হোম গদ্য গল্প রঞ্জনরা ফিরে আসে না

রঞ্জনরা ফিরে আসে না

রঞ্জনরা ফিরে আসে না
183
0

অনেকদিন পর ভাতঘুম দিলাম। এত বেশি বাঁকাচোরা জীবনের মোড়, কেবল ছুটে ছুটে যাওয়া এদিক-ওদিক। ছুটি হলেও নিজের যেন ছুটি নেই। ঘুম ভাঙতেই দেখি পিকলু পায়ের কাছে বসা। ওর মাথায় হাত রেখে বললাম—কি রে পিকলু, কিছু বলবি?

—না তেমন কিছু না, অনেকদিন তোমাকে এভাবে ঘুমাতে দেখি নি। আমি উঠতে যাচ্ছিলাম ও ধরে বসাল, বলল—তুমি শুয়েই থাক, উঠতে হবে না।

—কেন উঠব না, তুই তো রোজা, ইফতার রেডি করতে হবে।


আমি চমকে গেলাম, আমার দশ বছরের ছোট একটি ছেলে, কেন ওর দিকে আমি তাকাতে পারছি না, এমন তো কখনও হয় নি


পিকলু নরম সুরেই বলল—হেমন্ত আজ আমার সাথে ইফতার করতে চাইছে কিন্তু তোমাকে একা বাসায় রেখে মন কিছুতেই যেতে চাইছে না, কুমুটাও আজই চলে গেল, কী করি তাই ভাবছিলাম।

—পাগল, এটা কোনো সমস্যা হলো, তুই যা । আমার কিচ্ছু হবে না, মাত্র তো দুঘণ্টার ব্যাপার।

—না, আমি যাব না। এক কাজ করি, হেমন্তকে আমাদের বাসায় আসায় আসতে বলি?

—বাসায় খাবার-দাবার কি আছে?

—ও হয়ে যাবে, তুমি চিন্তা করো না।

—ঠিক আছে বল।

কুমুই সব করে, তাই রান্নাঘরের ওদিকটায় যাওয়া হয় না প্রায় এক বছর। ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকটায় গিয়ে দেখি, পিকলু ছোলা সিদ্ধ নামাচ্ছে চুলা থেকে, কাঁচামরিচ, পেয়াজ কাটা আরেকটি বাটিতে, অন্য হাতে শসা, চালকুমড়ো ঢেঁড়স ধুয়ে নিচ্ছে ট্যাপের পানিতে, রান্নাঘরের এখানে ওখানে ময়লা, বেসিনের নিচটায় শ্যাওলা জমেছে।

আমাকে দেখে চমকে ওঠে বলল—একি তুমি এখানে কেন? যাও ঘরে যাও আমি সব পারব। হেমন্তকে ছোট ছোট জিলাপি আনতে বলেছি, তোমার পছন্দ যেগুলো।

—আজ রোজা সাতাশটা নারে পিকলু?

—এই প্রথম তুমি বাড়িতে আছ আর আজই কেউ নেই।

—আরে দুদিন পরে ঈদ যাবেই তো! তুই ওঠ, হেমন্ত ফোন দিচ্ছে, বাকিটা আমি করি।

ওদের জন্য আরও কয়েকটি রেসিপি করতে না করতেই‌ ঘেমে অস্থির হলাম, কলিংবেল! এইরে ওরা বুঝি এল। ইস গায়ের জামাটাও পাল্টালাম না, হেমন্ত পিকলুর বন্ধু, আর আজই আমার সাথে প্রথম দেখা হবে। ধ্যাত, কী যে করি! ভাবলাম ওদের সাথে বসব না, দরজা খুলে দিয়েই আমার ঘরে ঢুকে যাব। কালো হাল ফ্যাশনের ফ্রেমে চশমা চোখে ছেলেটির, বাইশ হবে বোধহয়, পিকলুর চেয়ে ছোট হবে বয়সে। বেশ হাসিখুশি, দিদি সম্বোধন করে বসল। আমিও হাসিমুখে বসতে বলে আমার ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম, এর মধ্যেই পিকলু আমাকে ধরে ডাইনিং-এ আমার চেয়ারটায় বসিয়ে দিল। হেমন্ত বসতে বসতে বলল, বাহ! দারুণ চেয়ার, ইউনিক, কার ডিজাইন, নাকি রেডিমেড?

পিকলু হেসে বলল, মহামতি, শ্রীমতি…।

—থাক আর বলতে হবে না, বুঝেছি দিদির করা। ও চমৎকার সব রেসিপি দেখে মুগ্ধ হলো । এটা কী, ওটা কী বলতে বলতে খাওয়া শুরু হলো। কথা, হাসি দিয়ে সময় গড়িয়ে যেতে চাইল। পিকলু বলল, ওর গাড়ি সাড়ে দশটায়। ও ততটা সময় আমাদের এখানে থাকবে।

আমি অপ্রতিভ হয়ে বললাম, ঠিক আছে থাকুক না। তাহলে ভাত বসিয়ে দেই, খেয়ে যাবে।

হেমন্ত বলল, প্লিজ দিদি, আপনি উঠবেন না, কোনো ঝামেলার প্রয়োজন নেই। গল্প করি। আপনার গল্প শুনতে ভালো লাগছে।

—তাহলে হেমন্ত, তুই আর দিদি গল্প কর, আমি একটু বাইরের কাজ সেরে আসি।

আমি চমকে গেলাম, আমার দশ বছরের ছোট একটি ছেলে, কেন ওর দিকে আমি তাকাতে পারছি না, এমন তো কখনও হয় নি, পিকলু বাইরে যাওয়ার কথা বলাতেই-বা এমন ঠান্ডা শিরশির অনুভব করছি কেন ভেতরটায়? রঞ্জন চলে যাওয়ার পর তো আমি ভীষণ একা হয়ে পড়েছিলাম, তারপর তো অনেক দিন হলো, কখনও এমন হয় নি তো। এক ঝটকায় রঞ্জন চলে এল আমার সামনে।

পিকলু বলল, তুমি তো একটা দুঃসংবাদ জানো না, হেমন্ত ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আর নেই। ও নিজেই ছেড়ে দিয়েছে।

—কিন্তু কেন? নাট্যকলার ফার্স্ট বয়, ভার্সিটি ছেড়ে দিয়েছে এটা কী বলিস?

হেমন্ত নিজেই আস্তে আস্তে বলল, হ্যাঁ দিদি, ও ঠিকই বলছে। সে অনেক কথা।

—বলো আমি শুনব।

পিকলু এর মধ্যে চলে গেল।


প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনের প্রায় তিনমাস পরে রঞ্জন গুম হয়েছিল, ওকে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।


হেমন্ত বলছিল ওর সেই সব কথা যা ওকে রোজ কুরে কুরে খায়। কৈশোর থেকেই সিনেমা, থিয়েটার পাগল ছেলেটি শিকার হলো ডিপার্টমেন্টের স্যারদের পলিটিক্সে। কাল হলো প্রথম সেমিস্টারে ফার্স্ট হওয়া, আউট অব ফোরে ফোর পাওয়া। এমনকি পর পর কয়েকটি প্রোগ্রামে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স চুড়োয় তখন হেমন্ত। সবার ভালোবাসার মধ্যমণি চোখের বালি হলো একজনের, ওরই ডিপার্টমেন্টের স্যার সুদীপ চক্রবর্তীর। তার কোন পছন্দের একজনকে প্রথম করে এই ভার্সিটিতে টিচার হিশেবে রেখে দেওয়ার প্লানে হেমন্তে পানি ঢেলে দিয়েছিল। সুদীপ স্যারের মনে হয়েছিল, সেকেন্ড সেমিস্টার থেকেই শুরু হোক মানসিক টর্চার। এমনকি শতভাগ উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষায় বসতে দেয় নি হেমন্তকে। পরপর দুবছরের গ্যাপ হেমন্ত মেনে নিতে পারে নি, অন্যান্য স্যারদের জানিয়ে যখন লাভ হয় নি, সে গেছে ভিসির কাছে, ভিসি তাকে আশ্বাস দিলেও শেষ রক্ষা হয় নি। ওর জন্য চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, আরও অনেক অনেক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি যা পরে হেমন্তের মানসিক চাপ এমনকি তা অসুস্থতার দিকে গড়ায়। হেমন্তের মা এসে ওকে বাড়ি নিয়ে যায়, এখন ড্যাফোলিড ইউনিভাসির্টির জার্নালিজমের ছাত্র সে। কিন্তু জীবন থেকে তিনটি বছরের বিন্দু বিন্দু হিশাব ও আজও চায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে, ওর চোখে আগুন দেখি আমি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব দিক আমি প্রায়ই জানতাম না, একথা সে কথায় হেমন্তের থিয়েটার ভবিষৎ আরও কথা জানতে জানতে পিকলু চলে এল।

—হেমন্ত তোকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেবো, রঞ্জন চলে যাওয়ার পর এই প্রথম এমন করে কারও সাথে গল্প করছে দিদি। রঞ্জন, রঞ্জন কে? হেমন্তের প্রশ্নটা ঠিক আমার চোখ বরাবর, একটু থেমে বলল, কনফিডিন্সিয়াল না হলে আমাকে বলবে?

আবারও রঞ্জনের কথা মনে এল। বছর চারেক আগের কথা আমার বন্ধু আরিফ লন্ডনে থাকে, আঠার বছর পর বাংলাদেশে এসে প্রথমে আমার সাথেই যোগাযোগ করে। ওর সাথে সময় দিতে দিতেই ওর থ্রুতে রঞ্জনের সাথে পরিচয়। তারপর প্রেম। রঞ্জন নামটা আমারই দেয়া। স্লিম ফিগার আর শ্বেত বর্ণ ছিল ওর গায়ের রং। আরিফ যেতে না যেতেই ওর সাথে আমার কথা, দেখা হওয়া, সময় কাটানো জমে উঠল। গভীর প্রেমে মগ্ন হলাম আমরা। আমি সারাদিন অফিস শেষ করেই বুঁদ হয়ে যেতাম রঞ্জনের মাঝে। এক সাথে চা খাওয়া, গল্প করা, সময় কাটানো। এমনকি ওকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে গেলাম। পরিচয় করিয়ে দিলাম আমার বন্ধুদের সাথে। আমার মন খারাপ হলে ও আমায় সবচেয়ে বেশি বুঝত, আনন্দ হলেও।

ওর কাছে থেকে প্রথম জানতে পারি ধ্রুপদী সাহিত্যের কথা, সিনেমার গল্প, ইউরোপীয় থিয়েটার, প্রাচীন সব অস্কার প্রাপ্ত সিনেমার গল্প। বেথোবেন, মোজার্ট, ঠুংরি রাগ, ভায়োলিন কী জানত না ও। আমার যখন যেমন অনুভূতি হতো ও ঠিক সেটা বুঝেই আমাকে জাগিয়ে রাখত ওর গভীরে আরও গভীরে। ওকে প্রথম দেখেই আমার ভালো লেগে গিয়েছিল, তারপর স্পনটোনিয়াস প্রেম। এমনকি প্রজন্ম চত্বরের দিনগুলোতে ও ছিল আমার পরম বন্ধু। সারাদিন অফিস শেষে, শ্লোগান শেষে, যেন ওর কোলেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তাম। মাঝে মাঝে ওর ব্যবহার খুব খারাপ হতো, আমিও রাগ করে, অভিমান করে মুখ ঘুরিয়ে থাকতাম, কিন্তু সে অভিমান বেশি সময়ের নয়, একটু পরেই আবার ঠিক হয়ে যেত। মাঝে মাঝে ওরও অভিমান হতো, আমি কী করব ভীষণ বিজি থাকতাম যে। ইচ্ছে করলেও দেখা হতো না, আবার ওর অভিমান ভাঙিয়ে কখনও কখনও ওকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। রঞ্জন আমার জীবনে আসার পর যেখানে যেখানে ট্যুরে গেছি সবটাতেই ও আমার সাথে ছিল।

—তারপর কী হলো দিদি? ও কোথায়? কেন তোমাকে ছেড়ে গেল?

হেমন্তের প্রশ্নে চুপ করে থাকলাম।

পিকলু মুখ খুলল, রঞ্জন ইচ্ছে করে যায় নি। প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনের প্রায় তিনমাস পরে রঞ্জন গুম হয়েছিল, ওকে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।

—মানে কী? হেমন্ত উঠে দাঁড়াল।

—হ্যাঁ ঠিক তাই।

—তোমরা খোঁজার চেষ্টা কর নি?

—করেছি অনেক। কিন্তু পাওয়া যায় নি রঞ্জনকে আর। আপু তখন অফিসে, আমি সুজানাকে নিয়ে সবে স্কুল থেকে ফিরে দেখি রঞ্জন বাসায় নেই। এদিক ওদিক খুঁজেছি, রঞ্জনকে বাসায় রেখেই আমরা বেরিয়েছিলাম। আপুকে ফোন করে জানালে, ও যেন পাথর হয়ে গেল। অফিস শেষে শান্ত হয়ে বাসায় ফিরল দুই ভ্যান পুলিশ নিয়ে। ততক্ষণে আমি আর সুজানা কান্নাকাটি করে শেষ। আপু কাঁদল না, চুপ করে সোফায় বসে থাকল। পুলিশ ইনভেস্টিগেশন শেষে আলামত নিয়ে চলে গেল। এলাকার ক্যাডারদেরও জানানো হলো, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। ওই ঘটনার পরের দিন সুজানাকে নিয়ে আপু কক্সবাজার চলে যায়, ফেরে প্রায় সাত দিন পর। সেদিনের রাতটাও ও ওদের ঘরে থাকে নি, থেকেছিল আমার ঘরে। যে ঘরে ও আর রঞ্জন থাকত সে-ঘরে আর থাকতে পারছিল না। তাই চুপ করে চলে গিয়েছিল, কিন্তু জীবন তো! ফিরতেই হয়, কারও জন্য কারও জীবন থেমে থাকে না। কিন্তু আপু তারপর থেকেই একটু অন্যরকম, চুপচাপ, ব্যস্ত। ওর সমস্ত আনন্দ আর দুঃখ শেয়ারের জায়গা ছিল যে রঞ্জন।


হেমন্তদের বেরিয়ে যাওয়ার শব্দ মিলিয়ে গেল দরজায়। হেমন্তের স্পর্শটুকু তখনও আমার হাতের অলিতে-গলিতে।


চা খাবে হেমন্ত?

—হুম।

পিকলু চা বানাতে চলে গেল।

হেমন্ত আমার হাতে আলতো করে চাপ দিয়ে বলল, দিদি…

ওর স্পর্শে কেঁপে উঠলাম। শিহরিত, বিস্মিত হয়ে নিজেকে অচেনা লাগল। উঠে যেতে যেতে শুধু বললাম, রঞ্জনের প্রাণ থাকলে ও আমাকে কখনও ছেড়ে থাকতে পারত না। ও ঠিক ঠিক ফিরে আসত আমার কাছে। হেমন্ত বিস্মিত হয়ে চেয়ে রইল, পিকলু চা নিয়ে এলে একবার ওর দিকে চাইল একবার আমার দিকে। আমি চলে গেলাম আমার রুমে।

পিকলুকে বলতে শুনলাম—

—আপুর ল্যাপটপের নাম, ‘রঞ্জন’। ও রঞ্জনকে বয় ফ্রেন্ড বলত। দুলাভাই প্রায় বিনা কারণে ওকে ছেড়ে চলে যায়। শারমিন নামের এক কলিগকে বিয়ে করে। তার কিছুদিন পরে আরিফ ভাইয়া দেশে এসে ওকে এক ট্যারাবাইট ক্লাসিক মুভি, ধ্রুপদী সাহিত্যের মুভি, অনেক অনেক মিউজিক, আর চারটি ওয়ার্ল্ড ক্লাস লাইব্রেরি দিয়ে যায়। তারপর আপু অফিস, সুজানা আর এই রঞ্জন নিয়েই থাকত। গত সেপ্টেম্বরে বাসা থেকে রঞ্জন ল্যাপটপ চুরি হয়ে যায়। তারপর আবারও ল্যাপটপ কিনে দেয়া হয়েছে। কিন্তু রক্তমাংসের রঞ্জন আর ফিরে আসে নি ওর জীবনে। অতঃপর আপু কোনো মানুষের সাথে আর স্বাভাবিক হয় নি, জড়ায় নি কোনো ইমোশনাল সর্ম্পকে।

ঘড়িতে প্রায় দশটা বাজে।

—কী রে ওঠ, তোর গাড়ির দেরি হয়ে যাবে।

—হ্যাঁ চল। দিদিকে!

—ওকে বলতে হবে না, ও এখন বের হবে না। চল, তোকে নামিয়ে দিয়ে আসি।

—ঠিক আছে চল।

হেমন্তদের বেরিয়ে যাওয়ার শব্দ মিলিয়ে গেল দরজায়। হেমন্তের স্পর্শটুকু তখনও আমার হাতের অলিতে-গলিতে।

আঁখি সিদ্দিকা

আঁখি সিদ্দিকা

জন্ম ১৭ অক্টোবর, মানিকগঞ্জ। বাংলায় স্নাতকোত্তর।
পেশা : চাকরি; কর্মকর্তা, আইসিবি।

প্রকাশিত বই—

ছায়াচর
বালক
নক্ষত্রের জলে কয়েকটি তারা
বিষণ্ন সরাইখানা
বই-চড়ুইয়ের সাদা ডিম ভাঙ্গা দুপুরে (২০১৬)

ই-মেইল : ankheesiddika@Gmail.com
আঁখি সিদ্দিকা