হোম গদ্য নূর, আমাদেরই লোক

নূর, আমাদেরই লোক

নূর, আমাদেরই লোক
870
0

উত্তরবঙ্গের ছোট্ট শহর নীলফামারী। আসাদুজ্জামান নূরের বাড়ি।

ছোটবেলায় একবার নূর, সমরেশ এবং সিদ্দিক—এই তিন বন্ধু মিলে ঠিক করলেন কবিতা লিখবেন। এজন্য উপযুক্ত জায়গা তাদের পছন্দ হলো বাড়ি থেকে খানিকটা দূরের শহরতলিতে। নিরিবিলি এক ধানক্ষেতে দিনক্ষণ ঠিক করে তারা পৌঁছুলেন। যার যার পছন্দ মতন জায়গা বেছে নিয়ে তিন বন্ধুই আলাদা হয়ে কবিতা লিখতে বসলেন। কাগজ-কলম তো আছেই। সবার মধ্যেই উত্তেজনা—কবি হবেন! প্রায় ঘণ্টাখানেক চেষ্টার পর দু’জনের কিছুটা হলো, কিন্তু নূর আটকে গেলেন। ওদিকে দূর স্টেশনে রেলগাড়ির আওয়াজ শোনা যায়—ফুটো পয়সা চ্যাপ্টা করার খেলা তখনো বাকি। সেদিকেও মন পড়ে আছে, কাজেই উঠতে হয়! তো এত জায়গা থাকতে ধানক্ষেত কেন পছন্দ হলো? কী কারণে যেন তাদের ধারণা হয় কবিতা লিখতে হলে প্রকৃতির মনোরম পরিবেশ, নদী, পাহাড়, নীলাকাশ, দিগন্ত প্রসারিত ধানক্ষেত ইত্যাদি দরকার। যেহেতু তাদের এলাকায় নদী, পাহাড় নেই—তাই সিদ্ধান্ত হলো কবিতা লেখার জন্য ধানক্ষেতই ভরসা।


নীলফামারীই তার অনিবার্য উত্থানের সূচনাস্থল। আজ শুধু নীলফামারীর নন, তিনি গোটা বাংলাদেশের।


সেই নূর এখন বড় হয়েছেন। সমর সেন তার প্রিয় কবি। কর্মব্যস্ততার মধ্যেই রফিক আজাদ, কামাল চৌধুরী প্রমুখের কবিতা পড়েন। এই বড়বেলায় তার ৩টি খাতা ও একটি ডায়েরি রয়েছে। যখনই সময় পান তখনই কবিতা লিখেন। আরও অবাক ব্যাপার হলো, সেগুলো আবার তিনি প্রকাশ করেন না! তার ক্ষুদে আত্মজীবনী নিরালা নীলে, সেখানে তার ডায়েরির একটি কবিতা টুকে নেওয়া আছে। যেমন—

‘‘আমি তো ধরেই নিই
আমাকে সবাই চেনে
তবু তুমি অচেনা চোখ নিয়ে
তাকালে আমার দিকে
প্রশ্ন তোমার চোখে
তীব্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শরীর ভেদ করে
আমাকে চিনতে পারলে না?
আমি তো সেই…’’

কবিতায় নিজের মুখোমুখি হয়ে নিজের সাথে কথা বলছেন বলেই তো মনে হয়। প্রতীকী আয়নায় কি এভাবে স্বগতোক্তি হয় না? নিজের উদ্ভাসন, ভিতরের দ্বন্দ্ব, জিজ্ঞাসা চিত্র ও সংশয় দূর করানো—এই যে এতগুলো প্রতিক্রিয়া; এত জীবন্ত—ছোট্ট একটা পরিসরে। ভাবতেই শিহরন জাগে, মনে হয় আমিই আমার মুখোমুখি—এক জাদুময় আত্মপ্রতিকৃতি। সত্তাকে চিনতে সদাই আত্মসচেষ্ট। একটাই বার্তা—আমি তো আছিই, আমি তো ছিলাম, আমিই সেই! কৃতী ও সংশয়ের সংমিশ্রণে ভিতরের মানুষটার এই ঘোষণা বা আশ্বস্তকরণ বড় চমৎকার লাগে, সত্তার পরতে পরতে দৃশ্য বদলানো নাটকীয়তার চমক। নিভৃতে বা সংগোপন উচ্চারণে আমরা ঠিকই বুঝে নেই তিনি যা তিনি তাই-ই, আজকের আসাদুজ্জামান নূর। বাড়ি এবং স্কুলের পরিবেশ থেকে পাওয়া সাংস্কৃতিক মানসিকতাই তার ভবিতব্যের ফল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবি-আবৃত্তিকার-অভিনেতা থেকে জননেতা এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী। নূরের এইসব হয়ে উঠবার পিছনে বাবা আবু নাজেম মোহাম্মদ আলী এবং প্রিয় শিক্ষক সুনীল রতন ব্যানার্জি (খোকন দা)-র অসামান্য অবদান। জীবনের প্রথমভাগে ছিলেন উত্তরবঙ্গের ছোট্ট জনপদ নীলফামারীতে—নীলফামারীই তার অনিবার্য উত্থানের সূচনাস্থল। আজ শুধু নীলফামারীর নন, তিনি গোটা বাংলাদেশের।

