হোম গদ্য চিন্তার জার্নাল : প্রথম কিস্তি

চিন্তার জার্নাল : প্রথম কিস্তি

চিন্তার জার্নাল : প্রথম কিস্তি
683
0

সৃষ্টি ও নির্মাণ


সৃষ্টি প্রচলিত প্রথাবদ্ধ প্রতীকী শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। একজন মানুষ, যে প্রচলিত প্রথাবদ্ধ জাগতিক নিয়ম ও শৃঙ্খলার বন্দীত্ব স্বীকার করে বেঁচে আছে, সে নিঃসন্দেহে স্রষ্টা নয়। সে একটি নিরামিষ পতিত-সত্তা। কোনো পতিত-সত্তার বিদ্রোহ হবে অমানবিক পারভারশন। সে ভেনাস কিংবা ম্যাডোনার ছবি দেখে মনে তুলে নেবে ধর্ষণের মোহ। তার ভাষা হবে বাচাল নষ্ট সময়ের ধ্বনি। রামধনুতে সে কেবল দেখতে পাবে অস্ত্রের সংঘাত। স্রষ্টা হওয়া খুব একটা সহজ কিছু নয়।

সৃষ্টির রূপ ও স্বরূপ প্রকাশ করতে গেলে ভাষাকেন্দ্রিক প্রতীকী-শৃঙ্খলায় আবদ্ধ মানুষের মনের জানালার কপাট খুলে দেখতে হবে প্রথমেই। এই সেই মানুষ, যে জাক লাকাঁ কথিত ‘আয়না পর্ব’-র সময় থেকেই বন্দী হয়েছে কতক সামাজিক, জৈবিক আর রাষ্ট্রিয় নিয়মের শৃঙ্খলে। কিন্তু সে মুক্তি চায়, অনিশ্চয়তাবদ্ধ ঠিকানাহীন বৈশ্বিক বস্তুবলয়ে অবস্থান করে সে চায় তার নিজস্ব অহংসত্তাকে নির্দিষ্ট সত্যমাত্রায় প্রকাশ করতে। যে নতুন ভাষায়, নতুন চিন্তায়, নতুন রঙে, নতুন ফর্মে সত্যকে তুলে ধরতে পারে, সেই হয় স্রষ্টা।

কিন্তু মুশকিল হলো, জাগতিক বাচাল ভাষায়, ক্লিশে রঙে, বহুল ব্যবহৃত ফর্মে কিংবা সাধারণ গণিতে অহং-সত্যকে তুলে ধরা সম্ভব নয়। কেবলমাত্র আপেক্ষিক মিথ্যা দিয়েই চরম সত্যকে উপস্থাপন করা সম্ভব। এখানে বলা আবশ্যক যে আপেক্ষিক মিথ্যা কিন্তু মিথ্যা নয়। জাগতিক বাচাল কিংবা অপরিচিত সত্যকে চরম সত্যরূপে প্রকাশ করার জন্যই আপেক্ষিক মিথ্যা ব্যাবহার করা হয়। আপেক্ষিক মিথ্যা কিছু উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। জীবনানন্দ দাশের ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার’, ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’, বিষ্ণু দে’র ‘কাল রজনীতে ঝড় হয়ে গেছে রজনীগন্ধা বনে’, আল মাহমুদের ‘গাঙের ঢেউয়ের মতো বল কন্যা কবুল কবুল’, শামসুর রাহমানের ‘দ্বিধাহীন আমি উড়ে গেলাম সূর্যের ঠোঁটে রক্ষাকবচহীন প্রার্থনার মতো’, নিউটনের MV=MV, আইনেস্টাইনের E=Mc2, দ্যালির আঁকাবাঁকা ঘড়ি, পিকাসোর ত্রিমাত্রিক নারী, এইসব হলো আপেক্ষিক মিথ্যার উদাহরণ। একজন বোদ্ধা সত্তা যখন এই আপেক্ষিক মিথ্যা বোঝে, তখন তা নান্দনিক রস নিয়ে চরম সত্য হয়ে উপস্থিত হয়।

সৃষ্টির সাথে নির্মাণের সম্পর্ক সহজাত। সৃষ্টি করতে হলে ব্যাকরণ জানতে হয়। এই ব্যাকরণই নির্মাণ, আর নির্মাণপর্বের কোনো এক ধাপে সৃষ্টির অবস্থান। ঐতিহ্য আর ব্যাকরণ জানা না থাকলেও নির্মাণের বৃথা চেষ্টা করা যায়, কিন্তু ব্যাকরণ জানা না থাকলে কিছুতেই নির্মাণকে সৃষ্টির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। একজন স্রষ্টা নির্মাণের কৌশল অবলম্বন করে সৃষ্টি করতে পারেন, আবার তার পক্ষে নতুন নির্মাণ কৌশল আবিষ্কার করাও কঠিন কিছু নয়।

আমাদের দেশে নির্মাণের কৌশল না জেনেই অনেকে স্রষ্টা হতে চান, আর তাদের তৈরি ‘বিষয় বা বস্তু’ সৃষ্টি হিশেবে হাততালিও পায় প্রচুর। তাদের পুরস্কৃত করার জন্য ‘বটতলা’ আছে, তাদের গুণগান করার জন্য আছে ‘স্রষ্টা সমিতি’ আর প্রচারের জন্য আছে ‘অন্ধকার কালো’। সৃষ্টির সঠিক মূল্যায়নের জন্য আমাদের প্রয়োজন সৃষ্টির তত্ত্ব জানা ভালো সমালোচক।


কবিতার সৃষ্টি


কবি জীবনানন্দ দাশ একটা চরম সত্য কথা বলেছেন—সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। কবির বক্তব্যটি কেন সঠিক তার একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর বিচারে আমরা সবাই বিভিন্ন প্যারাডাইমের মানুষ আর আমাদের চিন্তাকাঠামোও কাজ করে বিভিন্ন মাত্রায়। হাইডেগারীয় দর্শন গ্রাহ্য করে এই বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ বিশ্ব-বস্তু-পরিবৃত্ত-সত্তায় (Being-in-the-midst-of-the-world) বা পতিত সত্তায় (Dasman) অবস্থান করে। পতিত সত্তায় থাকার অর্থ হলো খাওয়া, ঘুমানো, যৌনকর্ম করা, বংশবিস্তার করা, বাজারে যাওয়া, আড্ডা মারা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকা ইত্যাদির মতো কিছু দৈনন্দিন কাজকর্ম ভিত্তিক জীবন যাপন। আমাদের মাঝে কিছু কিছু মানুষ আছে যারা মৌলিক সত্তা বা Dasein স্তরে অবস্থান করে জীবনের মূল্য ও কর্ম সম্পর্কে সচেতন। তারা এই জাগতিক মিথ্যা বিষয়ীগততার বাইরেও কিছু ভাবেন এবং তারাই হয় স্রষ্টা, কবি বা শিল্পী।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলা আবশ্যক। আমাদের মাঝে কিছু Dasman বা পতিত সত্তার কবিও পাওয়া যাবে। তারা মৌলিক সত্তা বা Dasein-এর অভিনয় করে কারুশিল্পীর মতো কারুকাজ করে কবি স্রষ্টা হতে চান। কারুকাজ বা নির্মাণের বিষয় চিন্তা করে বেশ জোর দিয়েই বলা যায় যে তারা কখনোই চারুকবি বা মৌলিক সত্তার কবি হতে পারবে না। তবে পাঠ পঠন আর চেষ্টার ফলে একজন পতিত সত্তা বা Dasman, মৌলিক সত্তা বা Dasein স্তরে পৌঁছতে পারে।

কবিতা লেখা কোনো অবস্থাতেই ঐশীপ্রাপ্ত কর্ম নয়, আবার কবিতা লেখাকে কারুশিল্পও বলা যাবে না। কবিতার জন্মের সাথে সবসময় জড়িয়ে থাকে একজন মৌলিক সত্তার অধিকারী স্রষ্টা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত। কবির মনের ভেতর যদি প্রকাশের যন্ত্রণা কিংবা বাস্তবতা নিয়ে সংঘাত থাকে, তবে তা কোনো এক নতুন আপেক্ষিক মিথ্যার ভাষাতে কবিতা হবেই।


