হোম গদ্য নবারুণ মারা যাওয়ার পরও কলকাতার কোনো শ্মশানের চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটে নাই

নবারুণ মারা যাওয়ার পরও কলকাতার কোনো শ্মশানের চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটে নাই

নবারুণ মারা যাওয়ার পরও কলকাতার কোনো শ্মশানের চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটে নাই
328
0

নবারুণ মারা যাওয়ার পরও কলকাতার কোনো শ্মশানের চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটে নাই… সো ডোন্ট ওরি। এই লাইনটা ফেসবুকে স্ট্যাটাস মারলে বাংলা কবিতার ‘নটি বয় অব লস্ট ঢাক্কা’, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ কমেন্ট করেন, “মমতা আপা সতর্ক ছিলেন তো… হারবার্ট দেখছেন না?” সো ডোন্ট ওরি, নবারুণ আমাদের মধ্যে অনেক সদাসতর্কতা তৈরি কইরা দিয়া যাইতে পারছেন।

সাহিত্যিক অথবা বিদ্যোৎসাহী পাঠকের মতন আমার পাঠাভ্যাস না, আমি জাস্ট পাড় নেশাখোরের মতন পাঠক। যেই টেক্সটে, যার টেক্সটে নেশা হয়, আমি সেই টেক্সট, সেই রাইটারে আসক্ত হইয়া যাই। হৃৎপিণ্ডের এই যন্ত্রসভ্যতায় হৃদয় হারানো মানুষ যেমন যুদ্ধবান্ধব পৃথিবীতে, হৃৎপিণ্ডের ভার বহন কইরা লইয়া যায় ক্রমাগত সংসারে বা ট্রেঞ্চের ভিতর, তা মোটেও সে আশরাফুল মাখলুকাত বইলা না… বরং ভরসাহীন যন্ত্রসভ্যতার এই হৃৎপিণ্ডরে বাঁচায় রাইখা হৃদয়ের খোঁজ করবে বইলা। মাটির ওপর নিছক প্রাণীর মতন বাঁইচা থাকার মতো, এই নেশা।


বাংলা সাহিত্যের কমিউনিস্ট রাইটারদের লেখা পইড়া তো আমার রীতিমতো অপরাধ বোধ হইত।


নবারুণ কত বড় লেখক, নবারুণ কত মহান সাহিত্যিক সেইগুলা বলার জন্য তথাগত ক্রিটিকরা মুখ খুলবেন একঘেয়ে মিডিয়ার বোরিং রুচি ও প্রটোকলের মধ্যেই। সেগুলা আমরা পইড়া নিব নে লোকাল মার্কেট থেইকা কেনা চাইনিজ এন্ড্রয়েড ফোন সেটে, কমরেড মাও সে তুং-এর প্রতি চোরাটান না রেখেই। কিন্তু, নবারুণ কত নবারুণ, তা পাঠিকা, আমিও পারব না বলতে, কারণ, এটা বলা সম্ভব নয়, কত নেশা হয় খেলে ধুন।

আমি যখন স্ট্যাটাসটা দিছি, তখনও জানি না যে, নবারুণরে পোড়ানো হইয়া গেছে কিনা বা নিউজ ফিডও ফলো করি নাই তাই জানি না, ভারতবর্ষের বা কলকাতার বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপকার করতে সে কি মরণোত্তর দান কইরা গেল কিনা, নিজেরই কংকাল। তবে, বুইঝা গেছি যে, ইতিহাস চেতনার নামে এনার্কিস্ট জীবনানন্দ যেইটা বলছেন, সেইটা লেখকের রাজনৈতিক হইয়া ওঠা। নবারুণরে পোড়ানো বা তার মহান কংকাল দানের চিন্তার সাথে জীবনানন্দের ইতিহাস চেতনা আর রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নাই, নাকি? এই ঢাকায় বইসা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, সিপিবিরে লিটারারি অগ্রহণযোগ্য রাইখা, এমনকি দুনিয়া ধইরা কমিউনিস্ট-ডেমোক্রেট-রিপাবলিকান-মডারেট ও মিডলইস্ট অ্যাক্রোবেট দেইখাও তো রাজনীতি লাগে বড় দিশেহারা।

