হোম গদ্য গল্প সালেহার সপ্তবর্ষব্যাপী বৃষ্টিদিনগুলি

সালেহার সপ্তবর্ষব্যাপী বৃষ্টিদিনগুলি

সালেহার সপ্তবর্ষব্যাপী বৃষ্টিদিনগুলি
2.19K
0

তখন বৃষ্টি। ঘাটে আঁধার ঘনায় আসে। সামনে ঢেউ। এমন ঘনঘোর মেঘলা দিন। টানা ৭ দিন ৭ রাত সূর্যের দেখা নাই। মনে হয় আগুনের গোলা গেছে নানাবাড়ি। তখন গাছেরা দিকচিহ্নহীন তরলপ্রান্তরে নিশানামাত্র। সেই কবে, বাপের পানসিতে চড়ে একবার লোহারফড়িং দেখতে গিয়েছিল মৌসুমী। বাদামতলির কানিমাঠে একখণ্ড স্বর্গ আর লোহার ফড়িং-এর পেট থেকে ফেলে দেয়া মুড়িচিড়া নিয়ে গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরেছিল সে। আঙিনার কোনায় গোড়া পচে যাওয়া গুলমরিচ আর লেবুগাছেও ভর করেছিল মধুর ঘ্রাণ। চিড়া-গুড় খেতে খেতে ছোট্ট মৌসুমীর সে কী গান। আজ ক’বছর বাদে সেই ছবি আবারও ভেসে ওঠে। সেবার বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়া ৩ বছরের থাপুস-থুপুসের শুধু মাথার টিকি দেখে সালেহা সন্ধান পেয়েছিল ওর, তুলে আনতে পেরেছিল একদমে।


মা এইডা কি লুহার রাজহাঁস? নাকি পানির পাসাদ? দ্যাহো কেমন ঘুরতাছে!


‘এখন আর দম কুলায় না মা। কৈ গ্যালোরে আমার সোনা মানিক? আইজ বাছা আমার কোন পাতালপুরির দুয়ারে দুয়ারে ঘোরে?’—মা মা ডাকে কলিজা মোচড়ায়া ওঠে সালেহার। আর কত ঢেউ! বিজলি চমকায়। এত স্মৃতি! বাজের শব্দে আত্মা চমকায়। ৩ বছর বয়সে অলৌলিকভাবে বেঁচে যাওয়া মৌসুমীই আবারো নিয়ে এসেছিল মরিচ বোনার দিন। তারপর কাগজি লেবুর নতুন চারায় লেবুফুলের ঘ্রাণ। কিন্তু ফকফকা দিনগুলো এত সহজে হারায়া যাবে? কিন্তু এমন তো কথা ছিল না। যথারীতি আকাশ ছিল আগুন ঝকঝকে। বাতাসে পানকৌড়ির ডাক শোনা যাচ্ছিল কান পাতলেই। সেই খুশিতে স্কুলব্যাগ যাচ্ছিল মামা বাড়ি। আর কী খুশি! বলে, ‘মা মা এইডা কি লুহার রাজহাঁস? নাকি পানির পাসাদ? দ্যাহো কেমন ঘুরতাছে!’

খুশিতে চোখে পানি আসে সালেহার। এখনও চিকচিক করে চোখ, চোখে পানি। সন্ধ্যার আঁধার তাতে জমাট হয় আরও। ডজন ডজন টিভি ক্যামেরার ফ্ল্যাশ সেই ব্ল্যাক হোল আলোকিত করতে পারে না। শুধু মাঝদরিয়ায় জ্বলে ওঠে সার্চলাইট। ‘ভাই ডুবুরি তুমি আমার কইলজ্যাডারে বিছরাইয়া আনো। মানিক আমার পাতালপুরির কোন ডাইনির দুয়ারে কেঁদেকুটে মরে! কৈ গেলি রে মৌসুমী!’

জল কাঁপিয়ে, আত্মা কাঁপিয়ে সশব্দে ফিরে আসে ট্রলার। আরও বেশি জনরব। পারে হুমড়ি খায়া পড়ে হাজার হাজার মানুষ। দূর থেকেই নাক বেঁকে যায় কটুগন্ধে। ফুলবাগান পইচ্যা শেষ! মরা মানুষ ত্রিশ হাজার; জ্যান্ত মানুষ কেবল পাত্থর। সালেহা চিক্কর পাড়ে—‘ভাই ডুবুরি তোমারও তো ছেলেপুলে আছে। গাজরক্ষেতে খরগোশের লাহান দৌড়ায়। আছে সুনার সংসার। তাগো দোহাই, আমার বুকের ধনেরে আইনা দেও। পেট কাইট্যা ডাইনির খোরাক কইরো না তারে। পায়ে পড়ি।’

সালেহার কান্নায় চেপে ভোর আসে। আকাশে শকুনের দল। কার বুকের ধন ছিঁড়েখুড়ে খায় পাষাণ-ইতর! একবার চেনা দরিয়া আর আরেকবার অচেনা ভিড়ের রহস্যে হারিয়ে যায় সালেহা। জিগায়—‘কেউ কি দেখছ নি আমার কলিজার টুকরারে? এই এতটুকুন! মৌসুমী। নীল স্কুলড্রেস আছিল গায়ে। মামা বাড়ি যাইব বইলা কী নাচন মায়ের! ফড়িং ধরব, বিল থেইক্যা আনব তুইল্যা শাপলার ডাঁটা। যাইছ না মা একলা একলা। সাপখোপ থাকে! এখন কোন কালসাপ গিলল আমার কলিজার টুকরারে!’


হেই কবে ওর বাপ নিখোঁজ। কিছু মানুষে তারে নিয়া গ্যালো কুয়াশার ভোরে, আরও দূর কুয়াশার ভিতরে


চোখের পানি শুকায়া আসে। এখন খালি হেঁচকি ওঠে সালেহার; খালি হেঁচকি। ‘মাইয়া আমার কোন আন্ধারে মরে ঘুরে ঘুরে’। মন্ত্রী আসে। আসে টাউট-বাটপার। এরে বাপ তারে কাকা বলে লাশ বাগাতে চায়। একটা করে ট্রলার আসে পারে। আসে মরার কাফেলা। কারো শরীর ঢোল হয়ে ফুলে ওঠে। দামামা বাজে আকাশে বাতাসে। সন্ধ্যা শতকোটি ধারায় খানখান হয় দূরের আজানে। শোনা যায় সালেহার বিলাপ—‘আল্লাহ তুমি আমার মাইয়াডারে ফিরায়া দাও। হেই কবে ওর বাপ নিখোঁজ। কিছু মানুষে তারে নিয়া গেল কুয়াশার ভোরে, আরও দূর কুয়াশার ভিতরে।’

তারপর বস্তির গলি, মোতালেবের চা দোকানে জমল মজমা, ইতর পোলাপাইন জটলা করল, এক সময় বন্ধ হইল দোকানের ঝাঁপ। ফের সকাল। ‘একটা জলজ্যান্ত মানুষ হারায়া গেল কুয়াশার ভিতর! মৌসুমীর বাপ, আমার সোয়ামি। মায়ে আমার বাজান বাজান বলে খালি কানতো, আমি কানতাম রাইত-নিশুতির ঘর। সেই মাইয়াও কি হারায়া গেল জলের ভিতর?’

সালেহার নাওয়া নাই, খাওয়া নাই। এই তিনটা দিন যেন হাবিয়া দোজখ। একবার সূর্য আগুন ঢালে। শুকায়া আসে গলা। পরক্ষণেই নামে তুমুল বর্ষা। চোখের পানি, দরিয়ার পানি, আকাশের পানি মাখামাখি যায়। রাক্ষসী নদী আরও ফুলেফেঁপে ওঠে। ‘ও ভাই ডুবুরি পাইছ নি আমার কলিজার টুকরারে? পানির ভিতর ডাইনির সংসার। কুমির হাঙড়। কচি শরীর না জানি খুবলায়া খুবলায়া খায়!’


হাতের তালুতে উঠে এসেছে চামড়া; ছোট্ট ফুটফুটা মৌসুমীর গালের দগদগে মাংস


তখনও সন্ধ্যা নামে নি পুরাপুরি। হয়তো তিন দিন, চারদিন পর। খোঁজ মিলে সালেহার মেয়ের। তখনও বেণি দুটো শক্ত করে বাঁধা। লাল ফিতা। ঘটিহাতা ফ্রক। কী টাটকা সতেজ! এখনো কি আছে জান?! মা’রে-এ-এ বলে সালেহা মেয়ের মুখে চুমু খেতে যায়। অফিসার ভলেন্টিয়ার দৌড়ে আসে—না না ছোঁবেন না, ছোঁবেন না। বৃষ্টির ভেতর কান্নায় মুড়ে যেতে যেতে সালেহা দেখে—ওর হাতের তালুতে উঠে এসেছে চামড়া; ছোট্ট ফুটফুটা মৌসুমীর গালের দগদগে মাংস। মূর্ছা যাবার আগে সালেহা সর্বশক্তি দিয়ে বিলাপ করে—মারে তোরে খুবলায়া খাইল পোকা। আমারে আন্ধার…

সালেহার হাতে লেগে থাকা ছোট্ট মৌসুমীর গালের চাকলা উঠে আসা দাগ ধুয়ে দেয় আশ্বিনের ঝুম বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি চলে টানা ৭ বছর। দিন-রাত বিরামহীন। সূর্য বেড়াতে চলে যায় নানাবাড়ি। গেছে তো গেছে, আসার নামগন্ধ নাই। প্রকাণ্ড পাকুড়, জগডুমুর গাছেরা দিকচিহ্নহীন জলপ্রান্তরে ডুবে থাকা অদৃশ্য নিশারার মতো হাত নাড়ে। লোকজন অস্থির। এভাবে কতদিন? কৃষক মাঠে যাইতে পারে না, জেলে দরিয়ায় যা-বা যায়, মাছ আনে কিন্তু রান্না করতে পারে না। ছেলেপুলে স্কুল যেতে পারে না; হান্ডিওঅলা আসতে পারে না ঘরের দরজার। ভেজা কাঁথা জমে স্তূপ। মহিলারা পুরানা শাড়ি আর স্বামী-দেবরের তবন দিয়ে কিনতে পারে না সিলভারের ডেকচি, স্টিলের চামচ। সবাই বলাবলি করে, এই সব সালেহার জন্য হইতেছে। প্রত্থমে খাইছে স্বামী, তারপর বেডি… কেউ কেউ কিছুটা নরম দিল। বলে—‘আহা বেচারা বেড়ি! বাচ্চার গালের মাংস গইল্যাপইচ্যা হাতে লাগছে, এত সহজে দাগ মুছে!’

কিন্তু হাতের দাগ মুছতে আর কত বৃষ্টি লাগব সালেহার? আমাগোরও ঘরসংসার আছে! কেমনে কী উপায়? পাড়ার বুড়াবুড়িরা বলাবলি করে—এই বৃষ্টি সালেহার চৌখ্যের পানি। সেই পানিতে মরে যায় জনপদের উঠানের সব গোলমরিচ আর কাগজিলেবুর গাছ। মৌসুমীর কথা ভেবে আর নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে মাঝেমাঝে সালেহার শরীর গুলায়; প্রচণ্ড বমি পায়। ওয়াক-ওয়াক। কিন্তু বমি থামাতে নাকের কাছে ধরার জন্য একটা লেবুপাতাও ওর নসিবে জোটে না।

মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান