হোম গদ্য চড়াইয়ের সাদা ডিম ভাঙা দুপুরে

চড়াইয়ের সাদা ডিম ভাঙা দুপুরে

চড়াইয়ের সাদা ডিম ভাঙা দুপুরে
343
0
11125457_927442120634243_1553428509_n
অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম

তুমি কি জানো, রবীন্দ্রনাথ কখনও এই বাড়িতে আসেন নি

কী প্রসঙ্গে ভদ্রলোক কথা তুলছিলেন—মনে পড়ছে না; প্রসঙ্গের সাথে বিষয়ের মিল ছিল কিনা—ভাবনা অবান্তর। সেদিনই প্রথম পরিচয়। প্রথম দেখা। তার বাড়িতেও প্রথম আসা। বিকেল ভেঙে তখন গড়িয়ে পড়ছিল প্রায় সন্ধ্যার গায়ে। এগিয়ে এসে বললেন, নদী দেখতে গেলে বসা নয়, বেরিয়ে পড়ো। কী নামে যে ডাকল লোকটা নিজের ছেলেকে, ঠিক বুঝতে পারলাম না। ফুটফুটে এক পিচ্চি দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বলল, এনারা কারা ধুন্দু পটাশ? চুপচাপ লোকটি এক কথায় উত্তর দিল, আমার বন্ধু, বাবা। সোফায় বসতে বসতে না বসতেই ঠান্ডা শরবত নিয়ে এল খোলা চুলের একজন নারী। মিষ্টি হেসে এগিয়ে দিয়ে বলল, তাড়াতাড়ি নেন, বেলা একেবারে পড়ে এল, আপনারা ঘুরে আসুন।… আমি গড়ার বড় বোন গড়ি।
মানে! আমরা তো হেসেই গড়াগড়ি। তখন বুঝতে পারলাম লোকটি ছেলেটিকে গড়া নামে ডাকছিল।
পিচ্চি এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে বলল, আমি দীপ্র। ধুন্দু পটাশ আমার মামা।
মাথায় তখন গড়া-গড়ি ঘুরছে। এটা কারো নাম হতে পারে? গড়া-গড়ির পোশাকি নাম কিন্তু দারুণ। বোঝা গেল এ শুধু মাত্র বাবা-মায়ের আদর-ডাক। বেরিয়ে পড়লাম গড়ার সাথে আমরা কয়জন। রাতেই যে যার মতো বাড়ির সদস্যরা খেয়ে নিচ্ছে। বাড়ির কর্ত্রীর মুখের ভাষার সাথে এই অঞ্চলের এমনকি বাড়ির অন্য সদস্যদের মিল নেই। কী চমৎকার করে কথা বলেন! খাঁটি বাংলা ভাষা। কান জুড়িয়ে যাচ্ছিল। একহারা শরীরের ছোটখাট মাথায় চুলহীন পাঞ্জাবি পরা ধীর মানুষটি খেতে বসলেন আমার থেকে দূরের চেয়ারে। এতটা দূরের যে তার কথা আসতে আসতে কথাগুলো আরও আস্তে শোনা যাচ্ছিল। আমি চেয়ারটা টেনে কাছে বসতেই তিনি কী যেন বলতে চাইলেন, আবার থেমে গিয়ে খাওয়ায় মন দিলেন। মাথা উঁচিয়ে ‘গড়া’ নামে জোরে ডাক দিলেন। গড়া আসতেই বললেন, সব জায়গায় ঘুরিয়েছিস তো মেহমানদের? দক্ষিনডিহীতে নিয়ে গিয়েছিলি তো? গড়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে মাকে পানির গ্লাস টেবিলে কেন দেয় নি—বকা দিতে দিতে অন্য রুমে চলে গেল। একটু অস্বস্তি নিয়েই বলতে শুরু করলাম, আপনাদের গ্রামটি কিন্তু অনেক সুন্দর!

—আপনার ভালো লাগছে?

—আমি তো অনেক ছোট, তুমি করে বলবেন।

—দক্ষিনডিহী গিয়েছিলে?

—হ্যাঁ, তবে খুব ভালো লাগে নি…

—কেন?

