হোম গদ্য পরকীয়া অথবা অন্যান্য ক্রিয়ার গল্প

পরকীয়া অথবা অন্যান্য ক্রিয়ার গল্প

পরকীয়া অথবা অন্যান্য ক্রিয়ার গল্প
5.25K
0

১.
চম্পার বাড়িতে হানা দিল আফজাল—অপরাহ্ণের কিছুটা পর। বাড়ির আঙিনায় অন্ধকার ছুঁই ছুঁই করছে তখন। আফজালের সঙ্গী দু’জন। বন্ধু জহির তো পাশে থাকবেই। সবসময় থেকেও এসেছে। আফজালের ভালো-মন্দ সব কাজের সাক্ষী যে। কিন্তু সিরাজ কেন? নিজের বাড়িতে এভাবে কেউ হানা দেয়? দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে আঁতকে উঠল চম্পা। চম্পার বুকের ভেতরেও যেন কু কড়া নাড়া শব্দ করতে লাগল। চম্পা শুনতে পাচ্ছে সিরাজের রাগত আর আফজালের বিকৃত কণ্ঠস্বর। শরীরের ভেতরে অস্থিরতা সত্ত্বেও নিথর, নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে রুমের ভেতরের প্রাণীগুলো। এবার দরজায় দুম দুম শব্দ—ক্রমশ বাড়ছে চাপা উত্তেজনা। সিরাজ চম্পাকে নাম ধরে ডাকছে তো ডাকছেই—হুঙ্কার দিচ্ছে। নিজের বাড়িতে ঢুকতে পারছে না—লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে ও।


লক্ষ্মী স্ত্রী আর মমতাময়ী মাতৃরূপের আড়ালে চম্পা নষ্টা, ভ্রষ্টা এক নারীর নাম।


চম্পা কী করছে ভেতরে? পরপুরুষের সাথে মজা লুটছে? এক পুরুষে কি ওর গতর তৃপ্তি পায় না? এক ছেলের মা হওয়া সত্ত্বেও! কতদিন ধরে চলছে এসব? সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন তো রাতেই ডিউটি থাকে সিরাজের। আফজাল অফিস থেকে ধরে না আনলে-তো আজও জানা হতো না লক্ষ্মী স্ত্রী আর মমতাময়ী মাতৃরূপের আড়ালে চম্পা নষ্টা, ভ্রষ্টা এক নারীর নাম।

—‘একটু খাঁড়ান। দরজা এখনই খুলতাছি।’ ভেতর থেকে চম্পার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল।

তিনজন একে অন্যের দিকে ফিরে চায়। সিরাজের দৃষ্টি লজ্জা মাখানো—জহিরের দৃষ্টি রহস্যঘন—আর আফজালের প্রখর দৃষ্টি, অন্ধকারে বেড়ালের দৃষ্টি যেমন—তীক্ষ্ণ, ধারাল। তিনজনই যখন নিজেদের ভেতরের ভাবনাগুলো নিয়ে সাম্রাজ্য গড়তে যাচ্ছে, আচমকা তখনই, কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে একজন বলিষ্ঠ পুরুষ বাড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে দৌড়ে চলে গেল। দরজার ধাক্কায় আফজাল সাথে সাথে মাটিতে পড়ে গেল। যে যে-অবস্থাতেই থাকুক না কেন—কিছুটা সময় তিনজনই বিমূঢ়ের মতো চেয়ে রইল। সম্বিত ফিরে পেয়ে জহির ধর ধর বলে পুরুষ লোকটার পেছন ধাওয়া করল। এদিকে আফজালকে মাটি থেকে তুলে রাজ্যের অসুস্থ চিন্তা মাথায় নিয়ে সিরাজ দ্রুত দরজার দিকে পা বাড়াল। চম্পাকে কী অবস্থায় দেখবে? এতক্ষণে হয়তো শাড়ি পরিপাটি করে ফেলছে। ছেলেটা কি মায়ের সাথে আছে, নাকি বাহিরে বের করে কাজ করেছে? দেহকোষে বাড়ছে ক্রমশ উত্তেজনা…

সিরাজ ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল। এ যে বকুল! তবে কি পালিয়ে যাওয়া পুরুষটা বকুলের? তৎক্ষণাৎ মাথাও কাজ করে ফেলল। সিরাজের রাগ ঘটনার প্রেক্ষিতে যতই বাড়ুক না কেন—বকুলকে দেখে সমান স্বস্তিও ফিরে এল। স্ত্রীর সাথে বার বছরের একমাত্র সন্তানকে দেখে ওর বুঝতে আর কোনো অসুবিধাই হলো না যে, বৃষ্টির আগ পর্যন্ত মেঘ কিছুটা সময় অন্ধকারকে জাহির করলেও, আকাশ মুক্তির রং ধারণ করে বৃষ্টি পড়ার সাথে সাথেই।

এদিকে বকুলের চোখে আগুন—‘আপনি? কেন আপনি আমার পিছু নিয়েছেন? বাড়িতে বউ থাকা সত্ত্বেও আমার প্রতি নজর কেন?’

