হোম গদ্য জিয়া হায়দার রহমান : এক বিস্ময়কর বিশ্ব-আওয়াজ

জিয়া হায়দার রহমান : এক বিস্ময়কর বিশ্ব-আওয়াজ

জিয়া হায়দার রহমান : এক বিস্ময়কর বিশ্ব-আওয়াজ
597
0
11355581_948194998558955_957859039_n
অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম

জিয়াকে নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ার কাভারেজেও এই হাইপটা বা ওভারটোনটা ছিল

জিয়া হায়দার রহমান এখন একটা ফেনোমেনা/ঘটনা। আর বাংলাদেশের মিডিয়াতে জিয়াকে নিয়ে যা চলছে তা ফ্যাশনের পর্যায়ে চলে গেছে। শুরু থেকে জিয়া হায়দার রহমানকে যে কারণে বাংলাদেশে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে তা হলো, উনি ‘বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত’। মজার ব্যাপার হলো, আপনি যদি জিয়ার লেখা পড়েন বা জিয়ার প্রকৃত কাজের জায়গাটা ধরতে পারেন, দেখবেন তাঁকে বাংলাদেশের ব্যাপারে খুব আবেগাপ্লুত দেখা যাবে না। জিয়ার কথাতেও আপনি হতাশ হতে পারেন। ফলে মিডিয়া যে অতিরিক্ত দরদ তৈরি করছে তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। এবং এই দরদী কাভারেজ জিয়ার কাজের গুরুত্ব বুঝতে. ও ‘পাঠ’-তৈরিতে সমস্যা তৈরি করতে পারে। সেই দিকে মনোযোগ রেখে আমরা অতি সংক্ষেপে জিয়ার কাজের জায়গাটা বুঝতে চেষ্টা করব।

বিশ্বসাহিত্য ও জিয়া :

জিয়া যেই পদ্ধতির মধ্য দিয়ে লেখা-লেখিকে এগিয়ে নিয়ে যায় এর জন্য তাঁকে কোন রকম কেন্দ্র-প্রান্ত ধারণার আশ্রয় নিতে হয় না। তার পরেও বাস্তবতা থাকে, তিনি প্রান্তদেশিয় লোক হিসেবে কেন্দ্রর সাথে সম্পর্ক করতে গিয়ে যে ধরনের মুশকিলের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন তা জিয়াকে কিছুটা ক্ষ্যাপা করে তুলেছে। এটাকে বলতে পারেন, সাংস্কৃতিক শ্রেণি সংগ্রাম। জিয়া বারবার শ্রেণির কথা বলে। এই সংগ্রামটা জিয়াকে করতে হয়েছে। এটা করতে করতে তিনি নিজেকে ব্যাপকভাবে ভেঙেছেন। কেন্দ্র-প্রান্তের টেনশন কাটিয়ে নিজের কাজের পদ্ধতিটা ধরতে পেরেছেন। এটা খুব নতুন প্রবণতা এমনটা বলা যাবে না।