নবারুণ মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে “গান্ডু” খ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা কিউ নবারুণ ভট্টাচার্য সম্পর্কে বলছেন, “He was probably the last communist Bengali writer.” দুর, আমি ভাবছি অথবা ভাবি নাই যে, নবারুণ পোস্টমডার্ন বা এইরকমের কিছু, কিছুটা হাংরিও হইতে পারেন। কিন্তু কিউয়ের কথাটা এড়াইতে পারি নাই… কংগ্রেস-বিজেপির দ্বৈরথের ভিতর সিপিএম শাসিত কলকাতায় নকশাল ট্রমা লইয়া নবারুণ কেমনে লাস্ট কমিউনিস্ট বেঙ্গলি রাইটার… যেন সে বিলুপ্ত দৃশ্যে কারেন্টের তারে বসে, ঝুলে যাওয়া প্রতারিত বাদুড়!!!

বাংলা সাহিত্যের কমিউনিস্ট রাইটারদের লেখা পইড়া তো আমার রীতিমতো অপরাধ বোধ হইত, মনে হইত কী এক মহার্ঘ্য জীবনবোধ আমার জীবনে অনুভূত হয় নাই। আমার মডারেট কিছু ধার্মিক বন্ধু ধর্মগ্রন্থ পইড়া যেইরকম অপরাধবোধে ভুগত, অনেকটা সেইরকম। নবারুণ পইড়া তো হাফ গান্ডু জীবনে ক্ষণিকের মিনিং পাইছি… সাহিত্য আর ভাষার ভিতর উদ্ধারের পয়গাম পাইছি। বাতিকগ্রস্ত মন নিজেরেই সন্দেহ করতেছে—টিকা থাকার দায় মিটায়া, আমিও কমিউনিস্ট না তো!!! ওহ, গড, লেট মি বি কমিউনিস্ট। হা হা হা, ডিয়ার কিউ, আমি আগে ভাবতাম যে, কুন্ডেরা হইলেন পৃথিবীর সর্বশেষ এবং অবশিষ্ট কমিউনিস্ট রাইটার…।

যাউগ্গা, নবারুণ ভট্টাচার্য কমিউনিস্ট হোক বা ভারতীয় কি সিপিএম-মমতা হোক… কিংবা হিন্দু হোক তাতে অনেক কিছুই যায় আসে অথবা আসে না। কারণ তার আর উপায় কি, যখন, এটা সম্ভবই না, যে, কেউ দাবি করবেন, নবারুণ বিজেপি করতেন বা কংগ্রেস মারাতেন বা কালিপুজোয় হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতেন মায়ের পায়ের কাছে… “খেলনানগর” নামে পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়া।

এইখানে ঠাস কইরা খেলনানগরের নাম বইলা আমি আসলে মিতুল, মিতুল দত্তরে স্মরণ করতেছি। খেলনানগর নিয়া কথা বলছিলাম ওর সাথে মেলা। ও ভারত থেইকা ঢাকায় আসছিল, মে বি এখনও যাওয়া আসা করে তবে আর দেখা হয় না। তো, মিতুল সেবার ঢাকায় আসার পর আমার সাথে দেখা হয়—গল্প-টল্প হয়… আর আমি তখন কেবল মাত্র নবারুণের হারবার্ট, খেলনানগর, ছোটগল্পের একটা সংকলন পইড়া বিলাটিক ফিল নিয়া ঘুরতেছি। আর, মিতুলের সাথে দেখা করার এইটাও একটা কারণ ছিল যে, ও যদি কলকাতা থেইকা নবারুণের কিছু টাটকা বই পাঠায়। তো, মিতুল করছে কি আমারে নিয়া গেছে কনকর্ড টাওয়ারে নতুন গইড়া ওঠা বইয়ের মার্কেটে। ওই মার্কেটে সে দেখি ব্যাপক পরিচিত, আর আমি প্রথমবার ঢুকতেছি…। মিতুলরে এইটা কইলে সে জানায়, যে এইটা তারে অবাক করে নাই। কিন্তু মিতুল যখন একটা দোকান থেইটা ৭/৮ টা নবারুণের বই কিনা গিফট করল, আমি অবাক হইছিলাম। থ্যাংকস, মিতুল। আর, সেদিনই জানলাম যে, নবারুণ কবিও বটে, বইটইও আছে কবিতার। আর, এইটা শুইন্যা “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না” ক্লিশে কবিতার কথা জানাইল মিতুল। আমি মনে হয় বলছিলাম, হ শুনছি মাইকে, লাউড স্পিকারে গলা কাঁপায়া পড়তে, কিন্তু সার্বিক বিষয়টার ভিতর কবিতা ছিল না, তাই এইটা না শোনার মতন চইলা গেছি… বলতে বলতেই দেখি মিতুল হাসতেছে… তো, এরপর নানাভাবে নবারুণ হাতে আসছে…


