হোম গদ্য বই থেকে গদ্য : জীবন মোচড়

বই থেকে গদ্য : জীবন মোচড়

বই থেকে গদ্য : জীবন মোচড়
431
0

জুয়েল মোস্তাফিজ

10410437_10203881246329473_3230435910534018634_n
জুয়েল মোস্তাফিজ

 কেন নানি ওই সকালের নাম দিয়েছিল ডুমুর? এই ভেদ জানার আগে নানির সাথে বেরোলাম গাছের কাঁচা ফল পাকল কি না, তা দেখতে…

বালা-মসিবত দূর করো খোদা…
বালা-মসিবত দূর করো খোদা…

জীবন জীবন করে শব্দ বেরোচ্ছে মেরাতুন্নেসার বুকের খাঁচায়। সেদিন তার বুকে ভাত আটকে গিয়েছিল। প্রায় প্রায় নানির বুকে ভাত আটকে যায়। আর আমরা হাউমাউ করি। বুকের ভাত নেমে গেলে নানি বলত, ওরে আমার জীবন রে, মোচড় দিয়া উঠলি? রাইত এখন কত দূর জুবেল? দুধের রাইতে জীবন মোচড় দিল?
এশার আজানের পরপর রাতটাকে মেরাতুন্নেসা দুধের রাইত বলত। পড়ে থাকত অবশিষ্ট ভাতের থালা। নানি আঙিনাতে নেমে তার মাকে দেখে আসত। বলত তার মায়ের কথা—‘আমার মারও বুকে ভাত লেগে যেত। আমরা ঘটির পানি নিয়ে মার কাছে যেতাম। মা বলত, মেরাতুন, পানি লাগবে না। জীবন মোচড় দিয়েছে।’ নানির কাছে জানতে চেয়েছি, জীবন মোচড় কী নানি?
নানি আমাকে বলত জীবন মোচড়ের কথা…। জীবন হইল বোবা পাখি, মাঝে মাঝে আওয়াজ করে। এই যে আমার বুকে ভাত লেগে গেল। জীবন আমারে কইল—‘মেরাতুন, কত দিন তোর সাথে কথা কই না, আয় একটু কথা কই! জীবন আমার সাথে কথা কইল।’
এ কথা শুনে নানির দিকে তাকিয়ে রইলাম। নানি বুঝল, জুবেল জীবন মোচড় বোঝে নাই। এরপর একটা গামছা আনল নানি। সেই গামছা পানিতে ডুবাল। পানি থেকে ভেজা গামছা তুলে ভাঁজ করল। গামছার দুই মাথায় কব্জি লাগিয়ে দিল চিপানি। গামছাটা লেপ্টে গেল গামছার সাথে। ঝরঝর করে পড়ল পানি। এ দৃশ্য দেখিয়ে নানি বলল, জুবেল, এই হলো মোচড়! গামছার মতো জীবনটাও মাঝে মাঝে মোচড় দিয়া ওঠে। জীবন যার কাছে থাকে, তার সাথে কথা কয়। জীবনের কথা বলার সাধ হলে, বুকে ভাত আটকায়। মুখের ভেতর দাঁতে দাঁত লাগে। দমের চলাফেরার ঘাটায় পাথর পড়ে। জীবন হইল বোবা পাখি, বুঝলি জুবেল? ভয় পাবি না। জীবন তোর সাথে মাঝে মাঝে কথা কইবে।…
নানির জীবন মোচড় লাগার পর, পরের দিন যে সকাল, সেই সকালকে নানি বলত ডুমুর সকাল। এক বালতি পানির ভেতর ঢেলে দিত এক ঘটি দুধ। তারপর সেই পানি মাথায় ঢেলে গোসল। পাশে দাঁড়িয়ে দেখতাম দুধ-পানি নানির দেহ ছুঁয়ে ছুঁয়ে পায়ের গোড়ালি দিয়ে নামছে। নানি বলছে, বালা-মসিবত দূর করো খোদা।

 পাকা পেঁপে ঘরে এনে কেন জানি প্রাণটা কেঁপে উঠত। মনে পড়ত গাছের দেহ থেকে ঝরছে দুধ। নানি মনে করিয়ে দিচ্ছে পেঁপে গাছের শেকড়ের কথা

11004912_10153087352219581_1486886257_n
চৈতন্য প্রকাশনী; অমর একুশে বইমেলা ২০১৫

নানির সাথে আমিও বলেছি, বালা-মসিবত দূর করো খোদা। কিন্তু মাথার ভেতর ঢুকে পড়ত একটা ডুমুর সকাল। কেন নানি ওই সকালের নাম দিয়েছিল ডুমুর? এই ভেদ জানার আগে নানির সাথে বেরোলাম গাছের কাঁচা ফল পাকল কি না, তা দেখতে…
মেরাতুন্নেসার ভিটায় নানান ফলের গাছ। মেরাতুন্নেসা দিনে একবার করে গাছের ফল দেখে বেড়াত। এগাছ ওগাছ ঘুরে ঘুরে মেরাতুন্নেসা পেঁপে গাছের সামনে দাঁড়িয়ে দেখল একটা সবুজ পেঁপে লাল হয়েছে। নানি আমাকে ডেকে বলল, এই দ্যাখ পাকা ফল। পাড়বি?
আমি বললাম, হ্যাঁ পাড়ব। নানির মুখের কথা মুখে থাকল, আমি পাকা পেঁপের দিকে হাত বাড়ালাম। আমার হাতটা পেঁপের কাছে যেতে না যেতেই নানি দিল বাধা। বলল, বল তো জুবেল, এই পাকা পেঁপে কার? আমি বললাম, তোমার নানি। নানি বলল, আমার তো না। বল, এই পাকা পেঁপে কার? বলতে পারলি না? নানিরে বলি, তাইলে কার? নানি বলে, সেটাই তো জীবনের মারপ্যাঁচ জুবেল! আমি হয়ে গেলাম ঠাণ্ডা। নানি হয়ে গেল চুপ। কিছু সময় ফুল হয়ে দুলল বাতাসে। এরপর নানিরে বলি, তাইলে এই পেঁপে কার নানি? নানি বলল, এই পাকা পেঁপেটা হলো পেঁপে গাছটার। আমার ভিটায় গাছটার শেকড় আছে মাত্র।
আমি নানিরে বলি, তাইলে পাকা পেঁপে পাড়ব না? নানি বলে, না, পাড়বি না। পেঁপেটার মার কাছে পেঁপেটা চেয়ে নিবি। এই গাছটা পেঁপেটার মা। এরপর নানি পেঁপে গাছের কাছে কীভাবে পেঁপে চেয়ে নিতে হয় তা বলে দিল আমাকে। নানি বলল, জুবেল, পেঁপে গাছকে বল, ও পেঁপে গাছ, তোমার পাকা পেঁপে আমাকে যদি দাও, আমি তোমার শেকড়ে পানি দেব।
মেরাতুন্নেসা যা বলে দিল, তাই বললাম তিনবার। এরপর নানি বলল, এবার পেঁপেটা পাড়। গাছটা তোকে পেঁপেটা দেবে। ব্যস, পাকা পেঁপেটা ধরে টান দিলাম। অমনি পেঁপের বোঁটা বেয়ে ঝরতে লাগল দুধ। নানি ওই দুধ দেখিয়ে বলল, এই দ্যাখ, পেঁপে গাছের কান্না। বলেছিলাম না, এই গাছটা পাকা পেঁপের মা?…
পাকা পেঁপে ঘরে এনে কেন জানি প্রাণটা কেঁপে উঠত। মনে পড়ত গাছের দেহ থেকে ঝরছে দুধ। নানি মনে করিয়ে দিচ্ছে পেঁপে গাছের শেকড়ের কথা। বালতিতে পানি নিয়া দৌড়াচ্ছি পেঁপের মার শেকড়ের দিকে। তিনবার চেয়েছিলাম তাই তিন বালতি পানি। মেরাতুন্নেসা দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। শেকড়ে পানি দেওয়া শেষ হলে মেরাতুন্নেসা বলেছে, আর ফল পাড়বি জুবেল? নানির দিকে চেয়ে থেকেছি চুপ। নানি বলেছে, পাড়বি না কেন, পাড়বি। তবে ফল পাড়ার আগে ফলের মাকে বলবি, সেই ফল তোকে দেবে কি না…
ওহ! প্রতিদিনের সকাল আজো জানা হলো না, মেরাতুন্নেসা কেন তোমার নাম রেখেছিল ডুমুর।

জুয়েল মোস্তাফিজ
জুয়েল মোস্তাফিজ

Latest posts by জুয়েল মোস্তাফিজ (see all)