হোম গদ্য গল্প শুয়োর ও শুয়োপোকার গল্প

শুয়োর ও শুয়োপোকার গল্প

শুয়োর ও শুয়োপোকার গল্প
290
0

মনোটোনাস পুরনো শহরে


তীব্র শীতের ভেতর সন্ধ্যাকাল ভিজে জবুথবু। সেরকম সন্ধ্যার আড়ষ্ট আবহাওয়ায় যুবকটির সঙ্গে দেখা হলে তখন আমাদের প্রতীক্ষার দৈর্ঘ্য আর লম্বা হতে পারে না। প্রতীক্ষা অবসিত হয়, বিভ্রম আসে। রেলগেইটের ডানপাশে সেলিমের ফুচকা-বিতানে বুকে দুহাত চেপে বসে থাকা লোকটি আমাদের দ্বিধা ও সংকোচের ঘেরাটোপে আটকে দেয়। জানা তথ্য ও পূর্বানুমানের বিপরীতে একটা অন্য লোককে ফুচকা দোকানের পুরনো কেঠো বেঞ্চে অভ্যাসবসে গুটিসুটি মেরে বসে থাকতে দেখে আমাদের হয়তো ঈষৎ হতাশা পেয়ে বসে। মনে হয়, রেজাউল করিম মন্টুর সঙ্গে আমাদের আর দেখা হলো না। কিন্তু ফুচকাঅলাকে জিজ্ঞেস করে আমরা জানতে পারি, এই-ই সে—আমাদের উদ্দিষ্ট যুবক। ফুচকাঅলার কথায় এরই মধ্যে অতিক্রান্ত দু যুগেরও বেশি সময় আমাদের মনে পড়ে। এই ন্যুব্জ প্রৌঢ়ের সঙ্গে তখন, ছাব্বিশ বছর আগে শহরের পাশ ধরে নরম পায়ে হেঁটে যাওয়া সেই ছেলেটিকে মেলাতে আমাদের কষ্ট হয়। সেই তুমুল তরুণটি কুয়াশায় ঢেকে যাওয়া শীতের শহরে গরমকাপড় পরেও এখন দুহাত বুকে বেঁধে অনবরত কাঁপে। শহরের রাস্তায়, গাছের পাতায় সময় অনিবার্য দাগ রেখে যায়। ছাব্বিশ বছরে যুবক ছেলেটির শরীর থেকে ঝরে গেছে সমস্ত লাবণ্য আর যুবকের পাশ ঘিরে সেঁটে থাকা কোমল মেয়েটিকে হয়তো আর কারো মনেই নেই!


তরুণের জীবনে আরও নারী ছিল। অনেক কবুতর ছিল। আর ছিল কয়েকটা রাজহাঁস। কখনো-সখনো কেউ কেউ তার সঙ্গী হতো, রিকশায়, ঘোড়ার গাড়িতে।


অন্যরা ভুলে যেতে পারে, যুবকটি কখনো তাকে ভোলে না। শালিক পাখির মতো যুবতী চারুনিশি প্রতি রাতে যুবক রেজাউল করিম মন্টুর চোখের পাতায় স্বপ্ন এঁকে দেয়। আর তখন, ঘোরগ্রস্ত মধ্যাহ্ন রাতে কেউ কাউকে চিনতে পারে না। দুজন দুজনের দিকে ভারি আশ্চর্য হয়ে তাকায়। পুরনো দিনের স্মৃতির কাছে যেতে যেতে যেন দেয়ালের এপার থেকে ফিরে আসে। ক্লিশে-কাতর যুবকের নিকটজনেরা তাদের পরিচিতদের কাছে যুবকের রাতে চারুনিশিকে স্বপ্নে দেখে জেগে ‍ওঠে রাতের পর রাত না ঘুমোনোর ব্যাপারে এ বলে হাহাকার করে যে—‘আহা রে! কী হবে ছেলেটার? রাজপুত্রের মতো ছেলেটার কী হয়ে গেল! একটুও ঘুমাতে পারে না। খালি মেয়েটারে স্বপ্নে দেখে!’ তখন রেজাউল করিম মন্টুর এমন হয়—পরের দিন সে ভুলে যায়, তার গতরাত নির্ঘুম ছিল। আর দুঃসহ দুঃস্বপ্নের রাত শেষে ভোর হলে আরেকটি নির্ঘুম রাতের অপেক্ষায় যুবকটির জীবন এলোমেলো হয়ে যায়। পরিস্থিতির চাপে নিকটজনেরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। নিষ্ফল ডাক্তারি চিকিৎসায় হতাশায় ডুবে যাওয়ার দিনগুলোর কোনো এক সময়ে ছোট বনগ্রামের আবদুল গফুর কবিরাজের কথা তারা জানতে পারে। রেজাউল করিম মন্টুর শুভাকাঙ্ক্ষীরা যদিও কবিরাজে বিশ্বাসী নয়, তবুও ফুরিয়ে আসা তেলের প্রদীপের মতো নিভু নিভু প্রত্যাশা নিয়ে তারা একদিন কবিরাজ আবদুল গফুরের ঝাড়ফুঁক দেওয়া রুমাল আর বহুমূল্য বনস্পতির তেল নিয়ে আসে। রুমালটি রেখে দেওয়া হয় যুবকের বিছানার নিচে বালিশ বরাবর। বনস্পতির তেল মোমের আগুনে হালকা গরম করে ঘষে দেওয়া হয় তার পায়ের পাতায়। কিন্তু কবিরাজের তেল আর রুমালের কেরামতিও ছেলেটিকে দুঃস্বপ্ন থেকে রক্ষা করতে পারে না। ছাব্বিশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া অসম্ভব তরুণীটি ছেলেটির চোখের পাতায় এসে বসতেই থাকে। আর দুজন অচেনা মানুষ যেভাবে পরস্পরের দিকে তাকায় সেরকম দৃষ্টির জড়তা নিয়ে মেয়েটি প্রতি মধ্যরাতে ক্রমে ন্যুব্জ হতে থাকা ছেলেটির মধ্যে হয়তো সেই তুমুল তরুণকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়—যে ছিল তার বাসনার মতো, নিজেকে যার একতমা ভাবতো।

রেলগেইটের উল্টোদিকে সেলিমের ফুচকা-বিতানের কেঠো-বেঞ্চে বসে শীতে কাঁপতে কাঁপতে রেজাউল করিম মন্টু ক্রমাগত মেঘে ঢেকে যাওয়া আকাশ দেখে। আকাশ দেখতে দেখতে যুবকবেলা পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেও সে আসলে কোনোদিন প্রৌঢ় হয় না। প্রতিদিন শেষে দুঃস্বপ্নের রাতের অপেক্ষায় বেঁচে থাকা লোকটি বাস করে বহু বছরের পুরনো জীবনে। হয়তো তখন তরুণের জীবনে আরও নারী ছিল। অনেক কবুতর ছিল। আর ছিল কয়েকটা রাজহাঁস। কখনো-সখনো কেউ কেউ তার সঙ্গী হতো, রিকশায়, ঘোড়ার গাড়িতে। সেইসব ডাকসাইটে সুন্দরীরা হয়তো তাকে পেয়ে একটা পাখি শিকারের আনন্দ পেত বা নিজেকেই ভাবতো ঘাইহরিণ। তারা তাকে দিতে চাইত অনেককিছু, হয়তো সবকিছুই। কিন্তু যুবক দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। হয়তো দ্বিধাই, ভীরুতাও হতে পারে, নৈতিকতাবোধও হতে পারে। না কি চারুনিশির প্রেম তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আনত সমূহ পতন থেকে, পঙ্কিলতা থেকে! কিংবা শরীরের প্রাচীন অন্ধকারের ভেতর জেগে থাকা আলো তীব্রতর হলে যুবক শুধুই তরুণীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার বিমূঢ় আনন্দ নিয়ে অসংখ্য রাত ভোর করে দেয়।


ছেঁড়া গল্পের সুতো


রেজাউল করিম মন্টু সম্পর্কে যা কিছু জানা যায়—ছেঁড়া ছেঁড়া গল্পের মতো; আর যা কিছু জানা যায় না, পরিচিতদের মধ্যে যারা যুবকের সঙ্গে ঘনিষ্টতার দাবি করে তাদের কেউ কেউ হয়তো একদিন নাসিরের চা-স্টলে চা খেতে বসে বেনসন অ্যান্ড হেজেজের মাথায় আগুন লাগিয়ে বাতাসে ধোঁয়ার রিং বানাতে বানাতে চারুনিশি সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠে।

—চারু আপা সম্পর্কে বলেন না মন্টু ভাই! কে বেশি ভালোবাসতেন? আপনি চারু আপাকে নাকি চারু আপা আপনাকে?

তাদের টলমল আগ্রহে জল ঢেলে এমনকি প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গতিহীনভাবে যুবক অনতিস্বরে  বলে—হয়তো। এমন নিরুত্তাপ, কর্কশ ও অপ্রাসঙ্গিক ‘হয়তো’-র কনফিউশন সত্ত্বেও তারা আগ্রহ হারায় না। চারুনিশি কেমন দেখতে ছিল সে সম্পর্কে শহরের লোকেরা নানারকম বর্ণনা দেয়। কেউ বলে সে ছিল একটি দেশি লালঝুটি মোরগের মতো দুরন্ত, কেউ তাকে একটি গোলাপ ফুলের ফুটে ওঠা পাপড়ির উপমায় চেনাতে চায়। যুবকের পরিচিত নিকটজনেরা যারা বাস্তবে চারুকে কখনো দেখে নাই, তারা এই লালঝুটি মোরগ অথবা গোলাপ ফুলের পাপড়ির সঙ্গে একটি মেয়ের চেহারার বর্ণনায় সন্তুষ্ট হয় না। তবে এ বিষয়ে তাদের মনে কোনো সন্দেহ থাকে না যে, মন্টু ভাই চারুকে খুব ভালোবাসতেন, চারুনিশি তো বটেই। ফলে যুবক শুধু হয়তো বলে তাদের প্রথম প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেও তারা হতাশ না হয়ে বেনসন অ্যান্ড হেজেজে টান দিতে দিতে দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেয়—

—মন্টু ভাই, চারু আপার কোনো ফোটোগ্রাফ নেই আপনার কাছে? দেখান না আমাদের! শুনেছি খুব সুন্দরী ছিলেন!

আগের প্রশ্নের উত্তরে যুবক একটি শব্দ অন্তত বলে, কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নে কোনো কথা না বলেই রেজাউল করিম মন্টু উঠে চলে যায়। পরিচিত লোকেরা নিরাশ-চোখে যুবকের চলে যাওয়া দেখে। বহু বছরের পুরনো যুবক-যুবতীর অপ্রকাশ্য বিচ্ছিন্নতার কারণ ও যুবতীর মুখাবয়ব উদ্‌ঘাটনের একটি বাস্তব-সম্ভাবনা কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

শহরের লোকেরা বলে—চারুনিশি, বাবুই পাখির মতো মেয়েটি, মনোটোনাস এই শহরটিকে বাসযোগ্য করে তোলে। মফস্বল শহরের নিস্তরঙ্গ উদাসীনতা এক পশলা বৃষ্টি যেভাবে উচ্ছল উচ্ছ্বাসে দিগ্বিদিক করে দেয়, চারু ছিল এই শহরে সেরকম মুষলধারা বৃষ্টি। মেয়েটি এমনভাবে কথা বলে যেন শান্ত পুকুরে একটা ঢিল পড়ে চারদিকে ঢেউ ছড়িয়ে যায়। তার কথায় বাতাসে পারফ্যুমের মতো মিশে যায় আনন্দ আর স্বস্তি। কথা বলতে বলতে তার চোখের পাতা নুয়ে পড়ে আবার দুলে ওঠে লজ্জাবতী পাতার মতো। শহরের গা ধরে বয়ে যাওয়া প্রাচীন নদীটির জল ছুঁয়ে সে হাঁটে। জলে এমনভাবে পা ফেলে যেন একটি পাতায় জমা হওয়া শিশিরবিন্দু মুক্তোর মতো গড়িয়ে পড়ে আরেকটি পাতায়।

ছেঁড়া ছেঁড়া ধোঁয়াশার মতো দিনযাপনের পরতে পরতে মুখর একেকটি সকাল, দুপুর, বিকেল। তখন একদিন নদীর ওপর একটি পানসি ভাসিয়ে দূরে কোথাও নয়, কেবল নদীটির বুকের মধ্যে জেগে ওঠা চরে কাশবনে হাঁটতে হাঁটতে দুপুরের রোদ গায়ে মেখে তরুণ আর তরুণী মাথার ওপর দিয়ে কয়েকটি বালিহাঁস উড়ে যেতে দেখে। চারুনিশি সেই উড়ে চলা বালিহাঁস দেখে বিমূঢ় বিস্ময়ে রেজাউল করিম মন্টুর দিকে তাকায়।

—এই মন্টু, বালিহাঁস উড়তে পারে!

