হোম গদ্য পথের পাঁচালীর উত্তর-ঔপনিবেশিক বয়ান ও আত্মপরিচয়ের সংকট

পথের পাঁচালীর উত্তর-ঔপনিবেশিক বয়ান ও আত্মপরিচয়ের সংকট

পথের পাঁচালীর উত্তর-ঔপনিবেশিক বয়ান ও আত্মপরিচয়ের সংকট
508
0

উপন্যাস নামক সাহিত্য ফর্ম বাংলা সাহিত্যে ঔপনিবেশিক আমলে প্রভাববিস্তারী হয়ে ওঠে। যার ফলে বাংলা উপন্যাসের কাঠামো থেকে শুরু করে বয়ান পর্যন্ত ঔপনিবেশিকতার প্রভাবটাই চোখে লাগে। যেখানে সামন্ত শ্রেণি কিংবা শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি উপন্যাসের বিষয়-আশয় হয়ে টিকে থাকে আর দেশীয় মিথ-লোকাচার-লোকসংস্কৃতি-ইতিহাস-ধর্ম-ঐতিহ্য হোঁচট খায় কিংবা তাল পায় না সাহিত্যে। বলা যায়, উপনিবেশের প্রভাবে এইসব বিষয়-আশয় মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি জীবন থেকে অনেকটা আড়ালে পড়ে যায়। এইসব আড়ালে পড়া বিষয়-আশয় সাহিত্যের পাতায় স্থান পেল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০) নামধারী এক লেখকের পথের পাঁচালী (১৯২৯) নামক উপন্যাসে। ইংরেজ উপনিবেশ থেকে ভারতভূমি মুক্ত হয় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে আর পথের পাঁচালী প্রকাশিত হয় ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে। যদিও পথের পাঁচালী লেখার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে। পথের পাঁচালী’র এই সময়টা গুরুত্বের দাবি রাখে যখন এই আখ্যানের কাহিনিতে একটা উত্তর-ঔপনিবেশিক বয়ান পাওয়া যায়। এই উত্তর-ঔপনিবেশিক বয়ানটার খোঁজ করা দরকার। আর তখন খোঁজা জরুরি হয়ে পড়ে অপু নামের এক ব্রাহ্মণপুত্রের আত্মপরিচয়ের সংকট অর্থাৎ ‘আইডেনটিটি ক্রাইসিস’।


বিভূতিভূষণ কৌলীন্যপ্রথার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো বয়ান খাড়া করেন নি।


২.
পথের পাঁচালী আখ্যানের কাহিনিতে অপু নামের এক গ্রাম্য বালকের মনে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামকে কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠার একটা সরল চিত্র পাওয়া যায়। গ্রামটা ইংরেজ উপনিবেশের ভারতবর্ষীয় এক গ্রাম। যে-গ্রামের পাশ দিয়ে রেললাইন গেছে। কিন্তু গ্রামের জীবন জীবিকায় রেললাইন তখন পর্যন্ত কোনো প্রভাব ফেলে নি। ফলে পিতৃপুরুষের প্রচলিত পেশা দিয়েই গ্রামীণ জীবন আর জীবিকা চলে। পিতার সুদের ব্যবসা যেমন পুত্র পায় তেমনি হরিহর পায় বংশানুক্রমে চলে আসা শিষ্য-সেবকদের বার্ষিক প্রণামি। এবার আখ্যানের কাহিনিতে নজর দেওয়া যাক। আখ্যানে ‘বল্লালী-বালাই’, ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ ও ‘অক্রুর সংবাদ’ এই তিন উপশিরোনাম পাওয়া যায়। ‘বল্লালী-বালাই’ অংশে ইন্দির ঠাকরুনকে কেন্দ্র করে কাহিনি পাক খায়। হরিহর রায়ের পিতৃপুরুষের পরিচয়ও পাওয়া যায় এই অংশে। এই অংশটা একটু খেয়াল করা দরকার :

ব্রিটিশ শাসন তখনো দেশে বদ্ধমূল হয় নাই। যাতায়াতের পথ সকল ঘোর বিপদসঙ্কুল ও ঠগী, ঠ্যাঙাড়ে, জলদস্যু প্রভৃতিতে পূর্ণ থাকিত। এই ডাকাতের দল প্রায়ই গোয়ালা, বাগদি, বাউরি শ্রেণির লোক। তাহারা অত্যন্ত বলবান—লাঠি এবং সড়কি চালানোতে সুনিপুণ ছিল। বহু গ্রামের নিভৃত প্রান্তে ইহাদের স্থাপিত ডাকাতে-কালীর মন্দিরের চিহ্ন এখনো বর্তমান আছে। দিনমানে ইহারা ভালো মানুষ সাজিয়া বেড়াইত, রাত্রে কালী পূজা দিয়া দূর পল্লীতে গৃহস্থ বাড়ি লুঠ করিতে বাহির হইত। তখনকার কালে অনেক সমৃদ্ধিশালী গৃহস্থও ডাকাতি করিয়া অর্থ সঞ্চয় করিতেন। বাংলাদেশে বহু জমিদার ও অবস্থাপন্ন গৃহস্থের অর্থের মূলভিত্তি যে এই পূর্বপুুরুষ-সঞ্চিত লুণ্ঠিত ধনরত্ন, যাহারাই প্রাচীন বাংলার কথা জানেন, তাহার ইহাও জানেন।

এখানে লেখক ইতিহাসের যে-অংশকে তুলে ধরলেন তার শুরুতেই তিনি ব্রিটিশ শাসনের পূর্বের কথা টানলেন। এটা এই আখ্যানের একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে, এখানে প্রাচীন বাংলার প্রসঙ্গ টানা হয়েছে যখন ব্রিটিশদের উপনিবেশ দানা বাঁধে নাই। বিভূতিভূষণ পুরো আখ্যান জুড়ে ব্রিটিশ উপনিবেশের কোনো কথা তুলেন নাই। এক নীলকুঠির ভগ্নাবশেষ ছাড়া যা ছিল বেঙ্গল ইন্ডিগো কন্‌সারনের হেডকুঠি। ইংরেজ উপনিবেশ নিয়ে বিভূতিভূষণের এই না-বলার মাঝে অনেক কিছুই আছে। ‘বল্লালী-বালাই’-এর শেষাংশে ‘ইন্দির ঠাকরুনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে সেকালের অবসান হইয়া গেল’ বলে যে-ইঙ্গিত লেখক দেন তা গ্রামীণ এক বৃদ্ধাকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের জের টানা। কারণ ইন্দির ঠাকরুনের সঙ্গে জড়িত আছে কৌলীন্যপ্রথার ইতিহাস।

শোনা যায়, পূর্বদেশীয় এক নামজাদা কুলীনের সঙ্গে ইন্দির ঠাকরুনের বিবাহ হইয়াছিল। স্বামী বিবাহের পর কালেভদ্রে এ গ্রামে পদার্পণ করিতেন। এক-আধ রাত্রি কাটাইয়া পথের খরচ ও কৌলীন্য-সম্মান আদায় করিয়া লইয়া, খাতায় দাগ আঁকিয়া পরবর্তী নম্বরের শ্বশুরবাড়ি অভিমুখে তল্পি-বাহকসহ রওনা হইতেন, কাজেই স্বামীকে ইন্দির ঠাকরুন ভালো মনে করিতেই পারে না।

ইন্দির ঠাকরুনের এই ইতিহাসটা খুব জরুরি। কারণ ঔপনিবেশিক কাঠামোয় আবদ্ধ জীবন ছেড়ে বিভূতিভূষণ কৌলীন্যপ্রথার একটা বয়ান তুলে ধরলেন। যা এই অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। আর ইন্দির ঠাকরুন মরার পর এই ইতিহাসটাই যেন শেষ হয়ে যায়। তখন প্রশ্ন জাগে, বিভূতিভূষণ এই কৌলীন্যপ্রথার বিষয়টা কিভাবে দেখলেন? বিভূতিভূষণের এই দৃষ্টিভঙ্গিটা হলো উত্তর-ঔপনিবেশিক। কারণ বিভূতিভূষণ কৌলীন্যপ্রথার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো বয়ান খাড়া করেন নি। তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্যে উপনিবেশ পূর্ব একটা সময়কে ধারণ করেছেন মাত্র। আর এখানেই উপনিবেশিত লেখকের বয়ানটা হয়ে উঠেছে উত্তর-ঔপনিবেশিক। কারণ আখ্যানের মূল কাহিনির সঙ্গে এই অংশের কোনো ঘনিষ্ঠ সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও লেখক এটা দিয়েই আখ্যানের শুরু করছেন। আর তখন লেখকের বয়ান বোঝা জরুরি হয়ে পড়ে যে-তিনি গ্রাম্য এক বালক মনে প্রকৃতির পরিচয় তুলে ধরতে শুধু এই আখ্যানের কাহিনি বিস্তৃত করেন নাই। এই গ্রাম্য-প্রকৃতি একই সঙ্গে আত্মপরিচয়ের একটা চিত্র হয়ে উঠেছে। যে-আত্মপরিচয়ের সংকটে অপু শহর ছেড়ে আবার নিশ্চিন্দিপুরে ফিরে আসতে চায়। এই সংকটটা শুধু অপুর না এটা উপনিবেশিতদের সংকট। এ প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে।

আখ্যানে ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ অংশে প্রকৃতিতে উন্মুক্ত হয়েছে অপু আর দুর্গা। এখানে অপুর চেয়ে দুর্গা বেশি প্রকৃতিঘেঁষা। ফলে দুর্গা প্রকৃতির সঙ্গে সমার্থক হয়ে উঠেছে। আর দুর্গার ভেতর দিয়েই অপুর মনে মানব সম্পর্ক আর প্রকৃতি ভাবনার রূপান্তর ঘটেছে। ‘যখন তাহার দিদির মাথার সামনের রুক্ষ চুলের এক গোছা খাড়া হইয়া বাতাসে উড়ে তখনই কী জানি কেন, দিদির উপর অত্যন্ত মমতা হয়—কেমন যেন মনে হয় দিদির কেহ কোথাও নাই—সে যেন একা কোথা হইতে আসিয়াছে—উহার সাথী কেহ এখানে নাই।’


বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন।


এখানে দুর্গার জন্য অপুর মনে যে-মমতা জন্মেছে তার মধ্যেও কিন্তু প্রকৃতি নিয়ামক হয়ে এসেছে। দুর্গার রুক্ষ চুলের গোছা বাতাসে উড়লে অপুর মনে দুর্গা যেন প্রকৃতির মতো রহস্য নিয়ে হাজির হয়। এই প্রকৃতির যে-রূপ দুর্গার মধ্যে তা ভারতবর্ষীয়। প্রত্যন্ত গ্রামের প্রকৃতিজাত এক বালিকার মধ্যে লেখক সমস্ত ভালোবাসা, মমতা দান করেছেন আবার তার মৃত্যুও ঘটিয়েছেন। দুর্গার এই মৃত্যু তো একটা প্রতীক যার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি বিলীন হয়ে যাচ্ছে আখ্যানের কাহিনি থেকে। ইন্দির ঠাকরুন যেমন ভারতবর্ষীয় একটা ইতিহাস তেমনি দুর্গা ভারতবর্ষীয় প্রকৃতি। ভারতবর্ষীয় এই প্রকৃতির সঙ্গে মিথ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষা এই আখ্যানে তাল মিলিয়েছে।

প্রথমইে মিথ প্রসঙ্গ। আখ্যানে কাশীদাসী মহাভারতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বজয়ার মুখে সুর করে পড়া মহাভারতের কাহিনি অপু মন দিয়ে শোনে ‘—বিশেষত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কথা শুনিতে শুনিতে সে তন্ময় হইয়া যায়।… এক-একদিন মহাভারতের যুদ্ধের কাহিনি শুনিতে শুনিতে তাহার মনে হয় যুদ্ধ জিনিসটা মহাভারতে বড় কম লেখা আছে।’ তাহলে যুদ্ধ জিনিসটা কোথায় বেশি আছে? কাশীদাসী মহাভারতে যুদ্ধ কম থাকার যে-প্রসঙ্গটা অপুর মনে এসেছে সেটা কি তাহলে ভারতবর্ষে আছে? আর ভারতবর্ষে যুদ্ধ মানেই তো উপনিবেশিত হওয়ার ইতিহাস। ‘মহাভারতের রথিগণ মাত্র অষ্টাদশ দিবস যুদ্ধ করিয়া নাম কিনিয়া গিয়াছেন, কিন্তু রক্তমাংসের দেহে জীবন্ত থাকিলে তাহারা বুঝিতে পারিতেন, যশোলাভের পথ ক্রমশই কিরূপ দুর্গম হইয়া পড়িতেছে।’ এই দুর্গম হয়ে পড়া পথটা উপনিবেশ থেকে মুক্ত হওয়ার অবস্থারই ইঙ্গিত কিনা সেটা একটা ভাবনা।

পথের পাঁচালী আখ্যানের কাহিনিতে উপস্থিত সাহিত্য ও শিক্ষা বিষয়টার দিকে নজর দেওয়া যাক। অপুর ভেতরে সাহিত্যপাঠ আর চর্চার একটা আগ্রহ লক্ষ করা যায়। অপুর সাহিত্যপাঠের এই জগৎটায় পদ্মপুরাণ-এর আবদার পাওয়া যায়। অপুর মধ্যে পদ্মপুরাণের এই আগ্রহ দেবী মনসার ইঙ্গিতবাহী। কারণ দেবী মনসার কাহিনি তো মাতৃহীনা, পিতা ও স্বামী পরিত্যক্তা, লাঞ্ছিতা হওয়ার। যার সবকিছু থাকার পরও কিছুই নেই। যেমনটা উপনিবেশিতদের বেলায় ঘটে।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। তবে ঔপনিবেশিক শিক্ষা লাভের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক মুক্তি যে জরুরি তা এই আখ্যানে দেখিয়েছেন। আর সেক্ষেত্রে বিভূতিভূষণের মধ্যে উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটটা লক্ষণীয়। আখ্যানে অপুকে যেদিন প্রথম পাঠশালায় পাঠানো হয় সেটা যেন সেই প্রাচীন ভারতীয় টোল যেখানে বসে সংস্কৃত পাঠের শিক্ষা নেওয়া হতো। অপুর সেই পাঠাশালার চিত্রটা ছিল এমন : ‘কয়েকটি বড় বড় ছেলে আপন আপন চাটাইয়ে বসিয়া নানারূপ কুস্বর করিয়া কী পড়িতেছে ও ভয়ানক দুলিতেছে। তাহার অপেক্ষা আর একটু ছোট একটি ছেলে খুঁটিতে ঠেস দিয়া আপন মনে পাততাড়ির তালপাতা মুখে পুরিয়া চিবাইতেছে।’ খেয়াল করা দরকার পাঠশালার এই চিত্রটা লেখক ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতে দেখাচ্ছেন। আবার যখন অপু নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে কাশীর স্কুলে ভর্তি হয় সেখানকার চিত্রটা ভিন্ন। কারণ সেখানে শিক্ষা অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে ফলে অপুর স্কুলের একটা ম্যাগাজিনে লেখা ছাপার জন্য তাকে চার টাকা চাঁদা দিতে হয়। আবার কাশী থেকে অপুরা যখন আরেক জায়গায় যায় তখন ‘অপু মাকে বলিয়া কহিয়া একটা ছোট স্কুলে যায়।… জন পাঁচেক মাস্টার, ভাঙা বেঞ্চি, হাতলভাঙা চেয়ার, তেলকাঠি উঠা ব্ল্যাকবোর্ড, পুরোনো ম্যাপ খানকতক—ইহাই স্কুলের আসবাব।’ স্কুলের এইসব চিত্র অর্থনৈতিক শ্রেণি বৈষম্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত। কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় টোল শিক্ষা ব্যবস্থায় এহেন চিত্র ছিল না, যদিও সেখানে বর্ণপ্রথার একটা ব্যাপার ছিল।

আর সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে চৈত্র সংক্রান্তি, চড়ক পূজা, পূজা উপলক্ষে যাত্রাপালা আখ্যানের এইসব বিষয়-আশয়ের মধ্যে বিভূতিভূষণ যেন ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীন রূপটাই দেখাতে চেয়েছেন। কারণ এই আখ্যানেই মেয়েদের দ্বারা অর্গান বাজানোর ঘটনাও আছে। তো প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য বরাবরই এইখানে তুলনামূলক একটা ভঙ্গি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়ের প্রেক্ষাপটে পাশ্চাত্য তার ঔপনিবেশিক ভঙ্গি নিয়ে যতটা দণ্ডায়মান বিভূতিভূষণ যেন ঠিক ততটাই উত্তর-ঔপনিবেশিক ভাবনায় আখ্যানকে খাড়া করছেন। আর এই ঔপনিবেশিকতার ব্যাপারটা আরও গভীরভাবে লক্ষ করা যায় হরিহর রায়ের ভিটা ত্যাগ করে কাশীতে যাওয়া, অতঃপর মৃত্যু, তারপর অপুর ‘আইডেনটিটি ক্রাইসিস’ বা আত্মপরিচয়ের সংকট ঘটার পর। এবার ‘আইডেনটিটি ক্রাইসিস’ বা আত্মপরিচয়ের সংকট নিয়ে আলোকপাত করা যাক।

৩.
আখ্যানে রেললাইন আর রেল দেখার জন্য অপু আর দুর্গা মাঠের পর মাঠ পেরিয়েছিল। ‘দুইজনে অনেকক্ষণ নবাবগঞ্জের সড়কে উঠিয়া চাহিয়া চাহিয়া দেখিল। তাহার দিদি বলিল—বড্ড অনেক দূর, না? যাওয়া যাবে না—
—কিছু তো দেখা যায় না—অতদূরে গেলে আবার আসব কী করে?’


অপু কিংবা সর্বজয়া দুজনেই আখ্যানের শেষের দিকে তাদের আত্মপরিচয়ের সংকটটা উপলব্ধি করতে পারে।


সেদিন তারা রেলের দেখা পায় নাই। আর পরবর্তীকালে রেলে চড়েই অপু চিরদিনের মতো নিশ্চিন্দিপুর ছাড়ে। ‘অতদূরে গেলে আবার আসব কী করে?’ ফিরে আসার যে-ভয় কিংবা সংশয় তাই সত্যি হয়। কারণ পিতৃপুরুষের এই ভিটামাটি ছাড়ার পেছনে হরিহর কিংবা সর্বজয়া স্বচ্ছলতার যে-স্বপ্ন দেখে তা তো বাস্তবায়িত হয় নি বরং উল্টো আত্মপরিচয়ের সংকটে পড়ে। আর এই আত্মপরিচয়ের সংকট এতটাই প্রবল হয় যে, নিশ্চিন্দিপুরে আর তাদের ফেরা হয় না। ব্রাহ্মণ হরিহর রায়ের বংশানুক্রমে পাওয়া পেশা ছেড়ে সপরিবারে কাশীতে চলে যাওয়া থেকেই আত্মপরিচয়ের সংকট শুরু। নিশ্চিন্দিপুরের হরিহর রায় আর কাশীর হরিহর রায় পেশাগত জায়গায় বিস্তর ফারাকের মধ্যে পড়ে। নিশ্চিন্দিপুরের বালক অপু তার পিতার পেশাকে কখনওই প্রশ্নবিদ্ধ করে নাই। কিন্তু কাশীতে তার বাবা কথকতা করে এটা তার বন্ধুদের সামনে স্বীকার করতে সে সংকট বোধ করে।

যেদিন তার সঙ্গীরা থাকে, সেদিন কিন্তু বাবার দিকে সে যায় না। সেদিন বাবার নিকট দিয়া যাইতেছিল, তাহার বাবা দেখিতে পাইয়া ডাকিল—খোকা, ও খোকা—

তাহার সঙ্গের বন্ধুটি বলিল—তোমাকে চেনে নাকি?

অপু শুধু ঘাড় নাড়িয়া জানায়, হ্যাঁ। সে বাবার কাছে আসে নাই সেদিন। তাহার বাবা ঘাটে কথকতা করিতেছে, একথা বন্ধুরা পাছে টের পায়!

বন্ধুরা টের পেলে কী সমস্যা সৃষ্টি হতো? অপু সেদিন যে-আত্মপরিচয় সংকট তৈরি করে তা যেন তার বংশানুক্রমে প্রচলিত পেশা কিংবা জীবিকাকে সে অস্বীকার করে। আর এই সংকট আরও ঘনীভূত হয় হরিহরের মৃত্যুর পর। উদাহরণ হিশেবে বলা যায় :

ক. গ্রামে যাত্রা দেখার সময় অপু নিজের ইচ্ছে মতো জায়গায় বসে কিন্তু শহরে আশ্রিত বাড়িতে থিয়েটার দেখার সময় সেটা সে পায় না, চাইলে অপমানিত হতে হয়।

খ. পরের বাড়িতে সর্বজয়ার নিতান্ত চোরের মতো থাকা।

গ. ভয়ে ভয়ে কোনোরকমে চাহিয়াচিন্তিয়া অপুর উপনয়নের ব্যবস্থা করা।

ঘ. তুচ্ছ কারণে অপুকে বেত দিয়ে পেটানো।

এইসব ব্যাপার অপু আর সর্বজয়ার মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকটকে দগদগে করে। আর তখন তারা দেশের সন্ধান করে। তাদের এই দেশ হলো নিজের ভিটামাটি।

তাহার মা খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—একটা কথা ভাবচি, এখান  থেকে চলে যাবি?

সে আশ্চর্য হইয়া মায়ের মুখের দিকে চাহিল। পরে হঠাৎ খুশি হইয়া বলিয়া উঠিল—কোথায় মা, নিশ্চিন্দিপুর? সেই বেশ তো, চলো, আমি সেখানে ঠাকুর-পুজো করব—পৈতেটা তো হয়ে গিয়েছে—নিজেদের দেশ, বেশ হবে—এখানে আর থাকব না—

অপু কিংবা সর্বজয়া দুজনেই আখ্যানের শেষের দিকে তাদের আত্মপরিচয়ের সংকটটা উপলব্ধি করতে পারে। ফলে নিশ্চিন্দিপুর মানে তাদের দেশ আর পিতৃপুরুষের পেশাটা তারা ফিরে পেতে চায়। কিন্তু চাইলেই কি দেশ ফেরত পাওয়া যায়?


‘চল এগিয়ে যাই’—এই আহ্বান জানিয়ে বিভিূতিভূষণ তার পথের পাঁচালী শেষ করেছেন। এই এগিয়ে যাওয়া যে, প্রাচীনকে ফেলে নয় তা এই আখ্যানের বিষয়-আশয় জুড়ে আছে। যার মধ্য দিয়ে লেখক প্রাচ্য বলয়টা ঘিরেই ঘুরপাক খেয়েছেন। তার এই ঘুরপাক ঔপনিবেশিকতা বিরোধী। কারণ ঔপনিবেশিক কাঠামোয় নিজের দেশ কিংবা আত্মপরিচয় কোনোটাই টিকে থাকে না। ‘—আমাদের যেন নিশ্চিন্দিপুর ফেরা হয়—ভগবান—তুমি এই কোরো ঠিক যেন নিশ্চিন্দিপুর যাওয়া হয়—নৈলে বাঁচব না—’ উপন্যাসের শেষাংশে অপুর এই গোপন আর্তি তার একার থাকে নি দেশ হারানো উপনিবেশিত, আত্মপরিচয়ের সংকটে পাক খাওয়া সবার আর্তি হয়ে ঝরেছে।

Masud Parvaj

মাসুদ পারভেজ

জন্ম ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫; দিনাজপুর।

শিক্ষা : স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

প্রকাশিত বই :
জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]
বিচ্ছেদের মৌসুম [গল্প, দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
ঘটন অঘটনের গল্প [গল্প, বটতলা, ২০১১]

ই-মেইল : parvajm@gmail.com
Masud Parvaj