হোম গদ্য দুখু

দুখু

দুখু
555
0

‘রবীন্দনাথ ওষুধ খাওয়াইয়া নজরুলরে অচল বানায়া দিসিল? নজরুলরে তো হিংসা করত। পাগলা পাগলা কইয়া ক্ষ্যাপাইতো। আসলে রবীন্দনাথের চাইয়া নজরুল অনেক বড় কবি আছিল’

নকশা আঁকা ঝলমলে রিকশাটা মুহূর্তেই ঢেকে গেল লতাপাতা ফুলফলে ভরা একটা সুতি শাড়িতে, নতুন বউ নাইয়র যাবে বাপের বাড়িতে। গাঁয়ের পথ দিয়ে তের মাইল যেতে হবে। আয়নাবালি গ্রামের নজরুল ইসলামের পোয়াতি বউ, পর্দা না করলে কি চলে! পরনের শাড়ি রিক্সার চারপাশটায় পেঁচিয়ে পর্দার যথাযথ ব্যবস্থা।

হরিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়াশোনা নজরুলের। বলশালী গেরস্থ ঘরের পুত। লেখাপড়ায় মন ছিলো না। বয়স ১৯ না হতেই বাপ-মা দিলো বিয়ে করিয়ে। নজরুলও বিয়ে করেছে আনন্দ চিত্তে। বউ ময়না বিবি। জামাই-বউ দুইজনেরই শখ রেডিও শোনা। নিজের নামে নাম বলেই কি-না, কাজী নজরুল ইসলামের গান তার ভালই লাগে শুনতে। নজরুল রিকশায় কাপড় পেঁচায় আর বেসুরা গায়, ‘লাল টুকটুক বউ যায় গো, লাল ন’টের ক্ষেতে যে তার আলতা পায়ের রঙ, চিহ্ন এঁকে নালতা শাকের গাঁয় গো’

nazrul_01ময়না বিবির পা যেন লাজে সরে না। সে মুখ ফিরিয়ে শাড়ির আঁচল আঙুলে জড়ায়। অথচ ময়না জানে না কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর গানের শেষটায় এরকমই লিখেছিলেন। এর কিছুদিন পর পুত্র সন্তানের পিতা হবার গর্বে বুক ফুলে যায় নজরুলের। গাঁয়ের লোকেরা যাকে ডাকে ‘নরজুল’, হাড়ির বাতাসা না ফুরাতে পুত্র-বউকে বাড়িতে নিয়ে আসে সে।

পুত্রের নাম রাখা হয় ময়নুল ইসলাম। মা আর বাপের নাম থেকে অক্ষর মিলিয়ে রাখা আর কি! ময়নুল বড় হতে থাকে। ইশকুলে যাওয়া শুরু করে। আল্লাহর রহমতে ছাত্রও বড্ড ভালো। প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস টু থেকেই রোল নম্বর ওয়ান ময়নুলের। টু-তে পড়ার সময়েই কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছোটবেলার জীবনী পড়ে সে। বারান্দায় শীতল পাটিতে বসে শব্দ করে করে পড়ে, ছোটবেলায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম ছিল দুখু মিয়া। পাশের রান্নাঘর থেকে দুখু মিয়ার গল্প শোনে ময়না।

বড় মায়া হয় দুখুর জন্যে। তার পোলারেও ডাকা শুরু করে দুখু মিয়া। সেই ডাকের স্বর বড় আদুরে। যেন গরম দুধের ‘পরে ধীরে ধীরে সর জমছে। খেলার সাথীদের মধ্যেও দুখু নামটা ছড়ায়ে পড়লো। কোকড়া চুল আর শ্যামলা বর্ণের ময়নুল যখন প্রথম হয়ে ক্লাস ফোর থেকে ফাইভে উঠল, প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিনও তারে ডাকলো দুখু।

143176425296688এভাবেই ময়নুল ইসলাম হয়ে উঠে নজরুলপুত্র দুখু। প্রত্যেক ক্লাস ডিঙায় আর প্রথমেই ‘আমার বাংলা বই’ থেকে মুখস্থ করে ফেলে কাজী নজরুলের কবিতা। গাঁয়ের মক্তব-মসজিদের ওয়াজ মাহফিলে গায় ‘তৌহিদেরই মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম’; হুজুরের অনুরোধে ‘তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে, দোলে শিশু ইসলাম দোলে’-ও গেয়ে ফেলে। খুশি হয়ে দশ টাকার নোট দেয় আলাউদ্দিন মেম্বার। দুখু নামটা নিয়ে গর্ব হতে থাকে তার। সে ভুলে যায় তার নাম ময়নুল ইসলাম।

