হোম গদ্য গহনযাত্রা : কিছু কি এড়িয়ে গেল

গহনযাত্রা : কিছু কি এড়িয়ে গেল

গহনযাত্রা : কিছু কি এড়িয়ে গেল
230
0

ফ্যাক্ট ও ফিকশন—এ দুয়ের মুখোমুখি হলে আমরা ন্যারেটিভের মধ্যে দাবি করি দুটি জিনিশের—নাট্যগুণ অথবা কাব্যগুণ। নাট্যগুণ বলতে সহজভাবে কাহিনি, চরিত্র ও চিন্তার দ্বান্দ্বিক মুহূর্তগুলির উজ্জ্বল উদ্ভাসনকে বোঝাতে চাইছি। আর কাব্যগুণ বলতে সংক্ষেপে বুননশিল্প। আরও অল্পকথায় অভিব্যক্তি।

রুবাইয়াৎ আহমেদের গহনযাত্রা আখ্যানে নাট্যগুণ প্রায় অনুপস্থিত। কাব্যগুণই এর প্রধান আশ্রয়। ভাষা দিয়ে তিনি শ্রোতা-পাঠকের মনকে আচ্ছন্ন করতে চেয়েছেন এবং পেরেছেনও। তার বয়ানকৌশল সেলিম আল দীনের স্মারকচিহ্ন সর্বত্র মুছে ফেলতে পারে নি, হয়তো চায়ও নি। বরং অনুমান করা যেতে পারে, বিশেষ একটি ধারাকে প্রতিষ্ঠিতই করতে চেয়েছেন তিনি।

সেই ধারার চুল-চেরা বিশ্লেষণের দিকে আমরা যাব না। আমাদের অভিনিবেশ অন্যত্র। আখ্যান ও আঙ্গিকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত যে চিন্তাস্রােত, লেখকের যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি—সে প্রসঙ্গে একটি তর্ক তুলতে চাই।


ক্ষয়িষ্ণু এক দর্শনের অনুগামী তাদের গোত্র। হাজার বছরের পরম্পরায় তারা আঁকড়ে আছে সেই নির্বিরোধী সংস্কৃতি। এই তাদের অপরাধ। 


প্রথমেই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, যে গল্পকথা উপস্থাপিত হলো, তা কোন দেশের, কোন ভূখণ্ডের? বাংলার পাঠক যদি তাকে বঙ্গভূমি ভাবতে যান, তাহলে কিন্তু ঠকতে হবে। তখন সালমা নামের মেয়েটির ধর্মসংস্কৃতি ঠাওর করতেই আপনি দিশাহারা হয়ে পড়বেন। আপনার মন চাইবে তাকে মুসলিম বালিকারূপে দেখতে, কিন্তু তার প্যাগানিজম আপনাকে ঠেলে নিয়ে যাবে অচেনা এথনিসিটির দিকে।

এমন একটা চরিত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব কেবল আরব-ভূখণ্ডে। ভাবা যেতে পারে, এই ঘটনা ঘটছে হয়তো ইরাকে, সিরিয়া বা লেবাননে। ‘ক্ষয়িষ্ণু এক দর্শনের অনুগামী তাদের গোত্র। হাজার বছরের পরম্পরায় তারা আঁকড়ে আছে সেই নির্বিরোধী সংস্কৃতি। এই তাদের অপরাধ। অথচ অন্যকোনো জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তারা কখনো তোলে নি হন্তারকের খড়গ। তবু কালে কালে তাদের ওপরে নেমে এসেছে নিদারুণ পীড়ন, শিকার হয়েছে নৃশংস গণহত্যার।’

নাট্যকারের বয়ানে সংখ্যালঘুত্বের প্রতি সুপরিস্ফুট মমত্ববোধের পরিচয় মেলে। কিন্তু এই মমত্ববোধের উৎস যদি হয় ‘নির্বিরোধী সংস্কৃতি’, তবে তাতে কিছু গোলমাল বা সন্দেহ উপস্থিত হতে বাধ্য। সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় কোনো বিশেষ গোত্রকে ইতিহাসের নিরিখে ‘নির্বিরোধী’ বলার অবকাশ কোথায়? নিষ্ঠুর শোনা গেলেও বলতে হয়, গোত্রকলহসহ নানা বাদ-বিসম্বাদের মধ্য দিয়ে রণরক্ত-সফলতাই পৃথিবীর মানুষের সম্মুখযাত্রাকে উত্তরঙ্গ রেখেছে। যাদের আজ নিতান্ত নিরীহ বলে মনে হয়, কালের কার্বনপৃষ্ঠায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব তার পরাজয়ের খতিয়ান। সে হোক দূর-তাহিতির কোনো গল্পগাথা।

ফলে একটি কোমল মনের সরলীকৃত চিন্তার আবছায়ায় আখ্যানটি হয়ে উঠেছে স্বপ্নমেদুর। আর সেই স্বপনপারের ভগ্নদূত যেন পম। সালমার মনে সে দুলিয়ে দেয় অচিনপুরের মায়াবী পর্দা—

এমন সহজ যাপন হল
এই জগতের রীতি
অভেদ প্রেমেই ধর্ম মানে
শাসক হল জ্ঞাতি
শাস্তি-বিচার প্রয়োজনহীন
নাই তো হিসাব-নিকাশ
খবরদারির দণ্ড-কিতাব
তাই পায়নি প্রকাশ

সালমার গহনযাত্রা বা মৃত্যুযাত্রায় পমের এই উচ্চারণ আমাদের সত্তার গভীরে বেজে ওঠে সান্ত্বনার চেয়ে ম্রিয়মাণ আকাঙ্ক্ষার সুরে। সুরের রেখার প্রান্তে যে ঘুমের দেশ, সেইখানে যে প্রগাঢ় প্রাচীন পাহাড়, তার গুহায় মিলবে এক অমূল্য গুপ্তধন—এমন অলক্ষ্য ইশারায় কিছুদূর অগ্রসর হতেই যখন শুরু হয় জাগরণের পালা, আমরা বেদনায় মুষড়ে গিয়ে হয়তো বলে উঠি ‘ইউটোপিয়া’। সেই ইউটোপিয়ার উল্টো পিঠে আমাদের আজকের বাস্তবতা—মৃত্যুবিভীষিকাময়। কিন্তু কেন? কেন এই রক্ত-রঞ্জিত মেঘে-ঢাকা দিগন্তজুড়ে নামল কালসন্ধ্যার অপচ্ছায়া? পম-সালমার অনুচ্চ-বচনেই তার হদিস মেলে :

: তারা সৃষ্টি করতে চায় এমন এক ভূগোল যেখানে থাকবে না কোনো সুন্দর আর সাম্য। এক দর্শন হবে প্রবল। বিপরীত আর সব মতবাদ তারা করবে না স্বীকার। অবশ্য বস্তুতপক্ষে অদৃশ্যের দোহাই দিয়ে তারা নিজেদের ক্ষমতা আর ভোগলিপ্সা বাস্তবায়নেই নেমেছে।

: এই অন্যায্য কর্মের প্রতাপ কি থামবে না? তাদের বিরুদ্ধে কেউ কি রুখে দাঁড়াবে না?

: নিশ্চয় দাঁড়াবে মানুষ তাদের বিরুদ্ধে। তবে সময় প্রয়োজন। কারণ যারা চায় পৃথিবীকে শাসন করতে একচ্ছত্রভাবে, এ তাদেরই পাতানো খেলা। এই যে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ঘটানো হল তাও তাদের খেলারই অংশ। তারা অলক্ষ্যে দংশন করে বিষ ছড়ায় আর প্রকাশ্যে সেই বিষ ধ্বংস করে। এভাবেই নিজেদের শক্তিমান আর ত্রাতারূপে প্রকাশ্য হয়। এ রীতি পুরনো। তারা এর নাম দিয়েছে রাজনীতি। এই রাজনীতির নামে এমন হাজারো ভয়ানক খেলাই এখন চলছে পৃথিবীতে।


