হোম গদ্য নাকছাবি

নাকছাবি

নাকছাবি
911
0

জৈগুনবিবির অন্তিম সময় উপস্থিত।

হাপরের মতো ওঠানামা করে তার রুক্ষ বুক। বের হয়ে পড়া চোয়াল ঝুলে পড়ে। তীব্র কষ্টে সে মাছের মতো হা করে শ্বাস টানে। খামচে ধরে বাঁশের চাটাইয়ের ঘুণে ধরা পুরনো খুঁটি। খড়কুটো আঁকড়ে ডুবন্ত নাবিকের বাঁচার শেষ চেষ্টা।

তবু মরেও মরতে চায় না জৈগুনবিবি! কৈ মাছের মতো ছটফট করে, খাবি খায় কিন্তু প্রাণটা খাঁচা থেকে বেরোয় না শেষতক। কোটর থেকে বের হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টারত ঘোলা চোখ দুটোয় এখন আর কিছুই প্রায় দেখে না—তবু সে চোখই উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ফেরায়। পাগলের মতো খোঁজে কাউকে! তারপর তার শ্লেষ্মা জড়ানো, বুজে আসা গলায় খুব কষ্টে উচ্চারণ করে—

‘অ বাছের, বাপ আমার! আইচিস?’

উপস্থিত জনতা, যারা মূলত জৈগুনের অন্তিম বিদায়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত, সাগ্রহে অপেক্ষা করছে কখন চোখ বুজবে এই শকুনের পরমায়ু পাওয়া বুড়ি, তারা এবার নড়েচড়ে ওঠে। ফিসফাস গুঞ্জন ওঠে প্রথমে, তারপর তা স্পষ্ট হয়। জনতার ভেতর থেকে কেউ একজন, কথা বলে ওঠে, কণ্ঠে মমতার চেয়ে বিরক্তিই যেন বেশি ঝরে।

‘সেকি তুমার জন্যি বাড়িত বসে আচে নাহি! তার কামকাইজ নাইকো? আইজ কুমোরখালির আট, শনিবার, সে গেচে আটে তার জিনিস নিয়ে বেইচপের, ফিরতি মেলা রাইত অবিনি তার!’

শুনে জৈগুন চুপসে যায় আরও। তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় ঢেরগুণ। ঘোলা অসহায় চোখ মেলে সে দুপাশে মাথা নাড়ায়। পাটকাঠির মতো চিকন, হাড্ডিসার, বলিরেখাভরা ডান হাতটা নেড়ে সে ইশারা করে দরজা থেকে উপস্থিত জনতাকে সরে দাঁড়াতে।


জৈগুনবিবি নিদারুণ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে প্রতীক্ষা করে সেই অচেনা অমঙ্গলের, আসন্ন মৃত্যুর। সময়ের অকরুণ কামড়ে ছিবড়ে হওয়া তার শুকনো শরীরটাকে কাকের বাচ্চার মতো শুকনো, ক্ষুদ্র আর কুৎসিত দেখায় ।


প্রায়ান্ধকার ঘরে বাতাস চলাচলের ঐ একটাই দরজা। জনতা তা আগলে রাখায় অন্তিম সময়ে বাতাসের বড় অভাব বোধ করে সে। জনতা একটু সরে কি সরে না। সবাই চায় অন্তত শেষ সময়টা নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করতে। জৈগুনবিবির অন্তিম সময়ের বর্ণনাটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে অন্যের নিকট উপস্থাপনে বিকল্প কোনো পন্থা তারা ভেবে পায় না। বড় হা করে নিশ্বাস টানতে টানতে জৈগুনবিবি হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘বাছেরের সাতে কতা না কয়া আমি মইরবের পারতিচি নে, তুরা উয়োর আনার এটা বেবস্তা হর, তোরে পায় পরিচি, আমার যবর কষ্ট অচ্চে, যবর…’

কথা আর বলতে পারে না জৈগুন বিবি, চোখ উল্টে যায়, মহিলারা কেউ কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে, কেউ মুখে পানি দেয়, কেউবা জৈগুনের কানের কাছে সুর করে বলে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু…’

জনতা ভাবে, নাটক বুঝি সমাপ্ত হলো এবার।

পুরুষদের কেউ কেউ একটি বা দুটি করে মরে আসা বাঁশ জৈগুনবিবির কবরে দান করার নিয়ত করে মনে মনে বেশ আত্মপ্রসাদে ভরে উঠতে চায়। কেউবা ভাবে এবার পাড়ায় বের হয়ে জৈগুনবিবির জানাজার টাকা ওঠানোর ব্যবস্থায় নামবে। কিন্তু সবার আশার মুখে ছাই দিয়ে কিছুক্ষণ পর জৈগুনবিবি আবার নড়ে চড়ে উঠে, মাছের মতো হা করে শ্বাস টানে, তারপর সেই একই সুরে বলে—

‘ও বাছের, বাপ আমার! টপাত হরে আয়! আর কষ্ট সইজ্য অয় না রে…’

বাছের শেখ কি আর আসে! সে গেছে সেই সাত মাইল দূরের কুমারখালীর হাটে। শুক্রবার সারারাত নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরে বাছের শেখ, তারপর, শনিবারের কুমারখালীর হাটে নিয়ে যায়। কষ্টেসৃষ্টে পার করে তার দিন। এর মধ্যে জৈগুনবিবির মৃত্যুর সময় উপস্থিত হবে সে কি আর জানত! জানলেও কাজকর্ম বাদ দিয়ে জৈগুনবিবির কথা শোনার মতো অবস্থা তার নাই।

জনতা বোঝে জৈগুনবিবি সহসা মরছে না, হয়তো বাছের শেখের জন্যই অপেক্ষা করে আছে তার প্রাণ—বাছের শেখের আসতে তো সেই বিকেল গড়িয়ে সাঁঝ! অতঃপর হতাশ জনতা ধীরে ধীরে যে যার কাজে ফিরে যায়। সবারই নুন আনতে পান্তা ফুরোয় প্রায়। যেতে হয়। দুচারজন বয়স্ক মহিলা আর অতি কৌতূহলী মানুষ থেকে যায় জৈগুনের কাছে। দয়া নয় বরং কর্তব্য আটকে রাখে তাদের।

জৈগুনবিবির ছোট্ট ভিটেখানির নুয়ে পড়া শনের ছাউনির অনেক ওপর দিয়ে একঝাঁক কাক অনবরত কা কা কা রবে উড়ে, হুটোপুটি করে। কয়েকটা চিল ডানা মেলে ওড়ে যায় সাঁ করে, ভর দুপুরে কাকের কা কা ডাক—চৈত্রের দারুণ কাঠফাটা রোদ্দুর আর ধুলোওড়া বাতাসে কী এক অমঙ্গল ছায়া ফেলে জৈগুনবিবির ভিটেয়।

কুঁড়ের মধ্যে বেড়ার গায়ে হেলান দিয়ে জৈগুনবিবি নিদারুণ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে প্রতীক্ষা করে সেই অচেনা অমঙ্গলের, আসন্ন মৃত্যুর। সময়ের অকরুণ কামড়ে ছিবড়ে হওয়া তার শুকনো শরীরটাকে কাকের বাচ্চার মতো শুকনো, ক্ষুদ্র আর কুৎসিত দেখায় ।

জৈগুনবিবি! কত বয়স তার! জৈগুন নিজেও ঠিক বলতে পারে না তার প্রকৃত বয়স। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে এসেছিল সে—আট কী নয় বছর বয়স ছিল তখন। কত দিন গেল তারপর, কত বছর! কে জানে!

ভারী দশাসই মরদটা ছিল তার। গহর শেখ দেখতে ছিল যেমন তাগড়া জোয়ান, তেমনি তিরিক্ষি মেজাজি! মাগো! কী গমগমে গলায় কথা বলত লোকটা!

প্রথম প্রথম জৈগুনবিবির বুকের ভেতরটা ভয়ে ধরাস ধরাস করত খুব! তারপর কবে যেন লোকটা জৈগুনবিবির ভারী আপন হয়ে গেল। রাগী ছিল খুব, কিন্তু মনটা ছিল শাদা। জৈগুনবিবিকে ভারি ভালোবাসত লোকটা।

কলেরায় মরল শেষে!

দেখতে দেখতে উজাড় হয়ে গেল চর। গহর শেখ অন্য পাড়ায় কলেরায় মৃত আত্মীয়কে দেখে এসে ভালো মানুষ বিছানায় গেল। মাঝরাতে শুরু হলো ভেদবমি। সকাল হতে না হতেই সব শেষ।

জৈগুনবিবি তার ছোট ছোট তিনটি ছেলে আর ছয়মাসের মেয়েটিসহ দিব্যি সুস্থভাবে বেঁচেবর্তে রইল। রইল তার মতো আরও কিছু শক্ত প্রাণও। জৈগুনবিবির শ্যামলবরণ ধীরে ধীরে বিবর্ণ হলো ঠিকই, তবু টিকে রইল টিমটিমে পিদিম জ্বালা শনের ছাউনিঘেরা ঘরটাতে বাতিল পয়সার মতো।

গহর শেখের মৃত্যু জৈগুনবিবিকে অকূল পাথারে ফেলে। তখনও জৈগুনের কূল উপচানো রূপ—পিঠময় ছড়িয়ে পড়া একরাশ কালো চুল, ডাগর কালো চোখ।

রাত দুপুরে শিয়াল, শকুন বড় উৎপাত করে মারত, বড় জ্বালা ছিল তখন। পুরুষগুলো বড় বজ্জাত, তাদের চোখ পড়ত জৈগুনের ওপর, ঝামেলা এড়াতে মহিলারা কাজে নিতে চাইত না জৈগুনকে।

বাছের শেখ গহর শেখেরই দুঃসম্পর্কের ভাইয়ের ছেলে। বিপদে আপদে এখন তারই দ্বারস্থ হয় জৈগুনবিবি ।

সর্বনাশা পদ্মার তোড়ে ভেসে গেছে জৈগুনের স্বামীর ভিটে, ভেসে গেছে আবাদি জমি যা ছিল সব! সম্পর্কগুলোও কি তেমনি করে ভেসে যায় নি, মরে যায় নি জীবনের কাছে পরাজিত, লাঞ্চিত, হতভাগ্য জৈগুনবিবি! অন্যের বাড়িতে কাজ করে, খেয়ে না খেয়ে কোলে পিঠে করে বড় করা সন্তানেরা, আজ তারা কোথায়! জানে না জৈগুনবিবি!


সেই বয়সে বিধবা হওয়ার কষ্ট হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে জৈগুনবিবি—টের পেয়েছে চরের লেবাসধারী শকুনগুলোর লকলকে জীব কত ভয়ঙ্কর!


আবাদি জমি গিলে খেয়েছে পদ্মার সর্বগ্রাসী ক্ষুধা, সেই সাথে ছিনিয়ে নিয়েছে তার জীবনের সবটুকু আলো। পদ্মার এই ধূধূ চরে কাজ নেই, দুবেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থান নেই। শুধু ক্ষুধা আর কান্না। অভাব আর কোন্দল। জৈগুনের ছেলেরা একে একে ছেড়ে গেছে অভিশপ্ত এ চর। ছেড়ে গেছে জৈগুনবিবিকেও। এখানে জীবনের কাছে বড় তুচ্ছ সেই মমত্ব। জৈগুন শুনেছে তারা ঢাকা শহরে গেছে, সংসার পেতেছে সেখানেই । মায়ের কোনো খোঁজ রাখে না কেউই।

জৈগুনই কি রাখে তাদের খোঁজ! একমাত্র মেয়েটা স্বামীর অত্যাচার সইতে না পেরে গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে সেই কবে! মরে বেঁচেছে! ছেলেরা ছেড়ে গেছে তাকে, সেও প্রায় বছর পনের হলো! এতদিন ভিক্ষে করে চলত জৈগুনের দিন। এখন আর সে শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নাই শরীরে। বাছের শেখ নিতান্তই দয়ার বশে জৈগুনবিবির খোঁজ খবর করে মাঝে মধ্যে। সে কতবার বলেছে জৈগুনকে, ‘অ চাচি, চল তোক শহরে দিয়াসি, হোনে শুনিচি বুড়া-বুড়ির থাহার ফাইন বেবস্তা আচে, তোর তালি পরে আর খাওয়া পরার চিন্তে থাকপি নানে কো!’

শুনে চোখের জলে, নাকের জলে এক করেছে জৈগুনবিবি। এই চর ছেড়ে, এই পরিচিত মুখ, এই চিরচেনা পদ্মার জল হাওয়া ছেড়ে কোথায় যাবে সে! সে বরং না খেয়ে মরে পড়ে থাকবে এই চরেরই ভীষণ তপ্ত বালুর ’পরে, তবু কিছুতেই এখান থেকে যাবে না কোথাও! এখানকার হাওয়ায় যে তার অতীতের মিহি সুবাস ভাসে, ভাসে তার মরদটার শরীরের গন্ধও! জৈগুনবিবির ভারি পাগল পাগল লাগে তাতে।

শেষ পর্যন্ত বেছে নেয় ভিক্ষের পথ! সাত সকালে উঠে চর ভেঙে, নদী পার দিয়ে ডাঙায় গিয়ে মানুষের দরজায় দরজায় হাত পাতা! কি লজ্জা! কি অপমান! মাঝে মাঝে সে ঝোলায় করে চর থেকে বালু নিয়ে যায়। ‍ওপাড়ের বউঝিদের কাছে বেচে। তারা খৈ, মুড়ি ভাজার জন্য কেনে। তাতে আর ক পয়সা! ভিক্ষেই ভরসা অগত্যা।

গহর শেখের মরার দিনটি স্পষ্ট মনে পড়ে জৈগুনবিবির। কত বছর আগের কথা! জৈগুনবিবির বয়স তখন বড়জোড় পঁয়ত্রিশ! আনমনে মাথা দোলায় জৈগুন। না, তার বেশি নয়। সেই বয়সে বিধবা হওয়ার কষ্ট হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে জৈগুনবিবি—টের পেয়েছে চরের লেবাসধারী শকুনগুলোর লকলকে জীব কত ভয়ঙ্কর!

সকালে গহর শেখের মৃত্যুর পর পাড়ার কেউই আসে নি কলেরার ভয়ে। জৈগুনবিবি আর তার সন্তানদের উচ্চস্বরে কান্নার আওয়াজে ভারী হয় বাতাস, অমন কান্না তখন ঘরে ঘরে শোনা যায়। লোকজন ভয়ে চর ছেড়ে পালায়। নেহাৎ নিরুপায় যারা তারাই থেকে যায়। জৈগুনবিবির কান্না থামে অচিরেই। বাস্তব অবস্থাটা অনুধাবন করে যেন দিশে পায় না ভেবে।

সে একা কী করবে গহর শেখের লাশ! ছেলেরা তখন খুবই ছোট । তার মরদটা কি শেষে জানাজা ছাড়াই কবরে যাবে! কবর! কবরই-বা খুঁড়বে কে! ভেবে আবার গলা ছেড়ে কেঁদে ওঠে সে। অগতির গতিস্বরূপ চরেরই কজন যুবক ছেলে শেষে ব্যবস্থা করে গহর শেখের দাফন কাফনের।

কদিন পর কলেরার প্রকোপ কমে এলে চরের লোকজন ঘরে ফেরে, একে একে। জৈগুনবিবিকে দেখে সবাই ছিঃ ছিঃ করে ওঠে! এ কী অলক্ষুণে কথা গো! স্বামী মরেছে সেই কবে, এখনও কেন জৈগুনবিবির নাকে জ্বলজ্বল করে নাকছাবি! সবাই মিলে জৈগুনবিবিকে বোঝায়, নিষেধ করে, না পেরে শাসায়। কিন্তু জৈগুনবিবি নির্বিকার।

তার এক কথা সে কোনোমতেই নাকছাবি খুলবে না। একঘরে করার ভয়েও টলে না সে। কানাঘুষা, ফিসফিসানি থামে একসময়। ক্লান্ত হয়ে সবাই ধরেই নেয়, গহর শেখের প্রতি অনুরাগ আর স্মৃতিকাতরতাই জৈগুনবিবির এহেন আচরণের কারণ ।

জৈগুনবিবির নাকে একটা নয়, তিন তিনটে ফুটো। কবে করা হয়েছিল সে স্মৃতি নেই জৈগুনবিবির। নাকের দুপাটায় দুটো আর মাঝখানে একটা, মোট তিনটে নাকছাবি এখনও জ্বলে জৈগুনবিবির নাকে। হাজারো আঁকিবুকি আঁকা মুখের উপর ঝুলে পড়া নাকে তিন তিনটে নাকছাবি যেন বিদ্রেূপের তীক্ষ্ণ ফলার মতো জেগে থাকে জৈগুনের মুখে। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা হাসাহাসি দেয়, বয়স্করা করে তিরস্কার—জৈগুনবিবি তবু গা করে না কিছুতেই। হেসে সে উড়িয়ে দেয় সব।

বড় সাধের ভিটেখানা ছিল গহর শেখের। ভিটে থেকে একটু গেলেই পদ্মা। সে কী রূপ ছিল গো পদ্মার! গহর শেখ নৌকা নিয়ে ওপাড়ে পাবনায় যেত কাজে। অপেক্ষা করে করে জৈগুন অধীর হতো। তারপর ভর দুপুরে স্নান করার জন্য গিয়ে বসত পদ্মার পাড়ে। বিজন চরে হাওয়া উঠত খুব, শব্দ উঠত শোঁ শোঁ শোঁ। তালগাছের পাতায় টাল খেয়ে কী করুণ সুর উঠত তখন! সাথে আরও বউঝিরা থাকত। পদ্মার উপচে পড়া জলে ভেসে যেত ট্রলার, পালতোলা নৌকা, খুব দূর দিয়ে নয়, কূল ঘেঁষে। অবাক হয়ে দেখত জৈগুনবিবি আর তার সাথিরা।

নৌকা বা ট্রলারে থাকা সাহেবরা অনেক সময় হাত ইশারায় ডাকত তাদের, চিৎকার করে বলতও কিছু, তারা বুঝত না কিছুই, শোনাও যেত না, বাতাসে গা ছুঁয়ে শব্দগুলো ভেসে যেত দূরে, তবু তাদের ইশারা দেখেই এ ওর গায়ে হেসে গড়াত। সবাই বলত ওরা আসলে জৈগুনবিবিকেই ডাকে। শুনে হাসত জৈগুন। মনে মনে একটু অহঙ্কারও হতো তার।

বিকেলে ফিরত গহর শেখ। জৈগুন বসে থাকত নদীর পাড়ে, দেখত বিন্দুর মতো ক্ষুদ্র একটা কালো ফুটকি ধীরে ধীরে কিভাবে অবয়ব পেত—তারপর হয়ে যেত আস্ত একটা নৌকো আর দেখতে পেতো নৌকোয় গ্যাঁট হয়ে বসে আরামসে বিড়ি টানছে তার মরদ গহর শেখ। তাকে দেখে ভারি একটা আনন্দ ছলকে উঠত বুকের মধ্যে, মুখেও ছড়িয়ে পড়ত তা। গহর শেখও খুশি হয়ে উঠত তাকে দেখে। নৌকো ভিড়িয়ে আশেপাশে কেউ নাই দেখলেই কোলে তুলে নিত জৈগুনের পলকা শরীর। কী যে দস্যি ছিল লোকটা! যেন বায়স্কোপ চলে জৈগুনবিবির মনে!


মরণাপন্ন জৈগুনবিবি তাদের ভারি একটা বিনোদনের বিষয় হয়ে উঠে আজ। জৈগুনবিবির বুক হাপরের মতো ওঠে আর নামে, পাঙ্গাশ মাছের মতো বড় হা করে শ্বাস নেয় সে।


এত সাধের ভিটেখানা তার! মরবার তরটুকুও সইল না সর্বনাশা পদ্মার! তিন কুলে আর কে আছে জৈগুনের! মরার পর না হয় খেতিস জৈগুনবিবির ভিটে! দীর্ঘ এই জীবনটাতে জৈগুনবিবি দেখল কত শিকস্তি আর পয়স্তির খেলা! দেখল কত উত্থান আর পতন। কতবার তার ভিটে গেল পদ্মার পেটে! কতবার উদ্বাস্তু হলো জৈগুনবিবি!

খাস চরের এই ধূ ধূ জীবনে তাকে ভিক্ষে করে চালাতে হয় পেট! বয়সের ভারে কতদিন হলো নড়াচড়াও করতে পারে না ঠিকমতো। বাছের শেখের বাড়ি থেকে যদি খাবার আসে তো খায়, নইলে উপোস। চরের দুএকজনও মাঝে মাঝে খোঁজখবর করে দয়াপরবশ হয়ে।

হ্যাঁ, একবার শহরে গিয়েছিল বটে জৈগুন! গ্রামে ভিক্ষে করার ধকল আর সইছিল না শরীর। তখন সে চরের কয়েকজনের বুদ্ধিতে কুমারখালি থেকে চড়ে বসেছিল গোয়ালন্দগামী ট্রেনে। বেশ কদিন চলেছিল বেশ। কিন্তু এই চরটা বড় টানে। মানুষগুলোও। চরে তার মতোই জীবনের কাছে পরাজিত বাতিল মানুষের তো অভাব নেই খুব। টানে তারাও।

মাঝে মাঝে চর পেরিয়ে নদীর পাশটিতে বসে পদ্মার অতল জলের দিকে ঘোলা চোখে চেয়ে থাকে জৈগুনবিবি। আঁতিপাঁতি করে যেন খোঁজে ঠিক কোথায় ছিল গহর শেখের আদি ভিটে, কোথায় শেষবার তাকে শুইয়ে দেয়া হয়েছিল শুভ্রতায় মুড়ে।

কতদিন বড় মাছ খায় না জৈগুনবিবি! মনে পড়ে, নদী থেকে কী বড় বড় মাছ তুলত গহর শেখ! সেবার, সেই যে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটল দেশে, শুরু হলো যুদ্ধের ডামাডোল, তখন পদ্মা দিয়ে ভেসে যেত লাশের পর লাশ, মাছ উঠত খুব। কিন্তু সে মাছ কিছুতেই ঘরে আনত না গহর শেখ, বলত লাশ খাওয়া মাছ সব, ও মাছ খেতে নেই, অসুখ করবে।

সন্ধ্যা প্রায় নামি নামি সময়ে ঘরে ফেরে বাছের শেখ। এসেই জৈগুনবিবির খবর শুনে দৌড়য়। তার সাথে প্রায় পুরো পাড়া। সবাই বিনে পয়সায় সিনেমা দেখতে চায়। মরণাপন্ন জৈগুনবিবি তাদের ভারি একটা বিনোদনের বিষয় হয়ে ওঠে আজ। জৈগুনবিবির বুক হাপরের মতো ওঠে আর নামে, পাঙ্গাশ মাছের মতো বড় হা করে শ্বাস নেয় সে। বাছের শেখ গলা খাঁকারি দেয়। বলে, ‘ও চাচি, আমাক বলে তুই খুঁজতিচিস ইঁ? কী কবি কদিনি টপাত হরে, কেবল আটেত্তে আইচি, লাবো য্যায়া।’

জৈগুনবিবির চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়, গলা দিয়ে কথা সরে না, আটকে যায়। থেমে থেমে, দম নিয়ে নিয়ে বলে, ‘বাজান রে, কত কষ্ট সইচি, কত মানষির কত কতা অজম হরিচি, কোনোদিন লাহেত্তে লাকছাবি খুলি নাইকো। আজ তুই খুলে দে বাপ, আমি চলে যাচ্চি, লাকছাবি তিনডে বেচে আমাক মাটি দিস…’

জৈগুন বিবির মুখ দিয়ে ফেনা ভাঙে, হেঁচকি উঠে নিথর হয়ে যায় শরীর, পরম শান্তিতে মুদে আসে চোখ। তাকে ধরে থাকা মহিলাটি অস্ফুটে বলতে থাকে—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু…

কুঁড়ের একপাশে বাঁশ কাটার আয়োজন চলে, টিমটিমে হারিকেনের আলোয় বহুদিন পর আবার আলোকিত হয়ে ওঠে জৈগুনবিবির ভিটে। ভিটের এক কোণে ঝাপসা অন্ধকারে কোদাল ওঠানামার ভোঁতা শব্দ শোনা যায়। শোনা যায় গোরখোদকদের হালকা আলাপচারিতাও। জড়ো হওয়া তরুণদের মস্করা আর হাসির শব্দ অন্ধকার ভেদ করে ভেসে আসে, জমাট নিস্তব্ধতা গুঁড়িয়ে দেয়। জৈগুনবিবির মৃত্যুতে কোথাও শোক ছায়া ফেলে না। অন্ধকার আরও ঘন হয়ে আসে। আজ অমাবস্যা, আকাশে চাঁদ নেই। বাছের শেখ টানা-পা করে প্রতিবেশীর সাথে গঞ্জের দিকে যায়। পকেটে কাগজে মোড়ানো তিন তিনটে নাকছাবি, সোনার!

শিল্পী নাজনীন

শিল্পী নাজনীন

জন্ম ১৪ জুলাই, ১৯৮১; কুষ্টিয়া। কবি, কথাচিত্রী।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই :
ছিন্নডানার ফড়িঙ [উপন্যাস, কাা বুকস, ২০১৬]
আদম গন্দম ও অন্যান্য [গল্পগ্রন্থ, ছিন্নপত্র প্রকাশনী, ২০১৭]
তোতন তোতন ডাক পাড়ি [শিশুতোষ গল্প, ছিন্নপত্র প্রকাশনী, ২০১৭]

ই-মেইল : 81naznin@gmail.com
শিল্পী নাজনীন