হোম গদ্য নতুন কাব্যভাষার আকাঙ্ক্ষায় সুব্রত’র কবিতা

নতুন কাব্যভাষার আকাঙ্ক্ষায় সুব্রত’র কবিতা

নতুন কাব্যভাষার আকাঙ্ক্ষায় সুব্রত’র কবিতা
1.38K
0

সাক্ষাৎকার থেকে একপ্রস্থ গ্রহণ ও কিছু কথা

‘অলস দুপুর’ ওয়েবম্যাগের সম্পাদক দুপুর মিত্রের সাথে কথা বলতে গিয়ে কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এক পর্যায়ে বললেন—

কবিতায় আমি খুব বিশেষ কিছু একটা করতে চেয়েছি, এভাবে কখনও ভাবি নি। আমার বিশেষ কোনো ভাবনা থেকে যদি থাকে/থাকত তো সেটা বরং ভাষা নিয়ে। হ্যাঁ, আমি একটা নোতুন কাব্যভাষা আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম, আর সে-আকাঙ্ক্ষা ম’রে যায় নি আজও। বাংলা ভাষার সকল রূপ আর সম্ভাবনার অবাধ অংশগ্রহণ দেখতে চেয়েছিলাম আমার কবিতায়—আমাদের কবিতায়—গদ্যেও। আর সেই দিল্লি এখনও দূর-অস্ত হ’লেও, একেবারে বুদ্ধুর বেহেস্ত নয় আজ আর, দিগন্তরেখায় তার আবছা এক ছায়া ফুটে এরই মধ্যে উঠেছে ব’লেই-না ভাষা নিয়ে হঠাৎ এত হট্টগোল, এত গেল-গেল, এল-এল, চারিদিকে।

আর কবিতায়—আমার ভিতর কয়েকটি টানাপড়েন কাজ ক’রেই চলে। এক দিকে পশ্চিমের কবিতার নিটোল ডৌল কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারি না, আজও; অন্য দিকে এও প্রবলভাবেই অনুভব করি, আজ, যে, ও জিনিস ঠিক আমার নয়, এবং আমার ভাষার ও কবিতার আসল শক্তির জায়গা অন্য কোথা অন্য কোন্‌খানে। তাই তো বারে বারে আমার কবিতা খুলে-খুলে পড়তে চায়, আর এ-দুইয়ের কোনো রীতিতেই কাব্য হ’য়ে উঠতে ব্যর্থ হ’লেও, বাংলা ভাষার নানা প্রায়-অদৃশ্য কোনাকাঞ্চিতে হ্যাজাকালোক ফেলবার চেষ্টা তার থামে নি, থামবে না।

নিজের কবিতা নিয়ে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের এই উপলব্ধিকে আমি এক ধরনের কনফেশন হিশাবেই দেখতে চাই। ভবিষ্যতে কেউ কেউ হয়তো ক্রমেই শক্তিমান হয়ে উঠতে থাকা এই কবির কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, গল্প বা উপন্যাস একাডেমিক প্রয়োজন, কৌতূহলী পাঠ বা লেখালেখি চর্চার কারণেই আরো অনুপুঙ্খ বিবেচনায় নিতে চাইবেন এবং পাঠ-পর্যালোচনা তৈরিতে আগ্রহী হবেন। এ ধরনের টুকরো সাক্ষাৎকার বা স্বীকারোক্তিকে জোড়া লাগিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের কিছু সম্পর্ক-সূত্র তখন তারা হয়তো পেতে পারবেন।

তবে উপরের উদ্ধৃতিতে তিনি কবিতার ক্ষেত্রে যে একটা ‘নোতুন কাব্যভাষা আকাঙ্ক্ষা’ করেছেন সে বিষয়ে তার অর্জনের স্পষ্টতর রূপ জানতে বোধ করি আরও সময় লাগবে। এখন শুধু এটুকুই বলা যায়—তার ভাবনা-জগৎ, বিষয় বাছাই, ছন্দ-পারঙ্গমতা ও নতুনত্ব সন্ধান অভিনব ও আকর্ষণীয়। কারণ হিশাবে বলা যায়, তার সৃষ্টিগুলোতে দেশজ কাব্য-ইতিহাস থেকে আহরিত মনন ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য থেকে সমৃদ্ধ পাঠ গ্রহণের অভিজ্ঞতা সরাসরি যুক্ত হওয়ায় একটি ভিন্নতর আবহ সেখানে বিরাজ করে। কিন্তু যাকে বলা হয় কবির নিজস্ব কাব্যভাষা, সেটা কই? যার মধ্যে আলাদা একটা সৌন্দর্য থাকবে, যা পড়লেই মনে হবে এটা সুব্রতীয় কবিতা। বোধের ভিতর ফিট হয়ে থাকা রাডার সেই নির্দেশনা অটোমেটিক্যালি জানিয়ে দেবে। যার কিছু কিছু লক্ষণ মাঝে মাঝে কবিতায় উঁকি দিয়েই মিলিয়ে যায়। তাকে যে স্থায়ী রূপ দেওয়া দরকার, এটা কবি নিজেও বোঝেন। এজন্যই কবিতা নির্মাণের প্রচলিত প্রথা, ফর্ম, ভাব, ভাষা, ছন্দ ও শব্দের ব্যবহার নিয়ে অবিরাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ভাঙচুরের মধ্য দিয়েই তিনি তার কবিতার ভার বইবার মতন উপযুক্ত একটা কাব্যভাষা উদ্ভাবন করার চেষ্টা করছেন।


প্রাচীন সাহিত্য, পুরাণ, উপাখ্যান, লোকজ কাহিনি, রূপকথার আমেজ ও বিদেশি সাহিত্যের বিভিন্ন উপাদানের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়


এই প্রয়াসের সাথে প্রাচীন সাহিত্য, পুরাণ, উপাখ্যান, লোকজ কাহিনি, রূপকথার আমেজ ও বিদেশি সাহিত্যের বিভিন্ন উপাদানের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়, যা কবি নিজের মতন করে করেছেন। ফলে রস-রুচি-সময় ও মনস্তত্ত্বে অবগাহনের মাধ্যমে সুব্রতর মেধা-বিচ্ছুরিত কবিতায় জীবনের এক রূপময় দ্বন্দ্ব-সংকুল অভিযাত্রিক ভ্রমণ ত্বরান্বিত হয়। কবির কাছ থেকে তার কবিতার ভার বইবার জন্য নিজস্ব ধরনের ভাষাভঙ্গি তথা ‘নোতুন কাব্যভাষা’-র উদ্ভাবন অবশ্যই প্রত্যাশিত, এই প্রাপ্তি আমাদের কবিতার ভুবনকেই সমৃদ্ধ করবে। দেখিই না, আমাদের এই অপেক্ষার নামান্তরে কী হয়! সুব্রত-রচিত যেসব কবিতা বা কবিতাংশে স্বতন্ত্র কাব্যভাষার উঁকিঝুঁকি পাওয়া যায় তার থেকে কয়েকটি বিবেচনায় নিতে চাই,  যেমন—

আইস আলোকবর্ষ অতিক্রম করি
ব্রক্ষ্মার অঙ্কপালঙ্কে
আইস আমরা দোঁহে শ্যামসুন্দরের
পিতৃমাতৃপরিচয় লিপিবদ্ধ করি।

তনুমধ্যা-র তামাদি পর্বের প্রথম সর্গ থেকে নেয়া হয়েছে। সন্তান জন্মদানের জন্য রোমান্টিক আহ্বান, যার মাধ্যমে তারা পিতা এবং মাতা পরিচয় অর্জন করতে পারবেন। সেই আহ্বানের এই রূপ নির্মাণ—কবির কাব্যভাষার সুন্দরতম লক্ষণ।

তুমিও কি ভুলে গ্যাছো লালাবাই?
আমার এই উশখুশে ইনসমনিয়ায়
তুমিও কি ঢেলে দেবে পপিফুল?
রবারের মতো রাত শুধু বেড়ে যায়।

তনুমধ্যা-র তামাদি পর্বের অষ্টম সর্গ থেকে নেয়া হয়েছে। অনিদ্রা রোগ সারে না, রাতও বাড়ে, এর থেকে মুক্তির পদ্ধতি সন্ধান করা হলো রোমান্টিকতার আদলে। সন্ধান তো মেলে না, শুধু রাত বাড়ে।

আর যদি পারো ভেজাও এ-জানলাটা
আমার সাথির হাত দুটো সেই যুদ্ধে গিয়েছে কাটা
আর চাই আপাতত
ঘুমের উমের মতো
এক কাপ ঘুম
উমম

তনুমধ্যা-র প্রবজ্যা পর্বের ‘জানলা’ অংশ থেকে নেয়া। কল্পনায় যোগীর জিজ্ঞাসায় চাহিদা পেশ করতে বলা হলে উপরের দৃশ্যটি তৈরি করা হয়। সে ঘুমুবে কিন্তু জানলাটা বন্ধ করা দরকার। যেহেতু তার সাথীর হাত কাটা গেছে যুদ্ধে, তাই সে জানলাটা বন্ধ করতে পারছে না। প্রভু যদি করে দেন। কারণ, তার চাই ‘ঘুমের উমের মতো এক কাপ ঘুম’, একদম শেষে ‘উমম’ একটা আশ্চর্য দ্যোতনা ছড়িয়ে দেয়।

স্বেচ্ছায় তোমার কাছে
হারলাম
একযুগ পরে,
পাইনার খালে
বেদিয়ার মেয়ে
আবরু আলগা করে।

দিগম্বর চম্পূ-র কবিতা, নাম ‘উৎপ্রেক্ষা’। দু’টি ভিন্ন ধরনের বক্তব্য নিয়ে একটি গন্তব্য তৈরি করা হয়েছে—তার নাম স্যাক্রিফাইস। তুলনাবাচক শব্দ ‘যেন’ এদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছে।  বারো বছর পর একজন ‘তোমার’ কাছে হার মানার স্বীকারোক্তিকে তুলনা করা হয়েছে বেদের মেয়ের আবরু শিথিল করার সাথে। বড় নরম করে বলা হয়, ফলে ভাবনার নিমজ্জন চলতে থাকে অনায়াসে। নিজের কাব্যভাষার লক্ষণ হিসাবে এই ধরনটিকেও কবি অনুশীলন করেছেন।

মেঘে ঢিল-পড়া ঢেউ
আহাহাহা মেঘে-মেঘে ঢিল-পড়া ঢেউ
আকাশের বিল-ভরা ঢেউ
হাজার চাঁদের তরি ছুটছে তোড়ে
আজ আমারে ঘিরিয়া

গর্দিশে চশমে সিয়া নামের বই থেকে ‘প্রয়াণ’ নামের উপরোক্ত কবিতাংশটি নেয়া হয়েছে। পুকুরে ঢিল ছুড়লে তরঙ্গ খেলা করে বলে জানতাম। সেই বাস্তবতাটি কল্পনাশক্তির আধারে ‘মেঘে ঢিল-পড়া ঢেউ’ হয়ে যায়। সাথে পরের চরণের ইমেজারি রূপে যুক্ত হয় ‘আকাশের বিল-ভরা ঢেউ’। তারপর একটা ঘূর্ণায়মান আবর্তনে গতি বা মোশনের খেলা। কবিতাংশটি পড়ার সময় থেকে মনের চোখে মুগ্ধতার দৃশ্যমানতা আটকে যায়, বড় ভালো লাগে।

কাজি আলাউদ্দিন রোডের
রোদ ঠেলে রোজই যে-বাড়ির
দিকে আমি অন্ততঃ একবার
তাকাবই, কে জানত সেখানে
পুঁটিমাছ-ছোট্ট দু’টি পায়ে
হাঁটি-হাঁটি-পা-পা বেড়ে উঠছে
শিশু-চাঁদ, কলায়-কলায়।

হাওয়া হরিণের চাঁদমারি বইয়ের ২০ নং কবিতা। জীবনের প্রতি স্মৃতিপ্রিয়তা মানুষের অনেক বড় সম্পদ। কবির ব্যক্তিগত স্মৃতির ভিতর থেকে চিত্রনাট্যসম ধারাবাহিক ভালো লাগা বা একটা সময়ের আবেগের খুঁটিনাটি দৃশ্য তৈরি হয়েছে পুরান ঢাকার কাজি আলাউদ্দিন রোডের সেই বাড়িটিকে নিয়ে। গল্প-কবিতার ঘ্রাণে জীবন মায়াময় লাগে।

দিগন্ত নাই। আকাশে মিশে গেছে সাগর
জোড়হীন ভিনিয়েটে। দশ দিক নীল নীল নীল!
আমরা বড্ড একা—অসহায়—
এক নীল কজমসের কেন্দ্রে
জারক লেবুর মতো জারিত
নীলে।
নীল নীল নীল
নীল নীল নীল
নীল নীল নীল
আহ্ মরণ!

মর্নিং গ্লোরি কাব্যগ্রন্থেরই কবিতার নাম ‘বিমান’। অসীম বিস্তারের মাঝে একাকী মানুষের অনুভব। আসলে তো মানুষ সব কিছুর মধ্যে থেকেও একা।

এখন প্রশ্ন, উপরের এই ৭টি উদাহরণ বিভিন্ন ফর্মে সুব্রত’র নিজস্ব কাব্যভাষার লক্ষণ প্রকাশ করছে কি? যেখানে বলেছিলাম, নিজস্ব কাব্যভাষার পূর্ণরূপ তৈরির জন্য সুব্রত’র চেষ্টা অব্যাহত সেই অনেক কাল আগে থেকেই। কবিতা লিখনে, বিষয়বৈচিত্র্যের ব্যাপকতায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেও সুব্রত দিশাহারা বা বিচ্যুত হন নি, তিনি আপন লক্ষ্যের দিকে সঠিকভাবেই রয়েছেন।


অনেক সময় অভিধান, এনসাইক্লোপিডিয়ার সহায়তার দরকার পড়ে।


সুব্রত’র লেখালেখি নিয়ে কবি মাসুদ খানের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া

আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও তরুণদের পছন্দের কবি মাসুদ খান। আমার এই লেখাটি তৈরির প্রস্তুতি পর্বে আগে-পরের কোনো কিছু না ভেবেই আমি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের কবিতা সম্পর্কে তার কাছে তৎক্ষণাৎ মতামত জানতে চেয়েছিলাম। আমি গভীরভাবে অভিভূত হলাম, একই দশকে আবির্ভূত এক কবি আরেক কবির সৃষ্টিশীলতার প্রতি যেভাবে আন্তরিকতার সাথে শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব পোষণ করছেন তা দেখে। মাসুদ খান আমাকে তৎক্ষণাৎ সংক্ষেপে, সুন্দর পরামর্শ দিলেন। তার কথাগুলো এরকম—

আসলে সুব্রত’র কিছু বই পড়ে-টড়ে লিখলে ভালো হয়। কারণ, শিল্পসাহিত্য সাবজেক্টিভ ব্যাপার, একেক জনের কাছে একেক রকম অনুভব, উপলব্ধি। আর লিখলে সিরিয়াসলি লেখা উচিত।

সুব্রত’র লেখালিখি খুব বৈচিত্র্যময়। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ (ইংরেজি-বাংলা এবং বাংলা-ইংরেজি), ইংরেজি ভাষায় লেখা কবিতা, এমনকি গানের লিরিকও লিখেছে সে। সাক্ষাৎকারও আছে বেশ কিছু। সেগুলিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একটা বড় সাক্ষাতকার আছে ‘অলস দুপুর’ অনলাইনে, সেটা বেশ বড় ও আলোচিত সাক্ষাতকার।

বলার ভঙ্গি সম্পূর্ণ নিজের। তার লেখালিখি যেন আবহমান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের, বিশ্বসাহিত্যের নির্যাস। বাংলা, ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর বিচিত্র বিষয় আর প্রসঙ্গের সমাবেশ। এত বিষয় ও প্রসঙ্গ, ফলে অনেক অচেনা শব্দ। অনেক সময় অভিধান, এনসাইক্লোপিডিয়ার সহায়তার দরকার পড়ে। বাংলাদেশের বিশেষ করে ঢাকা অঞ্চলের ভাব ও ভাষাভঙ্গি, যা সাবলীলতা দিয়েছে তার লেখাকে।

অন্তউড়ি (আধুনিক বাংলা রূপান্তরে চর্যাপদ), তনুমধ্যা (কবিতা), পুলিপোলাও (কবিতা), কালকেতু ও ফুল্লরা (উপন্যাস), মাতৃমূর্তি ক্যাথেড্রাল (গল্প)—এসব খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। লিখেছেন প্রচুর। এখনো লিখে যাচ্ছেন সমানে।

তাৎক্ষণিকভাবে এটুকু মনে এল। তাকে নিবিড়ভাবে পাঠ ছাড়া বিকল্প নাই আসলে।

আমি মাসুদ খানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলি, ‘আপনার এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আমার অনেক কাজে দিবে। আমি আমার পাঠ-অভিজ্ঞতায় মিলিয়ে নিলাম, দেখলাম লাইন মতোই আছি।’ এই কথোপকথন আমাদের ইনবক্সে আছে।


ভূমিকা ধরনের কথা

আমাদের কবিতা লেখা শুরুর কালে আমরা সবাই দেখেছি, ছন্দ শেখা ও শিখানোর জন্য বানানো কবিতার নমুনা। যেমন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘কবিতার ক্লাস’ বইতেও আছে বেশ কিছু। সেগুলো নবিসদের জন্য কাজ দেয়। কিন্তু কাল জয় করা শিল্পের মুগ্ধতা তাতে পাওয়া যাবে না। তবে বিভিন্ন সময়ে লেখা কবিতার ফর্ম জানা ও আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে নিজের কবিতায় সার্থকভাবে তার নবায়ন ঘটানো প্রতিভাবান কবিদের হাতেই যায়। অবশ্য কারো কারো অনুকৃতিতে ‘আমিও এরকম লিখতে পারি’ ধরনের জানান দেওয়ার জন্য তৈরি করা কবিতা-কাঠামো পাওয়া যায়, তাতে আর যাই-ই হোক কবিতার প্রাণ প্রতিষ্ঠিত থাকে না। কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এই সংকট থেকে মুক্ত। তিনি নিশ্চিতভাবেই আমাদের সময়ের অন্যতম প্রতিভাবান কবি। সেই সাথে নিবিড় পঠন-পাঠন, গভীর শ্রম ও অবিরাম চেষ্টায় নিজের লেখালেখিকে একটা আলাদা রকম উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছেন। কবিতার নির্মাণ-ভাবনায় দেশীয় ঐতিহ্য সন্ধান তার প্রধান পুঁজি। প্রকরণ হিশাবে ভাবনার নতুনত্ব ও বহুমাত্রিকতা, বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ঘনঘন উল্লম্ফন, কোলাজ নির্মাণ, ছন্দ, শব্দ, প্রতীক-উপমা-উৎপ্রেক্ষা, ন্যারেশন ও চরণ তৈরিতে সবকিছু নিয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ নিরীক্ষা-কৌশল তিনি সমন্বয় করেছেন। কৌশলটাকে ঝুঁকিপূর্ণ এজন্য বলছি যে, সুবিমল মিশ্রও তার গল্পের ক্ষেত্রে ভাষা ও আঙ্গিক-কৌশলের অতিমাত্রায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে সীমিত হয়েই থাকলেন। এটাই যে কোনো লেখকের জন্য বিপদের জায়গা। লেখক নিজের জন্যই লিখুন বা যে উদ্দেশ্যেই লিখুন, কিছু লিখলে পাঠকের সাথে তার একটা সম্পৃক্ততা তৈরি হবেই। এটা হতে পারে প্রকাশিত লেখার পাঠ-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কিংবা যে কোনো আয়োজনের শ্রোতা হিশাবে। এসময় পাঠক যদি লেখাগুলোকে দুর্বোধ্য মনে করেন বা ভয় পান বা দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণে অস্বস্তি বোধ করেন তাহলে তিনি হাত সরিয়ে নিবেনই। তাকে দোষারোপ করা যাবে না। এ অবস্থায় কেউ যদি বলেন, আমি সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য লিখি না—আর যে পাঠক নতুন কিছুকে ভয় পায়, লেখক যেমন পরিশ্রম করে লিখেন তেমন করে বুঝার জন্য সময় দেন না বা অলসতা করেন, আমার লেখা তাদের জন্য নয়—এটা তিনি বলতেই পারেন। তাতে কিন্তু লেখকের দায়মুক্তি ঘটবে না। প্রশ্ন উঠবে, তাহলে তিনি কেন পাঠককে ধীরে ধীরে এ ধরনের লেখা পাঠের উপযুক্ত করে তৈরি করলেন না এবং সাথে নিয়ে এগোলেন না। কথা উঠলে দু’দিক থেকেই কথা হবে, যা পাল্টাপাল্টি বিতর্ক ছাড়া আর কিছুই নয়—এইসব বিতর্কের কোনো মীমাংসা নাই।

আঙ্গিক প্রকৌশলের দিক থেকে সুব্রত’র লেখার ধরনটি ভিন্ন, কিন্তু এখনো অস্থির প্রকৃতির। আরও বিনির্মাণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভাষারীতি ও আঙ্গিক-কৌশলের অবয়বটাকে সুব্রতীয় হিশাবে পোক্ত রূপ দেয়া সম্ভব। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, কবিতায় আপন সৃষ্টির নবায়নকে সমৃদ্ধ করার জন্য সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ কখনো কখনো প্রচলিত ও অপ্রচলিত ধরনের শব্দের সাহসী ব্যবহার, গীতল প্রবহমাণতার গতি, কখনো এলিয়টীয় বিস্তার, পুরনো সাহিত্যের শব্দভাণ্ডার, বিভিন্ন সৃষ্টি থেকে অসংখ্য উদ্ধৃতির অনায়াস আত্তীকরণ করেছেন। প্রবল আত্মবিশ্বাস থেকেই সুব্রত নিজের মতো করে কবিতা নিয়ে খেলছেন। তার কবিতায় চলে আসে দেশি ধ্রুপদি বা বিদেশি অনুবাদ ধরনের পুরনো কাব্যঘ্রাণ, যা অনাকর্ষণীয় নয়। আবার কী যেন একটা আছে; যেটা কাছে টানে কিন্তু পাওয়াও যায় না। অর্থাৎ বলা যায়, সুব্রত’র লেখার ভিতরে কিছু একটা নিজস্ব ধরনের ভঙ্গি অনুভব করা গেলেও তার রূপটাকে সেভাবে স্পষ্ট করে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আমাদের ভাবনার আন্দোলনে এক ধরনের সংশয়ের বৃত্ত তৈরি হয়। স্বতন্ত্র কাব্যভাষার পূর্ণায়বয়ব রূপই কেবল উপরোক্ত সংশয় দূর করতে সমর্থ। এ প্রসঙ্গে মিলিয়ে দেখবার জন্য সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মার্জিনে মন্তব্য-এর ভূমিকাংশ থেকে একটু স্মরণ করতে চাই। তিনি বলছেন—

আঙ্গিক, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্তব্য নয়; এটি অর্জনের ব্যাপার। এই অর্জনও কেবল আঙ্গিকচর্চার পথে সম্ভব নয়; ওটি আসে জীবনের প্রতি, জীবন থেকে পাওয়া বিষয়ের প্রতি লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। দৃষ্টিভঙ্গির এই নিজস্বতাই লেখকের সার্বভৌমত্বের প্রমাণ, আর, এই দৃষ্টিভঙ্গির নিজস্বতাই এক লেখক থেকে আরেক লেখককে আলাদা করে। দৃষ্টিভঙ্গি, শেখবার বা শেখাবার নয়। ওটি আসে অভিজ্ঞতার আলোকে। সেই আলো ধরেই এক সময় গড়ে ওঠে একজন কবির একজন লেখকের বিশেষ প্রবণতা—ভাষা ব্যবহারে, বাক্যগঠনে, ছন্দ নিরূপণে, বলবার ভঙ্গিতে ও সঙ্গীতে। আঙ্গিকের ভেতরে যে মিস্তিরির দিক আছে, তার শিক্ষা আমরা সাহিত্যপাঠ ও বিশ্লেষণ থেকে পারি। তাই লেখা যদি শেখার ব্যাপারই হয়, তবে তার একমাত্র উপায় হচ্ছে পড়া, পড়া এবং পড়া। অপরের লেখা পড়া, এবং নিজের লেখার দিকে ফিরে ফিরে তাকানো।

কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, এই কাজটি তার লেখক-জীবনের শুরু থেকেই অবিরত করে আসছেন। সেদিক থেকে গড়ন-পিটনের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করার ঝোঁক তার সঠিক পথেই প্রবাহিত রয়েছে। কিন্তু প্রতিভা ও পরিশ্রমের তুলনায় নিজস্ব ভঙ্গি এলেও পাশাপাশি তার উপযুক্ত ‘নোতুন কাব্যভাষা’ বা স্বতন্ত্র কাব্যভাষা আজ অবধি মর্মকে আকৃষ্ট করার মতন যথেষ্ট স্পষ্ট হয় নি। যা দিয়ে মনের মধ্যে কবিতার ছাপ তৈরি হতে পারে। কিছু লক্ষণ পাওয়া যায়, কিন্তু এখন অবধি পূর্ণতা দেখি না! সেই কবিতা ভালো লাগে যা মন ছুঁয়ে যায়, এখানেই কাব্যভাষার ক্যারিশমা। আমরা দেখেছি কবিতার ভাষায় হৃদয়ই ডাক দিয়ে ওঠে। সত্য তো এটাই যে, হৃদয়ের ডাকেই মানুষের জীবনের সাথে তার অভিজ্ঞতার মিলন ঘটায় কবিতা। এই উপলক্ষে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, জয়-পরাজয়, প্রেম, স্মরণ-বিস্মরণ, গৌরব, সংগ্রাম, আনন্দ-বেদনা- কত কিছুর জন্যই তো কবিতা পড়া হয় ।

মাথার ওপর অবোধ্যতা বা দুর্বোধ্যতার চাপ যদি না থাকে কবিতা পড়ে ঢের আনন্দ পায় মানুষ। ভাবনার বিচিত্র আনাগোনায় সুব্রত অগাস্টিন গোমেজও কবি হিসাবে সৃষ্টির আনন্দে রত। মানুষের ও কবির উভয় প্রকার আনন্দের সম্মিলনে কবিতা জন্মায়। সুব্রত একের পর এক কবিতা লিখে যচ্ছেন। সময়ের সাথে তাল মিলিয়েই কবিতার নবায়ন হয়—নবায়ন হয় ভাষা, টেকনিক, দৃষ্টিভঙ্গি, অনুশীলন প্রভৃতির। কবি তার চর্চার মধ্য দিয়ে এই কাজটি করেন। কবিতার নবায়ন না ঘটলে পাঠক কবিতাকে নিবে না। কারণ তার জীবনমানের সাথে কবিতার নবায়নের বা কবিতার স্বাদ পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। কবিকে সব সময়ই এই পরিবর্তনের সাথে থাকতে হয়, তা না হলে পাঠক তার সাথে থাকবে না।

কারণ; আগের, এখন এবং পরেরকার—এই তিন কালের সীমারেখাতেই আর সব কিছুর মতোই কবিতা, শিল্প, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির ধারায়ও পরিবর্তন ঘটে। অগ্রজ, সমসাময়িক এবং অনুজদের সকলের কাজের মধ্যেই একটা ধারাবাহিকতা প্রচ্ছন্ন থাকে। যে কারণে সকল কালেই স্বদেশ এবং বিশ্বের অন্যদের সাথে সম্পর্কের নানা রকম টানাপড়েনের প্রভাব কবির মনোজগতে পড়ে। কবিতায়ও পরিবর্তন আসে। এ কারণে প্রতিদিনই আগের দিনের কবিতার সাথে পরের দিনের কবিতার একটু একটু করে ব্যবধান তৈরি হয়। এটাই কবিতার অটো-নবায়ন প্রক্রিয়া।


তবে সুব্রত’র কবিতাগুলো আসলেই ভিন্ন ধরনের।


এজন্যই ধারণা হয়; কবি নিশ্চিতভাবেই জানেন, তিরিশের দশক থেকে অদ্যাবধি কিছু পাঠক ‘আমি এই সব কবিতা বুঝি না’ বলার পরও কিন্তু আগের অভ্যস্ততার বাইরে গিয়ে আধুনিক কবিতার স্বাদ নিতে চান। তারা যদি সুব্রত’র কবিতা পড়তে গিয়ে একটা মানসিক ধাক্কার মুখোমুখি হন এবং বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন তোলেন, কবিতা কি তাহলে আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছে? কবিতা যদি অতীতের জায়গায় ফিরে যায়ই তাহলে অতীতের নামী-দামী কবিদের কবিতা পড়লেই তো হয়, সুব্রত’র কবিতা পড়তে হবে কেন? কিংবা বলতে পারেন, এই কবিতাগুলো কী রকম যেন। পাঠক এ প্রশ্ন তুলতেই পারেন। কারণ, কবির যেমন কবিতা লেখার অধিকার আছে তেমনি পাঠকেরও আছে প্রকাশিত কবিতা নিয়ে কথা বলবার অধিকার। আমি কবি এবং পাঠক উভয়ের ভাবনাকে অনুসরণ করছি বলেই এখন নিজের কথা বলতে চাই। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, সমাজ, দেশ ও বিশ্বের জানার জগৎ প্রতিমুহূর্তেই বদলায় এবং প্রতি মুহূর্তেই তা বদলানোর মুখোমুখি অবস্থায় থাকে। যে কারণে ব্যক্তির জীবন-জগৎ ও ভাবনায় তা দোলা দেয়। সত্যটা এইখানে যে, সমাজ পেছোয় না, মানুষও সামনে এগোয়। যে কারণে চাইলেও কবিতাকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তবে সুব্রত’র কবিতাগুলো আসলেই ভিন্ন ধরনের। তিনি বাংলার প্রাচীন সাহিত্য থেকে শুরু করে মহাকালের স্তরে স্তরে সংঘটিত ও সঞ্চিত কবিতার যে বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে তা আত্মস্থ করেছেন এবং অভিজ্ঞতার নবায়ন করে বাংলা কবিতাকে অত্যন্ত দুঃসাহসিকভাবে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের টানা সীমারেখায় সকল প্রক্রিয়ার মধ্যে অবস্থিত ব্যক্তির জীবন ও ভাবনার দোলাচল সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের কবিতার মধ্যে অনায়াসে জায়গা করে নেয়।

 

তার এ যাবৎকালের সৃষ্টিগুলো

কবিতার বই:  তনুমধ্যা (১৯৯০), পুলিপোলাও (২০০৩), কবিতাসংগ্রহ (২০০৬), দিগম্বর চম্পূ (২০০৬), গর্দিশে চশমে সিয়া (২০০৮), ঝালিয়া (২০০৯), মর্নিং গ্লোরি (২০১০), ভেরোনিকার রুমাল (২০১১), হাওয়া-হরিণের চাঁদমারি (২০১১)।

উপন্যাস: কালকেতু ও ফুল্লরা (২০০২)। ছোটগল্প: মাতৃমূর্তি ক্যাথিড্রাল (২০০৪)।

অনুবাদ কবিতা: অন্তউড়ি (১৯৮৯), নির্বাচিত ইয়েটস (১৯৯৬), এলিয়টের প’ড়ো জমি (১৯৯৮), কবিতা ডাউন আন্ডার (২০১০), স্বর্ণদ্বীপিতা (২০১১)।

সুব্রত ছন্দ জানেন ভালো, কিছু ভিন্নতা বাদে প্রায় সবটাতেই ক্যালকুলেটিভ এ্যাপ্রোচ তার। বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বতন্ত্র স্বর তৈরি করছেন; তার কবিতায় অনেক দিন থেকেই সেই আওয়াজটা বেশ টের পাওয়া যায়। সুব্রত’র নিজের তৈরীকৃত উপরোক্ত ‘নিরীক্ষা-কৌশল’ সমন্বয়ের মাধ্যমে আপন কবিতার বহন উপযোগী ‘নোতুন কাব্যভাষা’র রূপ পুরোপুরি তৈরি না হলেও কাছাকাছি একটা যে ভঙ্গি আছে তা বোঝা যায়। এটা এখনও অস্থির এবং যথার্থ রূপও পায় নি। তাই যে কবিতা পড়লেই মনে হওয়ার কথা এটা সুব্রত’র কবিতা এবং ভাবনার আবর্তনে একটা মন ছুঁয়ে যাওয়ার ব্যাপার থাকবে। সেই নিজস্ব ভাষাভঙ্গি বা কাব্যভাষা কতটা দূরে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরাও সুব্রত’র সাথে তার কাব্যভ্রমণের সঙ্গী হওয়াই ভালো।

কবি সুব্রত বিশ্বভূগোলের বহুমাত্রিক সাহিত্য-উপাদানের নির্বিশেষ ব্যবহারকেই এখন পুরোমাত্রায় তার কবিতায় জায়গা করে দিয়েছেন। এটিই এখন তার মূল প্রবণতা। অন্তউড়ি দিয়ে শুরু করা যাত্রাটি এখন এই ঘরানায় স্থিতি নিয়েছে। যে কারণে ছোট ও মাঝারি আয়তনের কবিতাগুলোয় সেই প্রতিফলন টের পাওয়া যায়। বড় কবিতাগুলোয় দেশ-বিদেশের ধ্রুপদি পরিকাঠামো এবং ছোট ও মাঝারি কবিতাগুলোয় শেষ অবধি দেশজ শিকড়ের মূল টান তাকে আকৃষ্ট করে, কবির মানসিকতা সেই অন্তউড়ি-র দিকেই যায়। যেখানে মানুষই ঈশ্বর, মানুষের আদিজ্ঞানে প্রাণ, সংস্কৃতি ও পরিবেশই বেঁচে থাকে। যেমন—

আরণ্যক অন্ধকারে কানমাছি ভোঁ ভোঁ যারে পাবি তারে ছোঁ
ত্বমেব সর্বং মম আর কমলার ফুল আর মধুকমালায়
আমরা দুটি খনা ও মিহির
নিজেদের দেহরসে  প্রাণপ্রতিষ্ঠা  করেছি যে বিগ্রহে
তারই বরে শবরী শবর অবিনশ্বর ঈশ্বর

 

অন্তউড়ি  ও তনুমধ্যা-র সংমিশ্রিত প্রভাব পরের সব কিছুতেই

আরম্ভ-যাত্রায় বিস্ময়করভাবে কবির মনোজগতে একটি বাঁক-বদলের ভঙ্গিকেই সঙ্গী করেই সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের আবির্ভাব। যদি দেখি, তাহলে পাই অন্তউড়ি—তার প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই, অন্য নামে পদ্য হিশাবে চর্যার আধুনিক বাংলায় রূপান্তর। দ্বিতীয় প্রকাশিত বই তনুমধ্যা, কিন্তু মৌলিক কবিতার বই হিসাবে ধরলে প্রথম। একটি আদিতম বাংলা কবিতার অনুবাদ, অন্যটি পাশ্চাত্যপ্রভাবিত নিজের মৌলিক কবিতা। এই দু’টি বইয়ে প্রকাশিত কবি-মানসিকতার সংমিশ্রিত রূপ; আমার ধারণা তার পরবর্তী সকল সৃষ্টিপ্রয়াসের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে। সবকিছুতেই সেই দুঃসাহস, সেই তির্যকতা, সেই উদ্ধতপনা, সেই মজা বা বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গি, সেই ছন্দ-পারঙ্গমতা, সেই নতুনত্ব-পিয়াস ও বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে গমনাগমন, সেই উল্লম্ফন—সবই এই প্রথম দিককার দু’টি বইয়ে পাওয়া যায়, পাওয়া যায় পরের বইগুলিতেও। এগুলোর সম্মিলিত রূপই ভবিষ্যতের স্বরূপধারী অন্যতম শক্তিমান কবি হিসাবে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের উত্থানকে আসন্ন করেছে। আমি তার কবিতায় বহুমাত্রিকতার সন্ধান করতে গিয়ে যেমন প্রবল সম্ভাবনা দেখি তেমনি কখনো কখনো হেলাফেলার মনোভাব দেখে ব্যথিত হই। শংকিত থাকি কোনো কারণে তার কবিত্ব শক্তির অপচয় ঘটলে আমাদের কবিতার বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে কী হবে না হবে সেটা নিয়তিই বলে দেবে। যদিও সুব্রত, কবি দুপুর মিত্রের সাথে কথা বলতে গিয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই বলেছেন, ‘কবিতা একটা হাতের কাজ, এতে ঐশী, দৈবী ব’লে কিছু নাই। ওসব ঐশিতার ধারণা যাদের, তারা হয় অকবি, নয়তো কবি নয়। মূর্তিমান অভিনয়।’ এই উক্তি যেহেতু করেছেন, কাজেই নিয়তির বিষয়টিকে তিনি কতটুকু নিবেন বা আদৌ গ্রাহ্য করবেন কিনা তা নিশ্চিত নই। সেটা তার ব্যাপার।

 

তনুমধ্যা-য় দেখি জন্মরহস্য ও জীবনের অলৌকিক পরিভ্রমণ

অন্তউড়িতনুমধ্যা পরপর দু’বছরে বেরিয়েছে। চর্যার অনুবাদকর্ম অন্তউড়ি-র কথা বাদ দিলে তনুমধ্যা-ই  প্রথম মৌলিক কবিতার বই। কবি আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহর সাথে আলাপচারিতার সময় সুব্রত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে পড়ার সময়কার স্মৃতিচারণ করে বলেছেন—‘ডিপার্টমেন্টে থাকতেই বইটার সবটুকুই লেখা হয়েছিল, কয়েক বছর ধ’রে, আর আবারও হ্যাঁ, দ্য ওয়েস্টল্যান্ড সে-সময় আমার উপর যথেষ্ট কর্তৃত্ব করত। তনুমধ্যা-র কবিতাগুলির পরিকাঠামো এলিয়টেরই, কিন্তু ভিতরে যা আছে তা আমার। কাঁচা—তবু, আমারই। বলা দরকার যে, একই সময়ে প’ড়ো জমি-র অনুবাদও আমার হাত থেকে বেরুচ্ছিল..।’’  এই হলো অবস্থা, তাহলে তনুমধ্যা-কে দিয়েই শুরু করি। কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের কবিতাগুলো দেখতে দেখতে এগোই। তনুমধ্যা বিন্যস্ত হয়েছে তামাদি, প্রবজ্যা ও সাহারা—এই তিন পর্বে।

শুরুতেই তনুমধ্যা-র তামাদি পর্বের প্রথম সর্গের প্রথম স্তবকের শেষাংশ দেখি—

অনেক দুঃস্বপ্ন হেঁটে বুঝে যাই ডিম্বাকার সব,
আপন বোধির তলে জেগে উঠি দুরন্ত মনসুর—
বীজ ভাঙি—নিজেকেই খুঁজে পাই বীজের ভিতর।

আর স্তবকের শুরুতেই আছে:  ‘একবার শখ হলো বীজ ভেঙে ভিতরে তাকাই:/ তাতেই অনর্থপাত, এখানে যা চাই তা তো নাই!/ পেন্ডুলাম ফণা দোলে কাঁচা-পাকা দুই অন্ধকারে;/ টিকি খাড়া হয়ে যায় অগ্নিশর্মা তালুতে আমার।’

এই যে ‘বীজ’ ভাঙার কথা এসেছে—এই ‘বীজ ভাঙা’ তথা নিজের জন্মবৃত্তান্ত বা আত্মপরিচয় সন্ধানই সুব্রত’র শেষ পর্যন্তকার একান্ত প্রবণতা। তনুমধ্যা কবিতার ভুবনে সংঘটিত এক অলৌকিক পরিভ্রমণ, যার পরিধি অনন্ত ও অনিঃশেষে নিমজ্জমান। জীবন ও জগৎকে জানতে চাওয়ার মধ্য দিয়েই এই রহস্যময় গল্পযাত্রার শুরু হয়। স্মৃতির সহস্র জানালা দিয়ে পুরাণ, উপাখ্যান, শিশুতোষ শৈশব, গ্রামীণ সময়, ছোটবেলার প্রেমের স্মৃতি, নগরজীবন, রিকশাভ্রমণ, জন্ম-মৃত্যু, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, সভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়ার আশাবাদসহ অসংখ্য কত কিছুতেই সমৃদ্ধ এই ঐন্দ্রজালিক ভ্রমণের নাম তনুমধ্যা। শেষটাও তো পৃথিবীর সেরা আনন্দ-যাদুর প্রার্থনায় সাজানো হয়েছে—‘শরদো শতম্ এই বাতাস থাকুক,/ শরদো শতম্ থাক এই খোলা বুক/ মাটি হয়ে, পানি হয়ে, ঘাস হয়ে, আর/ প্রেমের প্রসূণ হয়ে, সুখ-হয়ে সুখ।’

তনুমধ্যা-য় তামাদি পর্বের তৃতীয় সর্গে তৈরি হওয়া ছোট একটি গল্প-দৃশ্য আমি তুলে ধরতে চাই। আমি এর কোনো ব্যাখ্যায় যেতে চাই না। শুধু অনুভবে রাখতে চাই; কৈশোরকালীন প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হওয়া রোমাঞ্চ—ছোটবেলার স্মৃতি বড়বেলায়ও মানুষের মনে অপার রহস্যময়তায় জমা রাখার সেই ইঙ্গিতটুকু। আর মন উতল করা সেই দৃশ্যটি যা কিনা আহ্বানের নীরবতায় রহস্য-শিহরন ছড়িয়ে রাখে! স্মৃতিগুলো কী রকম উথাল-পাতাল, কেবলি নিমজ্জন তৈরি করতে চায়। এই ঘোরগ্রস্ততা পাওয়া হয় জীবন থেকেই। শুধু কবিই পারেন অল্পকথায় এরকম করে বলতে। যেমন—

একটা পুকুরে গেছি বাড়ি থেকে দূরে,
প্রায় পরিত্যক্ত, ভরা হিজল চুনায়—
অথচ ছিলো না মন সাঁতারের প্রতি
আদপেই, দেখে নিয়ে চৌদিক, শ্রীমতি
বলে—একটা মজার খেলা খেলি আয়।

                            (তনুমধ্যা, তামাদি/তৃতীয় সর্গ)

তৃতীয় সর্গের ছোট একটি প্রতীকী ভৎর্সনার দৃশ্য, পৌরাণিক সেই গল্পটির কথা ভাবুন তো একটু। কবি কিভাবে সেই বেদনাটিকে এই কবিতার সংলগ্ন করেছেন! রাজা হরিণ চেনেন বটে, কিন্তু চেনেন না হরিণের রূপ ধারণ করা তাপসকন্যাকে। যার ফলে দৃশ্যটির জন্ম, এই ভৎর্সনাটি রাজার বুকে বেশ লাগবার কথা। যেমন—

অশোক কাননে আহা সখি সমাচারে
দীর্ঘশ্বাস ফেলে যায় পঞ্চবটী বন—
হরিণ যতোটা চেনে, চেনো নি রাজন,
হরিণীর মতো অই তাপসবালারে!

তৃতীয় সর্গে ছোটবেলার প্রেমের স্মৃতির এই বর্ণনাগত সৌন্দর্য যদি দেখতে চাই, তাহলে কী পাব? ‘চুলগুলি তার অশথ গাছের মতো’ লাইনটির সাথে জীবনানন্দ দাশের ‘শ্যামলী তোমার মুখ সেকালের শক্তির মতো’ লাইনটির একটা আবেশ পাওয়া যায়। কিন্তু ৪ লাইন এক সাথে পড়লে ভালো লাগার অবাক করা একটা দীপ্তি মন জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের একটা বয়সে মনের প্রবণতায় কী নির্ভেজাল সৌন্দর্য; সেই সৌন্দর্যের বর্ণনা এর চাইতে সহজ করে আর কিভাবে বলা যায় তার উত্তর খুঁজে পাওয়া সহজ নয়! যদিও কবিতার ধারাবাহিকতায় পরের দৃশ্যপটগুলো আর এরকম থাকে নি। তবু এই অংশটি নিয়ে আমার মনের ভিতর মন্ত্রের গুঞ্জন তুলে কেউ যেন গল্পের মতন টানা বলে যেতে থাকে—

শ্যামলী নামের মেয়েটির কথা শোনো,
চুলগুলি তার অশথ গাছের মতো,
আমি ভাবতাম ও আমাকে ভালবাসে,
আমি যা-ই করি তাতেই অবাক হতো—

চতুর্থ সর্গ থেকে লোকমুখে প্রচারিত একটা স্থানীয় জ্ঞান-কথার নমুনা দিই, যেটি পরিস্থিতিগুণে বেদনার্ত হওয়া একজনকে অন্যজন সান্ত্বনা দিয়ে বলছিল। কবিতায় লোকায়ত জ্ঞানের এইরূপ ব্যবহার কবিতাকে আরও আন্তরিক করে তোলে। এই টেকনিকটি টানা চলে আসা উপস্থাপনার মাঝে টোটকার মতো ঢুকে যায়, তারপর এক টুকরো স্নিগ্ধ রূপ তুলে ধরে। যেমন—

শুধু মাটি কোনোদিন প্রতিশোধ নেয় না সুজন,
করো যতো পদাঘাত মাটি তবু বুকে টেনে নেয়।

উদ্ধৃতির অনায়াস আত্তীকরণ যত্রতত্র ছড়ানো সুব্রত’র কবিতায় একটি সহজলভ্য ঘটনা। একটি উদাহরণ নিই—

নগরে নতুন মেঘ, এ-মেঘ নতুন,
এ-মেঘ ঝরলে পরে জ্বলবে আগুন,
আসফ আঁখোঁসে রোয়া ঔর জিগর জ্বলতা হৈ
ক্যা কয়ামৎ হৈ কে বর্সাৎমেঁ ঘর জ্বলতা হৈ।

পঞ্চম সর্গ থেকে ভাবনার একটা উল্লম্ফন তুলে নিই। সিকোয়েন্সগুলোর একটার সাথে আরেকটার মিহি বুননের মতো আন্তঃসংযোগ—কবিতা না পড়ে তো তখন আর উপায় থাকে না। কবিতা তার দিকে যাদুর মতোই পাঠককে টেনে নেয়—

তোমার যেখানে সাধ চলে যাও, এখানেই থেকে যাবো আমি
এক যুগ, এক কোটি যুগ—
ব্যাঁকা চাঁদের বঁড়শি দিয়ে টপাটপ
মাছ ধরে ধরে আমি লটকাবো ক্রুশে
যতোদিন নিজের মাথা না ভাঙে নবাবী দুর্মুশে।
জ্বলজ্বলে অন্ধকারে ঘুটঘুটে দেউটি দেখাবে
প্রতাপ। এই তো কয়দিন সবে।
খেলে নাও, তারপর ফানা হবে।
ফী আমানিল্লাহ।

কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এভাবেই একটা সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি পর্বেই দুর্মূল্য এক কাব্য-মেধার বাহবা পেয়েছিলেন তার সতীর্থ কবিবন্ধুদের কাছ থেকে।


যদি অন্তউড়ি-র নতুন আরেকটি সংস্করণের দরকার হয়, তবে কি কবি প্রয়োজনমতো এর পরিমার্জনার জন্য কোনো কষ্ট স্বীকার করবেন?


অন্তউড়ি : তরুণ কবির অসম সাহসের কাজ

অন্তউড়ি কী? এই প্রশ্নটির উত্তরে প্রচ্ছদেই বলা হয়, ‘আধুনিক বাংলা পদ্য-রূপান্তরে চর্যাপদ’। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ অন্তউড়ি-র গৌরচন্দ্রিকায় বলছেন, ‘অক্ষম অনুবাদকের কলম আর জল্লাদের কৃপাণে আমি নিজেই খুব একটা তফাৎ দেখি না।’ অনুবাদকের জায়গা থেকে তিনি এটা মনে করতেই পারেন, তবে তার আগে শুরুতেই আরও সহজ ভাষায় বলেছেন, ‘অপ্রিয় সত্যটা এই যে, আমার এই অনুবাদের পিছনে তেমন কোনো মহান উদ্দেশ্য ছিলো না। ব্যাপারটা ছিলো যুগপৎ খেয়ালী এবং আকস্মিক। অবশ্য আধুনিক বাংলায় চর্যার রূপান্তরের প্রয়োজনটা আমি বুঝতাম।’

তার মানে কবিও ভিতরে ভিতরে একটা যুগ-চাহিদা অনুভব করছিলেন। এই বোধই সুব্রত অগাস্টিন গোমেজকে তাড়িত করেছে এই দুঃসাহসিক অনুবাদ-কর্মটি সম্পাদনের দিকে। তরুণ এক কবির জন্য এ কি অবিমৃশ্যকারিতা, নাকি ইতিহাসের চাহিদা পূরণের চেষ্টা ছিল, তা বলার সময় এখনও হয় নি। তবে একটি প্রশ্ন তোলাই যায়—তখনের পরিবর্তে যদি এখন সুব্রত চর্যা অনুবাদ করতেন; তাহলে এর মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াত? আবার এই কথাটিও বলা যায়, যদি অন্তউড়ি-র নতুন আরেকটি সংস্করণের দরকার হয়, তবে কি কবি প্রয়োজনমতো এর পরিমার্জনার জন্য কোনো কষ্ট স্বীকার করবেন? আমার মনে হয় করাটাই উত্তম হবে।

‘চর্যা’ বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সম্পদ এবং প্রাপ্ত আদিতম নিদর্শন। অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা বিবেচনা করেই সুব্রত এর আধুনিক পদ্যে রূপান্তর করেছেন। যেমন—মূল থেকে পাঠান্তর, শব্দার্থ, টীকা, ব্যুৎপত্তি, সুনির্দিষ্ট রাগ সম্বলিত ছন্দ, অন্তর্নিহিত ভাব, সংকেত, সন্ধ্যা-ভাষা, আধুনিককালে অনুবাদের ভাষাগত উদাহরণ না থাকা প্রভৃতি। তবে আমি ধারণা করি, কবি সুব্রত চর্যা অনুবাদের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার দুঃসাহসিকতা ষোল আনাই উপভোগ করেছেন। সুব্রত ছাত্রাবস্থায় যা করেছেন সে কাজটি আরও আগে হতে পারত, হয়তোবা অন্য কেউ করতে পারতেন। সুব্রত কবি বলেই চর্যা অনুবাদ করার সাহস করেছেন। এটি খেয়ালি সিদ্ধান্ত হলেও সুব্রত সত্যি সত্যিই কবিতার জন্য অতি-দরকারি কাজটিই করেছেন।

চর্যার অনুবাদ সুব্রত’র জন্য সহজ ছিল না। অনুবাদ করার ক্ষেত্রে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতার মধ্য থেকে সুব্রত’র  ভাষায় একটিকে তুলে ধরতে চাই—

বাংলা ভাষা তখন সবে অপভ্রংশের উদর থেকে ভূমিষ্ঠ হবার চেষ্টা করছে। হাত পা নাক মুখ তখনও স্পষ্ট রূপ নেয় নি। বানান অস্থির, বৈয়াকরণিক নিয়মগুলো ভঙ্গুর, তদুপরি, কবিরা সবাই বাঙালি না হবার ফলে আশেপাশের, অর্থাৎ, অসমীয়া, মৈথিলি, ওড়িয়া, হিন্দি ইত্যাদি ভাষারও কিছু কিছু শব্দ বা বাগ্বিধিও নাক গলিয়েছে এখানে-সেখানে। বলাবাহুল্য, ঐ সমস্ত ভাষাগুলোরও তখন নিতান্ত শৈশব। অধিকন্তু, চর্যার প্রতিলিপিগুলি লিখিত ও সংরক্ষিত হয়েছে নেপালে বা তিব্বতে, সম্ভবত অবাঙালি এবং স্বল্পশিক্ষিত লিপিকরদের দ্বারা। ফলে, বানান এবং অন্যান্য বিচ্যুতি প্রায় অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং, স্বাভাবিক কারণেই, হরেদরে হাজার বছর পরেকার বাঙালির কাছে চর্যার ভাষা রীতিমতো বিভীষিকার বস্তু।

সুব্রত’র চর্যা অনুবাদের শিল্পমূল্য বা সার্থকতা নিরূপণের কোনো চেষ্টাই এখানে করা হচ্ছে না। এখানে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে যে, বাঘা বাঘা পণ্ডিতেরা গবেষণা করে চর্যার যে পাঠ-প্রক্রিয়া নির্দেশনা দিয়েছেন, সেই অভিজ্ঞতার সহায়তা নিয়ে কেউ কবিতা হিসাবে এর বাংলায় অনুবাদের কেন উদ্যোগ নিলেন না? একজন তরুণ কবিকেই কেন ছাত্রকালে এই দায়িত্বটি পালন করতে হলো? মূল টেক্সটে উল্লেখিত পাঠান্তরের অর্থ, টীকা, ভাষার ব্যাখ্যাশ্রয় সহ নানান সংকেতের অর্থ উদ্ধার করে চর্যা পাঠ করা এখনো সুখকর কোনো বিষয় নয়। মূল চর্যা ও অনূদিত চর্যার প্রতিটি চরণের প্রায় দুই বা ততোধিক মাথায় গাণিতিক সংখ্যা উল্লেখের মাধ্যমে সংকেত-সূত্র দেয়া রয়েছে। চর্যা আসলেই জটিল, দুর্বোধ্য ও রহস্যময় সাংকেতিকতায় আবৃত।

তরুণ কবি সুব্রত’র খেয়ালিপনা ও দুঃসাহসিকতার পুরস্কার হচ্ছে এই দুর্গম পথ অতিক্রমের গল্প। অন্তউড়ি তথা চর্যা অনুবাদ আপাতত যেভাবে আছে সেভাবেই থাকুক। পরবর্তী সংস্করণে পরিমার্জনার মাধ্যমে এর আরও উন্নত রূপান্তর করা সম্ভব। সুব্রত, কোনো এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি শুনেছিলেন কিন্তু হাতে পান নি; কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের চর্যার অনুবাদ রয়েছে। একই টেক্সটের একাধিক অনুবাদ খুবই সাধারণ ঘটনা। তাতে তুলনামুলক পাঠের সুযোগ বাড়ে। এদেশের সাহিত্যের অধ্যাপকরা অন্তউড়ি নিয়ে কী ভাবছেন তা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা আমার চোখে পড়ে নি। অন্তত কিছু আলোচনা তো হতে পারত। প্রসঙ্গক্রমে একজন বলেছেন, সুব্রত’র করা এলিয়টের অনুবাদ প’ড়ো জমি ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের ছেলেমেয়েরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগ্রহ করে পড়ছে। তাহলে প্রশ্ন, রেফারেন্স বুক না হলেও অন্তউড়ি কি বাংলা সাহিত্যের ছেলেমেয়েরা পড়ে?

কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের অনুবাদে তিনটি চর্যার অনুবাদ দেখে নিই, পাশে মূল কবিতার অবস্থান রাখি। তাহলেই বোঝা যাবে সুব্রত এজন্য কতটা কষ্ট স্বীকার করেছেন—

 

চর্যা-২৮
শবরপাদানাম/ রাগ – বরাড়ি (বলাড্ডি)

উঞ্চা উঞ্চা পাবত তহি বসই সবরী বালী।
মোরাঙ্গ পীচ্ছ পরিহাণ সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী ॥
উমত সবরো পাগল সবরো মা কর গুলী গুহারী।
তোহেরী ণিঅ ঘরিণী ণামে সহজ সুন্দরী ॥
ণাণা তরুবর মৌলিল রে লাগেলী ডালী।
একেলী সররী এ বণ হিন্ডই কর্ণকুন্ডল বজ্রধারী ॥
তিঅ ধাউ খাট পড়িলা সবরো মহাসুহে সেজি ছাইলী।
সবরো ভুঅঙ্গ ণইরামণি দারী পেম্ম রাতি পোহাইলী ॥
হিঅ তাঁবোলা মহাসুহে কাপুর খাই।
সুণ নৈরামণি কণ্ঠে লইআ মহাসুহে রাতি পোহাই ॥
গুরুবাক্ ধনুয়া বিন্ধ ণিঅ মনে বাণে।
একে সর সন্ধানে বিন্ধহ বিন্ধহ পরম ণিবাণে ॥
উমতো সবরো গরুআ রোসে।
গিরিবর সিহর সন্ধি পইসন্তে সবরো লোড়িব কইসে ॥

রূপান্তর—

চর্যা-২৮
শবর

উঁচু পর্বতে বাস করে এক শবরী বালা,
ময়ূরপুচ্ছ পরনে, গলায় গুঞ্জামালা।
মত্ত শবর, পাগল শবর, কোরো না গোল,
সহজিয়া এই ঘরনিকে নিয়ে দুঃখ ভোল্।
নানা গাছপালা, ডালপালা ঠ্যাকে আকাশ-তলে;
একেলা শবরী কুণ্ডলধারী বনস্থলে।
ত্রিধাতুর খাটে শবর-ভুজগ শেজ বিছায়,
নৈরামনির কণ্ঠ জড়িয়ে রাত পোহায়,
কর্পূরযোগে হৃত্-তাম্বূল চিবায় সুখে,
আত্মাহীনার আসঙ্গ তার মত্ত বুকে—
গুরুবাক্যের ধনুকের তিরে আপন মন
গেঁথে ফেলে লভো পরিনির্বাণ, পরম ধন।
কোথায় লুকালে, শবর আমার, অন্ধকারে?
খুঁজব তোমাকে কোন্ গিরিখাতে, কোন্ পাহাড়ে?

 

চর্যা-২৯
লুইপাদানাম্/ রাগ- পটমঞ্জরী

ভাব ন হোই অভাব ণ জাই।
অইস সংবোহে কো পতিআই ॥
লুই ভণই  বঢ় দুলকখ বিণাণা
তিঅ ধাএ বিলসই উহ লাগে ণা ॥
জাহর বানচিহ্ন রুব ণ জাণী।
সো কইসে আগম বেএ বখাণী ॥
কাহেরে কিস ভণি মই দিবি পিরিচ্ছা
উদক চান্দ জিম সাচন মিচ্ছা ॥
লুই ভণই মই ভাবই কীস!
জা লই অচ্ছম তাহের উহ ণ দিস ॥

রূপান্তর—

চর্যা-২৯
লুই

ভাব-ও হয় না, না-যায় অভাবও,
এমন তত্ত্বে কী-বা জ্ঞান পাব?
লুই বলে, বোঝা ভীষণ কষ্ট,
ত্রিধাতু-বিলাসে হয় না স্পষ্ট।
যা-কিছু অরূপ, যা অতীন্দ্রিয়
আগম-বেদে কি তা ব্যাখ্যনীয়?
কী জবাব দেব—জলে বিম্বিত
চাঁদ সে সত্য, নাকি কল্পিত?
লুই বলে, কোনো কিছু নাই জানা,
কই আছি, নাই তারই যে ঠিকানা।

 

চর্যা- ৪৫
কাহ্নপাদানাম/ রাগ- মল্লারী

মণ তরু পাঞ্চ ইন্দি তসু সাহা।
আসা বহল পত ফল বাহা ॥
বরগুরু -বঅণে কুঠারে ছীজই।
কাহ্ন ভণই তরু পুণ ন উজই ॥
বাঢ়ই সো তরু সুভাসুভ পাণী।
ছেবই বিদুজন গুরু পরিমাণী ॥
জো তরু ছেব ভেবউ ণ জাণই।
সড়ি পড়িআঁ রে মূঢ় তা ভব মাণই ॥
সুণী তরুবর গঅণ কুঠার।
ছেবহ সো তরু মূল ন ডাল ॥

রূপান্তর—

চর্যা-৪৫
কানু

পঞ্চেন্দ্রিয় শাখা মন-তরুটাতে,
আশারূপ ফল পাতা শোভা পায় তাতে।
সদ্গুরু কাটে তরু বচন-কুড়ালে;
কানু বলে, এ-জীবন পাবে না, ফুরালে।
সেই তরু বাড়ে পাপপুণ্যের জলে,
বিদ্বান্ কাটে তারে গুরু-কৃপা-বলে।
তরুটার ছেদ-ভেদ না-জানে যে-বোকা
পৃথিবী সত্য ভেবে খায় সে যে ধোঁকা।
শূন্য সে-তরুবর, আকাশ কুড়াল—
শিকড়ে বসাও কোপ, ছেঁটো না রে ডাল।


স্পষ্টতই  মাসুদ খানের ‘কুড়িগ্রাম’ কবিতার কাউন্টার মজা করতে গিয়ে লেখা বলেই মনে হয়েছে।


এছাড়াও ‘গাড়ি-দেখা’, ‘লিটল ম্যাগাজিন’, ‘তাণ্ডব’ সুব্রত অসাস্টিন গোমেজের ভিন্ন স্বাদের কবিতা। এইগুলিতে কবিতার স্পিরিট ও পরিবেশনায় জীবনের প্রতি একটি মানসিক নিমজ্জমানতা বা উদ্ভাসন পাই। জীবনের সম্মুখীন কতগুলো দ্বন্দ্ব ও প্রশ্নের খোলা প্রসঙ্গ তুলে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সেই হেলাফেলার স্টাইল। ‘গাড়ি দেখা’য় একেবারেই ভিন্নভাবে বিত্তের প্রভাবে যৌনমিলনের মালিকানা নির্ণয়, ‘লিটল ম্যাগাজিন’-এ এর পরমায়ু ও উৎপাদনের ইফেক্ট এবং ‘তাণ্ডব’-এ কতগুলো ইমেজ আঁকা হয়েছে দ্রুতগতি ও তীক্ষ্ণতার সমবায়ে। পড়ার সময় অনুভবে কেটে কেটে বসে।

দিগম্বর চম্পূ নিরীক্ষাপূর্ণ কাব্যপ্রয়াস। প্রচলিত অভ্যাসের পাঠানন্দ পাওয়া যাবে না। স্নায়ু-সংবেদনা নিয়েই তবে পড়তে হয়। দিগম্বর চম্পূ-তে ‘মাসুদ খানের জন্য ক’টি’ নাম দিয়েও কবিতা কবিতা খেলার একটা সিরিজ করা হয়েছে। এই সিরিজের ৬টি কবিতার মধ্যে ‘ওসমান ট্রেন ফেল করেছিল’ এবং ‘গর্ভপর্ব’—এ দু’টিতে রসিকতা নাই। ভালো লেখা হয়ে গেছে। এই সিরিজের প্রথম কবিতার  নাম ‘চর শামসুদ্দিন’। স্পষ্টতই  মাসুদ খানের ‘কুড়িগ্রাম’ কবিতার কাউন্টার মজা করতে গিয়ে লেখা বলেই মনে হয়েছে।

মাসুদ খানের ‘কুড়িগ্রাম’ কবিতার একটি এবং সুব্রত’র  ‘চর শামসুদ্দিনের’ ছোট দু’টি স্তবক পরপর তুলে ধরা হলো। সুব্রত সম্ভবত এই বার্তটিই দিতে চেয়েছেন যে, শক্তিমান কবিরা চাইলেই যে কোনো রকমের লেখা লিখতে পারেন। সাহিত্যিক প্রতিযোগিতা থাকা ভালো, তাতে লিখবার গতি বাড়ে যেমন, মানও বাড়ে তেমন। যেমন—

কোনোদিন আমি যাইনি কুড়িগ্রাম।

রাত গভীর হ’লে আমাদেও এই প্রচলিত ভূপৃষ্ঠ থেকে
ঘুমন্ত কুড়িগ্রাম ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়।
অগ্রাহ্য করে সকল মাধ্যাকর্ষণ।
তারপর তার ছোট রাজ্যপাট নিয়ে উড়ে উড়ে
চ’লে যায় দূর শূন্যলোকে।

অপরদিকে সুব্রত লিখলেন  ‘চর শামসুদ্দিন’—

মানচিত্রের উপলদ্ধ এই নাম
চর শামসুদ্দিন
এবং সেখানে আমি যেতে চাই
একদিন

যদিও আমার বন্ধু আছে শামসুদ্দিন
তবু হয়তো ঐ দ্বীপে যেতে চাই
এইসব শামসুদ্দিনদের এড়াতেই
অথবা কেবল বেড়াতেই

কবি মাসুদ খনের  সাথে কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের যতই সাহিত্যিক প্রতিযোগিতা থাকুক, বন্ধুত্ব তারও চেয়ে বেশি। শ্রদ্ধাবোধও বেশ প্রবল বলেই মনে হয়। দুপুর মিত্রের সাথে পূর্বোক্ত সাক্ষাৎকারের অন্য অংশে সুব্রত বলেছেন—

আমি উৎপলকুমার বসু, বিনয় মজুমদার, রণজিৎ দাশ, অনন্য রায়, মৃদুল দাশগুপ্ত, জয় গোস্বামী বা গৌতম চৌধুরী পড়ি যখন, কী যে হাহাকার আমার হয়—হায়, আমাদের কেউ নাই অমন, কেউ না, কেউ না। কিন্তু মাসুদ খান পড়তে সময় মনে হয়, আমাদের এই যে মা.খা., এঁর মতো কেউ কি আছে ওদের—ওদের-আমাদের মিলিয়ে, “আমাদের”? হিমালয়ে কত-কত বেজায় উঁচু শৃঙ্গ, অনেক উঁচুর ভিড়ে আরও-একটু উঁচিয়ে-থাকা কোনো-কোনো মাথা, নজর করতে হয় দেখতে; কিন্তু খান হলেন মাউন্ট কিলিম্যাঞ্জারো, আশপাশে সমতল সাভানা, তার মধ্যে একা এক অভাবনীয়, বেঢপ, বিশালতা…

দিগম্বর চম্পূ-তে ‘মাসুদ খানের জন্য কটি’ সিরিজের ‘ওসমান ট্রেন ফেল করেছিল’-এর শেষ ক’টি চরণ তুলে নিই, পুরো কবিতা না নিলেও চলবে। কবিতায় যাই-ই থাকুক, শেষ চরণে চমক নিয়ে এলেন কবি ‘ ন্যাপলিয়নের মতো ট্রেন’  উপমাটি ব্যবহার করে—

‘আমি একা পড়ে রৈনু হায়
ফাঁকা প্লাট্ফর্মে সীমাহীন
নিশ্চলতায়

চ’লে গেল শুধু বিন্-টিকিটে
আমার জীবন-বিমা বিদ্যুৎশকটে
আর কিবা রাত্রি কিবা দিন
জীবন এবং বিমাহীন

হায় ট্রেন
ন্যাপলিয়নের মতো ট্রেন

এই সিরিজেরই শেষ কবিতা ‘গর্ভপর্ব’। শেষ স্তবকটি হলো আরেকটি উল্লম্ফন। ফিরিস্তি বর্ণনার মধ্য দিয়ে ঘনঘন ম্যাসেজ শিফটিং ও পরিচয় নির্ণায়ক অনুসিদ্ধান্ত তৈরি করা হয়—

তিনি গর্ভিনী। তিনি মা অবনি।
তিনি শ্যামাঙ্গিনী। অপিচ যবনী।
লীলা তাঁর তিনিই জানেন।
গর্ভে নড়ে তুতানখামেন।

দিগম্বর চম্পূ থেকে আরেকটি ছোট কবিতা বেছে নিতে ইচ্ছা করে, নাম ‘আলোক ষটক’। নিচের ‘আলোক ষটক’ নামের এই কবিতাংশের মধ্যে ঠারেঠুরে যেসব কথা বলা হয়েছে বা যেভাবে লেখা হয়েছে তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়া নিষ্প্রয়োজন। পুরো ব্যাপারটাই অনুভবের, শুধু পাঠানন্দের বিষয়। এর মধ্যেও কবির নিজস্ব ‘কাব্যভাষা’-র লক্ষণ পাওয়া যায়—

আলো, আমি দেখেছি তোমার এক নূতন সুসার—
আলোহিম গোধূলিতে শাড়ি সায়া খুলে দেখালে, কী
আশ্চর্য তোমার দেহ! আমি জানি এখন, মুসার
কেন জ্বলে গিয়েছিল চোখ।

গর্দিশে চশমে সিয়া থেকে কিছু চরণ, উপমা ও কাব্যভাষার উদাহরণ খুঁজে নিতে চাই। ইরানি যুবকের সাথে আলোচনার সূত্র ধরে পর্সিয়ান শব্দার্থ দিয়ে এই কবিতাটি নির্মিত এবং সেই নামেই বইয়ের নামকরণ। এখান থেকে জ্ঞাস্তিক, অঘটন, ত্রাহি মে,  দু’দিন পর তার সঙ্গে দেখা, নটেমুন্ডন-এর কিছু উদ্ধৃতি নিতে পারি। যেমন—

প্রজ্ঞার কাফন-গায়ে জন্ম আমার

চরণের অভিনবত্বের কারণে এটি ‘জ্ঞাস্তিক’ নামের কবিতা থেকে স্রেফ একটি উদ্ধৃতি হিসাবে নেয়া হয়েছে।

কে জানত যে কালকে রাতে এত বৃষ্টি হবে,
জানলে কি নিজের ধড়টা বাইরে রেখে শুই?
আজকে সকালে তো তাকে চিনতেই পারি না,
এক-রাতে একশ-নব্বই

কবিতার নাম ‘ত্রাহি মে’।  বৃষ্টি ভেজা শরীরে অস্বাভাবিক তাপমাত্রার উপলদ্ধি—একটা ফ্যান্টাসির ভিতর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। একটু উদ্ভট টাইপের সুররিয়ালিস্টিক।

সেই বিবিখ্যাত ব্রথেলের থেকে কোনো কাক
উড়ে এসে ফেলেছিল তোমার মাথায়
ময়লা কনডম, তুমি তায়
কেমন আধখানা হ’য়ে গেলে,
সুজন আমার!
বয়সের ঢের আগে মাথাময় প’ড়ে গেল টাক,
সিফিলিস-চিহ্ন ফুটে উঠল কচি গালে,
আর আমরা ভাবি-কি, কেমন
ফাস্ট্-ফরোয়ার্ড হ’য়ে যাচ্ছে, বঁধু, তোমার জীবন!