বড়বেলায় কবি হিশাবে পরিচিতির অন্তত দৃশ্যমান কোনো আগ্রহও নূরের কাছ থেকে পাওয়া যায় নি। নূর এখনও কবিতা লিখছেন কিন্তু কবি হিশাবে ততটা প্রকাশ্য কিংবা প্রচারিত নন। যতটা উদ্ভাসিত আবৃত্তিকার হিশাবে। মূলত বাবার কাছেই আবৃত্তির হাতেখড়ি ঘটে। ইদানীং নাটক, আবৃত্তি প্রভৃতির ক্ষেত্রে পারফর্মিং আর্টের শিল্পীরা যেমন তৈরি হন ওয়ার্কশপের মাধ্যমে। তখনকার নীলফামারীতে নূরের ছোটবেলায় বর্তমান স্ট্যাইলের ওয়ার্কশপ করে শিখবার সুযোগ মোটেও ছিল না বলাটাই বাস্তবসম্মত। তবুও নূর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করলেন; উচ্চারণে স্পষ্টতা আনয়নে সাহায্যকারী হিশাবে স্কুলের পণ্ডিত মশাইয়ের দ্রুতপঠন ক্লাশের কথা। আরও প্র্যাক্টিক্যালি মিন করলেন বাবার কাছে দৈনন্দিন পাঠাভ্যাস তথা অনুশীলনের কথা, যা ছিল ওয়ার্কশপেরই নামান্তর। নূরের ভাষায় যদি পিছন ফিরে তাকাই; দেখি আশ্চর্য এক স্বীকারোক্তির ধরন—

মনে আছে, ছোটবেলা বারান্দায় পাটি পেতে হারিকেন জ্বেলে যখন পড়তে বসতাম বাবা বলতেন ‘জোরে পড়’। আমরা জোরে জোরে পড়তাম। বাবা শুনতেন। উচ্চারণ ভুল হলে শুধরে দিতেন। আজ বুঝি কেন উনি উঁচু গলায় পড়তে বলতেন। উচ্চারণের নিয়মকানুন আজো আমার পুরোপুরি জানা নেই, ব্যাকরণ আমার সারাজীবনের ভীতি। কিন্তু ভুল উচ্চারণ কানে লাগে, বুঝতে পারি। এ সম্ভবত, ছেলেবেলায় বাবার কাছে আমার প্রথম ওয়ার্কশপ।