—সরকারি পদক্ষেপে আদল হয়ত আছে , শ্বাস নেই। তবে শৌচাগারে কেবল আগের সেই ইট পাওয়া গেল।

—(হেসে দিয়ে) হ্যাঁ তাই। সংস্কার ভালো, তবে অতি সংস্কারে চেহারাই বদলে যায়। তুমি কি জানো, রবীন্দ্রনাথ কখনও এই বাড়িতে আসেন নি?

—হ্যাঁ শুনলাম। তবে দক্ষিনডিহীর চেয়ে আলকা গাঁয়ের অন্য কিছু আমায় মনে করিয়ে দেবে, এখানে আমি কোনো একদিন এসেছিলাম?

তিনি উন্মুখ হয়ে জানতে চাইলেন, কী?

—ঝিমিয়ে পড়া বিকেলের গায়ে ভৈরব নদের কলমিদামের ভেতর ডুবে থাকা হাঁস, তাড়াহুড়ো করে ফেরা খেয়াঘাটের নৌকোয় ঘরে ফেরা মানুষের মুখ, ফণিমনসা, শটিবন, মধুকর ডিঙা, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা খুলনালঞ্চের এগিয়ে আসা ভেঁপু, নদের পাড় ধরে হাঁটা বালুপথ, বেঁকে এসে তীরে ওঠা রসগোল্লার দোকানে রস-আপ্যায়ন, সন্ধ্যে নামার মুখে কৃষ্ণাদ্বাদশীর জ্যোৎস্নার নরম গান, ওপারে বিশীর্ণ বটের নিচে থমকে থাকা অন্ধকারের গায়ে লেপটানো নিস্তব্ধতা। বাসকলতায় ঘেরা জলসিঁড়ির ঢেউ ছলকে ওঠা সাতটি তারার তিমির, গঙ্গা ফড়িং, কেবল ঘন হয়ে আসা অন্ধকারে চুপ জিরিয়ে নেয়া পথিক, ভ্যানে রেললাইনের পাড় ধরে আসতে আসতে বিজন ঘাসপোকা আর ঝিঁঝির চিৎকার। এই ‘স্রোত’ নামের বাড়ির গেটে এসে কচি লেবুপাতার নরম সবুজ আলো , মিহি ঘিয়ে রঙের জবা, নাটাফলের গাছ, ধুন্দল বীজ আর শালিক-খঞ্জনার দৌড়াদৌড়ি মনে করিয়ে দেবে আমায়।

আনমনে বলে উঠলেন, রেললাইনের ধারে কাচপোকারা এখনও খুব করে ডাকে? অনেকদিন যাওয়া হয় না ওদিকটায়। সে অনেকদিন আগের কথা। তখন বোধহয় তোমাদের জন্মও হয় নি। সত্তরের কথা। সবে আমার চাকরি হয়েছে রুপালী ব্যাংকে। এই রেল লাইনের ধারে রুপালী ব্যাংক শাখায় আমার পোস্টিং। ঘাসের ভেতর চড়াইয়ের সাদা ডিম ভাঙা দুপুর আসত বুনো হাঁস-সকাল গড়িয়ে। অশ্বথ সন্ধ্যার হাওয়া লাগার আগে অফিস শেষ করে বাড়ি ফেরার পালা। বয়স খুব বেশি নয়, বুঝলে ?

