হোম গদ্য গল্প সংগ্রাম

সংগ্রাম

সংগ্রাম
168
0

১.
বিভূতির হাত ধরে আরণ্যকের জ্যোৎস্না নেমেছে।

শহরের শেষপ্রান্তে বড় ছাতিয়ান গাছের তলা দিয়ে একটু সামনে এগুলে নদী বরাবর নেমে যাওয়া ঢাল। তার মাথায় একটা মাত্র খেয়া পানির উপর চাঁদের ছায়াটাকে দু’ভাগ করে ঝিমুচ্ছে। বৈঠাটা আধেক জলে ডোবানো, তার একমাথা ধরে আছে কেউ, কেউ মানে নিশ্চয় মাঝি। এই রাত সাড়ে ন’টায় শহরের বাইরে যাবে যে নবীন ইঞ্জিনিয়ার তার জন্যেই কি এমন মরণতর অপেক্ষা?

শহরের বাসটা যেখানে তাকে নামিয়ে গিয়েছিল খেয়াঘাট সেখান থেকে বেশ কিছুটা দূরে। এটুকু পথ হেঁটে আসা ছাড়া উপায় ছিল না মারুফের। ছাতিয়ান ফুলের তীব্র গন্ধ গায়ে মেখে মারুফ উঠে পড়ে খেয়ায়। নিস্তরঙ্গ পানির মাঝে সহসা খেয়াটা দুলে উঠে চাঁদের ছায়াটা ছত্রখান করে দিলে মাঝি চাদরের তলা থেকে মুখ তুলে খেয়া ছাড়বার অনুমতি চায়।

এমন নদী কোনোদিন দেখে নি মারুফ।


দুইজন সাইট ইঞ্জিনিয়ার খুন হয়েছেন তিন মাসের ব্যবধানে। খুনের ধরন একই রকম, মাথার পেছনে গভীর ক্ষত, আর সারা শরীরে খামচানোর চিহ্ন।


কী নীরব মুগ্ধতায় চাঁদটাকে গিলে খাচ্ছে সমগ্র নদী! দুই দিকে তাকালে দিগন্তে ক্রমশ মিশে যাওয়া ঘন বাঁশঝাড়, পানিতে ঢেলে দেওয়া টার্কিশ ব্লু সাথে একটু কাজলের কালো। জোনাকিরা কিছুটা সাবধানী, মাঝখানে ওদের আনাগোনা কম। দুই তীরে গ্যালাক্সি নামিয়ে জেঁকে বসে আছে তারা। মারুফ ছয়মাস আগেও রাইন দেখে এসেছে। লেক কনস্ট্যান্স থেকে ট্রেনে স্টুটগার্ড যাওয়ার পথে রাইন দেখা যায় অনেকক্ষণ। রাইন কি এমন? ভালো করে দেখেছে কি?

শেষ কার্তিকের আকাশে মেঘ নেই। একটু উপরে তাকালে আকাশটা আরো যেন খানিকটা নিচে নেমে আসে। মাথাটা উপরে রেখেই বা হাতটা প্যান্টের পকেটে চালিয়ে দেয়। অনেকক্ষণ সিগারেট খাওয়া হয় নি।

কাঠিতে আগুন লাগাতে লাগাতে ভাবে খামোখাই আসার সময় এত ঝগড়া-ঝাটি! চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে নেমেই একটা ফোন দিতে হবে, নিদেনপক্ষে একবার এমন ভরা জ্যোৎস্না গায়ে মেখে স্যরি বলে ফেলা যায়। এমন জ্যোৎস্নায় খুনিকেও ভালো লাগে!

খেয়াটা তীরের মাটিতে ধাক্কা লাগলে মারুফ একটু বেসামাল হয়ে পড়ছিল প্রায়। সামলে নিতে নিতে মারুফ দেখতে পেল ঘাটের উপরে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। নৌকাটা থামতেই সে কাছাকাছি আসে এবং বলে, আসসালামু আলাইকুম স্যার, আমি, মন্টু। মন্টু শেখ। এই ব্রিজ প্রজেক্টের ফোরম্যান।

—আচ্ছা। বুঝেছি, আপনার কথাই স্যার আমাকে বলেছিল। একটু আগেও কথা হয়েছে। একটু রাত হয়ে গেল বলে উনি আর আসেন নি।

—জি সার। আমার সাথেও কথা হয়েছে। উনি বললেন বলেই না আমি আপনার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।

মন্টুর বাড়ি এখানেই। বড় আরামের চাকরি করে সে, এই ব্রিজ প্রজেক্টটা যেটা তৃতীয়বারের মতো কাজটা বন্ধ হয়ে আছে সেটার ফোরম্যান। দিনে চা খায় রাতে চোলাই। চাকরি বলতে দিনে একবার এসে লেবারদের সাথে হম্বি তম্বি আর ঊর্ধ্বতনকে কিছুটা মসৃণ তেল ক্ষেপণ। ব্যাস। তারপর আবার তিনমাস কাজ বন্ধ।

মন্টু চতুর ছাগলের মতো। সব খায়, কিন্তু রয়ে সয়ে। ঊর্ধ্বতনদের আগা পাঁচ তলা হাড়ির খবর সব সে জানে। সে সূত্রে গোপনীয়তা রক্ষার তাগিদে ঊর্ধ্বতনরাও ওকে বিস্তর ছাড় দেয়। সড়ক জনপথে চাকরি করছে ১৮ বছর। প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে ইতোমধ্যে। মারুফ কনিষ্ঠ ইঞ্জিনিয়ার। কিছুদিন হলো জার্মানি থেকে ফিরেছে। ট্রেনিং ব্যাপার স্যাপার। রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে পাঠিয়েছিল, ময়মনসিংহ ফোর লেন নিয়ে বিস্তর গবেষণার কাজে। কিন্তু বিড়ম্বনা পিছু ছাড়ে না। ফরিদপুরের এ প্রজেক্টটাএকটু ব্যতিক্রম। গত একবছরে দুইবার কাজটা বন্ধ হয়েছে এবং দুইবার ইঞ্জিনিয়ার চেঞ্জ হয়েছে, চেঞ্জ বলতে আসলে অমন চেঞ্জ না। অকাল মৃত্যু। দুইটা মৃত্যুই একইরকম। খুন বলা যেতে পারে।

ঘটনাটা রোডস অ্যান্ড হাইওয়েতে বেশ শোরগোল ফেলেছে। কোনোরকম ক্লু পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকার স্পেশাল টিম তদন্তে নেমেছিল। নেমেছিল বলতে কি এখনো তদন্তে আছে। কিন্তু স্থানীয় রাজনীতি টেন্ডার ফেন্ডার দ্বন্দ্ব মাথায় রেখে এগোচ্ছিল, দেশে যা হয় আর কি! কিন্তু ঘটনা সেটা না।

তদন্তের পাগলা ঘোড়া এখন একটা খোলা প্রান্তরে থিতু হয়েছে। যেখানে মনে রাখার মতো কোনো ল্যান্ডস্কেপ নেই, কোনো বিশেষ চিহ্নও নেই। তদন্ত চলছে।

এই চলমান তদন্ত মাথায় নিয়ে মারুফের আগমন। এই ঘটনাবহুল প্রজেক্টে আর কেউ আসতে চাইছিল না। মারুফও না। আসার সময় এ নিয়ে ফাইল ছোড়াছুড়ি কম হয় নি। ঢাকায় অত আয়োজন ছেড়ে কে আসতে চায় এই প্রান্তিক প্রান্তরে? এমনকি মিলিও খুব পাকিয়েছে।

নৌকা থেকে নেমে খাড়া নদীর তীর ধরে উপরে উঠতে একটু হাফ ধরে যায় মারুফের। একটা ঘন জট পাকানো অন্ধকারের নিচে এসে থামে তারা। এটা একটা তরুণ বট গাছ, এই শতকেই জন্ম। মারুফ উচ্চতায় মাঝারি, তবে সুপুরুষ নয়। মন্টু সে তুলনায় লম্বা বটে, কিন্তু একটা তালগাছের ক্যারেক্টার ওর ঋজুতে ভর করে আছে। তালগাছটা কিছুটা কুজ হয়ে দু হাত থেকে ব্যাগ দুটো নামাতে নামাতে বলে, জানেন স্যার, এইরকম জ্যোৎস্নায় দুইধরনের মানুষ রাত্রির বেলা বাইরে বাইরে ঘোরে।

—না, জানি না। আপনি জানেন?

—জানি বলেই তো বললাম। এক ধরনের মানুষ যারা স্ত্রী লোকে অসুখী…

—আরেক ধরনের মানুষটা কে?

মন্টু বলে, স্যার, একটা সিগারেট ধরাই?

বলেই সে আর অনুমতির অপেক্ষা করে না। মুখের খুব কাছে দু হাত দিয়ে ঢেকে পাকা লোকের মতো সিগারেট ধরায়। কাঠিতে আগুন লাগলে সহসা কিছুটা মুহূর্ত মন্টু শেখের মুখ আলোয় ঝলসে ওঠে। মারুফ সে আলোয় দেখে নেয় মন্টুর ধুর্ত দুটো চোখের নিচে একটা কাটা দাগ।

মারুফ বলে, আমরা এখন কিভাবে যাব, মন্টু ভাই।

—একটা ভটভটি আছে। আবার হেঁটেও যেতে পারি। ঐ যে আলোটা দেখছেন, ঐটাই অস্থায়ী শেড।

ঘন ও উঁচু কিছু গাছ গাছালির ওপারে একটা আলো দেখা যায়। একটা উঁচু খাম্বার সাথে নিঃসঙ্গ একটা লাইট ঝুলছে। শহরের বেশ বাইরে এমন একটা জায়গায় নিজের অবস্থান সম্পর্কে ভাবনা জাগলে মারুফের খুব ভালো লাগতে শুরু করে। বেশ বটে। একটা ফেলুদা ফেলুদা গন্ধ নাকে আসছে।

গলা খাঁকারি দিয়ে মন্টু বলে ওঠে, আরেক ধরনের মানুষ হলো স্যার যারা কিনা একটু মহামানব টাইপের, তারা! মহামানবেরা যে শুধু ভালোই হবেন তা নয়, স্যার। বড় বড় খারাপ মানুষেরাও কিন্তু মহামানব।

এমন রাতে মন্টুর কাছে এসব নিয়ে আর কথা বাড়াতে চায় নি বলেই বর্তমান যুগের মহামানবের সংজ্ঞাটা জিজ্ঞেস করতে করতে শেষ পর্যন্ত করল না মারুফ।

২.
এ নদীর নাম নবগঙ্গা। নামকরণের ইতিহাস এখনও জানা যায় নি। নবগঙ্গায় জোয়ার-ভাটা হয়। শহর থেকে আসলে গোটা পাঁচেক গ্রাম, ছোট ছোট বাজার তারপর নদীটা। নদী এপারে ইছামতী বিল। বিখ্যাত বিল, কিনারে দাঁড়ালে এখনও ধানের আধো পাকা রংটা দোলা দেয়, এই শতাব্দীতে বাঙলার গ্রামে শহরের দিগন্তে কেবলই মোবাইলের লাল শাদা টাওয়ার। দেখতে খারাপ হলেও বিষয়টা ভালো।

কালিয়া এ জেলারই আরেকটা থানা। থানা শহরের সাথে জেলা শহরের সংযোগের প্রয়োজনীয়তাই এই সেতু! কাজ দুইবারের মতো বন্ধ রয়েছে। এইখানে দুইজন সাইট ইঞ্জিনিয়ার খুন হয়েছেন তিন মাসের ব্যবধানে। খুনের ধরন একই রকম, মাথার পেছনে গভীর ক্ষত, আর সারা শরীরে খামচানোর চিহ্ন।

দুইদিন হলো মারুফের আগমন। ব্যাগে করে আর্নেস্ট হেমিঙওয়ে আর বিভূতি এনেছে, দিনরাত সেইগুলোই ভরসা। সন্ধ্যার আগে আগে নৌকা পার হয়ে ওপারের বাজারে যায়, একটু ঘুরে আসে। ছোট থানা শহর লাগোয়া এই গ্রামের বাজারখানি অতীব ক্ষুদ্র। মাছ ও তরকারি ছাড়াও এই বাজারে আরেকটি বিচিত্র দোকান আছে যেটা মাইকের। মুসলমানি ও বিয়ে শাদি সংক্রান্ত কাজে ভাড়ায় যায়। এই মাইকের দোকানে যে লোকটা বসে তার নাম গৌতম, বয়স চল্লিশের কোটায়! সে খুব প্র্যাকটিসিং হিন্দু। নিয়মিত পূজা অর্চনায় তার সময় যায়। এই দোকানে গৌতম মারুফের জন্য একটা অতিরিক্ত চৌকির ব্যবস্থা করেছে, মারুফ সেখানেই বসে, গৌতমের কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মহাভারত শোনে। অর্জুন ভক্ত গৌতম যখন পুন পুন দুর্যোধনের কুটিল কর্মে আহত হন, অভিমান করেন তখন তার চোখের কোনা ভিজে আসে। মারুফ কী বলে সান্ত্বনা দেবে ভেবে পায় না। এইরকম পরিস্থিতিতে মারুফ সিগারেট ধরায় আর গৌতম ধূপদানি থেকে দেয়াশলাই এগিয়ে দেয়।


খেয়াঘাটের একটা ক্লান্ত কুকুরের প্রলম্বিত ডাক যেন সাঁতরে সাঁতরে নিকটে আসতে লাগে। এর মধ্যেই অতিপ্রাকৃতিক কোনো একটা শব্দ মারুফের কানে ঢুকে পড়ে। শব্দটা ক্রমশ সামনে এগোয়!


—আচ্ছা দাদা, আপনি কি খুনের বিষয়ে কিছু জানেন?

মারুফ একটু আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু গৌতম এখনো মহাভারতে আটকে আছে। মারুফের প্রশ্নটা ঠিক মতো শোনে নি। কিন্তু বুঝতে পারে মারুফ কিছু একটা বলেছে। জিজ্ঞেস করে, ইঞ্জিনিয়ার ভাই, কিছু বললেন?

গৌতম মারুফকে ইঞ্জিনিয়ার সাব বলতে চাইছিল। কিন্তু মারুফই সাব টাব বলতে দেয় নি। সেই থেকে ভাই।

—না, আমি বলছিলাম খুনের বিষয়ে আপনি কিছু জানেন?

গৌতম কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। বলে, আমি ওসব জানি না। কিচ্ছু জানি না।

—ও আচ্ছা, আজ উঠি। মিজানুরের শেষ খেয়াটা ধরে চলে যাই। না পেলে আবার ডাকাডাকি।

মিজানুর বধির মাঝি। কানে শোনে না। কিন্তু বোঝে। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, দেখতে কালো। হাতের পেশি দেখলে মনে হয় ত্রিশ বছরের যুবক। ছোট বেলা থেকেই নবগঙ্গার বুকের উপর দিয়ে এপার ওপার করেছে। ওর বাবাও ছিল মাঝি। খুব নামকরা মাঝি, নাম ইসহাক। নৌকা বাইচে ইসহাকের নৌকা এসেছে শুনলে সেইখানে আর কেউ দাড় ধরার সাহসই নাকি থাকত না। গাজিরহাটের নৌকা বাইচে তার নৌকার গলুই কখনো পেছনে পড়ে নি।

মিজানুর এইঘাটে নৌকা বায় ত্রিশ বছরেরও বেশি। আর অনেকেই ছিল। এখন মাঝির সংখ্যা অনেক কম, যারা আছে তারা শ্যালো লাগিয়ে নিয়েছে। শুধু মিজানুরই আলাদা, এখনো হাতে বাওয়া দাড় দিয়েই নবগঙ্গা শাসন করে চলেছে সে, নিঃশব্দে।

মারুফের বেশ লাগে মিজানুরকে। কেমন যেন একাগ্র শিল্পী, এঞ্জেলোর খোদাই পেশির মতো। কথা বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সে তা পারে না। মিজানুরকে এই দুই সপ্তাহে মারুফ কখনো হাসতে দেখে নি বা ইশারয় বা অন্য কোনোভাবে তার সাথে কারো মতো বিনিময় বা ভাব বিনিময়—কিছুই না। গৌতমের দোকান থেকে শেষ সিগারেট শেষ করে ঘাট ধরে মিজানুরের নৌকায় উঠলে মিজানুর নিঃশব্দে নৌকা ছেড়ে দেয়। কখনো মারুফের দিকে তাকায় না। কিন্তু প্রথম দিন চাঁদনি রাতে মিজানুরের খেয়ায় উঠলে সে খেয়া ছাড়ার অনুমতি চেয়েছিল, মারুফের দিকে তাকিয়ে। মারুফ মাথা ঝাঁকিয়ে অনুমতি দিয়েছিল।

৩.
জায়গাটা ভালো লেগেছে মারুফের। বেশ ভালো। নবগঙ্গার কালো বাউশ খুব সুস্বাদু মাছ। প্রায়ই খাচ্ছে। সুশান্ত ছেলেটা দারুণ রাঁধে। রান্না সবসময় ছেলেদের কাজ, মেয়েরা এই দেশে এটা নিজেদের করে নিয়েছে। আজ রাতে ‘ফেরাওয়েল অ্যান্ড আর্মস’ শেষ হতে পারে, প্রায়ই শেষ অনুচ্ছদের কাছাকাছি।

মারুফ খুন দুটো নিয়ে চিন্তা করে না তা নয়। চিন্তা সে করে। তার ঘরের ভেতরে একটা পূর্ব প্রস্তুতি সে নিয়ে রেখেছে। মানে হঠাৎ ঘাতক যদি ঢুকে পড়ে তাহলে কিভাবে সামলাবে—এই আর কি! এর মধ্যে মন্টু শেখ খুব ভালোভাবে তালিম দিয়ে গেছে। পাইলিং মেশিন অপারেটর পরশু আসছে, আশা করা যাচ্ছে তার পরদিন কাজ শুরু করা যাবে। মারুফ ভেবেছে এই দু তিন দিনে সে একটু আলাদাভাবে বিষয়টা ভেবে দেখবে। মানে খুনের বিষয়টা! জেলা শহরেও যাবার ইচ্ছে আছে। সুরতহাল এবং ময়না তদন্ত রিপোর্টটা সে একবার দেখে নিতে চায়। যদিও কাজটা সিভিল সার্জনের অফিস সহজে হতে দেবে না—তবুও।

আজ আর পড়া তে মন নেই। মফস্বলের বিদ্যুতের আলোয় কি তেজ কম? আলো হয় না কেন? এইখানে রাত হলে শিয়াল ডাকে। শিয়াল খুব চালাক কিন্তু এরা এত সমস্বরে বোকার মতো ডাকে কেন—এটাই ভাবছিল মারুফ। ভাবতে ভাবতে মনে হলো কাল সকাল ৬.২০ এর বাসে সে শহরে যাবে। এটা চূড়ান্ত।

ময়না তদন্ত রিপোর্ট থানা থেকে আনিয়েছে। একটা ফটোকপি। সেটাও অনেক ঝক্কি ঝামেলা করে। কলেজ বন্ধু শ্যামল কুষ্টিয়ার পুলিশ অফিসার। তাকে বলে-কয়ে এই থানার আইও-কে দিয়ে কাজটা হলো। এবার অবসরে গোয়েন্দাগিরি। কিন্তু সমস্যা হলো প্রতিবেদনটি এতটাই শাদামাটা যে সেখানে কোনো ক্লু নেই। মাথার পেছনে গভীর ক্ষত। সাইট শেল্টারের জানালা দিয়ে তাকালে নদীর বুকে খাড়া পিলারগুলো ভৌতিক লাগে। ভুতের ঠ্যাঙের মতো।

এখন নবগঙ্গায় জোয়ার।

দূরে হারিকেনের আলো নিয়ে ছিপি নৌকাগুলো সাঁতরে বেড়াচ্ছে। ঢেউয়ের তালে কখনো কখনো নৌকাগুলো অদৃশ্য হচ্ছে আবার জেগে উঠছে। আকাশে চাঁদ নেই, জাঁকাল অন্ধকারেও নবগঙ্গার বুকে যেন একটা ক্ষীণ আলোরচ্ছটা লেপটে আছে। মারুফ তাকিয়ে থাকে আর ভাবে।

মিলিকে কি একটা ফোন দেবে? ফোনের দিকে তাকায়। এখন তো অনেক রাত!

খেয়াঘাটের একটা ক্লান্ত কুকুরের প্রলম্বিত ডাক যেন সাঁতরে সাঁতরে নিকটে আসতে লাগে। এর মধ্যেই অতিপ্রাকৃতিক কোনো একটা শব্দ মারুফের কানে ঢুকে পড়ে। শব্দটা ক্রমশ সামনে এগোয়!

মারুফ প্রতীক্ষিত প্রস্তুতি গ্রহণ করে, মোটা সেগুনের লাঠিটা বিছানার পাশ থেকে তুলে এনে দরজার পাশে দাঁড়ায়। কোথাও পেঁচা ডাকছিল, থেমে থেমে—কিন্তু সেটাও এখন আর নেই! এত রাতে ঝিঁঝিঁ পোকারাও ক্লান্ত!

কিন্তু শব্দটা কি থেমে গেল!

হ্যাঁ, তাই তো। শব্দটা এখন আর নেই! মারুফ পুনশ্চ দরজার লক ও ছিটকিনি পরীক্ষা করে শুয়ে পড়ল। কৌতূহল মাথায় নিয়ে ঘুমানো একটু কঠিন, তবুও।

শেষ রাতে বৃষ্টি হয়েছিল, সকাল বেলায় শেল্টারের পাশে স্তূপ করে রাখা বালি আর পাথরের কুচির উপর একটা বলিষ্ঠ পায়ের ছাপ জ্বলজ্বল করে। বেশ সুস্পষ্ট এবং তুলনামূলক বেশ বড় পায়ের পাতা। মারুফ ব্রাশ করতে করতে পায়ের ছাপটি খুব কাছ থেকে দেখে নিতে লাগে। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো পায়ের ছাপের সাথে আরেকটি লম্বাটে ঝিনুকের আকৃতির চিহ্ন পাশে পাশে দেখা যায়, মারুফ ধারণা করে এটা ঘাতকের হাতের অস্ত্র বর্ষা বা অন্য কিছু, যেটাতে ভর দিয়ে সে হাঁটছিল। আর ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যায় চিহ্নটা বা পায়ের ছাপের সমান্তরাল। মানে অস্ত্র তার বা হাতে ছিল।

মারুফ একমাস হলো এইখানে এসেছে। বেশ পরিচিত মুখ এখন সে।

গ্রামের মসজিদে জুম্মার নামাজে বা ওপারে গৌতমের দোকানে—সবখানেই তাকে চেনে মোটামুটি! দিন বেশ ভালোই চলে যাচ্ছে। ব্রিজের কাজ চলছে। স্প্যান লোডিং এর কাজ আর দুই সপ্তাহের মধ্যে শুরু করা যাবে হয়তো।

কিন্তু মারুফের মাথার ভেতর দিন শেষে অঢেল সময় মাথা ঘামানোর।

৪ .
ভাটার পানি নেমে গেছে অনেকদূর। আজ কি পূর্ণিমা?


ছমছম করা আবহটা যেন ঘিরে ধরে মারুফকে। এই নির্জন নবগঙ্গায় মিজানুরকে অপিরিচিত লাগে!


মারুফ খেয়া ঘাটে নেমে আসে। বুধবার, লোক একেবারেই কম। হাটবার ছিল মঙ্গলবার। সেইজন্য হয়তো লোকের অভাব। খেয়াঘাটে শুধুই মিজানুর। বিপরীতে চাঁদের আলোয় ভাটায় নেমে যাওয়া পানিহীন ভিজে বালির ভেতর চিকমিক করে উঠে আলো। ছবির মতো খেয়ার উপর বসে আছে মিজানুর। নিশ্চুপ। চরাচরে জীবনের প্রতিবিম্ব যেন সে একাই। মারুফ নেমে আসে খেয়ার দিকে, কিন্তু একটা পরিচিত চিহ্ন তার ভাবনার দিগন্তে আলোড়ন তোলে। একটা মানুষের হেঁটে যাওয়া পায়ের ছাপ, আর সেই পরিচিত ঝিনুকের আকৃতির আদলে খোদাই চিহ্নটি বা পায়ের সমান্তরালে চলেছে। অজান্তেই পায়ের ছাপ ফলো করে মারুফ যেটা কিনা শেষ হয় খেয়ার কাছেই, যেখানে মিজানুর বসে আছে অপেক্ষায়।

তাহলে?

ঘটনাক্রম কিছুতেই মেলাতে পারে না মারুফ! তাহলে ঘাতক কি সেই?

ছমছম করা আবহটা যেন ঘিরে ধরে মারুফকে। এই নির্জন নবগঙ্গায় মিজানুরকে অপিরিচিত লাগে!

মারুফ বেশি কিছু বুঝতে দেয় না। সাহস নিয়ে খেয়ায় চেপে বসে। বৈঠা দিয়ে বালিতে সজোরে ঠেলা দিয়ে খেয়াটা পানিতে ভাসায়। বৈঠার আঘাতে ভিজে বালির শরীর কেটে জন্ম নেয়া পরিচিত চিহ্নটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মারুফ ভাবনার অতলে তলিয়ে যেতে থাকে।

গভীর রাত! পরিষ্কার আকাশে তারাগুলো স্থির জোনাকির মতো! মারুফ হাতের লাঠিটা বগলে গুজে দরজায় সিটকিনি এঁটে বেরিয়ে পড়ে। উদ্দেশ্য মিজানুরের বাড়ি। রাত দুইটার কম নয়। দুটো বাঁক পেরোলেই একটা প্রকাণ্ড বাঁশ ঝাড় আগলে রেখেছে পথ, অন্ধকার জড়াজড়ি মোড়টা পেরোলেই একটা ছোট্ট উঠোন-সমেত দোচালা টিনের ঘর। মিজানুরের মুখোমুখি হবে সে! দেখা যাক!

কিছুক্ষণ দরজায় শব্দ করলে মিজানুরই দরজা খোলে। তারপর বিস্ময়ে বিমূঢ় হতে হতে দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। মারুফ যা বোঝার বুঝে ফেলে। ছিন্ন কাঁথা যত্রতত্র ভাঁজে দরিদ্রতা ধরে রেখেছে। ঘরে শুধু একটা কলস, একটা গ্লাস আর কিছু বাসন। ঘাতক বৈঠাটা হেলান দেওয়া কাঠের দেয়ালে।

মারুফ বসে পড়ে বিছানায় আর মিজানুর মেঝেতে জড়সড়!

কিছুক্ষণ নীরবতা, তারপর ঝড়ে ভেঙে পড়া শিকড় সমেত শিমুলগাছের মতো মিজানুর ভূপাতিত হয় মারুফের পায়ের কাছে, হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে পা। গোঙ্গাতে থাকে। কিছু বলতে পারে না!

দূরে শেয়ালের চিৎকার আর ঘুম ঘোর অপিরিচিত কিছু পাখির ডাকের বাইরে মিজানুরের গোঙানি অনেক অর্থবহন করে। কিন্তু মিজানুর কেন? কেন?

মিজানুরের বাড়ি থেকে মারুফ যখন বের হয় তখন পুবের আকাশে আলোর আনাগোনা। বাকহীন মিজানুরের কাছ থেকে সভ্যতার ভাঙনের অনেক বয়ান নেওয়া হলো। যেন স্বরহীন মিজানুরের কথাগুলো চাবুক হয়ে ফিরে আসছে মুহূর্তে। দূরে নদীর মাঝে দাঁড়ানো নিঃসঙ্গ পিলারগুলো দম্ভ দেখায় যেন!

মিজানুর ভেবেছিল এখানেই শেষ হবে ব্রিজের কাজ!

তার তিরিশ বছরের দাঁড় বাওয়া জীবনের সমাপ্তি হচ্ছে না সহসায়। তার একমাত্র জীবিকা এই খেয়া, সেই খেয়া যদি না চলে নবগঙ্গায় তবে এই উদর নিয়ে কোথায় যাবে সে? কারে পারাপার করবে এই কূল থেকে ওই কূল?

আশ্বিনের সকালে হিম ঠান্ডা, তবুও ঘামে মারুফ।

এ এক অন্য অভিজ্ঞতা। বিস্ফারিত আগুন-চোখে মিজানুর তাকিয়ে আছে, আর বারে বারে পেটে হাত বুলিয়ে “কী খাবে তাহলে?” এই প্রশ্নটা যখন সে ছুড়ে দিচ্ছিল মারুফের দিকে তখন পৃথিবী আবর্তিত হচ্ছে ঠিক নিয়মে, তখন যুদ্ধে যাওয়ার আগে সৈনিক শেষ চুমু খাচ্ছে প্রিয়তমার কপালে—হয়তো পৃথিবীর অন্য গোলার্ধে! হয়তো কোথাও আরো অনেক কিছুই ঘটে চলেছে নির্বিকার! কিন্তু বাকহীন মিজানুরের সে-সব নিয়ে বেশি ভাববার সময় কই? আপাতত নবগঙ্গায় তার খেয়া জীবনের অপমৃত্যু সে হতে দিচ্ছে না।

ভোর সকালেই মন্টু দরজায় হাজির।

বড় স্যার জেলা সদরে ডেকেছেন। তার কাছে রিপোর্ট আছে মারুফ ব্রিজের কাজের চেয়ে গোয়েন্দাগিরিতে মনোযোগ বেশি। যা ভাবা তাই, বদলীর কাগজ। মারুফ দুইদিনের বেশি আর থাকে নি। থানার আইও-কে কয়েকবার ফোন দিতে যেয়ে দেয় নি। দ্বন্দ্বে ভুগেছে।

ঢাকার গাড়িতে উঠে শরীরটা এলিয়ে দেয়। পকেট থেকে ফোনটা বের করে।

—হ্যালো, হ্যালো… ইন্সপেক্টর?

… … …

এর মধ্যে বাস কখন বিশ্বরোডে উঠে পড়েছে টেরই পায় নি মারুফ!

দু পাশের দ্রুত সরে যাওয়া ল্যান্ডস্কেপের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না।

মারুফ চোখ নামিয়ে নেয়!

নিচের দিকে!

মির্জা মুজাহিদ

মির্জা মুজাহিদ

জন্ম ২৫ জানুয়ারি, নড়াইল। চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, স্পেলবাউন্ড কমিউনিকেশন লিমিটেড।

প্রকাশিত বই : বিপ্রতীপ [গল্প], একুশে বইমেলা ২০১৬, অনুপ্রাণন প্রকাশন।

ই-মেইল : me@mirzamuzahid.net
মির্জা মুজাহিদ

Latest posts by মির্জা মুজাহিদ (see all)