হোম গদ্য বই থেকে গল্প : জ্যোৎস্নার ঘরে কান্নার স্বর

বই থেকে গল্প : জ্যোৎস্নার ঘরে কান্নার স্বর

বই থেকে গল্প : জ্যোৎস্নার ঘরে কান্নার স্বর
424
0

রিপনচন্দ্র মল্লিক

1544539_690643974345251_6069769185638400582_n
রিপনচন্দ্র মল্লিক

 কখনো কখনো মানুষ যদি খুব বেশি অসহায় হয়ে পড়ে তখন কোন আশার আলো দেখলেই চোখে পানি এসে যায়। সে-পানি অপ্রতিরোধ্য

ক’দিন ধরে আমার কী-যে  হয়েছে, বুঝতে পারছি না।
হঠাৎ মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যায়। ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত লাগছে। আগে কখনো এরকম হয়নি। ঘুম ভেঙে যায়, এতে তেমন কোন সমস্যা নেই। কিন্তু ঘুম ভেঙে গেলেই একটি অদ্ভুত রকমের চিৎকার শুনতে পাই। তার চেয়ে বলি, চিৎকারের শব্দেই আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি যে বাসায় থাকি তার পাশ দিয়ে একটা সরু রাস্তা চলে গেছে, সেই-রাস্তায় কোন এক নারী মধ্য রাতে পুঁথি পাঠের মতো সুর করে কাঁদে। তার কান্নার শব্দ আস্তে আস্তে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। নিঃশব্দ রাতে যখন এই কান্নার শব্দ কানে ভেসে আসে তখন আমার ভেতরে কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে।
একদিন বিকেলে এতিমাখানার নিরাপত্তাকর্মী করিম চাচাকে ঘটনাটি খুলে বললাম। এখানে চাকরি করতে আসার পর থেকে করিম চাচাই আমার দেখাশোনা করেন। বলা যায় এতিমখানা পাহারা দেয়া আর আমার টুকিটাকি কাজকর্ম করাই তার দায়িত্ব।
তিনি আমার কথা শুনে হাসতে হাসতে বললেন, ‘আপা, আপনি কী আবার এইসব কান্নার  শব্দ শুনে ভয় টয় পাইছেন না-কি?’
‘কেন ? ভয় পাবো কেন?’
‘না মানে, আপনার বাসা থেকে কিছু দূরেই তো গোরস্থান। কোন ভূত-পেত্নি মনে করে ভয়-টয় পাইছেন কিনা সেটাই জিজ্ঞেস করলাম।’
‘না। আমি মোটেও ভয় পাইনি। আপনি কি তাকে চেনেন?’
‘মনে হয় হারানী। ওর আসল নাম কারো জানা নেই। তবে সবাই ওকে হারানী বলেই ডাকে। বছর চার পাঁচেক আগে দুর্ঘটনায় ওর স্বামী মারা যায়। সেই থেকে ময়মনসিংহ বাসস্ট্যান্ডের কাছেই পড়ে থাকে। নিজের নাম ঠিকানা কিছুই বলতে পারে না।
কেন যেন পাগলীটার জন্য মনটা ভীষণ ভারি হয়ে উঠল। বুকের ভিতরে কেমন মায়া মায়া লাগছে। আহারে মানুষের জীবন কত বিচিত্র!
বাসা থেকে দুপুরের লাঞ্চ করে অফিসের কাছাকাছি আসতেই ঝপঝপ করে এক পশলা বৃষ্টি এসে পড়লো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চেয়ে দেখি আমার পুরো শরীর ভিজে জবুথবু। ছাতা বাসায় রেখে আসায়, ভেজা ছাড়া আমার কোন উপায় ছিল না। ভালোই হলো কতোদিন যে বৃষ্টিতে ভিজি না! শেষ যেবার বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম, সেই স্মৃতি এখনো স্পষ্ট মনে আছে। প্রায় পাঁচ-সাত বছর আগের কথা। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। শ্রাবণ মাসের এক দুপুরবেলায় রুনুর সাথে ইচ্ছে মতো অঝোর ধারার বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম। আমাকে আর রুনুকে ভিজতে দেখে মা বারবার চিৎকার করে বলছিলো, ‘মিলি ঘরে উঠে আয় বলছি।’
‘আসছি, মা।’
‘বৃষ্টির পানিতে বেশি ভিজলে শরীর খারাপ করবে তো! ’
মাকে আসছি আসছি বলেও আমি বৃষ্টি ছেড়ে আসছিলাম না। মায়ের সুরের সাথে সুর মিলিয়ে রুনুও বলে উঠলো, ‘চল মিলি, আর ভেজার দরকার নেই। বেশি ভিজলে জ্বরে পড়তে হবে।’
রুনু আমার বান্ধবী। ডনোভান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আমরা দুজনে এক সাথে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। মাদারীপুর শহরে চারার ঘর এলাকায় পাশাপাশি বাসাতে আমরা ভাড়া থাকি। ক্লাস সিক্স থেকে আমাদের পরিচয়। তারপর এক সাথেই স্কুলের পড়াটা শেষ করলাম।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই আলোর দিশারী এতিমখানার গেটের কাছে প্রায় চলে এসেছি। আমাকে দেখেই করিম চাচা দৌড়ে এসে তার ছাতাটা মেলে ধরে, ‘আপা, বাসা থেকে ছাতা নিয়ে আসলে তো আর এভাবে আপনাকে ভিজতে হতো না।’
‘বুঝতে পারিনি, হঠাৎ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে। বাসা থেকে রওনা হওয়ার সময় দেখলাম আকাশ পরিষ্কার। এখনতো পুরোই ভিজে গেলাম।’
‘হু, তাইতো দেখছি।’
‘চাচা, আমাকে আপনার ছাতাটি দেন। এখনই আমাকে কাপড়গুলো বদলাতে বাসায় ফিরে যেতে হবে।’
আমার বাসা থেকে এতিমখানার দূরত্ব পাঁচ থেকে সাত মিনিটের পথ। আমি প্রতিদিন হেঁটেই আসি। গত ১ জুন আলোর দিশারী এতিমখানায় যোগদান করেছি। আগামী ডিসেম্বর মাসে চাকরির বয়স পাঁচ মাস হয়ে যাবে। এখানকার কাজের পরিবেশ আমার কাছে ভালোই লাগছে। এতিমখানার তত্ত্বাবধায়ক মাওলানা হাশিম-উদ-দৌলা যাকে সবাই বড় হুজুর ডাকে, তিনি আমাকে তার ছোট মেয়ের মতনই মনে করেন। যেদিন প্রথম যোগদান করতে আসি সেদিনই মাওলানা সাহেব আমাকে ডেকে বলেছেন, ‘মিলি, আপনি দেখতে ঠিক আমার ছোট মেয়ে খুশির মতো হয়েছেন।’
‘তাই নাকি।’
‘আল্লাহ আপনাদের দুজনকে দেখতে প্রায় অবিকল একই রকম করে সৃষ্টি করেছেন। যদি আপনি খুশির ছবি দেখেন তাহলে আপনার কাছে মনে হবে ওই ছবি খুশির নয় ওটা আপনারই ছবি।’
আমি এক দৃষ্টিতে বড় হুজুরের মুখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছিলাম আর মাথা নাড়াচ্ছিলাম। তিনি আমাকে পেয়ে গলগল করে বলতে লাগলেন, ‘খুশিকে দুই বছর আগে ইতালী প্রবাসী এক ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছিলাম। বড় সুখেই ছিল। কিন্তু বছর খানেক আগে খুশি আমাদের ছেড়ে চলে গেল।’
আমি বললাম, ‘কেন, কী হয়েছিল?’
তিনি অনেকটা নরম গলায় বললেন, ‘একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে সিজার করার সময়ে মা ও সন্তান এক সাথেই মারা যায়।’
আমি লক্ষ্য করছিলাম কথাগুলো বলতে বলতে তার গলা খাদে নেমে গেল। পরের মুহূর্তেই নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলে ওঠেন, ‘গত ৩০ বছর ধরে এই এতিমখানা আমি নিজ হাতে তিল তিল করে গড়ে তুলেছি।’
‘ওহ।’
‘এখানের অনেক এতিম ছেলে মেয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে- ছিটিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। তাদের অনেকেই প্রতি মাসে আয়ের একটি অংশ দান করে।’
আমি বিস্ময়ের সাথে বলে উঠলাম, ‘তাই নাকি! তাহলে তো দেখছি এতিমখানার প্রতি তাদের অনেক মমতা জড়িয়ে আছে।’
‘আপনি ঠিকই বলেছেন। মূলত ওদের দেওয়া অনুদানের টাকাতেই প্রতিষ্ঠানটি সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারছি। তা-নাহলে টিকিয়ে রাখাই মুশকিল হয়ে যেত।’
‘সত্যি যারা এখানে টাকা পাঠাচ্ছেন তাদের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কোন তুলনা হয় না।’
আমার কথা শুনে বড় হুজুর শুধু মাথা নাড়লেন।
তিনি বললেন, ‘আপনি আমার সহকর্মী হলেও আমি আপনাকে খুশির মতনই দেখতে চাই।’
হঠাৎ বড় হুজুরের মুখ থেকে এমন একটি কথা শুনে হু হু করে আমার বুকটা ভারি হয়ে উঠলো। আমি টের পেলাম আমার চোখ দুটো ছলছল করে ভিজে উঠছে। কখনো কখনো মানুষ যদি খুব বেশি অসহায় হয়ে পড়ে তখন কোন আশার আলো দেখলেই চোখে পানি এসে যায়। সে-পানি অপ্রতিরোধ্য। বড় হুজুরের এমন মায়া জড়ানো কথা শুনে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ অনেক বেড়ে গেলো।

 মাঝে মাঝে আমার ঘর থেকে আলাপ পাই, বাবা মাকে খুব কড়া ভাষায় বকাবকি করছে

11004156_778016985607949_109389842_n
দেশ পাবলিকেশন্স, অমর একুশে বইমেলা ২০১৫

আমি বললাম, ‘হুজুর, আপনি আমাকে খুশিই মনে করবেন। আমার মাঝে যদি আপনি খুশিকে খুঁজে পান, তবে আপনার কাছে খুশি হয়েই থাকতে চাই।’
‘ঠিক আছে মা। আজ থেকে তুমি আমাকে চাচা বলেই ডাকবে। এখানে যখন যা কিছু প্রয়োজন হবে সরাসরি আমাকে বলবে।’
‘ঠিক আছে চাচা।’
আমাকে যে এতো তাড়াতাড়ি চাকরি করতে হবে এটা আমার কল্পনায়ও ছিল না। আমার বয়সী কতো মেয়ে আছে যারা বাবা-মায়ের সাথে থেকে পড়াশুনা করছে। আমি বেঁচে আছি কতগুলো এতিম শিশুর স্বপ্ন বুকে ধারণ করে। মাঝে মাঝে ভাবি, এখানকার এতিম শিশু আর আমার মধ্যে তো তেমন কোন পার্থক্য নেই। ওরাও এতিম আর আমিও ওদের মতোই এতিম।
আমার বাবা হাবিবুর রহমান মাদারীপুর পোস্ট অফিসে কেরানি পদে চাকরি করতেন।
আমি, মা আর বাবা।
তিন জনের ছোট্ট সংসার।
রুনুর কাকা বজলুর রশিদ যার কাছে আমি অংক শিখতাম। তিনি আমাদের ঘরে এসেই প্রতিদিন অংক শেখাতেন। রুনু তাকে ছোট কাকা বলে ডাকতো। রুনুর দেখাদেখি আমিও তাকে ছোট কাকা বলে ডাকতাম।
রুনুর ছোট কাকা খুব মেধাবী ছাত্র। কেমিষ্ট্রিতে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে দীর্ঘদিন ঘরে বেকার পড়েছিল। চাকরি করতে তার ইচ্ছে করে না। তাই কোথাও কোন চাকরির চেষ্টা না করে রুনুদের পরিবারের সাথেই পড়ে ছিল। পাশাপাশি বাসা হওয়ায় রুনুদের সাথে আমাদের পরিবারের খুব সুসম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।
মাঝে মাঝে আমার ঘর থেকে আলাপ পাই, বাবা মাকে খুব কড়া ভাষায় বকাবকি করছে। আমি এসব কথা কখনো কানে নিতাম না। তবে প্রায়ই শুনতাম মা, বাবার কথার প্রতিবাদ করছে। খুব রেগে গিয়ে বলছে, ‘একটা বুড়া মানুষের সাথে ঘর করে আমার সারা জীবনটাই মাটি হয়ে গেল।’
আমার খুব মনে আছে, আশ্বিন মাসের এক রাতে মা-বাবা দুজনে প্রচণ্ড বাক-বিতণ্ডা করে। ঘটনাটি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে মা, বাবার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছে। আমি পড়ে গেলাম মহা মুশকিলে।

 তোর বাবা আমার চেয়ে ১৮ বছরের বড়। সেই জন্যই আমি তাকে বিয়ে করতে চাইনি

আমি মায়ের রাগ ভাঙানোর জন্য বলি, ‘মা, তুমি শুধু শুধু বাবার সাথে এমন রাগারাগি করো কেন?’
‘তুই শুধু আমার রাগটাই দেখলি। তোর বাবার কোন দোষ নেই!’
‘না, আমিতো দেখি প্রায় সময় তুমিই প্রথমে বাবার সাথে ঝগড়া শুরু করে দাও।’
‘তুই তো তোর বাবার পক্ষই নিবি!’
‘এখানে বাবার পক্ষ নেওয়ার কিছু নেই মা। বাবাকে যদি তোমার ভালো না লাগে তাহলে তার সাথে সংসার করতে আসলে কেন?’
আমার কথা শুনে, মা যেন দীর্ঘদিন পরে হালকা হবার একটি সুযোগ পেলেন, ‘আমিতো তোর বাবাকে বিয়ে করতে রাজি ছিলাম না। তোর নানাই তো জোর করে বিয়ে দিয়েছে।’
‘বাবাকে কেন বিয়ে করতে চাইছিলে না?’
‘তোর বাবা আমার চেয়ে ১৮ বছরের বড়। সেই জন্যই আমি তাকে বিয়ে করতে চাইনি।’
‘তাহলে তুমি বাবাকে বিয়ে করলে কেন?’
‘আমি কী করতে চেয়েছি! তোর নানা আর তোর দাদাই তো জোর করে আমার জীবনটাকে অন্ধকার করে দিলো।’
আমার নানা আর আমার দাদা আপন দুই ভাই ছিলেন। শুনেছি মায়ের বিয়ের আগে দাদা জব্বার মাতুব্বর নাকি আমার নানা কাওছার মাতুব্বরকে বলেছিলন, ‘শোন কাওছার, ঘরের মেয়ে ঘরেই রেখে দেই। হাবিবের সাথে জ্যোৎস্নার বিয়ে দিয়ে দিই। এতে কি তোর কোন অমত আছে?’
আমার দাদা আমার নানার বড় ভাই। তাই দাদার কথার কোন প্রতিবাদ করার সাহস পায় নি। সেই থেকে গত ১৫ বছর ধরে বাবার সংসারের ঘানি টেনে আসছেন মা। শুনেছি মায়ের বিয়ের বছরেই আমার জন্ম। মা-বাবার ছোট খাটো ঝগড়া-বিবাদ ছাড়া ভালোই কাটছিল আমাদের জীবন। হঠাৎ করে একদিন এক মহাকাণ্ড ঘটে গেল। আমি তখন নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। অংক পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরে দেখি মা বাসায় নেই। এ-বাড়ি ও-বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোথাও মাকে পাওয়া যাচ্ছে না। পরিচিত আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় ফোন করেও খোঁজ নিলাম। কিন্তু কোথাও মাকে পাওয়া যাচ্ছে না। খুঁজতে খুঁজতে দিন শেষে রাত হয়ে এলো। কিন্তু মাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

 ‘নারে মিথ্যে কথা না। তোর মা সত্যি সত্যিই বজলুর সাথে পালিয়ে গেছে।’

মাকে খুঁজতে লঞ্চঘাট, বাসস্ট্যান্ড থেকে সদর হাসপাতালেও বাবাকে যেতে হলো। কোথাও না পেয়ে শেষ পর্যন্ত থানায় জিডি করলেন। সারারাত আমি আর বাবা ঘুমাতে পারি নি। মাকে খুঁজে না পাওয়ার দুশ্চিন্তায় বাবার সাথে সাথে আমারও খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।
পরেরদিন খুব সকালে বাবা বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন। আমি ঘরের ভিতরেই চুপচাপ মনমরা হয়ে বসে ছিলাম।
হঠাৎ কোথা থেকে যেন বাবা খুব দ্রুত পায়ে ঘরের ভিতরে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লো, ‘মিলি..রে.. তোর মা তো বজলুর সাথে পালিয়ে গেছে।’
বাবার কথাগুলো যখন আমার কান দিয়ে ঢুকলো আমি যেন আমাকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সত্যিই কি মা আমাদের ছেড়ে রুনুর কাকার সাথে পালিয়ে গেছে।
আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না। আমার কাছে মনে হচ্ছিলো বাবার মুখ থেকে কথাগুলো শুনে আমি যেন বোকা বোকা হয়ে যাচ্ছি। তারপরেও কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বাবাকে বললাম, ‘বাবা, তোমাকে এসব মিথ্যে কথা কে বললো?’
‘নারে মিথ্যে কথা না। তোর মা সত্যি সত্যিই বজলুর সাথে পালিয়ে গেছে।’
আমি বাবার কথাগুলো যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। মা, এরকম একটি লজ্জাজনক কাজ কিভাবে করতে পারে! এই বয়সে এই ধরনের একটি জঘন্য কাজ আমার করার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে আমার মা, শেষ পর্যন্ত রুনুর কাকার সাথে পালিয়ে গেল। মায়ের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আমার কাছে যতটা না খারাপ লাগছে তারচেয়ে বেশি খারাপ লাগছে, আমি এখন রুনুকে কি করে মুখ দেখাবো এটা ভেবে। রুনু, যে আমার প্রিয় বান্ধবী, সেই রুনুর কাকার সাথেই মা পালিয়ে গেছে। কোন মুখ নিয়ে আমি এখন রুনুর সামনে গিয়ে দাঁড়াবো। আমাকে নিয়েই বা এখন রুনু কী ভাবছে! ছিঃ ছিঃ লজ্জায় আমি মরে যাচ্ছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিলো, আমি আমার মাথার চুলগুলো টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেলি। তাহলে হয়তো কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারবো। লজ্জায় আমার সারা শরীর চুপসে যাচ্ছে। তারপরেও কিছুটা অপ্রস্তুতভাবে বাবাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলাম, ‘বাবা, তোমাকে এইসব আজে বাজে কথা কে বলেছে?’
বাবা প্রায় কান্নার সুরে বলে, ‘বাজে কথা না মিলি। বাজে কথা না। সত্যি সত্যি তোর মা আমাদের ছেড়ে বজলুর সাথে চলে গেছে।’
আমি কিছুটা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললাম, ‘ঠিক আছে বাবা। মা যদি আমাদের ছেড়ে চলে যেতেই পারে, ভালো। আমরাও তাকে ছাড়া খুব ভালো করেই থাকতে পারবো।’

 মফস্বল শহর। এখানে প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। সেখানে এমন একটি মুখরোচক ঘটনায় সবাই বেশ উৎসাহী

বাবা আমার কথার কোন উত্তর দেয় না। আমি কণ্ঠে খানিকটা জোর এনে বললাম, ‘তুমি দেখো বাবা। আমি তোমাকে বলে রাখলাম, এই জীবনে আমি আর কোনদিন তোমাকে মায়ের কথা বলবো না। সে যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক।’
এই ঘটনার পর থেকে আমি রুনুদের বাসায় যাওয়া এবং রুনুর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি।
গত দুই সপ্তাহ ধরে আমি ঘর থেকে তেমন একটা বের হই না। লজ্জা আর সংকোচবোধ আমাকে ঘরকুনো করে রেখেছে। বার্ষিক পরীক্ষার আর কোনো বিষয়েই অংশগ্রহণ করতে পারি নি। কী করেই বা পরীক্ষা দিতে যাবো! মফস্বল শহর। এখানে প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। সেখানে এমন একটি মুখরোচক ঘটনায় সবাই বেশ উৎসাহী। ঘর থেকে বের হলেই এলাকার মানুষ আমার দিকে এমনভাবে তাকায় যেন তাদের চোখে স্পষ্ট লেখা থাকে, কীরে মিলি ঘটনা কী সত্যি! তোর মা না-কি বজলুর সাথে ভেগে গেছে?’ তাই লজ্জায় আমি ঘর থেকে বের হই না। মনে হচ্ছিলো নির্বাসনে না গিয়েও আমি যেন ঘরের ভেতরেই নির্বাসিত। বাবাও খুব শান্ত আর চুপচাপ হয়ে গেছেন। আগের মতো কারো সাথে তেমন একটা কথাবার্তা বলেন না। মা আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার এক মাসের মধ্যেই বাবা আমাদের জন্য বাসা পরিবর্তন করে ফেললো। চারার ঘর এলাকা ছেড়ে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে পানিছত্র এলাকার মোবারক মোল্লার বাড়ির দোতলায়। বাসাটি আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমার বেডরুমের দক্ষিণ পাশেই একটি ব্যালকনি। জোছনা ভরা রাতে ব্যালকনি ও জানালা ভেদ করে চাঁদের আলো আমার রুমে এসে পড়ে। আকাশে জোছনা এলেই আমি ব্যালকনিতে গিয়ে চাঁদের আলো গায়ে মাখিয়ে মায়ের জন্য ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদি। যেন বাবা আমার কান্নার শব্দ টের না পায়। আমি চাইতাম না, মায়ের জন্য আমার বুকের ভেতর যে এখনো হাহাকার করে ওঠে সেটা বাবা জেনে ফেলুক। বাবা ও আমার দুজনের জন্যই পুরনো বাসার চেয়ে নতুন  বাসাটা ভালো হয়েছে। বাসা থেকে পোস্ট অফিসের দূরত্ব মাত্র পাঁচ মিনিটের পায়ে হাঁটা পথ। আমার স্কুলও কাছেই।
মা না থাকায় সংসারের দায়িত্ব এখন আমার উপরে চলে এসেছে। সেই ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রান্না-বান্না, ঘর পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে জামা-কাপড়-থালা-বাসান ধোয়াসহ সকল কাজ আমাকেই করতে হয়। তার সাথে নিজের পড়াশোনাটাতো রয়েছেই। সব মিলিয়ে আমি প্রায় নাজেহাল। কিন্তু তারপরেও আমি ছাড়া এইসব কাজ করার লোক নেই। বাবা অল্প বেতনের চাকরি করেন। মাস শেষ হতে না হতেই সব টাকা খরচ হয়ে যায়। এর উপরে একজন কাজের মানুষ রাখা সম্ভব না। মাদারীপুর শহরে বাসা বাড়িতে কাজের মানুষ পাওয়া আর এক টুকরো চাঁদের কণা হাতে পাওয়া সমান কথা। মাঝে মাঝে বাবাকে বলি, ‘তোমার এই সংসার আমি আর দেখতে পারবো না। রান্না-বান্না করতে করতে আমি তো পড়াশোনাতে মনই দিতে পারছি না।’
আমার কথা শুনে বাবা কিছুক্ষণ নিরব থেকে ক্ষীণ গলায় উত্তর দেয়, ‘তুই-ই বল মা, এখন আমার কিইবা করার আছে?’
বাবার কথার আমি কোন প্রতি-উত্তর দিতাম না। আমার জীবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এইসব ঝড়ের মধ্যে দিয়েও কীভাবে যেন আমি এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষাটা দিয়ে ফেলি।
আমার মনে আছে, যেদিন আমার এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিলো সেদিন বাবা আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললো, ‘তুই এ গ্রেড পাওয়ায়  আমি খুব খুশি হয়েছি।’
আমি বাবার চোখে মুখের দিকে চেয়ে দেখি একরাশি খুশির ঝিলিক।
‘আজ যদি তোর মা পাশে থাকতো তাহলে সেও হয়তো আমার মতনই খুশি হতো।’
অনেক বছর পরে বাবার মুখে মায়ের কথা শুনে আমি ফ্যাল ফ্যাল করে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকি।
বাবা বললো, ‘আজ আমি তোর জন্য নফল নামাজ পড়েছি। আমার বিশ্বাস আমি যদি তোর জীবনে না-ও থাকি জীবনের বাকী পথটুকু এখন তুই নিজে নিজেই চলতে পারবি।’
আমি বাবার কথায় বুঝতে পারি, মায়ের জন্য আমার বুকের ভেতরে যেমন করে একটি শূন্যতা হাহাকার করছে, তেমন করে বাবার বুকেও একটি শূন্যতা হাহাকার করে উঠছে।
মাকে ছাড়া বাবার জীবন একাকী হয়ে উঠেছিল। মায়ের এভাবে চলে যাওয়ায় আমি যতটুকু কষ্ট পেয়েছি, বাবা তার দ্বিগুণ কষ্ট পেয়েছেন। সে-কষ্টটাকে বাবা বুকে পুষে রেখেছেন। পুষে না রেখে কী কোন উপায় আছে? নিজের স্ত্রী যখন অন্য পুরুষের সাথে পালিয়ে যায়, সেই কষ্টের কথা কী অন্য মানুষকে বলে বেড়ানো যায়! বাবাও কারো সাথে তার দুঃখটাকে ভাগ করতে পারেননি।
আমার আর মায়ের দুঃচিন্তা করতে করতে এক সময় বাবা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অনেক ডাক্তার দেখালাম। মাদারীপুর, ফরিদপুর থেকে ঢাকা শহরেও গিয়েছি চিকিৎসা করাতে। কিন্তু কোন কিছুতেই বাবা সুস্থ হয়ে উঠলেননা। মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়লেন। কোন কথাও বলেন না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। চোখের কোনা দিয়ে গড়িয়ে অশ্রু পড়ে। আমার বুকের ভেতরটা তখন এমন হু হু করে ওঠে!
বাবার মৃত্যুর পরে আমি যে-দিকে তাকাই কেবল আঁধার ছাড়া আর কোন কিছুই চোখে পড়ে না। বাবা মরে যাওয়ার কিছুদিন পরেই চাকরির বিজ্ঞাপন পত্রিকায় দেখলাম ময়মনসিংহের আলোর দিশারী এতিমখানায় সহকারি হিসাব রক্ষক আবশ্যক।
মনে হলো, আমার মতো আরো যারা এতিম আছে ওদের সাথেই বাকি জীবনটা পার করে দেবো। এই ভেবেই এখানে চাকরির চেষ্টা করলাম।
আমার স্পষ্ট মনে আছে, যেদিন মৌখিক পরীক্ষা হলো সেদিন এতিমখানার তত্ত্বাবধায়ক হাশিম-উদ-দৌলা চাচা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘মাদারীপুর থেকে এতো দূরে চাকরি করতে এসেছেন কেন?’
আমি বলেছিলাম, ‘দূরত্ব যতই হোক, আমার একটি চাকরি দরকার।’
সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার মুখ থেকে এরকম একটা উত্তর কেউ মনে হয় প্রত্যাশা করেনি। আবার এমনও হতে পারে আমি যে উত্তরটি দিয়েছি এটাই তারা জানতে চেয়েছিল। এর মধ্যে হঠাৎ করে ইন্টারভিউ বোর্ডের একজন বলে উঠলো, ‘পরিবারে আপনার কে কে আছে?’
শুনেছিলাম চাকরির ইন্টারভিউতে না-কি একাডেমিক প্রশ্নের চেয়ে ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়েই বেশি প্রশ্ন করা হয়। ইন্টারভিউ দিতে এসে আমার মনে হলো কথাটি একদম মিথ্যে নয়।

 মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি এক অভাগা এতিম, ওরাও আমার মতোই এতিম

আমি বললাম, ‘আমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আমি একা। তাই এতিমখানাতেই চাকুরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
যাই হোক। শেষ পর্যন্ত চাকরিটা আমার কপালে জুটে যায়। চাকরিটা পেয়ে বেঁচে থাকার একটা আলো খুঁজে পাই। সেই থেকে এতিমখানার দুইশ শিশুদের আপা হয়ে আছি।
আমি যে বাড়িতে ভাড়া থাকি বাড়িটা দেখতে খুব সুন্দর। রাস্তার পাশেই। চারপাশে ইটের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ভেতরে নানা ধরনের ফুলের বাগান। বাড়ির মালিক রুহুল আমিন সাহেব ফুলপ্রেমিক মানুষ। কত রকমের যে ফুলের গাছ লাগিয়েছেন তার কোন হিসাব নেই। ফুল গাছ ভাড়াটিয়ারা নষ্ট করে ফেলে, এই অভিযোগে রুহুল আমিন সাহেব বাড়ির কোন রুম ভাড়া দিতে চাননা। রুহুল আমিন সাহেব হাশিম-উদ-দৌলা চাচার ছেলেবেলার বন্ধু। চাচাই আমাকে বাড়িটি ঠিক করে দিয়েছেন। এটা একতলা একটি বিল্ডিং হলেও উপরে ছাদের পরিবর্তে টিনের চাল দিয়ে তৈরি। টিনের ঘর আমার খুব প্রিয়। বৃষ্টির রিমঝিম রিমঝিম শব্দে আমার ভেতরে এক অদ্ভুত রকমের ঘোর তৈরি হয়। বৃষ্টির শব্দে আমার তুমুল রকমের ঘুম আসে। আহ, কী দারুণ ঘুম!

এখানে আমার খুব একটা কাজের চাপ নেই। প্রতিদিনের হিসাবপত্র প্রতিদিনই প্রস্তুত করে রাখি। ফলে এক সাথে কাজের খুব বেশি চাপ এসে পড়ে না। তবে কাজ কম থাকলেও কিন্তু বসে থাকি না। এতিমখানায় প্রায় দুইশ শিশু। ওদের নিয়েই আমি পড়ে থাকি। শিশুগুলোও খুব ভালো। আমাকে তারা বড় আপা হিসেবে ভালোবাসতে শুরু করেছে। রাসেল, সুমন, আবীর, কনকতো প্রায় সময় আমার কাছে এটা-ওটা নিয়ে হাজির হবে। আবীর কথা বলার জন্য অফিস কক্ষের কাছ দিয়ে হাঁটাচলা করবে। জানালা দিয়ে আবীরকে দেখে জিজ্ঞেস করি, ‘আবীর কিছু বলবি?’
ও মাথা নাড়িয়ে বলে উঠে, ‘না আপা।’
‘তাহলে এখানে কেন?’
‘আপনি অফিসে বসে বসে কী করছেন সেটা দেখতে আসছি?’
আমি আবীরের কথা শুনে হাসি। আবার দেখা যায় আবীর চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই কনক অথবা সুমন কাঁদতে কাঁদতে এসে বলবে, ‘আপা আমাকে রাসেল খালি খালি একটা লাথি দিছে।’
আমি বলি, ‘ঠিক আছে তুই তোর ঘরে যা। আমি আসতেছি।’
গত পাঁচ মাসে এতিমখানার সব শিশুদের নাম আমার প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে। ওদের বড় বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি এক অভাগা এতিম, ওরাও আমার মতোই এতিম। এখানকার সব শিশুই আমার নিজেরই ভাইবোন।

 আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো সবাইকে চিৎকার করে বলি, ‘আপনারা একটু সাহায্য করেন। আমার মা মারা যাচ্ছে