কিন্তু নূরের শিল্পীসত্তা যৌগিক-আবৃত্তি ও অভিনয়ের মিশেলে। অভিনয় করেছেন নাটক ও চলচ্চিত্রে। পিছনের একটা গড়ন-পিটনের কাল বা দীর্ঘ অতীত তাকে এইখানে উপস্থাপন বা উপনীত করেছে। জীবনের প্রথম পর্যায়ে নীলফামারীতে থাকতেই আসাদুজ্জামান নূর কিন্তু আবৃত্তি করতেন। স্কুলজীবনে কয়েকটি নাটকেও অভিনয় করেছেন।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে, ষাটের দশকের শেষভাগে নূর ঢাকায় পা রাখেন। অভিনয় জীবনের দ্বিতীয় পর্যায় এখান থেকেই। তার আগে নীলফামারীতেই স্কুল এবং কলেজ জীবনের পরিসমাপ্তি। ঢাকায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে’ আইন বিভাগে ভর্তি হন। প্রথম দিকে নাটক নিয়ে যখন যেরকম সুযোগ পান সেরকম কাজ করেছেন। কিন্তু প্রকৃত-অর্থে, স্বাধীনতার পরই ঢাকার মঞ্চনাটকের সাথে সম্পূর্ণরূপে যুক্ত হন। এই জড়িত হওয়ার গল্পটিও বেশ মজার। শানে-নুযুল হলো—সিনেপত্রিকা ‘চিত্রালী’র জন্য আলী যাকেরের সাক্ষাৎকার নিতে নূর এ সময় তার কাছে যান। আলাপের এক পর্যায়ে আলী যাকের নূরকে আমন্ত্রণ জানালেন। নূর কথা রাখলেন—সময় করে একদিন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের রিহার্সাল দেখতে গেলেন। রুমে ঢুকতেই সবাই প্রম্পটার পাওয়া গেছে ধরনে; বরণ-আনন্দের খুশিতে হৈচৈ করে উঠলেন। বুঝা গেল নূরকে তারা চেনেন। তাদের অনুরোধে নূর প্রম্পটারের দায়িত্ব নিলেন, সেই থেকেই তিনি হলেন নাগরিকের একজন। আন্তরিকভাবেই অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। একদিন হঠাৎ একটা ঘুষির ঘটনা ঘটল। নূরও রাতারাতি প্রম্পটার থেকে নিয়মিত অভিনেতায় পরিণত হলেন। তার পৌষ মাসের শুরু—খুলে যায় বৃহত্তর শিল্পীজীবনের পথ।


তিনি ভাগ্যবান অন্যদের তুলনায়; হেতু হুমায়ূন আহমেদ নামের বিপুল প্রতিভাবান নাট্যকার তার বন্ধু ছিলেন।


ঘটনাটি সংক্ষেপে, নাগরিকে ১৯৭৩-এর শেষ দিকে কথাশিল্পী রশীদ হায়দারের লেখা তৈলসংকট ও বিদগ্ধ রমণীকুল-এর রিহার্সাল চলছিল। কেরোসিন সংকট, মজুতদারদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ—এসব বিষয়ই ছিল নাটকে। একপর্যায়ে উত্তেজিত মানুষ মজুতদার ভেবে ভুলক্রমে নিরীহ আবুল হায়াতকে উত্তম-মধ্যম দেয়। এই সময়টাতেই সেই ঘুষির ঘটনা ঘটে। রিহার্সালের মধ্যেই প্রয়াত চলচ্চিত্রকার বাদল রহমান এমন ঘুষি মারলেন যে, আবুল হায়াতের নাক ফেটে গেল। সিরিয়াস ইনজুরি—হাসপাতাল পর্যন্ত গড়ায়। দু’দিন পর শো—পত্রিকায় বিজ্ঞাপন গেছে, টিকিট বিক্রি শেষের দিকে। শো’ও বাতিল করা যাচ্ছে না। উপায় না পেয়ে আলী যাকের তখন নূরকে আবুল হায়াতের জায়গায় অভিনয় করতে বললেন। প্রম্পটার হিশাবে নূরের সব সংলাপ মুখস্ত ছিল, কাজেই তেমন অসুবিধা হয় নি। সেই থেকে একের পর এক সাড়া জাগানো মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছেন। যেমন : ‘এই নিষিদ্ধ পল্লীতে’, ‘ভেঁপুতে বেহাগ’, ‘বহিপীর’, ‘সৎ মানুষের খোঁজে’, ‘মাইলপোস্ট’, ‘নাট্যবিচিত্রা’, ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’, ‘সাজাহান’, ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’ প্রভৃতি। সত্তরের দশকের শুরুর কিয়ৎকাল পর থেকে পুরো আশির দশক বা নব্বইয়ের কিয়দংশ পর্যন্ত মঞ্চ নাটকে ভিন্ন উচ্চতায় নূরকে দেখতে পাওয়া যায়।

নূর মঞ্চনাটকে যেমন উজ্জ্বল; তেমনি টিভি নাটকেও দুর্দান্ত অভিনয়ের কাল চিহ্নিত করলেন। বিশেষ করে, আশির দশকে এবং আংশিক নব্বইয়ে টিভি নাটকে অভিনয় করে সমকালের মানদণ্ডে জনপ্রিয়তার সকল সীমানা অতিক্রম করলেন। হুমায়ুন ফরীদিও ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান ও জনপ্রিয় অভিনেতা, তবে সেই প্রেক্ষিত আলাদা। এই একই সময়টায় বাংলাদেশের মঞ্চ ও টিভি নাটকে একঝাঁক তারকা শিল্পীর ছিল সোনালি কাল। নূর তাদেরই একজন। তিনি ভাগ্যবান অন্যদের তুলনায়; হেতু হুমায়ূন আহমেদ নামের বিপুল প্রতিভাবান নাট্যকার তার বন্ধু ছিলেন—যিনি তার সব টিভিনাটক ও সিনেমা’র জন্য তাকে পছন্দ করতেন। আশির দশকেই কোনো এক সময় হুমায়ূন আহমেদের সাথে রামপুরা টিভি ভবনে তার পরিচয় ঘটে। এই পরিচয়ই তার অভিনয় জীবনটাকে অন্যরকম করে দেয়। হুমায়ূন আহমেদ সবেমাত্র পিএইচডি করে দেশে ফিরেছেন। টিভির জন্য ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ লিখলেন। বিটিভির নাটক বদলে যাওয়ার সূচনা হুমায়ূনের হাত দিয়েই। আসাদুজ্জামান নূরের সাথে তার সংবেদনশীল সম্পর্ক। তার লেখা নাটক, ধারাবাহিক নাটক বা সিনেমায় নূরের থাকাটা অবধারিত এবং অনিবার্য ব্যাপার ছিল। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’—হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত সব ধারাবাহিক নাটক। ‘আগুনের পরশমণি’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ তার বানানো সিনেমার নাম।

মাত্র কয়েকটা দিনের সম্ভবত ৩দিনের কাহিনি নিয়ে ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি—যেখানে নূর ছিলেন এক গেরিলা যোদ্ধার অসাধারণ ভূমিকায়। যতবার এই ছবি দেখা হয়, আশ মেটে না। মানুষ দেখে, কষ্ট পায় আবার ভালোওবাসে। মুক্তিযুদ্ধ বা দেশ স্বাধীন তো আর এমনি এমনি হয় নি। কত রক্ত, মৃত্যু, অশ্রুপাত, ত্যাগ, সম্ভ্রমহানি—‘ও আমার দেশের মাটি তোমার প’রে ঠেকাই মাথা’। ‘আগুনের পরশমণি’ সিনেমায় তরুণ গেরিলা যোদ্ধার চরিত্র নূরের জন্য অসংখ্য মানুষ চোখের পানি ফেলেছে। হুমায়ূন আহমেদ জাদু জানতেন—মানুষের মন ছুঁয়ে ভিতরটাকে ধরতে পারতেন। নাটক বা সিনোমায় কাকে দিয়ে কী হবে বা কী করা যায় অনায়াসে বুঝতে পারতেন। এবং সেরাটা বের করে নিতে পারতেন। নূর ছিলেন তাকে বুঝতে পারা আরেকজন—তাদের বোঝাপড়ার কেমিস্ট্রির মধ্যে ঐশ্বরিক কিছু একটা ছিল নিশ্চয়ই। এত স্বাভাবিক অভিনয় মানুষ কী করে করতে পারে, এই প্রশ্নের তো উত্তর পাওয়া মুশকিল! হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলির মধ্যে টিকে থাকবে—নূরও অমরত্ব পাবেন, সঙ্গে থাকবে দেশের মানুষের ভালোবাসা। যেমন মানুষের হৃদয় জুড়ে আছে ব্যক্তিগত রোজনামচার আদলে লেখা শহিদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’।

‘কোথাও কেউ নেই’ হুমায়ূন আহমেদের দেশ কাঁপানো ধারাবাহিক নাটকগুলোর একটি। নূর তখন বাকের ভাইয়ের চরিত্র করছিলেন। ঘটনাক্রমে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি আসন্ন। লোকজন ক্রেজি হয়ে উঠল, তারা এই ফাঁসি হতে দেবে না। এরকমও শোনা যায়, বাকের ভাইয়ের ফাঁসি ঠেকাতে হুমায়ূন আহমেদের তখনকার এলিফেন্ট রোডের বাসার গলিতে মোটর সাইকেলে এসে বোমা ফাটানো হয়েছে। টেলিফোনে হুমকি পেয়ে উনি জিডি করলেন। যেদিন শেষ এপিসোড, হুমায়ূন আহমেদ সেদিন পরিবারসহ গা-ঢাকা দিলেন। নাটক শেষ হওয়ার পরের দিনগুলিতে পত্রিকায় আসতে লাগল নিউজ—দেশের মধ্যে আজ এখানে কাল ওখানে বাকের ভাইয়ের কুলখানি। সত্যিই কুলখানি হয়েছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। একটি কাল্পনিক চরিত্রের জন্য এই ক্রেজ অবিশ্বাস্য, ভাবাই যায় না। আরও একটি ঘটনা আমাকে খুব মুগ্ধ করেছে। কলকাতায় তখন বিটিভি দেখা যেত। নূর ক্ষুদে আত্মজীবনী নিরালা নীলে-তে বলেছেন :

