হোম গদ্য গল্প যে তুমি আগুন-আলো

যে তুমি আগুন-আলো

যে তুমি আগুন-আলো
570
0

শ্যামল বলল, ১৬৬৬ সালের কথা।

ঋতু জিজ্ঞেস করল, ইতিহাস নাকি?

শোন না, মোগল সেনাপতি ও বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁর ছেলে বুজুর্গ উমেদ খাঁর সেনাদল চট্টগ্রাম আক্রমণ করল। আরাকানিদের সাথে তাদের সেকি যুদ্ধ! সেই যুদ্ধে কত লোক মরল, কত রক্ত ঝরল, তার কি হিশাব আছে! মোগলরা আরাকানিদের বিতাড়িত করে চট্টগ্রাম দখল করল। কায়েম হলো মোগল শাসন।

একটু থেমে দুঃখী কণ্ঠে বলে, ইতিহাস তো এ রকমই, বারুদ, রক্ত ও অশ্রুতে ভরা।

ঋতু রিমনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

শ্যামলের চোখে এখন ঘোর। মৃদু কণ্ঠে বলল, মীরসরাই থানার পশ্চিম প্রান্তের সমুদ্র তীর থেকে কুড়াল দিয়ে গাছ কেটে পথ তৈরি করে মোগলরা চট্টগ্রামে উপস্থিত হয়েছিল। ২৭ জানুয়ারি তারা উত্তর চট্টগ্রাম দখল করে। একটু পর বলল, আমি একটা জিনিস দেখেছি।

কী? আমি জানতে চাইলাম।

সে বলল, যুদ্ধের শেষ পর্যায়। পাহাড়ের পাদদেশে বসেছিলেন উমেদ খাঁ। সৈন্যরা জয়ের খবর শোনাল। শুনে তিনি ভাবলেন, মানুষ জয়ী হয় হেরে যাওয়ার জন্য। তারপরও জয়ের আনন্দ আছে। আনন্দ প্রকাশের আগেই তার হাই উঠল। হাই সামলে অদূরে আমগাছের দিকে তাকালেন। দেখলেন, শাদা-কালো ছোট্ট একটা পাখি মায়া ভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বাংলার রূপ কেমন হবে সাথে সাথে বুঝতে পারলেন।

শ্যামল বলে, সেই পাখিটা ছিল দোয়েল।

হুম।

উমেদ খাঁর হাই তোলা পাখি ছাড়া আর কেউ দেখে নি। সেদিন দেখলাম আমি।

তুই! আমি মুচকি হাসলাম।


বাংলাদেশ এখন সত্যিই বাঘ। লোকজন বলছে, বাঘ এখন গর্জন করতে পারে।


আষাঢ়ের সকালে রোদ থাকে কোমল। কিন্তু আজ তার তীব্রতা থুত্থুড়ে বুড়োর খর চাহনির মতো। দুপুর হতে হতে তা আরো খনখনে; গলায় কফ আটকানো কাশির মতো। আমরা কয়েকজন বন্ধু ক্লান্ত হয়ে প্রেস ক্লাবের নিচে বাতিঘরে বসে আছি। এ তো একটা জাহাজ, জাহাজভর্তি বই। জ্ঞানেরই রাজ্য।

ঋতু বলল, জ্ঞানের রাজ্যে পিছিয়ে আছে বাঙালি।

রিমন বলল, জ্ঞান!

ঋতু মুখ বাঁকাল, না, ধ্যান।

আমার খুব খিদে পেয়েছে। ঘুমও। মনে হলো, কিছু খেলেই ঘুম ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাই মুখ খুলি না।

দক্ষিণ কোনায় টিভির বড় স্ক্রিন। টিভিতে গতকালের বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট ম্যাচটা দেখাচ্ছে। বাংলাদেশ ৭৯ রানে জয়ী হয়েছিল। ভারতের অধিনায়ক বাংলাদেশের নবাগত মুস্তাফিজকে গুঁতা মেরেছেন। বিষয়টা সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। সবাই দুষছে ধোনীকে। প্রথম আলো হেডলাইন করেছে : বাংলাদেশ এখন সত্যিই বাঘ। লোকজন বলছে, বাঘ এখন গর্জন করতে পারে।

