হোম গদ্য গল্প ৮৭তম দিনে তার এবং আমি

৮৭তম দিনে তার এবং আমি

৮৭তম দিনে তার এবং আমি
601
0

মুহূর্তের পর মুহূর্ত বেদনার্ত মনে বসে থেকে সে বেরিয়ে আসে মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর আবার বাষ্পযুক্ত শ্বাস ফেলে ঢুকে যায় খোলা স্নানাগারে।

নিষ্পলক কয়েকটি মুহূর্ত মাত্র অপেক্ষা তার, ৮৭তম দিন আজ।

ইশ ওর আসবার দিনও সব ঠিক ছিল। দু’দিন অন্তর বদলেছে পানি, জেট যুক্ত করে তার মাঝে আবার কখনো পরম মমতায় কিংবা খুব তাড়াহুড়োয় বদলেছে ডুবে থাকার জায়গাটা। কাউকে বলে আসলে বোঝানো যায় না অনেক কিছুই যেমন এখন বোঝানো যাচ্ছে না নিজেকেই নিজে। এমনটা কী করে হলো! অসাবধানতা, পুরো ব্যাপারটাই ঘটে গেছে তার অসাবধানতায়।

সেবার, যেবার পাহাড়ে গেল সবাই মিলে সেবারও কি কম কাণ্ড হলো?

সবার সাথের সবকিছু যেমনটি নিয়ে গিয়েছিল তেমনটিই ফেরত আসলো, আসলো না শুধু ওগুলোই। পরে ড্রাইভার, গাইড কতজনকে ফোন করে খুঁজে পেতে আনা গেল তবুও।


মেয়েরা কুহকিনী না হলে বোধহয় জগতের কোনো নিয়মই ঘটত না।


মনে আছে, খুব মনে আছে বৃষ্টিভেজা দিনে অনেক ছবি তোলা হলো, আনন্দ আড্ডা হলো। তারপর এসে পরম মমতায় ভিজিয়ে দিল ফেনিল—জেট পাউডারে তৈরি ফেনিল বু্দ্‌বুদে। কয়েকটি গোল গোল হাওয়া পোরা বড় আকারের বুদ্‌বুদ হাতের উপর দিয়ে ভেসে গেল রংধনুর ন্যায় বর্ণচ্ছটা তৈরি করে। ইশারা! কত রকমের ইশারা চলে জগতে। এই ভেসে ভেসে যাওয়া ব্যাপারটাই বা কম কী? ক’টা বুদ্‌বুদে ক’টা রংধনু তৈরি করেছিল, কোনোরূপ কি কোনো ইঙ্গিতমূলক ব্যাপার ছিল! অথচ প্রায় দু’ কি তিনদিন অন্তর ও বদলেছে পানি, নতুন পানি, নতুন করে বানানো জেট পাউডারের গোলা; তার মধ্যে পরম মমতায় অপেক্ষা, উপযুক্ত সময়ের না পর্যাপ্ত সময়ের অপেক্ষা!

আচ্ছা মেয়েরা কুহকিনী না হলে বোধহয় জগতের কোনো নিয়মই ঘটত না।

বলল বেশ করে আর অমনি ঘটে গেল ব্যাপারটা। না বললে হয়তো চলত আরো বেশ কিছুদিন, কিংবা সব সময়ই তেমনটিই ঘটে যেত যেমনটি চলছিল।

সকল বিশ্বাসের জায়গাটিতে বরাবরের মতো আবার একটি ঘা খেল সে। পাশ মুড়ে শোবার চেষ্টাটা করে রেহাই নেই ভেবে আবার উঠে বসে একদৃষ্টিতে চেয়ে রয় আর কানে বাজে ঝরনার কলতান নিয়ে আছড়ে পড়া হাসির শব্দ।

উহ … আর পারা যায় না। মেয়েটা পারেও। খারাপ একটা। কী যে হবে তার কে জানে।

একদিন স্বপ্নে দেখে ধড়ফড়িয়ে ওঠে বসে সে। কী বলছে কুহকিনীটা আবার!

