হোম গদ্য জাগ্রত চূড়ায়

জাগ্রত চূড়ায়

জাগ্রত চূড়ায়
102
0

ভাষার ব্যাপারে বলতে গেলে স্মৃতি হাতড়ে আমার জিজ্ঞাসু মুখটাই দেখতে পাই। হায়! কত জায়গায় যে আমার জিজ্ঞাসা নাক ঢুকিয়েছে তার হিশাব নেই। কিন্তু ঠিক কাঠামোকৃত কোনো উত্তর পাই নি। আবার এও তো ঠিক যে, যা কিছু শিল্প ও সুন্দর তার কোনো নির্ধারণী নেই। আমার বোধের কাছে সে যেভাবে ধরা দেয় তা-ই আমার মানসে গড়ে দেয় তার সত্তাকে। তবে একটি শরীর আমি হাতড়ে হাতড়ে দেখতে পারি। আমার মাঝে শরীর বোধ প্রবল। ইন্দ্রিয়ের সত্য আমার চেতনায় বহুবিস্তারী। আমি চেতনারও বৃন্ত টের পাই। এবং আমি যথার্থই হাতড়ে, অর্থাৎ হাত দিয়ে ও হাত থেকে দেখার কথাই বলছি। ইন্দ্রিয়ের নিজস্ব চেতনা আছে। সেই চেতনা মহাবিশ্বের মৌলের আত্মাকে ছোঁয়। এই যোগ দ্বিমুখী, বহুমুখী, বিভিন্নমুখী, প্রায়ই এফোঁড়-ওফোঁড় করা বহ যাত্রার ঊর্মিময়। বিমূর্তের পরিসর আপনি তখনই দেখতে পান যখন তার সীমাকে দেখানো হয় আপনাকে। সেই বিমূর্তের স্নায়ু ছুঁয়ে দেখি।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, কবিমাত্রই আলাদা। তার কাছে তাই অর্থও আলাদা হবে। প্রতিজনই ভিন্নরকম করে দেখবেন। কারও কাছে ভিন্নরূপেই ধরা দেবে। ভিন্নভাবে গড়ে নেবেন কোনো কোনো কবি। কাজেই একেক কবি বলবেনও তেমন বিভিন্নরকম করেই। তার অন্তঃশীল অন্তর্মানসের ব্যাপ্তিই জগতে ছড়ায়। তিনি যা দেখবেন, গড়বেন ও দেখাবেন তাই তার বাস্তব। প্রত্যক্ষের সাথে সে বাস্তবের মিল নাও থাকতে পারে। আপনি যখন সেই কবির রচনা পাঠ করছেন তখন আপনি তার জগৎ, অর্থাৎ তার বাস্তবে, তার প্রাতিস্বিকতায় হাঁটছেন।


জগতের রং, ধ্বনি ও গতি বিভিন্ন। প্রকাশভঙ্গীর বদলে সেই জগতের স্বকীয়তাকে ধরতে হবে সামগ্রিক ভাষায়।


কবিতা, ভাষা ইত্যাদি নিয়ে বলতে গেলে ফর্মের কথা চলে আসে। বহুদিন যাবৎ শিল্পে ফর্মের উপযোগিতা ইত্যাদি নিয়েই মূলত আলোচনা চলেছে। ভেবে দেখা দরকার যে, শিল্পের বহুমাত্রিকতার দুয়ারে, শিল্পের যাত্রা যে আসীমে দৃষ্টি মেলে সেখানে নতুন নতুন ভুবনে যাত্রাই আমাদের মোক্ষ। সেহেতু যে জগৎগুলো আবিষ্কার করি আমরা এবং গড়ে তুলি যে জগৎগুলো তেমন জগৎগুলোয় আমাদের পর্যটন গভীরতর মনোযোগী দৃষ্টি দাবি করে। একে হয়ে উঠতে হবে অভিসার। বুঝতে হবে প্রতিটি জগতের রং, ধ্বনি ও গতি বিভিন্ন। প্রকাশভঙ্গীর বদলে সেই জগতের স্বকীয়তাকে ধরতে হবে সামগ্রিক ভাষায়।

আসলে ভাষা বা এমন যেসব মৌল নিয়ে কথা হয় তাদের মাঝে ভাব প্রকাশের ব্যাপারটিই মুখ্য বলে সাধারণ্যে গন্য। ফর্মগুলো আমরা দেখে থাকি, প্রতিনিধিত্ব করে—আমাদের কোনো আবেগ আশা ইত্যাদির। অথবা কোনো কিছুর দূরতম প্রতিনিধি হয়ে ওঠে এরা। তবে প্রতিনিধিত্ব করা ছাড়াও তার আরো পরিচয় আছে। কিছু ফর্ম তো এমন থাকবেই যারা কারো বা কিছুরই প্রতিনিধিত্ব করে না। আমরা যদি শিল্পকে তার নিজ সত্তায় ভাবি তো ছবিটা পরিষ্কার হয়। অর্থাৎ ফর্মটি তার নিজের হয়ে কথা বলবে। ফর্মের নিজেরই জগৎ আছে। একথাও মনে রাখছি, আপনার জগতের পীড়নে আপনার ফর্ম নির্ধারিত হয়। কাজেই আপনার জগৎ বা আপনি এবং আপনার ফর্ম এরা একে অন্যের সাথে সংলাপে নিজেদের জায়গা ঠিক করে শিল্পকে গড়ে তোলে।

একেকটা গড়ন হয়ে উঠবে নিজের মতো, আলাদা, বিভিন্ন। চিত্রকলায় যেমন দেখা যায়, হারমনি ইত্যাদি তৈরি হয়, রংগুলো নিজেদের মাঝে বোঝাপড়া করে, সংলাপ করে, কোলাজগুলো নিজের মৌন সত্তা নিয়ে জেগে থাকে। চলতে গিয়ে রং তৈরি করে বিচিত্র বিভিন্ন সব জগৎ : cosmos, chaos ও কখনো কখনো। অনির্বচন। তাকিয়ে দেখুন অজানা সেই সুর ধ্বনি ও সংগীত। ফর্ম হচ্ছে এক সত্তা ও ছাঁচ। শিল্পী এই ছাঁচ-এ একেকটি গড়ন তৈরি করেন : বোধ ও আবেগ তার কাজের মাধ্যম ইত্যাদিকে ফর্ম-এর পীড়নের ভেতর দিয়ে শুদ্ধ করে নেন। গড়ন তৈরি হয়। কিন্তু এছাড়াও ফর্ম-এর নিজের সত্তায় সে গুরুত্বপূর্ণ। স্বতন্ত্র একেকটি ফর্ম একেকটি নন্দন। যেমন রাগ সংগীতে ধ্বনি, রং, সৌন্দর্য ও টেক্সচারের এক জগৎ জেগে ওঠে। রাগ সংগীতের জগতের এই তো ভাষা। যেমন করে না দির দির দিম তুম তা না ধ্বনিতে ওস্তাদ রশিদ খাঁর কন্ঠে জগৎ জেগে উঠল, নির্দিষ্ট হলো, কায়া পেল । (রাগ ভাটিয়ার)

Chaos বলতে যে শৃঙ্খলা ও সমাহিতিপূর্ব পৌরাণিক অবস্থাকে বোঝায় তার একটা রেশ আমাদের মানস পরিস্থিতি ও শিল্পে থাকতে পারে। তবে আমাদের কথাটা আসলে শৃঙ্খলাপূর্ব বা মধ্যবর্তী নয়, শৃঙ্খলা অতিক্রমী এক অবস্থা যেখানে উদ্ভাসের স্রোত ও বিস্ফোরণে একেকটি আকাশ ফুলের পাপড়ির মতো ফোটে। তাদের গহিনে থাকে উৎকেন্দ্রিকতার বীজ। বলা প্রয়োজন উৎকেন্দ্রিকতাই উৎরে দেয় আপনাকে, জাগিয়ে তোলে। এমন সব বাস্তবতায় আমরা অভিসার করতে আগ্রহী। আরো একটি পরিসরের কথা বলা যায় : anarchy। তবে সব শৃঙ্খলা অতিক্রমী জড়তাই আসলে এমন সব আঁধার স্রোতকে তার খাঁড়িতে নিয়ে এগোয় যারা আসলে অদৃষ্টপূর্ব। আপনি তাদের দিকে চেয়ে দেখেন নি বা তারা আপনার দিকে চেয়ে দেখে নি, অথবা সেই উষ্ণতায় আপনি হাত রাখেন নি। আপনি তাদের দেখলেন, তাদের একটা মুখর মালায় গাঁথলেন (স্বাধীনতা দিয়ে), তারপর লাটিমের মাতাল নাচে তারা আমাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ল।