এ সময়ই ব্যাপারটা ঘটে। শ্যামল টিভিতে দেখল, বিজ্ঞাপনে এক মহিলা হাই তুলছে। তখন তার মনে পড়ে, সে স্বপ্নে বুজুর্গ উমেদ খাঁকে হাই তুলতে দেখেছিল।

রিমন তার মাথায় চাঁটি মারে।

শ্যামল আনমনে বলে, ঠিক একই রকম। হ্যাঁরে, সত্যিই দেখেছি।

পেছনে কয়েকজন তরুণ এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা খুলে কিছু দেখছে। একজন বলে, বাংলাদেশ টেমটেমি গাড়ির আবিষ্কারক। আরেকজন বলে, বাঙালি আবিষ্কার করে না, আবিষ্কারের রহস্য মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখে।

আমার ঝিমুনি ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিয়েছে। মাঝে মাঝে এ রকম ঘুমের কবলে পড়ি। তখন একটা জাহাজে চড়ে সাগরে ভাসতে ইচ্ছে করে। ডেকে আমি একলা। আকাশে থাকবে কোটি কোটি তারা, তারার আলোয় দেখব সমুদ্রের রূপ।

বন্ধুরা না থাকলে হয়তো ঘুমিয়েই পড়তাম। আর পারছি না, বললাম, কফি খাব।

ইতিহাস শ্যামলের প্রিয় বিষয়। সে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ও আবদুল হক চৌধুরীর বই উল্টে পাল্টে দেখছিল। নবাব ওয়ালি বেগ খাঁর নাম দেখে চকবাজার ওলি খাঁ মসজিদের কথা উঠল। ওয়ালি বেগ খাঁ ছিলেন চট্টগ্রামের মোগল শাসনকর্তা। ১৭১৪ সালে তিনি চকবাজারে নির্মাণ করেছেন একটা মসজিদ ও দিঘি। দিঘির নাম কমলদহ। দিঘির পাড়ে ছিল তার কাচারি। তিনি কাচারিতে থেকে নবাবি কাজ চালাতেন। সেই সময় কর্ণফুলী নদী ছিল আরো কাছে। শুলকবহর পর্যন্ত বাণিজ্যের জাহাজগুলো যাতায়াত করত। সে জন্য বাণিজ্যকেন্দ্র হিশেবে এখানে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। পরে তা চকবাজার হয়। সেই দিঘি আর নেই। ওখানে নাকি তার স্ত্রীর কবরও ছিল।

দিঘিটা কোথায়? রিমন জানতে চায়।

শ্যামল বলে, দিঘির পশ্চিম পারে ওলি খাঁ মসজিদ, শিখদের গুরুদুয়ারা ও হিন্দুদের কালীমন্দির। সব সম্প্রদায়ের মানুষ এই দিঘি ব্যবহার করত। কিন্তু সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে উঠা দিঘিটা লোভের পেটে ঢুকে গেছে। দিঘি ভরাট করে কমিউনিটি সেন্টার ও আরো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

আহ! চকবাজারের মাঝখানে একটা দিঘি, দিঘি ঘিরে পার্ক। কয়েক শ বছরের পুরনো বিশাল বিশাল গাছ আর হাজার হাজার পাখি। পার্কে মানুষ। কেউ মানুষের সঙ্গে, কেউ গাছ কিংবা পাখির সঙ্গে প্রেম করছে। কেউ প্রেম দেখছে। শিশুরা খেলছে, বৃদ্ধরা হাসছে। কত দারুণ হতো!

ঋতুর কথায় ওরা হাসে। সে বলে, দিঘি থাকলেই তার কোনো কাহিনি থাকে। মনে হয়, দিঘিতে সোনার থালা ভেসে উঠত। ভেসে ভেসে শান বাঁধানো ঘাটের কাছে আসত। ওখানে বসে থাকতেন ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া কোনো রানি; যাকে কেউ চেনে না। সেই রানি জোছনা রাতে রহস্যময়ী হয়ে যেতেন। ওয়ালি বেগ বা আর যারা নবাব, তাদের স্বপ্নের নারী যেরকম হয়, তার চেয়েও অন্যরকম।

আমি বলি, একদিন গভীর রাতে জোছনা মাখা সেই রানি হাই তুলেছিলেন। তার হাই দেখেই তো পাগল হয়েছিলেন ওয়ালি বেগ।

শ্যামল জিজ্ঞেস করল, ইতিহাস কি ছক্কা খেলা?

