হোম গদ্য দুর্গা-বিষয়ে যে-দুয়েকটি কথা আমি জানি

দুর্গা-বিষয়ে যে-দুয়েকটি কথা আমি জানি

দুর্গা-বিষয়ে যে-দুয়েকটি কথা আমি জানি
231
0

দুর্গাপুজো এসে গেল। সম্ভবত, দেবীরই কৃপায়, আমা-হেন পল্লবগ্রাহী কুঁজোরও সাধ হলো পাণ্ডিত্যের পালঙ্কে চিত হয়ে শোবার। অতএব, দুর্গার রূপকল্পনার উদ্ভব এবং বিবর্তন নিয়ে দু’কথা বলার অনুমতি যাচ্ঞা করি। একটু ধৈর্য ধরে পড়বেন।


আদিম কৃষিভিত্তিক সমাজে, পৃথিবী বা মাটিই মানুষের আদি উপাস্য দেবতা (বা দেবী) হয়ে দেখা দেয়, এবং শুরু হয় মাতৃকাপুজোর।


মনে করা হয়, খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে, কুষাণরা যখন আফগানিস্তান থেকে ভারতে আসে, তখন তাদের সঙ্গেই দেবী দুর্গার এ-দেশে আগমন। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে দুর্গা-নামক কোনো যুদ্ধ-দেবীর কথা পাওয়া যায় না। বস্তুত, বেদে দেবীর সংখ্যা একেবারেই নগণ্য—বাক, ঊষা ইত্যাদি মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া, বেদের সমস্ত দেবতাই পুরুষ। আদি বৈদিক সমাজ ছিল পশুচারণকেন্দ্রিক (Pastoralist), ফলে সেখানে নারীর অবস্থান, কৃষিভিত্তিক সমাজের তুলনায় কিছুটা প্রান্তিক হবে, এটা স্বাভাবিক, আর তার ছাপ সেই সমাজের দেব-দেবীর কল্পনায় ফুটে ওঠাও অস্বাভাবিক নয়। সে যাই হোক, লিখিতভাবে দেবীর দুর্গার কথা প্রথম পাওয়া যায় মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য অংশে। ওয়েন্ডি ডনিগার-সমেত আরো কিছু ভারততত্ত্ববিদ পণ্ডিতের মতানুযায়ী, আঠারটি (মতান্তরে, কুড়িটি) পুরাণের মধ্যে, মার্কণ্ডেয় পুরাণই প্রাচীনতম, সম্ভবত ২৫০ খ্রিস্টাব্দে রচিত। দেবীমাহাত্ম্য অংশটি যদিও পরে ৫৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ রচিত ও সংযোজিত বলে ওয়েন্ডি ডনিগার মনে করেন। কিন্তু এসব আলোচনায় পরে আসব। গোড়ায়, আমরা বরং আরো একটু অতীতে তাকাই।

নিওলিথিক যুগে, যখন সবেমাত্র কৃষিভিত্তিক সমাজের সূচনা হচ্ছে, তখন পৃথিবী, অথবা মৃত্তিকা, মানুষের কাছে এক আশ্চর্য শক্তি হয়ে দেখা দিয়েছিল। কেননা পৃথিবীর গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসে প্রাণদায়ী খাদ্য, রসদ। তাই, এইসব আদিম কৃষিভিত্তিক সমাজে, পৃথিবী বা মাটিই মানুষের আদি উপাস্য দেবতা (বা দেবী) হয়ে দেখা দেয়, এবং শুরু হয় মাতৃকাপুজোর। মানুষ কল্পনায় ভাবত, পৃথিবী যেন গাভী। আর আকাশ, বৃষের মতো, বীর্য (অর্থাৎ বৃষ্টি) নিক্ষেপ করে তাকে নিষিক্ত করে, ফলবতী করে। মাটি যে শুধু নতুন শস্য দেয় তাই নয়, সে প্রাচীন শস্য হরণও করে। মৃতদের টেনে নেয় নিজের গর্ভে। এইভাবে, জন্ম আর মৃত্যু আদিম মানুষের কাছে একটা অনবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক চক্র হিশেবে প্রতিভাত হয়েছিল। আবার এই জমির রক্ষা ও ক্রমাগত বিস্তারের জন্যই মানুষের যত লড়াই, যত যুদ্ধ, সেই আদিম যুগ থেকেই। ফলে, উর্বরতা আর যুদ্ধ, জন্ম আর হত্যা, ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে যেতে থাকে।

21905527_1444059582344841_29151406_nনিওলিথিক আনাতোলিয়ায় এক দেবীমূর্তি পাওয়া যায়, যা ৬০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নির্মিত বলে পুরাতাত্ত্বিকদের অনুমান। দু-পায়ের ফাঁক দিয়ে সন্তান প্রসব করছেন সেই পৃথুলা দেবী, আর তার দু’দিকে শার্দুল-জাতীয় পশু। এই দেবী, পরে হিটাইটদের মধ্যে Kubaba আর গ্রিক ও রোমানদের কাছে Kybele নামে পরিচিত হন। এনার উপাসনায় ষাঁড় বলি দেওয়া হতো। বলির রক্তে ভক্তদের পাপ ধুয়ে যেত আর তারপর সেই ষাঁড়ের অণ্ডকোষ প্রসাদ হিশেবে খাওয়া হতো। আক্কাদ ও সুমেরে আরেক দেবী ছিলেন Anat, তিনি আবার যুদ্ধেরও দেবী। তার প্রেমিক Ba’al Haddad, যিনি আকাশের দেবতা আর বৃষ্টি ঝরিয়ে পৃথিবীকে উর্বর করেন। গ্রীষ্মের সময়ে তিনি থাকেন পাতালে, এবং শরৎকাল এলেই উঠে আসেন আকাশে। আনাতের প্রতীক গাভি, আর বা’লের ষাঁড়। এই আনাতের আদলে পরে অনেক মিশরীয় ও মেসোপটেমীয় দেবীর উদ্ভব হয়, এবং কোনো এক অদৃশ্য কার্যকারণের সূত্রে (সম্ভবত যুদ্ধের দিকটাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে) তাদের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় সিংহ বা সিংহী। প্রোটো-এলামাইটদের রাজকীয় সীলমোহরে ষাঁড় আর সিংহের লড়াইয়ের মোটিফ ঘুরেফিরে আসত। এরা হলো দুই বিরোধী মহাজাগতিক শক্তি—আকাশ আর পৃথিবী, পুরুষ আর প্রকৃতি, মৃত্যু আর জন্ম। মেসোপটেমীয় দেবী ইনানা (হিমাচলের নয়না বা নৈনি দেবী এনারই এক রূপ, সম্ভবত শকদের হাত ধরে এসেছিল) বা ইশতারের প্রতীক সিংহ। ইশতারের প্রেমিক দুমুজিকে নির্বাসিত হয়ে চলে যেতে হয়েছিল পাতালে, দানবদের রাজ্যে, এবং বছরে ছমাস শুধু সে স্বর্গে এসে ইশতারের সঙ্গে মিলিত হতে পারত। ইনানার সঙ্গে দুর্গার আশ্চর্য সাদৃশ্য রয়েছে।21905686_1444059792344820_1133261967_n


মৃত্যুকালে মহিষাসুর দুর্গার যোনি চুম্বন করে এবং শাপমুক্ত হয়।


এবার আসি ভারতের কথায়। চানহু-দারোয় পাওয়া সীলে, একটি বাইসন ষণ্ডকে তার উচ্ছ্রিত লিঙ্গসমেত এক উন্মুক্তযোনি নারীর সঙ্গে উপগত হতে দেখা যাচ্ছে। এই সীলটিতে মেসোপটেমীয় রীতির প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। কালীবঙ্গানে পাওয়া আরেক সীলে ব্যাঘ্রবাহিনী এক দেবীরও ছবি পাওয়া যায়। তবে পরবর্তীকালের বেশিরভাগ সীলে ষাঁড়ের জায়গা নিয়েছে পুরুষ মহিষ। মনে রাখতে হবে, মহিষ দক্ষিণ এশিয়ার পশু, পশ্চিম এশিয়ায় পাওয়া যেত না। আবার, সিংহও ভারতবর্ষ বা সন্নিহিত অঞ্চলে লভ্য ছিল না। ফলে, এই দেবীকল্পনায়, বহির্ভারতের সঙ্গে আদান-প্রদানের বিষয়টি অস্বীকার করা মুশকিল। দুর্গার রূপকল্পনায় বা আইকনোগ্রাফিতে, ষাঁড়, মহিষ আর সিংহের পারস্পরিক সম্পর্কটি, আমরা সকলেই জানি, খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিবের বাহন ষাঁড়, এবং শিব পর্বতকন্যা পার্বতীর স্বামী। আবার, দুর্গার প্রধান শত্রু পাতালবাসী মহিষাসুর। পাতাল কিন্তু মৃতদের রাজ্য, যম যার রাজা, এবং যমের বাহন সেই মহিষ। এখানে, সিংহ আর মহিষকে যথাক্রমে জন্ম আর মৃত্যুর প্রতীক ভাবলে খুব ভুল হবে কি? সাধারণভাবে, দেবীমাহাত্ম্য-সমেত অন্যান্য সমস্ত পুরাণেই (শিবপুরাণ, বামনপুরাণ) মহিষাসুরকে সরাসরি দুর্গার শত্রু-হিশেবে চিত্রিত করা হয়েছে। অথচ পরে, বৈষ্ণব ভক্তিবাদের প্রচার ও প্রসারের কালে, মহিষাসুরকে দেখানো হয় দুর্গার একনিষ্ঠ ভক্ত হিশেবে। দেবীপুরাণে বলা হচ্ছে, মহিষাসুর পূর্বজন্মে দুন্দুভি-নামক অসুর ছিল যে দুর্গার প্রেমে পড়ে, এবং শিব ঈর্ষাহেতু তাকে ভস্ম করে ফেলেন। উড়িষ্যায় প্রচলিত এক কাহিনি অনুসারে, মৃত্যুকালে মহিষাসুর দুর্গার যোনি চুম্বন করে এবং শাপমুক্ত হয়। কালিকাপুরাণ অনুসারে, শিবই এক ঋষির শাপে মহিষাসুরের রূপ নেন এবং দুর্গার দ্বারা হত হয়ে শাপমুক্ত হন। আবার, প্রাচীন তামিল সাহিত্যে কোট্টি বা কোট্টিভাই বলে এক যুদ্ধের দেবীর কথা পাওয়া যায়, যিনি তার ভক্তদের কোট্টম অর্থাৎ বিজয়-প্রদান করেন। তামিল মহাকাব্য সিলাপ্পতিকারম-এ এনাকে মহিষাসুরমর্দিনীর সঙ্গে এক করে দেখানো হয়েছে। এই দেবীও পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন পশু-রূপী অসুরকে হত্যা করেন, যার মধ্যে মহিষ অন্যতম। তামিল সাহিত্যে কিন্তু, অনেকক্ষেত্রেই, দেবীর হাতে যে-পুরুষের মৃত্যু হচ্ছে, সে আসলে দেবীর প্রেমাস্পদ বা স্বামী।

21905610_1444059972344802_487150125_nভারতবর্ষে, দুর্গার রূপের এই ধারাবাহিক বিবর্তন ও স্থানিক রূপভেদগুলি বিবেচনা করে, এবং বৈদিক ও দ্রাবিড় গাথাকাব্যগুলির পাশাপাশি সিন্ধুসভ্যতার সীলমোহরগুলি বিশ্লেষণ করে আসকো পারপোলা দেখাতে চেয়েছেন, দুর্গার রূপকল্পনার ভিত্তিটি আসলে বহু-প্রাচীন। হয়তো সিন্ধুসভ্যতার কালেই তার উৎপত্তি। পারপোলার মতে, বেদে যাদের “ব্রাত্য” বলা হয়, এই দেবী-উপাসনা হয়তো তাদের থেকেই হিন্দু-ধর্মের মূলস্রোতে ঢুকে পড়েছে। আদি-অর্থে “ব্রাত্য” শব্দটি কিন্তু নঞর্থক নয়। যারা বৈদিক যজ্ঞ না-করে ব্রত-পালন করে, অর্থাৎ যারা বেদ-পন্থীদের থেকে পৃথক, তারাই ব্রাত্য। অথর্ববেদের ওপর, বিশেষ করে পিপ্পলাদ-গোষ্ঠীর অথর্ববেদে, এই ব্রাত্যদের গভীর প্রভাব রয়েছে। পিপ্পলাদ-অথর্ববেদের ‘অভিচার’ অর্থাৎ তন্ত্র-মন্ত্র-জাদুটোনার অংশগুলি ব্রাত্যদের আচার-বিচার থেকে গৃহীত বলে মনে করা হয়। মজার কথা, মগধ-সহ পূর্বের অঞ্চলগুলিকেই এইসব অভিচারের মূল আখড়া বলে নির্দেশ করা হয়েছে বৈদিক সাহিত্যে, বিশেষদ সামবেদে। গৃহ্যসূত্রে, ব্রাত্যষ্টোম যজ্ঞের মাধ্যমে, এই ব্রাত্যদের বৈদিক-সমাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার বিশদ পদ্ধতিও বাতলানো হয়েছে। তো সে যাই হোক, পারপোলার মত এই যে, সিন্ধু-সভ্যতাতেই দুর্গার প্রাথমিক রূপকল্পটি রচিত হয়, পরে যখন সিন্ধু-সভ্যতা, নানান প্রাকৃতিক কারণে বিনষ্ট হয়, তখন সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের এই শাক্ত (এবং হয়তো বামাচারী তান্ত্রিক) আচার-আচরণগুলিও দোয়াব হয়ে পূর্বে, এবং বিন্ধ্য পেরিয়ে দক্ষিণে প্রবেশ করে (বস্তুত, পারপোলার মতে সিন্ধুসভ্যতার ভাষা থেকেই দ্রাবিড়-ভাষার উদ্ভব, এবং দ্রাবিড়-ভাষাকে ভিত্তি করে সিন্ধুসভ্যতার সীলের যে-পাঠোদ্ধার তিনি করেছেন, তা এখনো অবধি সবচেয়ে প্রামাণ্য বলে পণ্ডিতমহলে স্বীকৃত)। ধীরে ধীরে, বৈদিক সভ্যতা এই যুদ্ধের দেবীকে, নিজের মতো করে গড়ে-পিটে, আত্মীকৃত করে। বৈদিক সভ্যতার প্রাচীন দেবী প্রজাপতি-কন্যা বাকের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ঢুকে পড়ে দুর্গার কল্পনায়। ঠিক যেভাবে, বৈদিক সমাজ আত্তীকৃত করে নিয়েছিল আরেক আঞ্চলিক দেবতা শিবকে। বৈদিক-সাহিত্যের রুদ্র কালক্রমে রূপান্তরিত হয় শিবে। আবার এই রুদ্রই, অন্যদিকে, রূপান্তরিত হয়ে, কার্তিক বা স্কন্দের উদ্ভব ঘটায়। কেরালার একটি পৌরাণিক কাহিনিতে, আয়াপ্পান অর্থাৎ কার্তিককে দেখা যায় বাঘের পিঠে চড়ে মহিষ-রূপী দানবীকে বধ করতে। দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপের সঙ্গে এই কাহিনির মিলটা খুবই প্রত্যক্ষ, কেবল চরিত্রগুলি পালটে গেছে, পুরুষ আর নারী নিজেদের স্থান-বদল করেছে। পারপোলা এ-ও দেখাতে চেয়েছেন, উর্বরতাদায়িনী মাতৃকাদেবী যেমন ষাঁড়ের সঙ্গে মিলিত হয়ে নতুন ফসল দেয়, তেমনি তার হাতে সেই ষাঁড়ের বা পুরুষের বিনাশও নির্ধারিত। কেননা, প্রাচীনের বিনাশ না হলে নতুনের আগমন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পৃথিবী নিত্য, কিন্তু পুরুষ পাল্টে যায়, প্রত্যেক বছর একটা নতুন ঋতু আসে, নতুন মেঘ আসে পৃথিবীকে গর্ভবতী করতে। পারপোলা বলেন, এই আর্কেটাইপটি হয়তো ভারতের রাজা বা ক্ষমতার প্রতিভূর ক্ষেত্রেও কালক্রমে প্রযোজ্য হয়েছে। রাজা তার রাজ্যের (রানি যার প্রতীক) সম্পদ বৃদ্ধি করেন। আবার রাজার ঔরসে রানির গর্ভজাত সন্তান, সেই রাজাকে সরিয়ে (প্রতীকী মৃত্যু), একসময়ে নিজেই রাজ্যভার গ্রহণ করে। বৃদ্ধ রাজা সরে যায় অন্তরালে, সে জ্ঞানী কিন্তু অশক্ত, আর তার জায়গা নেয় যে তরুণ রাজা, সে বীর, শক্তিমান কিন্তু কূটনীতিতে অপরিণত। রানির “মহিষী” নামও এক্ষেত্রে বিশেষ দ্যোতনাময়। মনে রাখা ভালো স্কন্ধ আবার শিব আর পার্বতীর ছেলে।


দুর্গার অমন যৌনতা-উদ্রেককারী চেহারা আসলে সনাতন হিন্দুত্বের অপমান।


21919470_1444060135678119_501887794_n

তো বলার কথা এই যে, পুজোর মুখে, অনেক অতিবৈপ্লবিক পণ্ডিতই আমাদের ভজাবেন যে, দুর্গা আর মহিষাসুরের যুদ্ধ আসলে নাকি আর্য-অনার্যের, ব্রাহ্মণ-দলিতের লড়াই। ফলে, দুর্গাপুজোয় ফুর্তি করা মানেই দলিত-বিরোধী ব্রাহ্মণ্যধর্মের জয়গান গাওয়া। অনেক হনুমানবাদী পণ্ডিত আবার বলবেন, দুর্গার অমন যৌনতা-উদ্রেককারী চেহারা আসলে সনাতন হিন্দুত্বের অপমান। অথবা, দুর্গাপুজোয় এন্তার মাছ-মাংস সাঁটিয়ে বাঙালি আসলে সনাতন ঐতিহ্যকেই খর্ব করছে। এই সমস্ত বক্তব্যগুলোই আসলে, একেকরকমের খণ্ডিত দেখা। যেকোনো মিথ বা পুরাণপ্রতিমা, বিশেষত এই ভারতবর্ষে, একটি অতিজটিল ট্যাপেস্ট্রি। কতরকম সুতোর বিপরীতমুখী টানা আর পোড়েনে এদের জন্ম, সেকথা ভাবলেও অবাক হতে হয়। মানুষের হাজার-হাজার বছরের সুখ-দুঃখ-আশা-আকাঙ্ক্ষা, তাদের চেতন-অবচেতনের ধোঁয়াটে সীমানায়, বাস্তব আর কল্পনার মিশেলে এইসব মিথের জন্ম দিয়েছে। তারা পুষ্ট হয়েছে, বিবর্তিত হয়েছে মানুষের সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার সাপেক্ষে। সেই জটিল উদ্ভব ও বিবর্তনের ইতিহাসকে সরল শাদা-কালো ছকে আঁটিয়ে ফেলা শুধু দুঃসাধ্য কেন, অসম্ভব বলেই মনে হয় আমার।


তথ্যঋণ :

Asko Parpola- The Roots of Hinduism : The Early Aryans and the Indus Civilization (Oxford University Press, 2015)

Wendy Doniger- The Hindus :  An Alternative History (Viking Penguin, 2009)

শৌভ চট্টোপাধ্যায়

জন্ম ৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৩; হাওড়া, ভারত। ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার, এম বি এ। পেশা : ম্যানেজমেন্ট কনসালটিং।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
অনন্ত-র ঘরবাড়ি, হাতিঘোড়া ও অন্যান্য [ডি কোং, ২০০৯]
মুনিয়া ও অন্যান্য ব্যূহ [নতুন কবিতা, ২০১৩]
মায়াকানন [সৃষ্টিসুখ, ২০১৭]

ই-মেইল : souva.chattopadhyay@gmail.com