রক্ত

রক্ত
161
0

অভি সূর্য জাগবে জাগবে মুহূর্তেই শুভকে নিয়ে টানবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। টানবাজার যে কাজের জন্য প্রসিদ্ধ (অনেকের মতে নিষিদ্ধ) সেই টান টান উত্তেজনার বাজার এখন আর নেই। অবশ্য অভির উদ্দেশ্যটা ভিন্ন। শরীর নিয়ে খেলতে চাইলে দিন নয়, রাতই ছিল উত্তম। অন্ধকারে খুঁজে নিত ভেতরের আলোর তৃপ্তি। তখন অন্তঃসারশূন্য এ ভঙ্গিমাটাও থাকত না। বরঞ্চ উত্তুঙ্গ প্রত্যাশা নিয়ে শরীর ও মন খেলায় মেতে উঠত আকাঙ্ক্ষিত শরীরের অলিগলিতে।

শুভ জানে না কেন আজকের পরিভ্রমণ। অভির সাথে যেতে হবে এক লোককে খোঁজার উদ্দেশ্যে—শুধু এ পর্যন্ত-ই ছিল শুভর নগরযাত্রার কাহিনি। অভির জন্য বর্তমান সময়টা এতটাই নাজুক আর বিপ্রতীপ যে, অভিকে যাত্রা সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করার কোনোরকম স্পৃহাই শুভর মধ্যে কাজ করে নি। অভির মনে অভিমান আর যন্ত্রণার বসবাস—এ সংক্ষুব্ধ যন্ত্রণায় ওর মনে প্রতিনিয়ত বিবমিষার উদ্রেক হলেও অস্বাভাবিক মনে হবে না।


আচমকা সঙ্কোচমিশ্রিত স্বরে শুভ বলে উঠল, ‘তুই কি তোর বাপের সোনা কাটবি?’


নারায়ণগঞ্জে যাবার সাথে সাথে সকাল ফুঁটে উঠেছে পদ্মফুলের পাপড়িতে ভর দিয়ে। নয়তো শুয়ে থাকা ধুলোকে জাগিয়ে দিয়ে। তবে মানুষের চলাচল এখনও খুব বেশি হয় নি। ব্যায়ামে নিমগ্ন কিছু নারী-পুরুষ শরীর নিয়ে বিভিন্ন কসরত করছে—হাঁটছে, নয়তো দৌড়াচ্ছে। জীবনকে ভালোবেসে যারা শরীরকে নিয়ে বহুদূর পথ পাড়ি দিতে চায় তারা চলিষ্ণু এ পথ বেছে নিয়েছে। অভি হাজামের ঠিকানা সংগ্রহ করে এসেছে। তবুও সঠিক পথ খুঁজে পেতে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কেউ নির্ভুল তথ্য দিয়ে ডানে পাঠাবে, আবার কেউ-বা ভুল তথ্য দিয়ে বামে পাঠাবে। অভির চোখ জনে জনে বহুজনের শরীর বেড়ে পা দিয়ে নেমে যাচ্ছে তবু কাউকে জিজ্ঞাসা করার সাহস পাচ্ছে না। সঙ্কোচ কাটিয়ে দাদুর বয়সী এক মুরব্বীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘দাদু, শহিদুল্লাহ হাজামের বাড়ি চিনেন? টানবাজারের আশা-মাসা সিনেমা হলের পাশেই নাকি বাড়ি।’ দাদু কথার জবাব না দিয়ে বার-তের বছরের দুটো বালকের দিকে চেয়ে রইল। অভি আর শুভ বুঝতে পারল না এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার অর্থ কী?

দাদু বলল, ‘শহিদুল্লাহ তো এখন আর হাজামের কাজ করে না বললেই চলে। বয়স হইছে তো। কাছের মানুষের অনুরোধে দু-একটা কাজ করে। কার মুসলমানি করাই-বা? ছোট ভাই’র?’

অভি বলল, ‘আমার কোনো ছোট ভাই নাই।’

—‘তবে শহিদুল্লাহরে কী দরকার?’

—‘অন্য দরকার। আপনি যদি একবার ঠিকানাটা বলতেন।’

দাদুর চেহারায় সংশয়। হয়তো অভির চেহারায় কিছু একটা দেখেছে। মুহূর্তে নিজেকে পাল্টে নিয়ে ঠিকানা বলল। হয়তো ভেবে নিলো হাজামের কাজের সম্পর্কে  নয়। প্রয়োজনের সূত্রটা অন্য কোথাও।

শুভ এই মাত্র জানল অভির টানবাজারে আসার উদ্দেশ্য। শুভ-ও ভেতরে ভেতরে বিস্মিত মুসলমানি হয়ে যাবার পরও হাজামের কাছে অভির কী কাজ থাকতে পারে ভেবে। বাড়ি খুঁজে পেতে খুব বেশি সমস্যা হয় নি অন্য দিনের মতো। হাজামের শরীর সত্যিই দুর্বল। কাঁপতে কাঁপতে উঠোনে এসে দাঁড়াল। কিশোর বয়সের দুটো ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক। এরকম বাচ্চা বয়সের দুটি ছেলে তার সাথে দেখা করতে এসেছে বিগত পঞ্চাশ বছরেও এরকম অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে কিনা তিনি মনে করতে পারছেন না। বৃদ্ধের শরীর হাত-পা মুখ অচলের পর্যায়ে চলে গেলেও চোখটা অদ্ভুতরকম সচল। ক্রুর দৃষ্টি। ভয়ঙ্করও।

হাজাম বলল, ‘তোমরা কারা? আমি তো অহন আর মুসলমানি করাই না।’

অভি বলল, ‘না মানে আমরা সে-জন্য আসি নি।’

—‘তবে কেন আইসো? দূর থেইক্যা আমার কাছে কেউ তো অন্য কোনো কামে আসে না।’

অভি অপ্রস্তুত। ঘামছে যেন। কিছুটা ভীত কি? আমতা আমতা করে বলল, ‘আমরা আসলে মুসলমানির কাজেই এসেছি।’

—‘তোমার কথা তো কিছুই বুঝতাছি না। দেহ, যা কওয়ার ঠিক কইর‌্যা কও। আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারুম না। শরীলডা খারাপ।’

—‘আপনি শুধু সোনা কাটার চাকু আর ওষুধ দিয়ে দেন। বাকিটা আমরাই পারব।’

অভির কথা শুনে শুধু হাজাম নয় শুভও যারপরনাই বিস্মিত। সোনা কাটা! যৌনাঙ্গ কর্তন কিংবা মুসলমানি বললেও হয়তো কথাটা অশালীন শোনাত না।

হাজাম রাগান্বিত হয়েই বলল, ‘তোমরা পারবা মানে? বিষয়ডারে কি ছেলেহেলা মনে করো? তোমারে না-হয় খতনা পিঁড়ি, বাঁশের চিমটি, ছুরি, কাঁচি, ক্ষুর, সাদা কাপড় সবই দিমু। কিন্তু কাজ কিভাবে করবা শুনি? পুরাটা সোনা তো ফালাইয়া দিবা মিয়া।’

অভি আর শুভ পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকায়। এক অদ্ভুত অস্বস্তি দুজনের শরীরেই যেন জড়িয়ে রইল অস্থির শীতের কাঁথার মতো। অভি জড়ানো কথা নিয়ে বলতে পারল এরকম—সোনা কাটার সময় যেন ব্যথা না লাগে সেরকম একটা মেডিসিন লাগবে। একটা ছুরিও লাগবে—ধারাল এবং ব্যবহারে উপযুক্ত। সোনা কাটার পর ক্ষত স্থানে ব্যবহারের জন্য মলমও লাগবে। দাম হিশেবে ডাবলের চেয়েও বেশি টাকা দিতে প্রস্তুত আছে। অতঃপর বৃদ্ধ, বয়সের কারণে দরিদ্র হাজামকে ভাবনায় রেখে অভি ও শুভ বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।

বের হয়ে অনেকক্ষণ পর্যন্ত কেউ কোনো কথা বলে নি। আচমকা সঙ্কোচমিশ্রিত স্বরে শুভ বলে উঠল, ‘তুই কি তোর বাপের সোনা কাটবি?’

২.
দুইদিন আগের ঘটনা। অভির মনে পড়ছে ও রাতকে বড় করে তুলেছিল মানসিক আবেগের তীব্রতর উত্থান-পতনে। কৈশোরের কৌতূহল! এ সময়টায় কি সবারই এরকম হয়? ভাবে অভি। কী রকম অস্থির অস্থির ভাব যেন। শুভর কাছ থেকে বেশ কয়েকটা ভিডিও ক্লিপ নিয়েছিল মোবাইলের আদান-প্রদানের মাধ্যম শেয়ারইটে। এবারই প্রথম। শুভ নয়তো অশুভ সূচনা। হাত কাঁপছিল থরথর, তবু আড়চোখে লক্ষ করছিল শুভর হাসি। রাতে ফোন চালু করতেই ঘামছিল তরতর। পিঠাপিঠি বড় বোন অপর্ণা তখন ঘুমিয়ে। ঘুমের সময় ওর শরীর সঠিক আচরণ করে না। গরমে অসহ্য হয়ে ওড়না দূরে চলে যায় সচরাচর। পায়জামাও হাঁটুর কাছাকাছি চলে আসে। অবশ্য এসবের প্রতি লক্ষ করার সময় ওর নেই। সবসময় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। তখনও সদ্য ফুটে উঠা যৌবন নিয়ে বিছানায় পড়েছিল সমস্ত ঘুমের ঘোর নিয়ে। শরীরে ভাই-বোন দুজনেই বড় হয়ে গেছে—তবু একখাটে ঘুমুতে হয় ওদের। অসচ্ছল পরিবারে নিয়মের সৌন্দর্য-বাস্তবায়ন কষ্টকর হয়। পাশের ঘরে শুয়েছিল ওদের বাবা-মা। বাবা বাসের ড্রাইভার। সীমিত আয়। দুরুমের বাসা নিয়েই ওদেরকে এখন পর্যন্ত সময়ের মৌলিক চাহিদার সান্ত্বনা নিতে হয়। এতসব ভাবনার মধ্যেও অভির কানে আ য়ি য়ু চিৎকার এসে জমে যাচ্ছিল। শ্রুতি মধুর, চোখ বিস্মিত—তবু অভির দেহকোষে জেগেছিল অস্বস্তিকর মনোভাব। কোনো ধরনের রমণক্রিয়া যে অভির চোখ আগে দেখে নি, কানও শুনে নি। এত সহজে নারী-পুরুষ মিলিত হতে পারে এ ভাবনার জন্মও অভির মধ্যে প্রথম। মেয়েটা নিজের ইচ্ছেতে স্বচ্ছন্দে শরীরের সব কাপড় খুলে ফেলেছিল! নারীকে এত সস্তা ও আগে কখনো দেখে নি। ওর চোখ রতিক্রিয়ার সব প্রক্রিয়া আর কৌশল সহ্য করতে পারছিল না। নোংরামির ভেতরেই তবে শারীরিক তৃপ্তি লুকিয়ে! চোখ সরিয়ে ফেলছিল কিছুটা সময় পরপর। অপর্ণার শরীরেও চোখ যাচ্ছিল। অপর্ণার শরীরও তো মোবাইলে জেগে থাকা মেয়েটার মতো। অঙ্গের পণ্যশালা তো একই, সব উপাদানে—তবে কারো কারো রুচি বিক্রি হয়ে বিকৃত হয়ে যায়।

শুভ আর বেশিক্ষণ দেখতে পারে নি। কী এক স্যাঁতসেঁতে পদার্থে ওর প্যান্ট ভিজে গিয়েছিল। কেঁপে উঠেছিল শরীর। ভয় জেগেছিল মনে। উৎকণ্ঠাও। যৌন অঙ্গটা চেপে তাড়াতাড়ি বাইরে চলে গিয়েছিল। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে পড়েছিল বোনের সাথে। কেন যেন একটু বেশিই ব্যবধান রেখে। কিসের ভয়ে ওর এ আচরণ বুঝতে পারে নি। এই ভাবনার উদ্রেকই ছিল ওর জন্য কষ্টদায়ক।

৩.
সকাল বেলা অভির ঘুম ভেঙেছিল মিলিত চিৎকারের ভয়ঙ্কর আক্রমণে। অপর্ণার কান্না ভেসে আসে মাধুর্যহীন কণ্ঠে। যেন নির্যাতিতা এক মেয়ে স্বামীর প্রহারে আত্মাভিমানের বয়ান দিচ্ছে। ভেসে আসছিল আরো অনেকের চিৎকার আর উৎকণ্ঠিত ধ্বনি। অভির ঘুমঘোর চোখে চেতনা জেগেছিল হঠাৎ। মা কোথায়? বিছানা থেকে নেমে এসেছিল মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। যা ভেবেছিল—মা-ই অসুস্থ! মুখে লালা-জাতীয় কিছু। অপর্ণার কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিল। ছটফট করছিল। কিছু প্রতিবেশী খালারা ছুটোছুটি করে পানি, তেঁতুল ইত্যাদি নিয়ে আসে। অভি ফ্লোরে শুয়ে থাকা মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। মা কি মারা যাবে? অভিই যেন মরে যাচ্ছিল ভেতরে ভেতরে, দুর্ভাবনার অভিঘাতে। নেতিয়ে পড়া মায়ের শরীর, গোঙানির শব্দ আচমকা থেমে গিয়েছিল অভির স্পর্শে। ও হাসি আর কান্নামিশ্রিত মুখ নিয়ে মায়ের দিকে চেয়েছিল। কিন্তু মায়ের এ কী রূপ? শতাব্দীর মুখাবয়বে ভয়ঙ্কর প্রতিচ্ছবি। মায়ের এ রূপ দেখে অভ্যস্ত নয় অভি। ঘাবড়ে গিয়েছিল। ঝড়ের পূর্বাবাস পাচ্ছিল আগেই এবার দেখল তার প্রলয়-রূপ। দুহাতের সজোর ঝাপটায় অভিকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। জড়ানো অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল, ‘যা, সরে যা। তুই তো তোর বাবার মতোই হবি। তোদের রক্তই খারাপ।’

বিমূঢ়ের মতো পড়ে ছিল অভি। যতটা না শরীরে ব্যথা তার চেয়ে বেশি মনে। অভিদের রক্ত দূষিত মানে? আর বাবার মতো হলেই বা আপত্তি কী? পুরোটা ব্যাপার বুঝে উঠে বোন অপর্ণা কিছু সময় চেয়েছিল শান্ত আর করুণ চোখে। এর মধ্যেই অভির কাকু আর তার বন্ধুরা মিলে শতাব্দীকে কোলে করে বাহিরে নিয়ে রিকশায় তুলে। শতাব্দী বিষ খেয়েছে। অভি মায়ের দেয়া অপমান ভুলে গিয়েছিল, মাকে হারানোর ভয়ে ওর চোখে তখন পানি।

হোক না ছেলে, তবু, বার-তের বছরের বালককে কেই-বা মূল্যায়ন করে সাথে নিয়ে যায়। দৌড়াতে দৌড়াতে অভি ছুটছিল রিকশার পিছু পিছু হাসপাতালের পথে।


যোনির জন্য এ যৌবন কি আগ্রাসী রাক্ষসে পরিণত হবে?


হাসপাতালে যাবার পর মায়ের সাথে কথা বলতে অভির সে কী অন্তহীন চাওয়া। মা বাঁচবে তো? যদিও, বেঁচে থেকেও মৃত্যুর স্বাদ মা প্রতিনিয়ত পাচ্ছিল। মুখের ভেতর দিয়ে পেটে পাইপ ঢোকানোর পর শতাব্দী মৃত্যুময় ভঙ্গিমায় কিরকম কেঁপে উঠেছিল। ভেতরের সমস্ত জীবনীশক্তি যেন এই পাইপের ভেতর দিয়ে বের হয়ে আসছিল। তিনচার জন মিলেও ধরে রাখতে পারছিল না। তারপর ইঞ্জেকশনের পর ইঞ্জেকশন—শরীরের ভেতর ঢুকিয়ে দিচ্ছিল যেন মৃত্যুসুচ। কাকু এসে অভির কাঁধে সান্ত্বনার হাত রেখে বলেছিল, ‘কিচ্ছু ভাবিস না, আর ভয় নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই হাসপাতালে থাকিস। আমাকে একবার থানায় যেতে হবে।’

অভি কিছুই বুঝতে না পেরে বলেছিল, ‘কাকু, তুমি থানায় কেন যাবে?’

—‘বুঝছ না কেন যাবু? এই বিষয় নিয়া এখন আর কথা কমু না। ফিরা আইস্যা কথা হইব।’

কাকু চলে গিয়েছিল। তখন অভির মাথাতে কিছুই ঢুকে নি। এত সব ঘটনার পরও বাবা অনুপস্থিত কেন? মোবাইল ফোনটাই-বা অফ কেন? মা কেন বাবাকে গালাগাল করছে মৃত্যুর পথে হাঁটতে হাঁটতে? জীবনকে প্রচণ্ড ভালোবাসা মা-ই বা কেন বিষ পান করবে? অপর্ণা কাছে থাকলে সব কিছু জেনে নিতে পারত। সন্ধ্যার পর মায়ের সাথে দেখা হলো অভির। শতাব্দীর পুরো শরীর চাদরে ঢাকা। মুখটা শুধু বের হয়ে ছিল যাবতীয় বিষণ্নতা সাথে নিয়ে। খাটের এক কোনায় বসতেই মা চোখ খুলেছিল। অভির হাত ধরেছিল আর চোখ পরিপূর্ণ করেছিল জলের ধারায়। ‘কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?’ বারংবার অভির জিজ্ঞাসা সত্ত্বেও মুখে কথা বলছিল না, যত কথা ওর সব যেন চোখে, কান্না হয়ে বেরিয়ে আসছিল। এ জলে মিশে আছে সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, ক্লান্তি আর প্রায়শ্চিত্তের কথা।

শতাব্দী উপলব্ধি করেছিল বিশ খাওয়া তার উচিত হয় নি। সাময়িক উত্তেজনার ফল-স্বরূপ আল্লাহ যদি এ প্রাণ নিয়ে নিত তবে অবুঝ দুটি সন্তানের কী হতো? আত্মহুতির মতো পাপ করে সারা জীবন জাহান্নামে কাটাতে হতো? সকালে অভিকে অযথা গালাগালের জন্যও শতাব্দীর মনে আপরাধবোধ জেগে উঠেছিল। অভি মায়ের এ রূপেও অভ্যস্ত ছিল না। অভি বুঝতে পারছিল, মা হয়তো তাকে কিছু বলতে চায়।পরক্ষণেই শতাব্দী বলে উঠেছিল, ‘সকালের ব্যবহারে কিছু মনে করিস না, বাবা। এমনভাবে ঘটনাগুলো ঘটে গেল অস্থিরতায় মাথা ঠিক ছিল না।’ অভি মায়ের দুঃখিত হওয়াকে খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিল না। বরঞ্চ ও জানতে উৎসুক ছিল মায়ের আত্মহত্যা, বাবা আর ওর রক্ত নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের কারণ। নাজুক পরিস্থিতিতে মায়ের শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে অভি বিশদ জিজ্ঞাসা করতে পারে নি। শুধু ভেতরের জমানো নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ থেকে কিছু শব্দ বের হয়ে এসেছিল, ‘মা, বাবা কোথায়? বাবাকে ফোন করেও পাচ্ছি না কেন?’

শতাব্দীর চেহারা আবার পাল্টে গিয়েছিল। এসময় প্রশ্নটা করা কি ঠিক হলো? আজ মায়ের চেহারার বিভিন্ন রূপ দেখছে অভি। জন্মাবধি এমনটা আর কখনো দেখেছে কিনা মনে করতে পারছে না। শতাব্দী বলেছিল, ‘তুই ওই অমানুষটার কথা আমাকে আর জিজ্ঞাসা করবি না।’

আবারও বিস্মিত অভি। বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই ডাক্তার এসে ওকে রুম থেকে বের করে দিয়েছিল। বাহিরে এসে পায়চারী করছিল—ওর ভাবনাগুলোও বিরামহীন পায়চারী চালাচ্ছে সময়ের অস্পষ্ট অলিতে-গলিতে। কী এমন ঘটনা ঘটল যে, বাবা এত দিনের চিরপরিচিত মানুষ থেকে আজ অমানুষ হয়ে গেল।

রাতে মাকে হাসপাতালে থাকতে হবে। এমনটা সিদ্ধান্তের পর কাকু আর কাকি একরকম জোর করেই বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল অভিকে। ও বাবার সম্পর্কে আর কিছু জিজ্ঞাসা করে নি কাউকে। পরিচিত সব মানুষগুলোর মুখ সরলতা আর প্রফুল্লতাবিমুখ হয়ে এক অদ্ভুত কঠিন মানুষরূপ হয়েছিল—এই বিরূপ পরিস্থিতিতে এ রূপের মানুষদের কি সিরিয়াস কিছু জিজ্ঞাসা করা যায়? অভি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, বাড়িতে গিয়েই সব জানতে হবে অপর্ণার কাছে। অথচ সিঁড়িতেই যে যাবতীয় বিস্ময় দাঁড়িয়ে থাকবে এমনটা ভাবতে পারে নি। বাড়িওয়ালার প্রাইমারিতে পড়া মেয়ে সুপ্রিয়া অপরূপ চেহারা নিয়ে সবসময়ই ছুটাছুটি করে এদিক-ওদিক। অভির সাথে ওর বন্ধুত্ব, সবচেয়ে বেশি ভাব। অথচ তখন অভিকে দেখে ও পালিয়ে যেতে চাইছিল! কেন? অভি সুপ্রিয়াকে আটকে দিয়েছিল, ‘প্রিয়া, চলে যাচ্ছিস যে। দেখে মনে হচ্ছে পালাচ্ছিস?’

সুপ্রিয়া বলেছিল, ‘পালাব কোথায়? আমাদের বাড়ি।’ আরও যোগ করল, ‘কোন দুঃখে আমি পালাতে যাব?’

—‘তবে কথা না বলেই চলে যাচ্ছিস যে?’

—‘ধর্ষক বংশের ছেলে তুমি। তোমার সাথে আর কথা নেই। তোমাদেরকে বাড়ি থেকেও ্চলে যেতে হবে আগামী মাসে।’

অভি কিছুটা সময় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য অবস্থায় দাঁড়িয়ে। ‘ধর্ষক বংশের ছেলে’ শুনে, অভি সুপ্রিয়ার অপরাজিত ভঙ্গিমা নিয়ে চলে যেতে দেখেও কিছু বলতে পারে নি। তখন কী করেই-বা পারবে ওর পুরো অস্তিত্বই যে নড়ে উঠেছিল। সুুপ্রিয়ার কথা হয়তো নির্ভুল হয় নি, তাই বলে ভাবটা বুঝতে ওর বিন্দুমাত্র সময় লাগে নি। কেন মায়ের আত্মহত্যার পরিকল্পনা। বাবাকে অমানুষের স্বীকৃতি দেওয়া। কাকুর থানায় যাওয়া। সবই অভিকে বুঝতে সহায়তা করেছে। বাবা ধর্ষণ করেছে। সকালে থানা থেকে পুলিশ এসে বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। বাবার অপরাধের কাহিনি সন্তান কি সহ্য করতে পারে? নিজেদের বদনামকে কষ্টেসৃষ্টে হয়তো মেনে নেওয়া যায় কিন্তু বাবার বদনাম! সমাজ জীবনে এ এক নিদারুণ লজ্জার কারণ। এ ব্যাপারে মানুষের সাথে তর্ক করা যায় না। যুক্তিও দেখানো যায় না। শুধু মাথা নিচু করে চলে যেতে হয়।

ধর্ষণ তো নির্যাতনের কাহিনি। জোরপূর্বক অন্যকে ভোগ করার অপচেষ্টা। মোবাইল ফোনের সেই নারী-পুরুষের মতো সম্পর্ক তো আর হয় নি বাবা আর সেই ধর্ষিতা মেয়েটার। ভাবতে ভাবতে দরজার প্রান্তে চলে এসেছিল অভি। অপর্ণা দরজা খুলেছিল। অপর্ণা অভির বড় বোন, পিঠাপিঠি। অপর্ণাকে দেখে ওর কিছুটা অন্যরকম লাগছিল। রূপটাই কেন যেন চোখের কোণে প্রথমে দেখা দিল। পোশাকেই কি ফুটে উঠেছিল এ রূপ! ভিন্ন রকম সাজ। পূর্ণ মাধুর্য জমা করে ও ঘোমটা দিয়েছিল। দেখে মনে হয়েছে ভাসুর কিংবা শ্বশুরের সামনে দাঁড়িয়ে। শুধু মুখটাই দেখা যাচ্ছে। পোশাকের সৌন্দর্যে ঢাকা পড়ে ছিল শরীরের সব অঙ্গ-পতঙ্গ। অপর্ণার এ সাজ মনোমুগ্ধকর হলেও বিস্ময়করও—অন্য দিনের অপর্ণার সাজ যে এরকম হয় না। অপর্ণার থমথমে মুখ, ক্লান্তির শরীর দেখে ওকে আর কিছুই জিজ্ঞাসা করতে পারে নি অভি। আর কীই-বা জিজ্ঞাস্য থাকতে পারে—সুপ্রিয়াই তো সব বলে দিল।

গ্রাম থেকে দাদা আর দাদি এসেছে। তারা রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়েছিল জার্নির ক্লান্তি শরীরে নিয়ে। অভিকেও কিছুটা খেতে হলো। শরীরে অবসাদ আর বিষাদ যতই জমা হোক—শরীরে আক্রোশ জেগে উঠুক, ঘৃণায় শরীরকে নোংরা মনে হোক, তবু এ শরীরে ক্ষুধা জাগ্রত হবেই। অনিচ্ছা সত্ত্বেও খাবার খেতে হবে। ঘুমাবার সময় অভির মনে ধাক্কা লেগেছিল সবচেয়ে বেশি। অপর্ণা বিছানার মাঝে একটা কোলবালিশ রেখে দিয়েছে। কোলবালিশ অন্য সময় দেখা তো দূরের কথা, কোলবালিশের অস্তিত্ব সম্পর্কেই অভির কোনোরকম ধারণা ছিল না। এ কী কোলবালিশ নাকি দেয়াল? অপর্ণা অভিকে অবিশ্বাস করল? শতাব্দীর মতো অপর্ণাও এ রক্তকে বিশ্বাস করতে পারল না। বোন হয়ে ভাইকে বিশ্বাস করছে না। যত কামনা আর বাসনা মনে জাগুক—বিকৃত যত লিপ্সাই ওর মধ্যে কাজ করুর—ভাই হয়ে বোনের ওপর কি ঝাঁপিয়ে পড়া সম্ভব? সব নারী শরীরকে কি এক করে দেখা যায়? সম্পর্ক আর সৌন্দর্যের সামান্যতম বোধ আর বিবেচনা কি অভির মধ্যে জন্মায় নি?

এই অপর্ণাও অভির অচেনা। চঞ্চল মেয়েটা সারা বাড়িতে ছুটোছুটি নয় যেন উড়ে বেড়াত অদৃশ্য এক পাখা নিয়ে। বিছানায় শুয়ে থাকত শুধুমাত্র একটা জামা আর পায়জামা পড়ে—ওড়নার ব্যবহার থাকত অনিয়মিত। নিশ্চিত আর নিশ্চেতন ঘুমের দেশে চলে যেত পাত-পা ছুড়োছুড়ি করতে করতে। একদিনে একটা মেয়ের আমূল পরিবর্তন হয়ে গেল? গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে বিছানার এক কোণে। পারলে বিছানাতেও ঘোমটা দিয়ে শোয়। দাদা আর দাদি না আসলে ও নিশ্চয়ই বিছানা পরিবর্তন করে বাবা-মায়ের রুমে শুয়ে থাকত। ছোট ভাইকে বিশ্বাস করতে পারল না ও। এ রক্তের প্রতি এত অবিশ্বাস!

অভি মোবাইলের নেট লাইন চালু করেছিল তখন। ধর্ষক বাবার কাহিনিও জানা দরকার। জেনে নিবে কিরকম দূষিত রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে এ দেহে। অভি স্বনামধন্য একটা জাতীয় পত্রিকাতে ‘ধর্ষণ’ সম্পর্কে দেওয়া প্রতিবেদন সম্পূর্ণটা পড়ে ফেলেছিল। ওর চোখ ভিজে গিয়েছিল পড়তে পড়তে। ওর পরিচিত বাবা তো এরকম নয়। মানুষ কি বেশির ভাগ সময়ই মুখোশ পরে থাকে? অভির মনে পড়ে কত উপদেশ বাণী শোনাত বাবা। সেই বাবা ধর্ষণ করল এক মেয়েকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে—বাসের হেলপার ও অন্যান্যদের নিয়ে। পত্রিকায় লিখেছে, চারটি কামুক পশু এক প্রতিবন্ধী অথচ মেধাবী ছাত্রীকে ধর্ষণ করল। দেহ প্রতিবন্ধী এক নারী ধর্ষণের শিকার হলো চার মানসিক প্রতিবন্ধী মানুষনামক পশুর দ্বারা। অভি রাতের আবছা আলোতেও নিজেকে দেখে নিচ্ছিল। এ শরীরে তবে পশুর রক্ত। মেয়েটা বাঁচার আকুতি জানিয়ে পায়ে পর্যন্ত পড়েছিল। কিন্তু চার পশুর কোনো পশুই তাকে বাঁচার সুযোগ দেয় নি। ধর্ষণ করেছে চরম বর্বরতায়। ধর্ষণ শেষে ঘাড় মটকিয়ে হত্যা করেছে নজিরবিহীন নির্মমতায়।

কী মর্মান্তিক! অভি কেঁপে উঠেছিল শেষ লাইনটা পড়ে। এ দূষিত রক্ত নিয়ে অভিও হয়তো দিনের পর দিন ধর্ষণ করে যাবে অবিরত, অগণিত নারীদের। শিশু থেকে শুরু করে মা-খালা বয়সী নারীদের। প্রতিবন্ধী নারীও হয়তো বাদ যাবে না। যোনির জন্য এ যৌবন কি আগ্রাসী রাক্ষসে পরিণত হবে?


আত্মহত্যা নয়, আপন যৌনাঙ্গ হত্যারই সিদ্ধান্ত নিল।


অভি তখনই সিদ্ধান্ত নেয় নি আত্মহত্যার কিংবা যৌনাঙ্গ কর্তনের। যখন কৌতূহল-বশত দেখতে চাইল এ ধর্ষণের বিরুদ্ধে ফেসবুকে কিরকম গণউচ্চারণ হয়েছে। এ নিকৃষ্ট কাজের বিরুদ্ধে নারী-পুরুষের সম্মিলিত ক্ষোভ আর আক্রোশ প্রকাশ পেয়েছে। ‘প্রকাশ্যে এদের যৌনাঙ্গ কর্তন করে দেওয়া উচিত’, ‘সোনা কাইট্টা কুত্তা দিয়া খাওয়াস না কেরে’, ‘এরকম প্রতিবন্ধী যৌনাঙ্গ রেখে লাভ কী?’, ‘আগে জানলে কোনো নারী ছেলে সন্তান জন্ম দিত না’, ‘এ সোনাগুলা না কাটলে সোনার দেশ গড়া যাবে না’। কোনো কোনো পুরুষ প্রতিবাদস্বরূপ তাদের যৌন অঙ্গ তালা মেরে রেখেছে। এরকম হাজার স্ট্যাটাস, ছবি আর ধর্ষকের বিরুদ্ধে জোরাল মন্তব্য দেখে অভি মর্মান্তিকভাবেই মুষড়ে পড়েছিল এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আত্মহত্যার। আত্মহত্যার আসক্তি যখন ওকে ক্রমেই স্থির সিদ্ধন্তে পৌঁছে দিচ্ছিল তখনই মায়ের কথা মনে পড়েছিল। হাসপাতালে দেখা মায়ের অসহায় মুখের প্রতিচ্ছবি ভেসে আসছিল চোখের ভুবনজুড়ে। তারপর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে আত্মহত্যা নয়, আপন যৌনাঙ্গ হত্যারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তখনই, আবছা আলেতে ইন্টারনেট ঘেঁটে হাজামের ঠিকানা সংগ্রহ করে। সকাল হবার আগেই বন্ধু শুভকে নিয়ে হাজামের উদ্দেশে রওয়ানা হয়।

৪.
অভি বাস্তবে ফিরে এল। দুদিন যাবৎ ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ওর স্মৃতিতে বেশ জোরাল দাগ কেটে যাচ্ছে। তাই কিছুটা অস্থির, অন্তর্মুখীও। বাড়িতে এখন কেউ নেই। রুমের এক কোণে চাকু হাতে বসে আছে ও। সাথে ওষুধের বোতল। যৌনাঙ্গটা কেটে ফেলবে গোড়া থেকে। তারপর মলম লাগিয়ে দিবে। ওর যৌনাঙ্গ যেন একটা সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়াচ্ছে—যত অন্যায় মূল থেকে উপড়ে ফেলে, ভালো কাজ হিশেবে ওষুধ দেওয়া। এখন অভির মাথা ঠান্ডা আছে। যৌনকাতর কোনো চিন্তাও মাথায় কাজ করছে না। যৌনাঙ্গটা এখন ন্যাতানো, নরম একটা আঙুলের মতো নুয়ে আছে। এরকম থাকতেই কেটে ফেলবে। কোনো অবস্থাতেই বড় হতে দিবে না। এক টানে কেটে ফেলে মলম লাগিয়ে দিবে। কিছুটা রক্ত যাবে—পাপের রক্ত কিছুটা চলে গেলে কী আর এমন ক্ষতি হবে। এই সোনা কর্তন করেই নাকি সোনার বাংলা গড়া যাবে। হাসি পেল অভির। অনেক কষ্টে জোগাড় করেছে কর্তন কার্যের যাবতীয় উপকরণ। শুভকে ছাড়া যেতে হয়েছে। ঋণগ্রস্ত লোভী হাজামকে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়েছে। কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়। এমনটা যেমন হাজামের ক্ষেত্রে সত্য হয়েছে—এখন অভি তার জীবনের উপর দিয়েও সত্য প্রমাণিত করবে। তবে কর্তন মুহূর্তে হাজামের একটি কথা অভির বারবার মনে পড়ছে। হাজাম কেমন যেন দার্শনিক ভাব নিয়ে বলেছিল, ‘তোমার হাতে মুসলমানির উপকরণ তুইল্যা দেওয়া আমার ইচ্ছাতে ছিল না। একটা কথা সব সময় মনে রাখবা, মানুষের কোনো ইচ্ছাই ঠিক মতো পূরণ হয় না।’ অভি কি তাহলে ব্যর্থ হবে? অভির এ চাওয়া কি পূরণ হবার নয়? না, অভি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এ সংকল্প সফল করতে। সোনার বাংলার অন্তরায় হয়ে মানুষ পরিচয়ে বেঁচে থাকাও তো দুঃখজনক, নিন্দনীয়। বাবা জোর করে ধর্ষণ করেছে পাপিয়াকে। তার একদিন পরেই শিক্ষক সৈয়দ মোতালেব জোর করে ধর্ষণ করল ছাত্রীকে। মানুষের অধিকার হরণ করা এ বর্বরতা অসহ্য ঠেকছে অভির কাছে। এখনই অভি উপড়ে ফেলবে যাবতীয় অহংকারের মূলভিত। এ কর্তন ছাড়া অভির অন্য কোনো উপায় হাতে নেই। বাবা-নামক পশুটার রক্ত যে ওর পুরো শরীরে প্রবাহিত। বাবা দিনের পর দিন বৈধ মিলনেও সন্তুষ্ট ছিল না। বাহিরে গিয়ে জোর করল। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করল। অভি তো ওই রক্ত হতেই প্রবাহিত ঢেউ। একদিন ও হয়তো সুপ্রিয়াকে ধর্ষণ করবে আপোসে। অপরিচিত কোনো এক মেয়েকে নষ্ট করবে ইচ্ছার বিরুদ্ধে। হয়তো বোন অর্পিতাকেও করে ফেলবে নষ্ট রক্তের কামুক মানসিকতায়। মা বলেছে এ রক্ত দূষিত। বোন ভাইয়ের কাছ থেকে বাঁচতে মুখে না বললেও অঙ্গভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে। অভির কৈশোরের ভাবনাতে এ অঙ্গটা শুধু নষ্টের প্রতীক—নতুন সৌন্দর্যের-যাত্রা পথ নয়, আলোর পথ নয়। অভির ভেতরে এখন কোনো ভাবনা কাজ করছে না। শুধু মনে মনে আওড়ে যাচ্ছে ‘এখনই কেটে ফেলা দরকার’।

অভি যৌনাঙ্গটা কেটে দিতে চাইল গভীর মর্মবেদনায়। চোখে পানি চলে আসলো। হাতও কেঁপে উঠল। সামান্য কাটতে পারল। রক্ত। লাল রক্ত। দূষিত রক্তের কোনো চিহ্ন এখানে নেই। টাটকা লাল রক্ত। অভির চোখ সহ্য করতে পারল না, হয়তো মনও না। অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে।

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৮৪, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।

কবি ও কথাসাহিত্যিক।

মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর।

পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই :
সমাপ্তির যতিচিহ্ন [উপন্যাস, ইমন প্রকাশনা, ২০১৩]

ই-মেইল : joychironton@gmail.com

Latest posts by মহ্‌সীন চৌধুরী জয় (see all)