ঋতু বলল, না, সাপ-লুডু খেলা। বলে হাসে।

ধূমায়িত ও ফেনায়িত কফি আসে। ঘ্রাণ শুঁকে তিন বন্ধুর দিকে তাকাই। বললাম, আমি একবার একটা জিনকে হাই তুলতে দেখেছিলাম। সেই কথা মনে পড়ল।

তারা আমার দিকে তাকায়। ঋতু চেপে ধরে, কোথায় দেখেছিস?

শ্যামল ও রিমন চুপ করে আছে। ঋতুর চাপাচাপিতে আমাকে বলতে হলো।

কয়েক বছর আগের এক আষাঢ় মাসের কথা। আমি বলা শুরু করলাম : ঝুম ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। তোদের নিশ্চয় মনে আছে, অফিস থেকে পাঁচদিনের ছুটি নিয়েছিলাম। তোরা জানতে চেয়েছিলি, কোথায় যাচ্ছি। আমি বলি নি, দুষ্টামি করেই বলি নি।

সেবার গিয়েছিলাম নানাবাড়ি। বাড়ির অদূরে টিলার পর টিলা। নানা জাতের গাছ ও জঙ্গলে ভরা। টিলায় বাঘ-হাতি ছাড়া সব আছে। নানার বাহু দুটো জারুলগাছের মতো আর আঙুলগুলো যেন পাঁচ সুতা লোহা। মহিষের মতো কালো নানাকে মাঝে মাঝে পাগলা মহিষ মনে হয়। বাঘ-হাতিকে এক ঘাটে পানি খাওয়াতে পারে—এমন তার শক্তি। বিশাল দুটি মহিষ দিয়েই চাষ করত। যেদিন লাঙল আর মহিষ নিয়ে মাঠে যেত, লোকজন অবাক চোখে দেখত তার হাল চষা।

সেই নানা একবার এক জিনের কবলে পড়েছিল। জিনটা থাকত তার আখখেতেই। একদিন এক কামলা আখখেতে দেখে সুন্দরী এক মেয়ে বসে আছে। তার মনে দুষ্টামি চাপে। দুষ্টামি করতে গিয়ে মেয়েটার চড় খায়। চড় খেয়ে তার কথা বন্ধ হয়ে যায়। পরে জিনটা নানার ওপর আছর করে।

নানি তো দুরন্ত সাহসী। তার চোখ কোরবানির দিন সকালে বালিতে ঘষে ধার দেওয়া কিরিচের মতো। তাতে যে কাউকে কাটতে পারে। সেই ধারে কাটা পড়েছিল জিনটা।

নানাদের ছিল আখখেত। আখকে বলে কুইশ্যেল। দুই-তিন কানি জমিনের সেই খেত। বিশাল বিশাল সব আখ। কখনো আসামি, কখনো বাঁশ বা ফুল আখের চাষ হয়। খেতে ঢুকলে উত্তর-দক্ষিণ দেখা যায় না। চৈত্র মাসের দিকে রোপণ করে। শ্রাবণ শেষ হতে হতেই আখ বড় হয়ে যায়। ভাদ্র মাসে কাটা হয়। তারপর শুরু হয় মাড়াই। রস থেকে তৈরি হয় গুড়। সে এক কর্মযজ্ঞ।

দোআঁশ মাটি বলে ফলন ভালো হয়। ঘরের পাশে পুকুর, পুকুর ফেলে বিল। আখের সময় সেখানে মাড়াই হয়। ওটাকে বলে গাছঘর। লোহার ফালি আর গরু দিয়ে পেরানোর কাজ চলে। ওই সময় দিন-রাত এক সমান হয়ে যায়। আখ চাষ মহা ঝামেলার কাজ। মাড়াইকালে মাঝেমধ্যে বিরক্ত হয়ে নানি বলে, ‘হাত (সাত) পুত তেরো নাতি/ তে গরে কুইশ্যেল ক্ষেতি।’