—‘তোমার প্রতি নজর দিয়ে আমার লাভ? আমার বউয়ের চেয়ে কি তুমি বেশি সুন্দর? আমার নজর তো মহল্লার নোংরামির বিরুদ্ধে। বাইরে থেকে লম্পট, বদমাইশ এনে তুমি ফুর্তি করবা আর আমরা কি চোখ বন্ধ করে রাখব?’

—‘বাজে কথা বলবেন না। ও আসছিল আমার সাথে শুধুমাত্র দেখা করতে।’

—‘এতই যখন সতীপনা দেখাও, তো লম্পটটা পালায় গেল কেন?’

—‘ওকে আমিই পালাতে বলছি—কারণ আপনার হাতে পড়লে ওকে জীবন থেকেই পালাতে হবে।’

আফজালও ছাড়ার পাত্র নয়। বকুলকে অনেক কথা শোনাল। চম্পাকে ধমক দিয়ে দমিয়ে রাখল। চম্পা নামের যে মেয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসারে নুন, তেল জোগাড় করে, ধমকের প্রতিউত্তরে তার কথা বলা সাজে না। আফজাল মেম্বারের কাছে যাবে। এ অসুস্থ পরিবেশকে সুস্থ করতে না পারলে ওর মনে শান্তি নেই। হয়তো রাতের ঘুমও হারাম হয়ে যাবে। এ সমস্ত নোংরামিকে কিছুতেই প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। অবিবাহিত যুবক-যুবতী বদ্ধ ঘরে সময় কাটাবে—এ শুধু সামাজিকভাবেই দৃষ্টিকটু নয়—পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও হুমকিস্বরূপ।

আফজাল বকুলের নিবেদন, চম্পার মিনতি অগ্রাহ্য করল। সিরাজকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে, ওকে সাথে নিয়ে চলল মেম্বার বাড়ির উদ্দেশে—সিরাজকেই প্রধান সাক্ষী হিশেবে জাহির করতে। ধাওয়া দিয়েও ধরতে না পেরে ফিরে আসা জহিরও ওদের সঙ্গ নিল। আফজালের সঙ্গ যে নিত্যদিনই নেয়। যাবার পথে ওরা তিনজনই বকুলের কান্নার শব্দ শুনতে পেল—সাথে চম্পার সান্ত্বনার বাণীও। সিরাজের পা আটকে গেল। পিছন ফিরে দেখল করুণ দৃশ্যপট। মায়া হলো। কারণ ও জানে বকুলের কান্নায় মিশে আছে একটা অবিবাহিত মেয়ের অপমান—বাবার পাহাড়সম সম্মান ধূলিসাতের চিত্র—বড় ভাইয়ের বুকভরা অহঙ্কার পতনের ছবি। সর্বোপরি, বকুলের পুরো পরিবারের লাঞ্ছিত হওয়ার নিদারুণ কষ্ট। এরকম মর্মভেদী দৃশ্য দেখেও জহির পিছন ফিরে তাকিয়ে হেসে ফেলল। বর্তমান বাংলা সিনামাতে দেখা দুঃখগুলোও ওকে এভাবে হাসাতে পারে না নিঃসন্দেহে। আফজাল পিছন ফিরে তাকাবার প্রয়োজন বোধ করল না। হয়তো রুচিতে বাধল।

কিছুদূর যেয়ে সিরাজ আফজালের হাত ধরে ফেলল।

—‘আফজাল ভাই, বকুল আফারে মাফ কইরা দেন। বিচার-আচার করলে যে হের পরিবারের ইজ্জত আর থাকব না।’

—‘আমাকে যে অপমান করল তার কী হবে?’

—‘আমি বলমু নে, আপনার কাছে যেন ক্ষমা চায়।’

আফজাল চুপ করে থাকে বিধায় সিরাজ এবার রীতিমত ব্যগ্রতা প্রকাশ করে, ‘আমার পরিবারও তো এইখানে জড়িত। ভাই, একটু দয়া করেন।’

‘দয়া করতে পারি এক শর্তে।’

‘কী শর্ত, ভাই?’

‘কাল সন্ধ্যার পর তোমার বাসায় আমি আসব। বকুলরেও থাকতে বলবা। সরাসরি জিজ্ঞাসা করব—আমাকে আজ বিনা অপরাধে এত বড় অপবাদ দিল কেন?’

সিরাজ বিনা শর্তে রাজি হলো—তবে ওর ভেতরে ভেতরে কিছুটা দ্বিধাও কাজ করল।


এ যেন প্রতিবাদহীন এক কামুক প্রেমিকের নষ্ট জীবনদর্শন!


২.
মেম্বারের সাথে আলাপচারিতার পর সরাসরি বাড়িতেই প্রবেশ করল আফজাল। নিলুফা খাটে বসে দু’বছরের বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে খেলছিল। ছেলেকে কোলে তুলে নিল আফজাল। নিজেকে সামলে যথাসম্ভব গুছিয়ে নিলুফার উদ্দেশে বলল, ‘খেয়াল করেছ, মহল্লার অবস্থা দিনে দিনে কেমন নাজুক হয়ে যাচ্ছে। নীতি-নৈতিকতা একেবারেই যেন উঠে যাচ্ছে।’

ছেলেকে কোলে নিয়ে ও কী বোঝাতে চাইছে? ছেলের ভবিষ্যৎ চিন্তায় অস্থির কি? নিলুফা কিছুই বুঝতে পারে না। আফজাল আবার বলে চলে, ‘অবিবাহিত মেয়েরা পর্দা তো করছেই না—ফষ্টিনষ্টি করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর একটা বিহিত করতেই হবে। অবশ্য, আগামীকালের বিচারেই সব ফায়সালা হয়ে যাবে।’

—‘তুমি কার কথা বলছ?’

—‘আর কার কথা, বকুল।’

—‘তুমি এসব ঝামেলায় জড়াচ্ছ কেন? তোমার সাথে কি কিছু হয়েছে?’

আফজাল ভেতরে কেঁপে উঠল—‘আমার সাথে হতে যাবে কেন? কী সব যুক্তিহীন কথা বলছ!’

—‘আমি যুক্তিহীন কথা বলছি? তুমিই-বা কোন যুক্তিতে মেয়েলি বিষয়ে জড়াচ্ছ?’

এবার রীতিমতো রাগের ভঙ্গিমায় আফজাল। সম্ভব হলে ধমকে ওঠে—‘একে মেয়েলি বিষয় বলে? মানুষের মধ্যে কি দায়িত্ববোধ থাকবে না? সমাজের ভালোমন্দ কি পরিবারের ভালোমন্দ থেকে আলাদা?’

নিলুফা বিস্মিত। আজ শুরু থেকেই আফজালের কথা বলার ভঙ্গিমা অন্যরকম। এ কি অভিনয়! আফজালের মূর্তি যে আজ অগ্নিরূপ, যা কিনা ওর চরিত্রের বিপরীত চিত্র। ওদের চার বছরের সংসার-জীবনে নিলুফা কখনোই এমনটা দেখে নি। আফজাল যতটা রাগী তারচেয়ে বেশি কৌশলী। যেখানে রাগ প্রকাশ না করলেই নয়, সেখানেও কৌশলে কাজ চালিয়ে ঠান্ডা মাথায় বিরুদ্ধ পরিস্থিতির উত্তাপকেও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। প্রয়োজনে নিজেকে কিছুটা ছোট করতেও দ্বিধা করে না।

প্রসঙ্গক্রমে বলতে হচ্ছে, অন্যের প্রেমিকাকে বিয়ে করেছিল এই আফজাল। নিলুফা-নিলয়ের প্রেম খুব বেশি দিনের না হলেও দশ মাস দশ দিন স্থায়ী ছিল। সেই প্রেমে সৌন্দর্য ছিল—প্রত্যাশা ছিল—একে-অন্যকে প্রাপ্তির নিশ্চয়তাতে প্রতিজ্ঞা ছিল। সাময়িক দ্বন্দ্ব কোন প্রেমে কাজ করে না? নিলুফা-নিলয়ের প্রেমের দ্বন্দ্বে একে-অন্যকে প্রত্যাখ্যান করার কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না। কিন্তু নিলুফা প্রত্যাখ্যান করে নিলয়কে। কাছের বন্ধু আফজালের পরামর্শের ফাঁদে পড়ে। নিলয় আফজালের বিকৃত চতুরতাকে ঠাওর করে সরাসরি ওর সাথে দেখা করে। যথাসম্ভব অপমানও করে। মৌখিক অপমানে কাজ না হলে চূড়ান্ত পর্যায়ে গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করে না। কিন্তু আফজাল নিরুত্তর। এ যেন প্রতিবাদহীন এক কামুক প্রেমিকের নষ্ট জীবনদর্শন! নিষিদ্ধ প্রেমের প্রয়োজনে পাপ করতে দ্বিধাবোধ করে না—পাপের পরিণতিতে চরম অপমানিত হয়ে নিজেকে অতি তুচ্ছ, অতি ছোট করেও বিন্দুমাত্র আফসোস করে না। সেই আফজালের পুরোটাই চিনে ফেলেছে নিলুফা। তবুও আফজালকে স্বামী হিশেবে মেনে নিতে হয়। সংসার জীবনের যাত্রাপথে কণ্টকিত হাজার পথ মাড়িয়ে ওকে সঙ্গ দিতে হয়। সদ্য ফুল ফোটা আগত সন্তানের মুখে স্তন্য গুজে দিয়ে ভাবতে হয়—ওর ভবিষ্যতের জন্য পিতার প্রয়োজনীয়তাও সমান গুরুত্ববহ।

নিলুফা বকুলের বিষয়টা নিয়ে বাড়তি কথা বলতে রীতিমতো বিরক্ত বোধ করছিল।

—‘থাক বাবা, আমার এসব বিষয় নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। গ্রাম থেকে চাচি ফোন করেছিল, একবার না, একাধিক বার। তোমাকে নাকি ফোনে পাচ্ছে না।’

—‘চাচির নাম্বার আমি ব্লক মেরে রেখেছি।’

—‘সে কী কথা, কেন?’

—‘সেই একই কথা শুনতে আর কত ভালো লাগে? হয় মাকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসতে বলে, নয়তো তোমাকে গ্রামে নিয়ে যেতে বলে। তোমাকে শতবার বলা সত্ত্বেও তুমি তো আর গ্রামে যাবে না। এ চাকরি করে মাকে শহরে আনাও আমার পক্ষে অসম্ভব।’

—‘চাচি ঠিক এ কারণেই ফোন করেছিল, তুমি জেনে বসে আছো?’

—‘না জানার কী আছে—অবশ্যই জানি।’ আফজাল এবার সরাসরি নিলুফাকে প্রশ্ন করে, ‘যাবা গ্রামে মায়ের কাছে? একা একা মায়েরও তো কষ্ট হয়।’

‘তুমি অন্য কোনো ক্ষেত্রে তো মায়ের প্রতি দরদি না। আসলে আমি গ্রামে গেলে তোমার খুব সুবিধা হয়, তাই না? তুমি মেয়েলি বিষয়ে জড়াতে পারো—আবার প্রয়োজনে মেয়েলি বিচার-আচার নিয়েও মেতে থাকতে পারো।’

—‘বাজে কথা বলবা না। আসল কথা হলো, আমার মাকে তোমার সহ্যই হয় না। শাশুড়িকে মা মনে করে একসাথে বসবাস করা তোমার পক্ষে সম্ভব-ই না।’

—‘মুখ সামলে কথা বলবা। তুমি মাকে শহরে নিয়ে আসো। মাকে আমাদের কাছে নিয়ে আসতে আমার তো কোনো আপত্তি নেই।’

—‘এখানে নিয়ে আসলে সংসারের বাড়তি খরচ কে দেবে শুনি?’

—‘তুমি সংসারের বাইরে কারো করো জন্য মাত্রাতিরিক্ত যে খরচ কর, সেটা বন্ধ করলে আমাদের চারজনের সংসার দিব্যি চলে যাবে।’

—‘তুমি কী বলতে চাচ্ছ? আমি মেয়েদের পেছনে টাকা খরচ করি? আমি লম্পট, চরিত্রহীন?’

আফজাল ভয়ানক রাগ প্রকাশ করল। ছেলেকে নিলুফার কোলে দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল।