একদিন করিম চাচা আমাকে বলেন, ‘আপা, আপনি হলেন এতিমখানার জোনাকি। এখানের শিশুদের বুকের আঁধার তাড়াতে শুধু আলো জ্বেলে যাচ্ছেন।’
করিম চাচার মুখ থেকে কথাগুলো শুনে খুব ভালো লেগেছিল।
মনে হচ্ছিলো, ‘আমি যেন সারাটা জীবন ওদের বুকে আলো জ্বেলে যেতে পারি।’
একদিন শীতের বিকেল। চারদিকে ঠান্ডা হিমেল বাতাস। আমি একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে অফিস শেষ করে সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে বাসায় যাচ্ছি।
গেট থেকে কিছুটা এগিয়ে যেতেই দেখি মানুষের ভিড়। ভিড় দেখে আমি একটু দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকি। ভিড়ের খুব কাছে এগিয়ে যেতেই শুনতে পাই লোকজন বলাবলি করছে, ‘পোলাপান যেন এখন কেমন হয়ে গেছে। বিদেশে ভাই-ব্রাদার থাকে। কত কষ্ট করে খেয়ে না খেয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশে টাকা পাঠায়। সেই টাকা দিয়ে মটরসাইকেল কিনে চোখ বন্ধ করে চালায়।’
আরেকজন পথচারী বলে ওঠে, ‘ওরা সামনে কোন মানুষ আছে নাকি নাই সেটা দেখার সময় পায় না। যারে সামনে পায় তারেই চাকার নিচে ফেলায়। হারানী পাগলীটাকেও আজ চাপা মারলো।’
হারানী পাগলীকে চাপা দেওয়ার কথা শুনে দ্রুত লোকজনের ভিড় ঠেলে কুন্ডুলির ভিতরে ঢুকলাম। পাগলীকে দেখে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে যাই।
আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না। দম আটকে আসছে। আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো সবাইকে চিৎকার করে বলি, ‘আপনারা একটু সাহায্য করেন। আমার মা মারা যাচ্ছে।’
কিন্তু কথাগুলো আমি বলতে পারছিলাম না। আমার বুক আটকে মুখ বন্ধ হয়ে আসছে। আমি এখন কী করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। মাকে কী কোলে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাবো নাকি এখান থেকে কাউকে কিছু না বলেই চলে যাবো। আমার মাথা ঘুরপাক খাচ্ছে।
হঠাৎ দেখলাম, অতীতের সবকিছু ভুলে গিয়ে মাকে কোলে নিয়ে  চিৎকার করে মা… মা… বলে কাঁদছি। কিন্তু মা চোখ মেলছে না। যেন সে অনন্ত ঘুমে বিভোর।
আমি টের পেলাম, মায়ের পালিয়ে যাওয়ার পরে যে সকল দুঃখরা এতোদিন আমার জীবন থেকে পালিয়ে ছিল সেইসব পলাতক দুঃখরা এতো বছর পরে আবারো জেগে উঠেছে আমার ভেতরে ও বাইরে।
মনে হচ্ছিলো আমি যেন জ্ঞানশূন্য হয়ে যাচ্ছি।
জ্ঞান ফিরে দেখি আমি আর মা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাশাপাশি বেডে শুয়ে আছি। আমার পাশেই দাঁড়িয়ে হাশিম-উদ-দৌলা  চাচা।
চাচাকে বললাম, ‘চাচা, হারানী পাগলীই আমার মা। মাকে পাবনার মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তুলবো। আপনি আমার যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।’
তিনি আমার মুখের দিকে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন।
‘আমার এই মা ছাড়া পৃথিবীতে আপন কেউ নেই। মা’র সাথে যে আবার আমার দেখা হবে কোনদিন তা ভাবতেই পারিনি। এক অন্ধকার রাতে মায়ের সাথে আমার আত্মা ছিঁড়ে গিয়েছিল। ভাগ্যচক্রে হারানো মাকে আবারো ফিরে পেয়েছি। যে করেই হোক মাকে সুস্থ করে তুলতে চাই।’
আমি দেখলাম, তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে জানালা দিয়ে তাকাতেই দেখতে পেলাম তিমিরময়ী রাতের আঁধার। হঠাৎ কোথা থেকে একদল জোনাকি এসে, রাতের আঁধার তাড়াতে মিটিমিটি করে আলো জ্বেলে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছিলো, কেবল রাতের আঁধারই নয়, আমার আঁধারও তাড়াতে, চারপাশে এসে এইসব জোনাকিরা ভিড় জমিয়েছে।