২০০৫ সালে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক একটা বই লিখেছেন, ‘ডেথ অব আ ডিসিপ্লিন’। এর মধ্য দিয়ে তিনি তুলনামূলক সাহিত্যের মৃত্যু ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, তুলনামূলক  সাহিত্য বলে কোন সাহিত্য নেই। এই কালে যা রচিত হচ্ছে তা ‘সীমানা ছাপিয়ে যাওয়া সাহিত্য,’ যা প্রকৃত অর্থে বিশ্ব সাহিত্য। এটা যেখানে বসেই রচিত হোক না কেন, এটা এখন বিশ্বসাহিত্য হয়ে উঠতে পারে। এই ধারণটা পরিষ্কার করতে গায়ত্রী ‘প্ল্যানেটরি’ শব্দটি ব্যবহার করেন। জিয়াও সীমানা ছড়িয়ে গেলেন। বাংলাদেশে জন্ম নেয়া তরুণ এই লেখক কিভাবে সীমানা ছাড়িয়ে গেলেন? ইংরেজিতে তো অনেকেই লেখে। কিন্তু জিয়া কেন এতো গুরুত্ব পাবেন? প্রথম কথা হলো, পশ্চিমে বা ইংরেজি ভাষা-ভাষি লেখা-লেখির জগতে, বিশেষ করে উপন্যাসের বাজার তৈরিতে এজেন্টদের ভূমিকা লেখকদের চেয়ে বেশি। লেখক লেখেন। বাকি কাজটা খুব জমকালো ভাবে করা হয়। নানা লেখককে নিয়ে বাজার গরম করার জন্য পেশাদার এজেন্ট খুব শক্তিশালি ভূমিকা পালন করেন। এরা মিডিয়াতে গিমিক তৈরি করতে বেশ পারদর্শী। এর ফলে অনেক সময় মিডিয়ার হুজুগ দেখে কোনো লেখককে পাঠ করতে গিয়ে হতাশ হচ্ছেন ঘন ঘন। তেমনি জিয়াকে নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ার কাভারেজেও এই হাইপটা বা ওভারটোনটা ছিল। কিন্তু এই হাইপ কাটিয়ে জিয়া ধীরে ধীরে আপন গুরুত্বে ফিরতে শুরু করেছেন। জিয়ার কাজের গুরুত্ব অাঁচ করে সবচেয়ে কার্যকর ১৯ মে ২০১৪ তারিখে, ‘দ্যা ওয়ার্ল্ড এজ উই নো ইট’ নামে  নিউ ইয়র্কারে লেখেন জেমস উড। উডের লেখাটা জিয়ার গুরুত্বকে বুঝতে প্রাধমিকভাবে বেশ সাহায্য করে। জিয়া ইংরেজি ভাষা লিখে সীমানা অতিক্রম করেন নি। বিশ্বের লেখকে পরিণত হন নি। তিনি সীমানা অতিক্রম করেছেন ‘আইডিয়া’ ডিল করে। তাঁর উপন্যাসের ভুগোলও ব্যাপক। কিন্তু ব্যাপক ভুগোলের বাইরেও অনেক মানুষ থেকে যায়। কারণ শ্রেণি এখনও রয়ে গেছে এমনটা মনে করেন জিয়া। তাঁর উপন্যাস ‘ইন দ্যা লাইট অব হোয়াট উই নো’-তে ধারণাগতভাবে যে বিপ্লব ঘটিয়েছেন তা বিশ্ব ফেনোমেনা হয়ে উঠতে বাধ্য। জিয়া গায়ত্রী কথিত ডেথ অব আ ডিসিপ্লিনের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। এই উপন্যাসের ব্যাপ্তি সারা দুনিয়া। প্রতিটি জীবনই এই উপন্যাসটি ছুঁয়ে আছে। কিভাবে এটা ঘটেছে তার লম্বা আলোচনা না করে জাস্ট কয়েকটা পয়েন্টের কথা বলি, ১. পশ্চিমা দর্শন যেই প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে ভিত্তিসহ নড়ে উঠেছিল, যে প্রশ্নের উত্তরের মধ্য দিয়ে আজকের ‘সভ্যতা’ দাঁড়িয়ে গিয়েছে জিয়া সেই প্রশ্নটাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। ১৭ শতকের মহান দার্শনিক দেকার্ত পশ্চিমা দর্শনকে নতুন  ভাবে উদ্ভাসিত করেন এই প্রশ্ন তুলে যে, ‘আমি চিন্তা করি তাই আমি আছি’-এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন রেনেসাঁ বা আলোক যুগের। এটাই এক কথায় পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তিমূলের প্রশ্ন হয়ে আছে। ২. এই যে চিন্তা, এই যে আমার থাকা, এই যে জানা, এই যে আলোকময়তা এটাকে আবার প্রশ্ন করলেন জিয়া, ‘ইন দ্যা লাইট অব হোয়াট উই নো’ বলে আওয়াজ তুললেন। এর অনুবাদ করার মুশকিল আছে। বাক্যটা পুরা মাত্রায় কাব্যিক ও চিন্তা উদ্রেক। এর একটা কাছাকাছি অনুবাদ হতে পারে, ‘আলোকে কি আমরা জানি’?  ফলে জিয়াকে নিয়ে ঝড় না উঠে পারে না। ইংরেজি ভাষা-ভাষী এলাকা, বিশেষ করে আমেরিকা ও ইউরোপে জিয়ার বই নিয়ে এখনও চূড়ান্ত ঝড়টা দেখা দেয় নি। আশা করা যায় এটা অচিরেই দেখা দেবে। এখন জিয়া দর্শনের বিষয়কে ফিকশনের আদলে কেন ডিল করলেন, কোন কায়দায় ডিল করলেন তা খুজতে হলে বইয়ে ডুব দিতে হবে।


উপন্যাস পাঠের রাজনীতি :

উপন্যাস পাঠের রাজনীতি—এটা জানা বিষয়। পৃথিবীর নানা দেশের লেখকদের ইংরেজিতে লিখে মূলধারার ইংরেজিতে হাজির হতে অনেক দিন লেগেছে। মূল ধারা ব্রিটিশ, না আমেরিকান বা ভারতীয়, না বাংলাদেশি—এটা মিন করে না। যে কোটাতে ফেলে এদের লেখা বিচার করা হতো তা এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে।

jiaa
জিয়া হায়দার রহমান

জিয়ার উন্যাসটা অনেক জীবন্ত মনে হয়। মিলান কুন্ডেরা যেমন বলেন, ‘কোন কিছুকে জীবন্ত করার অর্থ অস্তিত্বের সংকটের গোড়ায় ডুব দেয়া।’ জিয়া উপন্যাসে বাস্তবতা এঁকেছেন—এমটা দাবি করার মানে হয় না।  কুন্ডেরা যেমন মনে করেন, এই কালের সাহিত্যের কাজ হলো, ‘সত্তার সম্পর্ক নিয়ে মনোযোগী হওয়া’; জিয়া ঠিক এই কাজটা শতভাগ সফলতার সাথে করেছেন। এটা করতে গিয়ে তিনি অনেকগুলো ডিসিপ্লিনের মধ্য যাতায়াত করেছেন। এবং সবগুলো ডিসিপ্লিন ভেঙে ভেঙে এগিয়ে গেছেন নিজের সত্তার নিগূঢ় বিকাশের পথে। এইভাবেই এই উপন্যাস সারা দুনিয়ার প্রতিটি জীবনের অংশের মধ্যে নিজেকে হাজির করতে সক্ষম হয়ে ওঠেছে। ৯/১১-এর পরের পৃথিবীতে এমন একটা উপন্যাস প্রত্যেকের জীবনকে ছুঁতে পারার অর্থ অতি তাৎপর্যপূর্ণ। উপন্যাস জিনিসটা পুরোদস্তুর রাজনৈতিক।  কী অর্থে একজন পাঠক কোনো উপন্যাসের বয়ান বা টেক্সটকে সময় ও সত্তার দোলাচাল ও নিজের লড়াইয়ের মধ্যেই আবিষ্কার করেন, এবং উপন্যাস কথা বলে পাঠকের সাথে, কখনও কখনও কাব্যিক অভিঘাত তৈরি করে? পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন বলেন, ‘ডায়ালগিক কনটেক্সটের কোন সীমা নেই’। জিয়া হায়দার এর উপন্যাস অনেক কথা বলে।  কথা বলার ধরণের মধ্যেই একটা ব্যাপার ঘটে। জিয়ার কথা বলার বিষয় কী—এই প্রশ্ন করে লাভ নাই।  প্রশ্ন করতে হবে কী বলে না সে? ধর্ম, রাজনীতি, সম্পর্ক, শ্রেণি সংষ্কৃতি, যুদ্ধ টেরিটরির বয়ান এমন এক  জটিল প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যায় যে এই রচনা একই সাথে দর্শনের বই, কবিতা, উপন্যাস, ভ্রমণ বৃত্তান্ত হয়ে ওঠে। এবং এই সব পার হয়ে সে গহীন সত্তার কাছে ফিরে প্রশ্ন করে, ইন দ্যা লাইট অব হোয়াট উই নো’? পশ্চিমের জন্য এই বইটা একটা  ভাল থ্রেট আকারে হাজির হতে পারত জিয়া যদি ‘রেনেসাঁ’ সমস্যাকে প্রশ্ন করার পাশাপাশি এর গোড়াটার ধরে আঘাত করতেন। এটা যে করতে তিনি চান তার লক্ষণ গোটা  উপন্যাসেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তিনি এডওয়ার্ড সাঈদকে খুব ভাল -ভাবে রপ্ত করেছেন তা উপন্যাস পাঠেই বোঝা যায়। তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণিত পড়েছেন। গণিত নিয়ে তিনি যে পরীক্ষা করেছেন তাও খুব গভীর। তিনি রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমের বা এই গ্লোবের সমস্যাটা ধরতে পারেন। এবং ধরেন পশ্চিমের মেথডের মধ্য দিয়েই। এখানে একটু আপত্তি জানিয়ে রাখা যায়, যে ‘আলোকময়তা’-কে তিনি প্রশ্ন করতে চান তা কি এই তাত্ত্বিক পরিসরে সম্ভব? মনে হয় না। এর জন্য এই সভ্যতাকে যে জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিমণ্ডল থেকে আঘাত করতে হবে তা নিশ্চয় গোডেল থিওরি দিয়ে হবে না। হবে না অরিয়েন্টালিজও দিয়েও। হচ্ছে না। খোদ পশ্চিমকেই ডিসেন্টারিং করে দেয়া একটা কাজের কাজ হতে পারে। ডিসেন্টারিং বা বিকেন্দ্রিকরণটা যে দার্শনিক লড়াই, তা জিয়া জানেন। কিন্তু তিনি এটা কতটা করতে পেছেন তার জন্য আরও জটিল আলোচনায় প্রবেশ করতে হবে। এখানে তা করছি না। কিন্তু একটা মাত্রায় জিয়া এটাই করেছেন বা করতে চেয়েছেন। কোন কেন্দ্র নাই। কেবল ভেঙে ভেঙে সত্তার কাছে ফেরার যাত্রা জারি থাকে পুরো উপন্যাসে।