যুবক তখন মেয়েটির বিস্মিত চোখে চোখ রেখে টের পায় পবিত্র শিশুর সারল্যে ভরপুর এই চোখ কী ভীষণ সুন্দর! দুজনের সেই তাকিয়ে দেখার মুহূর্তটি হয়তো তাদের পরবর্তী জীবনের নিয়তি নির্ধারণ করে দিতে পারতো। তা হয় না, বরং তার পরের মুহূর্তগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি নিয়ে অপেক্ষা করে। বালিহাঁসের ঝাঁক উড়ে যায় ঠিকই। কিন্তু কাশবনের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে একদল দাঁতাল শুয়োর। না, তারা দেখতে অবশ্য শুয়োরের মতো নয়। তবে যুবকটিকে মুহূর্তে বেঁধে ফেলে একদল শুয়োরের মতোই তারা হামলে পড়ে যুবতীর ওপর। তখন পদ্মাপাড়ে সূর্য ডুবে যেতে থাকে, কাশবনের ভেতরে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে শিশিরপাতের মতো নিঃশব্দে অন্ধকার ঘন হয়ে আসে।


যুবকটি সারাক্ষণ ভাবে, কেউ তাড়া করছে তাকে। আর সে পালায়। অক্ষমতার গ্লানি নিয়ে পালাতে পালাতে প্রতিটি রাতের তন্দ্রাচ্ছন্ন দুঃস্বপ্নের কাছে আশ্রয়প্রার্থনা করে।


যুবক একটু আগেই হয়তো ভেবেছিল ওই চোখ জীবনে সে কোনোদিন ভুলতে পারবে না। ভেবেছিল, বেঁচে থাকা অবশিষ্ট দিনগুলোতে ও চোখের দৃষ্টি তার আনন্দের উৎস হবে। যুবতীর অনাঘ্রাত চাহনির গভীরতায় ডুবে যেতে যেতে সেদিন  যুবকের মনে হয়তো ভয় ঢুকে যায়। হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় তখন তার মনে হতে পারে এই কদম ফুলের মতো পেলব নারী, যার চোখে একটি নদীর জল ছলছল করে, সেই নারী কী করে তার হতে পারে! নিজেকে এতটা যোগ্য ভাবতে হয়তো সে ভয় পায়। তার পরে অতর্কিতে পাল্টে যায় সমূহ পরিস্থিতি। সেদিন পদ্মায়—কাশবনে, অনেকটা পথ হেঁটে তারা যদি ফিরতে পারত পুরনো, গোছানো শহরের উপকণ্ঠে তাদের মধ্যবিত্ত বাড়িতে, তাহলে সে রাতে যুবকটি ক্লান্ত হয়ে ঘুমাত। ঘুমিয়ে হয়তো স্বপ্ন দেখত চারুনিশিকেই। কিন্তু তারা ভাবতেই পারে নি কাশবনেও দাঁতাল শুয়োর থাকে। তারা ভুলে গিয়েছিল মনোটোনাস শহরেও সারল্য ভেঙে পড়ে, প্রকাণ্ড ডানা ঝাপটে ঈগল উড়ে যায়, কিছু সহজ হাসি রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিটে মুমূর্ষু হতে পারে!

হয়তো সেই শরতে, বাতাসে কাশফুল ওড়াওড়ির দিনে, তখন আকাশে শাদা মেঘদল ঘুরে বেড়াতে গিয়ে একেক সময় একেক রূপে উদ্ভাসিত হয়—সেই শরতে ছেলেটি দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে ঘুমাতে যায় একটি দুঃস্বপ্নের প্রত্যাশা নিয়ে। তাহলে কি ব্যর্থতার মধ্যে লুকিয়ে থাকে নতুন একটি জীবন! নতুন জীবনের প্রণোদনার জন্য তাই হয়তো দরকার পড়ে বিচ্ছেদের। যুবকটি সারাক্ষণ ভাবে, কেউ তাড়া করছে তাকে। আর সে পালায়। অক্ষমতার গ্লানি নিয়ে পালাতে পালাতে প্রতিটি রাতের তন্দ্রাচ্ছন্ন দুঃস্বপ্নের কাছে আশ্রয়প্রার্থনা করে।

আহত হাসি একদিন বাড়ি ফিরে এলে শহরের লোকেরা সে রাতে স্বস্তিতে ঘুমোতে যায়। কিন্তু সে উচ্ছল সহজতা কোথাও ফেরে না। লোকেরা উজ্জ্বল রোদের দুপুরগুলোতে রিকশার হুড ফেলে চারুর ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য ভুলতে বসে। শহরটা যেন নির্জীব জলহস্তীর মতো চুপ মেরে থাকে। যুবকটিও হয়তো গ্লানির ভারে অসূর্যস্পর্শ গৃহবাস থেকে নিজেকে বাইরে আনতে চায় না।


শীতের মৌনতায় মৌন শহরে


শহরের রাস্তায় জারুল গাছ ফুলে ভরে যায়। শীত আসে। শীতের মৌনতায় শহরের প্রাচীন স্তম্ভের চুড়োয় কুয়াশা লেপ্টে থাকে। আরেকটি শরৎ এলে পদ্মার বুকের ভেতর আবার কাশবন ফুলে ফুলে শাদা একটা মখমল হয়ে যায়। রেজাউল করিম মন্টুকে আমরা কোথাও দেখি না। কাজলায় নয়, কাশবনেও নয়। অবমানিতের আত্মগোপনকালীন কোনো একদিনে শহরের লোকেরা জানতে পারে যুবতীটির বিয়ের খবর। বাতাসে পোলাও বিরিয়ানির গন্ধ না পাওয়া গেলেও হলুদের গন্ধ পাওয়া যায়। যদিও কাঁচাহলুদের গন্ধ লোকেদের বিভ্রান্তই করে। চারুনিশির গায়েহলুদের কথাই তাদের প্রথম মনে হয়। একটি আসন্ন বিয়ে-উৎসবের আবহে শহর আবার আলোকোজ্জ্বল হবার সম্ভাবনা নিয়ে ঘরে ফিরে পরদিন ঘুম থেকে জেগেই তারা শুনতে পায়—গত রাতে চারুনিশির বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু তারা জানতো না কার সঙ্গে বিয়ে হলো চারুনিশির। খুব সামান্য সম্ভাবনা হলেও তারা হয়তো ভেবেছিল—রেজাউল করিম মন্টু ছাড়া আর কে শুয়োরধ্বস্ত চারুকে বিয়ে করবে! খুব দ্রুতই তাদের ভ্রান্তি অপনোদিত হয়। অনেকদিন বাদে শহরের লোকজন দেখে বিধ্বস্ত, শুকিয়ে মলিন একটি উদ্ভ্রান্ত যুবক বাড়ি থেকে বেরিয়ে রেলগেইটের উল্টোদিকে সেলিম মামার ফুচকা-বিতানে পুরনো, কেঠো বেঞ্চে গুটিসুটি মেরে বসে। তখন শহরের লোকেরা সেই লোকটার কাছে মনে মনে পরাজিত হয়—যে লোকটি চারুনিশিকে গতরাতে বিয়ে করে নিয়ে গেছে। বিবমিষা গোপন করে তখন রেজাউল করিম মন্টুর ওপর তাদের খুব রাগ হয়। রাগে গা রি রি করে। ‘শালা একটা ভোদাই। যারে ভালোবাসলি শালা তারে বিয়ে করতে পারলি না’—বলে গালাগাল করে। কোথাকার কে আবদুল করিম চারুনিশির মতো মেয়েকে বিয়ে করে আদর করছে ভেবেই লোকেদের সকল ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। কিন্তু তারা আরও একবার সমস্ত পরিস্থিতির ভুল বিশ্লেষণ করে বা কিছু না জেনেই তারা নিজেদের কাছে নিজেরা পরাজিত হয়। যদি তারা জানত, শুয়োরেরা যেভাবে তাজা পাপড়িটিকে নিষ্ঠুরভাবে রক্তাক্ত করেছিল, চারুর পরিবার খুব কৌশলে আবদুল করিম ও তার পরিবারের লোকজনের কাছে সেই ঘটনার পূর্বাপর গোপন করতে সক্ষম হয় বলেই আবদুল করিম চারুনিশিকে বউ হিশেবে পায়, তাহলে তারা অত তাড়াতাড়ি নিজেদের কাছে নিজের অসহায় সমর্পণ করত না। কিন্তু আবদুল করিমও জানত না, সুন্দর পাপড়ির মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে গোপন কাঁটা; জানত না সেই কাঁটার আঘাত এত তীব্র যে, তার মতো দুর্বল মানুষকে একেবারে পপাত-ধরণীতল করে দিতে পারে।

সেলিমের ফুচকা-বিতানের কেঠো বেঞ্চে গুটিসুটি মেরে বসে উদ্ভ্রান্ত যুবকের উপস্থিতি প্রথম কদিন শহরের লোকজনের মনে তেমন রেখাপাত করে না। পরিচিতরা তাকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে কষ্ট পায়। কিন্তু কাছে গিয়ে কথা বলে না। আসলে তারা হয়তো ভেবে পায় না কী কথা তাকে বলবে। যার চোখের সামনে একটি ফুল রক্তাক্ত করে চলে যায়, ফোটা পাপড়ি খুলে পড়ে পাশবিক নখরে—চেয়ে দেখার বিহ্বলতা ছাড়া যে আর কিছুই করতে পারে না, পরিচিত লোকেরা সেই কথা জেনেও চারুনিশির গোপন বিয়ের পরে উদ্ভ্রান্ত যুবকটিকে কী সান্ত্বনার কথা বলতে পারে! তারচেয়ে ভাল তাকে এড়িয়ে যাওয়া। সেলিম মামা তাকে সরেও বসতে বলে না—হয়তো আদ্যোপান্ত জানা থাকে বলে রেজাউল করিম মন্টুর জন্য তার করুণা হয়। কিন্তু কিছুদিন পরে সন্ধ্যায় রেলগেইটের উল্টোদিকের এই জায়গাটায় একটা জটলা পেকে ওঠে। দুষ্টু ছেলেরা যুবকটিকে উত্যক্ত করে মজা পেতে থাকে। তাতে যুবকটির কিছু আসে যায় বলে মনে হয় না। সে যেন পাশ ফিরে শোয়। আপনমনে কথা বলে—এখন বেশ ভালো লাগছে আমার। খুব ভালো লাগছে।

ঘটনার বিপরীতে যুবকের ভালো লাগার অনুভূতিতে শহরের লোকজন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বগতোক্তি করে—আহারে! কী সুন্দর ছেলেটা! শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে গেল! কিন্তু তারা জানত না অকস্মাৎ কোনো ঘটনায় মস্তিষ্ক বিকৃতি হলে সেটা অনিরাময়যোগ্য নয়। যদি পরবর্তী ঘটনা প্রথম ঘটনার দুর্বহতাকে ছাড়িয়ে যায় তবে সাময়িক পাগলামি ছুটে যায়।

দূরের কোনো শহরের আবদুল করিম চারুর মতো মেয়েকে বিয়ে করে একটি সুখী জীবনের ছবি এঁকেছিল। তাতো আঁকবেই। পরিচিত লোকেরাও তেমনটাই ভাবে। আবদুল করিমের সঙ্গে চারু সুখীজীবন যাপন করতে পারলে তাদের কোনো সমস্যা নেই। তখন ঘটনা ও পরিস্থিতির চাপে পড়ে রেজাউল করিম মন্টু সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায়। যদিও একটা কাঙ্ক্ষিত দুঃস্বপ্নের ঘোর কখনোই তাকে আগেকার স্বাভাবিক জীবন দেবে না। ফুচকা-দোকানি সেলিম মামার পুরনো কেঠো বেঞ্চে বসে অতীতের স্মৃতিচারণ করার সুস্থতা সে অর্জন করে। যদিও প্রায় অনুচ্চারিত, এলোমেলো, বিচ্ছিন্নভাবে কথাগুলো সে বলে—তবুও সে কথার ধ্বনি কানে বাজতে বাজতে একটি শান্ত শহরের ভূগোল আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেই শহরে রাস্তার পাশে সুপেয় জলের কল। ঘোড়া ছুটিয়ে টমটম গাড়ি নিয়ে ছুটে চলে বয়স্ক গাড়োয়ান। টমটমে বসে যুবক যুবতী হাসতে হাসতে কাজলা, আলুপট্টি, পদ্মাপাড় করে বেড়ায়। যে বাতাসে মেয়েটির চুল ওড়ে সে বাতাসের বেগ সামলে ছেলেটি কায়দা করে ক্যাপস্টান ধরায়। কখনো তৃষ্ণা পেলে জলের কল থেকে জল খায় আঁজলা ভরে। বয়স্ক গাড়োয়ান ঘোড়াকে অহেতু চাবুক মারে। আড়চোখে দেখা যুবতী যাত্রীকে হয়তো সেও খুশি করতে চায়। সিগারেটে অনভ্যস্ত ছেলেটি খুকখুক কাশে। মেয়েটি বালাই ষাট বলে ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তখন মেয়েটিকে অন্যরকম লাগে। সেই অনুভবে কিছু মাদকতা থাকে হয়তো। তখন টমটম ধীরে চলে। সূর্যটা ঢাকা পড়ে সুউচ্চ দালানের আড়ালে। ছেলেটির তখন যদি মনে হয়, একে নিয়ে আমি এখন যা ইচ্ছে তাই করতে পারি, তবে তাকে নিছক কামনা বলা যাবে কিনা কে জানে! ছেলেটি হয়তো চারুকে বলে—

—ভীষণ অন্যরকম লাগছে তোমাকে! দারুণ সুন্দর।

—অন্যরকম কেমন?

—অন্যরকম মানে অন্যরকম। যেন তুমি একটা ফুল। পাপড়ি মেলা গোলাপ।

—আর তুমি?

—আমি একটা প্রজাপতি। না, না ভ্রমর।

—ভ্রমর! উ হু ভ্রমর আমি ভয় পাই।

—তাই! তাহলে মৌমাছি।


স্ত্রীর মৃত্যুতে আবদুল করিমের শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে হয়তো বলে—খুব বাঁচা গেছে! ছি! বড্ড বিশ্রী ছিল মেয়েটা!


যুবতীটি হয়তো সত্যি একটি গোলাপ আর যুবকটি মৌমাছি হলেও—এক শরৎসন্ধ্যায় কাশবনের শাদা ফুলের পটভূমিকায় তারা যেমন জানত না—অনেকগুলো দাঁতাল শুয়োরের কাছে একটি মৌমাছি নস্যি, তেমনি আবদুল করিমও জানত না যে, একটি নিছক সত্য কথা কী প্রচণ্ড আঘাতই না তাকে করতে পারে! চারুনিশিই কেবল জানত, গোপন সত্যটি কখনো গোপন থাকবে না। একদিন প্রকাশ পাবেই। ততদিনে একসময় বালিহাঁস উড়তে পারায় বিস্মিত সরল মেয়েটি বাস্তবতার বহুস্তর জেনে যায়। আর সে এও জানত সত্য প্রকাশ হলে কী কী ঘটবে। হয়তো এজন্যেই আগেভাগে মেয়েটি তার করণীয় স্থির করে রাখতে পারে। ট্রেনটা কিছুটা বিলম্বে এলেও কোনো সমস্যা হয় না। এত কম বিলম্ব, কেউ একজন এসে তাকে সরিয়ে নেবার আগেই আন্তঃনগর ট্রেনটা তাকে দ্বিতীয়বার রক্তাক্ত করে চলে যায় বড় কোনো স্টেশনের দিকে।


দুঃস্বপ্নে


শহরের লোকজনেরা বলে, যেদিন চারু আন্তঃনগর রেললাইনে শান্ত ও লাল হয়ে শুয়ে থাকে—এ খবর শহরে পৌঁছলে রেজাউল করিম মন্টু একটি শাদা শার্ট পরে নগরের সাহেববাজার বড় মসজিদে নামাজ পড়তে যায়। কিন্তু প্রার্থনা সত্ত্বেও একটি দুঃস্বপ্নকে সে কিছুতেই আড়াল করতে পারে না বা যুবকটিই হয়তো চারুকে চিনতে না পারার স্বপ্নে আশ্রয় পেতে চায়।

আর তখন দূরের শহরে উপর্যুপরি অপ্রিয় সত্য জেনে যাবার ধাক্কায় বিপর্যস্ত সময়ে স্ত্রীর মৃত্যুতে আবদুল করিমের শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে হয়তো বলে—খুব বাঁচা গেছে! ছি! বড্ড বিশ্রী ছিল মেয়েটা!

সৈকত আরেফিন

জন্ম ২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮০; আহাম্মদপুর, পাবনা।

প্রকাশিত গ্রন্থ :

পাতা ও পতত্রি [গল্প, ২০১৪]
সমাপ্তি-শাস্তি-অতিথি [প্রবন্ধ, ২০১১]
সাহিত্য পাঠ ও পর্যেষণ [প্রবন্ধ, ২০১৭]

ই-মেইল : saikatarefeen@gmail.com

Latest posts by সৈকত আরেফিন (see all)