কবিতার ছন্দ


ছন্দহীন বিশ্বজগতের কথা আমরা চিন্তাও করতে পারি না। আমাদের এই পৃথিবী, মহাবিশ্ব, ভৌত ও জৈব জগৎ এবং কোয়ান্টাম বিশ্বসহ যে কোনো জাগতিক ও মহাজাগতিক বস্তু, বিষয় বা ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে আমরা এক ধরনের যৌক্তিক ছন্দকে খুঁজে পাব। ছন্দ ছাড়া কোনো বিষয় আমাদের জীবন ও প্রকৃতিতে নাই। যে মুহূর্তে জীবন বা প্রকৃতির যৌক্তিক ছন্দ বিঘ্নিত হয়, ঠিক তখনই আমরা পাই পতিত ছন্দের সুনামি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, পাগলামি, ক্যান্সার ইত্যাদির মতো ছন্দহীন অনুষঙ্গ।

মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ে মায়ের হৃৎপিণ্ডের ‘লাব-ডাব’ শব্দ শুনতে শুনতে আমরা পৃথিবীতে আসি। তারপর ছেলেবেলায় শুনতে হয় ‘হাট্টিমা টিম টিম, তারা মাঠে পাড়ে দিম’, ‘ঐ দেখা যায় তালগাছ, ঐ আমাদের গা’, ‘খোকন খোকন করে মা’য়, খোকন গেল কাদের নায়’ ইত্যাদি। আমরা ছন্দপূর্ণ সামাজিক ভাষা বলতে বলতে কাব্যের জগতে প্রবেশ করি এবং এর ফলে একজন কবি বা পাঠক সবসময় মনস্তাত্ত্বিক কারণে ছন্দকে পছন্দ করে। আসলে সব ধরনের গদ্য আর কবিতার মাঝে এক ধরনের অন্তর্নিহিত ছন্দ থাকে। একজন কবি কবিতার চাহিদা মেনে নিয়েই ছন্দে বা গদ্যে কবিতাটি প্রকাশ করতে চান, এবং ঐ সৃষ্টির সময় ভাষার ছন্দকে গ্রাহ্য করেই তিনি কবিতাটি লিখেন।

কোনো কবি যদি ভাষার অন্তর্নিহিত মৌলিক ছন্দকে অস্বীকার করেন এবং ভাবেন যে কবিতায় ছন্দের প্রয়োগ একটা ক্লিশে ব্যাপার, তবে আমি মনে করব যে ঐ কবি আসলে ছন্দ জানেন না। কবিতার প্রয়োজনে যদি গদ্য লেখার প্রয়োজন হয়, তবে মনে রাখতে হবে যে গদ্যের মাঝেও এক ধরনের ছন্দ আছে।

মঈন চৌধুরী

জন্মতারিখ : ২৫ বৈশাখ, ১৩৫৪।

জন্মস্থান : কলকাতা।

পেশা : ভূ-প্রকৌশল উপদেষ্টা, শিক্ষকতা, শিল্পী।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :

এ কেমন ভালোবাসা (১৯৮৮),
ইন্দ্রজালে আপেক্ষিক (১৯৮৯),
জীবন শব্দ রেখা (১৯৯০)।

প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ :

সৃষ্টির সিঁড়ি (১৯৯৭),
বাঙ্গাল জাতীয়তাবাদ (১৯৯৮),
ফুকোর মানব (১৯৯৯),
হ্বিটগেন্সটাইনের দর্শন (২০০০),
ইহা শব্দ (২০০৪),
অল্প স্বল্প হলুদ গল্প (২০০৬),
শব্দের সম্ভাবনা (২০০৭),
বাংলা বানান সংস্কার (২০০৮),
ভাষা, মনস্তত্ত্ব ও বাঙ্গাল/ বাঙালি সংস্কৃতি (২০০৯).
প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১২)।

সম্পাদনা :

সম্পাদক, প্রান্ত—সাহিত্য ও দর্শন বিষয়ক ছোট কাগজ (১৯৮৮–১৯৯৮)।

ই-মেইল : mayeen.chowdhury@gmail.com