হনন

হনন
413
0

প্রতিনিয়ত জেসমিনের জন্য আত্মহননের পথ খুলে যায়। সেই পথের দরজা হাট করে খোলাই থাকে। তা চারপাশের কেউ হয়তো দেখতে পায় না। কেননা দরজা আগলে দাঁড়িয়ে সে, পরিজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর এই বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতকৃত পেছনের পথের মুখে প্রতিবার নতুন নতুন কাগজ জুড়ে দেয়। কাগজ সাঁটানোর কাজটা সে কখন করে? কেউ জানতে পারে না। কিন্তু তারা জেসমিনের সেঁটে থাকা রঙিন সব কাগজ দেখছে। তবে তা দূর থেকে দেখা রঙিন কাগজই ভেবে নেয়। বলে, যত্তসব ভীমরতি! কিন্তু কেউ কাছে এসে দেখে নি, রং থাকলেও প্রতিটি কাগজের মধ্যে কালো কালো পিঁপড়া হরফের অনেক আত্মকথন। যেইসব অক্ষরের যুক্তিগুলোকে দাঁড় করিয়ে জেসমিন হননের পথ থেকে বেরিয়ে আসে, আর আশপাশের মানুষগুলোকে বিভ্রান্তির মধ্যে রেখে দেয়। কেননা এছাড়া তার পথ নেই, নিজেকে সে হারিয়ে যেতে দিতে চায় না।

স্বজন পরিবেষ্টিত থাকলেও মূলত সে একা। হয়তো এই সত্যের প্রকাশ ঘটবে, সেদিন সত্যি সত্যি জেসমিন থাকবে না। এইখানে আর কোনো ঘটনা সম্বলিত যুক্তির রঙিন কাগজ জুড়ে রাখবে না কেউ। তখন শাদা কাগজের কেবল অপেক্ষা। যেমনটা থাকে সাংবাদিকের টেবিলে, পুলিশের রিপোর্টে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের ফাইলে। সেখানে রিপোর্ট লেখা হবে, জবানবন্দি লেখা হবে। দোষ-নির্দোষের সাফাই গাইবে সবাই।


কোনো মানুষকেই শতভাগ বিশ্বাস করা যায় না। একটু ফাঁক থেকেই যায়।


জেসমিন মাঝে মাঝে ভাবে, আসলে কে কে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইবে? এই কথা চিন্তা করে তার হাসিই পায়। শরিফ বেঁচে থাকলে সবার আগে হয়তো ওই বলত, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ! দৃশ্যটা চোখে ভাসে, শরিফের পাশে দাঁড়িয়ে একে একে তার বাবা-মা আর ভাই, সবাই বলছে তারা নির্দোষ! এটা কোনো হত্যা নয়, এটা আত্মহত্যা।

শরিফ থাকলে তো জেসমিন তাদের বাড়িতেই বসবাস করত। আচ্ছা, কোন ঘরটাতে সে ঝুলে পড়ত? নাকি বিষে আকণ্ঠ নীল হয়ে যেত তার শরীর! এটা সত্যি, শরিফের বাসার কেউ তাকে খুন করে না। তারা এত সহিংস নয়। কিন্তু জেসমিনের বাবা-মা, ভাই-বোন তারা কি ছেড়ে কথা বলত? যখন সে মৃত, তখন তাছাড়া কী-ই বা তারা বলবে? তখন ছেড়ে কথা বলতে নেই, সে শিক্ষা তাদের আছে। তারা তো সবাই আঙুল তুলে জেসমিনের শ্বশুর বাড়ির সাবাইকে খুনি প্রমাণ করতে টেলিভিশনের মাইক্রোফোন ফাটিয়ে ফেলত! এমনকি সচেতন গুটিকয় সামাজিক মানুষের দ্বায়িত্বও পড়ত ন্যায় বিচারের আবেদন জ্ঞাপনে।

এইসব আজে বাজে ভাবনা নতুন নতুন রূপে জেসমিনের সামনে আসে, মাঝে মধ্যেই আসে। জীবনের অনেকটা পথ ধরে এই ভাবনার বীজ তার মনের মধ্যে গড়ে উঠেছে, এখন তোলপাড় করে। আর তখনই আচমকা খুলে যায় পেছনের দরজা। জেসমিনের আত্মহননের পথ! আর চতুর জেসমিন রঙিন কাগজে কাগজে জিয়ে রাখে জীবন।

২.
ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পরীক্ষার পর পরই শরিফের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল জেসমিনের। শরিফ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আই. আর. থেকে সদ্য বেরিয়ে যাওয়া মেধাবী তরুণ। আর্ন্তজাতিক এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরিরত, আকর্ষণীয় যুবক। বাবা ব্যাংকের বড় কর্তাব্যক্তি, একমাত্র ভাই বুয়েট থেকে বছর-দুই বাদেই ইঞ্জিনিয়র হয়ে যাবে। মা শৌখিন এবং শিক্ষিত এক নারী। জেসমিনের পরিবারের আপত্তির কিছু থাকে না। জেসমিনের তো নয়ই। কেননা ঘটনা চক্রে শরিফের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আরও বছর তিন আগে। নানা সময়ে নানা ঘটনায় তাদের যে সাক্ষাৎ মেলে, তাতে দুজনের মনে মনে পরস্পরের ভেতরকার সুন্দরকেও খুঁজে ছিল, হয়তো দেখতেও পেয়েছে! যদিও ছুঁতে পাড়ার মতো মেলামেশা আর হয়ে ওঠে নি, তবে সেই মুগ্ধতা তো ছিলই। অগোচরে স্বপ্নের ভেতরের একটা প্রেম প্রেম ভাবনা খেলা করছিল। তাই যথা সময়ের প্রস্তাবে বিয়ে হয়ে গেল শরিফের সঙ্গে জেসমিনের।

শরিফ বলেছিল, দু’জন মানুষের কখনও শতভাগ মিল হয় না। ধীরে ধীরে মেলাতে হয়।

জেসমিন বলে, কোনো মানুষকেই শতভাগ বিশ্বাস করা যায় না। একটু ফাঁক থেকেই যায়।

তখনই তাদের মাঝে সত্যের সন্ধি হয়। আহা! কেমন সত্য প্রকাশে দ্বিধাহীন দু’জন, এমনটা ভাবা যায়!

জেসমিনের এম এ-এর রেজাল্ট ভালো হলো। তখন চাকরি খুঁজতে শুরু করেছে সে। শরিফের মত, অবশ্যই চাকরি করো। কিন্তু বিস্তারিত আলোচনায় আঙ্গিকে ঢাকা শহরের বাইরে যে তাদের বসবাস হবে না, তা খানিকটা স্পষ্ট। আর তা জেসমিনের সেক্টর পছন্দের ক্ষেত্রে বেশ কাজে দেয়। কিছু সরকারি চাকরির খাতা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে, মফস্বলীয় পেশা তাকে শুরুতেই বাতিলের লিস্টে রেখে দিতে হয়। পারস্পারিক বোঝাপড়া আর ভালোবাসায় তারা যৌথ খামারের অধিবাসী।

একটি এনজিওতে চাকরি পেলে শরিফ অভিনন্দন জানায়। শ্বশুরও বলল, বেশ। শাশুড়ি এতদিন ব্যস্ত ছিলেন নতুন বউকে সাজিয়ে-গুজিয়ে স্বজনদের বাড়ি বেড়ানো পর্বে, আর তা প্রায় শেষ। তিনিও না করলেন না, তবে চিন্তিত হলেন, চাকরির ধরন-ধারন ক্রায়টেরিয়া নিয়ে। তাতে চাকরি শুরু হতে অসুবিধা হয় না জেসমিনের। এও তো এক নতুন জীবন। দীর্ঘ বেড়ে ওঠা বয়সের একঘেয়েমি কাটিয়ে সম্প্রতি অর্জিত দু’দুটো নতুন জীবনের স্বাদে তরতর করে পেরিয়ে যায় দিন।

