন্যাশনাল স্টার, সেই তুলনায় ভালো লিখেও বাংলাভাষী লেখকরা খড়কুটোও নয়। এর পেছনে যেমন অনুবাদ না হওয়া দায়ী, তেমনি দায়ী পশ্চিমের কেবলা সরে যাওয়াও।

পরিশেষে একটা কথা বলতে চাই, রবীন্দ্রনাথের কবিতার সেই লিরিক্যাল, প্যাশোনেট ও সাবমিসিভ এটিটিউট হয়তো এখন আর টানে না পশ্চিমকে, কিন্তু তার হাজার দুয়েক চিত্রকর্ম তাদের নতুনভাবে অবাক করে দিতে পারে। পাজ-এর ভাষায় ‘অসামান্য ভূ-দৃশ্য, আর কাল্পনিক ও ভয়ংকর সব জীবজন্তু’র ছবির সেই ক্ষমতা আছে। কেন জানি মনে হয়, কবি রবীন্দ্রনাথে পশ্চিমি মুগ্ধতা কমলেও চিত্রকর রবীন্দ্রনাথকে নবরূপে আবিষ্কারের সুযোগ আছে। আত্মতুষ্টি ও ব্যক্তিপূজা ভুলে রবীন্দ্রভক্তদের উচিত সেই সম্ভাবনার নবদিগন্তটি উন্মোচিত করা।

 


তথ্য-সহায়িকা :


১. Introduction By W.B. YEATS, Song Offerings.

২. চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ এবং তার বর্ণান্ধতা প্রসঙ্গ, অভিজিৎ রায়।

৩. রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা সম্পর্কে অক্তাবিও পাস, রাজু আলাউদ্দিন।

৪. আমরা যদি Song Offerings গ্রন্থটির প্রথম কবিতাটি দেখি, তবে দেখব—‘আমারে তুমি অশেষ করেছ/ এমনি লীলা তব’—১৬ লাইনের কবিতা টানাগদ্যের চাপে পড়ে ৩ প্যারা ও ৮ লাইনে পরিণত হয়েছে ইংরেজিতে। শুধু আকার-আঙ্গিক ও ছন্দ নয়, নিজ অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ বেশ স্বাধীনতা নিয়েছিলেন। Song Offerings-এর বেশির ভাগ কবিতা আক্ষরিক তো নয়, বরং ভাবানুবাদ।

THOU hast made me endless, such is thy pleasure. This frail vessel thou emptiest again and again, and fillest it ever with fresh life.

This little flute of a reed thou hast carried over hills and dales, and hast breathed through it melodies eternally new. At the immortal touch of thy hands my little heart loses its limits in joy and gives birth to utterance ineffable.

Thy infinite gifts come to me only on these very small hands of mine. Ages pass, and still thou purest, and still there is room to fill.

৫. নতুন অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহীত উল আলম, মাসিক কালি ও কলম।

৬. দিয়েগো রিবেরার রবীন্দ্রনাথ : প্রতিপক্ষের প্রতিকৃতি, রাজু আলাউদ্দিন।

মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান