হোম গদ্য গল্প লালবাগান

লালবাগান

লালবাগান
704
0

‘চাইয়া দ্যাখ মতিন, আকাশে চানখান ক্যামন ঝলমলাইতাছে।’

মোসলেম চাচার কথায় মতিন মাথাটা আকাশের দিকে ওঠালে তিনি আবারও বলেন, ‘তুই কি জানিস পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো সাক্ষী কে?’

‘কে?’

‘এই চানখান, মানুষ যখন গুহা ছাইড়া শহর বানালো তখনও এইডা দেখতাছিল, যখন মানুষে শহরে শহরে যুদ্ধ কইরা ধ্বংস হইতাছিল তখনও এইডা দেখতাছিল, অবশ্য দ্যাখা ছাড়া এইডা কিইবা করতে পারে?’

তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলে, ‘একটা ক্যাপিস্টান দে না!’

চাচার গল্প শুরু করার আগের প্রারম্ভিকা শেষ হয় সিগারেট চাওয়ার মধ্য দিয়ে—এটা মতিন জানে। এই ক’বছরে এই অভ্যাসটার সাথে অভ্যস্ত সে। কোনোভাবেই রক্ত সম্বন্ধযুক্ত নয়, তবুও চাচা-ভাতিজা সম্পর্কের দুইজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ, সোয়ারী ঘাটের ধুলো ও ময়লামাখা নদীর কূলে দাঁড়িয়ে পড়ে। কিছুটা কেরানীগঞ্জের দিকে হেলে পড়া চাঁদটা তখনও শহরের শেষ আলোটুকুকে ছাপিয়ে উঠতে পারে নি। মোসলেম সিকাদার বয়সে ষাট, কিন্ত উন্নত যুবকের মতো হাঁটেন এখনো। কথা মতো মতিন একটা সিগারেট ধরিয়ে চাচার আঙুলের মাঝে গুঁজে দিলে এই বিরাতে মোসলেম সিকদারের জবান আরেকবার উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।

ঘাটে ছড়ানো শ্রান্ত খেয়াগুলো জীর্ণ পদ্মপাপড়ির মতো গিলে চলেছে রাতের শিশির। নভেম্বরের রাতে একটু ঠান্ডা বাতাস সারা বছরের তেতে থাকা ঢাকাকে একটু মমতা দেয়। রাতের এই প্রহরে মিউনিসিপিল্যাটির ছ্যাঁচড়া চোরটাও হয়তো জেগে নেই। চাচা-ভাতিজা সেই আশা ও শঙ্কার চিরজটিল শহরটাকে পেছনে রেখে কিছুটা ডাঙায় উঠে আসা একটা খেয়ার গলুইয়ের উপর বসে পড়ে। মোসলেম সিকদার সিগারেটে একটা টান দিলে ধোয়ার মেঘগুলো শিশির পেয়ে কেমন যেন নেতিয়ে পড়ে, তারপর তর্জনীর ইঙ্গিতে বলে—‘ওইটা দেখছিস ভাতিজা, ওইখানে শাহজাদা আযম আইছিল, একটু আগে।’


তোরা এই জমানার লোক, বই খাতায় শুধু খাঁ সাহেবের ১ টাকায় ৮ মণ পড়িস। আর কত কৃষক যে এই ৮ মণের গ্যাঁড়াকলে পইড়া গলায় দড়ি পরছে—তা জানিস না।’


মতিন মুখ তুলে তাকালে কিছুটা দূরে টিম টিম বাতি আর কয়েকটা মহাজনি নৌকা সমেত চাঁদনী ঘাট দেখতে পায়। চাচার কথায় মতিন কিছুটা কপট সন্দেহ ব্যক্ত করলে মোসলেম হুট করে লাফ দিয়ে দু’পা এগিয়ে মতিনের নাক বরাবর দু’আঙুল দূরত্ব রেখে বসে পড়ে। প্রায় বিস্ফারিত চোখ আর বিপুল উৎকণ্ঠা সহযোগে ক্ষীণকায় কণ্ঠে বলে ওঠে—‘তুই কি জানিস ভাতিজা, কেল্লার কাজ শুরু করার আগে শাহজাদার থাকার কোনো জায়গা ছিল না এই শহরে? সারাদিন কেল্লার কাজ সেরে এই ঘাটে বাঁধা নৌকায় তিনি আবার ফিরে আসতেন। আমি জানি, আমি আরো অনেক কিছুই জানি। বিয়ার আগেই পরীবিবি মরছিল ক্যা—আমি তাও জানি। আমি তো বাপ, আমিও জানি শায়েস্তা খাঁ’র কেমন লাগছিল পরীবিবিরে হারাইয়া!’

এইটুকু বলতে যেয়ে মোসলেম সিকদারের গলা আর্দ্র হয়ে আসে। আঙুলের ফাঁকে পুড়ে ছোট হয়ে আসা সিগারেটের উত্তাপ সইতে না পেরে এটাকে এক ঝটকায় দূরে ফেলে দেয়, পানির শরীর এক টুকরো আগুনকে একটা অদ্ভুত শব্দে গিলে ফেললে একই সাথে দূরে কোথাও ট্রান্সমিটার বিস্ফোরণ হয়।

সোয়ারী ঘাট অন্ধকারে নিমজ্জিত হলে মিটফোর্ড রোড ধরে একটা টমটম চাঁদনী ঘাটে এসে থামে। পাটনা থেকে আসা বিখ্যাত বাইজিকে গ্রহণ করতে শাহজাদার নৌকা থেকে নেমে আসে একটা স্বর্গীয় সিঁড়ি। কাশ্মিরি কারুকাজে ঢাকা দ্যুতিময় শরীরটুকু শাহজাদার নৌকায় অন্তরীণ হলে সেই আবেশটুকু চোখে মেখে রাজ্যের মুগ্ধতা নিয়ে আরেকটি সিগারেট চেয়ে বসে মোসলেম সিকদার। চাঁদনী ঘাটে চোখ রেখেই আস্তে আস্তে বলে ওঠে—‘তুই কিছু টের পাইলি মতিন?’

মতিন শুষ্ক ও নীরস গলায় “না” বললে এক ঝটকায় মতিনের হাত থেকে দেয়াশলাই কেড়ে নেয় মোসলেম।

‘তোর চোখ নাই রে ভাতিজা, তুই আন্ধা! শুধু তুই ক্যান, বেবাগ লোকই তো আন্ধা! তোরা এই জমানার লোক, বই খাতায় শুধু খাঁ সাহেবের ১ টাকায় ৮ মণ পড়িস। আর কত কৃষক যে এই ৮ মণের গ্যাঁড়াকলে পইড়া গলায় দড়ি পরছে—তা জানিস না।’

আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলে—‘তোরা কোনোদিন পরীবিবির কষ্ট বোঝস নাই। পরের কষ্ট বোঝা ভারি কষ্ট রে ভাতিজা।’

তারপর কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে আবার বলে—‘চাঁদনী ঘাটের নামটাও কিন্ত শাহজাদারই দেয়া। ঘাটে চাঁদের এই সৌন্দর্য তার খুব ভালো লেগেছিল।’

পাকিস্তান আমলে সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগ কেল্লার দায়িত্ব নিলে মেট্রিক-পাশ মোসলেম সিকদার প্রধান কিউরেটরের সহকারী হিশেবে কাজ নেয়। বড় কর্তার প্রায় সময় পরিবার নিয়ে করাচি থাকাতে সব কাজ তাকেই সারতে হতো। প্রায় ত্রিশ বছরের কেল্লা-জীবনে এর ইতিহাস তালুর রেখার মতোই স্পষ্ট মোসলেমের কাছে। ৮১ সালে যখন অবসর নেয় তখন মাথার ভেতরের পূর্বাপর স্মৃতিগুলো মুছে সেইখানে মুঘল আর ইংরেজদের ইতিহাস খোদাই হয়ে যায়। ফলে প্রায়ই সে অসংলগ্নতায় ভোগে। পূর্বের কথার সূত্রতা ভুলে যায়।  সারাদিন লর্ড ওয়েলেসলির সাথে তর্ক করে। কখনো কখনো স্বয়ং নবাব পরিবারের সমস্ত পুরুষ তার সাথে তর্কে পেরে ওঠে না। সে তালিকায় নবাব গনি থেকে নবাব সলিমুল্লাহ পর্যন্ত বাদ যান না কেউই।

চাঁদটা এতক্ষণে পশ্চিম আকাশে ঢুলু ঢুলু।

ক্ষীণকায় সাদা মেঘগুলো মওসুমের শেষ পানিটুকু নিয়ে হিমালয়ের শরীরের দিকে ছোটে। দূরে শহরের শব্দ আরো ক্ষীণ হয়ে আসলে মোসলেম সিকদার বলে ওঠে—‘নবাবের পোলাডার অকালে মরণের কারণডা জানিস ভাতিজা?’

মতিন এবারও না সূচক মাথা ঝাঁকালে মোসলেম কিছুটা এগিয়ে নবাব আহসানুল্লাহর বড় ছেলে হাফিজুল্লাহর অল্প বয়সে পৃথিবী ত্যাগের হেতু বোঝাতে থাকে। তার মতে মৃত্যুটা হয়েছিল তাঁর নিজের দেওয়া অভিশাপের কারণে।


পানির উপরে এত স্বচ্ছ প্রতিবিম্ব কি বুঝতে দেয়, একদা যে বুকের উপর দিয়ে ইতিহাস ভর্তি ভিনদেশী নাও বেঁচে থাকতো সেইখানে এখন জলের কীটেরাও বাঁচে না।


বলতে থাকে—‘সেই দিন দুপুর বেলা মানে মহরমের ৯ তারিখ—আমি দুই বস্তা ছোলা নিয়ে আস্তাবলের দরজায় দাড়াতেই কয়েকজন বলল অবস্থা সুবিধের নয়। আমি হাবিলদাররে জিগাইছিলাম সে কিছু জানে কিনা? না, সে কিছুই জানে না। ঢাকার কালেক্টর ম্যাজিস্ট্রেটরা এই সময় খুব ঘন ঘন আসা-যাওয়া করতাছে। পরের দিন আশুরার রোজা, সবাই অল্প রাতেই ঘুমিয়ে পড়লে আমি একটু বাইরে বেরিয়ে আইসা দেখি ইংরেজ সেপাইরা জটলা বাইন্ধা কী সব কইতাছে। তখন তেপ্পান্ন পদাতিক ঢাকায় ছিল। আমরা কেল্লার ভেতরে এর কাছে ওর কাছে শুনতাম মিরাটের সেপাইরা দিল্লি দখলে নিছে, ভেতরে ভেতরে তখন ফুটতাছি আমরা।’

এইটুকু এক নিশ্বাসে বলে মোসলেম সিকদার কিছুটা দম নেয়। কিন্ত সেটার বিরতি কেবল ওই এক নিশ্বাস। তারপর সে একনাগাড়ে বলে যেতে লাগে চিটাগাংয়ের হাবিলদার রজব আলী কেন শেষ পর্যন্ত ফেনীর এইপারে এসে মারা পড়ল। দার্জিলিং ব্যারাক থেকে কেন সেপাইরা ঢাকা পর্যন্ত আসতে পারে নাই! ২১ নভেম্বর পর্যন্তও কেল্লার সেপাইরা প্রস্তুত ছিল!

গল্প বলতে বলতে মোসলেম সিকদারের বুকের ভেতরের কপাট আরেক দফা খুলে যায়। অবাক বিস্ময়ে মতিন সেই খোলা কপাটের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসা ইতিহাসের বৈরী বাতাসের ওম নিতে থাকে। লোকটার মাথা গেছে অনেকেই বলে, কিন্ত মাথার ভেতর থরে থরে সাজানো দেড়শ বছরের ইতিহাস এইভাবে বেরিয়ে আসছে কোত্থেকে?

একটু কোনাকুনি নিচে তাকালে ব্রিজের নিচ দিয়ে সদরঘাটে ভিড়ে থাকা বরিশালের লঞ্চের আলো ঠিকরে পড়ে উদ্ভাসিত বুড়িগঙ্গার বুক দেখা যায়। পানির উপরে এত স্বচ্ছ প্রতিবিম্ব কী বুঝতে দেয়, একদা যে বুকের উপর দিয়ে ইতিহাস-ভর্তি ভিনদেশি নাও বেঁচে থাকত সেইখানে এখন জলের কীটেরাও বাঁচে না।

এইবার মোসলেম সিকদার কিছুটা হাঁপিয়ে ওঠে, কথাগুলো ধীরে জড়িয়ে আসে। বেশিক্ষণ আর দম ধরে রাখতে পারে না। তারপরও বিড়বিড় করে বলে যায় নবাব পুত্র হাফিজুল্লাহর অকাল প্রয়াণের কাহিনি। সেই বিশদ বর্ণনা থেকে দাদা নবাব আব্দুল গনি’র ইংরেজ-তোষণের অংশটুকুও বাদ পড়ে না। বাদ পড়ে না আন্টাঘরের ভেতর-বাহির কোনোটাই। দেড়শ বছর আগেকার কোন মহরমের বিকেলে কী ঘটেছিল সেটা রাত জেগে শুনলে মতিনের টিউশনি দুইটার জায়গার হুট করে তিনটা হয়ে যাবে না। তবু অতসব বাস্তব, মাথার ভেতরে রেখেও মতিনের এই উদ্দেশ্যহীন ইতিহাস ভ্রমণ সে নিজেই উপভোগ করে । এবং মোসলেম সিকদারের এই ইতিহাসের উৎসমুখ কোথায় সে প্রশ্নটাই নিজের দিকেই বারবার ছুড়ে দেয়।

কেল্লার ভেতরে সেই বিকেলে দেশীয় সেপাইদের কিভাবে নিরস্ত্র করা হয়েছিল, কিভাবে মারা হয়েছিল, দুই দিন পানির অভাবে সেপাইদের আর্তচিৎকারে কিভাবে কেল্লার বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল, ২২ নভেম্বর ’৫৭ এই বুড়িগঙ্গার পাড়ে আরেকটি কারবালায় কী ঘটেছিল তা কেউ জানে?

খুব নরম ও নীরস ভঙ্গিতে আরেকটা সিগারেট চাইলে মতিন অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। ভাতিজার এ অসহায়ত্ব মোসলেম মেনে নেয়। কিন্তু এইবার আর বসে থাকতে পারে না মোসলেম। দুই হাত দুই দিকে দিয়ে বুড়ো কলা গাছের ভূপাতিত হওয়ার মতো করে চিত হয়ে শুয়ে পড়ে গল্পকার। চোখ মুদে আসতে আসতে বলতে থাকে—‘আমার লাশটা ১০ দিন ধরে ঝুলেছিল আন্টাঘরের সামনে। কোনো নবাবের পুত লাশটা নামাইতে আসে নাই, ঝুলে থাকতে কষ্ট হয় না বুঝি আমার !’

তারপর ভিজে আর্দ্র গলাটার মধ্যে কথাটা আটকে যেতে যেতে বের হয়—‘আমারে একটা গুলিও করতে দেয় নাই রে মতিন!’


ইতিহাসের বর্জ্যগুলো মাথার ভেতর মেঘ হয়ে জমে যায়—বর্জ্য নিঃসরণের উপায় হলো তামাকের সংসর্গ, বর্জ্য নির্মূলে এর ভুমিকা অনেক।


এইবার আর কান্নাটা থামাতে পারল না মোসলেম, সেই কান্নায় সপাং সপাং বৈঠা পড়ার শব্দে যেন দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায় স্রোতের শরীর। তারপর আবার—‘আমি অভিশাপ দিমু না? আমি অভিশাপ দিছি, আমরা যখন ঝুলে ঝুলে খসে পড়তাছি—নবাবের বেটায় ইংরেজ গো লগে তখন কেমন আমোদে ছিল দেখি নাই বুঝি! আমার অভিশাপেই মরছে।’

দূরে কোথাও কুকুরের প্রলম্বিত ডাক বাতাসে ভেসে আসার ক্লান্তিতে ক্ষীণ হয়, তার শেষ রেশটুকু মোসলেম সিকদারের কান্নার সাথে একই তরঙ্গে মিলে যেতে থাকে। চাচার গল্পের এইরকম সমাপ্তির সাথে মতিন পরিচিত। পরিস্থিতির উন্নয়নে এই মুহূর্তে মাত্র একটা ক্যাপিস্টানের ভূমিকা বিশাল। কিন্ত সেটা পরাবাস্তবতা। চাচা এখন ১০ মিনিট চোখ বুজে থাকবে, মতিন জানে। মোসলেম সিকদারের মতে গল্প বলতে বলতে ইতিহাসের বর্জ্যগুলো মাথার ভেতর মেঘ হয়ে জমে যায়—বর্জ্য নিঃসরণের উপায় হলো তামাকের সংসর্গ, বর্জ্য নির্মূলে এর ভুমিকা অনেক।

মতিন জানে, চাচা একটু পরে চোখটা খুলেই বলবেন—‘ভাতিজা, চল যাইগা! বড্ড ঘুম পাইতাছে রে!’

বড় কাটরায় একটা মাত্র রুম নিয়ে মতিনের আবাস। ধারে-কাছে স্বজন বলতে কেউ নেই। ও যে বাড়িতে থাকে সেই বাড়ির আরেক কোনায় থাকে মোসলেম সিকদার—ছোট ছেলের পরিবার সমেত। চাকরি থেকে রিটায়ার করার পরপরই স্ত্রী মারা গেলে তার মাথার গোলমালটা বাড়ে। মাথার ভেতরের তুমুল স্মৃতির সংঘর্ষে তার অবস্থার ক্রম অবনতি শিক্ষিত বড় ছেলেকে বিচলিত করে নাই। চাকরির সুবিধার্থে সে ধানমণ্ডি স্থানান্তরিত হয়। শুধু থেকে যায় ধোলাই খালের মিস্ত্রি ছোট ছেলেটা, তার কালো বৌটিকে নিয়ে!

মতিন ইতিহাসের ছাত্র না। কবি নজরুল থেকে এম. এ. পাশ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাক্রমে এটা সহজ পাঠ্য মুড়ির মোয়া, সবাই পড়তে পারে। টাউট রাজনীতিকের দেশের প্রতি আগ্রহের মতো করে মতিনের ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞান’ পড়া! এখন সারাদিন অঙ্ক, ইংরেজির টিউশনি আর রাতে চাচার ইতিহাস পাঠ—মন্দ যায় না দিন!

অঘ্রানের হিমেল শিশিরে রাত আরেকটু চুপসে গেলে মতিন বুঝতে পারে যাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। অদূরে ব্রিজের তলায় একটা কার্গোর ভোঁ ভোঁ শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে। চাচাকে বেশ কয়েকবার ডাকার পরও সাড়া না পাওয়ায় সে গায়ে মৃদু ধাক্কা দেয়।

‘চাচা, এইবার উঠো। রাত কিন্তু অনেক।’

মোসলেমের কান্না থেমে গেছে, কিন্ত বৃষ্টির পর গম্ভীর আকাশের আবহ নিয়ে এখনো সে চুপচাপ। মতিন আবার তাড়া দিলে বলে ওঠে—‘একটা জিনিস দেখবি ভাতিজা?’ তখনও চিত হয়ে শুয়ে থেকেই কথাটা মতিনের দিকে ছুড়ে দেয় সে।

মতিন আবারও তাড়া দিলে—‘একটু কাছে আয়’ বলে মতিনের হাতটা ধরে কাছে টেনে মাথার কাছে বসায়। তারপর মাথাটা আরেকটু উপরে তুললে মোসলেম সিকদারের ইতিহাসের গলাটা উপরের দিকে ফুলে ওঠে মতিনের চোখের এক হাত দূরে।

বুড়িগঙ্গার এক কালের গঙ্গা ফড়িংয়ের মতো মতিন সন্ত্রস্ত-লাফ দিয়ে মোসলেমের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। উচ্ছিষ্ট ঠিকরে পড়া শহরের আলোয় মতিন দেখে—মোসলেম চাচার কণ্ঠনালি বরাবর একটা নীলচে কালো দাগ সমগ্র গলাটিকে পেঁচিয়ে আছে, যেন মওসুমের সেরা পাটের কষে পাকানো দড়ি দিয়ে কেউ সর্বশক্তিতে পেঁচিয়ে দিয়েছিল চাচার গলাটা!


কাটরার পুরনো দালানে আজানের প্রতিধ্বনিত শব্দে ইতিহাসের গল্পকারের ক্লান্তিটুকু পুরনো পলেস্তারার মতো খসে পড়তে থাকে।


‘আরে ভাতিজা, কাছে আয়। ডরের কী আছে? তুই কাছের লোক বইলা দেখাইলাম।’ গলায় হাত বোলাতে বোলাতে আবর বলে—‘তুই-ই বল ভাতিজা, আমারে যারা এত কষ্ট দিয়ে মারছে আর তোষামোদ করছে তাগো আমি অভিশাপ দিমু না?’

মোসলেমের সাথে মতিনের পরিচয় আড়াই বছরের। এর আগে চাচার কোনো আচরণে মতিনের এরকম হয় নি। কিন্তু আজ যেন মনে হচ্ছে এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে দরজা আটকাবে ততই মঙ্গল। মতিন ঘরে ফেরার তাড়া অনুভব করে। তারা হাঁটতে হাঁটতে বড় কাটরার গেট দিয়ে ঢুকে পড়লে শেষ রাতের শিশিরের ঘুম ছত্রখান করে কাছের মসজিদে আজান দেয় “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম”। কাটরার পুরনো দালানে আজানের প্রতিধ্বনিত শব্দে ইতিহাসের গল্পকারের ক্লান্তিটুকু পুরনো পলেস্তারার মতো খসে পড়তে থাকে। মোসলেম সিকদারের সাথে এমন অনেক রাতে তারা ঘরে ফিরেছে, কিন্তু চাচার এমন প্রশান্ত মুখের ছবিটা আর কখনোই দেখা হয় নি মতিনের।

অজ্ঞাত স্থান থেকে বেরিয়ে আসা আজানের উৎসমুখ খুঁজতে খুঁজতে মোসলেম সিকদার মতিনকে রেখেই ডানের রাস্তায় মোড় নেয়। তারের জঞ্জালে ঠাসা একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিকে পাশে রেখে মোসলেম চাচার এ চলে যাওয়াটুকু চোখ ভরে উপভোগ করতে থাকে সে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বেকার ছাত্রটি ‘মতিন মোল্লা’।

মির্জা মুজাহিদ

মির্জা মুজাহিদ

জন্ম ২৫ জানুয়ারি, নড়াইল। চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছেন। পেশা : ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, স্পেলবাউন্ড কমিউনিকেশন লিমিটেড।

প্রকাশিত বই : বিপ্রতীপ [গল্প], একুশে বইমেলা ২০১৬, অনুপ্রাণন প্রকাশন।

ই-মেইল : me@mirzamuzahid.net
মির্জা মুজাহিদ

Latest posts by মির্জা মুজাহিদ (see all)