বিছানায় স্ত্রী নিক-না রানির আসন এবং রাজত্বকালও সীমাবদ্ধ থাকুক না-অন্ধকারে।


৩.
সকালে আফজালের মেজাজ ফুরফুরে। সন্ধ্যারাতে নিলুফার সাথে যাই হোক না কেন—মধ্যরাতে নিলুফার দেহে ভর করে সব দুঃখ-অভিমান-রাগ ভুলে গেছে ও। আফজাল শিখে ফেলেছে—যথার্থ পুরুষের মতো ফুর্তিতে থাকতে হলে বিছানাতে কুকুরের মতো আর বিছানা হতে নেমে বাঘের মতো আচরণ করতে হয়। বিছানায় স্ত্রী নিক-না রানির আসন এবং রাজত্বকালও সীমাবদ্ধ থাকুক-না অন্ধকারে। অন্ধকারে, আফজালের মনের ভেতরে নিলুফার শরীর কত শত রানির অবয়ব ধারণ করে তা হয়তো ও নিজেও জানে না। গতকাল রাতে অবশ্য শুধুমাত্র বকুলকেই কল্পনা করেছে। বকুলকে ভেবে রতিক্রিয়ার সুখস্মৃতি আরো বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পুরোটা রাতে তৃপ্তির ঢেউয়ে ঢেউয়ে জোয়ার তৈরি করেছে।

এখন বকুলের জন্য একটু মায়াও হচ্ছে আফজালের। কিন্তু কী আর করা—বকুলকে তো প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আফজাল শুধুমাত্র একটা রাতের জন্য সময় চেয়েছিল। কিন্তু বকুল রাজি হয় নি—প্রয়োজনে নাকি আত্মহত্যা করতেও দ্বিতীয়বার ভাববে না। যদিও পরবর্তীতে অনেক অনুনয়-বিনয় করেছে সালিশ না বসানোর জন্য—এক্ষেত্রেও নাকি আত্মহত্যা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা থাকবে না। কিন্তু প্রত্যাখ্যান! বকুলের প্রত্যাখ্যানের এ অবিচার মানবে কেন আফজাল? মেয়েটার জন্য কম সময় অপচয় করেছে ও। বন্ধু জহিরকে পাহারাদার হিশেবে রেখেই তো হাজার হাজার টাকা গচ্চা দিয়েছে। মেম্বারকেও কি খুশি না করালে চলে? মাঝে মাঝে কী সব ইঙ্গিতে বলে গম-চোরটা। নিলুফাও কি মাঝে মাঝে সন্দেহ করে না? এ জন্যেই তো গ্রামের বাড়িতে যেতে চায় না। থাকো তুমি শহরে হিন্দি সিরিয়াল নিয়ে, আফজাল তার কাজ ঠিকই চালিয়ে যাবে। সবাই কি আর এক বকুলের মতো!—রানি করে রাখবে প্রতিজ্ঞা করেও যাকে রাজি করাতে পারল না। এখন আর কী করা—আত্মহত্যা করে ফেললে না-হয় সমাধিস্থলে একতোড়া গোলাপফুল রেখে আসবে। মনে মনে হেসে ওঠে আফজাল—এবার প্রকাশ্যে—উচ্চস্বরে।

নিলুফা চিৎকার করে ডাকতে ডাকতে ফোন সেট নিয়ে আফজালের নিকটে চলে এল। সদ্য গোসল করেছে নিলুফা। কাল রাতের রানিকে এখন আরো বেশি সুন্দর লাগছে। আফজালের মনে হচ্ছে, চোখের সামনে নিজেকে সমর্পণ করে বকুল দাঁড়িয়ে আছে।

—‘চাচির ফোন। তোমাকে নাকি খুব দরকার।’

মুহূর্তের ভালোলাগা বোধ চলে গিয়ে আফজালের মধ্যে বিরক্তি চলে এল। হাতের ইশারায় বারংবার না করা সত্ত্বেও নিলুফার চাপে অগত্যা ফোনটা হাতে নিতেই হলো। ফোনটা কানে নিয়ে মিনিট খানেকের মধ্যে হু হা ছাড়া আর কোনো কথা বলল না আফজাল। ফোন রেখেও কোনো কথা বলছে না। নির্বাক, বিমূঢ় আফজালের এ রূপ তো নিলুফার অচেনা। ও কি মাটিতে পড়ে যাবে নাকি? নিলুফা তাড়াতাড়ি ধরে বিছানায় বসিয়ে দিল।

—‘কী হয়েছে তোমার? চাচি কী বলল?’

আফজাল নিরুত্তর।

আবারও নিলুফার তাড়া—‘চাচি কী বলল, আমায় বলছ না কেন?’

অবশেষে আফজাল বলতে পারল, ‘ছোট চাচার সাথে মায়ের অবৈধ সম্পর্ক। আজ জুম্মার পর বিচার।’

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৮৪, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ। কবি ও কথাসাহিত্যিক। ঢাকা সিটি কলেজ থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই —
অদৃশ্য আলোর চোখ [গল্পগ্রন্থ, অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি, ২০১৮]

সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘শীতলক্ষ্যা’।

ই-মেইল : joychironton@gmail.com