এক পাশে মাড়াই হয়, আরেক পাশে বড় চুলা। চুলায় বড় কড়াই। কড়াইয়ে রস জ্বাল দেওয়া হয়। চার-পাঁচজন কামলা একনাগাড়ে কাজ করে। সেবার কাজ করছিল পাঁচজন।

একদিন বিকালে নানা বাজারে যাওয়ার পর দুজন কামলা আসে নানির কাছে। নানি বলে, কাজ কেমন চলছে?

কামলা বলে, ভাবী, একটা সমস্যায় পড়েছি।

নানি তাদের বসতে বলে। বলো তোমাদের সমস্যার কথা।

একজন বলে, ভাবী, আমাদের সাথে এক লোক কাজ করে, কিন্তু সে আমাদের মতো না। তার কোনো ছায়া নাই। ইয়া মোটা মোটা বাহু, তিন-চারজনের কাজ একাই করে।

নানি বলে, জিন নাকি?

লোকটা বলে, আমাদেরও সেরকম সন্দেহ।

তো?

আরেকটা ব্যাপার। লোকটা আমতা আমতা করে। আপনাকে কিভাবে বলব ভাবছি।

বলে ফেল।

রাতের বেলা ভাইয়ের সাথে প্রায় একটা মেয়েকে গল্প করতে দেখা যায়।

বলিস কি! ওখানে মেয়ে কোত্থেকে আসবে?

আমরা সবাই দেখেছি। বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করলে বলে, যে দেশে রসিক বসত করে, যেখানে মানুষ উড়তে পারে মনের সুখে, সেখানে তার বাড়ি। নিজে থেকে কোনো কথা বলে না।


মেয়েটাকে টেনে নিয়ে ফুটন্ত রসের কড়াইয়ে ফেলে দিল।


নানির চেহারায় অবিশ্বাস।

কামলা বলে, একদিন রাতে আসেন। না দেখলে বিশ্বাস করবেন না।

কাজের সময় লোকটার হাতগুলো হাতির পায়ের মতো মোটা মোটা হয়ে যায়। আর কী শক্তি! কাজ করে বাঘের শিকার ধরার মতো। কোনো ছাড়াছাড়ি নাই। কাজ শেষে সে নানার দিকে তাকিয়ে হাসে। ধীরে ধীরে অন্য কামলাদের থেকে দূরে সরে যায়। এক রাতে এক কামলা দেখে, হাসতে হাসতে ও অপরূপ এক তরুণী হয়ে গেছে।

কামলারা নানিকে আবার জানাল আর নানি জিজ্ঞেস করল নানাকে। নানা পরিষ্কার করে কিছু বলল না। কেননা তাকে বলতে মানা করেছে ওই রহস্যময়ী।

আখ মাড়াইয়ের সময় রাতে নানার আসতে প্রায় দেরি হয়। শরম ফেলে নানি একদিন গেল। যে দৃশ্য দেখল, তার মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার দশা। দেখে, স্বামীর পাশে এক তরুণী, চাঁদের আলোর মতো চোখ। কী একটা কথা বলে হাসল।

আকাশ ছড়ানো জোছনা। ওই পাশে চুলা। চুলায় বড় কড়াই। আখের রস জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। আগুনের আভা ও জোছনার রং মিলে অন্যরকম এক আলো। মেয়েটার হাসি সেই আলোর মতো।

তোরা তো আমার নানিকে দেখিস নি। নানা বলত, আনারের মতো তার রং। স্বাস্থ্যও ছিল দেখার মতো। দুই হাতে দুই কামলাকে ধরে আছাড় মারতে পারে—এমন তার শক্তি। চাষার ঘরের বউ; সব কাজ এক হাতেই সামলায়।

নানি রাগে কাঁপতে কাঁপতে খপ করে ধরল। কামলারা অবাক হয়ে দেখল, নানি মেয়েটাকে টেনে নিয়ে ফুটন্ত রসের কড়াইয়ে ফেলে দিল। এক কামলা কিছু বলতে চাইল। নানি বলে, খবরদার, যদি কাউকে এই কথা বলিস, তোদেরকেও ফেলে দেবো।

ফেলে এসে নানার দিকে তাকায়। নানির চোখ চিতার চোখের মতো জ্বলছে। জোছনার আলোয় নানা তা পুরো দেখে না। কাঁপতে কাঁপতে বলল, তুমি আমার স্বামী, তাই বেঁচে গেলে।

নানা বলতে চাইল, তুমি যাকে চুলায় ফেলে দিলে, সে মানুষ নয়। একটু পরই আলোর মতো ফুটে উঠবে।

তার চোখ যায় পেছনে। নানার চাহনি দেখে নানিও তাকায়। দেখে, কড়াইয়ের মাঝখানে একটা হাসনাহেনা গাছ। গাছের ডালে বসে আছে মেয়েটা। এখন সে পুতুলের মতো ছোট। তার হাতে একটা টুনটুনি। টুনটুনিটা গাইছে, টুইট টুইট টুন টুন।

নানিকে তাকাতে দেখে মেয়েটা হাই তুলল।

অবাক হয়ে নানি জিজ্ঞেস করল, ওটা কে?

নানা আস্তে করে বলল, জিন।

পরদিন সকালে নানি ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলায়। নানাকে বলে, এ রকম কাণ্ড তো কখনো হয় নি।

কী?

দেখলাম, আমি ঘুমাচ্ছি। আমার ঘুমের উপর দিয়ে ওই পুতুলের মতো মেয়েটা হাঁটছে, কোমর দুলিয়ে নাচছে। একটা পুরুষের বাহু ধরা।

পুরুষটাও ছোট হয়ে গেছে। তার মুখটা তোমার মতো।

নানা বলে, সে তোমাকে জ্বালাতন করা শুরু করেছে।

কার কথা বলছ?

জিন।

কোন জিন?

যাকে তুমি কড়াইয়ে ফেলেছ।

ওকে তাড়িয়ে দাও নি কেন?

তাড়ালে অন্য রূপ নিয়ে ফিরে আসবে।

কেন?

আমার ওপর তার নজর পড়েছে।

নজর টজর বুঝি না। দরকার হলে আগুনে পোড়াব।

নানা চুপ থাকে। নানি বলে, এবার থেকে বঁটি নিয়ে শোব। আবার যদি আসে, এক কোপে দুই ভাগ করে ফেলব। হারামজাদি, আমার সাথে শয়তানি!

নানা কিছু বলে না। লাঙল আর মহিষ নিয়ে মাঠে চলে যায়।

সেই জিনটার কী হলো? ঋতু জিজ্ঞেস করে।

নানি এ ঘটনা বলেছে মাত্র একজনকে। সে হলো আমার দাদি। দাদিকে বলার সময় ঘুমের ভান ধরে শুনেছি। আমাকে নড়তে দেখে নানি কথা বলা থামিয়ে দিয়েছিল। পরে তাকে জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু কোনো কথা বের করতে পারি নি। চাপাচাপি করায় বলেছিল, তুই মনে হয় স্বপ্ন দেখেছিস।

রিমন বলল, চৈত্র-বৈশাখ মাসেও এমন রোদ থাকে না। রোদের দিকে তাকানো যাচ্ছে না।

ঋতু বলল, বর্ষায় বৃষ্টি না হলে গাছ আর মাটি কান্না করে।

ঋতুর চোখ দুটি একটু ছোট। অনেকটা পাখির মতো। রিমন বলে, ও তো আমাদের পাখি বন্ধু।

একটু পর বললাম, ঘটনা আরো আছে।

বল পাস করে নেওয়ার সময় খেলোয়াড়রা বিপক্ষের পায়ের দিকে যেভাবে তাকায়, ওরা সেভাবে তাকাল।

গত বছর পহেলা আষাঢ়ে খুব বৃষ্টি হয়েছে। আমি ছিলাম গ্রামের বাড়িতে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনলেই ঘুমাতে ইচ্ছে করে। সেদিন ভাত খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিলাম। মোবাইলে গার্গী ঘোষের কণ্ঠে ‘মেঘ বলেছে যাব যাব রাত বলেছে যাই’ গানটা শুনছিলাম।

আমার খুবই প্রিয় গান। ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করেছিলাম। হঠাৎ মোবাইল হ্যাং হয়ে গেল।

ঘোড়ার চিঁহিহি ডাক শুনি। দরজায় ঠকঠক শব্দ, ভরাট কণ্ঠে বলে, দরওয়াজা খুলিয়ে, বহুত দুরসে আয়া।

আমি তো অবাক। ঘড়ির দিকে তাকাই। দশটা বাজে। দরজা খুলে দেখি, মাথায় পাগড়ি, বইয়ে দেখা মোগল রাজাদের মতো পোশাক পরা এক লোক। পায়ে নাগড়া, কোমরে লম্বা তরবারি।

উঠানে আমগাছের পাশে দাঁড়িয়ে আছে শাদা ঘোড়া। এমন শাদা, তার আলোয় উঠানটা আলোকিত। চোখ দুটি জ্বলছে। অদূরে আরো অনেকগুলো ঘোড়া দাঁড়িয়ে।

কে যেন ডাকল, এই গুবরে পোকা!

আমি অবাক হয়ে এদিক ওদিক তাকালাম। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে শুনলাম অদ্ভুত এক নারী কণ্ঠ। মাথার উপর শতচ্ছিন্ন একটা ছাতা। কোকড়ানো ধূসর রঙের চুল আর দাড়ি। পরনে ময়লা পাঞ্জাবি-পাজামা। খালি পা। মুখটা সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিনের ময়লার স্তূপের মতো।


হাসিটা মোহনীয়। মুহূর্তে গম্ভীর। চোখ দিয়ে আগুন বের হচ্ছে।


কণ্ঠের সাথে চেহারার কোনো মিল নেই। বিদ্যুৎ চমকাল।

লোকটা নারী কণ্ঠে বলল, দেখো।

দেখলাম। রীতিমত গা কেঁপে উঠল। ছোটবেলায় আমরা ‘সু মন্তর সু’ বলে জাদুর খেলা খেলতাম। লোকটাও তেমন এক পলকে ছাতা, মাথা সব খুলে ফেলল। অপরূপ এক তরুণী, একেবারে পরির মতো। হাই তুলে মৃদু হাসল। হাসিটা মোহনীয়। মুহূর্তে গম্ভীর। চোখ দিয়ে আগুন বের হচ্ছে।

হাসি না থাকলে সুন্দর ফুটে ওঠে না। গোমড়া মুখে মেয়েটি বলল, আমার কথা কাউকে বলবি না। বললে তোকে নিয়ে যাব।

কিছু বলব না ভেবেও জিজ্ঞেস করলাম, কোথায়? সে কি বলল জানিস?

কী? শ্যামল ও ঋতু একসাথে প্রশ্ন করল।

না থাক, সে কথা বলা যাবে না।

কেন?

মানা আছে।

কার?

কার আবার, ওর।

তাহলে বলেছিস কেন? ঋতু জানতে চায়।

রিমন বলে, আমাদেরকে কি বাচ্চা পেয়েছিস?

যা ঘটল তাই তো বললাম। তাছাড়া পৃথিবীতে সবকিছু কি আমাদের হিশাব মতো ঘটে? ঘটে না।

রিমন বলে, বাবু, আজ রাতে যদি বৃষ্টি পড়ে, তাহলে তো তোকে হারাব।

আমি চুপ থাকি।

ঋতু হাই তুলল।

আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকাই। সে একটু অবাক হয়। জিজ্ঞেস করে, কী হলো?

আমি কিছু বলি না। ঋতুকে নিয়ে কিছু স্বপ্ন সাজিয়েছিলাম। এতদিন খেয়াল করি নি, দেখি তার চোখ দুটি একটু নীলচে, একেবারে ওই মেয়েটার মতো। ওই রাতে এই চোখই কি দেখেছিলাম! ভয়ে গায়ে কাঁটা দেয়। তার ছায়াটা দেখতে ইচ্ছে করে।

বাইরে তাকিয়ে দেখি, ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি পড়ছে।

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প; ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প; ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)