হোম গদ্য জর্জ স্যান্ডার্স : লিংকনের কান্নার হাস্য’কার

জর্জ স্যান্ডার্স : লিংকনের কান্নার হাস্য’কার

জর্জ স্যান্ডার্স : লিংকনের কান্নার হাস্য’কার
1.22K
0

নোবেলের পর সাহিত্যে সম্ভবত সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ম্যান বুকার। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর লেখকদের প্রকাশিত বছরের শ্রেষ্ঠ ‘ফুল লেনথ’ উপন্যাসের জন্য এই পুরস্কার দেয়া হয়। এর বাইরেও বুকার আরেকটি পুরস্কার দেয় যেটি ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ, যা ইংরেজিতে অনূদিত বইয়ের জন্য দেয়া হয়। ২০০৫ থেকে এটি চালু হয়। তবে সচরাচর ম্যান বুকার পুরস্কার বলতে আমরা যা বুঝি সেটি দ্য ম্যান বুকার প্রাইজ—যার লেখককে অবশ্যই কমনওয়েলথ, জিম্বাবুয়ে অথবা আয়ারল্যান্ডের নাগরিক হতে হবে, এবং উপন্যাসটি ইংরেজি ভাষায় রচিত হতে হবে। ২০১৪ সাল থেকে মার্কিন লেখকদের বুকারে অংশ নেয়ার পথ উন্মুক্ত হয়। গতবছর পুরস্কার পেয়েছিল মার্কিন লেখক পল বিটি। মার্কিনিদের সেই জয়যাত্রা অব্যাহত রেখে এবার লিংকন ইন দ্য বারদো উপন্যাসের জন্য ম্যান বুকার পেয়েছেন ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার জর্জ স্যান্ডর্স।


এটি কি সাইফাই, নাকি নিপাট ভুতুড়ে; এটা কি আবেগঘন নাকি রম্যরচনা—এমন ধন্দে পড়ে যাবেন পাঠকরা।


লিংকন ইন দ্য বারদো’র উপন্যাসটির টাইটেলে ব্যবহৃত বারদো শব্দটি বৌদ্ধধর্মের একটি টার্ম, যার অর্থ মৃত্যু ও পুনর্জন্মের মধ্যবর্তী অবস্থান। আর বইটির গল্পের ভিত্তিভূমি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বে রচিত, সেটি হলো প্রেসিডেন্ট আব্রাহার লিংকনের পুত্রশোক। ১৮৬২ সালে কলেরা আক্রান্ত হয়ে মারা যান লিংকনের ১১ বছরের ছেলে উইলি। লিংকন তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এক বছর পর গৃহযুদ্ধের কবলে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। সেই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে বিলুপ্ত হয় দাসপ্রথা, উন্মুক্ত হয় সবার জন্য সম্মান, সুযোগ ও স্বাধীনতা। সেই ক্ষমতাধর ও দেশপ্রেমিক আব্রাহাম লিংকনের ছেলে যখন মারা যায় হঠাৎ করে আর তাকে নিয়ে হাজির হতে হয় গোরস্তানে, তখন তার মানসিক অবস্থাটি অনুভব করা যায়, মানুষ কত অসহায় মৃত্যুর কাছে—এমনকি দেশপ্রেমিক, মানবিক, মহানুভব ও পরাক্রমশালী প্রেসিডেন্টও। মূলত গোরস্তানে প্রেসিডেন্টের সেই রাত্রির অবস্থান ও মানসিক স্থিতি নিয়েই রচিত লিংকন ইন দ্য বারদো, এক রাত্রির কাহিনি, কিন্তু তা স্পর্শ করে মানুষের মন, উপস্থাপন প্রকরণে দেয় নতুনত্বের স্বাদ—মূলত একারণেই বেছে নেয়া হয়েছে এই উপন্যাসটিকে।

ব্যারোনেস লোলা ইয়ং—বুকারের এবারের আসরের বিচারক প্যানেলের প্রধান, বইটি পুরস্কৃত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, এটি উন্মোচন করে ‘রসাত্মক, বুদ্ধিদীপ্ত ও গভীর সংবেদনশীল বয়ান’।

প্রায় ৫ ঘণ্টা অলোচনার পর বিচারক প্যানেল, যেখানে ছিলেন ঔপন্যাসিক সারাহ হল, শিল্পী টম ফিলিপস, সাহিত্য সমালোচক লিলা আজম এবং ভ্রমনলেখক কলিন থাবরন, সবাই ঐক্যমতে পৌঁছায় ২০১৬ সালের সবচেয়ে ভালো বইটি জর্জ স্যান্ডার্সের লিংকন ইন দ্য বারদো। লোলা ইয়ং বলেছেন :

এটা পুরস্কার জিতেছে কারণ এটার নতুনত্ব, এর স্টাইল সম্পূর্ণ আলাদা।

বস্তুতপক্ষে এটা এমন এক উপন্যাস যার জেনার ঠিক করা কঠিন। সাহিত্য সমালোচক রেবেকা জনসের অভিমত :

এটি কি সাইফাই, নাকি নিপাট ভুতুড়ে; এটা কি আবেগঘন নাকি রম্যরচনা—এমন ধন্দে পড়ে যাবেন পাঠকরা।

প্রেসিডেন্ট লিংকন ছেলেকে কবর দিতে গেছেন, ভারি মন, একাকী পরিবেশ… তার মাঝে ১শ ৬৬টি আত্মার আবির্ভাব এবং সেই রাতকে ঘিরেই উপন্যাসের শুরু ও শেষ—এ এক অন্য মুন্সিয়ানা। পাঠাভ্যাস প্রতিবন্ধকতা ও কিছুটা অস্বস্তি ভেদ করে কিছুদূর এগুতে পারলে উপন্যাসটি শেষ না করে উঠতে পারবেন না পাঠক। কারণ, শেষ পর্যন্ত গল্পে কী ঘটতে যাচ্ছে তা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন।

সেই সাথে স্যান্ডার্স একটি ঝুঁকিও নিয়েছিলেন। সেটি হলো বিষয়বস্তু হিশেবে আব্রাহাম লিংকনকে নির্বাচন। লিংকন নিয়ে মার্কিন মুলুকে কাগজের বই থেকে স্যালুলয়েডের বই অর্থাৎ চলচ্চিত্র, কমিক-গান-গবেষণার অন্ত নেই। সেই চর্চিত এক চরিত্রকে প্রথম উপন্যাসের চরিত্র হিশেবে বেছে নেয়া সত্যিই সাহসের ব্যাপার। সেই ঝুঁকি স্যান্ডার্স নিতে পেরেছেন তার ভাষার বুনন ও আঙ্গিকগত উপস্থাপনের কৃৎকৌশলের ওপর ভর করে। মূলত এই অভাবনীয়ত্বের জোরে ৫৮ বছর বয়সী স্যান্ডার্স পিছনে ফেলেন এবারের বুকার শর্ট লিস্টের অন্য ৫ লেখককে, যাদের মধ্যে ছিলেন ব্রিটিশ লেখক আলি স্মিথ, ফিওনা মোজলে, নিজ দেশের পল আস্টার, এমিলি ফ্রিডলান্ড ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক মোহসিন হামিদকে।


মজার ব্যাপার হলো এটিই স্যান্ডার্সের প্রথম উপন্যাস এবং যেটি নিয়ে শুরু থেকেই কুণ্ঠিত ছিলেন তিনি।


পুরস্কার গ্রহণের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় স্যান্ডার্স উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ দিয়েছেন, অন্যসব বিজয়ী লেখকের মতো বলেছেন, এটি তার বড় অর্জন, যা ভবিষ্যতে অনুপ্রেরণা জোগাবে। সেই সাথে তিনি বইটির পেছনের চমকপ্রদ কিছু তথ্যও শেয়ার করেছেন। মজার ব্যাপার হলো এটিই স্যান্ডার্সের প্রথম উপন্যাস এবং যেটি নিয়ে শুরু থেকেই কুণ্ঠিত ছিলেন তিনি। প্রায় ২০ বছর ধরে মাথায় বয়ে বেড়াচ্ছিলেন গল্পের প্লটটি, কয়েকবার লিখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কিছুদূর এগুনোর পর আর মনঃপূত থাকে নি, ফলে পিছিয়ে গেছে লিংকন ইন দ্য বারদো-এর প্রসবক্ষণ। এমনকি ২০ বছর পর যখন উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত তখনও সন্দিহান ছিলেন স্যান্ডার্স। কারণ দুটো, প্রথমত, এর বিষয়বস্তু আর দ্বিতীয় সেই বিষয়বস্তু প্রকাশে জুতসই আঙ্গিক ও ভাষা; এ দুটো তালমেলে চলছে কিনা সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ ছিল স্যান্ডার্সের জন্য। স্যান্ডার্স বলছেন :

আমার গল্পটা খানিক ডার্ক, বিদ্রূপাত্মক, সাইফাই কিসেমের, লোকে এটিকে কিভাবে নেবে, চমৎকার আইডিয়াটির প্রতি আমি সুবিচার করতে পারব তো?

এমন নানান ভাবনা শুরু থেকেই তাড়িত করেছে। মনে হয়েছে যতদিন নিজে না সন্তুষ্ট হতে পারছেন ততদিন এই আখ্যান ছাপাখানায় যাবে না, সেই সন্তুষ্টি যদি কোনোদিনই না আসে তবে তাই সই। শেষ পর্যন্ত ২০ বছর পর মাথা থেকে কাগজে লিপিবদ্ধ হয় লিংকনের শোকগাথা, কিন্তু সেটি তেলতেলে আবেগে নয়, বরং হাস্যরসে, উদ্ভট আবহে। লেখা শেষে পাণ্ডুলিপি পড়তে দিলেন স্ত্রী পলাকে। সেটি পড়ে পোস্ট-ইট নোটে পলা লিখলেন :

এত অকৃত্রিম যে এটা চিরস্থায়ী হবে।

স্ত্রীর প্রশংসায় আত্মবিশ্বাস বাড়ল স্যান্ডার্সের, বের হলো লিংকন ইন দ্য বারদো, করল বাজিমাত।

শেষ করতে চাই স্যান্ডার্স-এর একটি কথা দিয়ে। তিনি বলছেন :

খুব অদ্ভুত এক সময়ে বাস করছি আমরা। আমাদের সব সময় নেতিবাচক অনুভূতি ও সহিংসতার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে।

হয়তো একারণেই ভেঙে পড়ছে পূর্বতন নন্দন, তালেগোলে জড়িয়ে যাচ্ছে হাস্য আর ভাষ্য, বদলে যাচ্ছে প্রথাবদ্ধ রচনারীতি, জন্ম নিচ্ছে ওপেনএন্ডেড ফিকশন ও একটি লিংকন ইন দ্য বারদো।

মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান