শরীর

শরীর
496
0

শরীর যে আমার আকর্ষণীয়, লোভনীয়, তা আমি টের পাই যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান হিসেবে অতি আদরে বড় হয়ে উঠলেও, বাবা-মা দুজনেই চাকরিজীবী হওয়ায় বছর ছয়েক বয়সেই আমার এই উপলব্ধি হয় যে, টুনিবু ছাড়া সারাদিন আমার আর কেউ নেই। দাদু যখন ছিলেন, তখন কী আনন্দেই না সারাটা দিন কাটত! দাদুর সঙ্গে এ-বাড়ি ও-বাড়ি যেতাম। সারাটাক্ষণ দাদুর দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকতাম। একটু চোখের আড়াল হলেই দাদু চিৎকার-চেঁচামেচি করে পুরো বাড়িতে হৈচৈ ফেলে দিতেন। তারপর, দুপুরবেলা গোসল করিয়ে খাইয়ে-দাইয়ে গল্প বলে ঘুম পারাতেন। হায়রে আমার দাদু! সেই দাদু একদিন মরে গেলেন। তখন আমার বয়স ছয়। ততদিনে আমার ছোট ভাই সরিতের বয়স দু’বছর পেরিয়ে গেছে। আমিও বাড়ির কাছে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়ে গেছি। সরিৎ জন্মের আগে আম্মু তার বাড়ি থেকে টুনিবুকে নিয়ে এল। টুনিবু বাবা-মা হারা এক দুঃখী মেয়ে। প্রথম প্রথম টুনিবুকে বেশ মারতাম। তারপর, আস্তে আস্তে টুনিবু’র সঙ্গে মিশে যাই। টুনিবু আমাকে সুুঁদি আপা বলে সম্বোধন করত। টুনিবু’র সঙ্গে মিশে আমার একটা লাভ হয়, গ্রামের প্রান্তজনের ভাষা আর গালাগালি শিখে যাই। যদিও বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁদের উৎসাহে মান ভাষায় কথা বলতে চেষ্টা করি। তো একদিন রাতে, বাবা-মায়ের সামনে কী একটা কারণে টুনিবুকে অশ্লীল একটা গালি দিতেই, মা তাৎক্ষণিক টুনিবুকে দোষী সাব্যস্ত করে সাবধান করে দেন, যাতে ভবিষ্যতে এসব অশ্লীল গালি উচ্চারিত না হয়, আর আমাকেও বুঝিয়ে বলেন,‘মা, এসব পচা কথা বলে না। ছি!’ তারপরও, মাঝে-মধ্যে এই অশ্লীল বাক্যগুলো কিভাবে যেন মুখে চলে আসত, অশ্লীল বিধায় অভ্যাসবসত জিভ বের করে কামড় দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করতাম। কিভাবে যেন সময়টা দ্রুত পার হয়ে যেতে লাগল। মায়ের তত্ত্বাবধানে পরপর তিনবার বার্ষিক পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে ক্লাস ফোরে উঠলাম। সরিৎ-এর ছোট সৌভিকের জন্ম হলো। ঝামেলা বেড়ে যাওয়ায় মা আর সময় করে উঠতে পারলেন না। বাবাকে বললেন, ‘আডডা বাদ দিয়া সন্ধ্যার পর পুরিরে নিয়া বও। আমি তো আর সময় করি উটতাম পারি না। সরিতেরও পাঁচ বছর অই গেছে।ইস্কুলো তো দিতে অইবো।’