তিনি পশ্চিমের কলিজার ভেতর বসে এর ক্ষত নিয়ে খেলেন। এটাই জিয়ার নতুন ইন্টারভেনশন

in-the-light-of-what-we-knowতাঁর উপন্যাসের বিস্তারিত আলোচনা এই পরিসরে সম্ভব না। সংক্ষেপে যদি বলি, বলতে হবে তিনি যে পদ্ধতিতে উপন্যাসের বয়ান বিস্তার করেছেন তাতে কোনোভাবেই মনে হয় না তিনি নতুন লেখক।  আলাপে তিনি বলেছেন, তিনি ছোটবেলা থেকে লেখেন। প্রকাশ করেছেন সম্প্রতি। তিনি মনে করেন প্রকাশ করা বা প্রোডাকশনটাও লেখকের জন্য ঘটনা না। বিষয় হলো, লেখার সঙ্গের হৃদয় দিয়ে লেগে থাকা। তিনি বারবার গুরুত্ব দেন লেখকের সত্য উপলব্ধির ভণিতাহীন রূপায়নে। যে কারণে তিনি যখন শশী থারু থেকে নিজেকে আলাদা করেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজেকে তারকা মনে করেন না। মুখোশ পরা পারফরমার বলে তিনি শশী থারুকে টিটকারিও করেন। ফলে তথাকথিত নেটিভদের লেখা-লেখির সাথে জিয়ার একটা পার্থক্য আছে। জিয়ার লেখাকে কোনোভাবেই অভিবাসী সাহিত্য বলে পাঠ করা যাবে না। তিনি উপন্যাস পাঠের রাজনীতির ফাঁক জানেন। তিনি পশ্চিমের কলিজার ভেতর বসে এর ক্ষত নিয়ে খেলেন। এটাই জিয়ার নতুন ইন্টারভেনশন। জিয়ার বিশ্ব কণ্ঠ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা লোকাল বনাম অান্তর্জাতিক টানাপোড়েন না। তিনি সত্তার গভীরে আলোড়িত হন এবং এই আলোড়ন কোনো রকম প্রান্তিকবোধের হীনমন্যতা ছাড়াই চিন্তাশীল প্রকরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেন। তাঁর উপন্যাসের বর্ণনাকারী একজন পাকিস্তানী এলিট। যিনি কোনোভাবেই শুধুমাত্র পাকিস্তানী না।  তিনি নিজেকে এই গ্লোবের একজন মনে করেন। তিনি যে চরিত্রকে আমাদের সামনে পরিচয় করিয়ে দেন তা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জাফর।  