Chaos যদি এক শৃঙ্খলা অতিক্রমী বাস্তবতার কথা বলে, তার ঠিক পাশাপাশি চলে cosmos নামের সেই বাস্তব, যা সুরের মাঝে পরিস্রুত আলোর কথা বলে। এ এক বিশ্বভূমি যার আড়াল নিয়ে ভাববার বদলে আপনার মাঝে এর রূপই কেবল জেগে থাকে। খুব শান্ত এর উপরিতল, কিন্তু ধরে থাকে এক সম্পূর্ণ গহিন। বস্তুত chaos ও cosmos একই সৃষ্টিসত্তার দুই ধারার সুর। তবে আপনার ক্ষেত্রে আপনি যে পরিসর সমূহ নিয়ে খেলা করেন তাদের প্রতিফলন ও প্রতিফলিত হবার পথ এই দুইই ভাষাকে গড়ে তোলে। আপনার প্রতিক্রিয়ার ভেতর সেখান থেকেই জেগে ওঠে chaos ও cosmosর বোধ। মোটাদাগে ব্যাপারটাকে এভাবে বলা যায়, কোনো বিশেষ নকশা, অলংকার, মোটিফ বা কোলাজ আপনার কবিতায় যে শান্ত বা ঝড়ো হাওয়া জাগিয়ে তোলে তা থেকে এই ভাষার গঠনের একটা সূত্র আপনি অবশ্যই পেতে পারেন।

তারকোভস্কির চলচ্চিত্রে সময়কে সিনেমার পরিসরে বইয়ে দেবার দর্শন; ওয়াংকার ওয়াই এর নির্মাণে জীবনকে চৌকোণ ফ্রেম ও পার্সপেক্টিভে দেখা; ঋত্বিক ঘটকের প্রান্তর ও রাগের সমন্বয়, এবং রান্নাঘরের গুমোটের বৈপরীত্য; অথবা গদারের নির্মাণে পরিপার্শ্বের আসবাব ও তাদের বাঙ্ময় রং পাত্রপাত্রীদের জীবনের সঙ্গে বৈপরীত্যের যে সংগীত গড়ে তোলে ভাষাকে সেখানেও ধরা যায়।


ফেনোমেনাকে খেলাবার পরিসর আপনি বিস্তৃত করবেন। কবির এখানে সৃষ্টীশীলতা।


ভাবুকেরা প্যাটার্ন বের করেন, কারুশিল্পীরা প্যাটার্ন গড়ে তোলেন। আমি বরং প্যারাডাইমের পক্ষপাতী। আমি যদি প্যাটার্নকে বলি তালিকা, প্যারাডাইম হলো সেই পরিসর যেখানে ফেনোমেনা তার নানা উদ্ভাস নিয়ে জেগে উঠবে। ফেনোমেনাকে খেলাবার পরিসর আপনি বিস্তৃত করবেন। কবির এখানে সৃষ্টীশীলতা। বহুতল ফেনোমেনা কবির জগতের পরিচায়ক। আমার কাছে ফর্মগুলো এমনই। যার নিজের ভাষা আছে, জাগৃতি আছে।

কথা বলছিলাম ফেনোমেনা নিয়ে। আমার বা আমাদের অনেকের মাঝেই রিয়ালিটি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা আছে। অর্থাৎ, কে কী বুঝে থাকেন, এসব। কথা হচ্ছে, বাস্তব কী? আপনি একে কিভাবে দেখেন? আপনি এর ওপর কতটা নির্ভরশীল? আরো একটা দিক আছে এর। বলা হয় বহির্বাস্তব, অন্তর্বাস্তব ইত্যাদি। আজ অন্তর্বাস্তবের বয়ানের দিকেই যাচ্ছি আমরা। কিন্তু বহির্বাস্তবের দুয়ারও আসলে অন্তর্বাস্তবের দিকেই নির্দেশ করে। কলপাড়ের ঝগড়ার যে বাস্তবকে আপনি কবিতায় ছেকে তুললেন তা কলপাড়ের বাস্তব নাকি কবিতা তার নির্ধারক আপনিই। যার মাঝে ওই গড়ন তৈরি হলো তা আসলে আপনারই ছাঁচ। কথা হচ্ছে, অন্তর্বাস্তবের বহিঃপ্রকাশ থাকবে। তা চোখে দেখা জগতের গলিতে ফলাবেন নাকি তা চোখ বুজে ছোঁয়া মর্মের নরম উত্তাপের স্রোতে বিকশিত হবে, তা কেবল আপনিই নির্ধারন করবেন। আপনার নিরিখ ও নিরিখের আত্মাই নির্ধারণ করে ভাষা কী হবে।

আবার ভাষার কথা এল। ভাষা আপনি যেভাবে তৈরি করেন তাই। তবে তাতে যথার্থই এক নাচ হবে। যদি না হয় তার স্থিতি ও সামর্থ্য নিয়ে সংশয় থাকে। আসুন এবার ডিডাকটিভ মেথডে যাই।ফেনোমেনার পরিসর থেকে প্যাটার্নের আলপথে হাঁটি। শিল্পের সাফল্য নির্ভর করে যে বিষয়গুলোর ওপর তাদের মোটামুটি একটা ফর্দ করা যায়। যেমন অনেকে একটা নাম বলে থাকেন—ক্র্যাফ্ট। শিল্পী তার মাধ্যমের বা উপকরণের সঙ্গে যে সহজতায় সঙ্গমে যান তাকেই আমি ক্র্যাফ্ট বলে বুঝি। যখন রং নিয়ে কাজ করেন আপনি, রংগুলো কি আপনার সাথে এক সহজ সংলাপে আসে? যদি আসে আপনার ও রঙের মোক্ষ এক হলো। এটা কোনো চুক্তি নয়, সহবাস। এই যে যৌনতা—অর্থাৎ আপনার প্রতি আপনার কাছে জীবনের এবং জীবনের প্রতি জীবনের কাছে আপনার দৃষ্টি ও কামনা—এরা এবং ভাষা একই সমতলের অধিবাসী। তবু তার ঘর লাগে। তাই কাঠামোর কথা আসে—উপরিতল, অন্তস্তল : সিনট্যাক্স, হারমোনি, এবং সর্বোপরি সংগীত। এর রাশ টেনে ধরা লয় বাড়ানো, মৌনতার জগতে পর্যটন এসবই আসলে একেকটি কলাবিস্তার। যাতায়াতগুলো সর্বমুখী। আমি হয়তো এভাবে বলতে পারি, ভাষাটি টোনালিটিময়, উৎকেন্দ্রিক, শৃঙ্খলারোধী, তানময়, সুঠাম, ইন্দ্রীয়স্পর্শী, ফাইনালিটিস্পর্শী। ভাষার ইন্দ্রীয়গুলো নিয়ে অনেক সুরেলা রসে ভাসা যায়, মগ্ন থাকা যায়।

তানভীর মাহমুদ

তানভীর মাহমুদ

জন্ম ৯ অক্টোবর, ১৯৮০, ঢাকা। ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এমবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অপরাধতত্ত্ব ও বিচার-এ এমএসএস।
পেশা : চাকরি।

প্রকাশিত বই : প্রতিবিহার (কবিতা)

ই-মেইল : editor.hansadhani@gmail.com
তানভীর মাহমুদ