হোম গদ্য গল্প সরাইখানা

সরাইখানা

সরাইখানা
776
0

হঠাৎ সেদিন সরাইখানাটা অচেনা লাগল আমার। পুরোনো সরাইখানা। কেউ তেমন একটা আসে না, যেদিন পথ ভুলে কেউ এদিক চলে আসে সেদিন আমাদের উৎসব হয়। এখানে আসে পাঁড়মাতাল, দাগি আসামি বা বেশ্যাদের কেউ, বুড়ো কেভিনের হুঁশ থাকা পর্যন্ত ফায়ারপ্লেসের সামনেই বসে থাকে, জোয়ানা ধূমায়িত তিতা কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বানায় ভেড়ার মাংসের স্টু, রোজকার একই দৃশ্য। একঘেয়ে রংহীন। কেভিন আর জোয়ানার সংসারে আমি এক বহিরাগত। তাদের পরিচারিকা ইভার সাথে কিছু কাল রাত্রিযাপন করেছি। জেল থেকে ফিরে সে অধিকারেই এখানে উঠেছি। এ ছয়মাসে ইভার চেহারা পাল্টে গেছে অনেক। সরাইখানায় চেরা কাঠ জ্বালানোর সময় প্রায়শই তাকে আমার আর তরুণী মনে হয় না। ফায়ার প্লেসের গনগনে আগুনে তার টকটকে লাল মুখ আমাকে আর কামার্ত করে না, আমার বর্তমান উত্তেজনাহীন নিরুত্তাপ।


পুরোনো ভদকার তরল আনন্দ গলায় ঢেলে খুঁজতে বের হই নতুন শরীর।


পুরোনো ভদকার তরল আনন্দ গলায় ঢেলে খুঁজতে বের হই নতুন শরীর। রোজকার জীবন একই রকম। মাঝে মাঝে জোয়ানার সৎ পুত্র রুথ পুরোনো একটা ভায়োলিন বাজায়। কোনো একটা গভীর গাঢ় বিষাদের সুর তোলার চেষ্টা করে, যদিও বেসুরে, তবুও আমি সেই ভায়োলিনের সুরে ডুবে যাই গাঢ় বিষাদে, খুব দুঃখ দুঃখ বোধ হয় আমার। আমি তখন শুকনো কাঠ নিয়ে বসি, বাটালে খোদাই করি ভ্রষ্টার মুখ, পাপীর মুখ, পতিত মানুষের মুখ। আমার খোদাইয়ে কোনো সুন্দর নেই। বাইস, রামদা, করাতে নিখুঁত করে তুলি একেকটা মুখ , নিষ্প্রাণ কাঠে ফোটে বঞ্চিত ক্লেদাক্ত জীবন, স্পষ্ট হয় পাড় মাতাল, দাগি আসামি বা বেশ্যাদের কেউ। এই চলছিল। সে জীবনে সেই দিনটা হঠাৎ অন্যরকম হয়ে গেল।

আমি সেদিন গলায় একটু বেশি ঢেলেছিলাম। ডায়নার উদ্বাহু বন্ধন কল্পনা করছিলাম অনেকক্ষণ। নারীর তরল নেশায় তখন আমি চুর। শ্যাম্পেইন পার্টিতে সালসা নাচছিল ডায়না, আহ কী কোমর! ফিরতি পথে ল্যাম্পপোস্টের কাছে একটা কুকুরের সাথে ধাক্কা খাই, কুকুরটাকেও আমার বেশ লাগে। চুমু খেতে এগিয়ে যাই, কুকুরটা কু্ঁই কুঁই করে পালায়। আমি হাসি, কোটের পকেট থেকে কয়েকটা পয়সা কুকুরের দিকে ছুড়ে মারি। হেসে উঠি নিজে নিজেই—আবে শালী, চুমু নিলি না তাই বলে পয়সাও নিবি না। লে লে পয়সা লে।

আমি জানি আজ রাতেও ইভা আমাকে ঘরে ঢুকতে দেবে না, প্রায়শই তার খরচ জোগাতে অন্য লোক ধরতে হয়, তার কাছে চোর ছেঁচড় ছাড়া কেউ খুব একটা আসেও না। তবে সরাইখানার আস্তানায় ঢোকার অনুমতি পাই জোয়ানার স্নেহের কল্যাণে। জোয়ানার ভাই সৈনিক ছিল। আমার মতো নাকি দেখতে! মরে গেল। ঢুস! বর্তমানে আমি তার ছায়া হয়ে সুযোগ নিচ্ছি কেভিন আর জোয়ানার অভাবী সংসারে আরো অভাব বাড়িয়ে তুলবার।

আমি আস্তে আস্তেই ফিরছিলাম কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কেউ তো নেই আমার অপেক্ষায়।

দরজার কাছে এসে আজ আর মাতালদের হই-হট্টগোল পেলাম না। সামনের অংশটায় একটা বাতি ছিল সেটাও দেখলাম বন্ধ আছে। প্রথমে কিছুক্ষণ ভ্রান্তি জন্মাল, নেশার ঘোরে নিশ্চয়ই আমি ভুল কোথাও চলে এসেছি। কিন্তু না, ভেতর থেকে জোয়ানার খরখরে গলার হাসি শুনতে পাচ্ছি। রুথের ভায়োলিনের দু ‘একটা টান কানে আসছিল, এমনকি ইভার কণ্ঠের উচ্ছলতাও।

আমি সরাইখানার পিছনের দরজা দিয়ে আগাই। অবাক হয়ে দেখি এক অভিজাত মহিলা ফায়ার প্লেসের সামনে মাথা নিচু করে বসে আছেন। অভিজাত বলছি কারণ এই অন্ধকার রাতেও তার গায়ের পোশাক মৃদু আলোতেও ঝলসে উঠছিল। উনার মুখ দেখছি না আমি এমনকি কণ্ঠও অস্পষ্ট শুধু এলোমেলো গল্পগুলো কানে আসছিল। সব এলোমেলো। বিক্ষিপ্ত। খাপছাড়া সব। কখনো জোয়ানাকে জিজ্ঞেস করছে এবার তার জমিতে স্ট্রবেরি চাষ কেমন হলো, কখনো কেভিনের শরীরের সুস্থতার খবর, আবার কখনো রুথের কলেজ নিয়ে প্রশ্ন। মনে হচ্ছিল তিনি কথা খুঁজে পাচ্ছেন না। জোয়ানাকে উপদেশ দিলো কিছক্ষণ; তারা চাইলে অধিক লাভের জন্য তাদের জমিতে ব্রকলি, গাজর বেবিকর্ণ লাগাতে পারে। এগুলো এখন সবজির দোকানে খুব চলে।

আমি শব্দ না করে অন্ধকারে সেঁটে রইলাম, নেশা কেটে যাচ্ছে আমার। শোনার চেষ্টা করছিলাম কী বলছে মহিলা, হঠাৎ দেখলাম ইভার চুল হাতে নিয়ে জ্বলে ওঠা মোমের শিখায় দেখছেন—প্রশ্ন করছেন, ইভা চুলে কোন কালার ডাই করে; ব্রাউন, অ্যাশ না গ্রে? আমি ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হই। আমার মনে হচ্ছিল ঘরের সবাইও বিরক্ত। এই অপরিচিত মহিলার সাথে নিতান্ত অনীহায় সকলে স্বাভাবিক উচ্ছলতা দেখানোর অভিনয় করছেন কারণটাও জানি। কারণ তিনি ধনাঢ্য, কারণ তিনি অভিজাত। এ কথা সে কথার পর হঠাৎ সবাই কথা খুঁজে না পেয়ে চুপ করে যায়। ঘরের বাতাস তখন ভারি। অনেক্ষণ কাটে এভাবেই, এরপর ক্লান্ত হয়ে ভদ্রমহিলা মুখ তোলেন। আমি চমকে উঠলাম, এ আমি কাকে দেখছি! ইনি এ শহরের বিখ্যাত কাউন্ট রোজার পিটের স্ত্রী ইসাবেলা। প্রায়শই তিনি বিকেল বেলা হরেক রকম গাউন পরে বৈকালিক ভ্রমণে বের হন, তার গাউনের উজ্জ্বল গোলাপি আভায় রঙিন হয়ে ওঠে পুরো শহর।


অবিশ্বাস্যরকম সুন্দরী ও অভিজাত এই রমণীকে আমি জরাজীর্ণ তৃতীয় শ্রেণির সরাইখানায় দেখব আশা করি নি।


গলফের আসরে তার সবচেয়ে বেশি উপস্থিতি, গলফ-প্রিয় কর্নেল ফিদার্সের সাথে তার দারুণ সখ্য, শহরের সেরা ক্যাসিনো বা বারে তাকে নিয়ে বাজি ওঠে; আজ কার সাথে নাচতে দেখা যাবে এই প্রিন্সেসকে! অবিশ্বাস্যরকম সুন্দরী ও অভিজাত এই রমণীকে আমি জরাজীর্ণ তৃতীয় শ্রেণির সরাইখানায় দেখব আশা করি নি। আমি যারপর নাই বিস্মিত। আমার নেশার ঘোর একেবারে কেটে গেছে না-আছে এ নিয়ে কিছুক্ষণ দ্বিধায় ভুগি। আমার বিস্ময়ের ঘোর না কাটতেই মহিলা ভাঙা গলায় বলে উঠলেন, “জানেন আমি গত তিনরাত ঘুমাই নি, তারপর আবার চুপ!”

এবার আর আমাদের বিরক্ত হবার মতো ধৈর্যও নেই, শুনতে চাই স্পষ্ট সব। তিনি নীরব! আমি ঘরের আবছা আলোতে অনুভব করলাম তার চোখ থেকে বড় বড় ফোটায় পানি পড়ছে। ঘরের সবাই অপ্রস্তুত। কেভিন, জোয়ানা, রুথ আর ইভা নিঃশব্দে তাকাচ্ছে একে অপরের দিকে। কারও চোখের ভাষাই কেউ পড়তে পারছে না!

তার শীতল কণ্ঠে আবার নীরবতা ভাঙে।

—আপনারা আমাকে পাগল ভাবছেন জানি, কী করব বলেন। জানেন আজ তিনরাত ঘুমাই নি। আমার সহিস আমাকে এই কাঠের ভাস্কর্যটি বড়দিনের উপহার হিশেবে দিয়েছে। তারপর থেকে আমি একটুকুও ঘুমাই নি। এই যে দেখেন কাঠের গায়ে একটা ভিক্ষুক নারীর খোদাই-করা মুখ, দেখেছেন? এই দেখেন! এই মুখ, দেখেন দেখেন।

সবাই ইসাবেলার হাতের কাঠের খোদাই করা মুখটা দেখে, কারো ভাবান্তর হয় না। গত সপ্তাহে আমিই ছেঁচে ছুলে বানিয়েছি এটা। বড়দিনের উৎসবে পানশালার ভোজনের খরচা উঠাতে বিক্রিও করে দিয়েছি সাথে সাথে। খুব কম দাম ছিল, শুধু কাঠের দামে বেচেছি। শিল্পের দাম কে দিবে?

ধ্যান ভাঙে মহিলার ভেজা কণ্ঠে।

জানেন তিনি কে? জানেন? সকলে চুপ থাকে। সাড়া না পেয়ে নিজেই বলেন। তিনি আমার মা। আমার মা। আমার জনম দুখিনী মা। তারপর আবার চুপ। তার প্রতিটা কথা দুবার করে পুনরাবৃত্তি হয়ে থেমে যায়।

তার শেষ কথায় আমরা নড়েচড়ে বসি। তিনি বলতে থাকেন আমার মা আমার বাবাকে খুন করার দায়ে জেলে গিয়েছিলেন। তারপর আর ফিরেন নি। আমি খোঁজ নিতে পারি নি, কেমন করে খোঁজ নিতে হয় তাও জানতাম না তখন। হারিয়ে ফেললাম মাকে। আর দেখেন সেই দুখিনী মায়ের কন্যা হয়ে এই আমি আজ কত সুখী! কত অভিজাত! ফাদার আমায় কৃপা করেছেন। শহরের সেরা কাউন্টের সেরা রত্ন বানিয়েছেন! ভাবা যায়?

মহিলা এবার কান্নার সাথে হাহা করে হাসছেন। আমার আর ঘরের আর-সবার কেমন জানি অস্বস্তি হয়! কী বলতে পারি এসময় আমরা?

তিনি এবার দ্রুতলয়েই বলছেন, আমরা শুনছি। জানেন, আমার মাকে আমার বাবা নেশার টাকা জোগাড় করার জন্য রোজ কয়েক পুরুষের কাছে বিক্রি করতেন। আমার মা বাঁধা দিলে মারত খুব। যে সে মার না একেবারে পৈশাচিক মার। আমার মায়ের দুধে-আলতা গায়ের রং পুড়ে পুড়ে কয়লা হয়ে গেল। চোখ বসে গেল, গাল ভেঙে গেল, খদ্দের জোটে না। খদ্দের না পেলে আরো বেশি করে মারত। মা সব মেনে নিতেন—মায়ের ভয় ছিল, প্রতিবাদ করলে বাবা আমাকেও এমন করে একরাতে কয়েক পুরুষের কাছে বেচবেন—মা এটা চাইতেন না কিছুতেই। মায়ের পালিয়ে যাওয়ার সাহস ছিল না, তবুও আমাকে সব সময় বলতেন পালিয়ে যেতে। আমি পারতাম না, আমি পালিয়ে গেলে আমার ছি্ড়ে যাওয়া, ক্ষত হয়ে যাওয়া মায়ের ঘা-গুলোতে কে বরফ জল লাগাবে, কে আগুনের সেক দিবে? বেঁচে থাকতে মাকে ছাড়ব না। আমি প্রতিজ্ঞা করি বাবাকে খুন করব, দিনে দিনে একটু একটু করে সাহস বাড়াই। মা কেমন করে যেন আমার মনোভাব টের পেয়ে যায়। গির্জার পাদ্রিকে ডেকে এনে রাতের অন্ধকারে পার করে দেয় সে নরক থেকে, তারপরের দিন বাবা খুন হয়।


আমি না জেনে কাঠের গায়ে যে মুখ খোদাই করেছি সে মুখে এত বঞ্চনা!


ঘরের প্রতিটি মানুষ ইসাবেলার নির্মম গল্পে ইসাবেলার হাতের কাঠের মুখের মতোই যেন কাঠ হয়ে যাই! আমি না জেনে কাঠের গায়ে যে মুখ খোদাই করেছি সে মুখে এত বঞ্চনা! এত কষ্ট! আমি যেদিন জেল থেকে বের হই সেদিন জেল গেটে দেখেছিলাম পুলিশ খুব ব্যস্ত হয়ে এক মৃত কয়েদির লাশ তুলছিল। আমি এক নজর দেখেছিলাম, তামাটে পাংশুটে মুখ, চোখগুলো তখনও খোলা শাদা, নিষ্প্রাণ! মুখটা স্মৃতিতে গেঁথে গিয়েছিল কেন জানি। চেষ্টা করেছিলাম ভুলে যাওয়ার আগেই কাঠের গায়ে ঠিকঠাক ফুটিয়ে তুলতে সে মুখ। হয়তো পেরেছিলাম না-হয় ইসাবেলা চিনল কী করে! না কি শুধু ইসাবেলা বলেই চিনতে পেরেছে।

ইসাবেলা কাঁদছে, জোয়ানা কাঁদছে, কাঁদছে ইভাও। হঠাৎ আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। ইভাকে খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। এই অন্ধকার সরাইখানায় একরাতেই ইসাবেলা আমাদের বুকের ভেতরে বিবেকের আগুন জ্বেলে দিয়েছে, পুড়ছি আমরা সবাই, সরাইখানার পাপী আত্মাগুলোর পাপ আজ রাতে ধুয়ে যাচ্ছে ইসাবেলার চোখের জলে।

নাহিদা নাহিদ

জন্ম ৫ জানুয়ারি, ১৯৮৩; চাঁদপুর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষে "কথাসাহিত্যে" পিএইচডি করছেন। পেশায় শিক্ষক। প্রভাষক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

কথাসাহিত্যিক।

প্রকাশিত বই :
অলকার ফুল [গল্পগ্রন্থ, বাঙালি, ২০১৭]

ই-মেইল : nahid.oprotim13@gmail.com

Latest posts by নাহিদা নাহিদ (see all)