হোম গদ্য ধর্ষক

ধর্ষক

ধর্ষক
766
0

১.
মেস-জীবন আনন্দেরই বটে—হই-হুল্লোড়ে, আড্ডায় মেতে থাকা যায়। স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং স্বাধীন ইচ্ছার বাস্তবায়নও করা যায়। ব্যক্তি কিছু সমস্যা উতরে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলে ভেতরে ভেতরে রাজার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। রাজ্য সীমানা ছোট রুম-দুটোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পুরো পৃথিবীটাই যেন তার অদৃশ্য শাসনে চলে।

সেই রাজ্যের রাজা আফজাল। আমার বন্ধু—বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু। আফজাল আর রফিক নীলক্ষেতের অদূরে দুইটা রুম নিয়েছে বহুদিন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স করে এ দিকটায় পড়ে থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না আফজালের। প্রতিদিনের যাতায়াতের কষ্টকে হাসিমুখে মেনে নেওয়ার মধ্যে শুধুমাত্র একটাই কারণ ছিল, আমার ভালোবাসা।

গত এক বছরে আফজাল নিজেকে কষ্ট দিয়েও ভালোবাসার সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছে। সেজন্য মাঝে মাঝে ভেতরে ভেতরে মানসিক পীড়া অনুভব করলেও গর্বে আমার বুকটা ভরে আছে। জীবনের কাছে মানুষের চাওয়া তো খুব বেশি থাকে না—তবে ছোট ছোট কিছু চাওয়ার পাওয়াতে মানুষ জীবনের চেয়েও বড় সুখের স্পর্শ অনুভব করে। আজ আফজালের সাথে আমার দেখা করার কথা। ওর সাথে রাতে থাকার কথা। সঙ্কোচবোধ করব কি? আমাদের ভালোবাসার সম্পর্কটা দ্বিধা-সঙ্কোচের ঊর্ধ্বে চলে গেছে। যেন আয়না হয়ে গেছি আমরা একে অপরের। সেই ভালোবাসার দাবিতে আমাদের নিজেদের মধ্যে প্রতিজ্ঞার সময় এসেছে, জীবনভর কাছে থাকার প্রতিজ্ঞা। আমি সঠিক পথ চিনেছি—যাচ্ছি।


আফজাল তো নিশ্চয়ই আমাকে আজ শরীরী-সৌন্দর্য দিয়ে পেতে চাইবে।


মোটামুটি সুদর্শনা হয়ে সন্ধ্যার দিকে আফজালের রুমে চলে এলাম। গতকাল আফজাল খুব করে বলেছিল, মেসে আসতেই হবে—অন্তত এ কথাটা যেন না ফেলি। আমি পড়াশোনা করি আপার বাসায় থেকে। স্বাভাবিকতায় আপাকে মিথ্যে বলে আসতে হলো। পারুলের বাসায় থাকব। পড়াশোনার চাপ—গ্রুপ স্ট্যাডি না করলে চলবে কেন? কিছু প্রয়োজনীয় নোট দুজন মিলে একসাথে না করলেই যেন নয়। দুলাভাই বিদেশ থাকাতে আপার সম্মতির জন্য বেগ পেতে হয় নি। আপার সরল মন—আফজালের প্রতি আমার বিশ্বাসের মতো।

আফজালের বন্ধু রফিকও বাড়ি গেছে—মা অসুস্থ। নাকি আফজালের অসুস্থ চিন্তা? আফজাল তো নিশ্চয়ই আমাকে আজ শরীরী-সৌন্দর্য দিয়ে পেতে চাইবে। অবশ্য শারীরিক সম্পর্কে যেতে আমার ততটা অনীহা নেই, যতটা অনীহা আফজালকে দুঃখ দেওয়াতে। সন্ধ্যার এ সময়টাতে আমাদের বাড়ির অন্ধকার অন্যরকম। মেসের অন্ধকার কি বাড়ির অন্ধকার থেকে ভিন্ন? সন্ধ্যার পড়ন্ত অন্ধকারকেই কেমন প্রগাঢ় রাত মনে হচ্ছে। একি মনের ভুল? সঙ্গমের আবহ? পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়লে কি সঙ্গমের ইচ্ছা জেগে ওঠে মানুষের?

শরীরী অবয়বে আমাকে স্লিমই বলা চলে। তবুও আজকের এ পরিবেশে আমি কি অন্য এক আমি নই? বক্ষযুগল, ঠোঁট কিরকম ঔদ্ধত্য নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কটিদেশ, দু’উরু, মসৃণ পদযুগল নিয়েও যেন দ্বিধার পদক্ষেপ। এটা কি সঙ্গম পূর্ব-আতঙ্কে নারীর স্বাভাবিকতা! আজকের পর কি পেট কুমারী মেয়েদের মতো মসৃণ, পেলব আর সমতল থাকবে? দেহের প্রতিটি প্রকোষ্ঠ কেমন স্থির আর নিশ্চল হলে যাচ্ছে।

আফজাল কাছে এল। ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকালাম। আমার দেহকে লক্ষ করেই কি আফজালের চোখ স্বভাববিরুদ্ধ জ্বলে ওঠল? সঙ্গম-পূর্বমুহূর্তে পুরুষের চোখ জ্বলে ওঠলেও ভাষা নাকি আবেগী হয়। পরবর্তীতে দেহ জ্বলে ওঠে বিকৃত লালসায়। পরীক্ষা করে দেখব কি? ভাবতেই ক্ষুরধার অভিমান জেগে ওঠল দেহজুড়ে। আমার দেহের কোমনীয় আর নমনীয়তার রেশও কি চলে গেল?

আফজাল আমাকে হাত ধরে বিছানায় বসাল। এবার ভাষাহীন অস্পষ্ট মুগ্ধতা ওর চোখে। রুমের পরিবেশে মুগ্ধতা কোথায়? দক্ষিণের জানালা নেই—উত্তরের হাওয়াবিহীন খোলা জানালা। জানালার পাশে উচু-বিল্ডিংয়ের মজবুত দেয়াল। বাহির থেকে কোনো কৌতুহলী চোখ আমাদের দেখবে না—এটাও ভালো, নিরাপত্তার বিষয়টা সুন্দর পরিবেশের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আদতে রাত এখনও পরিপক্ব হয়ে ওঠে নি। জানালা দিয়ে চাঁদ দেখা যাচ্ছে না, হাওয়ার ঝাপটাও নেই। শাদা শাদা হালকা মেঘ কেমন পালিয়ে বেড়াচ্ছে আকাশ থেকে। মুগ্ধ হওয়ার মতো প্রকৃতি থেকে কিছুই পাচ্ছি না আমি। যদিও নিবিড় নীলাকাশ মনকে বিশালতার দিকে আহবান করছে।

—চা খাবে? তোমার জন্য চা করে নিয়ে আসব?

—তুমি চা বানাতে পার? নানান চিন্তার মাঝেও হাসি পেল আমার।

—মেস লাইফ যেমন আনন্দের তেমন কষ্টেরও। মাঝে মাঝে খালা (ঝি অর্থে) আসে না, তখন নিজেদেরকেই রান্না করে খেতে হয়। শরীর অসুস্থ থাকলে আপনজন কাছে না-থাকার যে শূন্যতা, মনে ভীষণ ব্যথা হয়ে কাজ করে। তবে স্বাধীনতাও অ্যানজয় করি। আজ যে তোমার সাথে সময় কাটাতে পারছি—সারারাত গল্প করব—সেটা কি বাড়িতে থাকলে সম্ভব হতো?

—আমরা কি সারারাত শুধুই গল্প করব? বলে, হাসি দিয়ে ফেললাম।

—কেন, তোমার কি গল্প করতে ভালো লাগে না?

—ভালো লাগে। খুব ভালো লাগে। তবে তাই হোক, আজ আমরা সারারাত শুধুই গল্প করব।


রাত যত গভীর হয় ভালোবাসাও যেন তত জীবন্ত হয়ে ওঠে।


২.
আফজাল অসম্ভব সুন্দর হাসি দিয়ে রান্না ঘরে চলে গেল। চা তৈরি করবে আমার জন্য। এরপর, শুধুই গল্প করবে? সারারাত! এই কি তবে আবেগী কথার সূত্রপাত? সম্মান দিয়ে কথা বলবে, সেবার প্রতিশ্রুতি দিবে, কামনার কথা মুখে নয়; দেহে প্রকাশ করবে! মানুষ কি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই অভিনয় করে, আমিও কি তাই করছি না?

চা পানের মধ্যে চোখের-ভাষায় কথার আদান-প্রদান হলো। নিছক ভালোবাসার কথা এখানে স্থান পেয়েছে। চা শেষ করে খুনসুটি শুরু হলো। আফজাল আবেগ সামলাতে না পেরে কোলে তুলে আমাকে খাটের ওপর শুইয়ে দিল। তারপর সামনে এগুতে চাইলে আমার পক্ষ থেকে কেমন বাঁধা চলে আসে। এটা কি সহজাত? নারী-ধর্মের প্রকৃতিগত বাঁধা? নাকি এ বাঁধায় মিশে আছে আমার ভাবনা, পরবর্তী জীবনের ছবি? আফজালের ইচ্ছায় সমর্পিত আমার আগামীর কথা। ভাবনায় কাজ করল নানাবিষয়। বিয়ের আগের এ মেলামেশা জানাজানি হলে কিভাবে নিজেকে সান্ত্বনা দেবো? আমার সমাজ, আমার পরিবার বিষয়টাকে কিভাবে নিবে? আমার ভাবিত-মুখচ্ছবি আফজালের মুখে গিয়ে পড়ল যেন। ও কি ব্যথিত? মুখের ভাষাতে ‍বিমুখ কেন? অপমানিত? দুজনের মিলিত বোঝাপড়ার এ সম্পর্কের বাঁধাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবছে কি?

শোয়া অবস্থাতেই আফজালের পিঠে প্রকৃত বন্ধুর মতো হাত রাখলাম।

—আমরা আগে খাওয়া-দাওয়া করি—তারপর তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই।

নীরব। আফজালের এ নীরবতা আমাকে কিছুটা হাসায়—কিছুটা ভাবায়ও বটে। খাওয়া-দাওয়ার সময়ও আফজালের দৃষ্টি ছিল আমার দিকে—পক্ষপাত। আমার প্লেটে মুরগীর রান, পাখা, কলিজা, মাথাসহ ভালো ভালো টুকরোগুলো শোভা পাচ্ছে। এই আতিথেয়তাকে নীলনকশার চাটুবৃত্তি ভাবলে নিজেকেই নীচ মনে হবে। আজ আমি ওর অতিথি এবং ভালো বন্ধু—বন্ধুর চেয়েও বেশিকিছু।

রাত গাঢ় হচ্ছে। হঠাৎ করেই প্রকৃতি রুদ্রমূর্তি। শুধু বৃষ্টি নয়, বজ্রপাত। আকাশ যেন জৈবিক তাড়নার ডাকছে। আজ কি সভ্যতার শেষ? নিচ্ছিদ্র আর গাঢ় কালো রাত্রি পাহাড়ের মতো দীর্ঘ, বৃহৎ আর দুর্লঙ্ঘ্য হয়ে ওঠল যেন। এর শেষ কোথায়? প্রকৃতির তাড়না তো ক্ষণস্থায়ী—আমার, আমাদের তাড়না? এ খাট কি আজ সাক্ষী রবে মৃত-সভ্যতার, অন্ধকারের, আমার, আমাদের?

আফজাল বিছানা পরিপাটি করে সাজাল।

ভূমিকা ছাড়াই বলল, আমার মনে হয় তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছ। শারীরিক তৃপ্তির চেয়ে বিশ্বাসের মর্যাদা আমার কাছে অনেক বেশি। তুমি চাও তো আমি নিচে বিছানা করে ঘুমাতে পারি।

এ কথার ভিত্তিতে আমার মনোভাব কী হওয়া উচিত? এ কি আফজালের ভেতরের কথা? নাকি বাহিরের ভদ্র-মুখোশ? কী ভাবছি এসব? নিশ্চয়ই আমার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে বলেছে।

—ছি ছি কী বলছ এসব? তোমার সাথে থাকার ইচ্ছে না-থাকলে কি এত প্রতিকূলতার মাঝে আমি বাড়ি থেকে মেসে চলে আসতে পারতাম?

—তোমার আচরণ দেখে মনে হচ্ছে আমি তোমাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করতে চাচ্ছি। তুমি হয়তো বুঝতে পারছ-না কিংবা বুঝতে চাইছ-না, আদতে তোমার দেহের মর্যাদা-রক্ষার দায়িত্ব তোমার চাইতে আমার বেশি। সেই তুমি আজ অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেহের পর্দা হয়তো সরাতে পারবে, মনের পর্দা সরাতে পারবে কি? বলতে পার, মনকে অখুশি রেখে দেহ কিভাবে ভালো থাকে? মানসিক তৃপ্তিও পাবে না।

—তুমি এসব কী বলছ?

—সত্যিটাই বলছি। মনের এ পর্দা তোমাকে যন্ত্রণা দিবে। সত্যি নয় কি, আমি তোমার দেহের পর্দা ছিড়ে ফেলতে পারব—কিন্তু মনের পর্দা কিভাবে ছিড়ব?

সত্যি অভিভূত হয়ে গেলাম। মনে অসৎ উদ্দেশ্য থাকলে এরকম আবেগঘন কথা কারো মুখ থেকে বের হয় কি?

—আফজাল, তোমার কাছে আমার দেহ-মনের কোনো পার্থক্য নেই। তবে তোমাকে কথা দিতে হবে—কোনোদিন, যে কোনো বিরূপ পরিস্থিতিতে তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না।

—কথা দিলাম। আমার জীবন থাকতে তোমাকে ছাড়তে পারব না।

অতঃপর আমরা স্বর্গীয় মূর্তি ধারণ করি। বুদ্ধি, চেতনা কিংবা বোধের স্তরে নয়—অন্য কোনো এক গহিনে, অচেতন স্তরে—মায়াময়, এ স্তরে অনুরণন তোলে আনন্দ, উচ্ছ্বাস, তৃপ্তি। রাত যত গভীর হয় ভালোবাসাও যেন তত জীবন্ত হয়ে ওঠে।


প্রতিবারই শেষবার বলে সূচনাসঙ্গমের মতো আচরণ করে।


৩.
আমার শরীরকে পরখ করে দেখার ইচ্ছা আফজালের একবারই ছিল। দেখল, চাখল অতঃপর কী বিমোহিত-ই-না হলো। নারীশরীরে কি চাহিদার অতিরিক্ত মুগ্ধতা কাজ করে? স্বাদ কি ভোলা যায় না? শরীরের মোহে কথা রাখল না আফজাল। প্রায়ই আহবান করতে লাগল আমাকে। (রফিকের মা-ও বারবার অসুস্থ হতে লাগল।) প্রতিবারই শেষবার বলে সূচনাসঙ্গমের মতো আচরণ করে। লক্ষ করি, তখন কিরকম বিহবলতায় ওর চোখ জ্বলে ওঠে। আমার লাবণ্যময় অঙ্গপ্রতঙ্গ, অন্ধকারে প্রচ্ছায়াময় সৌন্দর্য, মনোমুগ্ধকর হাসি ওকে উম্মাদের পর্যায়ে নিয়ে যায়।

আমারও যে ভালো লাগে না তা নয়—তবে দ্বিধাও কাজ করে, শঙ্কা পুরো শরীর জাপটে ধরে। দেহের নৈতিকতা তো কবেই গেছে—মন মাঝে মাঝে নৈতিক চিন্তায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এমনও ভাবনায় আসে, ও কি আমাকে ভালোবাসার নামে প্রতিবারই ধর্ষণ করে চলছে? তখন ভেতরে ভেতরে অনুশোচনা আর ক্রোধের একটা মিশ্র অনুভূতিতে অস্থির হয়ে যাই। সঙ্গমমুহূর্তে আফজালকে বিয়ের কথা বললে ও মৌন সম্মতি জানায়—আদরের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।

আফজাল সঙ্গম শেষে যুক্তি আনে। এতে অযৌক্তিক কিছু থাকে না আমিও জানি। ওর লেখাপড়া শেষ হতে এখনও তিন থেকে চার বছর বাকি। গ্রামের বাড়িতে বাবা-মা ও ছোট বোন থাকে। বোনকে বিয়ে না দিয়ে ওর পক্ষে বিয়ে করাও অসম্ভব। সংসারেও সেই অর্থে স্বচ্ছলতা নেই। বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকতা। হার্টের সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ভুগছেন।

মা গৃহিনী। আটপৌরে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত বিধায় টেনেটুনে সংসারনামক চাকাকে ধীরগতিতে টেনে নিচ্ছে। বড় ভাইয়ের স্ত্রী-নিয়ে আলাদা সংসার। বাবা-মাকে সাহায্য করার সামর্থ্য থাকলেও মানসিক শক্তির অভাবে সম্পর্ক ছিন্ন রেখেছে। স্বাভাবিকতায় আফজালের দিকেই সবার দৃষ্টি, আস্থা। এ যুক্তির স্বপক্ষে দাঁড়িয়ে, রাগ করে কি আমার পক্ষে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব? সম্পর্ক ছিন্ন করা সম্ভব?

আফজাল আর আমার পুরো বিষয়টা আফজালের পক্ষ থেকে রফিক ছাড়া আর কে কে জানে তা আমার জানা নেই। আমার পক্ষ থেকে পারুল জানে। পারুলকে আমি বিশ্বাস করি। পারুলের দেওয়া পরামর্শ আমাকে সতর্ক করে, সাহসে শক্তি দেয়। এসব স্পর্শকাতর বিষয় শুভাকাঙ্ক্ষিদের মধ্য হতে কারো কারো সাথে শেয়ার করতে হয়। পাপ-পুণ্য নিয়ে ভেতরে যে সংঘর্ষ চলে—তা কিছুটা হলেও দমিয়ে রাখা যায়। মানসিক শক্তি আসে—হারানো উদ্যম ফিরে পাওয়া যায়। নতুন করে আবিষ্কার করা যায় নিজের অস্তিত্বকে।

নিজেকে নতুন করে ফিরে পাবার শর্তেই কি আমি পারুলের সাথে দেখা করার ইচ্ছা মনস্থির করেছি? প্রশ্ন জাগে, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে নাকি সান্ত্বনা পেতে? অস্থির মানসিকতার এই ক্রান্তিলগ্নে সান্ত্বনাও বড় নিয়ামক হয়ে কাজ করে কখনো কখনো। আফজালকে বেশ কিছুদিন ফোনে না পাওয়াতেই হয়তো আমার এ অবস্থা। শেষবার বলেছিল, বাবার অসুখ—হার্ট অ্যাটাক। গ্রামের বাড়ি যেতে হবে। বিপদজনক কিছু হলে শহরে এনে চিকিৎসা করাতে হবে। গ্রামের বাড়ি যাবে ভালো কথা, তবে ফোন করবে না কেন? নেটওয়ার্ক-সমস্যা কি? যতই সমস্যা থাকুক, প্রতিকূল অবস্থা হোক—বাজারের দোকান থেকে ফোন করা কি উচিত ছিল-না? আগে যেমন করেছিল। আমি যে কিরকম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে আছি তা কি ও জানে, নাকি বুঝতে পারে?


আমার স্তনের বোঁটাও বড় হচ্ছে, কালচে দাগ পড়ে যাচ্ছে। কিসের আলামত দেখতে পাচ্ছি আমি?


ইদানীং কেন জানি আমার মেজাজ সবসময় খারাপ থাকে। সেদিন আপাও আমার মেজাজ দেখে বিস্মিত হয়েছিল। দুলাভাইয়ের সাথে ফোনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানানোর পরও আপা অনুরোধ করেছিল, জোর করেছিল। মেজাজ কি ঠিক রাখা যায়? শরীরও বেশ কিছুদিন ক্লান্ত আর অবসন্ন লাগতে শুরু করেছে। সারাক্ষণ ঘুম পাচ্ছে। খাবারে অরুচি। প্রস্রাবও হচ্ছে ঘনঘন। হঠাৎ-ই এসব লক্ষণ আমাকে ভাবাতে শুরু করল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার স্তনের বোঁটাও বড় হচ্ছে, কালচে দাগ পড়ে যাচ্ছে। কিসের আলামত দেখতে পাচ্ছি আমি? সান্ত্বনা বলতে, খাবারে অরুচি থাকা সত্ত্বেও বমি-ভাব খুব একটা আসে না। পিরিয়ডকেই আমি যতনষ্টের মূল হিশেবে ধরব। নারী হয়ে ওঠার গল্পে আমার-পিরিয়ড সবসময়ই অনিয়মিত। সাড়ে তিন, চার মাস পর পর হয়ে থাকে। অনেকবার ডাক্তার দেখানোর পরও এর সুফল খুব একটা পাই নি।

পারুলের সাথে দেখা হতেই সবকিছু খুলে বললাম। কিরকম-ভয় চোখে ও আমার দিকে তাকাল। কথাতেও কি উদ্বেগ প্রকাশ পেল?

—মৌনতা, তুই আফজাল ভাইয়ের সাথে কথা বল। বিষয়গুলো ভাবনারই বটে। কি হবে তোর এখন!

আমি কাঁদতে পারি নি—এ কান্না নারীর অপমান। আফজাল তো আমার সাথেই আছে, থাকবে—তবে আর ভাবনা কী।

৪.
যদিও নিজেকে সান্ত্বনা দেই, তবুও ভাবনাগুলো ভেতরে ভেতরে ঠিক কাজ করে। সাথে সাথে আফজালের বন্ধু রফিক ভাইকে ফোন দিলাম। ধরলও বটে। আফজালের কথা জিজ্ঞেস করতেই বলল, ও তো আজ সকালে এসেছে। দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়েছে। আমি কি ডেকে দেবো?

আমি হ্যাঁ, না কিছুই বলতে পারলাম না। প্রতি-উত্তরের ভদ্রতাও রক্ষা হলো না। ফোন কেটে দিলাম। অভিমান, রাগ একাকার হয়ে আফজালের প্রতি ঘৃণার জন্ম দিলো। কার কাছ থেকে চুক্তিবদ্ধ প্রেমের পাঠ নিলাম? কার বুকে বিশ্বাস জমা রাখলাম? সকালে ঢাকায় আসলো অথচ আমায় ফোন করল না? কী করে সম্ভব এরকম অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ সহ্য করা।

পারুলকে বিদায় দিয়ে বাড়ি নয়, বরং আফজালের মেসের উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম। আমি এখন জ্ঞানে হিতাহিতশূন্য, আচরণে আগ্রাসী। পথের ধুলোমেখে, একরাশ ক্লান্তি নিয়ে সরাসরি মেসে ওঠলাম। আবারও রফিক ভাই। এবারও কথার সূচনায় গেলাম না। আমার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে উনি কি সব বুঝে ফেললেন? বিনা বাক্যব্যয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন।

আফজালের ঘুমন্ত চোখে বিষণ্নতার ছায়া। মায়া হলো। কতদিন পর দেখা ‍নির্মল মুখচ্ছবি। সৌন্দর্য-দর্শনে আমার রাগ কি চলে যাচ্ছে? নিজেকে ফিরিয়ে আনলাম—এখন দেহের সৌন্দর্য নয়, মনের সৌন্দর্যের প্রতি জোর দেওয়া দরকার। আফজাল চোখ মেলে তাকাল আমার দিকে। বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। অনুভূতিতে শূন্যদৃষ্টি। উচ্ছ্বাস নেই—কেমন যেন ঘোর উদাসিনতা। ওঠে বসল। হাত নেড়ে আমাকেও বসতে বলল। ওর চোখের কোণ ছলছল করছে কেন? কেঁদেছে কি?

বললাম, কি হয়েছে তোমার? কোনো যোগাযোগ নেই। ফোন বন্ধ। আজ এসেও ফোন দিলে না কেন?

—ফোনটা হারিয়ে ফেলেছি। তোমার নাম্বারটা ভুলে গেছি। বাবা মারা গেছে আজ পাঁচদিন। চারদিনের প্রোগ্রাম শেষ করে আজ সকালে রওয়ানা দিলাম।

বুকের ভেতরটা কি নড়ে ওঠল? কান্না চলে আসবে কি? সেই স্কুল জীবন থেকে অন্যের দুঃখে আমার চোখে জল এসে যায়। বাংলা সিনেমার শাবানা ম্যাডামই আমায় কত কাঁদিয়েছে। আজ নিজেকে সামলে নিলাম। সময়ের সাথে সাথে ভেতরে কিছুটা হলেও পরিপক্বতা এসেছে নিঃসন্দেহে। নানান চিন্তা আর শঙ্কার ভেতর দিয়ে হেঁটে মানসিক শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো। আফজালের মাথায় হাত রাখলাম। এই অব্যক্ত সান্ত্বনার মাঝেই হাজার সমব্যথির পরশ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কী করে বলব আমার সমস্যার কথা। বলা যায় কি?

আফজালই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, তোমাকে কেমন অস্থির মনে হচ্ছে, কোনো সমস্যা?

ভাবার সময় পেলাম না। সরাসরিই বলে ফেললাম, আমার গর্ভে সন্তান।


এ সন্তানের আগমন অনাকাঙ্ক্ষিত


একটা প্রাণ চলে যাওয়াতে আফজার ব্যথিত ছিল। আরেকটা প্রাণ চলে আসাতে উদ্বিগ্ন হলো। ভাষাহীন ‍উদ্বিগ্নতা। নিস্তব্ধতা!

অতঃপর কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর অবাক করে দিয়ে আফজাল আমাকেই বুকে টেনে নিল। সান্ত্বনায়, ভালোবাসায় মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি তো আছি, তাই না? তুমি কিছু চিন্তা কর না।

—চিন্তা নেই বলছ?

—চিন্তা আছে। আমরা তো নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারি নি। বাবাও হঠাৎ মারা গেল। এ বিষয়টা এখন জানাজানি হলে দুজনেই সমস্যায় পড়ে যাব।

—তবে কী করতে বলছ?

—অ্যাবরশন করে ফেল। পারুলকে সাথে নিয়ে কালই চলে যাও। আমি একটা ক্লিনিকের ঠিকানা লিখে দিচ্ছি।

বিদায় নিলাম। সাবলীল ভঙ্গিতে। হাসি দিয়ে। সম্মতি জানিয়ে।

আমার ভেতরে কিছুটা আস্থা ফিরে এল। ভালোবাসার মানুষ তো পাশেই আছে। চোখে এখন আলোর জ্যোতি। অন্ধকার যা ছিল তা তো ভেতরেই—কুঁড়ে  কুঁড়ে খাচ্ছিল আমাকে। এখন পৃথিবীটা আবারও রঙিন হয়ে ওঠল। বাঁচতে ইচ্ছে করছে বহুদিন। আকাঙ্ক্ষা সাথে নিয়ে—জীবন গুছিয়ে। ভালোয় ভালোয় অ্যাবরশনটা হয়ে গেলেই হলো।

পারুলকে নিয়ে ক্লিনিকে গেলাম। পরীক্ষা করলাম। ডাক্তার ম্যাডাম আমার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে চেয়ে আছে কি? যদিও মুখে হাসি ছিল।

পরদিন রিপোর্ট পেয়ে আবারও ডাক্তার ম্যাডামের সাথে দেখা করলাম। উনি রিপোর্টটা দেখলেন অল্প সময়, তবে বেশ কিছুক্ষণ কেন যেন আমার দিকে চেয়ে রইলেন। পারুল আর আমি একে অপরের দিকে তাকালাম। আমরা অপ্রস্তুত। বিশেষ করে আমি। এরকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি তো এবারই প্রথম।

—আপনার পিরিয়ড হতো কতদিন পরপর?
অনাকাঙ্ক্ষিত আর অযাচিত প্রশ্ন ছুড়ে দিল কি? নাকি গুরুত্বপূর্ণ? আবারও অপ্রস্তুত হয়ে রইলাম।

—সাড়ে তিনমাস থেকে চারমাস পর পর।

—বাচ্চা নষ্ট করবেন কেন?

—আমাদের বিয়ে হয় নি। সম্পর্কের কথাও পরিবারের কেউ জানে না।

—আপনার গর্ভের সন্তান তো পাঁচমাসের। একটা প্রাণকে কি হত্যা করবেন?

৫.
মা, মা, আমাকে মেরো না। আমি তোমার বাদশা হবো। দিগ্বিজয়ী যোদ্ধা হবো।
মা, তুমি কি ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলে? আমাকে মেরে ফেলতে চাও? আমি তো এখন পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে গেছি। তোমার ছেলে। জানো মা, আমার কী যে দুঃখ, বাহিরে আসতে পারছি না বলে। তোমাকে দেখতে পারছি না। তুমি কি খুব সুন্দর? মায়ের মতোই? জানো, এখন আমি আঙুল চুষতে পারি। একা একা খেলতেও পারি। তোমার কথা শুনতে পারি। তুমি কি সত্যি আমাকে মেরে ফেলবে, মা? জীবন-ঘাতক নল ঢুকিয়ে আমাকে ক্ষত-বিক্ষত করতে পারবে? সত্যি, তোমার বুক কি একটুও কাঁপবে না? বল না, আমি কি পৃথিবীর আলো দেখব না? আমার হাসি তুমি থামিয়ে দিতে পারবে? আমরা হৃৎস্পন্দন?

চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে জেগে ওঠলাম। ভেতরে অস্থিরতা, আতঙ্ক। শরীর ঘামে জবজব করছে—রীতিমত কাঁপছে। ভাবনাগুলো কী নির্মমভাবেই-না স্বপ্নে এসে ধরা দিল। আমি সবসময়ই প্রথম সন্তান হিশেবে, প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ হিশেবে ছেলে সন্তানকেই চেয়েছি। যদিও এ সন্তানের আগমন অনাকাঙ্ক্ষিত—শারীরিক কিছু ত্রুটি কিংবা অসাবধানতার কারণে। যেভাবেই আসুক এখন তো ও আমার সন্তান। কী করে আমি ওকে হত্যা করতে পারি?

ডাক্তার ম্যাডাম বলেছে, ও এখন একটা পরিপূর্ণ প্রাণ। এক ধরনের লম্বা নল ঢুকিয়ে প্রথমে ওকে ক্ষত-বিক্ষত করে তারপর হত্যা করতে হবে। পরে ভ্যাকুয়াম সাকারের মাধ্যমে শিশুর অস্তিত্বকে শুষে আনতে হবে। কথাগুলো শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠল। মানসিক অবস্থা দেখে ডাক্তার ম্যাডাম আমাকে বিদায় দিলেন। ভালোভাবে চিন্তা-ভাবনা করে দুদিন পর আসতে বললেন।

যত ভাবি ততই শিশুটির অব্যক্ত বেদনা আমাকে ব্যথিত করে। আবারও চিৎকার দিয়ে ওঠলাম। এ নির্মমতা, পশুসুলভ আচরণ আমি কিভাবে করব? আমার মা কি পারত আমার সাথে এরকম আচরণ করতে?

পাশের রুম থেকে আপা চলে আসলো। আপাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলাম। আরেকটা নিষ্পাপ প্রাণের পরশ পেতে। ওর মন আমাদের মতো পাষাণ না—মায়া-মমতা আছে, মনুষ্যত্ব আছে। আপা আরো জোরে আমাকে ওর গায়ের সাথে মিশিয়ে ফেলল। দু’ফোঁটা অশ্রুও ফেলল কি?

—কী হয়েছে তোর? ভয় পেয়েছিস? আমাকে বল কী হয়েছে।

—আপা, মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে রে।


শরীরের সাথে শরীরের সম্পর্ক ছাড়া সবটাই মিথ্যা ছিল নিশ্চিত।


৬.
আমার জীবনটা কি অন্যরকম হতে পারত না? বর্তমান মেয়েরা যেভাবে জীবন উপভোগ করে। যদি বাবা-মায়ের সাথে থাকতে পারতাম, মায়ের শেখানো পথে চলতে পারতাম। আমি কেন মায়ের ভালোবাসা বেশিদিন পাই নি? অদৃষ্ট? মৃত্যুতে না-হয় মায়ের হাত ছিল না। কিন্তু বাবার ভালোবাসা! বাবা কেন অবহেলা করল? দ্বিতীয় বিয়ে করে আমাদের দূরে ঠেলে দিল। দুঃখের জীবন বলেই কি প্রেম, ভালোবাসা, প্রিয়জন—এ শব্দগুলো আমার কাছে আকাঙ্ক্ষিত ছিল? আফজালকে কাছে পেয়ে এই শব্দগুলোর স্বাদ পেলাম। স্বাদে, গন্ধে, তৃপ্তিতে জীবন প্রশান্তিতে ভরে ওঠল। এরকমটাই তো ভাবনায় ছিল, কিন্তু হলো কি? মানুষ ভালোবাসার দাবিতে মিলিত হয়। উপহার স্বরূপ, ফুটফুটে সন্তান আসে কোলজুড়ে। পৃথিবী আলোকিত হয়। পরিবার-পরিজনদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস-বাক্যধ্বণিতে ঘর মুখরিত হয়ে ওঠে।

আর আমাকে নাকি সমাজের ভয়ে নিজের সন্তানকে হত্যা করতে হবে। এ হত্যায় কোনো হাজতবাস নেই, মৃত্যুদণ্ড নেই। সমাজ বলে, এ হত্যাকাণ্ডে অনুশোচনা আছে। প্রায়শ্চিত্তের পথ আছে।

প্রায়শ্চিত্ত! এ নির্মমতার কি প্রায়শ্চিত্ত হয়?

ফ্রেস হয়ে বের হলাম। মেসের পথে—আফজালের উদ্দেশে। আজ আফজাল একা। নাস্তা করে ফেলছে। আমাকে অফার করে বলল, নাস্তা তো করবে? বাহিরে চল। আমার বরাদ্দ নাস্তা শেষ করে ফেলছি।

 —আমি নাস্তা করতে আসি নি। তোমাকে নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসতে চাচ্ছি—সে জন্যেই আসা।

—কিসের সিদ্ধান্ত? আজ-না তোমার অ্যাবরশন করার কথা?

—আমি অ্যাবরশন করব না।

—অ্যাবরশন করবে-না? তবে সমাজে মুখ দেখাবে কিভাবে?

—আমরা বিয়ে করব।

—বিয়ে করবে? পাগল হয়ে গেছ তুমি। এ অবস্থায় কিভাবে সম্ভব বিয়ে করা। অবুঝের মতো কথা বলো না।

—একবার তো বলেছি আমার পক্ষে অ্যাবরশন করা সম্ভব না। আমাদের সন্তানের বয়স পাঁচ মাস। আমি ওকে খুন করতে পারব না।

—পাঁচ মাস? পাঁচ মাস হলো কিভাবে? তুমি আগে টের পাও নি?

—না বুঝতে পারি নি। আমার পিরিয়ড তো সাড়ে তিন থেকে চার মাস পর পর হয়।

—তারপরও। তোমার কথা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তুমি কি আমায় ঝামেলায় ফেলতে চাচ্ছ?

বুঝতে পারলাম না আফজাল কি সামান্য উত্তেজিত? আমার মেজাজটাও হঠাৎ চড়ে গেল। বললাম, লজ্জা করল না তোমার এ কথা বলতে? আমি কি তোমায় জোর করেছিলাম শারীরিক সম্পর্ক করতে? বেঈমান কোথাকার।

—গালাগাল দিবে না বলে দিচ্ছি। এ সম্পর্ক তোমার সম্মতি ছাড়াও হয় নি।

—হ্যাঁ, আমি সম্মতি দিয়েছি। তুমিও কথা দিয়েছিলে যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতিতে আমার পাশে থাকবে। তবে আজ কথা রাখছ-না কেন?

—আমি তো তোমার পাশেই থাকব। শুধু অ্যাবরশনটা করে ফেল।

—কতবার বলব তোমায়, আমি অ্যাবরশন করতে পারব না। আপন সন্তান-ঘাতিনী হবো ভাবছ কিভাবে?

তাহলে আমার কিছু করার নাই। ছোট বোনের আগে আমি বিয়ে করতে পারব না। মা শুনলে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করবে। অনাগত, অপরিচিত একটা প্রাণের জন্য আমি আমার মাকে হারাতে পারব না।

—আমাদের সম্পর্কটা শুধু ফূর্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল? এ সম্পর্কের কোনো স্বীকৃতি নেই?

—মৌনতা, তুমি মেস থেকে চলে যাও। এসব কথা কে কখন শুনে ফেলবে তার ঠিক নেই। যদি অ্যাবরশন করতে পার তবে যোগাযোগ রেখ। অন্যথায় আমার কোনো দায়-দায়িত্ব নেই।

কী শুনলাম আমি? এই কি ছিল ভালোবাসার উপহার? আস্থা, বিশ্বাস, নির্ভরশীলতায় দাঁড়িয়ে যে ভিত গড়েছিলাম বুকের পাঁজর জুড়ে—তা তো দেখছি এক নিমেষেই ভেঙে পড়ল। কিন্তু গড়তে সময় লেগেছিল কতদিন তা বলতে পারবে আফজাল পরখ করে? এই ভালোবাসাতে কতদিনের আনন্দ, কত রাতের স্বপ্ন, রাত জেগে থাকা ভাবনা, প্রিয়জনের জন্য প্রার্থনা, সম্পর্কের সৌন্দর্য রক্ষার্থে ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা—এ সব কি কাজ করে নি দিনের পর দিন? এখন কি সবই অস্বীকার করবে? বন্ধুত্ব! বন্ধুর থেকেও বেশিকিছু—এ সবই কি মিথ্যা? মিথ্যা স্বপ্নের বুনন! ভালোবাসা মিথ্যা ছিল? আবেগঘন মুহূর্ত মিথ্যা ছিল? বুঝতে পারলাম, শরীরের সাথে শরীরের সম্পর্ক ছাড়া সবটাই মিথ্যা ছিল নিশ্চিত।


দিনের পর দিন আমার নারীত্বকে উলঙ্গ করেছিল।


আমি প্রতিবাদ করার শক্তি হারিয়ে ফেলছি। বিচার চাইব এই নিকৃষ্ট আচরণের—এরকম মনোবৃত্তিও আমার মধ্যে কাজ করছে না। ঘৃণা হচ্ছে ওর প্রতি। দুর্গন্ধ টের পাচ্ছি ওর শরীর থেকে। বমি আসতে চাইছে—আমার গর্ভের সন্তান প্রাথমিক অবস্থায় থাকাকালীন যে সমস্যা হয়েছিল, তাতে বমি আসা অস্বাভাবিক ছিল না, কিন্তু বমি আসে নি—আর আজ যে বমি থামতে চাইছে না। আমি বাথরুমে যেয়ে বমি করে ফেললাম। নোংরা শরীর যে আমায় স্পর্শ করেছিল। দিনের পর দিন আমার নারীত্বকে উলঙ্গ করেছিল।

সম্মতি-অসম্মতির ধূম্রজালে চার দেয়ালের মধ্যেও কিছু নির্মম ধর্ষণকাণ্ড রয়েছে বন্দি। মানুষ তার কতটুকু খোঁজ নিচ্ছে? মানবিক-মন ভাবতে পারে কি কতো নির্মম তার দহন!

চলে যেতে হবে এ নরক-কুণ্ড থেকে। এ খাটে শুয়েই তো আমি এক একদিন সভ্যতাকে নগ্ন করেছিলাম। আজ সেই খাট যেন আমায় দেখে হাসছে। রক্ত-মাংসের শয়তানটাও হয়তো হাসছে ভেতরে ভেতরে। ও তো মানুষ না। মানুষ হলে শুধু নিজের ভালোটা বুঝতে শিখত না। দায়িত্ববোধ থাকত, দায়বহনে অঙ্গীকার থাকত। আমার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, মানুষ নামের অমানুষের সাথে যৌক্তিক আলোচনা বৃথা। তবুও যাবার আগে একটা কথা বলে যেতে খুব ইচ্ছে হলো।

ওর মুখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বললাম, ভেব-না আমি আত্মহত্যা করব। আমার সন্তানের জন্যই আমাকে বাঁচতে হবে। তবে আমার সন্তানকে পুরুষ হিশেবে গড়ে তুলব, পশু নয়। আর সবসময় শেখাব, যার সাহায্যে তোমাকে পৃথিবীতে এনেছি সেই তোমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। যারা জন্ম দিয়েও জন্মদাতা হয় না, হয় ধর্ষক।

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৮৪, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।

কবি ও কথাসাহিত্যিক।

মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর।

পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই :
সমাপ্তির যতিচিহ্ন [উপন্যাস, ইমন প্রকাশনা, ২০১৩]

ই-মেইল : joychironton@gmail.com

Latest posts by মহ্‌সীন চৌধুরী জয় (see all)