জাফরের সাথে জিয়ার ব্যক্তি জীবনের মিল পাঠক পড়া মাত্রই টের পাবেন। জাফর জিয়ার সাক্ষাৎ ছায়া চরিত্র। কিন্তু এই চরিত্রকে তিনি নিজে বর্ণনা করেন না। বর্ণনা করেন উপন্যাসের ন্যারেটর পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত জাফরের বন্ধু। যারা অক্সফোর্ডে পড়ার সময়ে গভীর বন্ধুতার বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন। এই ভাবে জিয়া নিজের সত্তাকে ক্রস চেক করেন অন্যের চোখে। আবার এই চোখও তিনিই তৈরি করে দেন। এ এক জটিল সত্তার সচেতন লেখকের ফর্ম। যার গুরুত্ব ধরতে না পারলে এই উপন্যাস পাঠের কোন ফায়দা হবে না। এই বন্ধুর সাথে জাফরের শ্রেণিগত পার্থক্যটা একটা সাংস্কৃতিক লড়াই আকারে জাফরের মনে উদিত হতে থাকে শুরুতে। পরে জাফর যে বিশ্ব পরিভ্রমণের মধ্য দিয়ে এই বেদনাবোধক সম্পর্ক কাটিয়ে নিজের অস্তিত্বের ও সত্তার জানান দেন, তা-ই এই উপন্যাসের বিস্তারের ভিতর দিয়ে আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়, যা আগাগোড়া রাজনৈতিকও একই সাথে। এই উম্মোচনের ইতিহাস তত্ত্ব, তথ্য, বিজ্ঞান, দর্শন ছপিয়ে কাব্যিক বর্ণনার ভেতর দিয়ে উপন্যাস এগিয়ে যেতে থাকে। জিয়া জানেন, সত্য ও আলো নিয়ে পৃথিবী অনেক দিন মোহিত। ফলে এই দুয়ের মাঝে ও এই দুয়ের বাইরে তিনি আমাদের টেনে নিয়ে যেতে থাকেন। অবশ্যই জিয়ার ভাষা বহু মাত্রিক। একই উপন্যাসে এমন বহুমাত্রিক ভাষা-ভঙ্গি পাঠককে একটু বেকায়দায় ফেলে দেয়। এই উপন্যাস কোন আরামদায়ক বা আনন্দ দেয়ার দায়িত্ব নেয় নি। উপন্যাসে তির্যক অভিঘাত ও ধারালো দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারটি মোটেও লুকানো নাই। এত সব কিছুর পরেও মনে হবে আপনি একটা উপন্যাসই পড়ছেন। ঠিক এইখানেই জিয়া ২১ শতকের একটি কনটেমপোরারি মাস্টারপিসের রাইটার হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয়। এটা ক্লাসিক নয়। এটা কনটেমপোরারি। আরও অনেক দিন কনটেমপোরারি থাকবে। ফলে এর আবেদন ও অভিনিবেশ ক্লাসিকের চেয়ে একটু বেশিই।

তিনি বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন টেরিটরির বা ভাষার অর্থে বোঝেন না। তিনি বোঝেন বিশ্ব বা গ্লোবের মধ্যে অন্য সব বিষয়-আশয়ের সাথে সম্পর্কিত করে

ক্ষ্যাপা ছেলের  আওয়াজ :

