হোম গদ্য গল্প মীনাক্ষী রানিকে নিয়ে রচিত দীর্ঘশ্বাস

মীনাক্ষী রানিকে নিয়ে রচিত দীর্ঘশ্বাস

মীনাক্ষী রানিকে নিয়ে রচিত দীর্ঘশ্বাস
463
0

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান বাজছে।

আমার জীবনের এত খুশি এত হাসি, কোথায় গেল
ফুলের বুকে সেই অলির খুশি, কোথায় গেল…

বসন্তের এই প্রথম বেলায়, বিকেলে দুপুরে আর বিষণ্নতার সন্ধ্যায় মেহগনি বাগানে অনেক বাতাস এসে পাতা ঝরায় আর আমার জানালায় তার কেমন শব্দ আসে। ছুটির এই দীর্ঘ সময় এই একই ব্যাপার যেন আমার আশে-পাশে ঘটে যায়। মেহগনি বাগানে পাতা ঝরার শব্দ আমার জানালায় এসে শুধু আছড়ে পড়ে। অবসর সময়গুলো কেন যে দীর্ঘ হয়। মেহগনি বাগানে শুধু পাতাই ঝরে আর মুহূর্তগুলো স্থির, ঝরে না আর তাই স্মৃতিগুলো বড্ড বেপরোয়া, আসে, মেহগনি বাগানে পাতা ঝরার মতো টুপটাপ ঝরে।


চিৎকার, মানুষের আর ঝড়ের। একটা বাঁশ ছুটে এসে পড়েছিল বাবার মাথার উপরে, তার এক মুহূর্তের চিৎকার। ভীষণ ঝড় সে রাতে।


সেই বয়সী কড়ই গাছটা, যদিও আমি এখন আর জানি না যে সেটা আছে কিনা। কোন সময় যেন তাতে ফুল আসত, ছোট ছোট ঘিয়ে রঙের ফুল, বাতাসে কেমন ঝরত, ঘাসের উপরে, ধুলোয় আর আমাদের দেহে টুপটাপ ঝরত। যদিও সুখ বলে মোটাদাগে কিছু ছিল না, তবে ছিল, আর মনে জমা বিষণ্নতাও টুপটাপ ঝরে পড়ত কিন্তু সে গাছটা কি আর আছে। একদিন ঝড় এসেছিল। তখন রাত্রিবেলার সে ভীষণ ঝড়ে চোখ কান বুজে খোদাকে ডাকছিলাম আর প্রায় জ্ঞানশূন্য আমরা দেখছিলাম বইয়ের ছেঁড়া পাতার মতো ঘরের চালা উড়ে যেতে। সে কী চিৎকার, মানুষের আর ঝড়ের। একটা বাঁশ ছুটে এসে পড়েছিল বাবার মাথার উপরে, তার এক মুহূর্তের চিৎকার। ভীষণ ঝড় সে রাতে। সেই বয়সী কড়ই গাছটার ডাল ভাঙল, সবচে মোটা আর উঁচু ডালটা। বাবা মরল। আর জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। সে অধ্যায়ে জীবনের রং ছিল। কত রকম ওজনে দিন কেটে যেত। এখন একই ওজনে দিন কাটে, বিষণ্নতা আর বিষণ্নতা। কারখানার মেশিনের শব্দ। মানুষের নোংরা কোলাহল আর একঘেয়ে কাজের ক্লান্তি, বিষণ্নতা।

হায় স্বপ্নভরা সেই গান, আজ কেন হলো অবসান
সেই দুটি কথা, ভালোবাসি, কোথায় গেল…

বাতাস যেন ঢেউয়ের মতো বয়ে আসে। শরীরে কখনো ছুঁয়ে যায় আবার কখনো যেন পিছলে পিছলে পড়ে। স্মৃতিগুলো এমন যদি পিছলে পড়ত কিংবা অতীত যদি মুছে যেত। মুন্নু এখন কোথায় কে জানে। ও তো কলেজ পাশ করেছিল শুনেছিলাম। আরো পড়তে চেয়েছিল কিন্তু পারে নি। আমিও পারি নি। কতজন পারছে, পড়ছে, ওদের যেন পড়ার কোনো শেষ নেই। সুজন পড়ে, ব্যারিস্টার নাকি হবে, আদালতে বসবে, বিচার করবে, আমি যে একদিন তাকে বেদম মার মেরেছিলাম, ক’দিন হাসপাতালে ছিল, সেকি ওর মনে আছে আর? তা থাকুক, মনে থাকুক, বিচার করুক। বন্ধুরে তুই জজ-ব্যারিস্টার হবি, বিচার করবি, পারলে করিস তো, এই কপালের বিচার করিস, তোর হাকিমি দেখব।

করুণ আর ক্লান্তস্বরে একটা ঘুঘু ডাকছিল দূরে এবং এখন আর তার কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। আমি বাইরে এসে এলোমেলো হাঁটি। কত ব্যস্ত মানুষ। যান্ত্রিক অযান্ত্রিক গাড়িগুলোও। ধুলো ওড়ে। মানুষের ভিড়। ছোট ছোট জটলা। গল্প শুনি। সারি সারি দোকান। মানুষজনের আনাগোনা। হোটেলে ভাজা ডিমের গন্ধ। খাবারে মাছি। কাঁচা বাজার। মাংসের দোকান। মাছের বাজার। কত মাছ। সমুদ্রের আঁশ উঠা ঘোলাটে চোখের মাছ। নদীর মাছ, পদ্মার মেঘনার। একটা টাটকা মাছ চোখে পড়লে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখি। পেটটা মোটা আর সরু লেজ। চকচকে আঁশ। চোখ দুটো টলোমলো আর যেন আমার দিকে দৃষ্টি। ভাসা ভাসা চোখদুটো থেকে যেন এখনি জল ঝরে পড়বে। আহা কে কিনবে আর মাছটাকে জল্লাদের মতো কাটবে। আচ্ছা কোথায় সে সিঁথিরানি বিশ্বাস। বিয়ে হয়েছে কিনা। সিঁথিরানি বিশ্বাস রে তোর বিয়ে হয়েছে, এখন ঘর করছিস, বরের আদরে পুলক পাচ্ছিস, একদিন তুই কার হতে চেয়েছিলি রে?

বাজার থেকে বেরিয়ে শহরের প্রান্তে চলে আসি। এখানে এক নদী। বাধাহীন আকাশ দেখা যায়। কিন্তু আকাশ কেন যে এত ফ্যাকাশে হয়। ভালো লাগে না, যেন মরা আকাশ, আঘাতে আঘাতে মরেছে কিংবা এখনো বেঁচে আছে রক্তশূন্য রুগির মতো মরার অপেক্ষায়। এই আকাশেই কি ছোট-বড় তারা ফুটে জ্বলজ্বল করে জ্বলে? চাঁদও ওঠে। এই মরা আকাশেই উঠে আর মরার মতো জ্বলে। আর কতই বা আলো দেবে। কোটি কোটি বছর হয়ে গেছে তো, এখন হয়তো তার শেষ সময় চলছে। তা চলুক, তাড়াতাড়ি বরং চাঁদের মৃত্যু ঘটে যাক আর গিয়ে পৃথিবীর উপরে টুপ করে খসে পড়ুক। এখানে বড় বেশি দিন মানুষের বীজ টিকে গেছে।

নদীটা বড় নয় আর আমার শৈশবের নদীর মতো ছোটও নয়। কিন্তু সুন্দর। কেমন যেন রূপ যেটা চোখে পড়ে কী পড়ে না, খুঁজতে হয়। আমি পার ধরে হাঁটতে থাকি। নিচে ছোট ছোট ঢেউ। কেমন শান্ত হয়ে বয়ে আসে। আমি দেখি আর হাঁটি, হাঁটি আর দেখি। শান্তি লাগে। কেন লাগে তা কি জানি তবে শান্তি লাগে আর বুকের ভেতরে কোথাও একটু ফাঁকা ফাঁকা। তবু সময় কোথাও আর আটকে নেই। নদী পারের হাওয়ায় সময় যেন ঝর ঝর ঝরে যায়। ছন্দের কোনো পতন নেই। আমি একটু দাঁড়াই। পায়ের নিচে বালুচর। বাতাসে মিহি বালুকণা ওড়ে। নদীপারের ওপারেই গ্রাম। সারি সারি গাছ। দু’একটা বাড়ি। মানুষজন নেই। আবারও হাঁটি পায়ের তলায় বালু মাড়িয়ে যেন সময়কে মাড়িয়েই। তারপর একটা বাঁক পেরোই। বাঁকটা আকস্মিক। তারপর ক্রমেই উঁচু পাড়, নিচে নেমে যায় নদীটা। আমি উঁচু পাড় ধরে হাঁটি। দেখি ছায়ার মতো ওপারে গ্রাম। আর দেখি নিজের ছায়াটাও ক্রমশ লম্বা হয়। হঠাৎ ঘেয়ো কুকুরের ডাক শুনি। সামনে এগিয়ে দেখি সরু রাস্তা নিচে নেমে গেছে। কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ দোকান। মানুষজনের কোলাহল। নদীতে ইঞ্জিন নৌকা। লোকজন ওপার-এপার করে। কূলে কয়েকটি জেলে নৌকা। তার ভেতরে একটা দেখি আয়োজন করে। হুট করে মনে হয় আর আমি আগ্রহের কথা বলি। তিনি সহজেই রাজি হন। তারপর নৌকায় চেপে বসতেই তিনি নৌকা ছেড়ে দেন। আহা নদীর টলোমলো জল। উপরে তাকিয়ে দেখি আকাশ কেমন প্রাণ পেয়ে গেছে। আকাশ আর ফ্যাকাশে নেই। আমি উপরে আরো উপরে তাকাই। দেখি নীল আকাশে পাখি উড়ছে ডানা দুটো মেলে দিয়ে। একটি দুটি নয়। অনেক পাখি উড়ছে। ওরা কি পৃথিবী দেখে আর পর্যবেক্ষণ করে? তারপর চীহ্হ ডাক শুনে চমকে উঠি। এত চিল কোত্থেকে এল। দেশ-গ্রামে এখন আর চিল দেখা যায় না। শৈশবে দেখা যেত। নিজের আঙিনায় দাঁড়িয়ে উপরে তাকালেই দেখা যেত পাক খেয়ে খেয়ে উড়ছে। তারপর হঠাৎ চেঁচামেচি শোনা যেত। তুরাবের মায়ের বুড়ো মুরগিটার দুটো বাচ্চা চিলে নিয়েছে। মুরগিটা তারস্বরে চিৎকার করছে আর বাকি বাচ্চাগুলো তরাসে আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। তুরাবের মায়ের কণ্ঠ বিরাম নাই। কিন্তু ততক্ষণে কোনো আকাশেই আর চিল দেখা যায় না। কোথায় হারাল সেই সব চিল। আর এগুলো মাথার উপরে কেমন উড়ছে। এখন কোথাও তো আর চিল দেখা যায় না। কোত্থেকে তবে উড়ে এল এগুলো। সেই শৈশব থেকেই কি। স্মৃতি থেকে এসে করোটিতে পাক খেয়ে খেয়ে উড়ছে যেন। আহা কোথায় যে হারাল।


শূন্য কি আকাশটাই, না শূন্য এ অন্তরটা? কিংবা অন্তরটাও নয়। শূন্য এ সময়টাই যে সময় কিনা একান্তই আমার হয়ে আছে।


জল কেটে নৌকা চলে আর আমি জলের ভেতরে কম্পমান আর উপরে স্থির আকাশ দেখি। ইচ্ছে হলে হঠাৎ ঝুঁকে এসে কামনার জল ছুঁয়ে দেখি। এ জল সত্যিই শীতল আর কামনার। কেমন যেন অন্তরে গিয়ে লাগে। তবে বলি। তাকে প্রথম কোথায় দেখেছিলাম যে সে যেন আজ আর মনে পড়ে না। কিংবা পড়ে, হয়তো ক্লাসেই দেখেছিলাম। গায়ে আকাশি রঙের কামিজ। পিঠজুড়ে কালোকেশ। বুঝি বাতাস ছিল না তবু চুল তার উড়ছিল। আর আমার মনেও একটা পাখি উড়াল দিয়েছিল। অস্থির ডানা ঝাপটাচ্ছিল আর তাতে কেমন আঘাত আসছিল। রক্ত ঝরছিল, তবু মিষ্টি সে আঘাত। কোথায় রে তুই সিঁথিরানি বিশ্বাস।

একটা জায়গায় নদী বেশ সরু হয়ে আসে আর একপাশে খাড়া পাড় এবং অপর পাশে দীর্ঘ বালুচর। এখানে স্রোত বয় বেগে কিন্তু নৌকার গতি কমে। জেলে জাল ফেলেন। তারপর মনে হয় এ কোথায় এসেছি আমি। জেলে তবু জাল ফেলেন। আমি আকাশের দিকে তাকাই। নদী আর ভালো লাগে না। তাই আকাশ দেখি। আর আকাশটা এখনো নীল বটে তবে তার সমগ্রতায় শূন্যতা ছাড়া কিছু নেই। শূন্য, মনে কেমন লাগে। কিন্তু শূন্য কি আকাশটাই, না শূন্য এ অন্তরটা? কিংবা অন্তরটাও নয়। শূন্য এ সময়টাই যে সময় কিনা একান্তই আমার হয়ে আছে।

না পাওয়ার ব্যথাভরা তিথিতে, মন আমার ভরে আছে স্মৃতিতে
হায় বাসরভরা সেই ফুল, হলো কাঁটার আঘাতে যেন ভুল…

জাল ফেলা শেষ হলে নৌকাটা ঘোরে। তারপর গতি বাড়ে আর আমার মনে প্রথমত স্বস্তি আসে। দ্বিতীয়ত মনে দৃশ্য ভাসে যে রুপালি একটা মাছ জালের ভেতরে অস্থির নড়ে-চড়ে। তারপর প্রাণ গেলে স্থির হয় আর চোখদুটো দেখা যায়। ভাসা ভাসা টলোমলো চোখদুটো, যেন আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আহা সিঁথিরানি বিশ্বাস।

যেখান থেকে ছেড়েছিল নৌকাটা সেখানে গিয়েই থামে। আমি মাটিতে পা রাখি। আকাশে তাকিয়ে দেখি সেখানে আর কোনো চিল ওড়ে না। যেন আবার শৈশবে, আমার স্মৃতিতে ফিরে গেছে। হয়তো আবার ফিরে আসবে কিংবা আসবে না। আমি আবার পথে হাঁটি। সূর্য থেকে আমরা ক্রমেই দূরে সরে যাই আর ছায়া আরো দীর্ঘ হয়। তারপর ঘরে ফেরার তাড়া অনুভব করলে নদীর পার ধরে দ্রুত হাঁটি। সন্ধ্যাও নেমে আসে দ্রুত। লোকমুখে গুজব শুনি, সময় ভালো নয়। অনেক মানুষের ওপরে এখন নাকি যমের আত্মা ভর করেছে। যদিও আমি ভীত নই তবু মনের ভেতরে কেন যে ঘরে ফেরার তাড়া কাজ করে। আর আমিও অন্ধকার গাঢ় হবার আগেই ঘরে ফিরে আসি। এই সন্ধ্যার অন্ধকারেও দেখি বেগে বাতাস বয়। জানালায় এসে আছড়ে পড়ে। মেহগনি বাগানে পাতা ঝরার শব্দ শোনা যায়। ঝর ঝর, ঝরছে। আর আমিও সেদিন ভুলি নি। রোববার ছিল। সময়টা ছিল পাতা ঝরার। কলেজের সামনে ছিল মাঠ। আর তারপরেই পুকুর। বাঁধা ঘাট আর ছায়াঘেরা। ঘাটের ওপরেই কৃষ্ণচূড়া গাছ। সময়টা ছিল লাল লাল ফুল ফোটার। সেখানেই প্রথম কথা হলো। সংকোচে আর লজ্জায়, সংশয়ে আর আশা-ভরসায়। সেদিন প্রথম কথা হলো কিন্তু কথা তো খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু দেখছিলাম। আমার পলক পড়ল না। তোমার পলক উঠল আর নামল। আমার পলক পড়ল না। কী সুন্দর চোখ দুটো তোমার। ভাসা ভাসা গোল গোল আর জলভরা টলমল। আমার দৃষ্টি পড়ল না। সময় তো বয়ে যায়। হঠাৎ তোমার মুখের ওপরে কৃষ্ণচূড়া ফুল পড়ল। তোমার মনে শক্ত হয়ে সংকোচ জাগল। তুমি চলে গেলে। আমার ঘোর কাটল না। এখন, বছর তো অনেক হয়ে গেল, এখনো আবেশ কাটল না। কোথায় যে কী হয়, কেনই-বা হয়, সেও তো বোঝা গেল না।

কারখানা খোলে আর আমার মনেও পুলক জাগে। শ্রমিকের নিঃশব্দ কাজ। যন্ত্রের একঘেয়ে শব্দ। তবু ভালো লাগে। এখানে বুঝি সময় বরফের মতো জমাট বেধে থাকে না। কিন্তু বিপরীত সত্যও মন বেশিক্ষণ ভুলে থাকে না। ব্যস্ততার দায় সে তো আসলে ফাঁকি। স্মৃতি তো আসে। ব্যস্ততার ভেতরেও আসে। ভেঙে ভেঙে আর টুকরো টুকরো হয়ে আসে। কিন্তু এখানে যেন সে বাতাস বয় না। যে বাতাসে হাঁ হাঁ শূন্যতা। বেদনা তাই সহজ স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু সন্ধ্যেয় আবার পথে নামি। দিনের কাজ শেষ হয়। আর এই জগৎটা, সারাদিন ভেতরে আটকে থাকার পর বাইরের এই জগৎটা অচেনা মনে হয়। প্রথমে কেমন ভালো লাগে। তারপর ভেতরে বাহিরে জড়তা কাজ করে এবং তারপর দেখি কোত্থেকে বিষণ্নতা উড়ে আসে। স্মৃতি থেকে বয়ে আসা বাতাসে বাতাসে আর মেঘে মেঘে। সেদিন আকাশের কোন কোনায় যেন মেঘ করেছিল। সকালে কিন্তু রোদ ছিল। তারপর হঠাৎ কখন মেঘ করে এল। একটুখানি কালো মেঘ সারা আকাশে ছড়িয়ে পড়ল। রোদের পৃথিবী মুহূর্তেই কেমন অন্ধকার হয়ে উঠল। মাতাল হাওয়া উঠলে মেঘ ছোটাছুটি শুরু করল। কলেজের মাঠে দাঁড়িয়ে আমরা এসব লীলা দেখছিলাম। তরপর তোমার মুখটা দেখলাম কেমন ভার হয়ে আছে। কিসের যেন ছায়া পড়ে সোনামুখে। মেঘের ছায়াই কি?


অদ্ভুত সুন্দর লাগে চোখ দুটো, কেমন তাকিয়ে থাকে, ভাসা ভাসা চোখ দুটো ভারি টলোমল করে।


আমি বিচলিত হলাম আর তাই তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তুমি কেমন তাকিয়ে থাকলে, আমার পলক পড়ল না, তোমার মুখের ছায়া কাটল, তুমি সবকিছুকে উপেক্ষা করলে, কেমন প্রাণ নিয়ে কথা বললে, আমরা পরস্পরের প্রতি মতামত দিয়ে দিলাম, সেদিন আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ দিন মনে হয়েছিল, এখন বিষণ্নতম দিন। এবং আরো একটা দিন, যেদিন তোমার নাম দিয়েছিলাম। সত্যি, ভারি সুন্দর চোখ দুটো তোমার। ভাসা ভাসা আর জল ছলছল, হাসলে যেন ঝরে পড়ে। একদিন তোমাকে তাই নাম দিলাম কিন্তু সে সহজে নয়। কত দিন ভাবলাম, কত নাম মনে এল, কিন্তু মনে ধরল না। তারপর হঠাৎ করেই এক দিন, গভীরে লুকিয়ে থাকবার পরে, আমাকে নিয়ে খেলা খেলবার পরে মনে ভেসে উঠল। কবে কোথায় দেখে উঠা ছবি মনে ভাসল। সে একটা মাছের ছবি যেটা কিনা সদ্যই মরেছে, রুপালি রঙের মাছটা ঝকঝক করছে। তারপরে চোখের ওপরে দৃষ্টি পড়ে। অদ্ভুত সুন্দর লাগে চোখ দুটো, কেমন তাকিয়ে থাকে, ভাসা ভাসা চোখ দুটো ভারি টলোমল করে। তারপর মনের ভেতরে অনেক সমর্থন-শ্রেণি হাঁ বললে আমি চূড়ান্ত করে ফেললাম। মীনাক্ষী রানি। তুমি খুশি হলে খুব আর আমারো তৃপ্তি আর স্বস্তি হলো। তুমি সিঁথিরানি বিশ্বাস মীনাক্ষী রানি হয়ে গেলে কিন্তু হারালে। সবকিছ্ইু কত সহজেই হারাল।

সেই মিলনমালার বকুলরাশি, কোথায় গেল
আমার জীবনের এত হসি এত খুশি, কোথায় গেল…

অন্ধকার ঘনিয়ে এলে আকাশভরা তারা চোখে পড়ে। আমি গান বন্ধ করে কতক্ষণ চেয়ে চেয়ে তাই দেখি। তারপর নিঃশব্দ শুয়ে থাকি। মাথার উপরে পাখা ঘুরছে আর বাইরে মনে হয় বাতাস নেই। তারপর অন্যদিনের চেয়ে একটু আগেই আজ নয়ন ভাই আসে, আমি যার সাথে রুম ভাগাভাগি করে থাকি। তার হাতে দেখি রুপালি মাছ। বুঝলে, নদীর মাছ, একদম টাটকা, দামটা একটু চড়া তবু কিনলাম আজকাল এসব দুর্লভ কিনা। আমি মাছটার টলমল দুটো চোখ দেখি আর তারপর আবারো পাশ ফিরে শুই। নয়ন ভাই শুধায় আমার আবারো মাথা ধরেছে কিনা। আমি শুয়ে থেকেই মাথা নেড়ে স্থির হয়ে যাই। আজো বুয়া আসে নি তাই নয়ন ভাই নিজেই মাছ কুটে ধুয়ে রান্না চড়ায়। মাছ ভাজার শব্দের সাথে আমার নাকে মজাদার এক গন্ধ এসে নাড়া দেয়। আমি যেন কোন সে সাগরের অতল তলে টুপ করে ডুবে যাই।

তারপর রান্না শেষ হলে নয়ন ভাই ডাকে, এসো খাওয়া যাক এক সাথে আর আমিও বিছানা থেকে নেমে খাওয়ার জন্য বসি। নয়ন ভাই যত্ন করে আমার পাতে মাছের মাথার একাংশ তুলে দেয়। মাছের বীভৎস পোড়া চোখ ক্ষণিক আগে কেমন টলমল ছিল। আমার পলক পড়ে না।

সুবন্ত যায়েদ

কথাশিল্পী
জন্ম ২৯ নভেম্বর, ১৯৯৫; কুষ্টিয়া। পড়াশোনা করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ই-মেইল : subantajayd@gmail.com