হোম গদ্য গল্প রহস্যের জলজ রাত

রহস্যের জলজ রাত

রহস্যের জলজ রাত
779
0

শোঁ শোঁ বাতাস বাইরে। তর্জার বেড়া দেওয়া ঘরে তেরচা ফালি ফালি ফাঁক দিয়ে শুক্রাণুর আভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার মতো বাতাসের ফিনফিনে কণা দেদারসে মাথা ঠেলছে। গত কয়েকটা দিন তুমুল তুফান গেছে এ তল্লাটে। সাক্ষী হিশেবে তখনো দণ্ডায়মান আছে শেষরাতের আধা উপড়ানো হাবুল্লা দাদার বেলগাছ, বেশ কটা নরছা গাছ মিরালি বাড়ি’র। আজও সুবিধা ঠেকছে না। ঝড়-বাদলা শুরু হলে বেশ কয়েকদিন নিয়ম করেই হয়। দেখা গেল আজ এশার সময় খুব করে বৃষ্টি হলো পরদিন এশার আশেপাশ সময়ে সেরকম ধাঁচেই আবারো এল বৃষ্টি। যেন এটা জানা কথা। এতকিছু জানার পরও দেখা গেল অইদিন সুমেল গেল আলাইবাড়িতে। গিয়েছিল বিকালেই। তখন আকাশ এত বিষণ্ণ ছিল না। মেঘের কয়েকটা ভাঙা পর্বত তখন আকাশের উত্তর কোনায় উড়ছিল। রোদের উচ্ছিষ্ট ছিল পাতায় পাতায়। ঘন অন্ধকার কোথাও ছিল না। তবে দু-একটি চতুর-চঞ্চল বাতাসের হালকা মিছিল চলছিল এ গাছ হতে ও গাছ, নিচু জলমগ্ন মাঠ বেয়ে বেয়ে। আলাইবাড়ি মুখ্যত আলাইমিয়া দাদার একান্নবর্তী পরিবারের শেষ নিদর্শন। এ বাড়ি বিখ্যাত যে কারণে তা হলো একটি প্যানাসনিক রঙিন টিভি। আলাইদাদার বড় ছেলে তাইজুল কাকার ঘরে ছিল টিভিটা। যদিও পুরো গ্রামে আরেকজনের ঘরে একটা শাদাকালো টিভি ছিল বৈকি তবে তা সুমেলের আত্মীয়ের মধ্যে পড়ে না বিধায় সংকোচ এড়াতে সে অই সানাউল্লার বাড়িতে কোনোদিন যায় নি। সুমেল সাড়ে ৩টার ছায়াছবি শেষ করে ভেবেছিল সবার সাথে বাসায় ফিরে যাবে কিন্তু মাগরিবের আজানের পর কী এক অজানা কারণে তার লোভ হয় সে আলিফ লায়লাটা দেখেই একবারে বাসায় যাবে। সে আরও ভাবে হয়তো ততক্ষণে বৃষ্টি নিশ্চিত কমে যাবে। বাতাস বইছিল জোরে। রাত সাড়ে ন’টার উপরে তখন, সুমেল আলাইবাড়ি থেকে বের হয়েছে মাত্র। আলাই দাদি অবশ্য সাথে কুপি দিতে চেয়েছিল কিন্তু সুমেল সেটা অযোগ্যতা ঢাকার ছলে ফিরিয়ে দিয়েছে। খালি পা সুমেলের। ইংলিশ প্যান্ট হাঁটু ছুঁই ছুঁই। সুমেল উঠোন পার হয়ে ধানখেতের দিকে হাঁটা দেয়। বেশ দ্রুতই আকাশে বিজলির বহর বেড়ে যাচ্ছিল তখন। থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকানোর ফাঁকে ফাঁকে দেখে নেওয়া যাচ্ছিল ভেজা পথ। তাতে পতিত ছিল ভেজা কিন্তু উড়ন্ত জিগার গাছের কাঁচাপাতা ও ডাল। এই ডাল আস্তই ভেঙে পড়েছে পথে। সামনের ধানগাছগুলোকে অনুমান করা যাচ্ছিল যেন অন্ধকারে স্তব্ধ, বাতাসে কুপোকাত আর বৃষ্টি জলে জবুথবু। সেই কখন এশার আজান পড়েছে চারগ্রামে, সুমেলভাবে। সুমেলের কেবল ভাবনা হচ্ছিল তার মায়ের জন্য। কারণ সুমেল জানে তার মা খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তখন।

বিকেলেই বলেছিল—‘আলিফ লায়লা দেখার দরকার নেই সুমু, মাগরিবে চলে আসবি। ভারি মেঘ করছে এ ক’দিন।’

ভাবতে ভাবতে সরসর সরে যাচ্ছিল বৃষ্টির জল পা ছুঁয়ে ছুঁয়ে। গলগল করে জল নেমে যাচ্ছিল আলাইবাড়ির বুকটান উঠোন থেকে। ঘরের পেছনে টিনের চালের সমান্তরাল বৃষ্টির ঝরনা বিজলির ক্ষণিকের আলোর ছটায় অতিলৌকিক লাগছিল। মনে হচ্ছিল নুহের নৌকাকে ভাসানোর জন্য যে তাবৎ জলের দরকার তা ওই রাতেই জোগাড় হতে হবে। এ যেন এইরাতের শপথ। উপরে অঙ্গুলিচিহ্নে কে বুঝিয়ে যেন দিচ্ছেন এ সমস্ত। ঠান্ডা হিমশিতল জল তখন সুমেলের পায়ে। বুকের মাঝখানটায় মায়ের মুখ গেঁথে আছে সন্ধ্যা থেকেই। বেড়ে রাখা গরম ভাত হয়তো ঠান্ডা হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। স্কুলের পড়ার কথা হয়তো তার দুশ্চিন্তায় নেই এখন। ছেলের শান্ত ও ফরসা মুখ কেবলি হয়তো মাথার মধ্যে ঘুরছে তার মায়ের। কী বাদলা ভীষণ এ রাতে!


‘বাপ, পা হেরে গেলে হেরে যায় জীবন, দৌড় একটি জরুরি কাজ সেখানে জীবন সরাসরি গতির গোলাম।’


সূচের মতো তীক্ষ্ণ লাগছিল বৃষ্টি। সুমেল পারলে যেন এক লম্বা দৌড়েই পৌঁছে যায় মায়ের কাছে। ওই তো মাত্র তো কয়েকটা ধানখেত মাত্র। ওপারে টিম টিম জ্বলছে আলো। বৃষ্টির অগোছাল আক্রমণে প্রায় তছনছ এই রাতের ভেজা গ্রাম। ঠান্ডা জলের আকাশ বেয়ে উপরে উড়ে যাচ্ছিল ভেজা পাখি।

তখন এক অবাক ঘটনা ঘটে। সুমেলের এক পা সহসাই ধানের খেতের আইলে পিছল খেয়ে কাদায় ঢুকে যায়। ধানক্ষেতের ভুরভুরে কাদায়। এক ঝটকায় কিছু বুঝে উঠার আগেই প্রায় হাঁটুর কাছাকাছি তক ডুবে যায় সুমেলের। ফলে বাকি অক্ষত হাঁটু ভেঙে মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে সে। ঠিক তখনই আকাশ কাঁপিয়ে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে কয়েকটা কুকুর। কোত্থেকে এই কুকুরের দল  আসলো এই ভেজা বৃষ্টির রাতে? ভেবে সুমেল ভয়ে অবাক হয় এবং আরও কুঁকড়ে যায়। ভয়ের আরও ব্যাপার হলো সুমেল যখনি পা’টাকে টেনে বের করার চেষ্টা করছিল ঠিক তখনই ভয়ংকর ভাবে ঘেউ ঘেউ বাড়িয়ে দিচ্ছিল কুকুরের দল। ব্যাপারটা এমন যেন ওই থকথকে কাদায় পড়ে আছে তাদের অসহায় বাচ্চাগুলো, যেন ওই ভুরভুরে কাদায় মিশে আছে সেই সারমেয়’র বাচ্চার গরম রক্ত! যেন ওখান থেকে ওরকম গরম কিছু উঠছে অবিরত। সুমেল নিচে হাঁটুর দিকে তাকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ এখন। কিছুক্ষণের জন্য আসমানে বিজলিও বন্ধ, বেশ থিকথিকে আঁধার চারপাশে। সুমেলের বেশ ভয় লাগে এবার। ও পা’টা উঠানোর সমূহ চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। মনে হচ্ছিল খুব জরুরি কাজে তার পা’টা খুব দরকার অন্য কারো। ডুবে যাচ্ছিল পা। এমন সময় সুমেল মায়ের মুখ খেয়াল করে। কোনো এক দিনের বেলায় ভরা আলোকিত সময়। তার মা যেন তারই করোটির খুব কাছে এসে তাকে বলছিল—‘বাপ, পা হেরে গেলে হেরে যায় জীবন, দৌড় একটি জরুরি কাজ সেখানে জীবন সরাসরি গতির গোলাম।’

ভাবতে ভাবতে হ্যাঁচকা টানে পা ছাড়িয়ে দৌড় দেয় সুমেল। আধা-কানি ধানখেত পার হয় সে। আনুমানিক। আইলে আইলে পথ বেয়ে সে হালকা দৌড় দেয়। হাঁটু-অব্দি দুর্গন্ধময় কাদা। কেমন ঘেন্না লাগে সুমেলের। পারলে যেন পুকুরে লাফ দিয়ে ধুয়ে নেয় এই পাপের কাদা।

তখন হঠাৎ বিজলি লাফিয়ে ওঠে অন্তরীক্ষে। কান ফাটা আওয়াজে বিদীর্ণ হওয়ার জোগাড় সমস্ত চারগ্রাম। সুমেল অন্ধকারের তোড়ে ডুবে যাওয়া উদ্ধারকৃত পায়ের ভরসায় পা চালাতে থাকে আবার। একদম একটা বিশাল খেত সুমেল অতিক্রম করে এক দৌড়ে। বুকের নিঃশ্বাস পেন্ডুলামের মতো ঝুলিয়ে মায়ের পথ চাওয়া পথের দিকে সে কেবলি দৌড়ে যায়।

সুমেল দৌড়াচ্ছে। আইল বেয়ে দৌড়ে যাচ্ছে সুমেলের সন্ত্রস্ত পা। পথিমধ্যে সে থমকে দাঁড়ায়। বিজলির আলোতে সহসা সে ধানখেতে ভয়ংকর এক ছবি দেখে। দু তিনটি কুকুরের বাচ্চা। মনে হচ্ছে মৃত। কেউ হয়তো আছাড় মেরে নাড়িভুঁড়ি বের করে এই ধানখেতে এনে ফেলে রেখেছে। বৃষ্টির ঠান্ডা জমা জলে এই ধানখেতের চিপচিপে পানিতে পড়ে আছে রক্তযুক্ত জন্তুর বাচ্চা দুটি। কী নির্মম ও ভয়ানক ঘটনা! এসব দেখে সুমেল দৌড়ে এবার ঝড়ের গতি আনে।

ঘটনা আরেকটা ঘটে যায়। সুমেল ধানখেত পার হয়ে আটকা পড়ে আর একটা টিলার সামনে। ঘন অন্ধকারের মুখে ঝাঁঝাল ভয়ের তুবড়ি নিয়ে দুটি প্রাণীর চারটে আগুন-চোখ অপেক্ষা করছিল। সুমেলের সামনে দুটি নিরুপায় কিন্তু ভয়ংকর চোখ জোড়া। টিলা টার দুইদিকে ভাগ হয়ে যেন প্রাণপণে  চিৎকার ও চোখ নাচাচ্ছে প্রাণী দুটি। সুমেলের আত্মার পানি শুকিয়ে ততক্ষণে বাষ্প হওয়ার জোগাড়।

এই কুকুর গুলোর ঘেউ ঘেউ মন খারাপের চূড়ান্ত করে দেয়ার মতো ছিল। চারটা জ্বলন্ত চোখের দুটি কুকুর। টিলার দুই পাশ দখল নিয়ে নিয়েছে। উদ্দেশ্য যেন স্পষ্ট। যে করেই হোক সুমেলকে টিলার ওপাড় যেতে দেওয়া যাবে না। গেলেই যেন সর্বনাশ। কে যেন বেশ আরাম করেই খেলাটা খেলতে বসেছে এই বিপন্ন রাতে। এক কিশোরের একাকী এই ঝড়ের রাতে কে যেন কোনো একটা খেলা খেলে নিতে চায়। আগুন চোখের কোনো জন্তু যেন টিলার দুই পাশে এই মহান দায়িত্ব নিয়ে ঘেউ ঘেউ করে যাচ্ছে। সুমেলের মনে পড়ে—কিছু আগে তার ডান পা আটকে গেছিল। তখন কয়েকটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠেছিল কোনার খেত থেকে । অনেক কষ্টে পা ছাড়িয়ে নিয়ে সে এই টিলা তক দৌড়ে এসেছে। আচমকা বিজলি ওঠে আকাশ জুড়ে তখন।  সুযোগে চরাচর এক পলক দেখে নেয় সুমেল। তার পায়ের দিকে চোখ পড়ে এক মুহূর্ত যেন পা কেটে দিয়েছে কেউ। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে অনর্গল। টিলার ওপারে দেখা গেল জন্তুগুলোকে। লেজ গুটানো নয় মোটেও বরং বৃষ্টিতে ভিজেও যথেষ্ট উদ্ধত। ক্রমাগত লেজ নাড়িয়ে নাড়িয়ে ভয়ংকর চোখ বিস্ফারিত করে পথ আগলে রেখেছে তারা।

এই তো এই টিলা পার হয়ে গেলেই সুমেলদের ভাটির আনাজের খেত। নিশ্চিত ওই খেতে ভেজা পড়ে আছে কুমড়া, মাচানে লাউ, শিম। আরও হয়তো ভিজে গিয়ে কাদা হয়েছে নিচের মাটি। সুমেল চাচ্ছে যেভাবেই হোক এক দৌড়ে চোখ বুজে গিয়ে উঠবে তাদের উঠোনে–সেখানে হয়তো কুপি হাতে দাঁড়িয়ে আছে তার মা।

কিন্তু কুকুরগুলোর প্রতিটি চিৎকারে সুমেলের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। মায়ের আদরের মুহূর্তগুলো লাফিয়ে ওঠে। মা যেন উল্টো ডাক দেয়—‘ও বাজান, লাফ দিয়া চইলা আয় এ পাড়ে!’

কুকুর দুইটার চিৎকারে যেন পাড়ার সব ডাক ঢাকা পড়েছে। হেরে যাচ্ছে আকাশের মেঘের গর্জন। সুমেল প্রস্ততি নেয়। চোখ বোজার আগে দিক ঠিক করে নেয় সে। ভোঁ দৌড় বলে একটা বিষয় সে জানে। আসুক পিছু পিছু কুকুরগুলো। হয়তো এক দুটি কামড়ে পায়ের কিছু মাংশ বড়জোর নিয়ে নেবে তবুও মায়ের কাছে তো ফেরা যাবে! সে জানে  তার মা ডাকছেন কিন্তু জানোয়ারগুলোর চিৎকারে হয়তো তার ডাক শোনা যাচ্ছে না।

দূরে আলাই বাড়ি অনুমান করা যাচ্ছে, সুনসান। দু তিন ঘর বিদ্যুৎ আলোয় আলোকিত। কিছু ঘরের মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো সেখানে। সুমেল মনে মনে ভাবে–তার এই বিপদকালে কেউ তো এগিয়ে আসতে পারত, তাই না? আলাইবাড়ি কিংবা তার বাড়ি থেকে? যতসব কুকুরগুলোর দোষ। কেমন আটকে রেখেছে তাকে এই ভয়াল ঝড়ের রাতে! অতঃপর যেমনটা সুমেল ভেবেছিল–ভোঁ দৌড়। প্রথমে কুকুরগুলোকে এপাশ ওপাশ নাড়িয়ে–লাফায়ে উত্তেজিত করে, ওদের হিংস্রতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সুমেল দৌড় দেয়।


কোন্‌ পাষাণ জানি ওইখানে বাচ্চা দুটোর পেট কাইটে ফালায়া রাইখছে গো মা!


এক দৌড়ে সে ওঠে আসে তাদের ফুলকপির খেতে। ফুলকপির বড় বড় পাতার পাশ দিয়ে সে দৌড়াতে থাকে। অদুরে দুটি কুপির আলো থর থর করে কেঁপে কেঁপে আসছিল উঠোন হতে। অন্যদিকে পরাজিত কুকুরের দল ততক্ষণে অগ্নিমূর্তি। টিলা পার হয়ে এই লোকালয়ের সীমানায় যেন এদের কোনো শক্তি নেই। কিন্তু বিধিবাম। তীরে এসে তরী ডুবে যায় সুমেলের। অসীম ভয়ে অন্ধকারে দৌড়ের সময় শরীরের বেগ নিয়ন্ত্রণে সে ব্যর্থ হয়। প্রচণ্ড বেগে প্রকাণ্ড জাম গাছটার সাথে বাড়ি খেয়ে সোজা কাদার মধ্যে চিৎপটাং। শরীর কাঁপাতে কাঁপাতে অসহায় ভাবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সুমেল। বৃষ্টি তখনও ঝরছিল। বিশ মিনিট আগেও সে আলাইবাড়িতে ছিল কিন্তু এখন তার এই নিশ্চল দেহ পড়ে আছে ঘরের পেছনে। দু তিন ঘর দূর থেকে বৈদ্যুতিক বাল্বের হালকা আলো মৃদু হয়ে পড়ছে তেরচা বৃষ্টির উপর। অজ্ঞান সুমেলের মুখের উপর তখনও পড়ছে ঝড়ো বৃষ্টির জল। অদুরে মা ডেকে ডেকে তাকে হয়রান।

পরদিন সকাল। চোখ মেলে তাকিয়েছে সুমেল। সে বিছানাগ্রস্ত। পাশে তার ক্লাস নাইনে পড়ুয়া বড় বোন। সবার আপাতত খুশি খুশি মন। গলায় ঘাড়ে বিশাল রকম চোট পেয়েছে বেচারা সুমেল। নীল হয়ে গিয়ে চামড়ার ছাল কিছুটা উঠে গেছে। ঘাড়ের রগে ফোলা ফোলা ভাবটা এখনো কমে নি। সুমেলের মায়ের কপালের ভাঁজ তো কমছেই না। তার একটাই কথা–বদ নজর লাগছে কারো, নিস্তার যদি না মেলে। আজ রাতে যদি আবার কিছু হয়। ভাবতে ভাবতে ছেলের মাথায় পট্টি-টা আবারও জল বিযুক্ত করে কপালে ঠেসে রাখে।

এদিকে অপার জিজ্ঞাস্য চোখে চেয়ে থাকে তার বড় বোন। হঠাৎ বলে ওঠে—‘ভাই আমার,  কি হইছিল তোমার?’ কিন্তু প্রশ্নটি শুনতে শুনতে সে সময় আরেকটি শোরগোল কানে আসে সবার।

বাইরে বিশাল জটলা। মনে হলো ভাটিখেতে সেই প্রকাণ্ড জামগাছটার নিচেই সেই জটলা যেখানে সুমেল গতরাতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল। সবাই দৌড়ে যায় সেখানে। শোরগোলের মাত্রা মনে হলো বেড়ে যাচ্ছিল। সুমেলের সাথে ওর মা বসে থাকে ঘরে। সুমেলের বড় বোন এগিয়ে যায় জটলার দিকে।

কিছু পর সুমেলের বড় বোন প্রায় চিৎকার করে করে ফিরে আসে ঘরে—জিজ্ঞেস করলে ঘরে ঢুকে সে বলতে থাকে—‘দুইটা জমজ বাচ্চা জাম তলায় পইড়া আছে গো মা! কাইল্কে ভাই যেখানে পইড়ে ছিল, কোন্‌ পাষাণ জানি ওইখানে বাচ্চা দুটোর পেট কাইটে ফালায়া রাইখছে গো মা!’

সুমেল তখন চিৎকার দিতে যায় কিন্তু অজানা কোনো এক বোধহীনতায় তার গলা আটকে যায়। সামান্য গোঙান ছাড়া তার তখন আর কিছু করার থাকে না।

 

মোসাব্বির আহে আলী

জন্ম ০৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮৬; পূরবীপ্রাঙ্গন, বারিধারা, ঢাকা।

শিক্ষা : বস্ত্র প্রকৌশলে স্নাতক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : বস্ত্র প্রকৌশলী।

সম্পাদনা :
ছোটকাগজ 'নীলঘুড়ি'।

ই-মেইল : sabbir.lit052@gmail.com

Latest posts by মোসাব্বির আহে আলী (see all)