‘কোথাও কেউ নেই’ পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসু দেখতেন। শেষ এপিসোড যেদিন সেদিন তিনি নাটকটি দেখবেন বলে মিটিং ক্যান্সেল করেছিলেন।

ভাবা যায়, আমার দেশের নাটকের জন্য ঘটনাটা কত গৌরবের! মোট কথা হুমায়ূন আহমেদ আছেন আর আসাদুজ্জামান নূর নাই এমন কোনো নাটক সিনেমা এ সময়টাতে হয় নাই। তখন বিটিভি ও রেডিও-র যুগ, প্রাইভেট চ্যানেলগুলো আসে নি। সে ছিল আমাদের মঞ্চ ও টিভি নাটকের সোনালি সময়। সম্ভবত ’৭৪ সালে নূর টিভিতে প্রথম কোনো নাটকে অভিনয় করেন এবং সম্মানী পেলেন ৭০/৮০ টাকা। আশির দশকে টিভি নাটকে অভিনয় নূরকে দেশব্যাপী রাতারাতি জনপ্রিয়তার চূড়োয় তুলে নেয়।


নূর আমাদের স্বপ্নের যুবরাজ। নিজ গুণে হাজার মানুষের মন ছুঁয়ে আছেন।


নূরের আবৃত্তির দিকে যদি তাকাই, ছোটবেলায় বাবার কাছে যার হাতেখড়ি ছিল। ’৯০-তে দেশের ইতিহাসে  গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত মানুষের এককাট্টা জাগরণ বা ইতিহাসের অসাধারণ ঘটনায় এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনামলের পতন ঘটেছিল। পুরো আশির দশক ছিল স্বৈরাচার হটানোর জন্য আন্দোলন, দ্রোহ ও সংগ্রামের কাল। এমন কোনো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা রাস্তার দেয়াল ছিল না যেখানে ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’ লেখা হয় নি। নূরলদীনের এই ডাক নাটকের মধ্য থেকে বের করে নিয়ে স্বৈরাচার হটানোর মন্ত্র হিশাবে মানুষ লুফে নিল। আসাদুজ্জামান নূর মানেই হলেন এই মন্ত্র জাগানিয়া অলৌকিক জন। নূর রাতারাতি দেশব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন আবৃত্তি এবং অভিনয়ের জন্য। সৈয়দ শামসুল হকের ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ প্রস্তাবনা অংশটির এই আহ্বান মানুষের মুখেমুখে ফিরতে লাগল। ১৯৮২ সালে আলী যাকেরের নির্দেশনায় ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ ঢাকায় প্রথম মঞ্চস্থ হয়। নূরের শুধু অভিনয়ই নয়, আবৃত্তিও সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণের পরিণামে রূপ নেয়। ক্যাসেটে, অনুষ্ঠানে, মঞ্চনাটকে—সর্বোপরি এখানে ওখানে হাজার মানুষ নূরের কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে আবৃত্তি শুনতে পেয়েছে, পুরনোদের মনে আছে সব। আমাদের কালে আমরা এসব শুনে শুনেই বড় হয়েছি। আমি নিজেও দেখেছি নূর অভিনীত মঞ্চ নাটক ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’, ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’। তখনকার লাইভ পারফর্মাররা এখন বয়সের কারণে বা বিভিন্ন বাস্তবতায় নিপতিত। যারা দেখেছেন বা শুনেছেন সেই সব মানুষের স্মৃতি, পত্রিকার বর্ণনা  বা আর্কাইভের রেকর্ডিং-এ যদি থাকে তবে সূত্রগুলো জোড়া লাগিয়ে এসবের একটা অবয়ব তৈরি করা যাবে। বোঝা যাবে একজন সাধারণ আসাদুজ্জামান নূর কেন বিশিষ্ট আসাদুজ্জামান নূর হয়ে উঠলেন।

আমি তখন তরুণ লেখক ও নাট্যকর্মী—আড্ডা অন্তঃপ্রাণ। মফস্বল শহরে থাকি। দেখতাম যেদিন টিভিতে ‘কোথাও কেউ নেই’ সিরিজ নাটকটি থাকত সেদিন মানুষজন আগেভাগেই হাতের কাজ সারার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ত। ভোজবাজীর মতন রাস্তা ফাঁকা হয়ে যেত। পাড় আড্ডাবাজরা পর্যন্ত বাসা-বাড়িতে ছুটত নাটক দেখার জন্য। আমাদের বিনোদন, মনোরঞ্জন বা দ্রোহের উষ্ণতায় নূর ছিলেন সে সময়ের আশ্চর্য মন্ত্র জাগানিয়া। কিংবা হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালা। তার আবৃত্তি শুনে ও নাট্যাভিনয় দেখে আমরা আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামে উদ্দীপ্ত হয়েছি—আমাদের নারী-শিশু-দেশ ও ভালোবাসার মেয়েটির প্রতি অনুরাগ গভীরতর হয়েছে। অনেকের সম্মিলিত অবদানের মধ্যে নূরের এই বিশিষ্টতা মানুষ মনে রাখবে।

তার আবৃত্তি ও অভিনয় আমাদের আনন্দ দিয়েছে। তিনি আমাদের ক্ষোভ-দুঃখকে সঙ্গী করেছেন। বিনোদন ও মনোরঞ্জনের মাধ্যমে ছুঁয়ে গেছেন সকল মানুষের কল্পনার নিভৃত জায়গাটিকে যেখানে একান্ত অনভূতির মিলিত স্রোতধারা প্রবহমান। আমরা সেইখান থেকে শক্তি পাই—দুঃখের বরাভয়, সান্ত্বনার আশ্রয়, দ্রোহ ও নির্মাণ এবং উদ্দীপনায়। ছোট ছোট সুখ-দুঃখের ঘটনা বা হাসি-কান্নায় অশ্রুপাতে কিংবা আনন্দ-বেদনা, দ্রোহ, সংগ্রাম ও গৌরবে রাঙানো আমাদের জীবনের অনুভবগুলিই নূর দীর্ঘকাল বহন করেছেন। নূর আমাদের স্বপ্নের যুবরাজ। নিজ গুণে হাজার মানুষের মন ছুঁয়ে আছেন। স্বাধীনতার পর থেকে নব্বইয়ের কিয়দংশ পর্যন্ত প্রায় তিন দশক অবধি—আবৃত্তি, টিভি নাটকে উপভোগ্য অভিনয় ও মঞ্চনাটকে তার মননশীল চর্চা আমাদের সংস্কৃতির সঞ্চয় সমৃদ্ধির নামান্তর। একটা সময়ে আমাদের আটপৌরে জীবনের অনুভব-অভিজ্ঞতা রূপায়ণের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হলেন। জনচিত্ত জয়ী ন্যাচারাল পারফর্মার নূর, তাকে আমাদের আপনজন ভাবতে বড় ভালো লাগে। নূর যা করেছেন, এই মাপের কীর্তিস্থাপন সংঘটিত হয় আপন প্রতিভার সাথে সময় নির্ধারিত কতগুলো রিলেটেড ফ্যাক্টরের কম্বিনেশনে। সবকিছু মিলিয়ে এইরূপ শক্তিমান অভিনেতার পুনরাগমনের জন্য এদেশে ভবিষ্যতের অপেক্ষা কতটা দীর্ঘতর হবে, সেই সিদ্ধান্ত হাতে অনির্ণীত মহাকাল।

আসাদুজ্জামান নূর বহুগুণের মোহনা—এটা মোটেই অত্যুক্তি নয়। তিনি বিখ্যাত মানুষ, ইতোমধ্যেই অনেক নাম করেছেন। আমাদের আপনজন। তার জন্য রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে একটু বদলে নিয়ে আমাদের মতন করে বলি—

নূর, আমাদেরই লোক
আর কিছু নয়,
এই হোক শেষ পরিচয়।

Firoz ahmad

শেখ ফিরোজ আহমদ

জন্ম ১ আগস্ট ১৯৬৩, চাঁদপুর।
অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : উন্নয়নকর্মী।

প্রকাশিত বই :
পাতকীর ছায়া [কবিতা, অন্তরীপ প্রকাশনী, বগুড়া, ১৯৮৭]
কালের পৃষ্ঠায় [প্রবন্ধ, যুক্ত, ঢাকা, ২০০৮]
মাতরিশ্বা [কবিতা, ভাষাচিত্র, ঢাকা, ২০১০]

ই-মেইল : firozbangla@yahoo.com
Firoz ahmad