হোম গদ্য চিন্তার জার্নাল : দ্বিতীয় কিস্তি

চিন্তার জার্নাল : দ্বিতীয় কিস্তি

চিন্তার জার্নাল : দ্বিতীয় কিস্তি
591
0

আমার পরী, রাজপুত্র তোমার


আনেকদিন আগে ফেসবুকে আমার ১৯/২০ বছর বয়সে লেখা একটি কবিতা পোস্ট করেছিলাম। কবিতাটির শিরোনাম ছিল—‘এ কেমন ভালোবাসা?’ প্রমা নামের একটি মেয়ের উল্লেখ ছিল কবিতার শেষ স্তবকে। শেষ স্তবকটি ছিল :

‘প্রমা, তুমি কেমন ভালোবাস?

অন্তরে বাস ফুলের সুবাস প্রকাশ করো নি তো
জীবন আকার তুলি ধরে রং রেখেছ অন্ধকারে
মনের ময়ূর বন্ধ ঘরে ছন্দ তুলো নি তো।

প্রমা, তুমি কেমন ভালোবাস?’

কবিতাটি পড়ে আমার এক ফেবু বন্ধু, মিতা, আমাকে প্রশ্ন করেছিল—‘প্রমা এখন কই?’ প্রশ্নটি যৌক্তিক ছিল, আর আমিও আমার মনস্তাত্ত্বিক যুক্তি নিয়ে উত্তর দিয়েছিলাম—‘প্রমা এখন আমার মনে।’ তবে প্রমার পর লাবণ্য, নন্দিনী, বনলতা, সুরঞ্জনা, নীরা, ডেসডিমোনা নামের আরও অনেকেই আমার মনে এসেছে। এমন ঘটনা কেন ঘটে, তার একটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা—‘পরী ও রাজপুত্র প্রকল্প’ শিরোনামে আমার প্রবন্ধ সমগ্রে দিয়েছি। পুরো প্রবন্ধ এখানে তুলে দেওয়া যাবে না, তাই আমি আমার মনস্তত্ত্বের কিছু ব্যাখ্যা পাঠক-পাঠিকার কাছে তুলে ধরতে চাই। আমার মনে হয় আমার মনের সাথে সব পাঠক-পাঠিকার মনও একই তত্ত্ব মেনে চলে।


আমার মা ছিলেন আমার প্রথম প্রেমিকা


আমার জন্মের পর আমার কোনো প্রমা, লাবণ্য, নন্দিনী, বনলতা কিংবা অন্য কেউ ছিল না। তবে আমার মা ছিলেন আমার প্রথম প্রেমিকা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। মায়ের শরীরের গন্ধ ও ওম, স্তনের স্পর্শ আর ঠোটের চুমু আমাকে আমার বৈপরীত্য সম্পর্কে হয়তো কিছু জানিয়েছিল আর আমিও আমার মা-প্রেমিকাকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকার প্রেরণা পেয়েছিলাম। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার জগৎ ও জীবন নতুন নতুন অর্থ নিয়ে আমার কাছে উপস্থিত হচ্ছিল আর আমিও নতুন নতুন দ্যোতনা সৃষ্টি করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। একসময় আমার মা আমাকে পরীর গল্প শোনালেন, আমি জানতে পারলাম লালপরী, নীলপরী, ঘুমপরী ও অন্যান্য আরও অনেক পরীর কথা, আমার মাঝে তৈরি হলো পরী-বাস্তবতার এক ফ্যান্টাসি জগৎ। পরীদের সাথে সাথে আমার কাছে এল মধুমালা, চম্পাবতী, আরো অনেক রাজকন্যা এবং আরও অনেক নারী চরিত্র। আমার বয়স যখন সাত কী আট, তখনই আমার ইচ্ছে হতো পরীর রাজ্যে যাবার, ইচ্ছে হতো মদনকুমার হয়ে মধুমালার ঘুম ভাঙানোর এবং এমন আরও অনেক কিছু। আমি আমার পাঠকদের বলতে চাই, আমার এ চাওয়ার প্রেক্ষাপটে কোনো যৌন আবেগ ছিল না, হয়তো আমি ভাবতাম এরা সবাই আমার মা-পরীর প্রতিচ্ছবি।

বয়স বাড়তে লাগল, আর আমার জীবনে এল লাবণ্য, বনলতা, নন্দিনী, সুরঞ্জনার মতো আরও অনেকেই। রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা পড়ে আমার শিলং যাওয়ার ইচ্ছে হতো লাবণ্যের খোঁজে, নিজেকে ভাবতাম আমি অমিত। জীবনানন্দের বনলতা সেন পড়ার পর নাটোরের বনলতা আমাকে এতটাই মোহিত করেছিল যে এইচ এস সি পরীক্ষা দিয়ে একবার নাটোর চলে গেলাম ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’-এর খোঁজে। আমি বাবা মা’র একমাত্র ছেলে হিশেবে সুখী ছিলাম, কিন্তু তারপরেও মনে হচ্ছিল পাখির নীড়ের মতো চোখ দেখলেই জীবন সার্থক হয়ে যাবে। নাটোর গিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত বিভিন্ন মার্কেটে, কলেজের সামনে, রাস্তায় শুধু মাত্র ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’ খুজেছিলাম, কিন্তু দেখলাম সব চোখই সাধারণ মানুষের মতো, বনলতা সেন এর মতো নয়। আমার এই চোখ দেখার ইচ্ছেতে কোনো রকম যৌনতা ছিল না, ছিল এক দুর্বার মানসিক সুখ এবং আমি আমার এই কর্মকাণ্ডকে পাগলামি বলতেও রাজি নই।

আমার জীবনে প্রথম প্রেমিকা হয়তো ছিলেন আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়া, যিনি ছিলেন আমার থেকে ১২ বছরের বড়। আমাদের সম্পর্কটা ছিল কামহীন প্লাতোনিক ভালোবাসার। আমি মহিলাকে আপা বলে ডাকতাম, তার সাথে প্রতিদিন কথা না বললে আমার চলত না, তার জবাকুসুম লাগানো চুলের গন্ধ পেলে মনে হতো কোনো এক ঐশ্বরিক সুগন্ধ আমার নিশ্বাসের সাথে আমার গহিনে মিশে যাচ্ছে। আপাও ভালোবাসতেন আমাকে খুব, তিনিও চাইতেন যে প্রতিদিন আমি তার সাথে দেখা করি। আপা এম এ পাস করার পর একটা কলেজে বাংলার প্রভাষক ছিলেন। আমি তার কাছ থেকে বৈষ্ণব পদাবলি ও চর্যার বিভিন্ন পদের বিশ্লেষণ শুনতাম, ভালো লাগত খুব। একদিন হঠাৎ আপার স্বামী, আমার দুলাভাই, এক দুর্ঘটনায় মারা যান। আপা চাকরি ছেড়ে চলে যান চাঁদপুরে বাবার বাড়িতে। অল্প কিছুদিন পর তার ছয় বছর বয়সের ছোট্ট ছেলে পুকুরে ডুবে মারা গেলে আপা পাগল হয়ে যান স্বামী ও পুত্রশোকে। খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমি চাঁদপুরে যাই। কিন্তু হায়, আমার ভালোবাসার আপা আমাকে চিনতেও পারে নি, এক দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে শুধু আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। আমি এমন কষ্ট পেলাম যার কোনো তুলনা নেই। এমন কষ্ট আমি আমার জীবনে আর পেয়েছি কিনা সন্দেহ।


মাঝে মধ্যে এই পরী-বাস্তবতার রূপ ও স্বরূপ বদলে যায়, তাদের অস্তিত্বের নাম বদল হয়।


তারপর বয়স বাড়ল, কিন্তু আমার অন্তর থেকে ‘পরী-বাস্তবতা’ দূর করা গেল না। আমি বিভিন্ন শিরোনামে পরীদের নিয়ে কবিতা লিখতে থাকলাম। একটা কবিতা তুলে দিচ্ছি :

পরী

১.0
এখন সে তো জলের পরী
চুল রেখেছে মেঘে
শুভ্র ফেনায় ভাবছেটা কী
বলতে পারে কে!
সবকিছু তো অন্ধকারে,
শব্দে বলা যায়
জলের রানী মেঘ জড়িয়ে
আছে তপস্যায়।

আমি এখন সময় শুধু
বলতে পারো—ঘড়ি,
মেঘগুলো সব ভাসছে জলে
স্বপ্নে দেখি পরী।

২.0
চিত্রগুলো পরীই বটে, স্বপ্নে আসার পরে
লালপরী আর নীলপরীরা মদন তুলে নেয়,
মধুমালার সঙ্গে তো হয় রূপকথাতে দেখা
পরীরা সব মুচকি হেসে অর্থ তুলে দেয়।

তারপরে তো ছলাৎ ছলাৎ জলের কোলাহল
জলকে দেখি জলে থেকেই, জলের ভালোবাসা
চিত্ত পরী নৃত্য করে আয়না ঘরে এসে
শব্দ হলে বুঝতে পারি সময় সর্বনাশা।

৩.0
ঐ পরীদের নিয়ে এখন কাব্য করা যায়
আরশি ঘরের পড়শি ওরা নিঝুম তপস্যায়।

আমার কবিতায় শুধুমাত্র পরীরা আনাগোনা করে, তা কিন্তু ঠিক নয়। অনেকসময় পরীদের সখি প্রমা, মালতি, মিতা, লাবণ্য, বেহুলা ও আরও অনেকে মুচকি হেসে উপস্থিত হয় আমার কাব্য ভাবনায় ও কবিতায়। আমি বুঝি এই সব চরিত্র আমার সত্তার অংশ হয়ে আমার ‘আমি’-তে মিশে গেছে। মাঝে মধ্যে এই পরী-বাস্তবতার রূপ ও স্বরূপ বদলে যায়, তাদের অস্তিত্বের নাম বদল হয়। তারা হয়ে যায় সুচিত্রা সেন যিনি হয়তোবা আমার বাবার পরীও ছিলেন, হয়ে যায় প্রিয়াঙ্কা চোপড়া যে আমার ছেলের পরীও হতে পারে। এমনও হয়, আমি হরণ করি রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুনীল, হুমায়ূন আহমেদ, আল মাহমুদের এবং আরও অনেকের মনস্তাত্ত্বিক পরীদের। মাঝে মাঝে পরীদের এই বিবর্তন দেখে আমি অবাক হই, ভাবি এ কেমন অস্তিত্ব, ধরা যায় না ছোঁয়া যায় না, অথচ আমার মাঝেই আছে?


আসলে বাস্তবে এলে পরীদের পরী-সত্তা হারিয়ে যায়


ব্যাপারটি নিয়ে আমি আমার স্ত্রীর সাথেও আলাপ করেছি। সে আমাকে প্রশ্ন করেছে—‘আমি কি পরী?’ আমি আমার স্ত্রীকে যেহেতু বন্ধু মনে করি, তাই তাকে মিথ্যে বলি নি। আমি তাকে বলেছি—’তুমি একদিন পরী ছিলে, এখন আর পরী নও, বউ হয়ে গেছ।’ আমার স্ত্রী হেসে আবারো প্রশ্ন করেছিল—‘তোমার বন্ধুর বউ আর এফ বি বন্ধুরা কি পরী?’ অনেক দ্বিধা আর দ্বন্দ্বের পর আমার উত্তর ছিল—‘ঠিক ধরেছ, তাদের মাঝে কেউ কেউ অবশ্যই পরী, তাদের অবস্থান তো কল্পনায়, ধরে ছুঁয়ে তো আর দেখতে পারি নি।’ আমার স্ত্রী যথেষ্ট আধুনিক, সে কিছুটা চিন্তা করে বলল—‘আসলে বাস্তবে এলে পরীদের পরী-সত্তা হারিয়ে যায়, পরীরা তাদের পরীত্ব হারিয়ে ফেলে’ এবং এ কথা বলে সে একটা গান গাইল। গানের প্রথম কলিটা ছিল :

‘নিশীথে যাইও ফুল বনে রে ভোমরা, নিশীথে যাইও  ফুল বনে’

একজন পুরুষ হিশেবে নিজেকে ‘ভ্রমর’ ভাবতে ভালোই লাগে, শত সহস্র ফুলের মাঝে পরী অস্তিত্বকে খোঁজার মজাই আলাদা। আমি এ কথাও ভাবি যে একজন পুরুষের মনে বিমূর্ত আভায় সবসময় এক নারী বা পরী অস্তিত্ব অবস্থান করে আর এ কারণেই আমার যে কোনো বাস্তব কিংবা বিমূর্ত প্রকাশের প্রেক্ষাপটে থাকে পরী বা নারী বিষয়ক মনস্তাত্ত্বিক ভাষা কাঠামো। পুরুষের জগতে যেহেতু নারী মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসনের শিকার, সেহেতু সামাজিক পুরুষও পুরুষতন্ত্রের ধ্বজা উড়িয়ে নারীকে করে রাখে তার নিজস্ব সম্পদ।

নিজেকে পরী-বাস্তবতার ‘ভোমরা’ ভেবে আমার স্ত্রীকে প্রশ্ন করেছি—‘আমার তো পরী-বাস্তবতা আছে, তোমার কী আছে?’ আমার কথা শুনে তার উত্তর ছিল—‘আমার আছে একজন রাজপুত্র, যে সব দৈত্য দানব মেরে আমাকে উদ্ধার করবে।’ আমার স্ত্রীর কথা শুনে মনে পড়ে গেল অনেকদিন আগের একটা ঘটনা। আমার বিয়ের মাত্র এক মাস পরে একদিন রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে শুনতে আমার স্ত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করল—‘বেঁচে থাকলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স এখন কত হতো?’ উত্তর দিলাম—‘তা একশত তিরিশ বছর তো হতোই।’ আমার স্ত্রীর উত্তর ছিল—‘যদি উনি বেঁচে থাকতেন তবে তাকে দুদিনের জন্য হলেও বিয়ে করতাম, প্রয়োজন হলে ঠাকুরের হাতে পায়ে ধরতাম।’ আমি অবাক হলাম, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে মাস্তানি করে টিকে থাকতে পারব না বিধায় উত্তর দিলাম—‘তিনি বেঁচে থাকলে আমি নিজেই তোমাকে তার কছে দিয়ে আসতাম।’ আসলে আমার স্ত্রীর মনের গহিনে রবীন্দ্রনাথ একজন রাজপুত্র হিশেবেই অবস্থান করছে, এ সত্য আমি বুঝেছিলাম।

কয়েক বছর ধরে হুয়ায়ূন আহমেদ আর শাওন প্রসঙ্গে অনেক উলটাপালটা কথা শুনতে হচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদ আমার বন্ধু ছিল এবং আমি খুব ভালো করেই জানি যে তার চরিত্রদোষ ছিল না। আসল সত্য হলো, মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণের বলী হয়েছিল হুয়ায়ূন ও শাওন। শাওন হুয়ায়ূনের মাঝে দেখতে পেয়েছিল এক ‘রাজপুত্র’-কে আর হুমায়ূন শাওনের মাঝে নতুন করে খুঁজে পেয়েছিল তার হারিয়ে যাওয়া ‘পরী’-কে। এই পরী ও রাজপুত্রের মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণ এতটাই প্রবল ছিল যে তারা সমাজের প্রচলিত আইনকে অগ্রাহ্য করতে পেরেছিল। আমরা সমাজের লোকজন তাদের সমালোচনা করতে পারি, দোষ ধরতে পারি, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাব তাদের কোনো দোষ নেই।

একটি মেয়ে তার জন্মের পর মা-পরীকে বন্ধু-পরী হিশেবে গ্রাহ্য করে। পরে মধুমালা, চম্পাবতী, লাবণ্য, বনলতা এবং আরও অনেকেই সখির চরিত্র নিয়ে উপস্থিত হয়। অনেক সময় মেয়েরা নিজেকে উল্লেখিত সখি চরিত্রগুলোর মাঝে নিজেকে প্রতিস্থাপন করে এক ফ্যান্টাসির জগৎ সৃষ্টি করে। নারী বা মেয়েদের প্রথম রাজপুত্র হয় তার বাবা। বাবার সাথে সাথে পরিবারের অন্যান্য সদস্য, যেমন ভাই, মামা, চাচা, ফুপা এবং আরও অনেকে রাজপুত্রের আদল নিয়ে নারীর মনে অবস্থান নিতে পারে। এই রাজপুত্রের বিবর্তন চলতেই থাকে, কোনো এক সময় রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, অমিত, হিমু, শুভ্র, আমির খান, শাহরুখ খান কিংবা অন্য যে কেউ নারী-মনে রাজপুত্র হিশেবে উপস্থিত হয়।


বেহেশতে গেলেও হুর আর পরীদের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।


এখানে উল্লেখ্য যে একজন পরী আর রাজপুত্রের সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়ায় ‘ভালোবাসা’ মুখ্য ভুমিকা পালন করে। শুধুমাত্র ঐশ্বরিক ভালোবাসার আকর্ষণে একজন পুরুষ কোনো এক নারীর মাঝে খুঁজে পেতে পারে তার কল্পনার পরী বা রাজকন্যাকে। ঠিক একই ভাবে ভালোবাসার চুম্বক বন্ধনে একজন নারী তার মনের মানুষকে স্থাপন করে রাজপুত্রের সিংহাসনে।

মানুষের যে সামাজিক ধর্ম আছে, সেখানেও বিভিন্ন নারী চরিত্র এসেছে পরী বা রাজকন্যা হিশেবে। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান পরী/রাজকন্যা কিংবা দেবী হিশেবে আমরা পাই ডায়ানা, ভেনাস, আফ্রদিতি, মিনার্ভা, এথেনার মতো অনেক চরিত্রকে, আবার রাজপুত্র হিশেবে পাই এপোলো, জিউস, হার্মেস, জুনো, হেদেস ও মার্সের মতো আরও অনেক দেবতাকে। বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মে রাজকন্যা বা পরী হিশেবে এসেছে অনেক দেবী। দেবী প্রজ্ঞাপারমিতা, তারা, যক্ষিণী, কুষ্মাণ্ডিনী, অম্বিকা, পর্ণশর্বরী, বর্তালী, বদালী, বরালী, বসুধারা, বজ্রসরস্বতী, মহাপ্রতিশরা, মহাময়ূরী, মহেশ্বরী, ইন্দ্রাণী, দুর্গা, কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী সহ অনেক নারী বা প্রকৃতির স্বরূপ সামাজিকভাবে পূজিত হয়ে আসছে। রাজপুত্র বা দেবতা হিশেবে এসেছে ইন্দ্র, বরুণ, যম, কুবের, শিব, কৃষ্ণ, বিষ্ণু এবং আরও অনেক চরিত্র। মুসলমানদের কোনো দেবতা বা দেবী নেই। তবে আলী, আমির হামজা, সোহরাব, রুস্তম ইত্যাদি নামের রাজপুত্রদের অবস্থান ইসলাম ধর্মে আছে। আরব্য রজনীর রাত আর হারেমকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের মনে জাগ্রত থাকে অসংখ্য পরী। বেহেশতে গেলেও হুর আর পরীদের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।

পরী ও রাজপুত্র নিয়ে এতক্ষণ আমরা যা ভাবলাম, তা হতে পারে মানুষের মনস্তত্ত্বকেন্দ্রিক একটি প্রকল্প। আমাদের মনে পরী ও রাজপুত্রের যে অবস্থান আছে, তার সাথে ফ্রয়েড, লাকাঁ, ইয়ুং প্রমুখের মনস্তত্ত্ব যোগ করে আমরা হয়তোবা পেতে পারি মনোবিশ্লেষণের এক নতুন পদ্ধতি।

মঈন চৌধুরী

জন্মতারিখ : ২৫ বৈশাখ, ১৩৫৪।

জন্মস্থান : কলকাতা।

পেশা : ভূ-প্রকৌশল উপদেষ্টা, শিক্ষকতা, শিল্পী।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :

এ কেমন ভালোবাসা (১৯৮৮),
ইন্দ্রজালে আপেক্ষিক (১৯৮৯),
জীবন শব্দ রেখা (১৯৯০)।

প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ :

সৃষ্টির সিঁড়ি (১৯৯৭),
বাঙ্গাল জাতীয়তাবাদ (১৯৯৮),
ফুকোর মানব (১৯৯৯),
হ্বিটগেন্সটাইনের দর্শন (২০০০),
ইহা শব্দ (২০০৪),
অল্প স্বল্প হলুদ গল্প (২০০৬),
শব্দের সম্ভাবনা (২০০৭),
বাংলা বানান সংস্কার (২০০৮),
ভাষা, মনস্তত্ত্ব ও বাঙ্গাল/ বাঙালি সংস্কৃতি (২০০৯).
প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১২)।

সম্পাদনা :

সম্পাদক, প্রান্ত—সাহিত্য ও দর্শন বিষয়ক ছোট কাগজ (১৯৮৮–১৯৯৮)।

ই-মেইল : mayeen.chowdhury@gmail.com