হোম গদ্য তারিক টুকুর সৌন্দর্যে যাত্রা

তারিক টুকুর সৌন্দর্যে যাত্রা

তারিক টুকুর সৌন্দর্যে যাত্রা
628
0

রূপ থেকে কোরকে যাবার এবং এর বিপরীত বিহার নিয়ে কবির অডিসি চলে। পরিক্রমায় গড়ে ওঠে ভাষা ও সংগীত। উপলব্ধির ধীর স্বর প্রক্ষিপ্ত হয় যাত্রার বাঁকে। গড়ে ওঠে কবিতার ডৌল। তারিক টুকুর বই বিস্মৃতি ও বিষাদটিলা’র শুরুতেই এই পরিক্রমার ছাপ দেখতে পাই। অন্তর্দৃষ্টি তাকে নিয়ে যায় অনেক গভীরে, আমাদের তিনি দেখিয়ে দেন বাস্তবতার কিছু অজানা প্রদেশ। কবি তার অন্তর্দৃষ্টিতেই তো প্রাতিস্বিক হয়ে ওঠেন।

“নীল ময়ূরটি” যখন “লাইটহাউস” হয়ে দেখা দিল দিব্য আলোর মতো, এবং এরপর “শৈল চোখ”—যার “আয়ু আছে”—এড়িয়ে কবি অভীষ্টে পৌঁছান, স্মৃতি হয়ে থাকে এক “সূর্যমুখী ফুল”। এর পর আত্মার উদ্ভাসের মতো, অস্তিত্বের সামনে ‘অপর’এর মতো কোলাজকল্প হয়ে আসে এক সুর—“কেননা, প্রেমের চেয়ে প্রেমের গানেরা নাকি অধিক সুন্দর”। একটি বিরতি দিয়ে আরেক উপলব্ধি দৃশ্য “বাগান রঙিন”।


তারিকের ভাষা-জগৎ গড়ে ওঠে মানবিক সংকট, উপলব্ধি ও নতুন বাস্তবতায় নিজেকে আবিষ্কার বা অস্তিত্বের গহিনে কিছু নতুন বাস্তবতার উদ্ভাস ঘটিয়ে।


যদি দেখতে চাই তারিকের ভুবনকে কী কী রঙ গড়ে তুলেছে এই বইটিতে, বুঝতে পারি লাল ও এর বিবিধ টোন এবং তাদের টোনালিটি (যাকে আমি রঙের বাঙ্‌ময়তা বলি)—“রক্ত-সর”, কালোর বিবিধ গাঢ়তা, নীল কালোর মিশেল, খশখশে কালো—যেমন ছিল খশখশে লাল (“মরচে ধরা টিনের ফুল”)—অন্ধকারের বিক্ষেপ, হরিৎ, নীল, ধূসর, রূপালি, আমি ক্রিস্টালকেও রং বলি, গতি, শক্তি ও ধ্বনিকেও রঙের মাত্রায় ধরি—শরীরী অনুভূতির, এবং আরও দুয়েকটি। প্রক্ষিপ্ত স্বর টানা রেখার মতো, মোটা টানের রঙের মতো দাঁড়ায় আমার চেতনায়।

নাইটমেয়ারের গল্পে মরচে ধরা টিনের ফুল নিজের অস্তিত্বে জেগে ওঠে, “ঝনঝন করে ওঠে”—বস্তুর জীবনের গভীরে দেখতে পাই আমরা, যেখানে দুঃস্বপ্ন থেকে ক্রোধে পৌঁছবার ধ্বনি ওঠে “নদীর জংশনে, সমুদ্রে” “আছড়ে” পড়ার—যেন অদৃশ্য তার দিক থেকে মুখ ফেরানো জগৎকে ভর্ৎসনা করছে আর তা দেখে ঘুড়ি ও তারাফুলের মতো প্রাণগুলো সরে যাচ্ছে বিপরীতে, দ্রুত, দৌড়ে। এরপর আমরা জীবনের আরও গহিনে প্রবেশ করি, যেখানে হরিৎ নীহারিকার ভেতর “অন্তর্জীবন” গুমগুম করে, সে ধ্বনি ক্রন্দনের। অস্থিরতা আর বিলয় গলে যায় অশ্রুধ্বনিতে।

তারিকের ভাষা-জগৎ গড়ে ওঠে মানবিক সংকট, উপলব্ধি ও নতুন বাস্তবতায় নিজেকে আবিষ্কার বা অস্তিত্বের গহিনে কিছু নতুন বাস্তবতার উদ্ভাস ঘটিয়ে। চারু বলে চিহ্নিত করা যায় লিনিয়ারিটি না মেনে উল্লম্ফনের মতো এক বোধ থেকে দূরতম বোধে চলে যাওয়া, যা পাঠকের অভিনিবেশ দাবি করে; একই সাথে কারুতায় তিনি বিশ্রাম তৈরি করে অস্বস্তিকে দূর করে দেন। তার বিমূর্তায়নগুলো জেগে থাকে মানবিক বোধ, সন্ত্রাস, অস্থিরতায় ধরা দেওয়া দৃশ্যমালা ও স্বরের প্রক্ষেপণ এবং রঙের অন্তর্বয়ানের মিলনে, সুরের রসায়নে। গতির ত্রাসিত বিস্তারকে শিলীভূত করে দেন তিনি। আর ভীতি ও ত্রাসের আঁধি পরিব্যাপ্ত হয়ে থাকে তার চারপাশে। এভাবে ভাষার পলিফোনি গড়ে ওঠে তার।

আমাদের সভ্যতার কিছু discontent এর মাঝে একটি হলো নর-নারীর সম্পর্কের বিভাজন। ভাই-বোন, মা-ছেলে এইসব বিভাজন ও পরিচয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে অনেক কিছু। নারী, যে কিনা মা-বোন-প্রেমিকা-সন্তান তার স্নেহধাত্রী ভূমিকাকে সভ্যতা নানাভাবে ভাগ করে দিয়েছে, যদিও স্নেহ ও প্রেমের সূত্রগুলোকে মুছে ফেলতে পারে নি। ‘পরিখা’ কবিতার দিকে তাকাই। স্নেহ ও যৌনতার মাঝে “ভেঙে পড়া” বালির পরিখায় ঢাকা পড়তে পড়তে অবচেতনের গভীর থেকে ভাইটির অনুভূতিকে জ্বলে উঠতে দেখি “যেন শ্বাপদের দাঁত হয়ে চক্রবালে জ্বলে আছি মিথ্যার ক্রিস্টাল।” উপলব্ধির আরেক পর্যায় পাই সেই প্রক্ষেপিত অস্তিত্ব ভগ্নাংশে যেখানে দাঁতটিই বলে মৃত্যুকে বদলে দিতে, এবং মৃত্যুর আস্থাভাজন বলে আমাদের আবিষ্কার করার ফাঁকে বিমূর্তায়নের রূপ পাই “নিজের উড়ন্ত চোখ তোমার তোরঙ্গে রাখে জমা”।

‘পরিখা’ কবিতায় দেখতে পাওয়া “বালি” অস্তিত্বের সাথে খোলসের মতো লেগে থাকে যেন। নিজের দিকে তাকালে বালির দেহ দেখেন কবি—

অযথাই জেগে ওঠি বালির শরীর
নিয়ে। বিমূঢ় বালির দূর থেকে জেগে ওঠে দূর থেকে আমাকেই দেখে,  [অস্তিত্ববাদাম]

আমাদের অস্তিত্বের সীমানায় জেগে থাকা উঁকি দেওয়া অর্থহীনতা ও ধ্বংসের ওপারেও নাস্তি পেরিয়ে যা থাকে তা আমাদের সুর ও সুন্দর এই বালির দেহই তা বোঝে—

বোঝে—বিলীনের মাঝামাঝি আজ কেন ছন্দময়  সেই বেলাভূমি।  [অস্তিত্ববাদাম]

‘চরাচর’ কবিতায় দেখি তারিকের ভাষার কিছু লক্ষণ। প্রথম লাইনটির পর বিভ্রান্তির আবরণে কসমিক আবহের উপলব্ধি থেকে কবিতা উল্লম্ফনে চলে যায় প্রক্ষেপিত স্বরে—“গান ছেড়ে যারা উঠে গেছে, তাদের প্রত্যেকের ডানা খসে গেছে।” কলাজের মতো আরেক উপলব্ধির চলছবি “সাইরেনে সড়কের পাশে দাঁড়ানো গাছগুলো রং বদলায়”। প্রথম স্তবকে পরিসরের হঠাৎ বিলোপে উৎকেন্দ্রিক ভাষার আবর্তে আমাদের যাত্রা বলে চিহ্নিত করতে পারি, কিন্তু কবির কারুকৃতি পাঠককে স্বস্তির আশ্রয়চ্যুত করে না। দ্বিতীয় স্তবকে দেখা দেয় ভীতির অভিজ্ঞতা।

উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার গভীরতা দেখি ‘পথ’ কবিতায়। তিনি চিনতে পারছেন “চির অন্ধকার”-কে এবং তার উৎসও ধরতে পারছেন, “নিজেরই মুখশ্রী চিরে”—সুক্ষ্মতায় তিনি “মুখশ্রী”কে-ই চিনতে পারছেন, মুখের বদলে। এরপর বিমূর্তায়ন “একটি পথ আমাদেরই কথা যেন বিসর্পিলভাবে বলে যায়”—একটি সাংগীতিক দৃশ্যায়ন। একই কবিতায় “ঢুলি বাজছে” এই অনুভূতি আরেকটি সংগীত মূর্তায়ন। কবিতাটির কেন্দ্রে থাকা রেলগাড়ির ভার নিয়ে মানস অতিক্রম করার পর অর্কেস্ট্রেশান এর মতো আবহ সেই “চির অন্ধকার”কে দেখি ফেরত আসছে ছায়ার সাথে—

রাস্তায় উন্মাদের গানের মাঝে ছায়া আর চির অন্ধকার দোদুল্যমান।

যেকোনো শিল্পেই কথার, থিমের ও মোটিফের পুনরাবর্তন বিশিষ্ট ব্যঞ্জনা গড়ে তোলে, এখানেও তাই হলো। আরও পেলাম “আপেলের মাঝখান থেকে গড়িয়ে নামতে থাকা আভা” যা অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির সাথে “আরও রক্তবর্ণ হয়ে উঠছে”। একটি গল্পের আবহ গড়ে তোলেন তিনি পাখির ডাক বা ধ্বনি ও ছাত্রেরা বাড়ি ফিরছে এই দৃশ্যে। গভীরভাবে পাই ওই রঙের পরিচয় এই উপলব্ধিতে “এর নামই কি সুর, আলোর সাথে সাথে নাচছে, নিভে যাচ্ছে”। লক্ষণীয় কোথাও প্রশ্নবোধক চিহ্ন নেই কথাটিতে।


আলোআঁধারি থেকে স্ফুট হয়ে ওঠা চেতনায় আসা তারিকের কবিতার আরেক রূপ।


নীরবতা গড়ে তোলা এবং মৌনীর বিবিধ বিশিষ্টতা এই সময়ের কবিতাকে বিশিষ্ট করে তোলে। রূপ, অভিজ্ঞতা ও অভিব্যক্তিকে গাঁথবার সেতু ভাষা, ভাষাহীনতা ও মৌনীর রূপায়ন দেখতে পাই কবিতায়।

কেননা সে ভাষাহীন—ভাষাহীনতা ঘেরা থাকে নিরুচ্চারে। নীরবতা গড়ে ওঠে যখন দৃশ্যটি এমন—

সমুদ্রে মীমাংসার মতো কখনো কি দেখো উপকূল
অথবা শরীরের সীমা পরিসীমা!

এবং মূক অনুভবের অসীম বিস্তারের দিকে নিয়ে যায়—

গম্বুজ, জলের ভেতর থেকে ফুলে ওঠা সহস্র গম্বুজ।  [দাঁড়]

টানা সুর ও ধ্যানের গভীরে নীরবতার যাপন—

আমি ব্যাধের ধনুকে টানা অভিনিবেশের মতো সমুদ্রের নিরন্তর প্রার্থনায় ভাসি  [দাঁড়]

স্মৃতির সামনে প্রবল অভিজ্ঞতা মৌনীতে প্রসারিত হয়—

প্রভুর দোমড়ানো রুটি ভেসে চলে যায়, অলিন্দ বিক্ষেপসহ ভাসে,       
ভাসে স্তনগুটি, উগ্রচাঁদ—তোমার মৌনতায়।  [দাঁড়]

ভাষাপরিত্যক্ত সত্তা কিভাবে বাঙ্‌ময় হবে দেখি—

আমরা ছিলাম ভাষাপরিত্যক্ত—তাই
মেঘের সাথেও কথা বলতে চেয়েছিলাম।  [বৃষ্টি]

এখানে ভাষা আর লেখ্যও থাকবে না, শরীরী হয়ে উঠবে, সত্তায় গেঁথে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষায়

না ভাষায়, না অক্ষরে—শুধু নৃত্যে, উঁচু দাঁতে
আমাদের হাসি—  [বৃষ্টি]

আরও এক মূক অস্তিত্বের মুখোমুখি করেন কবি আমাদের—

নাজুক তিরের মতো চান্দ্র-আকর্ষণে পৌঁছাতে চেয়েছে
তার কালো বৃষ্টিকে লক্ষ করে।  [বৃষ্টি]

মূক আরও অভিক্ষেপ দেখি—

ঝরে পড়ে নীহারিকা, মৃতের দৃষ্টির মতো শান্ত সমস্ত পাথর।  [জল]

অব্যক্তের রূপ গড়ে ওঠে—

সেখানে পৃথিবী থেকে যত ধ্বনি আসে, যত তির, চাঁদের অলিন্দে যারা
বাড়ি খেয়ে ঝনঝন শব্দ করে ওঠে, বুঝে নাও, তারাই তোমার কাছে
আমার নিরুদ্ধ বার্তা।  [বৃষ্টি]

শেষ শব্দটিকে কবি কিভাবে বিবিক্ত করে দিলেন খুব লক্ষণীয় তা। “হিমখণ্ড” পরিচয়ে বার্তার মূক অস্তিত্বের আরেক মুখ দেখিয়ে দেন তিনি, এবং ভাষাহীনতার—তা স্বপ্নে বেঁচেছিল—পরিণতি ট্র্যাজিক হয়ে ওঠে—

জেগে দেখি আমার সমস্ত কথা তোমার দুয়ারে পৌঁছে
ততক্ষণে জল হয়ে গেছে।

আলোআঁধারি থেকে স্ফুট হয়ে ওঠা চেতনায় আসা তারিকের কবিতার আরেক রূপ। অস্তিত্বকে আয়নায় দেখবার কবি-পরম্পরার প্রকাশ তার মাঝেও আছে। তার ভাষার পরিচয় গড়ে ওঠে আবিষ্কৃত বাস্তবের নানা অভিক্ষেপ গুপ্ত এলাকা ঢুঁড়ে দেখা, উদ্দীপক ও এর সামনে কবি আত্মার প্রতিক্রিয়াকে নানা মাত্রায় ফলিয়ে তোলা, অথবা গড়ে তোলা বাস্তবকে সংগীতের নিরিখে উপস্থিত করা। ধ্বনি, স্বর, বর্ণ ও ছবিতে—যারা ধরে রাখে শ্রুতি-বর্ণালি স্বর-ছবি—প্রত্যক্ষ করে তোলেন তিনি একেকটি বাস্তবকে।

হালকা, বর্ণান্ধের মতো
প্রতিফলনের ভেতর থেকে তোমায় দেখি

এর পরই বিরতি দিয়ে উপলব্ধি আসে স্বরচেতনা পেরিয়ে—

এই এক মরূদ্যান—যাতে সমস্ত প্রেমের সুক্ত
ছায়ায় বিরাজমান


কবিতা এখানে যা বলে তার চেয়ে গোপন করে অনেক খানি, অনির্বচনকে ধরে থাকে, যার গহিনে একেকটি বাস্তবতা গুঞ্জন করে চলে আমাদের আত্মায়।


আমাদের দেখিয়ে দেন তিনি “তার বাইরে নানা গুপ্ত খাদ, মরীচিকা”। নির্দেশের মতো একটি “সটান আঙুল” জেগে ওঠে, এবং কবি তোলেন প্রশ্নধৃত উত্তর “কাকে গাঁথতে চায়!”।

এমন নির্দেশক আঙুল স্বর মাত্রা নিয়ে জেগে ওঠে ‘নীল অশ্বারোহী’ কবিতায়, যেখানে গতি ও শক্তিকে ভাষা পরিসরে অনূদিত হতে দেখি, ধ্বনি-প্রশ্ন-ছবি নিয়ে।

বাজো ঝুনঝুনি, অনিদ্রিত মকরকুণ্ডল।
দূরে বিম্বিত ইস্পাত হলকায় দেখো বাম-চক্ষু কী রকমে ঘোরে।  [নীল অশ্বারোহী]

ভীতির ও ত্রাসের ছবিগুলো ফিরে আসে তারিকের আর্কিটাইপ মোটিফ নিয়ে—

অবিশ্রান্ত করাত কলের শব্দে, সেই দাঁত, নেত্রহীন ধড়
অদেখা শত্রুকে চিনে নেয়।  [নীল অশ্বারোহী]

বিস্তারিত অস্তিত্বের রূপ হয়ে জ্বলে ওঠে আগুন এবং এর প্রশ্নপ্রবণ সত্তা—

‘দেখি তুমি কেমন স্ফটিক’—এই প্রশ্নে হুতাশন দুলে ওঠে।
টলায়মান সংসার তাতে প্রতিসরিত, সময়চিহ্ন গলমান।  [নীল অশ্বারোহী]

শেষ চরণে দালিকে দেখতে পেলাম কি? বিলয় লীলার পিঠ ঘেঁষে চলা কবি মানস গতিকে খুঁজে পায়, গমকের মতো শ্বাসরোধী তালে, এবং উত্তরণ ঘটে তার—

হাসির অদম্য রোলে, ট্রেনের অনন্ত গুমগুমে, সংগুপ্ত ধাতুতে
নীল অশ্বারোহী জন্মলাভ করে।

এই “গুমগুম” ধ্বনি যতটা বলে তার চেয়ে শুষে নেয় এবং গড়ে তোলে বেশি—এখানে কবির আর্কিটাইপই নিজেকে দেখিয়ে দিচ্ছে বারবার। এখানেই শেষ নয় সে ভাষা ও নির্ঘোষ রেখে যায় স্বর—যা কিনা সত্তার শ্রুতিদেহ—তার অনন্য বিস্তারে। সুন্দরকে মহাবয়ানের বলয় থেকে মুক্ত রাখার প্রতিজ্ঞা তার।

আমি ইতিহাসগ্রন্থের জিভ কেটে দিতে চাই, ঘুমন্ত নক্ষত্র যাতে
এর চিৎকারে ঝরে না পড়ে। [নীল অশ্বারোহী]

কেননা নীল অশ্বারোহীর চালক সত্তা “স্বপ্নের ধাবনক্ষেত্র”। কূটাভাসের মতো দেখা দেয় “উন্মুখ ফলের দিকে ছুটে আসা শীতের বাতাস”। কেন কবি সুন্দরের “সুষুপ্তি”কে তথা মৌনী মাত্রাকে ঘিরে রাখতে চান নিভৃতে তার জবাব পেয়ে যাই যখন তিনি দেখিয়ে দেন ওখানে “সুষুপ্তির নালে নালে” প্রবাহিত হয় “বীজ”, অর্থাৎ প্রাচীন ধীরতায় আস্থা রেখে আজকের কবি “ধাতুপরাভূত দেশে” থেকেও বিদ্রোহ করেন,

লৌহনিনাদ আমি তোমাদের তন্ত্রীতে ছিটাই।
ছড়াই বিভ্রম—

বিদ্রোহী ও প্রেমিকের—কেননা প্রেম ছাড়া বিদ্রোহী জন্মে না—অবস্থাটি এই—

এই ঘাড়, কশেরুকা তবু অযৌক্তিক উড়ে যেতে চায়। [নীল অশ্বারোহী]

তারিকের ভাষায় একটি মোড় দেখতে পাই ‘অন্ধকারে বলা কথা’ কবিতাটিতে। পরিমিতি, মৌন সংগীত, ক্ষুদ্রায়তনে বৃহৎ জগৎকে ধরা এবং নীরবতা তৈরি করা—এগুলো এই ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য। স্তবকগুলোর মাঝে বিশিষ্ট ও অর্থবহ বিরতি দিয়ে ওই পরিসরটিকে ভাষার অংশ করে তোলা হয়।

ফুল, অবিমৃশ্যের নাম [অন্ধকারে বলা কথা]

সন্ধ্যা—একটি বিভাজক
ল্যাম্পপোস্ট এক ধরনের অতিরঞ্জন।

কবিতা এখানে যা বলে তার চেয়ে গোপন করে অনেক খানি, অনির্বচনকে ধরে থাকে, যার গহিনে একেকটি বাস্তবতা গুঞ্জন করে চলে আমাদের আত্মায়। আরও দুয়েক পঙ্‌ক্তি দেখা যাক—

সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে এই খেজুর গাছ তার রস দিয়ে যায়।
সে-ও বিভাজিত, তাই লম্বমান। [দাগ]

ভাষা পরিণতি পাচ্ছে দেখতে পাই—কারণ সে স্বল্প পরিসরে আগলে রাখছে অনেক গহিনকে

—আমার সম্বল শুধু পাখাগুলো
অন্ধের শিথিল চর্মে, ধবল সিংহের স্তবের আড়ালে।” [হাত]

এই কাব্যের জনয়িতা কবির জগতে বেশ স্পষ্টভাবেই বিরাজ করে বিষাদ, ব্যাপ্ত হয়ে ওঠে এবং বিবিক্তির বদলে শিল্পের ক্ষত্র গড়ে তোলে—সে শিল্প গাঢ় কালো, অভিনিবেশের ও দৃষ্টিপাতের। বিষাদের গভীরে ছুঁয়ে দেখেন তিনি। মমতা, নিয়তির সাথে বোঝাপড়া, আকুতি ও কাব্যিক অন্তর্দৃষ্টি মিলে তার শিল্পকে বিশিষ্টও করে তোলে। কথা বলছি ‘বিস্মৃতি ও বিষাদটিলা’ কবিতাটি নিয়ে। বইয়ের শিরোনাম কবিতাটি কবির চেতনার স্মারক। তার ত্রাস ও ভীতির জগৎ, অন্ধকার পরিক্রমা, রক্তদৃশ্য, বিলপের ও বিলয়ের স্মৃতি ও এর বিক্ষেপ সবকিছু ওই অনুভূতি সমতলে চোখ মেলে।

তানভীর মাহমুদ

তানভীর মাহমুদ

জন্ম ৯ অক্টোবর, ১৯৮০, ঢাকা। ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এমবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অপরাধতত্ত্ব ও বিচার-এ এমএসএস।
পেশা : চাকরি।

প্রকাশিত বই : প্রতিবিহার (কবিতা)

ই-মেইল : editor.hansadhani@gmail.com
তানভীর মাহমুদ