তুমি পরছ সেটা? না, ফিতাটাই পরানো হয় নি।

ও আচ্ছা পাঠিয়ে দিতে পোস্ট করে, কথার জবাবে উত্তর আসে—সেটাই করা যেত।

একটা কথার জের ধরে এত কিছু হয়ে গেল আবার বলে কিনা পাঠিয়ে দিতে ফিতা লাগাতে। সে ভাবল যে, সে দেখল কী করে ওটাকে? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল ও-প্রান্ত থেকে—সেদিন যে দেখালে শুকিয়ে-টুকিয়ে একেবারে হা করে কেলিয়ে রয়েছে তবে সেটা কী ছিল? কেলিয়ে থাকাই তো বলতে হয়, কিন্তু কী আশ্চর্য, সেদিন ও সে স্বপ্নে দেখেছিল সুন্দর এক জোড়া মাছ হয়ে তারা ফেনার বুদ্‌বুদ ভেদ করে উপরে উঠে আসছে আবার নিচের স্বচ্ছ পানিতে নেমে যাচ্ছে। স্বপ্ন অলীক কল্পনার পাখায় ভর করে যদি সত্যিই ওগুলো মাছ হয়ে যেত তবে বেশ হতো, সময়ের ধারাবাহিকতায় ওগুলোকে নিয়মিত জলসেবা করা যেত। বেশ সুন্দর এক জোড়া মাছ!

না না, এ হয় না। বলে সে আবার ঢুকে যায় স্নানাগারের মধ্যে। সেখানে স্বপ্নের মাছ জোড়া (!) মাছ হয়ে যাবার পরিবর্তে তার দিকে সুস্পষ্ট ভাবে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে চেয়ে আছে এই মুহূর্তের করণীয় খুঁজে না পেয়ে। বেদনার্ত মনের কান্না ভাষা খুঁজে না পেয়ে নিষ্পন্দ হয়ে তাকিয়ে রয়; সমাধান কি করা যেত না কোনোভাবেই! ও কোনোভাবেই বোঝে না শুকিয়ে-টুকিয়ে কেলিয়ে থাকবার ব্যাপারটা তাই আবার জানতে চায়, কিন্তু তুমি দেখলে কী করে আর কোথায় কিভাবে? উত্তর আসে, কেন তুমিই তো দেখিয়েছিলে, মনে পড়ে না? শাদার মধ্যে একটু কালো আর লালের আভাওয়ালা শেলাইয়ের পাশ দিয়ে পাশ দিয়ে (সশব্দে ঝরে পড়ে হাসি)।

কী রকম ছিল, বলো তো। আবার মনে পড়ে যায় প্রথম দেখার দিনের মুগ্ধবোধের কথাটা, পরে তার ব্যবহারেই বা কমতি ছিল কি? বরং প্রথম পরিচয়ের পর ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আরও বেশি আপন হয়ে গিয়েছিল তারা। শুধুই কি তারা, তার নিজেরও কি ভালোলাগা তৈরি হয় নি তাদের প্রতি? হয়েছিল, এক ধরনের ভালোলাগা। সৌন্দর্যবোধের সাথে একধরনের ভালোলাগার বোধ, তাই তো সে সব সময় তাদের প্রতি ছিল বিশেষ যত্নবানও।

কত কত দিন তাদের দেখেই শুধু অন্যদের সাথে চলে গিয়েছে; সর্বতোভাবে তাদের সাথে সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়িত্বের ব্যাপারে তার ছিল সজাগ দৃষ্টি। যে দৃষ্টির এতটুকুও হেরফের হয় নি আজ বেশ কয়েক বছরেও। এই যত্ন নেওয়ার ব্যাপারটি নিয়ে অবশ্য নিকটজনেরাও কম উক্তি করে নি। কতগুলি তো রীতিমতন সকলের মধ্যে ছড়িয়েও গিয়েছিল। সকলে মিলে, সে কি কম কথা শুনেছে! সে গর্বিত ছিল যে তারা শুধুই তার, আর কারো নয়। এবং এই পাওয়া তার বেশ দীর্ঘস্থায়ী পাওয়া হয়ে গিয়েছিল।


কান্নার শব্দ আসছে কি? আসলে কান্না তার মনে—একক মনে, উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির বোধের দ্বারা আক্রান্ত মনের কান্না।


সেবার ওই যে সেই মেয়েটি যে প্রজাপতির পাখায় ভর করে আসত তার কাছে যখন তখন, সেও তখন হারিয়ে যায় নি, সেও ছিল। একদিন বলেছিল তার মুগ্ধতাবোধের কথা। শুনে এমনি করে হেসেছিল বেশ অনেকক্ষণ। বলেছিল তোমার তো অবশ্যই ওদের বিকল্প ভালোবাসা তৈরি করে রাখা উচিত নতুবা তাদের অবসানে প্রাণ বাঁধবে কী প্রকারে? স্পষ্টতই ঠাট্টা ছিল, পারতও বটে। সর্বক্ষণ এক সুর-লহরি যেনবা! তারপর কী যেন হয়ে গেল একদিন, স্রেফ হারিয়ে গেল সময়ের আবর্তনে; বহুদিন পর একটি বার্তা পেয়েছিল—ফোন করো। তারপর আর কোনো খোঁজ নেই। তারও সেটা করবার কথা মনে হয় নি বা এমনটি নয়, কিন্তু হয়ে ওঠে নি আর বলতই-বা কী যে আমি তোমার কথা অনুযায়ী চলে দেখি নি, তাই আমার সকল কাজ শেষ হয়েও হয় নি।

এই মুহূর্তে বিছানায় গা এলিয়ে বেশ খানিকক্ষণ হয়ে গিয়েছে তার ভাবনার জগতে বিচরণ। কান্নার শব্দ আসছে কি? আসলে কান্না তার মনে—একক মনে, উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির বোধের দ্বারা আক্রান্ত মনের কান্না। আচ্ছা বেশ মনে আছে, গত মাসেও সে একবার একদিন ভাবল, আজ তো বেশ একটু সময় আছে ব্যয় করবার মতো। কিন্তু করি করি করেও সময় বের করা হলো না।

এ এক বেশ খেলা-খেলা একটা ব্যাপার চলছিল এই প্রায় তিন মাসে। প্রতি তিন বা চার দিন অন্তর পানির খেলা। পুরাতনটুকু গড়িয়ে ফেলে দিয়ে নতুন পানিতে তাদের সহ্যক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখবার মতো করে একটু ছুঁইয়ে আবার সুগন্ধি ফেনায় নিমজ্জন। মাঝেমাঝে তার নিজেরও যে ওদের সাথে নিমজ্জনের ইচ্ছেটা জাগত না তা নয়। তাদের সুখী ভালোবাসাপূর্ণ জীবনের প্রতি তার এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নে সে যত্নবান ছিল তাদের প্রতি।

সে ভাবে, একান্ত করেই ভাবে, খেলাটার প্রতিও তার এক ধরনের মায়া বা অভ্যস্ততা জন্মে গিয়েছিল। নচেৎ এটুকু তো তার খেয়াল করবার কথাই ছিল যে এমনতর একটি ভয়াবহ ব্যাপার ঘটে যেতে পারে। সে কি এতটাই মোহগ্রস্ত ছিল যে মাছ এক জোড়া সোনালি মাছের স্বপ্নে সে ঘটে যেতে দিল ব্যাপারটা আর সোনালি মাছের ব্যাপারটাও তো শুধু স্বপ্নে দেখেছিল সে, যেমনটা কখনই বাস্তবে ঘটা সম্ভব না। তবে মুগ্ধতার বোধ কি তাদের থেকে সরে সোনালি মাছের প্রতি বেড়ে গিয়েছিল!

আজ আর প্রয়োজন নেই তার পানি বদলাবার কিংবা ফেনা তৈরি করবার কিংবা স্নানাগারের একটি প্রান্ত যা সে দীর্ঘদিন যাবৎ দখল করে রেখেছিল, তাও আজ মুক্ত হবে সকল দিক থেকে, এও এক প্রকার ভালো হলো বলে ভাবতে ইচ্ছে করে, কিন্তু তারপর বারবার কি শূন্যস্থানটির উপর তার চোখ পড়বে না,পড়বে তো। তখন কি সে ভাবতে বসবে মধুরতম স্মৃতির সময়গুলির কথা।

রুবাইয়াৎ সিমিন

জন্ম ২৯ আগস্ট ১৯৮৩, চুয়াডাঙ্গা।

বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রভাষক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

ru.simin@yahoo.co.nz

Latest posts by রুবাইয়াৎ সিমিন (see all)