হোম গদ্য গল্প রোদ-ছায়ার পরম্পরা

রোদ-ছায়ার পরম্পরা

রোদ-ছায়ার পরম্পরা
734
0

আজ তার জন্মদিন। আজ তার পঁচিশ বছর পূর্ণ হলো। পঁচিশ বছর মানুষের জীবনে দারুণ সময়। পঁচিশ বছর জীবনে দু’বার আসে না। তাই দিনটি স্মরণীয় করে রাখা চাই। আর চাই বলেই গত পাঁচবছর ধরে দিনটি নিয়ে নানা কিছু ভেবেছে সে। ভেবে ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভিন্নরকম উদ্‌যাপনের, যা তাকে স্মরণীয় করে রাখবে দীর্ঘদিন। শুধু স্মরণীয়ই নয়, মুক্তি দেবে হীনম্মন্যতা, একাকিত্ব আর সকল মানসিক জঞ্জাল থেকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সাত-পাঁচ ভেবেছে, নিজের মুখোমুখি হয়েছে অসংখ্যবার। বিভিন্ন তল থেকে আলো ফেলে দেখেছে, তারপর চূড়ান্ত করেছে। কিন্তু কিভাবে উদ্‌যাপন করবে সেই ব্যাপারটা সবার জন্য চমক হিশেবে গোপন রেখেছে এখনও।

তো সে, মানে রোদ, মানে রোদ্দুর রায়, যে কিনা কবিতা লেখে এবং নিজেকে একজন কবিতাকর্মী হিশেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সে, তার পঁচিশ বছর পূর্ণ হবার দিনে ঘুমিয়েছিল অনেক বেলা পর্যন্ত। ঘুম ভাঙার পরও দীর্ঘক্ষণ গড়াগড়ি খেয়েছে বিছানায়। মনে মন ছক কষেছে কিভাবে সাজিয়ে তুলবে দিনের বাকি সময়টুকু। অনিবার্য যে ঘটনাটি সে ঘটাতে যাচ্ছে তার কথা ভেবে ভেতরে ভেতরে বোধ করেছে ভিন্ন রকমের উত্তেজনা। ফলে দাঁতটাত মেজে দীর্ঘসময় নিয়ে স্নান সেরেছে রোদ্দুর রায়। তারপর বন্ধু কবি ফেরদৌস আজিমের কাছ থেকে পড়ার জন্য ধার করে আনা বইগুলো গুছিয়ে নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে বেরিয়েছে হাতিরপুলের মেসবাড়ি থেকে।


রোদ্দুর জানে, তার সমসময় এই হেজিমনি তীব্রভাবে কাটিয়ে উঠছে। নিজেদের আলো-বাতাস-ভূমিতে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের কবিতা।


বেরোনোর আগে অবশ্য ভোলে নি তার অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ আলো-আঁধারের পরম্পরা’র পাণ্ডুলিপি সযত্নে তার বইপুস্তকের পাশে সাজিয়ে রাখতে। সে জানে, বহু প্রকাশকের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত এই পাণ্ডুলিপির কদর বাড়বে আগামীকাল সকাল থেকেই। শুধু বন্ধুরাই নয়, দৈনিকের সাময়িকী ও লিটল ম্যাগের সম্পাদক থেকে শুরু করে সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশকদের অনেকে হুমড়ি খেয়ে পড়বেন তার সৃষ্টিকর্মের ওপর। নিজের রচনা আর ভাষাভঙ্গি নিয়ে কখনই তার সন্দেহ বা সংশয় ছিল না। এখনও নেই। শুধু বিরুদ্ধ সময় তাকে একা ও নিঃসঙ্গ করেছে। বেড়ে উঠার দিনগুলো তাকে হীনম্মন্য করেছে। কিন্তু এখন সময় তার। এবার সে প্রতিশোধ নেবে সব কিছুর ওপর।

হাতিরপুল থেকে শাহবাগের আজিজ মার্কেট মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ। সবসময় সে যাওয়া-আসা করে হেঁটেই। আজ কী ভেবে রিকশা নিল। কোলের ওপর ফেরদৌস আজিমের বইগুলো। ‘পড়ুয়া’ বইয়ের দোকানে পৌঁছে দিলেই পেয়ে যাবে আজিম। রিকশাটা সবে যখন হাতিরপুল থেকে পরীবাগের রাস্তায় এসে পড়েছে তখন উল্টোদিক থেকে আসা আরেকটা রিকশা থেকে কে যেন তার নাম ধরে ডাক দেয়! ‘রোদ্দুর, কেমন আছেন?’

প্রশ্নের উৎস সন্ধান করে ঘাড় ঘোরাতে বিপরীত দিক থেকে আসা রিকশা অনেকটা দূরে চলে যায়। পাশ থেকে প্রশ্নকর্তার যেটুকু সে দেখতে পায় তাতে লোকটাকে তার চেনা চেনা মনে হয়, কিন্তু ওই মুহূর্তে ঠিকঠাক শনাক্ত করতে পারে না। এই যখন অবস্থা তখন অপস্রিয়মাণ লোকটি ঘাড় ফিরিয়ে চিৎকার করে বলে, ‘কথা আছে সন্ধ্যায় আজিজে দেখা হবে’।

কে লোকটি? কী চান উনি? কথা বলতে চান। কী নিয়ে কথা বলতে চান? আর কেনই বা তার সাথে? এসব প্রশ্ন তাকে ধাঁধার ভেতর ফেলে দেয়। তখন দুপুর এবং এমন একটা ক্ষণ যখন নাস্তার সময় গড়িয়ে গেছে কিন্তু মধ্যাহ্নভোজের জন্য প্রস্তুত হয় নি নগরের হোটেলগুলো। ফলে টং দোকানের বিস্কিট-চা-সিগারেট দিয়েই সে শুরু করে তার পঁচিশতম জন্মদিন। হ্যাঁ, আজ তার জন্মদিন এবং ভীষণভাবে দিনটি উদ্‌যাপনের কথা। জন্মদিনের প্রসঙ্গ মনোজগৎ থেকে সন্ধ্যায় দেখা করতে চাওয়া লোকটিকে নিমিষেই হটিয়ে দিয়ে আবারো চাঙা করে তোলে রোদ্দুরকে।

‘পড়ুয়া’র সেলসম্যানের কাছে আজিমের বইগুলো বুঝিয়ে দিয়ে সে নতুন আসা বেশ কয়েকটা লিটল ম্যাগ সময় নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে। দুই বাংলার কবিদের কয়েকটা কবিতা পড়ে ফেলে নগদে নগদেই। বাংলাদেশের কবিদের কবিতাগুলোই তার ভালো লাগে। নতুন ও নিরীক্ষাপ্রবণ মনে হয়। তবু সে খেয়াল করে দেখেছে সিনিয়র কবি-সাহিত্যিক-সমালোচকদের কেউ কেউ পশ্চিম বলতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে। চেহারায় শ্রদ্ধাপূর্ণ কেমন একটা গদগদ ভাব এসে হাজির হয়। কেন এই হীনম্মন্যতা? নিজের মতো করে এ প্রশ্নের এক ধরনের জবাব সে খুঁজে নিয়েছে। রোদ্দুর জানে, তার সমসময় এই হেজিমনি তীব্রভাবে কাটিয়ে উঠছে। নিজেদের আলো-বাতাস-ভূমিতে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের কবিতা।

‘পড়ুয়া’ থেকে বেরিয়ে লক্ষ্যহীনভাবে খানিকক্ষণ এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করে সে। একসময় আজিজ মার্কেটের পশ্চিমপাশের দোতালার সিঁড়িতে যেতেই সে খপ্পড়ে পড়ে জ্ঞানী আশরাফের। জ্ঞানী আশরাফ তার টোলে পাঁচ-ছ’জন অনুগত নিয়ে জ্ঞান বিতরণ করছেন। মোটা লেন্সের চশমার কোণা দিয়ে তাকে একনজর দেখেই নড়েচড়ে ওঠেন।

‘রোদ্দুর মাহাশয়! আসেন। বসেন।’ পিছু হটার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় রোদ্দুর। জ্ঞানী আশরাফ বলতে থাকেন, ‘আপনারা আজকালকার কবিরা তো কোনো কিছু না জেনে, না পড়েই বিদ্যার মহাসাগর হয়ে উঠেছেন।’

‘জ্বি ভাই’। রোদ্দুর ঠৌঁট কামড়াতে কামড়াতে স্বীকার করে।

‘আজকের যারা কবি তারা কেউই আধুনিক নন। এখনও আমি-তুমি, চাঁদ-তারা-পাখি-ফুল আর খোদা-দয়াল ইত্যাদি শব্দ সহযোগে দিস্তা দিস্তা আবর্জনা উৎপাদন করে চলছেন। অথচ আধুনিক কবিতায় এসব শব্দ অবশ্য বর্জনীয়।’

‘তাহলে কোন কোন শব্দ দিয়ে ভাই কবিতা লিখতে হবে?’ বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করে রোদ্দুর।

‘বাপুরে কবিতা বোধগম্য হবার বিষয় নয়। এটা উপলব্ধির বিষয়। এখনকার কবিরা সে ব্যাপারটাই জানে না। সাধে কি আর জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, “সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি”।’

কোন কোন শব্দ দিয়ে কবিতা লিখলে তা আধুনিক হয়ে উঠবে, রোদ্দুরের মনে হলো, এই প্রশ্ন সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেলেন জ্ঞানী আশরাফ। হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরও তার জানা নেই। তাই আবারো প্রশ্ন করল সে, ‘তাইলে ভাই কোন শব্দ দিয়ে কবিতা লিখব?’

এবার জ্ঞানী আশরাফ আরেক দফা নড়ে চড়ে বসেন। ‘আরে মিয়া, এখানে তো এই আলাপই হচ্ছে। আসেন বইসা পড়েন। না বইসা জ্ঞানের কথা শোনার কোনো বিধান নাই। এখনকার কবিদের মধ্যে আরেকটি বিষয় প্রকটভাবে অনুপস্থিত, তা হলো আদব। বুঝছেন?’

‘জ্বি ভাই।’

‘শোনেন। কবিতা লেখার আগে যে বিষয়টা জ্ঞাত হওয়া অতি আবশ্যক তা হলো শব্দের অর্থময়তা এবং ভাষা সাম্রাজ্যের রাজনীতি। আমরা সে বিষয়েই সামান্য ভূমিকা দিচ্ছিলাম মাত্র।’

মনে মনে প্রমাদ গোনে রোদ্দুর। এই বুঝি ঘণ্টা-খানেকের জন্য ফেঁসে যাওয়া গেল! এখন বিরক্তি সত্ত্বেও হাসি হাসি মুখে হজম করতে হবে সব কঠিন কঠিন কথা। খানিকটা ঝুঁকি নিয়েই তাই সে প্রস্তাব দেয় কয়েকটা সিগারেট কিনে নিয়ে আসার।

‘ভাই, বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া না দিলে আপনার কথা হজম হবে না। কয়েকটা শলাকা কিনে আনি। কী বলেন?’

‘আচ্ছা ঠিক আছে।’

জ্ঞানী আশরাফ আবারো জ্ঞানের কথায় নিজেকে ব্যাপ্ত করে আর সিগারেট কেনার কথা বলে সটকে পড়ে রোদ্দুর। শব্দের অর্থময়তা ফাঁকি দিয়ে, ভাষা-সাম্রাজ্যের পাঁচিল ডিঙিয়ে রৌদ্রস্নাত পার্কে এসে বসে সে। দেখে, রোদে জ্বলে উঠছে অধিক সবুজ ঘাস। তার নিচে স্যাঁতসেঁতে স্বস্তি। পিঁপড়ার দঙ্গল, কীটপতঙ্গের বসতি—নিঃশব্দ প্রাণের সমারোহ, সাবলীল। ঘাসঝোপে কাঠবিড়ালি লুকিয়ে রাখছে বাদাম, নাচতে নাচতে ছুটছে বাতাসের নূপুর। আনন্দে ঘাসফুল দুলছে, যেন ঘাড় দুলিয়ে গান গাইছে নার্সারি ক্লাস আর সস্নেহে তা দেখছে চির-উদাসীন প্রকৃতি।

এভাবে অনেকক্ষণ। একসময় সে খেয়াল করে, থমকে থাকা সূর্য আবারো হাঁটছে পশ্চিমে। একটু পরে স্নায়ু-ছেঁড়া চাপ কমাতে আসবে পুরো অবেসিটির শহর। দু’পায়ে পিষে দেবে ঘাসের কোমল শরীর। তার আগেই যদি, আহা! নির্জন কোনো চিলেকোঠায়, বাক্‌রহিত পাতাবাহারের বিষণ্নতায় আত্মগোপন করা যেত, ভাবতে থাকে রোদ্দুর। কিন্তু আত্মগোপনের মতো কোথায় সেই হিরণ্ময় নির্জনতা যেখানে স্বতোৎসারিত মহুয়া ফুলের ঘ্রাণ। কেমনতর সেই পাতাবাহার, যার চোখ থেকে অবিরাম ঝরে পড়ে খণ্ড খণ্ড মেঘের নামতা।

এসব প্রশ্ন ক্রমাগত আঁধার হয়ে আসে। এসব আঁধার ক্রমাগত প্রশ্ন হয়ে আসে উত্তর ও দক্ষিণ থেকে। ঈশান ও নৈর্ঋৎ থেকে আসে রাক্ষসের অট্টহাসি। তার প্রতিটি শূন্যগর্ভ ধ্বনিতে লেগে থাকা রক্ত ও স্বেদের নোনা স্বাদ মনে করিয়ে দেয় একদিন স্বাতী-তারার বুকেও দগদগে ক্ষত হয়ে চিত্রিত ছিল রক্তজবার মতো শতনিশি নির্ঘুম একজোড়া চোখ। সেই জোড়া চোখের প্রহারেই হোক কিংবা আসন্ন বিকেলের ঝুমঝুম পদধ্বনির কারণেই হোক হঠাৎ খুব অস্বস্তি লাগতে শুরু করে রোদ্দুরের। সেই অস্বস্তি একসময় একদলা শুকনো কাশির মতো আটকে থাকে গলার মাঝে। ইগনোরও করা যায় না আবার খ্যাকারি দিয়ে সরানোও যায় না।

এই যখন অবস্থা ঠিক তখন মনে পড়ে কোথায় যেন যাবার কথা ছিল তার। মনে হয়, কে যেন আসবে! কার কথা ছিল আসবার? রেল স্টেশনে? বাস টার্মিনালে? লঞ্চ ঘাটে? কাকে কথা দিয়েছিল সে? কার জন্য কথা ছিল অপেক্ষা করার? না, এমনটা শুধু আজ দুপুরেই নয়, গতকাল দুপুরে, পরশু দুপুরে, বিগত শত শত দুপুরে, অসংখ্য বিকেলে, সন্ধ্যায়, ভোরে, মাঝরাতে তার মনে হয়েছে—কে যেন আসতে চায়, একটা হলুদ ট্যাক্সি নিয়ে তার অপেক্ষা করার কথা। কোথায়? রেল স্টেশনে? বাস টার্মিনালে? লঞ্চ ঘাটে?

কিছু মনে আসে না। স্মৃতিঘর আজ কুয়াশায় শা্দা। সেখানে ফুল ফোটে না, পাখি ডাকে না। শুধু একবার ঘুম থেকে জেগে আরেক ঘুমে যাবার মাঝে মনে হয় মাইল মাইল বিস্মরণকে পেছনে ফেলে অসংখ্য আলোকবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া হলো। ফলত কোথাও যাবার তাড়া আর নাছোড়বান্দা অস্বস্তিসমেত পার্কের ঘাস-ফুল-লতা-পাতা-পাখি ছেড়ে উঠে পড়ে সে। কিন্তু কোথায় যাবে? কী তার গন্তব্য? না, তার কোনো গন্তব্য নেই। অনেক মানুষেরই কোনো গন্তব্য থাকে না। তবে কি সে কোথাও গিয়ে জোর করে হাসিমুখ বলবে, এটাই তার গন্তব্য! এভাবেই কি বেশিরভাগ মানুষ গন্তব্য খুঁজে নেয়? গন্তব্য খুঁজে পাবার সান্ত্বনা বোধ করে?—এসব ভাবতে ভাবতেই সে চারুকলার সামনে এসে পড়ে।

শাহবাগ মোড়ে তখন কয়েক শ ছেলেমেয়ে রাস্তা অবরোধ করে বসে আছে। সমস্বরে স্লোগান দিচ্ছে তারা—ফাঁসি চাই! ফাঁসি চাই!! এই ছেলেমেয়েগুলোর মধ্যে নিশ্চয় কেউ পরিচিত আছে, থাকতে পারে এই সম্ভাবনায় জটলাটার দিকে এগিয়ে যায় সে। একটি মেয়ে দুলে দুলে গলা ফাটিয়ে মাইকে স্লোগান দিচ্ছে। তাকে ঘিরে বড়সড় একটা বৃত্ত রচিত হয়েছে। মেয়েটি বলছে, ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই!’ সবাই তার উত্তরে বলছে, ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই!!’ ওদের প্রতিবাদী-ক্ষুব্ধ মুখগুলোতে তাকায় রোদ্দুর। ভালো লাগে তার। কেন? কে জানে? সবাই তরুণ। কারো মাথায় জাতীয় পতাকা বাঁধা, জাতীয় পতাকার আদলে বানানো কারো কারো টি-শার্ট। অধিকাংশই জিন্স পড়া। বিক্ষুব্ধ, মেধাবী চেহারা। তাতে বিচ্ছুরিত দৃপ্ত শপথ। স্লোগানের তালে তালে তাদের মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। আবার নেমেও আসছে তালে তালে। সমস্বরে ধ্বনিত হচ্ছে—‘ফাঁসি! ফাঁসি!!’ দারুণ একটা ছন্দোবদ্ধ ব্যাপার!

ছেলেমেয়েগুলোকে ভালো করে দেখে সে। না, এখানে তার পরিচিত কেউ নেই। তারপরও জটলাটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে সে। তাদের সিরিয়াসনেস উপভোগ করে সে। রাষ্ট্রের অন্যায় আচরণে, বিচারব্যবস্থার অসঙ্গতিতে বিক্ষুব্ধ হয়েছে তারা, অপমানিত হয়েছে এবং রাস্তায় দাঁড়িয়ে তার প্রতিবাদও করছে। অদূরে এক দল পুলিশ। সশস্ত্র। তারপাশে জলকামান। খানিকটা দূরে কাঁটাতারের ব্যারিকেড। এদিক সেদিক শাদা পোশাকে ঘোরাঘুরি করছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। তাদের ওয়াকিটকি বিরামহীনভাবে যান্ত্রিক স্বরে নানা তথ্য দিচ্ছে। অবরোধের কারণে চারপাশে আটকা পড়েছে অসংখ্য যানবাহন। সেখানে অপেক্ষমাণ মানুষ রাজনীতি থেকে শুরু করে নানা প্রসঙ্গে কথা বলছে। চা-বিস্কিট-সিগারেট থেকে শুরু করে নামাজ শিক্ষা বই হয়ে গোলাপ আর বেলি ফুলের মালা পর্যন্ত নানা কিছু বিক্রি করছে হকাররা। সবমিলিয়ে যেন মেলা বসেছে একটা। ভালো লাগে রোদ্দুরের।

তবে বেশিক্ষণ সে আনন্দ-আমেজ উপভোগ করা সম্ভব হয় না। কারণ অনর্গল বেজে চলেছে পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটি। একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে একের পর এক কল আসছে। দু’তিনবার কেটে দেয় রোদ্দুর। কিন্তু তাতে কী! ভীষণ ধৈর্যের সাথে ওপাশ থেকে ক্লান্তিহীনভাবে কে যেন তাকে পাবার চেষ্টা করেই চলেছে। কে হতে পারে? গত দু’তিন বছরে মোবাইল ফোনে তার সাথে কথা বলার লোক কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। বন্ধুদের যে দু’একজন দু’এক মাসে খোঁজ-খবর নেয় তাদের নাম্বার তো সেভ করাই আছে। তবে কে এই নিঠুর কালাচাঁদ? রোদ্দুর একবার ভাবে সুইচড অফ করে দেবে, পরমুহূর্তেই মনে হয়, এমনও তো হতে পারে কেউ হয়তো সত্যিই ভীষণ প্রয়োজনে বা জরুরি কোনো তথ্য জানানোর জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। কে হতে পারে?


পৃথিবীতে ব্যাখ্যাতীত অনেক কিছুই ঘটে। আমরা যুক্তি দিয়ে সবকিছু মেলাতে চাই। কিন্তু যুক্তির বাইরেই তো ঘটে বেশিরভাগ ঘটনা। যাকে আমরা রহস্য বলে জানি।’


অবশেষে রোদ্দুর ফোনটি রিসিভ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে কারণে শাহবাগ মোড়ের হৈ-হট্টগোল থেকে সরে জাদুঘরের পেছনে শিল্পী নভেরা আহমেদ মিলনায়তনের দিকে এগিয়ে যায়। রিসিভ করে ‘হ্যালো’ বলতেই বুঝতে পারে নাম্বারটি অপরিচিত হলেও ওপাশের কণ্ঠস্বরটি পরিচিতই বটে!

‘হ্যাপি বার্থ ডে! কিরে কোথায় তুই? তোর বাসাতে গিয়ে পেলাম না। কোথায়, কার সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছিস?’

‘এটা কার নাম্বার?’ খানিকটা আচমকাই এ প্রশ্ন করে কৃতীর জন্মদিনের সম্ভাষণের জবাব দেয় রোদ্দুর।

‘যার নাম্বারই হোক, তাতে তোর সমস্যা কী? নাকি এখনও অধিকার ফলাতে চাচ্ছিস?’

কৃতীর প্রশ্নের জবাব দেয় না রোদ্দুর। সে দিব্যি দেখতে পায় জোড়া ভ্রূ কুঁচকে গেছে মেয়েটার। ফর্সা কপোল লালচে হয়ে উঠেছে। কৃতীর এ চেহারা বহুবার দেখেছে রোদ্দুর। রেগে গেলে মেয়েটাকে খুব সুন্দর দেখায়। আর সত্যিই তো একটা সম্পর্ক ভেঙে যাবার পর সে কার ফোন থেকে কল করেছে এ প্রশ্ন করাটাই তো অবান্তর।

‘তুই কোথায় বল তো রোদ? তোর সাথে দেখা করা দরকার। শোন, গতরাতে স্বপ্ন দেখেছি তুই সুইসাইড করেছিস। তোকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। মনে হচ্ছে তোর সাথে দেখা না হলে খুব সর্বনাশ হয়ে যাবে।’ রোদ্দুর নিঃশব্দ থাকায় আবারও বলে ওঠে কৃতী।

‘সর্বনাশ যা হবার তা তো হয়েই গেছে’—এ কথাটা জিভের ডগায় চলে এসেছিল। বহু কষ্টে সে তা সংবরণ করে। বলে, ‘আমি তো উত্তরা। আজিমের অফিস থেকে বেরোলাম। তুই বরং ঘণ্টাখানেক পর ছবির হাটে চলে আয়, ঠিকাছে?’

‘ঠিকাছে।’ নিশ্চিন্ত শোনায় কৃতীর গলা।

রোদ্দুর ফোন কেটে দেয়। শুধু তাই নয়, কী মনে করে সেটা সুইচড অফ করে ছুঁড়ে ফেলে নভেরা মিলনায়তনের পাশের পুকুরে। ভাবে, না, এই সময়ে এসে আর কোনো আবেগকে পাত্তা দেয়া ঠিক হবে না। রোদ্দুর স্বীকার করে, অনেক কিছুর মতো কৃতীও তার জীবনে স্পর্শকাতর ও বেদনাদায়ক একটি অধ্যায়। বলাই বাহুল্য, এই মেয়েটিকে খুব ভালো লেগেছিল। ভালোবেসে জীবনটাকে অর্থময় করে তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু কৃতীর সবকিছু সে মেনে নিতে পারে নি। রোদ্দুরের মনে হয়েছে ভালোবাসা এমন একটি জিনিশ যা আর কারো সাথে ভাগ করে নেয়া সম্ভব নয়। কৃতীর অসংখ্য ছেলেবন্ধু, তাদের কারো কারো সাথে আবার গভীর লিপ্ততা, কখনো কখনো প্রায়-প্রেমিকার মতো আচরণ, দিন নেই রাত নেই হুটহাট এখানে সেখানে চলে যাওয়া—এসব মেনে নিতে পারে নি সে। অথবা হয়তো সে-ই ভুল—যেমনটা কৃতী বলে। ছেলেগুলোর সাথে কৃতীর বন্ধুত্বের মধ্যে হয়তো সত্যিই কোনো পাপ নেই। সে-ই হয়তো সন্দেহবাতিকগ্রস্ত। সে-ই হয়তো অসুস্থ।

অসুস্থতা শব্দটি তার ভেতর দারুণ এক দুঃখবোধের জন্ম দেয়। কেন এরকম সে? কেন সে পারে না সব কিছু স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে? কেন শৈশবেই তাকে মাতৃহারা হতে হয়? কেন বিষয়-বাসনা আকৃষ্ট করে না তাকে? কেন মাথার ভেতর সর্বক্ষণ খেলা করে আলো-ছায়া-দৃশ্যের ম্যাজিক? কেন সে অস্বাভাবিক? অসুস্থ? এতসব প্রশ্নে জর্জরিত হতে হতে সে দেখে কাঁটাবনের দিক থেকে ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই’ স্লোগান দিতে দিতে পনের-বিশজনের একটা মিছিল এগিয়ে আসছে। মিছিলটাকে চলে যেতে দেয় সে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে। তারপর রাস্তা পেরিয়ে পিজি হাসপাতালের পেছন দিয়ে হাঁটতে থাকে পরীবাগের দিকে। তখন ক্ষয়ে যাওয়া সূর্য পশ্চিমের দিগন্তে রক্তিমাভা ছড়িয়ে নিজের প্রস্থানের চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে ফেলেছে। জ্বলে উঠেছে স্ট্রিটলাইট। যানবাহন আর ছোট-বড় ভবনের আলোগুলো জ্বলে উঠতে উঠতেই এই শহর পরিণত হতে থাকে জাদুবাস্তবতার এক শহরে, অসম্ভবের শহরে।

মাথার ভেতর হাজার খানেক ঝিঁঝিঁর কোরাসে অস্থির রোদ্দুর রায় সাকুরা বারের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই হকচকিয়ে যায়। অসংখ্য মানুষ গিজগিজ করছে ভেতরে। এত মানুষ তবে ভেতরে ভেতরে অসুখী! এত একা! নিঃসঙ্গ! নয়তো সন্ধ্যা নামতে না নামতেই কেন এত মানুষ এসে ভিড় করবে পানশালায়? মাতাল হয়ে বাস্তবতা ভুলবে? খিস্তিখেউড় করবে? আলো-আঁধারের ভেতর দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে এলে রোদ্দুর দেখে প্রতিটা টেবিল ঘিরে গোল হয়ে বসে আছে পানরত মানুষ। ফাঁকা নেই কাউন্টারও। আপাতত এখানে ঠাঁই মিলছে না এমনটি ভেবে যখন সে বেরোবে বেরোবে করছে তখন দেখে দক্ষিণে, কোণার দিকে, প্রায় অন্ধকারের ভেতর একটা সিঙ্গেল টেবিলে একজন বসে আছেন। টেবিলের অন্য চেয়ারটা খালি। শেয়ার করা যাবে কিনা তার অনুমতি নিতে রোদ্দুর কাছাকাছি যেতেই লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে যায় সে। লোকটি পাশের খালি চেয়ারটি দেখিয়ে দিয়ে বলে, ‘আরে রোদ্দুর রায়! আসুন আসুন। আপনার জন্যই টেবিল সাজিয়ে, অর্ডার দিয়ে বসে আছি।’

‘আমার জন্য? মানে ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না!’ আমতা আমতা করে সে। তার বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটেই না।

‘হ্যাঁ, তা আর বলছি কী! আপনি ভোদকা খান বলেই আমিও হুইস্কি বাদ দিয়ে আজ স্মিরনভের অর্ডার করে বসে আছি। বাদাম দিতে বলি? লেবু-শসা? নাকি কাবাব-টাবাব খাবেন? সঙ্কোচ করবেন না প্লিজ।’

রোদ্দুর ফাঁকা চেয়ারটায় বসে পড়ে। তার মুখ থেকে যেন কথা সরে না। এখনও আলো-আঁধারির ভেতর সে লোকটিকে চিনে নিতে পারে নি পুরোপুরি। একবার চেনা চেনা মনে হলেও পরক্ষণেই আবার মনে হচ্ছে কস্মিনকালেও দেখে নি তাকে। মনে হচ্ছে লোকটি মুচকি মুচকি হাসছেন। সে হাসি তাকে আরো রহস্যময় করে তুলছে। প্রাথমিক বিস্ময়ের ধাক্কা কাটিয়ে সে বলে, ‘ধন্যবাদ। কিন্তু আমি ভোদকা পছন্দ করি সেটা আপনি জানলেন কিভাবে? তাছাড়া, কিছু মনে করবেন না, হয়তো আপনি চেনা, হয়তো আগে কোথাও আলাপ হয়েছিল, কিন্তু এখনও ঠিক আপনাকে স্মরণ করতে পারছি না।’

‘আরে পরিচয় হলে হয়েছিল। না হলে আবার হবে। সবার আগে আপনার জন্মদিন সেলিব্রেট করা যাক। হ্যাপি বার্থ ডে রোদ।’ লোকটা খানিকক্ষণ থামে, তারপর মদের গ্লাস শূন্যে তুলে ধরে বলে, ‘চিয়ার্স।’

জন্মদিনের কথা শুনে রোদ্দুরের বিস্ময়ের পারদ আর এক ডিগ্রি বাড়ে। এ লোক তো দেখি সব কিছু জেনে বসে আছে! গোয়েন্দা নাকি! মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেও গ্লাস টেনে নেয়। ঠোকাঠুকি করে বলে, ‘চিয়ার্স।’

বড় করে ঘন ঘন কয়েকটা চুমুক দেয় লোকটি। ‘দুপুরে রিকশায় যেতে যেতে আমিই তো আপনাকে বললাম, সন্ধ্যায় দেখা হবে। তখনও আপনি আমাকে চিনলেন না। যা হোক, আমি আপন। আপন মাহমুদ। কবিতা-টবিতা লিখি আর কী!’

এবার যেন ইলেকট্রিক শক খায় রোদ্দুর। তার শরীরের ভেতর দিয়ে ভয়ঙ্কর এক অনুভূতির স্রোত বয়ে যায়। হাত কেঁপে ওঠে। বরফশুদ্ধ পানীয় ছলকে পড়ে যায় টেবিলের ওপর।

‘তা কী করে সম্ভব! আপনি তো সুইসাইড করেছেন। মানে, কিছু মনে করবেন না, আপনি তো ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন!’

‘হ্যাঁ, সেটাই সত্যি। ১২ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে আমি মারা গেছি। সকলেই সেটা জানে।’

‘তাহলে আমি কার সাথে কথা বলছি? আপনি কে সত্যি করে বলুন তো?’ ভূতগ্রস্তের মতো চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে সে।

‘আরে বসুন! উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? আমিই আপন মাহমুদ। এই যে দেখুন আমাকে ভালো করে।’ লোকটি বিস্ময়াক্রান্ত রোদ্দুরের দিকে ঝুঁকে আসে।

শূন্য দশকের সিনিয়র কবি আপন মাহমুদের সাথে আলাপ-পরিচয় না থাকলেও তাকে চিনত রোদ্দুর। অনেকদিন তাকে আজিজ মার্কেটে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দেখেছে। শ্যামলা রঙের মানুষটির সাথে এই লোকটির চেহারা তো মিলে যাচ্ছে হুবহু!

‘তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? এর ব্যাখ্যাই বা কী?’

‘আরে সবকিছুর ব্যাখ্যা চান কেন? পৃথিবীতে ব্যাখ্যাতীত অনেক কিছুই ঘটে। আমরা যুক্তি দিয়ে সবকিছু মেলাতে চাই। কিন্তু যুক্তির বাইরেই তো ঘটে বেশিরভাগ ঘটনা। যাকে আমরা রহস্য বলে জানি।’

‘তাহলে বলছেন যে আপনিই আপন মাহমুদ?’

‘আরে হ্যাঁ। অবাক হবেন না। এমনটা হরহামেশাই ঘটছে। আমার ঘটনার দিন, মানে যেদিন আমি মারা গেলাম সেদিন তো আমার শামীম কবীরের সাথে দেখা হয়েছিল। শামীম কবীরের নাম শুনেছেন? নব্বই দশকের কবি। আপনার মতো আমিও প্রথমে বিশ্বাস করি নি। আপনার মতোই চমকে উঠেছিলাম। কিন্তু এটাই সত্যি যে আমরা এই টেবিলটাতেই মুখোমুখি বসে পান করেছিলাম। শামীম ভাই ড্রাই জিন পছন্দ করতেন। কিন্তু আমার অনারে সেদিন তিনি হুইস্কি খেয়েছিলেন।’

‘তাই নাকি! আচ্ছা!’

‘হ্যাঁ। তবে এসব প্রসঙ্গ থাক। মৃত মানুষদের নিয়ে কথা বলতে ভাল্লাগে না। আমরা বরং কবিতা নিয়ে কথা বলি। আপনি কি আমার কবিতা পড়েছেন?’