৩.
সেইসব দিনে জেসমিনের জন্য কোনো পিছন দরজার উপস্থিতি ঘটে নি। কবে থেকে সে দরজা নীরবে তার পিছু নিয়েছে? তাও কি ঠিকঠাক মনে পড়ে?

দুম করেই শরিফের চাকরির উন্নতি হয়, এবং তাকে এখন থেকে হংকং-এর অফিসে কাজ করতে হবে। খুবই আনন্দের খবর। এ উপলক্ষে বাড়ির সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে ডিনার করাও হলো। কিন্তু বিষয়টা যে ততটা আনন্দের নয়, তা শাশুড়ি হামিদা রহমানই জানালেন, বছর পেরিয়ে গেল, এখনও নাতি-নাতনির খবর নাই। ছেলে বিদেশে থাকবে, এ বিষয়ের চিন্তাটা তাই তিনি আর চেপে রাখতে পারলেন না। বিষয়টা নিয়ে এতদিন শরিফ আর জেসমিনও তেমন একটা ভাবে নি।

এ যাত্রা শরিফ মাকে বোঝাতে সক্ষম হলো যে সময় তো চলে যায় নি। জেসমিন নিজেরও তখন কি শিশুর জন্য মন কেমন করে! দু’জনের আলাদা থাকার কষ্টটা তখন তার ভাবনায় আরও গাঢ় হয়। শরিফ চলে যাওয়ার পর জেসমিনের দিনশেষে মন খুলে কথা বলার লোকটি কোথায়? রাত্রে হঠাৎ হেলে পড়ার জন্য, উষ্ণতার জন্য কিংবা দুঃস্বপ্নে ভাঙা ঘুমে মাথা গুঁজে দেবার জন্যও যে কতটা জরুরি শরিফের পাশে থাকা, এতদিনে অনুভব করতে পারল জেসমিন। আর তখন একটা শিশুর কথা তার নিজের মাথার মধ্যে ঘুণপোকার মতো বাসা বাঁধে। শিশুর হাসি আর দুষ্টুমি, ন্যাপকিন থেকে ফিডার বানানোও মনে হতে থাকে, সময়ের কত মধুর কাজ! তখন হয়তো শিশুর হামাগুড়ির পেছনে পেছনে ছুটে কেটে যেত সময়ের একাকিত্ব! কী এক অতৃপ্তি, বিবাহিত জীবনে দু’জন দুই জায়গায়, এ কেমন জীবন!

দিনে দিনে হামিদা বেগমও খানিকটা রুক্ষ হয়ে যাচ্ছেন! সংসারের নানা কাজে, বুয়া থেকে ড্রাইভার সব নিয়ে তিনি নাকি সামলে উঠতে পারছেন না। সংসারের হাল টানতে এ বয়সে আর মন চায় না তার। এইসব কথা জেসমিনকে ভাবনায় ফেলে না, সে ভাবনায় পড়ে অফিস যাওয়া আসার সময় হামিদা বেগমের নিরীক্ষাধর্মী দৃষ্টি আর প্রশ্নে। নিজেকে ভীষণ অপ্রস্তুত লাগে। পূর্ণবয়স্ক জেসমিনকে শিশুদের মতো, সন্ধ্যার হাজিরা খাতায় কতটা দেরি হলো? তখনই পেছনে অস্পষ্ট দরজাটা এসে পড়েছিল! না, তখনও নয় বলেই তার ধারণা।


জেসমিন বুঝতে পারল, উদার আর আধুনিক শরিফ রহমানও প্রকারান্তরে প্রমাণ হাজিরের তাগাদা দিচ্ছে।


মাস ছয় বাদে শরিফ দেশে আসছে।  কী আনন্দের বিষয়, সবার মাঝেই সে আনন্দ-ছটা স্পষ্ট। জেসমিন যেন নতুন করে সব সাজায়, ঘরের সব কিছু খানিকটা উল্টেপাল্টে দেয়। শরিফের জন্য কেনা-কাটা করে, এমনকি নিজেকে সাজাতেও সে নতুন কিছু নিয়ে আসে। মাত্র ছয়মাসকে মনে হয় কত বছর পর শরিফ আসছে! এত খুশি অনেক দিন বাদে ফিরল তার জীবনে। রাতে শরিফের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে শুয়ে থাকে, শরীরের ঘ্রাণও যেন তাকে অভুক্ত রেখেছিল। কত কথা, তবুও কথার চেয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে থাকতে অদ্ভুত এক অনুভূতি! যেন না বলেও পারস্পরিক উত্তাপে বিনির্মিত হতে থাকে সব অপ্রাপ্তি!

দিন দুই বাদে সন্ধ্যায়, একে অপরের গা-ছুঁয়ে বসে, শরিফ বলল, তোমার কোনো খালাত ভাই এসেছিল?

জেসমিন শুরুতে মনেই করতে পারে নি, কবে? কোন ভাই?

খানিক বাদে মনে পড়ে মেঝখালার ছেলে, কানাডাপ্রবাসী দিপু ভাই এসেছিল। বিয়ের সময় তিনি ছিলেন না, তাই জেসমিনকে চমকে দিতে একাই উপস্থিত হয়েছিল। সে কথা শরিফকেও ফোনে জানিয়েছিল। এতদিন বাদে এ প্রসঙ্গ! শরিফ অবশ্য বিষয়টাকে সামলে নিতে বলে, না, মা বয়স্ক মানুষ তো। আর তাছাড়া তোমার দিপু ভাই তো তোমার খালাকে সঙ্গে নিয়ে আসলে পারতেন।

জেসমিন বুঝতে পারল, উদার আর আধুনিক শরিফ রহমানও প্রকারান্তরে প্রমাণ হাজিরের তাগাদা দিচ্ছে। কী বিষণ্ন করার মতো বিষয়। বিশ্বাসের ভেতরের মসলিনের পর্দা। তুমি উড়ো, কিন্তু আমি তো দেখতেই পাব! সহসা কি একটু সরে এসেছিল জেসমিন! তবে কি সেদিন? পেছনের দরজা তৈরি হয়!

৪.
জেসমিন এক অদ্ভুত মেয়ে। তা না হলে এত এত রঙিন কাগজ আর অক্ষরের জাল কেউ বুনতে পারে? আর কী সব বিষয় লিখেছে! ওই সব তো মিডিয়াতে প্রকাশিত আর প্রচারিত বিষয়-আশয়, সবাই জানে। কিন্তু বোঝে কয় জনে। আহা-উহু করা মানেই তো সব বুঝে ফেলা নয়। আর ওই যে সুধীজনেরা, ওই যে অধিকার প্রতিষ্ঠার সংস্থা, তাদের লোকজন তারাই-বা কতটুকু বুঝতে পারার দায়ে কথা বলে? সব তো ডিউটি, এইসব তারা হয়তো এক সময় বুঝত, তখন ছাত্ররাজনীতির বাম বলে বেশ জ্ঞানের কদর তাদের ছিল। তা সংস্থার টাকায় নিজের পেট চালাতে গিয়ে তারা কেবল মুখপাত্র, রির্পোট-লেখক! তাই কেউই বুঝতে পারে না, কিভাবে সে সব জেসমিনের নিজের দরজার পেরেকে উপস্থিত হলো? এইসব কিছুকে সে নিজের জীবনের ব্যাখ্যায় ফেলে, এক জীবনচক্র বানায়! ওই খবরগুলোর সরব উপস্থিতি জীবন চক্রের একটা ফাঁদ, তা না বুঝলে ও কি আর এমন কারুকার্যে সাজাতে পারত নিজের চৌকাঠ।

দিব্যি জেসমিনের চোখ আছে, অথচ কী সব লিখেছে সে চোখ সম্পর্কে! কাগজটার রং যাই হোক না কেন শুরুতে বড় বড় অক্ষরের লেখা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রুমানার দুটো চোখ নষ্ট করে দিয়েছে পাষণ্ড স্বামী!’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তজার্তিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক রুমানা মঞ্জু, নিজের পারিবারিক সম্পর্কই যার ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে, তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষা করতে তো চোখ হারাবেনই। জেসমিন আরও কী সব লিখেছে, এমনকি ওই কাগজে সে লিখে রেখেছে জেসমিনের চোখ দুটো শরিফ উপড়ে নেয় নি, সে মোটেও পাষণ্ড ছিল না। কিন্তু জেসমিন নিজেই তো অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। না হলে শাশুড়ির বংশগতির হিশাব আর মায়ের মানিয়ে চলার উপদেশকেই তার যথার্থ মনে হলো! শরিফ বলেছিল, তোমার যেখানে ইচ্ছে থাকতে পারো। কিন্তু জেসমিন সেদিন সত্যিই সন্তান-আকাঙ্ক্ষায় অন্ধ হয়ে যায় নি? সে চাকরি ছেড়ে হংকং চলে যায় নি? গিয়েছে।

তাতে যে খুব বংশ রক্ষা করতে পারল, তা আর কই? তিন বছরের মাথায় এক কন্যা সন্তানের মা হতে পেরে আনন্দে জেসমিন অন্ধই ছিল। তা না হলে নিজের ক্যারিয়ার সব ছেড়ে মেয়ে আর সংসারের পেছনে কী করে পাঁচটা বছর কাটাল! কেমন অন্ধজীবন তার!

৫.
শরিফ আর ছোট বংশীকে নিয়ে মেতেছিল জেসমিন। একবারও চিন্তা করে নি অদূরে অপেক্ষারত জীবন তার জন্য কী পরিহাস নিয়ে আসছে।

হংকং-এ শরিফের অ্যাক্সিডেন্টটা বেশ আলোচিত। বংশীকে নিয়ে দেশে ফিরে এল জেসমিন। যেই নিশ্বাসের ভরসায় উড়ছিল সে, সহসা মিলিয়ে গেল তা, ডানা হারিয়ে। নিরুত্তাপ সেই প্রত্যাবর্তন। সেই প্রথম জেসমিন জানতে পারে, বংশী কোনো বংশের প্রদীপ নয়! কন্যার জন্য তখন তার বুকটা ফেটে গিয়েছিল। আহা রে, সোনা আমার! তোকে আমি কষ্টের পৃথিবীতে এনেছি।


সামাজিক মাধ্যমে নানা পক্ষ-বিপক্ষ। এতটুকুই কি যথেষ্ট নয় যে মেয়েটি লিখেছিল চিরকুটে, শারীরিক-মানসিক চাপ!


ক্রমশ সংসারের অাশ্রিত মনে হয় নিজেকে। একজন কাজের মানুষের জীবনে পর্যবসিত হতে থাকে জেসমিন। সংসার তাকে ভালো থাকার উৎসবে বন্দি করতে চায়, নানা রকম ফায়ফরমাশে নিজে বাকরুদ্ধ থাকলেই না, লক্ষ্মী বউটি সে! যদিও অলক্ষ্মীর প্রমাণ তো সে আগেই দিয়েছে, না হলে শরিফের অকালমৃত্যু! এখানে সকল উৎসবের জন্য নিজেকে বিসর্জন দেওয়াই সংসারধর্ম। আর প্রতিনিয়ত তার পেছনের পথ প্রশস্ত হতে থাকে। আর এইসবকে অবহেলা করে জেসমিন। জড়ো করে রঙিন কাগজ!

আহা, এমপি-পুত্রবধূ শামারুখ মেহজাবিন। তোমার মৃত্যুও রহস্যজনক! আচ্ছা, শামারুখ যদি আত্মহত্যা করে তা কি এজন্যই যে তাকে এফসিপিএস করতে দেওয়া হয় নি?  মেধাবী ডাক্তার পুত্রবধূ, শ্যামলিমা কন্যা আমার! মায়ের কাছেও সংসার টিকিয়ে রাখার তাড়া নিশ্চয়ই ছিল। হত্যা বা আত্মহত্যা—এছাড়া নিজেকে জীবিত প্রমাণের কোনো অবকাশ হয়তো ছিল না শামারুখের। মরিয়া প্রমাণ! আহা, রবি ঠাকুর। আজও পশ্চিমেই ডুবে যায়।

বাবার বাড়িতেও তার কোনো সম্মানজনক স্থান হবে না। বংশীর মতো সেও তো যথার্থ উত্তারাধিকারী নয়। ভাই বা তার বউদেরকে দোষ দিয়ে লাভ কী? জেসমিন কি ছোটবেলা থেকে দেখে নি মা এবং খালারা এক হলে দূরে থাকা মামাদের বউদের খরচে হাত, জীবনযাপন নিয়ে তারা কত চিন্তায় মেতে থাকত। অতৃপ্ত জীবন সব, অধিকারহীনতা তাদেরকে অনধিকার চর্চার মন্ত্র শেখায়। আর তাই অন্যের পরিবারের খবর যেন তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশ! এইভাবে সবাই ছদ্মজীবনের পিছনে ছুটে বেড়ায়। তখন জেসমিন কিংবা শামারুখকে ঠেলে দিতে হয় সূর্যাস্তের দিকে। কিন্তু কিছুতেই জেসমিন সেই দরজায় পা রাখবে না। সে বংশীর হাতটা শক্ত করে ধরে থাকে।

৬.
বেঁচে যাবার নানা ফন্দি করে জেসমিন। আবার কতদিন বাদে চাকরির খোঁজ, জানাশোনা লোকেদের খোঁজ। আর নিজের গিঁটে বাঁধা যৎসামান্য অর্থের গা ত্যানাত্যানা করে ফেলে গুনতে গুনতে! বিয়ের সব গয়না, আহা, দেনমোহরের খাতে সে দাম ধরেছিল বলে, জীবনে কি টাকা পয়সায় খানিকটা ঠকে গেল! দিনরাত ছুটোছুটি, কাদা মেখে, বিদ্বেষকে অবহেলা করে ছুটেছিল বলেই তো বন্ধু আনিসের মাধ্যমে মফস্বলের এই স্কুল চাকরিটা পেল জেসমিন। ভাগ্যিস ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেছিল, তাই রক্ষা। সোজা বাসা ভাড়া নিয়ে নিজের আবাস। সে আর বংশী, জীবনের কত রং, কত পর্ব!

কিন্তু এই যাত্রায় কি আর রক্ষা হয়? চাইলেই কি স্বাধীন হওয়া যায়? পাপ আর বিশ্বাসের হিশেব নিয়ে ঘুরছে পৃথিবী। যেন তাই দিন-রাতের তারতম্য কম, সময়ের অধিকারে তারা মানুষের পিছু ছাড়ে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আক্তার জাহান জলির সুইসাইড নোট পড়তে পড়তে আবারও নতুন কাগজ হাতে বসে পড়ে জেসমিন। সামাজিক মাধ্যমে নানা পক্ষ-বিপক্ষ। এতটুকুই কি যথেষ্ট নয় যে মেয়েটি লিখেছিল চিরকুটে, শারীরিক-মানসিক চাপ! মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতো এই চাপ অনবরত জেসমিনকে পেছনের পথের দিকে টেনে নিতে চাইছে না? তবে? পাল্টা আঘাত হানতে না পড়লে হয়তো সে বেরিয়ে যাবে।

জেসমিনের এই যে এত রঙিন কাগজের নোটবুক, তা তো বংশীর জন্যই। এত ব্যাখ্যা, জীবনের এত কাছে থেকে দেখা গলি-ঘুপচি, এইসব বংশীকে তো চিনে নিতে হবে। পৃথিবীর সে আসলেই কতটা উত্তারাধিকার? তা একদিন বংশীকে বুঝে নিতে হবে। আর যেমনটা নিজেকে চিনতে চিনতে বয়স বাড়ছে জেসমিনের।

ছোটবেলা-বড়বেলা, শ্বশুর বাড়ি, বাপের বাড়ি এইসব কিছু তো নিত্যদিনের জীবনের সঙ্গে, আঙুলের মতো, নখের মতো বাড়ন্ত জীবন। এই যে একা একা শিশু নারীজীবন। এই স্বাধীন ইচ্ছার সামনে অসংখ্য কাঁটাতার, এই সব তো সে জানছে, জীবনকে একটু একটু ক্ষয় করে করে জেনে যাচ্ছে সব। চেহারাগুলোর মমত্ব, চামড়ার ভেতর লুকিয়ে থাকা দাঁত! চাইলে তা খানিকটা বেশি বেড় করেও দেখানো যায়। হায়নার মতো। বংশীকে নিজের করে এইসব চেহারা পড়ে নিতে হবে। সেই জন্যই তো এমন শক্ত হাতে নিজেকে বেঁচে থাকার স্বপ্নে বিভোর জেসমিন। সব কিছু তুমি জেনে যাবে কন্যা আমার, আমি না পালিয়ে, তোমাকে না লুকিয়ে সব সত্যের কথা, সব আন্ধকারের কথা বলে যাব। আমরা তো এক সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করেছি, ফেলে পালাব না। ওই পালোনোর রাস্তায় দ্যাখো, সব লেখা আছে। তুমি আরও এগিয়ে যাবে বংশী।

কিন্ত সেই বংশীই যদি না থাকে! কার জন্য এইসব অক্ষর-ভাবনার সমুদয়? এত সমন্বয়। কাকে নিয়ে জেসমিন ছুটে চলবে সূর্যের তাপে। বংশীকে রক্ষা করতেই হবে। নদীতে ভেসে থাকা লাশের মতো, ডোবায় ফেলে দেওয়া শিশুর মতো হারিয়ে যেতে দিতে পারে না। এজন্যই জেসমিনের পথ আজ হননের দিকে।


শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিল জেসমিন! কী নোংরা সব কথা! অবলীলায় সে বলে ফেলল!


৭.
বিষয়টা বেশ রগরগে আর জুতসই হয়ে ওঠে সবার কাছে। স্বামী-হারা জেসমিন আর বয়স্ক হেড মাস্টারের পক্ষে এমন সম্পর্কে জড়ানো নতুন ঘটনা হবে না। অহরহ ঘটে, শুধু হয়তো নামগুলো ভিন্ন ভিন্ন। উপযুক্ত স্থান আর পাত্র! ক্ষেত্রটা কেবল তৈরি হলেই সারাদেশ জেনে যাবে। বিষয়টা প্রচার পায় স্কুল কমিটির বোর্ড মিটিং-এর একদিন পর। সেই মিটিং-এ উপস্থিত পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান স্থানীয় সাংসদ। তার মুখের উপর যখন বেয়াদবি করতে পারে স্কুলটির হেড মাস্টার, তখন সেই শিক্ষকের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। যে কিনা শুধু ঘুষখোরই নয়, নারী-লোলুপ! আর এই কাহিনি জেনেও সাংসদ চুপ থাকবেন? এলাকার মানুষের জীবন ও সম্মানের প্রতি তার অনেক দায় রয়েছে। তারা তাকে পছন্দ করেছে ত্রাণকর্তা হিশাবে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আদর্শ পরিবেশ নিশ্চিত করা তার কর্তব্য। সুতরাং বিষয়টির গভীরের গিয়ে অনুসন্ধান জরুরি।

উপযুক্ত পাত্রী হিশাবে জেসমিন ওই স্কুলের শিক্ষিকা। বংশী যেই স্কুলের ছাত্রী। আহা, অঙ্কশাস্ত্র বহুদিন আগেই যে শিখিয়ে রেখেছে দুই-দুগুনে চার! ঘটনা তখন মিলবেই, পরস্পর সম্ভবনার সূত্র বসিয়ে ফেলুন। কার হাঁড়িতে ভাত নেই, কে অভুক্ত থাকতে পারে। কার চালের হিশাব নেই, কোন চুলায় হাঁড়ি বসবে। মানুষ আজ সব বোঝে। কিন্তু সব দেখতেও পছন্দ করে। অথর্ব সময়ের কিছু নিয়ম আছে। তখন জীবন মানেই সার্কাস! অশ্লীলতার দায়ে সার্কাসের তাঁবু তুলে দেওয়া হলেও, অবাধ তথ্যপ্রবাহে মানুষ তো দিব্যি সার্কাস দেখে। নিজেকে যতক্ষণ দর্শক রাখা যায়, ততক্ষণই সুখ! তা উপভোগ করাই শ্রেয়। মানুষ তাই করে।

এই মাত্র কোর্টে শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিল জেসমিন! কী নোংরা সব কথা! অবলীলায় সে বলে ফেলল! রঙিন আর নতুন একটি কাগজের ছাপ আঁকতে হবে। জীবনকে জয়ের ধ্বজায় উড়িয়ে দিয়ে সে নিরাপদ তন্দ্রার জন্য বাড়ি ফিরছে। বংশীর হাত ধরে জেসমিন যে পথে বাড়ি ফিরছে, তার উল্টো পথে তখন প্রিজন ভ্যান। প্রধান শিক্ষক বিমল করকে নিয়ে ছুটে চলেছে কারাগারের দিকে।

বদরুন নাহার

জন্ম ২২ আগস্ট ১৯৭৭, ফরিদপুর। ফরিদপুর সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় হতে এসএসসি এবং সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজ ফরিদপুর থেকে এইচএসসি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর।

মহাশ্বেতা দেবীর আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস নিয়ে বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম ফিল ডিগ্রি লাভ। বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে আদিবাসী জনজীবন বিষয়ে পিএইচডি কোর্সে গবেষণারত।

চাকুরি ছেড়ে এখন থিতু হয়েছেন ফিকশন লেখায়। বর্তমানে এটিই তার পেশা।

প্রকাশিত বই :
গল্প—
গল্পগুলো ব-দ্বীপের (২০০৬), ঢেণ্ঢনপা’র দেশে (২০০৮), ভাতগল্প (২০১১), বৃহস্পতিবার (২০১৩), আমাদের গ্রামে মালো পাড়া নাই (২০১৬)।

উপন্যাস—
আশ্বিনের শেষ রাত্তিরে (২০১৫)।

শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ—
ককরোজ-নকরোজ (২০১২)।

পুরস্কার :
ছোটগল্পের জন্য নির্ণয় কবি বাবু ফরিদী পদক (২০১১-১২)। ব্র্যাক বাংক-সমকাল হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩।

সম্পাদনা :শূন্য পুরাণ [গল্প বিষয়ক ছোটকাগজ]

ই-মেইল : b.nahar.p@gmail.com

Latest posts by বদরুন নাহার (see all)