‘পশ্চিমের যে  সব লোক পুব বিষয়ে এখনও অজ্ঞ তাদের আমি আর ক্ষমা করতে রজি নই’, বলেন জিয়া। তিনি ক্ষমা করেন নি। জাফরের ক্রোধ এই উপন্যাসে এতো প্রবল যে পাঠক বারবার  নিজেকেও আক্রান্ত বোধ করেন। কিন্তু কোনোভাবেই এই ক্ষ্যাপামোকে বিরক্তিকর মনে হয় না। কারণ এমন এক জ্ঞান-তাত্ত্বিক অস্বস্তি নিয়ে জাফর দুনিয়াতে বিরাজ করে যার সমস্যা ‘জাফর’ ডাকনামের ব্যক্তির বাইরে যে কোনো চলমান, জীবন্ত মানুষের সমস্যার সাথে মিলে যায়। যে কোনো চলতি পরিস্থিতির মধ্যে আমরা এক ধরণের সত্যকে আবিষ্কার করি। কিন্তু এই সত্য নিয়ে সংশয় যে বিরাট আত্মদহন ও চৈতন্যের ভিতরে বিপ্লবের জন্ম দেয় তা যে কোনো ব্যক্তিকে আলোড়িত করে তোলে। উপন্যাসের ১০ম পৃষ্ঠাতেই এমন বাক্য আপনি পাবেন, ‘কোন  গিভেন ব্যবস্থার মধ্যে  কোন কিছুকে সত্য বলে হাজির করা বা প্রতিষ্ঠা করা হলেও এটা যে ‘সত্য’ তা আপনি প্রমাণ করতে পারবেন না’। এই যে অস্বস্তির গোড়াটা এত শক্ত যে এর বিরুদ্ধে মোলায়েম ভঙ্গিতে মোকবেলা সম্ভব না। ফলে জাফর ক্ষ্যাপাটে। জিয়াও ক্ষ্যাপাটে। লেখা বড় হয়ে যাওয়ার ভয়ে উপন্যাসের ভিতর থেকে অনেক কোটেশন ব্যবহার করার লোভ থাকলেও তা করতে পারলাম না। তবে আশা পরি পাঠক নিজেই এই উপন্যাসের গুরুত্বের দিকটি আবিষ্কার করতে সক্ষম হবেন। পাঠ মাত্রই তিনি চমকে উঠবেন। নিজ সময়, দেশ ও চেনা-জানা গণ্ডির নানান দিক নিয়া ভাবনায় ভাবিত হতে টান ফিল করবেন।

সাম্প্রতিক এক আলাপে বলেছেন, বাংলাদেশ মৃত্যু আইডিয়ার উপত্যকা। কী অর্থে, এখানে অাইডিয়া দ্বারা আলোড়িত হওয়ার চেয়ে মৃতদের ছায়ার দ্বারা আমরা বেশি আলোড়িত। তিনি মনে করেন, এখানকার ক্ষমতাসীনরা মৃতদের ছায়ার উপর দাঁড়িয়ে একটা পারিবারিক শাসন কাঠানো তৈরি করেছে।  তিনি বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন টেরিটরির বা ভাষার অর্থে বোঝেন না। তিনি বোঝেন বিশ্ব বা গ্লোবের মধ্যে অন্য সব বিষয়-আশয়ের সাথে সম্পর্কিত করে।  বাংলাদেশের হৃদয় হতে এ যেন একটা প্রকৃত বিশ্ব আওয়াজ। কথাটা ঠিক হলো না; সিলেটি হৃদয় হতে বিশ্ব অাওয়াজ। বাংলাদেশে বা  এই ধরণের সাংস্কৃতিক-কলোনিয়াল এলাকার জন্য জিয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ  লেখক এই জন্য না যে, তিনি গ্রামে বা রুরালে জন্ম নিয়ে বিশ্ব ফেনোমেনা হয়েছেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে তিনি মানব সত্তার লড়াইটা ধরতে পারেন। তিনি বোঝেন আইডিয়া বা চিন্তার লড়াই দিয়ে কেন্দ্র-প্রান্ত একাকার করে দেয়া যায়। তিনি পশ্চিমকে ডিসেন্টারিং যেমন করতে চেয়েছেন তেমনি প্রান্তের টেনশনকে লোকাল সংষ্কার থেকে মুক্তি দিয়েছেন। বিদ্রোহের এমন ধারালো, ক্ষ্যাপাটে ধরণ পৃথিবীর জন্য অতি জরুরী ছিল। ২১ শতক যেন জিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। জিয়ার আওয়াজ শুনছে বিশ্ব।

লেখক: কবি ও বিশ্লেষক
রেজাউল করিম রনি

রেজাউল করিম রনি

সাংবাদিক, সহকারী সম্পাদক at নিউ এজ
জন্ম : ২০ জুলাই, ১৯৮৮, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। কবি। তবে বিশেষ ঝোঁক তার সাহিত্য, রাজনীতি ও দর্শন নিয়ে বিশ্লেষণী লেখার প্রতি।

প্রকাশিত কবিতার বই : ‌‘গোলাপসন্ত্রাস’, ‘দাউ দাউ সুখ’। গদ্য: ‘শহীদুল জহিরের শেষ সংলাপ ও অন্যান্য বিবেচনা’।

ই-মেইল : rkrony@live.com
রেজাউল করিম রনি