‘আপনার সব কবিতা আমার পড়া হয় নি। স্বীকার করছি। তবে সকালের দাড়ি কমা বইটা পড়েছি। শুনেছি সফেদ ফরাজী ভাই আপনার অগ্রন্থিত কবিতাগুলো সংগ্রহের চেষ্টা করছে। আপনার বন্ধুরা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আপন মাহমুদ সমগ্র নামে একটি বই বের করার।

‘তাই নাকি? যাক, বন্ধুরা যে এখনও আমাকে ভুলে যায় নি ভেবে ভালো লাগছে। তা আপনার আলো-আঁধারের পরম্পরার খবর কী?’

এ প্রশ্নের উত্তরে নিজের অজান্তেই বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে রোদ্দুরের। সেটা লক্ষ করে আপন মাহমুদ বলেন, ‘এটা নিয়ে হতাশ হবার কিছু নেই। শিগগিরই আপনার বইটি প্রকাশিত হবে। দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি। তাছাড়া এ পর্যায়ে এসে বই প্রকাশ পেলেই কী, না পেলেই বা কী! প্রকাশের চেয়ে কবিতা লিখতে পারাটাই জরুরি। কি বলেন?’

‘জ্বি ভাই।’

‘আমি কিন্তু আপনার বেশ কিছু কবিতা পড়েছি। ভালো লেগেছে। আপনার অরুণিমা সিরিজের কবিতাগুলো কিন্তু দারুণ। আবেগ আর আকুতি এমন হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে যে মনে ভীষণ দাগ কেটে যায়। একটি সত্যিকারের ভালোবাসার সম্পর্ক ব্রেক আপ না হলে এমন কবিতা লেখা সম্ভব নয়।’

‘থ্যাংক ইউ ভাই। আপনিই প্রথম বললেন। এভাবে এর আগে আর কেউ অ্যাপ্রিশিয়েট করে নি।’ রোদ্দুরের কণ্ঠ থেকে কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ে। দুজনই বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকে। এর মাঝে ওয়েটার দুজনের জন্য আরো দুপেগ করে ভোদকা দিয়ে যায়।

‘রোদ্দুর, আপনাকে আমার কেন পছন্দ হয়েছে জানেন?’ আপন মাহমুদ জিগ্যেশ করে। তারপর উত্তর দেবার সময় না দিয়ে সে নিজেই জবাব দেয়। ‘কাব্যভাষার দিক থেকে কিছুটা আলাদা হলেও বিষয়বস্তুর দিক থেকে আপনার-আমার কবিতার মধ্যে সাদৃশ্য আছে।’

‘কী রকম ভাই? একটু খুলে বলুন তো।’ মোট কয় পেগ খাওয়া হলো মনে নেই, তবে রোদ্দুরের বেশ খানিকটা ঘোর এসেছে। সারাদিনের নানা ঘটনার পর এই সাঁঝের বেলা সত্যিকারের আনন্দে তার মন চাঙা হয়ে উঠেছে। তবে কি এটা অগ্রজ কবির কাছ থেকে স্বীকৃতি পাবার ফলাফল? কে জানে?

‘যেমন ধরুন আপনার কুয়াশায় মার মুখ সিরিজের কবিতাগুলোর সাথে আমার মা প্রজাপতি ও অন্যান্য ছায়া সিরিজের বেশকিছু কবিতার মিল রয়েছে। যেমন : মায়ের মুখ মনে এলে নিজেকে রক্ষকশূন্য গোলবার মনে হয়…। অথবা ধরুন…’

‘অথবা ধরুন, এবার বলে ওঠে রোদ্দুর, ‘আমার মায়ের মুখ মনে করে পৃথিবীতে শ্মশান/ নেমে আসে— চিড়িয়াখানার হরিণশূন্য খাঁচাটিও/ এগিয়ে আসে কাছে—আমি বরফরাজ্যের সর্বশেষ/ অধিকর্তার মতো পায়ের তালুতে হাত রেখে মেপে/ নিই পথ—বুঝে নিই প্রশান্তি ও মৃত্যুর তফাৎ…’

‘ঠিক ধরেছেন। দু’জনে দু’সময়ে প্রায় একই রকম কথা বলেছি আমরা। আপনি খুব ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছেন। সেরকম কোনো স্মৃতি নেই বললেই চলে। যে কারণে মায়ের মুখকে মনে হচ্ছে ঘন কুয়াশার চাদর। আমার সেরকমটা না হলেও মাকে নিয়ে হাহাকারের ধরনটা অনেক কাছাকাছি।’

পরিবেশটা হঠাৎই ভারি হয়ে উঠতে চায়। সেটা বুঝতে পেরেই আপন মাহমুদ প্রসঙ্গ পাল্টান। বলেন, ‘আপনার অরুণিমারও তো অনেক বন্ধু। অনেক গল্প তাদের। অনেকটা যেন আমার গল্প : শরীরের মতো বড় কবিতাটির মতো : গল্প শুনি তোমার মুখে, গল্পগুলো শরীরের মতো বড়। গল্পগুলো ভালোবাসার চে’ ছোট।’


ট্রেনে কাটা পড়া যুবকের মৃত্যুখবর ছড়িয়ে পড়ে খুব সকালেই। কারওয়ান বাজার রেললাইনের পাশের বস্তির এক বৃদ্ধ রাতভর সবজি টোকানোর পর ঘরে ফেরার সময় মৃতদেহটি প্রথম দেখতে পান।


এই রসিকতায় দু’জনেই হেসে ওঠে সশব্দে। আড্ডা এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে গড়াতে থাকে। দশক বিভাজনের রাজনীতি, সমালোচনার ক্ষেত্রে কন্সপিরেসি অব সাইলেন্স, হাংরি ও মব পোয়েট্রি, ছন্দ বনাম গদ্য বিতর্ক, সুফিজম ও বাংলার ভাবান্দোলন, আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক কবিতা, লিটল ম্যাগ ও প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা—বাদ পড়ে না কোনো প্রসঙ্গই। ওদিকে ওয়েটারও আরো কয়েক দফা গ্লাস ভরিয়ে দেয় তাদের। একসময় বিল চুকিয়ে দিয়ে উঠে পড়ে দু’জনেই। রাস্তার পাশে এসে বিদায় নেবার সময় আপন মাহমুদ ম্লান হেসে আরেকবার জন্মদিনের সম্ভাষণ জানান রোদ্দুরকে।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পানশালা থেকে মুক্ত বাতাসে বেরিয়ে মুহূর্তেই ঘেমে নেয়ে ওঠে রোদ্দুর। কেমন যেন পা টলতে থাকে তার। মনে মনে স্বীকার করে নেয় যে, এক বসাতেই অনেক বেশি মাল টানা হয়ে গেছে। খুব ঘোর লাগে তার। সে হাতিরপুলের মেসবাড়ির দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু এপথ সেপথ ঘুরে অনেক পরে নিজেকে আবিষ্কার করে শাহবাগ মোড়ে। তার চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চায়। অনেক কষ্টে সে চোখ খুলে দেখে তখনও শাহবাগ মোড় আটকে রেখে কয়েক শ ছেলেমেয়ে ‘ফাঁসি ফাঁসি’ স্লোগান দিয়ে চলেছে। শাহবাগ থেকে হাতিরপুল কোন দিকে ঠিকঠাক পথ নির্দেশ করে আবারও হাঁটতে থাকে সে। কতক্ষণ হাঁটে কে জানে! কিন্তু হাতিরপুল নয়, এবার সে নিজেকে আবিষ্কার করে একটা রেলপথের ধারে। সেখানে সে নিজেকে খুঁজে পেয়ে ভীষণ বিরক্ত হয়। শ্রান্ত রোদ্দুর বন্ধ হয়ে আসা চোখ মেলে দেখে এখানেও আলো-আঁধারি আর তার মাঝে নিশিজীবী কয়েকটি মেয়ে উৎকটভাবে সেজেগুজে, সস্তা পারফিউম মেখে খদ্দের ধরার জন্য অপেক্ষা করছে।

খুব বিব্রত বোধ করে রোদ্দুর। সেটা বুঝতে পেরেই হয়তো মেয়েগুলো খিলখিল করে হেসে লুটিয়ে পড়তে থাকে। তাড়াহুড়ো করে উল্টো পথে হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খায় সে। আর তখনই কে যেন তার নাম ধরে ডাক দেয়।

‘রোদ, রোদ্দুর।’

‘কে, কে ডাকে আমাকে?’

‘আমি।’ দেহপসারিণীদের মাঝ থেকে এক তরুণী এসে তার হাত ধরে মুখোমুখি দাঁড়ায়।

‘কে তুমি? আমার নাম জানলে কিভাবে?’

এ প্রশ্নে মেয়েটি আবারও খিলখিল করে হেসে ওঠে। মেয়েটির ঠোঁটে কড়া লিপস্টিকের প্রলেপ। শরীর থেকে অবশ্য ভেসে আসছে লেবু ও লবঙ্গের ঘ্রাণ।শাড়িই পড়েছে সে। কিন্তু শরীরের সাথে এমনভাবে পেঁচিয়ে যে একটা ভরাট স্তন প্রায় উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। মেয়েটির দু’হাতে রেশমি চুড়ির গোছা। হাসির দমকে তা রুমঝুম করে বেজে উঠছে। মরিয়া হয়ে তার হাত ছাড়িয়ে নিতে চায় রোদ্দুর।

‘কে তুমি? এভাবে পাগলের মতো হাসছে কেন?’

‘পাগলের মতো প্রশ্ন করছিস বলেই হাসছি। আমাকে এখনও চিনতে পারছিস না?’

মেয়েটার কণ্ঠ এত মধুর লাগে কেন? সে কি জাদু জানে? খুব তৃষ্ণা পায় রোদ্দুরের। নিজেকে শান্ত ও স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে গভীর অভিনিবেশ সহকারে মেয়েটির দিকে তাকায় সে।

‘সত্যিই চিনতে পারছি না। কে তুমি? আমার নাম জানো কিভাবে?’

‘আবারো পাগলের মতো প্রশ্ন! আরে বাছা, আমি তোর মা। ছায়া। ছায়ারানী রায়। আমাকে চিনতে পারছিস না।’

‘মা?’ সব নেশা ছুটে যেতে চায় রোদ্দুরের। সে খুব ভালো করে দেখতে থাকে মেয়েটার চেহারা। এতকাল ফ্যামিলি ফটো অ্যালবামে মা বলে যে ভদ্রমহিলাকে সে দেখেছে তার চেহারার সাথে এর মুখের আদলের বেশ মিল আছে।

‘কিন্তু তুমি এত রাতে এখানে কী করছ? আর তোমার সাজ পোশাকই বা এমন কেন?’

‘তোর আজ জন্মদিন আর আমি আসব না। আর সাজ-পোশাক? সে অনেক কথা। ধীরে ধীরে বলছি সব। কিন্তু তোকে এমন ক্লান্ত দেখাচ্ছে কেন রোদ? আহা রে! চোখের নিচে কালি জমে গেছে। কত রাত ঘুমোস নি খোকা? আয় তোকে ঘুম পাড়িয়ে দিই।’

মেয়েটি তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। মনে মনে প্রতিরোধের কথা ভাবলেও সম্মোহিতের মতো মেয়েটির পিছনে পিছনে হেঁটে যেতে থাকে রোদ্দুর। খানিকটা দূরে, যেখানে অন্ধকার আরেকটু জমাট, সেখানে গিয়ে মেয়েটি স্লিপারের ওপর বসে। রোদ্দুরকে তাগাদা দেয় তার কোলে মাথা রেখে শোবার। আর রোদ্দুরও কী পাগল! সেই নির্দেশ মেনে সত্যিই মেয়েটির কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। মেয়েটি তার চুলে বিলি কেটে দিতে থাকে। রোদ্দুর যেন এক শিশু, এমনভাবে ঘুম পাড়ানি গানও গাইতে শুরু করে। খুব শান্তি লাগে রোদ্দুরের। দু’চোখ ভেঙে ঝমঝমিয়ে নেমে আসে ঘুম। দারুণ শান্তির ঘুম। রেলপথে ওই মেয়েটির কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে সে।

দুই.
ট্রেনে কাটা পড়া যুবকের মৃত্যুখবর ছড়িয়ে পড়ে খুব সকালেই। কারওয়ান বাজার রেললাইনের পাশের বস্তির এক বৃদ্ধ রাতভর সবজি টোকানোর পর ঘরে ফেরার সময় মৃতদেহটি প্রথম দেখতে পান। কিছুক্ষণের মধ্যে মৃতদেহটি ঘিরে রচিত হয় উৎসুক মানুষের বৃত্ত। খবর পেয়ে আসে খবরের কাগজ আর টেলিভিশনের সাংবাদিকরা। আসে পুলিশও। লাশের শরীর তল্লাশি করে কোনো পরিচয় পত্র মেলে না। তবে প্যান্টের পকেটে কয়েকটি কবিতা পায় তারা। সাংবাদিকরাই প্রথম এগুলোকে কবিতা বলে শনাক্ত করে। কবিতার নিচে স্পষ্ট করে নাম লেখা আছে—রোদ্দুর রায়। তখন উপস্থিত সাংবাদিকদের কেউ কেউ স্মরণ করতে পারেন কোনো পত্রিকায় বা লিটল ম্যাগাজিনে এ নামের কারো কবিতা তারা পড়েছেন। ফটো সাংবাদিকদের মধ্যে যারা বয়োজ্যেষ্ঠ এবং প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই পেশায়, তাদের কারো কারো মনে পড়ে, ঠিক একুশ বছর আগে রেলপথের এই জায়গাটিতেই আত্মহত্যা করেছিল এক তরুণী গৃহবধূ। স্মৃতি হাতড়ে তার নামও মনে পড়ে—ছায়রানী রায়।

একথা সেকথা, নানা আলাপে সময় গড়াতে থাকে। প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে তেজগাঁও থানা পুলিশ লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। প্রাথমিকভাবে এই মৃত্যুকে পুলিশের কাছে আত্মহত্যা বলে মনে হয়। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হবার জন্য, অন্তত একটি সুইসাইড নোট পাবার জন্য, তারা যুবকের পকেটে থাকা কবিতাগুলো আলামত হিশেবে গ্রহণ করে।

যুবকের পকেটে থাকা ছয়টি কবিতা ছিল এরকম :

১.
এক পা পথের শেষে সবুজের
শয্যায় বিশ্রামরত
অন্য পা বন্ধুর প্রান্তরে হোঁচট
খেয়ে অতীব বিব্রত
দুয়ের ওপর দাঁড়ানো নশ্বর
ধারণার মতো আমি;
আমার বুকের পাঁজর পেঁচিয়ে
স্বর্ণলতিকার ঝাড়
আমার দু’চোখ জুড়ে কক্ষচ্যুত
নক্ষত্রের অন্ধকার
আমার মাথায় ঝড়ের তাণ্ডব—
গর্জনশীল পাগলামি!

২.
কয়েকটি বিশীর্ণ পঙ্‌ক্তি রচিত হবার পর গ্রাস করে অন্ধকার। নৈঃশব্দ্যে হাত পেতে বসে থাকি অন্ধ ভিখারি। একটা করুণ হাওয়া গান হয়ে বাজে। মৌচাকভর্তি গুঞ্জন ক্রোধ নিয়ে তেড়ে এলে ঝরাপাতার মর্মর হয়ে ওঠে দুর্বোধ্য গদ্য। বাঁধভাঙা তোড়ে আসে ঘণ্টাধ্বনি, দৃশ্য, গন্ধ, অস্পষ্ট কিছু মুখ। তাদের সমন্বিত সন্ত্রাসে মুখ গুঁজে পড়ে থাকি। চেতনা আলাদা হয় দেহ থেকে। দেহ ছড়িয়ে যায় ভগ্নাংশে। একসময় ফিরে যায় গুঞ্জন। ফেরে ধ্বনি, দৃশ্য, গন্ধ। ভাষাদেবতা মুচকি হেসে আবারও নীরব হোন। নৈঃশব্দ্য ফিকে হলে ঢলে পড়ি ঘুমে। ভোরের আলো না ফোটা পর্যন্ত প্রতিদিন মৃত্যু হয় আমার।

৩.
ধুঁকছে কমলা আলোর বিষণ্ন বিকেল
অলিগলি, রাজপথ ও ফুটওভার ব্রিজে।
ত্রস্ত নারীর স্তনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে
ব্যস্ত জনস্রোত, চোরাদৃষ্টি আর বৃষ্টি—
ফাগুনের। শহরের শেষপ্রান্তে বসন্ত-
বাতাসে তিলক-কাটা শেমিজ উড়ছে;
কুণ্ডলী পাকিয়ে ওঠা সাঁঝধুপের ধোঁয়া
শুষে নিচ্ছে চারপাশের দূর্বাসিত হাওয়া।
অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে পলাশ-ঝরা পথ
ম্লান চোখে ঘন হচ্ছে সন্ধ্যার গুঞ্জন।

৪.
এক ঘুম থেকে আরো গভীর ঘুমের হৃদয়ে গিয়ে দেখি লাল-শাদা রডোডেনড্রন ফুটে আছে থরে থরে। মৃত্যুকে নিয়ে তখন যা কিছু ভাবি সব সুন্দর হয়ে ওঠে—ঘেয়োকুকুরের জিভ থেকে খসা লালা, ঝমঝমিয়ে ছুটে আসা রেলগাড়ি, কুষ্ঠরোগীর ঢেকুর, আলোর চারপাশে বৃত্তাকারে আবর্তিত মথ, সবকিছু। তখন মৃত্যুর সৌন্দর্যের ভেতর খুঁজে পাই অনন্তের জিরোপয়েন্ট। পথ নির্দেশিকা নয়, হাহাকারের বাঁশি অনুসরণ করেই যেতে হবে সেখানে। বেলা শেষের শঙ্খধ্বনি বাজে। শেষ স্টেশনে মায়ার ফাঁদ পেতে আছে জীবন, তার আগেই আমাকে নেমে যেতে হবে কোনো শূন্য নির্জন প্লাটফর্মে।

৫.
এই উত্থিত অন্ধকার সংকুচিত হবার আগেই অরুণিমা তাকে মুখে পুরে নাও। জ্বলজ্বল করে জ্বলুক শুধু তোমার চোখ। বিড়ালের আনখর শীৎকারের মতো হাসুক রেটিনার টঙ্কার। ভ্রূণহত্যার সান্দ্ররাতে অপদেবতার মুখ শুষে নিক তোমার যোনিজ লবণ। জঙ্ঘার এই বেতসবন থেকে পালিয়ে আমি ঘুমিয়ে রবো মৃত নক্ষত্রের ক্রন্দনে। কেননা তোমার স্তনের ফর্সায় স্পষ্ট হচ্ছে লেক্সোন্যাটিলের মতো বোবা ফুল। ফুটে উঠছে দুঃখদিনের আভাসগুলো আর দেখো স্বমেহনে ভেসে যাচ্ছে নিঃসঙ্গ বিভাবরী। অরুণিমা, তুমি কি দেখতে পাও? মানুষেরাও ঈশ্বরের মতো জন্মান্ধ কেন?

৬.
মা মেঘের পেছনে পেছনে ছুটছে খুদে সব মেঘশিশু। কাজলকালো দিঘির জলে সে দৃশ্য হুমড়ি খেয়ে চিত্রায়িত হতে দেখছে ডানকিনির ছানাপোনারা। আর আমি মেঘবন্ত আকাশের নিচে, টলমলে জলের ধারে ডুকরে উঠা শূন্যতাকে আঁকড়ে ধরে বসে আছি। শিশিরের মাঝে কারো অশ্রুজল মেশানো থাকে না জেনেও সমস্ত শীতকাল ঘন কুয়াশাকে মা ডেকেছি। নির্জন রেলপথে কান পেতে শুনেছি দূরের বাঁকে অপস্রিয়মাণ তার নূপুরের শব্দ। আজ আরেকবার জরায়ুর আঁধারে ডুব দিয়ে আলোকিত স্তন্য তুলে আনার নির্দেশ ফেরি করছে হাওয়া। এবার তবে যাই, ঘুম?

শহীদুল রিপন

জন্ম ১৪ ফেব্রুয়ারি; উকিলপাড়া, নওগাঁ। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ—
শীতঘুম এইবার যাই [ঐতিহ্য, ২০১২]
প্রবল পার্পল কম্পন [ঐতিহ্য, ২০১৫]

ই-মেইল : shahidulislamripon@yahoo.com

Latest posts by শহীদুল রিপন (see all)