সুব্রত’র কবিতায় বরাবরই কিছু চমক সৃষ্টির অভিপ্রায় থাকে। ‘দু’দিন পর তার সঙ্গে দেখা’ হেলাফেলার ভঙ্গিতে সেই ঠাট্টার মুডে লেখা। তার ইমাজিনেশন বা কল্পনা-প্রবণতা একটা মানুষের ব্যক্তিত্বের রূপান্তরকে কোন জায়গা থেকে নিয়ে এসেছে! বেশ্যালয় থেকে উড়ে আসা কাক কোনো একজন ব্যক্তির মাথায় ময়লা কনডম ফেলেছে, ফল হলো এই যে তথাকথিত ভালো ব্যক্তিটি বদলে গেল। কিছু পরিবর্তন এল তার জীবনে।  প্রথমটায় প্রতীকী তামাশার আনন্দ পাওয়া গেলেও শেষটায় একটা যন্ত্রণাবিদ্ধ খোঁচায় মৌনতা নেমে আসে—

আমি আজ ফুরায়ে গেলাম
ফিল্টারে-আগুন-লাগা সিগ্রেটের মতো।
সব রক্ত বেরোবে যা দিয়ে
এমন গভীর এক ক্ষত

নিয়ে জন্মেছিলাম, এবং
তাই কোনো আক্ষেপও রইল না—
এই কথা দ্বাপরেরও আগে
টুনিরে কহিল এক টোনা।

‘নটেমুন্ডন’ পড়ার পর রূপকথার আমেজ ভর করে। টোনাটুনির গল্পের এই রূপটি বেদনার অন্তর্গত। সুব্রত’র কবিতার ভার বইবার জন্য নিজস্ব যে কাব্যভাষা বা ‘নোতুন ভাষা’-র আকাঙ্ক্ষা, সেই লক্ষণগুলি এভাবেই একটু একটু করে তৈরি হয়। কিন্তু পূর্ণরূপ তৈরি হওয়ার আগেই সরে সরে যায়—অস্থিরভাবে আইডিয়ার রূপান্তর ঘটতে থাকে।

অনেক সূর্যের ক্রোধে
লাল হ’য়ে যাবে আমাদের
ভুরু আর চুল।
একবার দাঁড়াও তবু। দেখি।
নোড়ো না, কেঁপো না, স্থিরোভব,
আয়না!

হাওয়া হরিণের চাঁদমারি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের আরেকটি কবিতার বই। ‘দাঁড়াও আমার আঁখির আগে’ এই বইয়েরই একটি কবিতা। কবিমনের কল্পনায় ইল্যুশন বা বিভ্রম তৈরি করা হয়েছে। ইমেজারিগুলো খুবই সরল ও নির্ভার—নাটকের মতন ছোট ছোট আন্তরিক ডায়ালগ ঘটনার ধারাবাহিকতা বারবার পরির্তনের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেছে।

কী বিশাল     একটা ছোট্ট ফোঁটা
কী গভীর     একটা ছোট্ট ফোঁটা
আকাশের      ওড়নাটা পেঁচিয়ে
ঢাকে তার     পাহাড়-দুধের বোঁটা

মর্নিং গ্লোরি কবিতার বই থেকে ‘মর্নিং গ্লোরি’ নামের নাম কবিতার অংশবিশেষ। পূর্বেকার ছন্দ চর্চার ধরনে লিখিত হয়েছে। ছবির দৃশ্য তৈরি করার মতোন করে পরম্পরা সজ্জিত। একই বই থেকে ‘ছবি’ নামের কবিতাটি দেখি। বইয়ের নামে নাম ‘মর্নিং গ্লোরি’ কবিতার তুলনায় নিচে উল্লেখ করা ‘ছবি’ কবিতাটিই বেশি কাঙ্ক্ষিত ও প্রাণবন্ত—

দৃশ্যত কিছুই বদলে যায় নি
বয়স একপোঁচ কালি মেখে গেছে চোখের তলায়
প্রসাধনে সেও ঢাকা যায়
চোখগুলি হরেদরে ততটাই বড়
হাতের আঙুলগুলি তেমনই লম্বাটে
ওষ্ঠাধর তেমনই পুরুষ্টু
ভ্রুজোড়া তেমনই অপ্রখর

কিন্তু আমি তোমার হাসিতে আর তোমার চাউনিতে
দেখতে পাচ্ছি হা-খোলা কবর

তোমার ভিতরে আমি ফুরিয়ে গিয়েছি

কখনও জানো নি
তবু


এসব কারণেই তাকে নিয়েও গল্প করার ইমেজ বাজারে চালু আছে বা মিথ তৈরি হয়েছে।


এই পর্যন্তই সীমানা অথবা সীমানাহীনতায় থাকছেন

কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের অন্তউড়ি, তনুমধ্যা, গর্দিশে চশমা সিয়া, দিগম্বর চম্পূমর্নিং গ্লোরি নামের কবিতার বইগুলোর ওপর ভিত্তি করে মূলত এই লেখাটি। কবিতায় তার অনেক বেশি বিচিত্র ধ্যান-ধারণা ও দুঃসাহসিকতা, নিজস্ব ভঙ্গি ও কাব্যভাষা তৈরির অবিরাম প্রয়াসে আমাদেরকে বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হতে হয়। সুব্রত আপন কবিতায় বিষয়ভাবনা, নির্মাণশৈলী, ছন্দদক্ষতা, শব্দ ও চরণ নির্মাণে বিস্ময়কর সাহস ও দ্বন্দ্ব তুলে আনতে পেরেছেন। এই দ্বন্দ্ব মূলত প্রাচীন ডিকশনের সাথে সমকালীন ধারায় সংমিশ্রণে, অলংকারে, ছন্দ ব্যবহার প্রভৃতিতে।

সংবেদনার আছর-লাগা মনোযোগ নিয়েই তার লেখাগুলো পড়তে হয়। বোঝা যায় নিজস্ব ভঙ্গিতে লিখছেন, তার আকাঙ্ক্ষিত ‘নোতুন কাব্যভাষা’র কিছু লক্ষণও পাওয়া যায়। কিন্তু নিরঙ্কুশ সুব্রতীয় ‘কাব্যভাষা’-র অবয়ব বা রূপ সেই মতো দেখি নাই। হয়তো আরও সময় লাগবে। এ থেকে উত্তরণের জন্য তার প্রস্তুতির স্বরূপ কী হবে বা কিভাবে প্রস্তুতি নিবেন—এটাও কবির মর্জির ওপর ছেড়ে দেয়াটাই উত্তম। তারপরও যদি প্রশ্ন উঠে, তাহলে কি এই পর্যন্তই তার প্রতিভার সীমানা না সৃষ্টিক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, নাকি হেলাফেলা করতে গিয়ে আপন প্রতিভার অপচয় করছেন—এসব উত্তর আমার জানা নাই।

তিনি কবিতায় প্রায়ই প্রচলিত শব্দের অপ্রচলিত ব্যবহার কিংবা অপরিচিত শব্দের অনায়াস স্থাপন করেছেন। তার লেখাগুলো পড়ার পর আমার ধারণা হয়, তার মনের মধ্যে যদি হঠাৎ কোনো ঝোঁক চেপেছে বা ইচ্ছা হয়েছে বা আড্ডায় কোনো উসকানি হয়েছে—সুব্রত সময় নেন নি, সঙ্গে সঙ্গে কিছু না কিছু লিখে ফেলেছেন। আর কিছু আছে দীর্ঘমেয়াদী ও সার্বক্ষণিক চর্চার ফল। সুব্রত এসব করতে পারতেন, এখনও পারেন।

কবি হিসাবে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের আশির দশকে আবির্ভাব এবং শাহবাগ কেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার গণ্ডিতে সে-সময় তাদের একটি বড় পরিধি ছিল। এসব কারণেই তাকে নিয়েও গল্প করার ইমেজ বাজারে চালু আছে বা মিথ তৈরি হয়েছে। কাজেই তিনি যাই করুন না কেন প্রত্যাশার একটা ব্যাপার থেকেই যাবে। তিনি কতদূর যাবেন বা বাংলা সাহিত্যের স্থায়ী রূপকাঠামোয় তার আসন কোথায় বা আদৌ হতে পারে কিনা—প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তার দিকে তাকিয়ে আছি। আশা করি, প্রতিভার প্রতি সুবিচার করেই তিনি কবিতাকে সেই প্রাপ্তির দিকে নিয়ে যেতে পারবেন ।

Firoz ahmad

শেখ ফিরোজ আহমদ

জন্ম ১ আগস্ট ১৯৬৩, চাঁদপুর।
অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : উন্নয়নকর্মী।

প্রকাশিত বই :
পাতকীর ছায়া [কবিতা, অন্তরীপ প্রকাশনী, বগুড়া, ১৯৮৭]
কালের পৃষ্ঠায় [প্রবন্ধ, যুক্ত, ঢাকা, ২০০৮]
মাতরিশ্বা [কবিতা, ভাষাচিত্র, ঢাকা, ২০১০]

ই-মেইল : firozbangla@yahoo.com
Firoz ahmad