ধর্মীয় উগ্রবাদিতার আবরণ দিয়ে ঢেকে দেয়ার সমান্তরাল আখ্যান হিশেবে দেখতে পাই গহনযাত্রাকে।


আখ্যায়ী আমাদের সামান্য আভাস দিলেন বটে, কিন্তু রাজনীতি ভেদ করতে চাইলেন না। একবার বললেন এটা মতাদর্শের লড়াই। এটা তাকে বলতে হলো আখ্যানের প্রয়োজনে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার সংশোধন করে নিলেন। পমের বয়ানে সংযোজন করলেন প্রকৃত সত্য : ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তির খেলা’। দুনিয়াজোড়া যে দুটি বয়ান হাজির, তিনি খুব সতর্কভাবে দুপক্ষকেই মেনশন করলেন মাত্র। কাউকে এনকাউন্টার করতে চাইলেন না। ধ্বংস ও বিনাশের চিত্রকল্প রচনার দিকেই ফিরে গেল তার মন। অর্থাৎ তিনি আমাদের দেখাতে চাইলেন ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’, কিন্তু আড়াল করে ফেললেন পৃথিবীর ‘ঘোর-কুটিল পন্থ’।

পশ্চিমা প্রোপাগান্ডায় যা ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’, গহনযাত্রায় তা ঠিকরে বেরিয়ে এল। কিন্তু ‘ক্ল্যাশ অব মার্কেন্টিলিজম’ হিশেবে সালমাদের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি দিল খানিকটা ঝাপসা করে। যে পুঁজির সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্য আজ মৃত্যু-উপত্যকা, সন্ত্রাসনির্মূলমন্ত্র যেভাবে উন্মুক্ত করেছে অনন্ত যুদ্ধের ময়দান, তাকে ধর্মীয় উগ্রবাদিতার আবরণ দিয়ে ঢেকে দেয়ার সমান্তরাল আখ্যান হিশেবে দেখতে পাই গহনযাত্রাকে।

জাতিগত বিদ্বেষ ও তার শোকাবহ পরিণাম এ লেখার মূল আলেখ্য। অর্থাৎ ‘কারণ’ নয়, ‘করণ’ই মুখ্য এখানে। আর তাই অনুক্ত থেকে গেছে বিশ্বভূগোলের এই একটি অস্থির বিন্দুতে নানা পরাশক্তির আধিপত্য কায়েমের অগোপন দ্বন্দ্বগুলি। গহনযাত্রা কেন মৃত্যুর পথরেখায় এগুবে? কেন সে চাইবে না মানব-বিনষ্টির মারীবীজকে চিহ্নিত করতে? এমন প্রশ্ন জেগেছে আমার অতৃপ্ত পাঠক-মনে।

এই কারণে হয়তো, গহনযাত্রা কেবল একটি চিত্রকল্প হয়ে রইল, চিন্তারূপ নিয়ে দাঁড়াতে পারল না।

তবে একথা আমাদের ভুললে চলবে না, এই নৃশংসতা, এই গণহত্যার মর্মন্তুদ দৃশ্যরচনারও মূল্য আছে। রুবাইয়াৎ চেয়েছেন মৃত্যুঞ্জয়ী প্রেমিক আরিয়ানের বেহালার করুণ সুরে এই নিখিলের হাওয়ায় লুণ্ঠিত মন ও আকাশের অবাক অনিমেষ চাহনির কাছে মনুষ্যত্বের একটি আর্ত আবেদন রাখতে। তা তিনি সফলভাবেই নিষ্পন্ন করেছেন।

সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি ফজলুল হক কলেজ, বরিশাল।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪
তিমিরে তারানা ● অগ্রদূত, ২০১৭

প্রবন্ধ—
বাদ-মাগরিব (ভাষা-রাজনীতির গোপন পাঠ) ● অগ্রদূত, ২০১৮

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব