হোম গদ্য গল্প সতাই ও সম্পর্ক

সতাই ও সম্পর্ক

সতাই ও সম্পর্ক
608
0

কার্তিক মাসের শেষ দিকে শীত পড়ে সিংধায়। রাতে হালকা কুয়াশা। সকালে কাঁচা রাস্তার দূর্বাগুলোতে শিশির জমলে সূর্যের আলোয় চিকচিক করে। অগ্রহায়ণ আসতেই হঠাৎ ঠান্ডাটা যেন ঝেঁকে বসে গাঁয়ের সর্বত্র। এমন শীত গত দুই দশক চোখে দেখে নি কেউ। গেরস্ত বাড়ির উঠানগুলোতে বেলা করেও আগুনের ডিবি জ্বালায় মেয়েরা। হাতে পায়ে সেঁক দেয়। সবে কূলছাড়া ছেলেগুলো অতি উৎসাহে গোল-আলু পুড়িয়ে খায় আগুনে।

পাশের গাঁয়ের জহুর সিংধায় জোনাব আলীর বাড়িতে বছর চুক্তি গতর খাটে। প্রত্যহ যখন সে ঘর ছাড়ে এশরাত আলীর বাড়িতে সকালের মোরগটা ডাকে না তখনও। ঘুমকাতর ছেলেগুলোও ভোরের ঘুমে বিভোর হয়। মাঝেমাঝে জায়েদা হয়তো ফজরের নামাজ পড়তে উদ্‌গ্রীব তখন। সুযোগ হলে চোখাচখি হয় মা-ছেলের। জহুর বলে, আয় গো মা। বৈকালে নি আওন যায়? কাহা জমি হাল দিব কয়।

তারপর মা’র উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে না সে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে সিংধার পথ ধরে। শীতের কুয়াশায় গাঁয়ের পথে অন্ধকার দীর্ঘস্থায়ী হয়। পথ সংক্ষেপ করতে ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটে জহুর। হয়তো ধল প্রহরের পূর্বেই জোনাব আলীর বাড়ি এসে হাজিরা দেয় সে। গোয়াল ঘরে গরুগুলোও ওর অপেক্ষায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। ফজরের নামাজ শেষ করে জোনাব আলী যখন বাইরে আসে ততক্ষণে হাতের কাজগুলো প্রায় শেষ। চোখাচোখি হলে জোনাব বলে, জহুর নি আইলি?

—হ, কাহা।

—বইয়ে থাহিস নে, শিগগির নাঙ্গল ল, উত্তরে হাল দিমু।

জহুরকে কথা বলতে শোনা যায় না। যৎসামান্য পর দেখা যায় হালের বলদ দুটো সাথে নিয়ে উত্তরের দিকে ধাবমান সে। এ গাঁয়ে তদ্রূপ উড়নচণ্ডী রাখাল সদৃশ ছেলেরা মাঠে বড় করে আগুনের ডিবি জ্বালিয়ে দেহ গরম করে। একই পাড়ার হারু জহুরের বন্ধু-মানুষ।

দৃষ্টিগোচর হলে হাঁক দেয় সে, জহুর, আহ ভাই শইলে সেঁক দেই, জার করে মেলা।

জহুর বলে, নিয্যস। অমন জার বাপের জম্মে দেহি নাই মালুম অয়। লও বিড়ি খাও। পরক্ষণে লুঙ্গির ভাঁজে রাখা বিড়ির প্যাকেট থেকে একটা বিড়ি হারুকে দিলে আগুন ধরায় সে।

উত্তরপাড়ায় জহুরদের বাড়িটা খানসামা নদীর পশ্চিমে। দমদমা বাজার হতে যে সড়কটা খানসামার পারে এসে ঠেকেছে, সে সড়ক পেরিয়ে মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই জহুরদের বাড়ি। নির্দিষ্ট সড়ক নেই। বাড়ি যেতে মাঝি পাড়ার শেষ মাথায় এসে বিনুবংশীর ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটতে হয় খানিক।

জহুরের বাপ এশরাত আলী পরবাসী। ওর বয়স যেবার আট কি নয় হলো সেবার বাপকে হারিয়েছে। বাপ মরলে খুব কেঁদেছিল জহুর। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। দৃষ্টিগোচর হলে পাশের বাড়ির বুচির মা এসে সান্ত্বনা দিত তাকে।

—দিলরে সবুর দে ভাই। বাপ নি আর কার বাঁচে চিরকাল?


মন খারাপ হলে মাঝে মাঝে জরজিনা এসে খোশগল্পে মাতে জহুরের সাথে। সে বলে, মুনখান সত্যই খারাপ মালুম অয় জহুর ভাই?


মা ছাড়াও জহুরের ছোট তিন ভাই আছে। সৎ মা। ফলে এ বাড়িতে মা’র স্নেহ প্রাপ্তিতে অন্য ভাইদের সাথে পার্থক্য আছে তার। নিজের ছেলেদের জায়েদা বেগম যতটা দরদ করে জহুরের ক্ষেত্রে অভাব হয়তো ততটাই। অথচ একদিন জহুরের জন্যই জায়েদা বেগমকে ঘরে তুলেছিল এশরাত আলী। কিন্তু এ সংসারে এসে জায়েদা বেগম যতটা স্নেহ দিয়েছে জহুরকে তাতে করে মা-নামের মানুষটিকে খুব বেশী মমতাময়ী মনে হয় নি জহুরের। নিজের মাকে কোনোদিন চোখে দেখে নি সে। এ পৃথিবীতে স্বার্থহীন বলতে কেবল বাপকেই বোঝে জহুর। বাপের জন্য ওর দুঃখটা হয়তো এখানেই। যা হোক, এতকিছুর পরও জায়েদা বেগমকে ভালোবাসে জহুর। তার চোখের কোনো এক জায়গাতে নিজের অবস্থান খোঁজে সে। বারংবার ব্যর্থ হয় কিন্তু আশাহত হয় না কখনই। তথাপি ছোট ভাইদের ক্ষেত্রেও স্নেহপরায়ণতার অভাব হয় না তার। এশরাত আলীর মৃত্যুর পর সংসার বাঁচাতে দিনরাত খেটে মরে। জোনাব আলীর দেওয়া মজুরিতে সংসার না-চলায় দু’বিঘা জমি বর্গা চাষ করে সে। তাতে ঘরে ভাতের জোগান হয়। মজুরিতে বাজার টেনে টুনে সংসার চলে জহুরদের। দিন যায় এক এক করে।

হাতে কাজ না থাকলে খানসামা নদীর কিনারে প্রকাণ্ড বট গাছটার গোড়ায় এসে বসে জহুর। বাড়িতে বসে থাকতে পারে না সে। ধমকায় জায়েদা।

—বইয়ে আছস যে, কামলা দিলে দুগা টাহা আইতো নিয্যস।

সহসা মা’র সাথে কথা বাড়ানোর সাহস করে না জহুর । উঠে এসে বটগাছটার গোড়ায় বসে সে।

মাঝি পাড়ার গুনাই মাঝির মেয়ে জরজিনা। দোহারা গড়ন। সম্প্রতি ওর সাথে মন দেওয়া নেওয়া করেছে জহুর। কাঁচা সম্পর্ক। এই তো গেল কার্তিকের পূজায় ঘোষবাড়ি পূজা দেখতে যেয়ে চোখাচোখি হলো দুজনের। এখন ওরা আত্মার সম্পর্কে আত্মীয়। মন খারাপ হলে মাঝে মাঝে জরজিনা এসে খোশগল্পে মাতে জহুরের সাথে। সে বলে, মুনখান সত্যই খারাপ মালুম অয় জহুর ভাই?

জহুর বলে, ছাড়ান দে লেউডা কতা। বয় কতা কই।

তারপর পাশাপাশি বসে খোশগল্প করে ওরা। সে গল্পে লুকানো কত কথা ভাষা পায়! কথা বলে বলে আগামীর স্বপ্ন দেখে দুজন। একটা নির্ঝঞ্ঝাট সুন্দর জীবনের স্বপ্ন ।

সেবার পৌষের শেষের দিকে ব্যস্ততা বাড়ে জহুরের। হেতু জোনাব আলীর ছেলে আহাদ। হঠাৎ কী এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে পড়ে বিছানা নেয় তিন বছরের ছেলেটা। অসুখ ছাড়ে না সহসা । বাড়িতে জোনাব আলীর বউ হবিরন কেঁদে আকুল হয়।

—আয় গো খোদা, পোলার জান ছদগা দ্যাও।

দিন শেষে অবস্থা বেগতিক হলে জহুরকে নিয়ে রাঁধানগর উপেন কবিরাজের কাছে যায় জোনাব আলী। পরদিন ছেলেকে দেখে আঁতকে ওঠে উপেন।

—সব্বনাশ। শত্তুর আছে নি মিয়া সা’ব, কন তো? পুলারে বিষবান দিছে মালুম অয়।

কবিরাজের কথাকেই সত্যি বলে মনে করে পাড়ার সবাই। কেবল জহুর সত্যি মানতে নারাজ। এতটুকু মানুষের শত্রু হয় নাকি? জোনাব আলীকেও জীবনে যেচে কারো সাথে কলহ করতে দেখে নি সে। সপ্তাহ খানিক পর সবাই যখন আশাহত হয়, তখন শিশুটাকে বাঁচাতে মরিয়া হয় জহুর। দিন রাত শহরে ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি করে সে। তখন সহসা বাড়ি ফেরার ফুরসৎ হয় না। নিজের বাড়িতেই থাকার ব্যবস্থা করে দেয় জোনাব। এর মধ্যে একদিন দুপুরে খেতে বসে জহুর বলে, একখান কতা আহে মুনে, কমু নি চাচি?

হবিরন বলে, ক বাপ। আমারে নি শরমাস?

—দরগাতলার হুযুর কিছু মানত করবার কয়, করবা নি?

—মানত, কাহার লগে কতা ক তাইলে।

জোনাবের সাথে কথা বলতে হয় না জহুরকে। ছেলের রোগমুক্তির বাসনায় জোড়া খাসি মানত করে হবিরন। জোনাব আলীও বউয়ের ইচ্ছায় বাধা সৃষ্টি করে না। এরপর সম্ভবত জহুরের ওসিলাতেই ছেলের রোগমুক্তি ঘটে জোনাবের।

এর দিন দশেক পর একদিন জহুর বাড়ি ফিরে দেখে কুটুম এসেছে ওদের। জায়েদার ভাইয়ের ছেলে মনু। জমি নিয়ে কলহ করায় মামলায় পড়ে এ বাড়িতে গা ঢাকা দিতে এসেছে। মনু এলে নিজের বিছানাটা ছেড়ে দেয় জহুর। তারপর বারান্দায় চট বিছিয়ে রাতযাপন করে। মাঘ মাস যায় যায় করে কিন্তু শীতের প্রকোপ কমে না সহসা। ঠান্ডায় রাতভর শরীরটা ঠক ঠক কাঁপে ওর।

ছেলে সুস্থ হলে একদিন জহুরকে নিয়ে দমদমা বাজারে যায় জোনাব। ভালো দেখে জোড়া খাসি কিনে আনে। পরদিন আখের মুনশি খাসি জবাই দিলে মাংস পায় গাঁয়ের অনেকেই। এক ভাগ জহুরও পেলে মনে মনে পুলকিত হয় সে। ওদের বাড়িতে ঈদ ছাড়া মাংস খেতে পায় না কেউ। কোরবানির ঈদে জোনাব আলী খুশি হয়ে কেজি দুই মাংস দেয় প্রতিবার। তাতে বাড়িতে দুবেলা ভুঁড়িভোজ হয় সবার। ছদগায় পাওয়া মাংস হয়তো সামান্যই কিন্তু এক বেলা যে অনায়াসে খাওয়া যাবে কেবল এটা ভেবেই খুশি হয় জহুর। সেদিন ওদের বাড়িতে উৎসব হয়। বাজার থেকে কিনে আনা মশলায় মাংস পাকালে গন্ধে বাড়ি ম’ ম’ করে। তাতে পেটে খিদে বাড়ে জহুরের। কিন্তু সহসা খাবার অনুমতি মেলে না ওর। অন্যদের খাওয়া শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করতে হয় তাকে। তারপর যখন অনুমতি মিলে ততক্ষণে হয়তো আশাহত হয় সে।

জহুর বলে, একখান লেডা দিবা নি মা, খামু?

জায়েদা বলে, লেডা, কহন শেষ!

—শেষ নি, আমারে দিলা না যে?

—কেমুন কইরা কতা কয় হারামির পু, আমি খাইছি মালুম অয়?

—তাইলে দুগা ভাত দেও, লগে ডাইল।

—নাই। দিলরে সবুর দে, সাঞ্ঝেবেলা খাইস।

এরপর আর কথা বাড়ায় না জহুর। কষ্টে ওর চোখে জল আসে। মাংসের লোভে হয়তো সবাই এক-দুচামচ ভাত বেশি খেয়েছে আজ, সাথে জহুরের ভাগের মাংসটাও। কিন্তু তবুও সত্য মানতে ইচ্ছে করে না জহুরের। পরক্ষণে আধপেট খিদে নিয়েই বাইরে বেরিয়ে আসে। জরজিনার সাথে দেখা হলে এক দুই কথায় কলহ করে। কারণ খুঁজতে ব্যর্থ হয় জরজিনা।


এরপর আর কথা বাড়ায় না জরজিনা। সোজা বাড়ির পথ ধরে সে। জহুরও থামানোর চেষ্টা করে না ওকে।


এভাবেই এক এক করে দিন যায়। একদিন বয়সে পরিপক্ব হয় জহুর। ওর প্রচেষ্টাতেই ছোট ভাইগুলো যৎসামান্য শিক্ষিত হয়। তারপর দমদমা বাজারে বিভিন্ন আড়তে মাসিক বেতনে চাকরি পায় কেউ কেউ। ফলে জায়েদা বেগমের সংসারেও সচ্ছলতা আসে দিনে দিনে। পাশাপাশি সংসারে গুরুত্ব কমে জহুরের। এক সময় প্রত্যহ সন্ধ্যায় জহুরের জন্য অপেক্ষা করত জায়েদা বেগম। বাজার থেকে কিনে আনা সবজি পেলে চুলাতে হাঁড়ি উঠত ওদের। এখন দিনের পর দিন মা’র দেখা পায় না জহুর। ছেলেদের অর্থে আয়েশি জীবনযাপন করে সে। তিলকপুর গ্রামের হারু ঘটকের সহায়তায় বড় ছেলে হরমুজের বিয়ের পাত্রী খুঁজে বেড়ায় জায়েদা। মাস দুই পর ভালো পাত্রীর সন্ধানও পায় সে।

ঘটক বলে, মাইয়্যা সাদেক আলীর বেটি গো ভাবি, ভালা গেরছ। লগে নগদ টাহা দিব কয়।

জায়েদা বলে, হাচা নি, শিগগির কতা কও ভাই।

হরমুজকে নিয়ে মাতামাতি করে সবাই। জহুরের কথা মনে করে না কেউ। সহসা জায়েদাও না। এদিকে মাঝি পাড়ার গুনাই মাঝি মেয়ের জন্য পাত্র খোঁজে মনে মনে। একসময় ভালো একটা ছেলে পেয়েও যায় সে। সব ঠিক। কেবল রাজি নয় জরজিনা। কারণ অনুসন্ধানে ব্যর্থ হলে মেয়েকে ধরে মারে সে। এরপর একদিন আবার জহুর আর জরজিনাকে বটগাছটার গোড়ায় দেখা যায়।

জরজিনা বলে, হুনছ হগগল মালুম অয়?

জহুর বলে, হ ।

—কিছু কও না যে ?

—কী কমু? হতাই মা আমাক নি বিয়া দিব?

—আমাক ক্ষেমা দিয়ো তাইলে, বাজান সত্য বুঝনের নয়।

এরপর আর কথা বাড়ায় না জরজিনা। সোজা বাড়ির পথ ধরে সে। জহুরও থামানোর চেষ্টা করে না ওকে। ওর সামর্থ্য যে যৎসামান্য সেটা অজানা নয় কারও। অমতে বিয়ে করলে হয়তো বাড়িতেই জায়গা হবে না তার। ভালো হয় অন্য কোথাও বিয়ে করুক জরজিনা। হয়তো তাতেই বেশি সুখী হবে জরজিনা। সেদিন রাতে জহুরের সাথে কথা বলতে এসে হরমুজের বিয়ের খবর দেয় জায়েদা।

জহুর বলে, মাইয়্যা ভালা নি? তাইলে বিয়া দিওন যায়।

সেবারই জ্যৈষ্ঠের শুরুতে একদিন ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে যায় হরমুজের। কনে বাঁশখালি গ্রামের সাদেক আলীর মেয়ে হনুফা। মেয়ে ভালো, দেখতেও বেশ। বিয়েতে শ্বশুরের কাছ থেকে মোটা টাকা পেয়েছে হরমুজ। সে টাকাই দমদমা বাজারে একটা মনিহারি দোকান দেওয়ার ইচ্ছে তার। জায়েদা বেগমেরও আপত্তি নেই তাতে।

এর কদিন পর অকস্মাৎ একদিন জরজিনারও বিয়ে হয়ে যায়। সেদিন কনে দেখতে এসে জরজিনাকে দেখে পছন্দ হলে ফিরে যায় নি ছেলেপক্ষ। পরমুহূর্তে ছেলেকে এনে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করেছে মুরব্বিরা। সকালে হারু এসে জহুরকে খবরটা জানায়।

—হুনছ নি জহুর, জরজিনার বিয়া অইছে কাইল?

—হাচা নি?

নিয্যস। ভালা পুলা, গঞ্জে ব্যবসা আছে কয়।

হরমুজের বিয়ের পর বাড়িতে ঘর বাড়ে এক এক করে। জায়েদা বেগমের অন্য ছেলেরাও বিয়ে করে সংসারী হয় দিনে দিনে। ঘরে নবজাতকের কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। এশরাত আলীর বাড়িটা জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে গমগম করে একসময়। কে জানে, হয়তো জনসংখ্যা বাড়ার অজুহাতেই জহুরের প্রতি সবার বিতৃষ্ণাটা প্রকট হয় আরও। ও বাড়ি না থাকলে ওকে নিয়ে কানাঘুষা করে ভাইয়ের বউয়েরা। জায়েদা বেগম প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করে দুএকবার। কিন্তু ব্যর্থ হয় সে। তারপর একদিন হরমুজের মাধ্যমেই সত্য প্রকাশ হয়।

হরমুজ বলে, একখান কতা কমু, গোস্যানি অয় মা?

জায়েদা বলে, গোস্যা ক্যান, হাচা ক বাপ?

—ভাইরে বাড়ি ছাড়বার কও। থাওনের জিরাত কই?

জায়েদা বেগম নিষেধ করতে পারে না ছেলেদের। বরং ওদের ইচ্ছাতেই সম্মতি জানাতে হয় তাকে। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরলে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় জহুরকে।

জায়েদা বলে, বাড়িখান দিয়া দে ভাইগো, একলা মানুষ তরনি থাহার অভাব?

জহুর কিন্তু কথা বাড়ায় না । সংসারে ওর অপ্রয়োজনীয়তা বিস্মিত করে ওকেই । তারপর রাগে দুঃখে নিজের অজান্তেই চোখে জল আসে ওর।

অবশেষে একদিন সকালবেলা জায়েদা বেগম এসে দেখে বিছানায় নেই জহুর। রাতের অন্ধকারে কখন যেন বাড়ি ছেড়েছে সে। সাথে কিছু নেয় নি, কেবল পরনের লুঙ্গিটা ছাড়া। বাড়ি ছেড়ে আসার পর জোনাব আলীর বাড়িতেই জায়গা হয় জহুরের। হবিরনের হস্তক্ষেপে কালীতলায় সামান্য জমি ছেড়ে দেয় জোনাব। সেখানে ছনের একটা দুচালা ঘর তুলে জহুর।

ঘরে ভালোমন্দ রান্না হলে জহুরকে ডেকে খাওয়ায় হবিরন। এ মানুষটার প্রতি কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই তার।

হবিরন বলে, অহন একখান বিয়া কর জহুর, একলা নি থাহুন যায়?

জহুর বলে, বিয়া নি, খাওয়ামু কী চাচি?

—ক্যান, কাহারে ভরসা নাই?

—নিয্যস, মাইয়া দেহ তাইলে।


পেট বাঁচাতেই একদিন জায়েদা বেগম দমদমা বাজারের এক মাথায় চট বিছিয়ে ছেলেকে বসিয়ে দেয়।


এরপর একদিন সত্যি জহুরকে বিয়ে করায় হবিরন। কালীতলার ছোট্ট ঘরটাতে এক জোড়া কপোত-কপোতীর সাজানো সংসার হয়। কনের বাপ বিয়েতে নতুন রিকশা দিয়েছে জহুরকে। জহুর এখন রিকশা চালায় শহরে। বউ মরিয়ম পথ চেয়ে অপেক্ষা করে সারাদিন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে অজুর পানি এগিয়ে দেয়। খেতে বসলে তালপাখায় বাতাস করে। রাতে বিছানায় শুয়ে সুখদুঃখের গল্প করে দুজন।

এদিকে এশরাত আলীর বাড়িতে নানা ক্ষুদ্র ব্যাপার নিয়ে কলহ বাড়ে বউদের মধ্যে। জায়েদার সাথে কলহও প্রকট হয় দিনকে দিন। মুখে মুখে চলা বিষবাক্যগুলো হাতাহাতিতে রূপ নেয়। অশান্তি চরমে উঠলে একদিন নিজ ছেলেরাই সংসার ত্যাগের সিদ্ধান্ত জানায় জায়েদাকে।

হরমুজ বলে, সৎ পুলার বাড়ি যাও অহন। দায় একলা আমগোর নি?

জায়েদা বেগম কিন্তু ঘোর আপত্তি জানায় তাতে। এতকাল ধরে গড়া সংসার ছাড়তে ইচ্ছে করে না সহসা । কিন্তু তবুও শেষমেশ ছেলেদের সিদ্ধান্তই মানতে হয় তাকে। যে সংসারে সবাই তার বিপক্ষে সেখানে একাকী টিকে থাকার সম্ভাবনা কতটুকু? তাই সংসার ছাড়তে হবে তাকে। কিন্তু সহসা জহুরের সামনে দাঁড়ানোর সাহস পায় না জায়েদা। সুখের দিনে সৎ বলে জহুরের প্রতি তার অন্যায় যৎসামান্য নয়। সত্যি কিন্তু লুকানো থাকে না বেশিদিন। একদিন উত্তরপাড়ার হারুর মাধ্যমেই সব জানতে পারে জহুর।

হারু বলে, মাও তোমার ভালা নাই গো জহুর, পুলারা রাখব না কয়।

এরপর একদিন আবার জহুরকে নিজ বাড়িতে দেখা যায়। জহুর এসে মা’র সামনে দাঁড়ালে অশ্রু বিসর্জন দেয় জায়েদা। তারপর বলে, আমাক ক্ষেমা দিস বাপ।

তারপর জহুরের হাত ধরেই কালীতলা এসে উঠে জায়েদা বেগম। আজকাল নিজেকে খুব সুখী মনে হয় জহুরের। সারাদিন পরিশ্রম করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলে মায়ের চোখে সমুদ্র দেখে সে। একটা নির্ঝঞ্ঝাট সমুদ্র। সমুদ্রকে কেবলই নিজের মনে হয় তার।

জহুরের দিনগুলো এমন হতে পারত সবসময় কিন্তু হয় নি। মাস-দুই পর একদিন খবর আসে শহরে রিকশা চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েছে জহুর। লালখানের হাসেম আলী খবর পৌঁছালে আহাজারি করে সবাই।

—আয় গো খোদা, এ কী সব্বনাশ অইল আইজ!

জোনাব আলীর হস্তক্ষেপে শহরে চিকিৎসা হয় জহুরের। একদিন পুরোপুরি সুস্থও হয় সে, কিন্তু পা দুটো হারাতে হয় তাকে। ফলে জহুরের সংসারে দুর্দিন আসে আবার। পেট কি আর অভাব বোঝে। হয়তো পেট বাঁচাতেই একদিন জায়েদা বেগম দমদমা বাজারের এক মাথায় চট বিছিয়ে ছেলেকে বসিয়ে দেয়। জহুর ভিক্ষা করে। ভিক্ষার টাকা কতইবা আর! ঘরে অভাব কমে না ওদের। কিন্তু এতদিনে উপলব্ধি চলে আসে। সম্পর্ক আত্মায় হয়। কী এক টানে পড়ে জহুরকে আর ছাড়তে পারে না জায়েদা। নিজের ছেলেরা নিতে এলে ফিরে যেতে অসম্মতি জানায় সে।

এরপর একদিন হারু দমদমা বাজারে নিজের বিয়ের সওদা করতে গেলে বন্ধুকে দেখে ভিক্ষা করতে। তখনও সত্যি প্রকাশ হয় নি ওর কাছে। সামনে পা বাড়ালে দেখে বাজারের অন্য মাথায় জায়েদা দাঁড়িয়ে। গায়ের শাড়িটাকে বুকেপিঠে গুঁজে আঁচলটা সামনে ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। কারো সাথে কথা বলে না। ওর চোখ হতে টপটপ জল ঝরে কেবল।

আবু রাশেদ পলাশ

আবু রাশেদ পলাশ

জন্ম ১৮ নভেম্বর ১৯৯২, সজবরখিলা, শেরপুর। শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত বই :
চড়ুইপাখি ও জ্যৈষ্ঠকথন [গল্পগ্রন্থ, ২০১৬, বাংলাদেশ রাইটার্স গিল্ড]

ই-মেইল : aburashed.ju492@gmail.com
আবু রাশেদ পলাশ

Latest posts by আবু রাশেদ পলাশ (see all)