হোম গদ্য গুঁড়োদুধ, হাওয়াই চপ্পল ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান

গুঁড়োদুধ, হাওয়াই চপ্পল ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান

গুঁড়োদুধ, হাওয়াই চপ্পল ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান
618
0

সময়টা হবে ১৯৯৮-৯৯; রূপসা হাওয়াই চপ্পল পরে আমরা স্কুলে যেতাম। স্কুলে যাওয়ার সময় প্রায়ই বৃষ্টি পড়ত। বৃষ্টি পড়লে নাকি সকলেই ভিজে যায়, এমন কথা আমরা ভাবতাম। পরে শুনেছিলাম আহমদ ছফাও একই কথা বলেছিলেন। যাই হোক, বৃষ্টির দিনে হাওয়াই চপ্পলের আর্ট করার অদ্ভুত এক ক্ষমতা আছে। প্যান্ট, কখনো-বা পিঠ জুড়ে গ্রাফিতি ছড়িয়ে পড়ত। সেভাবেই হয়তো আমাদের চিত্রকলা বিষয়ক ধারণা জন্ম নেয়। এমন চিত্রকলা পরে রাস্তার মোড়ে মোড়ে অনেক দেখেছি। পৃথিবী জুড়ে গ্রাফিতির ধারণা সম্ভবত হাওয়াই চপ্পল থেকে আগত। চিত্রকলা যদিও আমার বিষয় না। কোনোকালেই ছিল না। তবে গ্রাফিতি আমার ভালো লাগে। অনেক পরে বাঙ্কসিকে দেখে আমার হাওয়াই চপ্পলের কথা মনে পড়ত। এটুকু লেখার পর প্রশ্ন জাগছে, আমি আসলে কী নিয়ে লিখছি? নির্দিষ্ট কোনো বিষয় ঠিক করে লিখতে বসি নি। তবুও বিচ্ছিন্ন কিছু কথাকে এখানে জোড়া দিয়ে একটা গ্রাফিতি তৈরির চেষ্টা থাকবে।

২.
আসলেই কী নিয়ে লেখা যেতে পারে? নাসিরনগর—যেখানে হিন্দু বলে একটা গ্রামকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়েছে নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্প, যাকে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলোর একটি বলে ভাবা হচ্ছে অথবা সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপাল নির্মাণ নিয়ে বা সাঁওতালদের ওপর ঘটে যাওয়া নিপীড়ন-নির্যাতন, সর্বশেষ আছে মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান হত্যাযজ্ঞ নিয়ে—এত এত বিষয় আপনার আমার সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে লিখতে গিয়ে দেখি মাথায় প্যাঁচ লেগে যাচ্ছে। এর বাইরে অবশ্য চিত্রকলা-সিনেমা-গান এবং স্পোর্টস তো আছেই। এসব নিয়েও লিখতে ভালো লাগছে না। তারচেয়ে বরং নিজেকে নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে। তার আগে চলুন একটা গল্প শুনি। গুঁড়োদুধ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক গল্প। রাষ্ট্রবিজ্ঞান দেখে সিরিয়াস হবেন না। এটি একটি ফাঁদ। গল্পটা শুনলেই বুঝতে পারবেন।


সারা জীবন রাষ্ট্র এবং সমাজ পড়িয়েও তিনি রাষ্ট্র মানে বুঝতে পারেন নি।


তার নাম ছিল নওশাদ। পুরোনাম নওশেদুল ইসলাম। আমরা ক্লাস ওয়ান থেকে টেন পর্যন্ত একসাথেই পড়েছি। তার বাবা ছিল না, ছিল সৎ মা। সৎ মায়ের সাথে তার সম্পর্ক এভারেজের চেয়ে ভালো ছিল। সে প্রতিদিন স্কুলে আসার সময় পকেটে করে কিছু না কিছু নিয়ে আসত। যেমন কোরবানির ঈদের পর সে বড় বড় ভাজা মাংস পকেটে করে নিয়ে আসত, যেহেতু তার ব্যাগ নিয়ে আসার সামর্থ্য ছিল না, তাই পকেটই ছিল সম্বল। তেমনই একদিন সে পকেটে করে এক পোটলা গুঁড়োদুধ নিয়ে আসল। টিফিনের পর ‘পরিবেশ পরিচিতি সমাজ’ ক্লাসে বসে আমরা সেই গুঁড়োদুধ চাটছিলাম। তখন মাস্টারমশাই আমাদের রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছিলেন। একসময় টের পেয়ে তিনি আমাদের হাতে-নাতে ধরে ফেললেন। এরপর যা হলো, তাতে আমরা বুঝলাম রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক হিশেবে বড় কোনো দায়িত্ব পালনে আমরা নিশ্চয় ব্যর্থ। সে ঘটনার পর রাষ্ট্র বললে এখনো আমার মনে আসে গুঁড়োদুধ, ডোরাকাটা বেত, নীল ডাউন এবং পিঠ ভর্তি অসংখ্য গ্রাফিতি। বুঝলাম রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এভাবেই তৈরি করতে হয়। এরপর থেকে রাষ্ট্র বললেই শরীর ভয়ে হিম হয়ে যেত। এর বেশি আমি আর কিছু ভাবতে শিখি নি, এটা আমার ব্যর্থতা নাকি স্যারের যোগ্যতা সে উত্তর আজও মেলে নি। কিছুদিন আগে অর্থাভাবে ক্যান্সারে স্যার মারা গেছেন। আমার ধারণা সারা জীবন রাষ্ট্র এবং সমাজ পড়িয়েও তিনি রাষ্ট্র মানে বুঝতে পারেন নি। এ আবার আরেক ট্র্যাজেডি।

৩.
আমরা আরেকটু বড় হয়ে হাই স্কুলে পৌঁছে গেলাম। আমার সাথে যথারীতি সঙ্গী নওশাদ। সেখানে আমাদের পরিচয় হয় তৈমুর লংয়ের সাথে। শ্যামবর্ণের তৈমুরকে আমরা ডাকতাম রোনালদো বলে। তখন ব্রাজিলিয়ান ফেনোমেননের যুগ। আটানব্বই-এর বিশ্বকাপ হারলেও তিনি তখন সুপারস্টার বনে গেছেন। সেসব ভিন্ন কথা। তৈমুরকে রোনালদো বলার কারণ ছিল বছরের প্রায় অর্ধেকের বেশি সময় তার মাথা কামানো থাকত। জিজ্ঞেস করলে বলত মাথা গরম থাকে তাই কামিয়ে রাখি। এরপর একসময় রোনালদো স্কুলে আসা বন্ধ করে দিল। আমি আর নওশাদ তখন শার্লক হোমস পড়ে একটু একটু ডিটেকটিভ হওয়ার চেষ্টা নিতেছিলাম। দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম রোনালদোর কাহিনি বের করতে হবে। একদিন দুজন মিলে টেকপাড়া (যেখানে সে থাকত) গিয়ে জানলাম রোনালদোর বাবা প্রাগৈতিহাসিক কালে বাণিজ্য করতে গিয়ে আর ফিরে আসেন নি। তার দুই কি তিন বছর পর রোনালদোর জন্ম। তার জন্মের পরপর তার মা গলায় দড়ি দেয়। এরপর রোনালদো কিভাবে বড় হয়েছে তা কেউই বলতে পারে না। একসময় সবাই আবিষ্কার করল সে তালগাছে বাসা বেঁধেছে। সেখানে সে প্যাঁচার সাথে কথা বলত নিয়মিত। তখন থেকেই সে মাথা কামিয়ে রাখত নিয়মিত। কারণ তার মাথা গরম থাকত। পরে বুঝতে পেরেছি বিজ্ঞাপনের ভাষায় তাকে সবাই পাগল বলে চিহ্নিত করেছিল। যদিও সে আমাদের গোপনে জানিয়েছিল, ‘পৃথিবীতে মৃতদের একাদশতম ভাষায় সে তার আলাপ সারে।’


মোরালিটি হলো আরেকটা ফাঁদ। সেখানে বাঘ থাকে। আর থাকে হিরণ্ময় অন্ধকার।


৪.
তিনি বললেন, কবিদের মোরালিটি থাকতে হবে।

আমি বললাম, মোরালিটি হলো আরেকটা ফাঁদ। সেখানে বাঘ থাকে। আর থাকে হিরণ্ময় অন্ধকার। আমি তাই মোরালিটির সাথে নেই।

‘Don’t leave home without it’ এটি ছিল ১৯৭৫ সালে আমেরিকান এক্সপ্রেসের একটি বিজ্ঞাপন। ১৯৬৯ সালে কোকাকোলার বিজ্ঞাপনের ট্যাগ লাইন ছিল ‘It’s the real thing’. এসব বিজ্ঞাপন দেখতে আমার ভালো লাগে। বিশেষ করে পুরোনো বিজ্ঞাপন। ইউটিউবে দেশি-বিদেশি পুরোনো বিজ্ঞাপন দেখতে পারেন আপনিও। বিশেষ করে কোকাকোলার বিজ্ঞাপনে আপনি নস্টালজিক হবেন। বিজ্ঞাপনের কোনো মোরালিটি নাই। তাই বিজ্ঞাপন আমার ভালো লাগে।

গল্প অনেক হয়েছে এবার একটা স্বপ্নের কথা বলি। বলেই শেষ করব। সেদিন দেখলাম, একটা যুদ্ধের ময়দান। সৈন্যসামন্ত দেখে বুঝলাম লড়াইটা পাণ্ডব বনাম কৌরবের। আমিও যাচ্ছি যুদ্ধে যোগ দিতে। হঠাৎ দেখি কৃষ্ণরূপে বলিউডের নির্মাতা অনুরাগ কাশ্যপ সাথে আছেন নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী। তারাও আমার সাথে চলেছেন। যুদ্ধের বেশি আর দেরি নেই। আমি ঘামছি আর হাঁটছি। আর বেশি সময় নেই হাতে। মোটা হওয়ার কারণে অনুরাগ কিছুটা পিছনে পড়ে গেছে। আমি রীতিমতো দৌড়াচ্ছি…

হাসনাত শোয়েব

জন্ম ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৮। স্নাতকোত্তর (দর্শন), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
সূর্যাস্তগামী মাছ [কবিতা, ২০১৫, মেঘনাদ প্রকাশনী]

ই-মেইল : soyeb69@yahoo.com