হোম গদ্য নিকটবর্তী কথাগুলো

নিকটবর্তী কথাগুলো

নিকটবর্তী কথাগুলো
727
0

ভোঁ ভোঁ ভোঁ করে সরকারি গাড়ির বহর হাসপাতালের সামনে থামে। এই হুইসেলগুলো আগে শোনা যেত না। আগে পুলিশের গাড়ি থাকত আগে-পিছে—মনে হতো ভিআইপি নয় কোনো দুর্ধর্ষ চোরকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। হাস্যকর তুলনামূলক এমন ভাবনা সাইফুল আমানকে মনের অজান্তেই হাসতে বাধ্য করে। ক্রমশ নিকটবর্তী হুইসেল শুনে আমান কেবিনের বেডে শুয়েই টের পায় আক্তারুজ্জামান আসছে।

কিন্তু ওকে খবর দিল কে? নিশ্চয় দিলারা! ঘাড়টা একটু উচু করে আমান আশে পাশে কাউকে খোঁজেন—কিন্তু প্লাস্টিকের মতো অনুভূতিহীন একটা ফর্সা নার্স ছাড়া আর কাউকে দেখলেন না।


“আমাদের এই স্বাধীনতা কি তাহলে মিথ্যে? আমি কী চেয়েছিলাম? এই হাতে তবে কাজ নেই কেন?”


একঝাক পদধ্বনি কেবিনের নিকটবর্তী হয়, শো এর আগে মঞ্চের পর্দা সরে যাওয়ার মতো দরজার পর্দা সরে গেলে আক্তার ঢোকে, ৮৫-৮৬ সালের দিকে মঞ্চ কাঁপিয়ে যেভাবে আক্তার মঞ্চে ঢুকত। “আমাদের এই স্বাধীনতা কি তাহলে মিথ্যে? আমি কী চেয়েছিলাম? এই হাতে তবে কাজ নেই কেন ?”

কেবিনের নীরবতা ভেঙে আক্তার বলে ওঠে, কেমন আছিস?

আমানের বেডটা স্বয়ংক্রিয়, নার্স এখন মাথার দিকের অংশটা উচু করে দিয়েছে। যাতে মাথা উচু করে কথা বলা যায়! এতক্ষণ কি আমানের মাথাটা নিচু ছিল?

আক্তারের প্রশ্নে ৮৫-৮৬ সালের মঞ্চের আবহটা মাথার ভেতর থেকে উবে যায়। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো ইচ্ছে হয় না। আক্তার আবার বলে, কিরে কেমন আছিস?

এবার আর এড়ানো যায় না, আমান বলে, দেখতেই পাচ্ছিস! গতরাতে আবার, এ নিয়ে ৩ বার। এবার আর মনে হয় না ফিরব!

— কী যা তা বলিস?

—হুম, সত্যিই তো! মনে হচ্ছে!

শোয়া অবস্থাতেই নোয়ানো হাতের আঙ্গুলের ইশারায় আক্তারকে বসতে বলে আমান। আক্তারের পি এস সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে একটা ভিজিটর চেয়ার এগিয়ে দেয় মন্ত্রী সাহেবের দিকে। মন্ত্রী সাহেব বসতে বসতে হাতের ইশারা করলে মন্ত্রী বহরের অন্য সবাই কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।

আক্তার কিছুটা নোয়ানো ভঙ্গিতে মাথাটা আমানের দিকে এগিয়ে বলে, তুই কিছু বলবি?

—হুম, বলব! আচ্ছা আমাদের বয়স কত হলো রে?

তোরটা অ্যাকুরেটলি বলতে পারব না, আমার ৬৯।

আমান জোরে হেসে উঠতে গিয়েছিল, আক্তার থামিয়ে দিলে ফিস ফিস করে বলে, সিক্সটি নাইন!! আক্তার আমানের ভাবভঙ্গি লক্ষ করে কিছুটা কপট বিরক্তি নিয়ে বলে, মরতে বসেছিস, এখনো??

কিছুক্ষণ নীরবতা, নীরবতা আমানই ভাঙ্গে। তুই খুব ব্যস্ত, সময় নষ্ট করে কেন দেখতে আসলি!

আক্তার প্রশ্নটা এড়িয়ে যায়। তারপর বলে, তুই মনে হয় হাসপাতালের বিল নিয়ে টেনশন করছিস? ওটা নিয়ে তোর ভাবার দরকার নেই।

—কোনো কিছু না ভাবলেই ভাবনাটা পেয়ে বসে বুঝলি? তারপরও ভালো, অসুস্থ না হলে কি আর আমাকে দেখতে আসতি?

আক্তার জানে এ প্রশ্নটা সঠিক, তাই উত্তর দেয় না।

আমান বলে, তোর সিক্সটি নাইন হলে আমার আটষট্টি। তুই আমার এক বছরের সিনিয়র। এ জন্যে তোকে দেখে হিংসা হয় না। বড়দের সাফল্যে হিংসা কিসের?

—এসব কথা রাখবি এখন?


আমান কাউকে কোনোদিন বলতে পারে নি যুদ্ধের সময় সে প্রায়ই ইস্কাইলাসকে স্বপ্নে দেখত, তার সাথে ইস্কাইলাসের কথা হতো!


আমান কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকে। আক্তারুজ্জামানও কিছু বলে না। কিছুক্ষণ কেবিনের বাতাসে কবরের নৈঃশব্দ উড়ে বেড়ায়। সাইফুল আমানের কি এখন আফসোস হয়?

এক সময় আমান ও আক্তার একসাথে মঞ্চ দাপিয়ে বেরিয়েছে। এমনকি একাত্তরেও। আক্তার রাজনীতি করতে পারে কিন্তু যুদ্ধে আমান এগিয়ে। আলফাডাঙ্গার যুদ্ধে আমানের কীর্তি কে না জানে? কমান্ডার জলিল তাঁকে ইস্কাইলাস বলে ডাকত। আসলেই কি তাই? আমান কাউকে কোনোদিন বলতে পারে নি যুদ্ধের সময় সে প্রায়ই ইস্কাইলাসকে স্বপ্নে দেখত, তার সাথে ইস্কাইলাসের কথা হতো! সত্যিই তো হতো। একটা যুদ্ধে সে ছিল, জন্ম যুদ্ধ! একটা স্বপ্নের গাথুনি ছিল!

অথচ যুদ্ধের বন্ধু, মঞ্চের বন্ধু, এমনকি জীবনের বন্ধু আক্তারকে এখন কত অচেনা মনে হয়!

স্বাধীনতার পর তাঁরা দুজনেই মঞ্চে ফিরেছিল। দাপটের সাথে। প্রমিথিউস বন্ড, নীল দর্পণ, পদ্মাবতী—আরো কত কী? কিন্তু মঞ্চের আলোর বাইরের পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছিল, আক্তার ফিল্মে গেল, আমান তখনো ক্ল্যাসিক নাটকের সেবায়।

হয়তো কপাল। পরিচালক অনেক সেধেছিল, আমান রাজি হয় নি। কিন্তু আক্তার জহুরির মতো—সোনা চিনেছিল। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস এখন আর জোর দেয় না। অর্থনৈতিক সমীকরণ কেমন যেন সব বদলে দিল, একটা শতক যেন হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ল নব্বই দশকের সামান্য উঠোনে। কী করার ছিল আমানের?

আমানের সম্বিৎ যখন ফিরে আসে তখন তিনি বুঝলেন আক্তার তাঁকে অনেকক্ষণ ধরে ডাকছে।

—কী চিন্তা করছিস এত?

—তুই-ই ভালো করেছিস। ফিল্মে যাওয়াটা তোর সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।

—কিন্তু এ নিয়ে তো তুই আমার সাথে দুই বছর কথাই বলিস নি!

—হ্যাঁ, তা ঠিক। বলি নি।

—আমি তোকে অনেক বলেছিলাম, তুই আসলে সিনেমার ধরনটাই পালটে যেত! তোর ছায়ায় পড়ে থেকে থেকে আজ আমি যদি এমন হতে পারি, তাহলে তুই কী পরিমাণ সাফল্য পেতিস ভেবে দেখ।

—হ্যাঁ, এটা ঠিক, আমার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু কী যেন ছিল না। একটা সিগারেট খাই চল।

—তুই কি পাগল, এই অবস্থায়?

কিছুক্ষণ নীরব থেকে আক্তার সময় নিয়ে বলে, একটা জিনিস মনে পড়ে, দত্ত দা’ বারে বারে তোকেই চাইছিল। তুই তো রাজিই হলি না। কিন্তু একটা জেদ আমার মধ্যে ছিল। তুই যেটা পারিস সেটা কি আমি পারব না! হয়তো তোর মতো থ্রোয়িং আমার ছিল না কিন্তু আমিও তো পারতাম! আসলে আমি চাইছিলাম তোর ছায়া থেকে বের হতে।

—হা হা হা, এতদিন পর সত্যিটা বললি! বিকেল একটু ক্লান্ত বোধহয়। কেমন ঘনিয়ে আসছে। আমান আক্তারের দিকে তাকায়। তুই তো এখন উঠবি? নাকি?

—হ্যাঁ, উঠতে তো হবেই।


আমান আক্তারের হাতটা ধরে, তারপর ক্ষীণ কন্ঠে বলে, শুরুর সংলাপটা আমার সাথে একবার কোরাস করবি?


আক্তারুজ্জামান উঠে দাঁড়ান। পি. এস.দের সন্ত্রস্ত তাড়াহুড়া জেকে বসে কেবিনে। পাশে দাঁড়ানো আমানের স্ত্রী দিলারা, অকেজো পুত্র সন্তান ও আরো দুয়েকটি পরিচিত মুখের বিগলিত বিনয় ভীষণ যন্ত্রণার উদ্রেক করে। একি হিংসা? নাকি অন্য কিছু। শুয়েই শুয়েই আমান দেখতে পায় পি এস একটা চেক তুলে দিচ্ছে দিলারার হাতে। সে চেকটা আরেকটা হাত দিয়ে নিচ্ছে দিলারা। হাত দিয়ে ছাড়া আর কী দিয়েই বা নিবে?

কিন্তু বের হওয়ার আগেই আমান পেছন থেকে ডাকে। আক্তার ফিরে আসে বেডের কাছে। ইশারায় কাছে আসতে বললে আক্তার মাথাটা নিচে নামালে আমান বলেন, তোর লোকজনদের আরেকবার একটু বাইরে যেতে বলবি? একটু কথা আছে!

আক্তার ইশারা করলে সবাই আরেক দফা বাইরে যায়। কেবিনের ভেতর এখনো কিছুটা অন্ধকার লেপ্টে আছে। আক্তার বসে। আমান আক্তারের হাতটা ধরে, তারপর ক্ষীণ কন্ঠে বলে, শুরুর সংলাপটা আমার সাথে একবার কোরাস করবি? ঐ যে মহিলা সমিতি, ছিয়াশির বিকেলে তুই সিনেমায় নেমে যাওয়ার আগে যে বিশুদ্ধ উচ্চারণ ছিল! ‘প্রথম প্রভাত’… একবার ধর না?

কেবিনের অন্ধকার এবার গলে গলে পড়ে। দুজন প্রৌঢ় হাত ধরাধরি করে আওড়াতে থাকে নাটক ‘প্রথম প্রভাত’ এর প্রথম অঙ্ক—“আমাদের এই স্বাধীনতা কি তাহলে মিথ্যে? আমি কী চেয়েছিলাম? এই হাতে তবে কেন কাজ নেই? আমাদের হাত কি কথা বলবে না? না, এটা হতে পারে না। এই হাতে যদি দিতে পারে নিরাপদ দেশের সম্ভ্রম,  তবে আবারো… তবে আবারো এ হাতে নেব…”

একটা বদ্ধ কক্ষে আটকে পড়া ফড়িঙের মতো করে আমান ছুটে যায় চতুষ্কোণ। একটা জানালা খুঁজে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ভর করে তার সময়। আক্তারের মুঠি করে ধরে রাখা বন্ধুর হাত ক্রমশ শক্ত হতে থাকে।

মির্জা মুজাহিদ

মির্জা মুজাহিদ

জন্ম ২৫ জানুয়ারি, নড়াইল। চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছেন। পেশা : ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, স্পেলবাউন্ড কমিউনিকেশন লিমিটেড।

প্রকাশিত বই : বিপ্রতীপ [গল্প], একুশে বইমেলা ২০১৬, অনুপ্রাণন প্রকাশন।

ই-মেইল : me@mirzamuzahid.net
মির্জা মুজাহিদ

Latest posts by মির্জা মুজাহিদ (see all)