সাঈদ চাচা টান মেরে কোলে বসিয়ে দিলেন, তারপর আস্তে আস্তে বুকে হাত দিলেন


বাবা কিছু বললেন না । টিউটর খুঁজতে লেগে গেলেন। শেষ-মেশ, মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে তার কলেজ পড়ুয়া মামাতো ভাই সাঈদ চাচাকে লজিং মাস্টার হিসেবে নিয়ে এলেন। সাঈদ চাচার তত্ত্বাবধানে ষান্মাসিক পরীক্ষায়ও জয়ের ধারা অব্যাহত রাখলাম। সাঈদ চাচা যত্ন করে পড়ান, আর আদর করেন। একদিন রাতে মা খাবার টেবিলে বাবাকে বললেন, ‘পুরি বড় অই যার, আর বেশ লাম্বাও অর। তুমার তো কোন খেয়াল নাই। কাইল আওয়ার সময় রেডিমেইট পায়জামা লইয়া আইবায়।’ বাবা, পরদিন কী বুঝে যেন নিয়ে এলেন জিন্সের প্যান্ট। আহলাদে আটখানা হয়ে গেলাম। পড়া আর হলো না। ক্যাসেট প্লেয়ারে মায়ের প্রিয় গান ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে…।’ শুনতে শুনতে টুনিবু’র পরিবর্তে নিজেই রিডিং রুমে সাঈদ চাচার জন্যে চা-নাস্তা নিয়ে গেলাম। বললাম,‘পড়ব না, সাঈদ চাচা। নতুন কাপড় পরেছি তো, আনন্দ লাগছে। আপনি চা খেতে থাকেন।’ বলে আসতে যাব, বিদ্যুৎ চলে গেল। সাঈদ চাচা টান মেরে কোলে বসিয়ে দিলেন, তারপর আস্তে আস্তে বুকে হাত দিলেন। মিনিট পাঁচেক পরে ছেড়ে দিতেই দ্রুত চলে এলাম।
তারপর থেকেই, রাতে পড়ানোর সময় বিদ্যুৎ চলে গেলেই সাঈদ চাচা এ কাণ্ডটি করতেন।

ক্লাস ফাইভে সেকেন্ড হয়ে উঠলাম। বাবা মনক্ষুন্ন হলেন। কিছুদিনের মধ্যেই আরবি পড়ার জন্যে একজন হুজুর নিয়ে এলেন। ততদিনে বেশ সচেতন হয়ে উঠেছি। এই লোক আরও খাচ্চর। প্রথম দিন থেকেই আড়চোখে বুকের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মাসখানেক পেরোতে না পেরোতেই বলেই ফেললেন, ‘তুইন তো হুরপরী। আল্লায় তোরে সারা রুফ দিলাইছইন। বড় অইলে খাসা অইবে।’ ভাগ্য ভালো। কিভাবে যেন টুনিবু হুজুরের সব কথা শুনে ফেলে মাকে বলে দিল। বাবা পরদিন পারিশ্রমিক দিয়ে হুজুরকে বিদায় করে দিলেন। হুজুর কোনো কথা না বলে চুপচাপ চলে গেলেন। ক্লাস এইটে যখন পড়ি, সাঈদ চাচা তখন চলে গেলেন। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। মাকে বললাম, ‘মা জুঁই ম্যাডামের বাড়িতে ব্যাচে পড়ব।’ মা বাবাকে বলতেই বাবা রাজি হয়ে গেলেন। সকালের ব্যাচে জুঁই ম্যাডামের বাড়িতে পড়ে স্কুলে যাই, ক্লাস শেষে বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরি। এভাবেই চলতে লাগল। ক্লাস এইট থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি নিয়ে নাইনে উঠলাম। বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।

অনেকদিন পর সবাই মিলে গ্রামে দাদার বাড়িতে গেলাম। দাদার বাড়িতে ছোট দাদা (বাবার চাচা) ছাড়া আর কোনো দাদা নেই। সবাই গত হয়েছেন। বাবা-মা দুজনেই ছোট দাদাকে কদমবুচি করলেন। ছোট দাদা খুব খুশি হলেন। সরিৎ-সৌভিকের আনন্দের সীমা-পরিসীমা রইল না। মাঘের তীব্র শীত উপেক্ষা করে সর্দি-কাশি বাধিয়ে দিন সাতেকের মধ্যে সরিৎ সাঁতার শিখে গেল। শৌভিক শিখল শেয়ালের ডাক ‘হুয়াক্কে হুয়া’। শহরে তো এখন আর এসব নেই। অনেক আগেই বিলুপ্তি ঘটেছে। যেদিন চলে আসব, তার আগের দিন—সেদিন ছিল ভরা পূর্ণিমা । শীতে জবুথবু হয়ে ছোট দাদি সন্ধ্যারাতে পাশের বাড়ি গিয়ে খড় জ্বালিয়ে দলবেধে শীত নিবারণ করতে লাগলেন। মা-সরিৎ-সৌভিক ছোট দাদিকে অনুসরণ করল। মায়ের সঙ্গী হলাম না। পুকুর ঘাটে বাঁশ ঝাড়ের কাছে অজস্র জোনাকি পোকার সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়ে যতীন্দ্রমোহন বাগচির কাজলা দিদিকে খুঁজতে লাগলাম। খড়মের আওয়াজ কানে এল। বুঝলাম, ছোট দাদা ঘাটের দিকে আসছেন। কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সুুুঁদিনি, কিতা করোস?’ বললাম, ‘কাজলা দিদিকে খুঁজি।’ আমাকে বিস্ময়াভূত করে দিয়ে হাঁপানির টানে অস্থির ছোট দাদা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘আমারে গরম করি দে সুুঁদি, আমারে গরম করি দে। তোরে জুয়ান কালে পাইলাম না। পাইলে দেখতে ই দাদার কিজাত তেজ!’ হ্যাঁচকা টানে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ‘ছি!ছি!’বলে উঠোন পেরিয়ে মায়ের কাছে চলে এলাম।


বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবেমাত্র বেরিয়েছি। রেজাল্ট এখনও বের হয়নি। বাবা-মা অনার্স কমপ্লিট করার পর থেকে বিয়ে দেওয়ার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছেন। বলেছি, ‘আগে পড়াশুনা শেষ করি, তারপর না হয় দেখা যাবে।’ মা তাতে সন্দেহের গন্ধ পেয়ে আমার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পাড়াতুতো বান্ধবী মৌলিকে ডেকে নিয়ে এসে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছেন। মৌলি যা জানে, তাই উত্তর দিয়েছে। এরপর বাবা-মা আর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ করেন নি। একদিন হলিডেতে বাবা বললেন, ‘ফ্রেশ-টেশ হয়ে থেকো। ওরা বিকেলে দেখতে আসবে।’


আফা আফনার লাইফ গেছে। বাইসাবের তো জাপানে বউ আছে। আমি দশ বছর ধইরা এই বাড়িত আছি। বেবাক খবর জানি।


বাবাকে এই প্রথম অন্যরকম মনে হলো। সবসময় বাবার ন্যাওটা হয়ে থেকেছি। মায়ের বকুনিতে বাবার আশ্রয় খুঁজেছি। সেই বাবা আজ…একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এল। ওরা কারা? জিজ্ঞেস করলাম না। দুপুরে খেয়েদেয়ে একটু গা এলিয়ে দিতেই কখন যে চোখ লেগে এসেছে, টের পাই নি। সম্বিৎ ফিরে পাই তিথি খালার ধাক্কাতে। আমার চেয়ে বছর চারেক বড় তিথি খালার আহ্লাদিটা গেল না। কানাডা থেকে দিন পনের হয় দুটো ফুটফুটে শিশু সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরেছেন। বিদেশে গিয়ে ওঁর তিড়িং-বিড়িংটা আরও বেড়েছে। ঘণ্টাখানেকবাদে আমাকে শুধালেন, ‘কিতারে সুুঁদি, মন খারাপ কেনে!’ তারপর, আমাকে কোন উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে বললেন, ‘তোর মনো কিতা?’ হ্যাঁ-না কিছুই বললাম না। বিকেলে এসে ওরা দেখে পছন্দ করে আংটি পরিয়ে চলে গেল।

শুনলাম, ও মনোবুশো স্কলার। জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োটেক পড়ায়। জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখ মহাধুমধামে বিয়ে হয়ে গেল। স্কলারের মাজেজা টের পেলাম বাসর রাতে। ঐ কটা দিন সে ধৈর্য ধরল না। বাসর রাতেই স্বামী কর্তৃক ধর্ষিতা হলাম। মাসখানেক পেরোতে না পেরোতেই জমিরন বুয়া বেতন নিয়ে মতান্তর হওয়ায় কাজ ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রাক্কালে আমাকে একা পেয়ে বলল, ‘আফা আফনার লাইফ গেছে। বাইসাবের তো জাপানে বউ আছে। আমি দশ বছর ধইরা এই বাড়িত আছি। বেবাক খবর জানি। বাইসাবে যখন ডাকা ইনবার্সিটিতে পড়ত, হেই সময় হের লগের দিবা আফারে বিয়া কইরা হেরে লইয়াই তো জাপান গেল।’ জমিরন বুয়ার কথা অবিশ্বাস করার কোনো কারণ দেখলাম না। খোঁজ-খবর নিয়ে ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, ‘মিথ্যুক, জোচ্চরের সঙ্গে আর যাই হোক, বসবাস করা যায় না।’ তারপর, বাবার বাড়ি যাওয়ার কথা বলে ওর মা-বোনকে বলে পরদিন বিকেলেই চলে এলাম। বাবা আমাকে দেখে বুঝে গেলেন। তবে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে খবর পেয়ে মা অফিস থেকে ফিরে এলেন। বিস্তারিত জেনে বললেন, ‘যা হবার হয়ে গেছে। এরকম হয়। সপ্তাহ-দশদিন থাক, তারপর যা।’ বাবা বললেন, ‘ওর আগের বউ নেই। ডিভোর্স দিয়েছে।’ কথা বাড়ালাম না। রাতে ও এল। অনেক কথা শুনালাম। বললাম, ‘জোচ্চর, লম্পট।’ বলল, ‘আমি তো কুনতা লুকাইছি না। তুমার বাবা-মায় সকল কতা জানোইন। গেলে চলো, আর না গেলে থাকো’ বলে ও চলে গেল। দুয়েকদিন পর সৌভিককে সঙ্গে নিয়ে ওর ছোট চাচির বাড়ি গিয়ে সব জেনে এলাম। ও বাবা-মাকেও ব্লাফ মেরেছে। আসলে ও দিবাকে ছাড়ে নি। দিবা সন্তান ধারণে অক্ষম হওয়ায় মায়ের পীড়াপীড়িতে দেশে এসে আবার বিয়ে করেছে। আর ফিরে গেলাম না। কাবিননামায় তালাক দেয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়ায় উকিল নোটিশ পাঠিয়ে লিগ্যাল প্রসেসিং এর মাধ্যমে সেপারেট হয়ে গেলাম। মা আর বেশিদিন বাঁচলেন না। চাকরিরত অবস্থায় সেরিব্রো ভাসকুলার অ্যাক্সিডেন্টের কারণে একদিন চিরবিদায় নিলেন।


ইকোনোমিক্সে ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্টের কারণে সহসাই একটা এনজিওতে ভালো বেতনে চাকরি হয়ে গেল। নিজ শহরে, বাড়ি থেকে মাইল দুয়েক দূরে। যোগদান করলাম। অফিসে যাই-আসি। যাওয়া-আসার পথে প্রতিবেশীদের গুনগুন শুনতে পাই। সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে মেয়েরা যখন মন্তব্য করে, আজে-বাজে কথা বলে। আমাদের সমাজে মেয়েরাই মেয়েদের দুশমন! একদিন অফিসে যাচ্ছি, পাড়ার গলির মোড়ের চায়ের স্টল থেকে বাজে একটা মন্তব্য উড়ে এল। ‘মালটা কে বে? বড় খাসা।’ উত্তরও ভেসে এল, ‘সরিৎ বাইর বড় বোন। হুনলে খবর আছে।’ সরিৎ যে মাস্তান হয়ে গেছে সে খবর জানি। কিন্তুু মাস্তান যে এত বড় হয়েছে তা জানি না! মনটা খারাপ হয়ে গেল। সবকিছু ঝেড়ে ফেলে দিয়ে একসময় স্বাভাবিক হয়ে গেলাম। চাকরির বয়সও একবছর পূর্ণ হয়ে গেল। একদিন কী একটা কারণে অফিসে একটু দেরি করে ঢুকতেই খায়রুজ্জামানের মন্তব্য ভেসে এল। খায়রুজ্জামান বলছেন, ‘আমাদের নায়িকা কই আইজ? নায়িকা অইয়া লাভ কী? যৌবন যদি শুকাইয়া যায়।…’ আরও কিছু হয়তো বলতে যাবেন, আমাকে দেখে চুপ হয়ে গেলেন। সেই শুরু। একসময় অতীষ্ঠ হয়ে উঠলাম। আরেকদিন, আব্দুল আলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ম্যাডাম, কোন খবর-টবর আছে?’ জিজ্ঞেস করলাম,‘কিসের খবর?’ ‘বুঝলেন না, এই বয়সে কী খবর হতে পারে? সর্বগুণে গুণান্বিতা আপনি। কিন্তু, সময় তো চলে যায়।’ বুঝলাম, সহানুভূতির ছলে খোঁচা দিচ্ছেন। তাঁর বোন হলে নিশ্চয়ই এরকম কোনো কথা বলতেন না। মনটা খারাপ হয়ে গেল। বসের সঙ্গে দেখা করে তিনদিনের ছুটি নিলাম।


বস অকস্মাৎ আমার হাত আলতো করে ছুঁয়ে কিছুক্ষণবাদে বললেন, ‘স্মার্ট রমণী, তোমার প্রমোশন দরকার…’


ছুটি কাটিয়ে যখন জয়েন করলাম, দেখি, পুরনো বস আর নেই। বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। নতুন একজন যোগদান করেছেন। দেখা করলাম। ভালো ঠেকল না। এই বস কাজের ছলে প্রতিদিন ডেকে পাঠান। কাজ আর শেষ হয় না। একদিন, একসঙ্গে লাঞ্চ করার অফার করলেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও না করতে পারলাম না। লাঞ্চ সেরে এলাম। খায়রুজ্জামান আব্দুল আলিকে বললেন, ‘এই তো খাপে খাপ মিলে গেছে।’ মন্তব্য যে আমাকে উদ্দেশ্য করে তা বুঝতে অসুবিধা হলো না। চেম্বারে ঢুকে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আব্দুল আলির মন্তব্য আর শোনা হলো না। আরেকদিন, বসের রুমে বসে আছি। একে একে খায়রুজ্জামান, আব্দুল আলি, পিনাকী সাহা আসছেন, আর কাজ সেরে যাচ্ছেন। আমার আর কাজ শেষ হলো না। খায়রুজ্জামান কিছুক্ষণবাদে আবার এসে মিনিট পাঁচেকের ভেতর কাজ সেরে বিদায় নিলে, বস অকস্মাৎ আমার হাত আলতো করে ছুঁয়ে কিছুক্ষণবাদে বললেন, ‘স্মার্ট রমণী, তোমার প্রমোশন দরকার। চাকরি তো বছর তিনেক হয়ে গেছে। নতুন বছরেই যেন সেটা কার্যকর হয় সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে ।’ আর দেরি করলাম না। সিন ক্রিয়েট না করে চুপচাপ বাড়ি ফিরে এলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, চাকরি আর করব না। সৌভিকের মাধ্যমে কালকেই রেজিগনেশন লেটার পাঠিয়ে দেব। আমার সিদ্ধান্ত সিদ্ধান্তেই আটকা পড়ল। দৃশ্যমান আর হলো না। রাতে অকস্মাৎ সরিতের লাশ তার অনুগামীরা নিয়ে এল। শুনলাম, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংষর্ষে সরিৎ জিন্দাবাজারে নিহত হয়েছে। বাবা জ্ঞান হারালেন। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। সৌভিকের ঘাড়ে দুহাত রেখে কেঁদে-কেটে বুক ভাসালাম।


সরিৎ মারা যাওয়ার আজ ছমাস পূর্ণ হয়েছে। সময় যে দ্রুত ধাবমান, প্রকতি তার রঙ-রূপ পাল্টিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে। মনে হয়, এই তো সরিৎ সেদিন বলল ,‘আপা, চাকরি তো পেয়েছিস, বেতন পেয়ে কী দিবি?’ বললাম, ‘কী নিবি?’ বলল,‘দামি একটা ঘড়ি দিস।’ দেব দেব বলে ঘড়ি আর দেওয়া হলো না। প্রমোশন পেয়ে আজ নতুন পদে যোগ দিচ্ছি। প্রমোশন নেওয়ার জন্যে কী ছাড় দিয়েছি? তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ছাড় তো দিচ্ছি সেই ক্লাস ফোর থেকে, নতুন করে আর দেব কী!

iqbal@gmail.com'
iqbal@gmail.com'

Latest posts by ইকবাল তাজওলী (see all)