—হুমম। তারপর।

—নরম ধানগন্ধ ডুবসাঁতার সময় গড়িয়ে পড়ছিল কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাতের গড়িয়ে পড়া পানির মতো। হঠাৎ একদিন কাস্টমার-প্রায়-ফাঁকা দুপুরে ম্যানেজার ডাকলেন আমায়, বললেন ‘বাচ্চু, আপনারে একটা  দায়িত্ব দেব, যদিও কাজের চাপ আপনার একটু বেশিই। কিন্তু কী করব, এটি প্রথম চালু হওয়া একটা কাজ। আপনি ইয়ং ম্যান, আপনি ঠিক সামলে নিতে পারবেন।’ আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি তার দিকে, বরাবরই আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। তো স্যার আমায় নতুন দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন যে, এই মাস থেকে সকল শিক্ষকের বেতন ব্যাংক থেকে ড্র হবে আর সেই কাজটা আমায় করতে হবে, আমাদের এই থানার। তখন খুব বেশি শাখা হয় নি। আর স্কুল-কলেজ মিলিয়ে বেশ শিক্ষকদের চাপ নিতে হতে লাগল, মাসের প্রথম সপ্তাহ, আবার কেউ কেউ দ্বিতীয়, তৃতীয় সপ্তাহে আসেন।  নীরবে কাজ আর মাথা গলিয়ে মাঝে মাঝে রেললাইনের কু-ঝিক-ঝিক করা দুপুর দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা দিন পার হয়ে গেল। আমি বেশ অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম। এরকম এক ডানা ঝাপটানো দুপুরে উদোম গ্রীষ্মকাল হবে, কেবল বসন্ত যাই যাই করছে, আমি আলমারিতে ফাইল তুলছি, একটি কণ্ঠস্বরে ফিরে তাকালাম, এক্সকিউজ মি, আমি একটু বসতে পারি? ফিরে তাকিয়ে চোখ কেমন ঝাঁ ঝাঁ দুপুরের মতো ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। চুল-নাসা-গ্রীবার সাথে যেন কলকাতার গান বেজে উঠল। বেতশাখের আড়ালে যেন এক হলুদ মাছরাঙা ডেকে উঠল। আমি বসতে বলে হাতের কাজ শেষ করে জানতে চাইলাম, কী করতে পারি আপনার জন্য? আর মনে আওড়াতে আওড়াতে লাগলাম ‘Poet don’t invent poems, the poem is some what behind, it’s been there for a long time, the poet merely discovers it’।

ট্রেনটির শেষ হুইসেলে আরও একবার কাকুর গলা শুনতে পেলাম, তোমার চোখ এত গভীর কেন

হাতওয়ালা চেয়ারটির উপর হলুদ পালিশ করা সরু আঙুলের  ভাঁজে চিকচিক করছে নীলা পাথর। পেইন্ট করা চিবুকের নিচে জমে আছে মুক্তোঘাম। মসলিন হলুদ রঙের শাড়ির ফাঁকে উঁকি দিচ্ছিল দিনের প্রথম সূর্য। দুপুর রোদের সর্ষে ক্ষেতের মতো নিস্তব্ধ। খুব আস্তে অথচ স্পষ্ট গলায় বলল, আমি নলখাগড়া সরকারি কলেজে ফিলোসফি পড়াই। গত দুমাস আসতে পারি নি, আমার বকেয়া সহ এ-মাসের বেতন তুলতে চাই। কাঁপা হাতে সব কাজ করে তাকে টাকা বুঝিয়ে দেবার পর চুপ করে খানিকটা সময় বসে রইল। আমি জানতে চাইলাম আর কিছু বাকি আছে? সে বলল, না তো!

শানিকদিয়া চর পেরিয়ে বেশ খানিকটা পথে তাকে আসতে হতো। কিন্তু এই অজগাঁয়ে এত সাজ নিয়ে প্রায় রোজ আসতে লাগল। তার অকারণ বসে থাকা আমার টেবিলের সামনে! অস্বস্তিতে গলা ভরে উঠত আমার। আমার কাজের দিকে ঝাউচোখে তাকিয়ে থাকত সে। কখনও এসে মৃদু স্বরে বলে উঠত, একটু বসি? আবার কখনও না বলেই বসে পড়ত। একদিন এল মধুকুপী ঘাস-রঙা শাড়িতে বাসমতী ধানক্ষেতের পাড় জড়ানো , সবুজ টিপ আর সবুজ পালিশ পেইন্ট করা মুখচ্ছবিতে। মৌরির গন্ধমাখা ঘাস-শরীরে ঘুঘুর ডাক শুনতে পেলাম যেন, আমাকে একটু জল দেবেন? তাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বললাম, আপনি কি আমাকে কিছু বলবেন? তার সেই গভীর দিঘি-চোখে চোখ রেখে বললাম, বলুন, আজ আমি প্রস্তুত আপনার সব কথা শুনতে। সে মাথা নেড়ে ‘কিছু না’ বলল। আমি একটু ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম, কিছু না, তবে আমার টেবিলের সামনে রোজ এসে বসেন কেন? এদিকে অফিসে পুরুষ-নারী সহকর্মী এমনকি কাস্টমারদের টিপ্পনীও খেতে হচ্ছিল, অকারণ। আমি ঝাঁ করে উঠলাম, আপনার তো কাজও থাকে না, তবে? কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত চোখ মেলে কুয়াশা প্রার্থনা সবুজ ক্ষেতটি রেললাইনের শেষ পাইলনের ক্যাবল ছাড়িয়ে চলে গেল। দুদিন খুব ধুপধাপ বেরিয়ে গেল। অফিসে আসার আগে সকালে নাস্তা করতে করতে পত্রিকায় হালকা চোখ বুলিয়ে নেয়া রোজকার অভ্যাস ছিল। স্বভাববশত একটু তাড়াহুড়োই থাকে তখন। একটি সবুজ টিপওয়ালা শ্যামরঙের নারীর ছবির পাশে বড় বড় করে লেখা ‘নলখাগড়া সরকারি কলেজের দর্শনের শিক্ষক ‘প্রসূন ভট্টাচার্য’ দীর্ঘদিন মরণব্যাধি ক্যান্সারে ভুগে গতকাল রাতে দেহত্যাগ করেছেন’। তার স্মরণে স্মরণসভার তারিখও এক সপ্তাহ পরে উল্লেখ আছে। সরু সরু কালো কালো ডালপালা নিয়ে বিপুল বাতাস মশারির মতো ফুলতে লাগল মনের আনাচকানাচ। পলাতক খুনির অস্পষ্ট ধোঁয়ার মতো নিজেকে নিজের কাছে লুকিয়ে এক সপ্তাহ অফিস করে পত্রিকায় উল্লেখ করা তারিখে পৌঁছে গিয়েছিলাম নলখাগড়া কলেজের দর্শন বিভাগে, সেখানে গিয়ে বন্ধু হোসেনের সাথে দেখা। বলল বাচ্চু, তুই ! আমি বললাম, তুই এখানে! বলল, হ্যাঁ দিদি আমার বড় বোনের খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল, বোন আসতে পারে নি , তাই আসতে হলো। জানিস তার কলিগ বলছিল, তার সাজগোজ নিয়ে কলেজে ভীষণ আপত্তি ছিল, বলত অজগাঁয়ে এত সেজে আসলে ছেলেমেয়েরা বখে যাবে। তো হেসে উত্তর দিত, আর কদিনই বা আছি, উৎসবে বাঁচি! দর্শন বিভাগ প্রসূনের স্মরণসভা শুরু করে দিয়েছে। পেছনে বড় করে তার গভীর চোখ চেয়ে আছে পোস্টারে। নিচে লেখা ‘আর ক’দিনই বা আছি, উৎসবে বাঁচি’। থেঁতলানো সিগারেট মাড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম , হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম আলকা গাঁয়ের রেল লাইনের ধারে, কাচপোকার চিৎকারে।

—কাকু !

—তোমার চোখ এত গভীর কেন মা? এত মিল চোখে চোখে থাকে?

গড়া’র মায়ের চেঁচামেচি শোনা গেল, কত রাত হয়েছে খেয়াল আছে! এখন না ঘুমালে সকালের অনুষ্ঠানে কিছুতেই তুমি এটেনড করতে পারবে না।

আমার কাছে এসে কাকী বললেন এ কী মা, তোমার হাত তো শুকিয়ে গেছে, ওঠো ঘুমাতে যাও।

কাকু তার  ছোট্ট শরীর নিয়ে কখন উঠে গেলেন, খেয়াল করলাম না।

সকাল হতে না হতেই কাকুর আর দেখা মিলল না। আমাদের ট্রেনের সময় হয়ে এল। বেরিয়ে পড়লাম আমরা।

নিষিদ্ধ চুরুটের গন্ধে প্লাটফরমটি কেমন কঁকিয়ে উঠল। টেরিকাটা আলো নিয়ে ডুবো চাঁদ নক্ষত্র ছুঁই ছুঁই। আলকা গায়েঁর ঝাপটায় ট্রেনটির শেষ হুইসেলে আরও একবার কাকুর গলা শুনতে পেলাম, তোমার চোখ এত গভীর কেন?

আঁখি সিদ্দিকা

আঁখি সিদ্দিকা

জন্ম ১৭ অক্টোবর, মানিকগঞ্জ। বাংলায় স্নাতকোত্তর।
পেশা : চাকরি; কর্মকর্তা, আইসিবি।

প্রকাশিত বই :
ছায়াচর
বালক
নক্ষত্রের জলে কয়েকটি তারা
বিষণ্ন সরাইখানা

বই-চড়ুইয়ের সাদা ডিম ভাঙ্গা দুপুরে (২০১৬)

ই-মেইল : ankheesiddika@Gmail.com.
আঁখি সিদ্দিকা