হোম গদ্য দেশহীন জাতির কথা

দেশহীন জাতির কথা

দেশহীন জাতির কথা
178
0

একজন আকইবিবির কথা


নাফ নদীর তীরবর্তী এলাকায় শীত তখনো জেঁকে বসে নি। টেকনাফের মোচুনি গ্রামের নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরের পশ্চিমের পাহাড়ের ঢালে কাশগুলো বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। মোচুনি পাহাড় থেকে নামবার সময় মাঝবয়সী এক রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে দেখা। নাম তার আকইবিবি। গায়ে রংজ্বলা কালো বোরখা। বয়স বড়জোর চল্লিশ। কিন্তু জীবন এমনই কঠিন, যার ছাপ মেরে দিয়েছে তার সর্বাঙ্গে। খাদেপড়া দুই চোখ, ভাঙা চোয়াল, হাড়জিরজিরে রোগজীর্ণ আকইবিবিকে দেখলে মনে হয় বয়স ষাটেরও বেশি। তার ছেলে ইলিয়াস পাহাড়ে গেছে লাকড়ি কেটে আনতে, আর সে পাদদেশে বসে ছেলের ফেরার অপেক্ষায়।

উঁচু পাহাড়ে উঠার কারণে কিছুটা পরিশ্রান্ত ছিলাম। বিশ্রামের জন্য তার পাশে বসি। পরিচয়ের একপর্যায়ে সে তার জীবনযন্ত্রণার নানা কথা বলতে লাগল। জানাল, তার বাড়ি ছিল আরাকানের বুচিদং জেলার কাদিব্রুং গ্রামে। কিয়ৎ এলাকায় সরকার পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করবে। মাটি কাটার জন্য শ্রমিক দরকার। বিনা মজুরির জবরদস্তিমূলক শ্রম আদায়ের জন্য বিয়ের মাত্র দেড় বছরের মাথায় তার স্বামীকে মায়ানমারের মিলিটারিরা জোর করে ধরে নিয়ে যায়। আকইবিবি ভেবেছিল আবার ফিরে আসবে স্বামী। কিন্তু ফিরে আর আসে নি। কিছুদিন পর খবর পাওয়া গেল সীমাহীন পরিশ্রমে মারা গেছে স্বামী।

তখন ইলিয়াসের বয়স আট কি নয়। একদিন মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকা সদস্যরা তাকে বাড়িঘর থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে নাইক্ষংছড়ি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। আকইবিবি রুখে দাঁড়িয়েছিল। বলেছিল, ‘আঁই আর বসতভিটা ছাড়িয়েরে ন যাইয়্যুম’। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে এক নাসাকা জোয়ান তার তলপেটে প্রচণ্ড লাথি মারল। সন্তানের সামনে চিৎ হয়ে পড়ে গেল সে। শেষমেশ বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হলো। সেই থেকে এই নয়াপাড়া ক্যাম্পে ছেলেকে নিয়ে আছে। বহু চেষ্টা করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক দপ্তর ইউএনএইচসিআর-এর তালিকায় নাম উঠাতে, কিন্তু পারে নি। তাই সরকারি-বেসরকারি কোনো সাহয্য-সহযোগিতা পায় না। ইলিয়াস পাহাড় থেকে দিনে এক আঁটি লাকড়ি কেটে আনে, ৪০-৫০ টাকা দামে তা বিক্রি করে, সেই টাকা দিয়ে চলে দুজনের সংসার।

ফেরার সময় করুণাবশত আকইবিবির হাতে বিশ টাকার একটি নোট দিই। নোটটি হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল সে। খেয়াল করি, তিরতির করে কাঁপছে তার ঠোঁট আর থুতনি। তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। জানতে চাইলাম, ‘কাঁদছেন কেন?’ বললেন, ‘বা-জী, ছ মাসের বুতুরে আঁই এক্কই ওঁয়ারে বিশ টেঁয়া ন দেইক্কি।’ মানে, ছয় মাসের মধ্যে সে একসঙ্গে বিশ টাকা দেখে নি। আমি ভাবি, এও কি সম্ভব? ভাবতে ভাবতে ঢুকে পড়ি নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে।


এক দণ্ড শান্তির আশায়


পরবর্তী অভিজ্ঞতা আরো বিচিত্র। আবিষ্কার করি আকইবিবির মতো দেশহীন, ভিটেমাটিহীন, উদ্বাস্তু, উন্মূল অসংখ্য মানুষকে। দেখি তারই মতো নিরন্ন, রোগশোকগ্রস্ত অসহায় হাজারো মানুষের জীবনযাপন চিত্র। তেরপলের ছাউনি আর বাঁশের বেড়ায় ঘেরা সারি সারি ঝুপড়ি। ঘিনঘিনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। একেকটি ডেরায় ঠাসাঠাসি করে দশ-বারো জন মানুষের বসবাস। ছেঁড়াফাড়া থামি পরা নারী, রোগজীর্ণ পুুরুষ  আর রোগাপটকা ছেলেমেয়েরা দাওয়ায় বসে আছে। তাদের চোখেমুখে সীমাহীন ঔদাসীন্য।

কথা হয় নানা জনের সঙ্গে। বুড়ো নূরনেয়াজ রাস্তার ধারে কিছু কাঁচা কলা নিয়ে বসে আছে বিক্রির আশায়। তার কাছে জানতে চাইলাম, কেন রোহিঙ্গারা দলে দলে এই দেশে পাড়ি দিচ্ছে। জানাল, আরাকানে মগ-রাখাইনগোষ্ঠীর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য রোহিঙ্গাদের ওপর চলছে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। বিটিএফ, ইউএমপি, শিউ কাই, নাগাজিন, মাইয়াট মন, সেব, নাগামিন নামের অপারেশন পরিচালিত হয় তাদের উৎখাত করতে। পূর্বপুরুষের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করে প্রত্যাবাসন করা হয় মগ-রাখাইনদের। জবরদস্তিমূলক শ্রমদানে বাধ্য করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে তাদের যাতায়াতে, বন্ধ করা হয় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, রাতের আঁধারে পুড়িয়ে দেয়া হয় তাদের ঘর। চলে লুণ্ঠন, অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যা এবং গুঁড়িয়ে দেয়া হয় তাদের উপাসনালয়গুলো। বুড়ো বলল, ‘এত জোরজুলুম কি কোনো মানুষ বরদাস্ত করতে পারে, কন?’

সহ্য করতে না পেরে এক দণ্ড শান্তির আশায় এক বুক স্বপ্ন নিয়ে সেই চল্লিশের দশক থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জন্মভূমি আরাকান ছেড়ে চলে আসতে থাকে বাংলাদেশে। এখনো সেই আসা অব্যাহত রয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, আলীকদম, ঘুনধুম, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্তের প্রায় ৫২টি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিনিয়ত তারা আসছে। বিজিবি’র টহল থাকা সত্ত্বেও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ১৮২ কিলোমিটার জল ও স্থলসীমানা দিয়ে ঢুকে পড়ছে তারা। সীমান্ত পয়েন্টগুলো নিয়ন্ত্রণ করে এক শ্রেণির দালাল। স্থানীয়ভাবে তাদেরকে বলা হয় ঘাটের মালিক। কথা হয় শাহপরী পয়েন্টের সৈয়দ আলম নামের এক ঘাটমালিকের সঙ্গে। সে জানায়, ঘাটমালিকরা জনপ্রতি ৫শ থেকে ৭শ টাকা নিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকতে সাহায্য করছে। একেকটা ঘাটে ১৫/২০ জন মিলে একেকটি সিন্ডিকেট গঠন করা হয়েছে। মিয়ানমারের সংঘবদ্ধ চক্র এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী ‘নাসাকা’র সহায়তায় রোহিঙ্গাদের এ দেশে আসতে সহযোগিতা করছে তারা। কখনো কখনো বিজিবির হাতে অনেকে আটক হয়। কিন্তু এ সীমান্ত দিয়ে তাদেরকে পুশব্যাক করা হলে অপর সীমান্ত দিয়ে নাসাকা বাহিনী তাদের পুশইন করিয়ে দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিবির হ্নীলা সীমান্ত ফাঁড়ির এক কর্মকর্তা জানান, বিজিবির জনবল সংকট। ফলে রোহিঙ্গাদের এই অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। এছাড়া দুর্গম এলাকাগুলোতে সবসময় বিজিবি’র জোয়ানরা টহলে থাকে না। এই সুযোগ কাজে লাগায় রোহিঙ্গারা।


রাঙ্গামাটি থেকে টেকনাফ


বাংলাদেশের মতো একটি স্বল্পোন্নত ও জনবহুল রাষ্ট্রের পক্ষে শরণার্থী রোহিঙ্গাদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। তদুপরি আর্তমানবতার সেবায় নব্বইয়ের দশকে স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিরূপণ করে মায়ানমারে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত খাদ্য ও সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে। বসবাসের জন্য নির্মাণ করে শরণার্থীশিবির। কক্সবাজারের রামু উপজেলার ধুয়াপালং, ধেচুয়াপালং, উখিয়ার মরিচ্যাপালং, হলুদিয়াপালং, জুমাপাড়া, কুতুপালং, বালুখালি, টেকনাফের শৈলারচেবা, হ্নীলা, উইকং, খুনয়াপালং, হরিখোলা, নয়াপাড়া, দমদমিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ির গুনধুম, আদর্শগ্রাম, রংগীখালীর ২০টি ক্যাম্পে মোট আড়াই লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়।

রোহিঙ্গা বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা ‘সেড’ সূত্র জানায়, আড়াই লাখ থেকে বাড়তে বাড়তে বর্তমানে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা সাড়ে ছয় লাখে গিয়ে ঠেকেছে। রাঙ্গামাটি থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত এলাকায় বৈধ ও অবৈধভাবে এরা বসবাস করছে। উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-ইনচার্জ জানান, এই ক্যাম্পে ২০ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে। মোট তিনটি পাহাড়ে এদের বসবাস। কিন্তু আশপাশে যেসব পাহাড় রয়েছে এখন সেগুলোও খালি নেই। ভরে উঠেছে অবৈধভাবে বসত করা রোহিঙ্গাদের ঝুপড়ি-ঝাপড়িতে। কুতুপালং ক্যাম্পের বসিন্দা জয়নাল আবেদীন জানান, এই ক্যাম্পের আশপাশে বর্তমানে ৬০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

ইউএনএইচসিআর-এর হিসাব মতে, টেকনাফের নয়াপাড়া-১ ও নয়াপাড়া-২ ক্যাম্পে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে সাড়ে ১৭ হাজার এবং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে প্রায় ৪ হাজার। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে বাস্তবচিত্র ভিন্ন দেখা গেল। নয়াপাড়া ক্যাম্পের শরণার্থী মাওলানা ইউসুফ হোসেন জানান, বর্তমানে নয়াপাড়া ক্যাম্পে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি। একই অবস্থা বিরাজ করছে সবকটি শরণার্থী শিবিরে, নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের চেয়ে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা অন্তত দশ গুণ।

ইউএনএইচসিআর সূত্রে জানা যায়, গত ছ’ বছর ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ প্রত্যাবাসন কার্যক্রম কবে চালু হবে তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারছেন না। এ সুযোগে শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থান নেওয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন লোকালয়ে মিশে যাচ্ছে। জমি কিনে বাড়িঘর নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্কুলে লেখাপড়াসহ সব চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশি নাগরিকদের মতো। কেউ কেউ দরিদ্র বাঙালি মেয়েদের বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসত করার উপায় বের করে নিচ্ছে। রাঙ্গামাটি থেকে টেকনাফ পর্যন্ত অন্তত ত্রিশ হাজার রোহিঙ্গা বাঙালিদের সঙ্গে মিশে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছে।


দেশ থেকে দেশান্তরে


বাংলাদেশে সুবিধা করতে না পেরে রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ পাড়ি দিচ্ছে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ নানা দেশে। তারা মূলত বাঙালি হিশেবে নিজেদেরকে পরিচয় দিয়ে এসব দেশে যাচ্ছে। স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যানদের সহযোগিতায় অনেক রোহিঙ্গা ভোটার তালিকায় নিজেদেরকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়, তারপর পাসপোর্ট তৈরি করে অনায়াসে বিদেশ চলে যায়। কেউ কেউ ওমরা হজের উসিলায় সৌদি আরব গিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। অপরদিকে, যারা জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে পারে না তারা জাল পাসপোর্ট তৈরি করে বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছে। জাল পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে মায়ানমার ও বাংলাদেশের কিছু এজেন্সি সহায়তা করছে। মাঝেমধ্যে এসব জাল পাসপোর্ট তৈরি চক্র পুলিশের হাতে আটকও হয়। তবু তাদের তৎপরতা বন্ধ নেই। এ কাজে স্থানীয় একজন এমপিও জড়িত রয়েছেন বলে টেকনাফের স্থানীয় বাঙালিরা জানায়। বছর দুয়েক আগে বারোজন রোহিঙ্গাকে নাগরিকত্ব সনদ দেয়ার অপরাধে তার বিরুদ্ধে থানায় তিনটি মামলাও হয়েছিল।

অবৈধ পাসপোর্ট নিয়ে যাওয়ার ফলে বর্তমানে সৌদি আরবের জেলখানায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা আটক রয়েছে। আইয়ুব আহমেদ দুলাল নামের একজন সৌদি প্রবাসী লেখক অভিযোগ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিজেদেরকে বাঙালি পরিচয় দিয়ে রোহিঙ্গারা বৈধ ও অবৈধভাবে বসবাস করছে। তাদের নানা কর্মকাণ্ডে বিতর্কিত হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

অপরদিকে, অনেক রোহিঙ্গা ট্রলারে করে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া পাড়ি জমাচ্ছে। মহেশখালির কুতুবজোম, ঘাটভাঙা, সিপাহিরপাড়া থেকে এরা ট্রলারে ওঠে। কেউ হয়তো যেতে পারে, কেউ-বা সমুদ্রে ডুবে মরে, কেউ-বা আটক হয় পুলিশ বা কোস্টগার্ডের হাতে। জানা যায়, বর্তমানে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার কারাগারে অন্তত সাড়ে ৭শ রোহিঙ্গা আটক রয়েছে। এর আগে যারা আটক হয়েছিল তাদেরকে ইউএনএইচসিআর-এর মাধ্যমে ফেরত আনা হয়। বর্তমানে তারা বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে এই সংস্থাটির তত্ত্বাবধানে রয়েছে। বাকি আটককৃতদের ফিরিয়ে আনবার জন্য প্রক্রিয়া শুরু করেছে সংস্থাটি। এত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও থেমে নেই বিদেশ যাত্রা। শান্তির অন্বেষায় দেশ থেকে দেশে ছুটে চলছে রোহিঙ্গারা।


রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রতারণার ফাঁদ


প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামল থেকে বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করছে রোহিঙ্গা বিষয়ে মায়ানমারের সঙ্গে একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানে আসতে। একাধিকবার উভয়পক্ষের উচ্চপর্যায়ে বৈঠক হয়েছে। কোনো কোনোবার মায়ানমার কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে যে, রোহিঙ্গারা আরাকানের নাগরিক নয়। আবার কোনো বৈঠকে স্বীকার করেছে, রোহিঙ্গারা আরাকানের নাগরিক। প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়ার। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক হাতেগোনা কিছু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিলেও নির্যাতন-নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে তারা আবার ফিরে আসে। ফলে দারুণ বিপাকে পড়ে যায় বাংলাদেশ সরকার। শরণার্থী সমস্যার সমাধান দ্রুততর না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা কামনা করে এ দেশের সরকার। তাতে ইউএনএইচসিআর, ডব্লিউএফপিসহ বিভিন্ন সংস্থা এগিয়ে আসে। বর্তমানে শরণার্থীশিবিরগুলোতে দেশ-বিদেশের ৩০টিরও বেশি এনজিও কাজ করছে। তন্মধ্যে আল মারকাজুল ইসলাম, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক রিলিফ অর্গানাইজেশন (আইআইআরও), ইসলামিক রিলিফ এজেন্সি, ইসরা (সুদান), ইসলামিক ফাউন্ডেশন লিমিটেড (পাকিস্তান), মুসলিম এইড, কেয়ার বাংলাদেশ, এমএসএফ (ফ্রান্স), এমএসফ (নেদারল্যান্ড), সেভ দ্যা সিলড্রেন ফান্ড (ইউকে), দি সোর্স অব বাংলাদেশ সোস্যাল ডেভলপম্যান্ট প্রোগ্রাম ও ওয়াল্ড কনসার্ন উল্লেখযোগ্য। এ পর্যন্ত ইউএনএইচসিআর-এর তত্ত্বাবধানে কুতুপালং ও নয়াপাড়া ক্যাম্প থেকে মোট ১১শ রোহিঙ্গাকে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক ও নিউজিল্যান্ডে স্থায়ী অভিবাসী হিশেবে নিয়ে গেছে।

কিছু কিছু এনজিও রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সেবায় এগিয়ে এলেও অধিকাংশ এনজিও সেবার নামে ব্যবসার ফাঁদ পেতে বসেছে। রোহিঙ্গাদের জন্য যেসব বরাদ্দ নিয়ে আসে তার চার ভাগের এক ভাগও তারা পায় না। বিভিন্নভাবে তা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। আবার রোহিঙ্গাদের অসহায় দেখিয়ে সাহায্যের নামে বিভিন্ন ফাউন্ডেশন কিংবা সংস্থা গড়ে তুলে মধ্যপ্রাচ্যে বেপরোয়া চাঁদাবাজি করছে এক শ্রেণির ধর্মব্যবসায়ী। অসহায় ও দুস্থ লোকদের জীবনচিত্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী বাংলাদেশি ও স্থানীয় ধনকুবেরদের কাছে তুলে ধরে তাদের মাঝে সহানুভূতি সৃষ্টি করে এসব ব্যক্তিরা নামধারীরা কোটি কোটি টাকার সাহায্য হাতিয়ে নিচ্ছে। কক্সবাজার জেলার প্রায় প্রতিটি এলাকায় এই ধরনের অসংখ্য সাহায্যকারী সংস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

এছাড়া রোহিঙ্গা অধ্যুষিত সীমান্ত জনপদ উখিয়া-টেকনাফে সলিডারিটিস্ ইন্টারন্যাশনাল ও মুসলিম এইড নামে দুটি বেসরকারি সংস্থা অবৈধভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এখানকার শরণার্থী ক্যাম্পগুলোয় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনসহ নানা সুবিধা দেয়ার নামে চলছে সংস্থা দুটির অনুমোদনবিহীন কর্মকাণ্ড। এ নিয়ে উপজেলার সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কক্সবাজার জেলায় এই ধরনের সাহায্যকারী সংস্থার কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দেশের সীমান্ত এলাকা টেকনাফে। মায়ানমার সীমান্তবর্তী এই উপজেলা অনুপ্রবেশকারী মায়ানমার নাগরিকদের জন্য উর্বর এলাকা হওয়ায় এসব সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন মহলে রয়েছে ব্যাপক কানাঘুষা। অনেকেই এসব সংগঠনের কার্যক্রম রহস্যজনক বলে মনে করেন। আবার অনেকে এসব সংগঠনের তৎপরতা মায়ানমার নাগরিকদের অনুপ্রবেশ উৎসাহিত করার লক্ষে পরিচালিত বলে মন্তব্য করেছেন। আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা সলিডারিটিস্ ইন্টারন্যাশনাল ২০১০ সালের শুরু থেকে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা, হোয়াইক্যং, বাহারছড়ায় ১৫টি গ্রামে কমিউনিটি ভিত্তিক ও লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ওয়াটসন কার্যক্রম চালু করে। ইউএস পিআরএন ও ইকো প্রজেক্টের আওতায় প্রায় ৬০ জন কর্মচারী বার্ষিক চুক্তিতে প্রকল্প দুটিতে নিয়োজিত রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে এনজিওদের তৎপরতাকে ভালো চোখে দেখছে না স্থানীয় বাঙালিরা। এসব এনজিওর বিরুদ্ধে তাদের নানা অভিযোগ। কুতুপালং এলাকার সোলেমান হোসেন নামে এক স্কুল শিক্ষক বললেন, ‘এইসব এনজিও আঁরার দ্যাশত আইয়েরে বেআইনিভাবে কাজ চালাদ্দে। সরকারের উচিত ইতারার কাজকাম বন্ধ করি দেয়ন। বাংলাদেশের গরিবগুনারা খানা ন পাই উপাস থাই মরের, আঁরারলাই কনো সাহায্য-সহযোগিতা নাই, অথচ এনজিওরা রোহিঙ্গাদের কত কিছু সাহায্য দেয়। ইনের পিছনে নিশ্চয়ই খারাপ উদ্দিশ্য আছে।’ জানতে চাওয়া হলো, কী খারাপ উদ্দেশ্য? বললেন, ‘কিছু এনজিও রোহিঙ্গাদের নিয়েরে ব্যবসা শুরু করি দিইয়্যে।’ রাজাপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ কামাল বলেন, ‘এমন অপকর্ম নেই যার সঙ্গে জড়িত নয় রোহিঙ্গারা। এদের বিরুদ্ধে মামলা করেও লাভ হয় না, জামিনে বের হয়ে চলে আসে।’ তিনি ইউএনএইচসিআর-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, এই সংস্থাটি যদি তাদেরকে সাহায্য না দিত, তবে তারা এ দেশে আসার প্রতি উৎসাহিত হতো না।’


এখনো চলে মানুষ বেচাকেনা


মধ্যযুগে মানুষ বেচাকেনা চলত। মানবসৃষ্ট দুর্বিপাকে পড়ে রোহিঙ্গারা এখনো সেই যুগ অতিক্রম করতে পারে নি। এখনো তাদের মধ্যে চলছে মানুষ বেচাকেনা। একমাত্র দরিদ্রতাই এর কারণ। কুতুপালং ক্যাম্পের রীনা আক্তার (৩৮) প্রায় বারো বছর আগে আরাকান থেকে এসেছে। পাঁচ মেয়ে ও তিন ছেলে নিয়ে বিশাল সংসার। তার স্বামী কাপ্তাই এলাকায় বাঁশ কাটার কাজ করে। ইউএনএইচসিআর-এর কাছ থেকে রেশন যা পায় তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই এক বেলা খেলে আরেক বেলা উপোস করে থাকতে হয়। মেঝ মেয়ে তসলিমাকে (৮) মাত্র ৩ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীর কাছে। জিজ্ঞেস করি, ‘এত সন্তান নিলেন কেন, কম সন্তান নিলে তো ভালো মতো জীবন-যাপন করতে পারতেন।’ উত্তরে বললেন, ‘পোয়া-ছা আল্লার দান, আঁরা ঠেকাইয়্যুম ক্যাংগরি?’ মানে, ছেলেমেয়ে আল্লাহর দান, তাদের জন্ম মানুষ কেমন করে ঠেকাবে? নয়াপাড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ বলেন, ‘যতই জনসংখ্যা বাড়ে ততই তাদের জন্য মঙ্গল। জনসংখ্যা বাড়লে তাদের শক্তিও বাড়বে, তাই কেউ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করতে চায় না।’

রোহিঙ্গাদের জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে, কিন্তু কেউ তাদের কথা আমলে নেয় না। রোহিঙ্গাদের দৃষ্টিতে, ‘খোদার উপর খোদাগিরি করা কবিরাহ গুনাহ।’ ফলে ক্যাম্পে ক্যাম্পে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জনসংখ্যা। সন্তানের সংখ্যা বেশি হলে কেউ কেউ কন্যা সন্তানকে বেচে দেয় কম টাকায়। প্রতিমাসে গড়ে ২০ জন রোহিঙ্গা ছেলেমেয়ে বিক্রি হয়ে থাকে বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে। বেচাকেনার জন্য রয়েছে এক শ্রেণির রোহিঙ্গা দালাল। তাদের মধ্যস্থতায় কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় কাজের মেয়ে হিশেবে তাদেরকে বিক্রি করে দেয়া হয়। তারা আর কখনো ফিরে আসে না। জানা যায়, শহরে নিয়ে কাজের মেয়ে হিশেবে চাকরি দেয়ার নাম করে এদেরকে বিভিন্ন দেশে পাচার করে দেয়া হচ্ছে। এই পাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে রোহিঙ্গাদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এসব দেশে মোটা অঙ্কের টাকায় তারা তাদেরকে বিক্রি করে দেয়। নয়াপাড়া ক্যাম্পের শরণার্থী আবদুস সাত্তার তার মেয়েকে মাত্র দুই হাজার টাকার বিনিময়ে এক দালালের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। জিজ্ঞেস করি, ‘আপনার কষ্ট হয় না সন্তানের জন্য?’ মুহূর্তে খানিকটা উদাস হয়ে পড়লেন। বললেন, ‘কষ্ট ত অয়, কিন্তু ক্যান কইজ্জুম? ইতারারে আঁই খাবাইয়্যুম কডেত্তুন? বেচি দিলে যিয়ঁত থাকক, অন্তত খাইয়ের বাঁচি থাইত পারিব।’


লাঞ্ছিত-অপমানিত মানবতা


তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গারা প্রতি পনের দিনে ইউএনএইচসিআর-এর কাছ থেকে ৬ কেজি চাল, ২৮০ গ্রাম সয়াবিন তেল, আধা কেজি করে লবণ, সুজি, চিনি, ডাল ও কেরোসিন পায়। এ দিয়ে কোনোভাবেই চলে না। আর অনিবন্ধিত রোহিঙ্গারা সরকারি-বেসরকারি বিশেষ কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পায় না। মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও নেই তাদের। ক্যাম্পের আশপাশে খড়বিচালি দিয়ে ঝুপড়ি তৈরি করে রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছে। এসিএফ, এমএসএফ, মুসলিম এইড, কনসার্নসহ কয়েকটি এনজিও সপ্তাহে একদিন দুই প্যাকেট বিস্কিট, দুই বোতল পানি, নারী ও শিশুদের খিচুড়ি, সুজিসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ দিচ্ছে। কিন্তু এসব দিয়ে তো আর চলে না। তাই বাধ্য হয়ে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের বাড়তি আয়ের পথ খুঁজে নিতে হয়। রিকশা চালানো, ক্ষেতখামারে মজুরি, হোটেল বয়, ট্রলারে করে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রে বাঙালি জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরতে যাওয়া, ঘরামি, রাজমিস্ত্রির জোগালি ইত্যাদি কাজ করে থাকে। কেউ কেউ চিংড়ি পোনা ধরে তা বিক্রি করে সংসার চালায়। এমনকি অনেক রোহিঙ্গা নারী দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে দেহ-ব্যবসা বেছে নিয়েছে। কুতুপালং ও নয়াপাড়া ক্যাম্পে দেড় শ’রও বেশি যৌনকর্মী রয়েছে।

সূত্র মতে, কক্সবাজারের প্রায় ৮ হাজার ট্রলারে কর্মরত প্রায় ১ লাখ জেলের মধ্যে ৬০ হাজারই রোহিঙ্গা। কিন্তু তারা মজুরি পায় খুব কম। বাঙালি মজুররা রোজ দেড়-দুই শ টাকা পেলে রোহিঙ্গা বলে এদেরকে মজুরি দেয়া হয় রোজ সত্তর থেকে আশি টাকা। তবু এতেই তারা খুশি। কিন্তু রোহিঙ্গা শ্রমিকদের কারণে বাঙালি শ্রমিকদের কাজের সুযোগ কমে গেছে। এ জন্য তারা দারুণ ক্ষিপ্ত রোহিঙ্গা মজুরদের উপর। যখন-তখন চড়াও হয় তাদের উপর, মারধর করে রক্তাক্ত করে ছাড়ে অনেক সময়। উল্টো মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করে। যে জাতিগত বিদ্বেষের কারণে দেশ ছেড়ে এই দেশে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা, সেই বিদ্বেষ এখানেও তাড়া করে ফিরছে তাদের। বাঙালিরা মোটেই সহ্য করতে পারে না রোহিঙ্গাদের। নয়াপাড়া ক্যাম্পের কোনো রোহিঙ্গা জাল নিয়ে নাফ নদীতে মাছ ধরতে গেলে বাঙালিরা জালটা কেড়ে নেয়। বাড়াবাড়ি করলে মারধর করে।

অপরদিকে, কক্সবাজার এলাকায় যেসব শরণার্থী শিবির রয়েছে, এসব শিবিরে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা তিন মাস আগেও ক্যাম্প থেকে বেরুতে পারত। কিন্তু গত তিন মাস ধরে কক্সবাজারের প্রায় ১৭টি শরণার্থী শিবিরের কোনো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে যেতে পারছে না। নয়াপাড়া ক্যাম্প ইনচার্জ জানান, কয়েক বছর আগে কুতুপালংয়ে বাঙালিদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের রক্তক্ষয়ী এক সংঘর্ষ ঘটে। সেই সংঘর্ষে এক রোহিঙ্গা যুবক নিহত হয়। এর সূত্র ধরে ক্যাম্পগুলোতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়, ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াতের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। শুধু এ নয়, শরণার্থী শিবিরগুলোতে যেসব রোহিঙ্গা অল্প পুঁজি দিয়ে দোকানপাট খুলে ব্যবসা শুরু করেছিল, সেগুলো বন্ধ করে দেয় পুলিশ। মুদি দোকান, পান-তামাকের দোকান, দর্জি দোকানগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। এছাড়া নানা দরকারে স্থানীয় যেসব বাঙালির অবাধ যাতায়াত ছিল ক্যাম্পে, অথবা ছ’মাসে-বছরে অন্য ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের যেসব ইষ্টিকুটুম বেড়াতে আসত, তাদের যাতায়াতের ব্যাপারেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। বহিরাগত কাউকে দেখলেই পুলিশ নানা জেরা শুরু করে দেয়। কোনো ওজর-আপত্তি শুনতে চায় না। বাড়াবাড়ি করলে হাতকড়া পরিয়ে ফাঁড়িতে বেঁধে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। জেলে চালান হওয়ার ভয়ে অগত্যা পুলিশের নাস্তাপানি বাবদ ২-৩শ টাকা ঢালা ছাড়া গতি থাকে না। ঢুকতে দেয়া হয় না কোনো সংবাদকর্মীকেও। ক্যামরা বহন একেবারেই নিষিদ্ধ। রান্নাবাড়ার জন্য যারা পাহাড়ে লাকড়ি সংগ্রহে যেত, তাও বন্ধ করে দেয়া হয়। পাহারারত পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কেউ গেলে স্থানীয় বনবিভাগের লোকজন তাদের আটক করে। ৪-৫শ টাকা উৎকোচ দিয়ে ছাড়া পেতে হয়।

নির্দিষ্ট সীমানার কারাগারে বন্দি থেকে চরম দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গারা। নিবন্ধিত রোহিঙ্গারা কোনোরকমে দু-বেলা খাবার পেলেও অনিবন্ধিতদেরকে দিনের পর দিন উপোস করে থাকতে হচ্ছে। মাছ-মাংস দূরে থাক, ঠিক মতো এক কেজি আলুও জোগাড় করা সম্ভব হয় না তাদের পক্ষে। ফলে বিলে-জঙ্গলে গজিয়ে ওঠা কচু, লতি আর শাকই তাদের বেঁচে থাকার মাধ্যম। এই খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে থাকতে হয়, টেনে যেতে হয় জীবনের ঘানি। অপুষ্টিতে ভুগতে ভুগতে অল্প বয়সেই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে তারা। নয়াপাড়া ক্যাম্পের শরণার্থী আবদুল মোতালেব বলেন, ‘আঁরা বা-জী বদকোয়াইল্লা, এক জেলখানা থেকে আরেক জেলখানায় আইয়েরে পচি মরিয়ের।’ ক্যাম্পগুলো এখন একেকটি বন্দিশালা। এক বন্দিশালা থেকে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে এসে আরেক বন্দিশালায় অন্তরীণ হয়ে পড়েছে তারা। তাদের মুক্তি নেই। কারণ তারা দেশহীন।


রোহিঙ্গা প্রতিরোধ আন্দোলন


সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকে আরাকান থেকে যেসব রোহিঙ্গা এ দেশে শরণার্থী হিশেবে আশ্রয় নিয়েছিল তাদেরকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেয়ার জন্য তখন যেসব বাঙালি জোর দাবি জানিয়েছিল, এখন তারাই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে গঠন করেছে ‘রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ এবং প্রত্যাবর্তন আন্দোলন কমিটি।’ কক্সবাজার জেলাসহ বিভিন্ন উপজেলায় রয়েছে এই কমিটির শাখা। কমিটির সদস্যদের সহযোগিতায় স্থানীয় গ্রামবাসী দিনের বেলায় রেহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকায়। মাঝে মধ্যে টেকনাফ, উখিয়াসহ রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে চিহ্নিত রোহিঙ্গাদের মারধর করে, কান ধরে উঠ-বস করায়। তাদের হাতে মারধরের শিকার কুতুপালং ক্যাম্পের অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা হাফিজ উদ্দিন বললেন, ‘মগ-রাখাইন তারাও আঁরারে মারে, এই দেশর মুসলমানঅলও আঁরারে মারে। তই আঁরা কডত যাইয়্যুম, বদ্দা? আল্লায় কি আঁরার এই দুঃখ-কষ্ট ন দেখের।’

প্রতিরোধ কমিটির তৎকালীন আহ্বায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বললেন, ‘দিন দিন যেভাবে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে কক্সবাজারে আর বাঙালি থাকতে পারবে না। কয়েকটি চিহ্নিত এনজিওর সহযোগিতায় রোহিঙ্গারা কক্সবাজারকে ঘিরে আরাকান রাজ্য প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।’ প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে পাঁচটি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, জেলার সব রোহিঙ্গাকে এক জায়গায় একত্রিত করে নিয়ন্ত্রণে রাখা, সমন্বয় কমিটি গঠন করে রোহিঙ্গা সম্পর্কিত কার্যক্রম মনিটরিং করা, রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উখিয়া-টেকনাফ তথা কক্সবাজার জেলার উন্নয়নে কার্যক্রম গ্রহণ এবং গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার। হামিদুল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, তাদের এই আন্দোলন বন্ধ করতে আরআরআরসিসহ কয়েকটি এনজিওর লোকরা তাদেরকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে।


মুক্তির প্রতীক্ষায় মুক্তি আন্দোলন


কুতুপালং ক্যাম্পে দেখা হয়েছিল রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন বা আরএসও’র একজন কর্মীর সঙ্গে। সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে তার সঙ্গে কথা হয়। ত্রিশ-বত্রিশের মতো বয়স। নাম জানাতে তার দারুণ অস্বীকৃতি। ধরা যাক তার নাম এবাদুল। রোহিঙ্গা মুক্তি আন্দোলন সম্পর্কে সে জানাল নানা তথ্য-উপাত্ত। জানাল, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন বা আআরএসও সংগঠনটি বর্তমানে রোহিঙ্গা মুক্তি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত। এরকম সংগঠন আরো রয়েছে। যেমন, ন্যাশনাল ইউনিয়ন পার্টি অব আরাকান (নুপা), আরাকান আর্মি (এএ), আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (এআরএনএ) আরাকান লিবারেল পার্টি (এলপি), ইকতাদুল তুল্লাহ আল মুসলেমিন (আইটিএম), বান্দরবান আরাকান অ্যালায়েন্স (বিপিএ), ইত্তেহাদুল ইসলাম ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে সবচাইতে বেশি সংগঠিত আরএসও এবং এআরআইএফ। বর্তমানের আরএসও’র প্রায় ৮০ হাজার প্রশিক্ষিত কর্মী রয়েছে। দলের প্রধান হিশেবে রয়েছেন মায়ানমারের ড. ইউনুস। তার নির্দেশে পরিচালিত হয় সংগঠনটি।

এক রোহিঙ্গা যুবকের সঙ্গে একবার আমি নাইক্ষংছড়িতে যাই। সে নিয়ে গেল ‘বুছি’ নামক এক পাহাড়ি এলাকায়। সেখানে পরিচয় হয় তার ঊর্ধ্বতন কয়েকজন নেতার সঙ্গে। তারা সরল মনে রোহিঙ্গা মুক্তি আন্দোলন সম্পর্কে অনেক তথ্য দিলেন। দেখালেন তাদের মজুদকৃত তাদের অস্ত্রশস্ত্রও। রোহিঙ্গা যুবকটি আমাকে বলে দিচ্ছিল অস্ত্রগুলোর নাম। যেমন, রিভলবার, একে-৪৭, জি-থ্রি, এম-১৬, এলএমজি, এসএমজি, ভূমিমাইন, রকেট লাঞ্চার ইত্যাদি। কিছুটা ভয় আর কিছুটা কৌতূহল নিয়ে একজনের কাছে জানতে চাইলাম, বাংলাদেশের কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ আছে কিনা? তিনি জানালেন, না, ঠিক ওইভাবে কোনো যোগসাজশ নেই। তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দল তাদের আন্দোলনকে নৈতিকভাবে সমর্থন করেন।

রোহিঙ্গা যুবকটির কাছে জানতে চাই আরো তথ্য। সে জানাল, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, পাইথং, রুমা, লামা, কুতুপালং, থামচি, খাগড়াচড়ি, রাঙ্গামাটি এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার প্রশিক্ষিত আরএসও সদস্য রয়েছে। মায়ানমারের ড. ইউনুসের সঙ্গে যোগযোগ করে তারা নানা কার্যক্রম চালায়। তবে কখনো তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে অংশ নেয় না। এটা ড. ইউনুসের কঠোর নির্দেশ। এবাদুল ‘দি আরাকান নিউজ’ নামের চাররঙা আট পৃষ্ঠার একটি পত্রিকা এনে দেখাল। সেটি আরএসওর মুখপত্র। পত্রিকাটি সূত্রে জানা গেল, এরএসও সংগঠনটি মায়ানমার সরকারের কাছে মোট ষোলটি দাবি পেশ করেছে। জানতে চাইলাম, রোহিঙ্গা মুক্তি আন্দোলন কেন্দ্রিক সদস্যরা বাংলাদেশে অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিনা? জানাল, অন্তত আরএসও’র কোনো কর্মী এসবের সঙ্গে যুক্ত নয়। তবে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন, আরএসও ছাড়া অন্য দলের কেউ এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও থাকতে পারে। অসংখ্য আরএসও কর্মী স্বপ্ন দেখেন, একদিন আরাকান স্বাধীন হবে, দূর হবে মগ-রাখাইনদের যাবতীয় অত্যাচার-অনাচার। একই স্বপ্ন সাধারণ রোহিঙ্গাদেরও। তারা চায় একটি মুক্ত স্বদেশ, শান্তিতে বসবাসের নিশ্চয়তা। সেই প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে লাখ লাখ উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা।


পরিশেষে


রোহিঙ্গা সংকট সম্পূর্ণ জাতিগত। জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে যারা এই সংকটকে ধর্মীয় রূপ দিতে চাচ্ছেন তারা প্রকারান্তরে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ও সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার হাতকে শক্তিশালী করছেন। নিজভূমিতে রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিগত অর্ধ শতক ধরে যেসব সংগঠন লড়াই করছে সেসব সংগঠনকে এরই মধ্যে ইসলামি মুখোশ পরিয়ে দিতে মোটামুটি সক্ষম হয়েছে পাকিস্তানি আইএসআই, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ এবং সামাজ্যবাদী শক্তি। যেমন ইত্তেহাদুল ইসলাম, সাওতুল্লাজিন, আল-ইয়াকিন ইত্যাদি। নানা কৌশলে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন বা আরএসওকে বিলীন করে দেওয়া হচ্ছে এসব ইসলামি সংগঠনের উদরে।

পাকিস্তান ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এই ফাঁদে পা দিলে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কোনোকালে হবে কিনা সন্দেহ। রোহিঙ্গা একটি স্বয়ম্ভু জাতি। তারা বাংলা থেকে আরাকানে গিয়েছিল, নাকি আরব থেকে গিয়েছিল―এই বিতর্ক এখন অসার। তারা যেখান থেকেই ওখানে যাক না কেন, হাজার বছরের ব্যবধানে তারা এখন স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হয়েছে। তাই আরাকান তথা রাখাইন রাজ্যের সংকটকে চিহ্নিত করতে হবে জাতিগত সংকট হিশেবে, কোনোভাবেই ধর্মীয় সংকট হিশেবে নয়। প্রত্যেক বোধসম্পন্ন মানুষের উচিত রোহিঙ্গা সংকটকে জাতিগত সংকট হিশেবে চিহ্নিত করে রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা ভূখণ্ডের দাবি তোলা।

স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)