দুখু ভালো ছাত্র। শিক্ষরা একটু বেশিই আদর করে। ক্লাস এইটে পড়ার সময় বাংলা স্যার হাঁটতে হাঁটতে একদিন দুখুকে বলেন, “জানো না কি, রবীন্দনাথ ওষুধ খাওয়াইয়া নজরুলরে অচল বানায়া দিসিল? নজরুলরে তো হিংসা করত। পাগলা পাগলা কইয়া ক্ষ্যাপাইতো। আসলে রবীন্দনাথের চাইয়া নজরুল অনেক বড় কবি আছিল। হে ত অনেক বছর বাঁচছে। কিন্তু লেখসে কয় বছর? খুব কম। নজরুলরে থামাইয়া দিয়া হে বিশ্বকবি অইসে। নুবেল পুরুস্কার জিতসে”।

বাংলা স্যারের দিকে দুখু হা করে তাকায়ে থাকে, তার বিস্ময় কাটে না। বাংলা স্যারেরে সে জিগায়, এগুলা কি হাছা কথা স্যার? কপট রাগ দেখায়ে স্যার বলে, তোমারে কি মিছা কমু আমি! বেচারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি বিরাট রাগ তৈরি হয় দুখুর মনে, কালোজামের মতো মিশমিশে কালো রাগ!

ভাল লাগার কথা মুখে বলবে, সেই স্বস্তিটুকু দুখুর নাই। কিন্তু মনের ভেতর তো কুহু কহু কোকিল ডাকে। সাহস করে গভীর রাত্তিরে, ঝিঁঝি পোকার ডাকাডাকিরে স্বাক্ষী রেখে একটা চিঠি লিখে ফেলল সে

লেখাপড়ায় ফাঁকি দেয় না দুখু। ইতোমধ্যে তার একটা নিজের থাকার ঘর হয়েছে। সেই ছোট্ট ঘরের দেয়ালে কাজী নজরুল ইসলামের তিন বয়সের তিনটা ছবি টাঙিয়েছে দুখু। একটা ছবি সৈনিকের পোশাকে বিশ/একুশ বছরের নজরুল, আরেকটায় বাবরী চুলের পূর্ণযুবক নজরুল, অন্যটায় বৃদ্ধ বয়সের নজরুল, যেন অসহায় শূন্য দৃষ্টিতে তাকায়ে আছে। আল মেহদি লাইব্রেরী থেকে সে এসব পোস্টার কিনেছে। পোস্টারের সঙ্গে কিনেছে একটা নজরুলগীতির বই। সকাল বেলা সে রেডিও শোনে। ভোরের দিকে নজরুলের গানের অনুষ্ঠান হয় বাংলাদেশ বেতারে। গীতিমালঞ্চ দুখুর প্রিয় অনুষ্ঠান।

কয়েকটা গানের কথা সে মুখস্থও করে ফেলে। কলেজে যাবার পর শুভেচ্ছা ক্লাসেই কুপোকাত দুখু। বয়েজ স্কুলে পড়ে আসা দুখু সুমিকে দেখে যেন অজ্ঞান হয়ে যাবে। মনে মনে বলে ফেলে, এমন সুন্দরও মানুষ হয়! এ তো মেয়ে না। পরীস্থান কোহকাফ থেকে ভুল করে চলে আসা কেউ। আহা! এই বুঝি পরী জাফরানি!! কিন্তু মুখ ফুটে বলার মতো সাহস তার নাই। মা ছাড়া কোনো মেয়ে মানুষের সঙ্গে খুব একটা কথাও বলে নি সে। আস্তে আস্তে আড়ষ্টতা কাটানোর চেষ্টা করে। প্রথম বর্ষ ফাইনালে প্রথম হয়ে যায় দুখু। সুমি পঞ্চম। ফলাফলের পর নানা বাহানায় একে অপরের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলো দুজন।

ভাল লাগার কথা মুখে বলবে, সেই স্বস্তিটুকু দুখুর নাই। কিন্তু মনের ভেতর তো কুহু কহু কোকিল ডাকে। সাহস করে গভীর রাত্তিরে, ঝিঁঝি পোকার ডাকাডাকিরে সাক্ষী রেখে একটা চিঠি লিখে ফেলল সে। চিঠিও বলা যায় না অবশ্য; কাজী নজরুলের একটা গান থেকে তিনটা লাইন লিখলো—

“তোমারি আঁখির মতো আকাশের দুটি তারা
চেয়ে থাকে মোর প্রাণে নিশীথে তন্দ্রাহারা।
সে কি তুমি? সে কি তুমি?”

দুরু দুরু বুকে খলিল স্যারের ক্লাসের ফাঁকে কাগজটা দিয়েও ফেললো সুমিকে। টেনশনে ঘেমে গোসল করার মতো অবস্থা দুখুর। পরদিন একটা কাগজ ফেরত পায় সে। তাতে লেখা—

“মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো,
দোলে মন দোলে অকারণ হরষে।
হৃদয়গগনে সজল ঘন নবীন মেঘে
রসের ধারা বরষে”।।
আমার প্রিয় রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রসঙ্গীত। মাঝেমাঝে মনে হয়, ইশ! রবীন্দ্রনাথ যদি আমার জামাই হতো! হি হি হি হি…দারুণ মজা হতো, না? বুড়ার দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলতাম, আমাকে ভেবে কিছু একটা লিখো তো কবি! বাই দ্য ওয়ে, তোমার বুঝি নজরুল প্রিয়?”

Nazrul1এই উত্তরের পর রবীন্দ্রনাথের উপর দুখুর রাগটা আরো বাড়লো। তবে বন্ধুত্বটা গাঢ় হতে লাগলো দুজনের। প্রায় প্রতিদিনই নজরুলের গান থেকে দু-তিন চরণ লিখে দেয় দুখু, সুমি পাল্টা লেখে রবীন্দ্রনাথের গানের কলি। কলেজের এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে খলিল স্যার বিদ্রোহী কবিতাটা আবৃত্তি করলেন। পুরোটা মুখস্থ। হলরুম যেন করতালিতে ফেটে যাবে। দুখু নিজে পড়েছে মানুষ কবিতাটি। আর সুমি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইলো,

“মনে রবে কি না রবে আমারে সে আমার মনে নাই।
ক্ষণে ক্ষণে আসি তব দুয়ারে, অকারণে গান গাই॥
চলে যায় দিন, যতক্ষন আছি পথে যেতে যদি আসি কাছাকাছি
তোমার মুখের চকিত সুখের হাসি দেখিতে যে চাই—
তাই অকারণে গান গাই”॥

সুমি এই গানটাই কেন গাইলো? ভাবনার কূল-কিনারা পায় না দুখু। আর সুমি যে এত ভাল গাইতে পারে, সেটাই তো তার জানা ছিলো না। শুধু এটুকু জানতো, সুমির বাবা তাদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। বদলির চাকরি। যে কোন সময়ে সুমি উড়াল দিতে পারে। হলোও তাই। অন্য এক জেলায় বদলি হয়ে গেল সুমির বাবা। যাবার আগে দুখুকে সে বলে গেল, এইচএসি পরীক্ষার সময় দেখা হবে। তখন বর্ষাকাল। বিদায় বেলায় একটা কদম ফুলও দুখুর হাতে দিয়ে গেল সুমি।

এই যে হেন করা হলো, তেন করা হলো, এর সঙ্গে মেশা হলো, ওর সঙ্গে শোয়া-বসা হলো, এর সবই অলীক; কল্পনামাত্র। আসলে সে কোনোদিন বাহির দেখে নি, মানুষের সঙ্গে মেশে নি, কোনোকালে তার নাম দুখু মিয়া ছিল না, সে আসলে কাজী নজরুলের বোবা কষ্টের ছায়া, শেষ বয়সে অসহায় দৃষ্টির ভেতর খিল আটকে বসে আছে

Nazrulসুমি যাবার পর খলিল স্যারের সান্নিধ্যে এলো দুখু। আলাপে আলাপে জানলো নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের ওষুধ খাওয়ানোটা শুধুই একটি গালগল্প। আসলে দুজন দুই ধরনের কবি। খলিল স্যারের কল্যাণে শেষের কবিতা, গোরা, নৌকাডুবি, গীতাঞ্জলি এসব হাতে এলো তার, এলো নজরুলের বেশ কিছু বই। কাজী নজরুলের প্রতি ভালবাসা আরো বাড়লো। রবি ঠাকুরের উপরও কোন রাগ রইলো না। বরং অনুরাগ জন্মালো। নিজেও একটু-আধটু কবিতা লেখার চেষ্টা করতে থাকে দুখু। আর অপেক্ষা করতে থাকে, কবে সুমির সঙ্গে দেখা হবে। ওর রবীন্দ্রপ্রীতি জেনে সুমি নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে!

দেখা হলো। পরীক্ষার হলে। পরীক্ষা দিয়ে উপজেলা কোয়ার্টারে চলে যায় সুমি। দুখুর সাথে হাই-হ্যালো ছাড়া কথা হয় না। পরীক্ষা শেষ হবার জন্য অপেক্ষা করে দুখু। কত কথা জমে আছে, সুমিকে কত কী বলার আছে! পরীক্ষার শেষ দিন সুমিকে নিতে এলো ওর বাবা-মা, ভাই-বোনরা। সঙ্গে এক সুদর্শন যুবককেও দেখলো দুখু। সে সুমির দিকেই যাচ্ছিল। সুমিও দুখুকে দেখে জোরে হাঁক দিলো…দু__খু___উ___উ! কাছে যাবার পর যুবকের সঙ্গে দুখুর পরিচয় করিয়ে দেয়, “ও হচ্ছে দুখু। কলেজে আমার একমাত্র ছেলেবন্ধু। আর দুখু, ও হচ্ছে সুমন। আমার কাজিন। বুয়েটে পড়ে। ও তোমার দুলাভাই”।

দুখুর যেন পায়ের তলায় মাটি নেই। মাথা ভনভন করে ঘুরছে। নাইস টু মিট ইউ বলে হাত মেলালো তবু; একটা কষ্টচাপা হাসি রাখলো মুখে। কে যেন হাঁপরচাপা বিরহে দুখুর পৃথিবী কাঁপিয়ে গাইছে,আমি চিরতরে দূরে চলে যাব তবু তোমারে দেব না ভুলিতে…।

IslamKaziNazrul2তের বছর পর বসন্ত উৎসবে চারুকলার মঞ্চে দেখল সুমিকে। নাহ! ভুল দেখে নি। বাসন্তী রঙ শাড়ি পরে, খোঁপায় গাঁদা ফুল ছড়িয়ে গাইছে, বসন্ত মুখর আজি দক্ষিণ সমীরণে মর্মর গুঞ্জনে বনে বনে বিহ্বল বাণী ওঠে বাজি…। তখন বউ দুখুর হাত ধরে কাঁধে হেলান দিতে চাইছে। দুখুর কেবলি মনে হতে লাগলো, এই যে হেন করা হলো, তেন করা হলো, এর সঙ্গে মেশা হলো, ওর সঙ্গে শোয়া-বসা হলো, এর সবই অলীক; কল্পনামাত্র। আসলে সে কোনোদিন বাহির দেখে নি, মানুষের সঙ্গে মেশে নি, কোনোকালে তার নাম দুখু মিয়া ছিল না, সে আসলে কাজী নজরুলের বোবা কষ্টের ছায়া, শেষ বয়সে অসহায় দৃষ্টির ভেতর খিল আটকে বসে আছে। হেথা-হোথা কত ঘোরা হলো, অথচ দরজা খুলে কখনও বাইরে পা ফেলা হয় নি। সুমি নামের কাউকে সে চেনে না।

১০.০৬.২০১৫
রুহুল মাহফুজ জয়

রুহুল মাহফুজ জয়

জন্ম ৩১ মার্চ ১৯৮৪, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা : সাংবাদিকতা।

শিল্প-সাহিত্যের ওয়েবজিন শিরিষের ডালপালা’র সমন্বয়ক।

প্রকাশিত বই :
আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো [কবিতা, ২০১৬, ঐতিহ্য]

ই-মেইল : the.poet.saint@gmail.com
রুহুল মাহফুজ জয়

Latest posts by রুহুল মাহফুজ জয় (see all)