হোম গদ্য ঢাকায় আর্মেনীদের কথাচিত্র

ঢাকায় আর্মেনীদের কথাচিত্র

ঢাকায় আর্মেনীদের কথাচিত্র
1.22K
0

১৬১০ সালে দিল্লীর সিংহাসনের মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলায় পাঠালেন তাঁর জবরদস্ত সেনাপতি ইসলাম খাঁ চিশতিকে। ঢাকায় আসার আগে ইসলাম খাঁ ছিলেন রাজমহলে। বর্ষা যখন নামব নামব করছে তখন তাঁর বজরা এসে থেমেছিল ঢাকার বাবুবাজার খালে। ঢাকায় পা দিয়েই ইসলাম খাঁ ঠিক করলেন, ঢাকা হবে সারা বাংলার রাজধানী। তবে তিনি ঢাকার নাম বদলে রেখেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর, সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে। এই নামটি চালু ছিল সরকারি কাগজপত্রেই, কিন্তু লোকজন সবসময় পুরোনো নাম ঢাকাই মনে রেখেছে। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে ঢাকা ছিল বিশ্বের দ্বাদশ বৃহত্তম নগরী। মুঘল আমলে স্থাপিত বাংলার তিন রাজধানী—ঢাকা, মুর্শিদাবাদ এবং কলকাতার মধ্যে ঢাকাই সবচেয়ে পুরোনো। ১৯০৫ সালে ইংরেজরা যখন বাংলাকে দু’ভাগ করেছিল তখন ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ’-এর রাজধানী করা হয়েছিল ঢাকা-কে। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশকে ইংরেজরা দু’ভাগে ভাগ করে স্বাধীনতা দিয়েছিল। তখন জন্ম হয়েছিল নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের। পাকিস্তানের ছিল দুটি প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হয়েছিল ঢাকা। ১৯৭১ সালে যখন আমাদের এই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো স্বাধীন দেশ হিশেবে, তখন স্বাধীন দেশের নতুন রাজধানী করা হয় আবার ঢাকা-কে।

c5
আর্মেনিয়ান চার্চ

পৃথিবীর আর কোনো শহরের বোধ হয় এ সৌভাগ্য হয় নি, কিন্তু আমাদের এই ঢাকা রাজধানী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে চার-চার বার। মুঘল আমলে ঢাকার বাড়-বাড়ন্তের একটি প্রধান কারণ ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। ঢাকায় যে শুধু ঐ সময়ে বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র তৈরি হতো তাই নয়, আমদানি-রপ্তানিরও প্রধান কেন্দ্র ছিল ঢাকা। ঢাকার রপ্তানি-বাণিজ্যের মধ্যে প্রধান পণ্য ছিল কাপড়। সেই কাপড়ের মধ্যে প্রধান ছিল মসলিন। বাঁশের খোলের মধ্যে করে ব্যবসায়ীরা মসলিন নিয়ে যেতেন বিভিন্ন দেশে। তৎকালীন মুঘল সাম্রাজ্যের বারোটি বড় বাণিজ্য কেন্দ্রের মধ্যে একটি ছিল ঢাকা। সম্পদের টানে বিদেশি বণিকেরা এসে ভিড় জমাতেন এ শহরে। মুঘল আমলে ইরান, আরব, গ্রিস, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হল্যান্ড, পর্তুগাল প্রভৃতি দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা এসেছেন ঢাকায়। সব মিলেয়ে ঢাকা ছিল ঐ সময়ে গমগমে এক শহর।

b1
বুড়িগঙ্গা

শহরের দক্ষিণ দিয়ে বয়ে চলেছে একটি নদী, এই নদীর বাতাসে শহর স্নিগ্ধ থাকে, শহরের আত্মা বলা হয় এই নদীকে। নদীর নাম বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে চারশত বছরের শহর আমাদের রাজধানী ঢাকা। বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় তুরস্কের ঠিক পুবের দেশটাই আর্মেনিয়া। আর্মেনিয়ার উত্তরে জর্জিয়া, পুবের আজারবাইজান এবং দক্ষিণে ইরান। আর্মেনিয়ার রাজধানীর নাম ইরেভান। তার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর নাম হরাজদান। ইরেভান থেকে ঢাকা। হরাজদান থেকে বুড়িগঙ্গা। আর্মেনিরা ঢাকায় এসেছিলেন কবে জানা যায় নি। তবে ধরে নিতে পারি, মুঘল আমলে ভাগ্য বদলাতে দেশ-বিদেশ থেকে অনেকে এসেছিলেন ঢাকায়, আর্মেনিয়ানরাও এসেছিলেন তখনই। তেজগাঁয় পর্তুগিজ গির্জায় কবর আছে কয়েকজন আর্মেনিয়ানের, যাদের মৃত্যুও হয়েছিল ১৭৪১ থেকে ১৭৯৫ সালের মধ্যে। সুতরাং, ধরে নিতে পারি অষ্টাদশ শতকেই আর্মেনীয়ানরা দু’-একজন করে আসতে থাকেন ঢাকায়। বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে যে অঞ্চলে আর্মেনিরা বসবাস শুরু করেন সেই অঞ্চল পরিচিত হয় আর্মেনীটোলা (আর্মানীটোলা) নামে। টোলা শব্দের অর্থ পাড়া বা পল্লি।


বর্তমানে ‘বুলবুল একাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ যে বাড়িতে অবস্থিত সেটি ছিল নিকি পোগজের


সব আর্মেনি যে আর্মেনীটোলায় বাস করতেন এমন নয়। কেউ কেউ বাস করতেন মৌলবীবাজার ও নলগোলায়। সম্ভাব্য এ শহরে এখন আর আর্মেনি সম্প্রদায়ের কেউ নেই। ১৯৮৪ সালে স্টেফান নামে একজন আর্মেনি বেঁচে ছিলেন। বসবাস করতেন নারায়ণগঞ্জে। আর্মেনীটোলায় থিতু হয়ে বসার পর আর্মেনিরা এখানে নির্মাণ করেছিলেন তাদের গির্জা। বর্তমানে আর্মেনীটোলায় আর্মেনি যে গির্জাটি আমরা দেখতে পাই তা নির্মাণ করা হয়েছিল ১৭৮১ সালে। এখন যে জায়গায় গির্জাটি দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে রয়েছে আর্মেনিদের গোরস্থান। গির্জা নির্মাণের জন্য গোরস্থানের আশেপাশের যে বিস্তৃত জমি তা দান করেছিলেন আগা মিনাস ক্যাটচিক।

g
ঘোড়ার গাড়ি

একটি ক্ষুদ্র সম্প্রদায় হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা শহরে আর্মেনিরা ছিলেন প্রভাবশালী। কারণ, তাদের বিত্ত ছিল। অষ্টাদশ শতকে লবণ-ব্যবসা ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া। লবণ উৎপাদন ও বিতরণের জন্য কোম্পানি নিয়োগ করত ঠিকাদার। আর পূর্ববঙ্গে লবণের ঠিকাদারদের অধিকাংশই ছিলেন আর্মেনি। পাটের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা প্রথমে আর্মেনিরাই বুঝেছিলেন। পাটের ব্যবসায় তারাই পালন করেছিলেন অগ্রণী ভূমিকা। ১৮৬০-৭০-এর দিকে পাট ব্যবসায়ে যাঁরা প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছিলেন তারা হলেন— আব্রাহাম পোগজ, এম. ডেভিড, জে. সি. সারকিস, এম. কাচাতুর, এ থমাস, জে. জি. এন. পোগজ, মাইকেল সারকিস এবং পি. আরাতুন। এদের মধ্যে ডেভিড ছিলেন প্রধান। তাকে বলা হতো ‘মার্চেন্ট প্রিন্স অফ ইস্টার্ন বেঙ্গল’। এছাড়া কাপড়, পান ও সুপারির ব্যবসায়েও ছিল আর্মেনিয়ানদের আধিপত্য। জমিদারিও ছিল অনেকের। ১৮৬৮ সালের ঢাকার জমিদারদের এক তালিকায় দেখা যায়, ছ’জন ইউরোপীয় জমিদারের মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন আর্মেনি। এঁরা হলেন- জে.জি.এন. পোগজ, জি.সি. পানিয়াটি, জে. স্টিফান, জে.টি. লুকাস এবং ডব্লিউ হার্নি। এসব ধনী আর্মেনিয়ানরা ঢাকায় তৈরি করেছিলেন নিজেদের থাকার জন্য প্রাসাদতুল্য সব বাড়ি।

বর্তমানে ফরাশগঞ্জের রূপলাল হাউস হিসেবে পরিচিত মূল বাড়িটি ছিল আরাতুনের। ‘বুলবুল একাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ যে বাড়িতে অবস্থিত সেটি ছিল নিকি পোগজের। জমিদার, ব্যবসায়ী এবং বিদেশি হওয়া সত্ত্বেও পোগজ ঢাকায় নানা ধরনের সমাজসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন সক্রিয়ভাবে। মি. নিকোলাস পিটার পোগজ বা নিকি পোগজ ১৮৪৮ সালে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে শাঁখারী বাজারের মুখে অবস্থিত। আজকের বাহাদুর শাহ পার্ক, যার পূর্বের নাম ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক, এই পার্কেই ছিল একসময় আর্মেনীয়বাসীদের ক্লাবঘর, এখানে আর্মেনীয়রা বিলিয়ার্ড খেলতেন। উনিশ শতকের ঢাকায় পরিচিত ও প্রভাবশালী পরিবার হিসেবে যে ক’টি আর্মেনি পরিবারের নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হলো— পোগজ, আরাতুন, পানিয়াটি, কোজা মাইকেল, মানুক, হার্নি এবং সার্কিস। এঁদের বিত্তের ভিত্তি ছিল জমিদারি এবং ব্যবসা। ১৮৪০-৫০-এর দিকে অনেক আর্মেনি আবার পার্টনারশিপ ব্যবসায়েও যোগ দিয়েছিলেন। ১৮৪৬ সালে স্থাপিত ঢাকা ব্যাংকের একজন পরিচালক ছিলেন জে. জি. এন. পোগজ। কমিশন এজেন্সিতে (মাল সরবরাহ) প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছিলেন জে. লুকাস, এ. এম. ডেভিড, এ. থমাস এবং জে. মিনাস। ১৮৫৭ সালে ঢাকায় প্রথম ইউরোপীয় জিনিসপত্র বিক্রি করার জন্য দোকান খুলেছিলেন, জি. এম. সিরকোর। শাঁখারী বাজার স্থাপিত এ দোকানটির নাম ছিল ‘সিরকোর অ্যান্ড সন্স’। সি. জে. মানুক, জে এ. মিনাস এবং আনানিয়া দোকান খুলেছিলেন পাটুয়াটুলি, বাংলাবাজার ও দিগবাজারে।

b2
বুড়িগঙ্গাতীরে সূর্যাস্ত
* ফিচারে ব্যবহৃত সব ফটোগ্রাফ লেখকের