কলিকাতার কবি-লেখক মরলে আপনারা দেখি কাইন্দা বুক ভাসান ওদের তো কোনোদিন ভাসাইতে দেখলাম না।


আরো একটা ঘটনার কথা মনে পড়তেছে, দৃকের ছবি মেলা উদ্বোধন করতে আসছেন মহাশ্বেতা দেবী। আর উনি নবারুণের মা বইলাই, ছবি মেলার উদ্বোধনী প্রেস রিলিজ থেইকা শুরু কইরা অনুসরণ কইরা বেড়াইছি মহাশ্বেতা দেবীরে।

আমার এই নবারুণরে কখনোই ভারতীয় লাগে নাই। মনে হইছে বাংলা সাহিত্যের এক সেরা লেখকরে পড়তেছি। কিন্তু, সংগত ও যৌক্তিক কারণেই পৃথিবীর অপরাপর ভাষার সেরা সাহিত্যিকদের পড়তে তাদের পাসপোর্টের পরিচয় যেমন বিবেচনায় আসে না, ঠিক সেই সময়ই ভারতীয় বাংলা ভাষার লেখকের পাসপোর্ট বিবেচনায় চইলাই আসে। যেমন, মৃত্যুপরবর্তী নবারুণকে নিয়ে মন্তব্য ও শোক-শ্রদ্ধা দেইখা এক বন্ধু বেশ খোঁচাই দিতে চাইলেন। তিনি কইলেন—“কলিকাতার কবি-লেখক মরলে আপনারা দেখি কাইন্দা বুক ভাসান ওদের তো কোনোদিন ভাসাইতে দেখলাম না।”

বটে, রাইগা গিয়া তারে কইলাম—“আমি এত বড় বাংলাদেশি লেখক না যে, আমার টাইমের মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট বাঙালি রাইটার মইরা গেলেও জাতীয়তাবাদের খোমা দেখাইতে হইবো!” আর ইনায়া বিনায়া নবারুণরে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ থেইকা রক্ষা করতে বেচারা দেবেশ রায়ের গীবত করলাম… যেমন ইমোশনাল লোকে করে, কাউরে ঊর্ধ্বে তুইলা ধরতে কাউরে নিচে নামায়া… আর কি।

বন্ধুটা পুরানা, তাই সেও টের পায় মে বি, সে আবার বলে—“আপনেরেও মিন করি নাই আসলে, কইতেছিলাম আমাদের লইয়া।” বন্ধুটা সাহিত্যিকও বটে, তাই মোক্ষম আক্রমণ কইরা আরো বলেন—“এই সমস্ত প্যান-প্যানে মুগ্ধতা সাহিত্যের কোনো উপকার করে না। বড় লেখকের দিকে করুণা নিয়া তাকায়া থাকা ঠিক না।”

চিন্তা করেন, পিত্তি জ্বালানো কথা আর কারে কয়, পাঠিকা!!!

আমি তারে বলি—“আমার তো সাহিত্যের উপকার করার সাহিত্যিকবাসনা নাই কোনো। আর তেমন বড় লেখক পাইলে করুণা নিয়া তাকায়াই কেবল না… দিওয়ানা মাস্তানা… আমি তোমার দিওয়ানা… জেমসের এই গানটাও করতে রাজি।”

আমি, সেই বন্ধুটা আর আমাদের বন্ধুত্বটা বেশ চালাক আর সমঝদার… এরপর কথা ঘুরায়া আমরা অন্য বিষয়ে আলাপ কইরা সম্পর্ক জারি রাইখা বিদায় নেই।

তো, ঠিক আছে, পাঠিকা! ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ফেলানী যেহেতু উড়েই দুই দেশের জাতীয় পতাকার মান বাঁচাইতে, আমাদের তো সমস্যা হবেই। আর এর ভেতরই, গোটা দুনিয়াব্যাপী সব সীমান্তরেখার মধ্যবর্তী নো-ম্যানস ল্যান্ডে আপনার আমার সাহিত্যের চোরাচালান ঘটতেই থাকবে।